চলতি সংখ্যা
বর্ষ ২৬ সংখ্যা ০২
গৌরবের ২৫ বছর

রাজ্জাকের নায়িকারা

রাজ্জাকের নায়িকারা

ঢালিউডের জুটি প্রথার অন্যতম সফল নায়ক রাজ্জাক। একাধিক অভিনেত্রীর সঙ্গে তার জুটি গড়ে উঠেছিল এবং দর্শকমহলে সেইসব জুটি এখনো জনপ্রিয় হয়ে আছে। নায়ক হিসেবে রাজ্জাক যাদের বিপরীতে কাজ করেছেন, তারা হলেন— সুচন্দা, কবরী, অলিভিয়া, শবনম, শাবানা, নাসিমা খান, সুজাতা, ববিতা, কবিতা, নূতন, অঞ্জনা, রোজিনা, কাজরী। নায়িকানির্ভর নায়ক তাকে কখনোই বলা যাবে না। বরং অনেক নায়িকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে তার হাত ধরে। বলতে গেলে প্রভাবশালী সব নায়িকাই তার সঙ্গে কাজ করেছেন। নায়করাজ রাজ্জাকের নায়িকাদের কথা এখানে তুলে ধরা হলো।


কবরী
নায়করাজের পাশে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নায়িকার নাম কবরী। সুভাষ দত্তের ‘আবির্ভাব’ থেকে এই জুটির জয়যাত্রা শুরু। বছর দশেক এই জুটি চুটিয়ে ছবি করেছে। একটি-দুটি ছাড়া বাকি ছবিগুলো তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে। তুঙ্গে থাকা অবস্থায় এই জুটি ভেঙে গেলেও দর্শক হৃদয়ে রয়ে যান। রাজ্জাক-কবরীকে অনেকে সর্বকালের সেরা জুটিও বলে থাকেন। ১৯৬৯ সালে কাজী জহির রাজ্জাক-কবরীকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘ময়নামতি’। এ ছবিটিও দর্শক লুফে নেন। এরপর পরিচালক মিতা নির্মাণ করেন ‘নীল আকাশের নীচে’, ১৯৭০ সালে নজরুল ইসলামের ‘দর্পচূর্ণ', মিতার ‘দীপ নেভে নাই’, কামাল আহমেদের ‘অধিকার’ এইসব চলচ্চিত্রে রাজ্জাক-কবরী জুটির প্রেমের অনবদ্য উপস্থাপন দর্শকের মনে তুমুলভাবে জায়গা করে নেয়। এই জুটির ‘রংবাজ’ ছবিটিকে ঢালিউডের সেরা দশ সিনেমার অন্যতম বিবেচনা করা হয়। 
রাজ্জাকের সঙ্গে অভিনয় সম্পর্কে কবরী বলেন, ‘আমরা এমন আবেগ ঢেলে অভিনয় করতাম যে, ছবির প্রণয় দৃশ্যগুলো খুবই স্বাভাবিক এবং জীবন্ত হয়ে উঠত।’ তাদের অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো— ‘রংবাজ’, ‘ময়নামতি’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘আবির্ভাব’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘কাচের স্বর্গ’, ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’, ‘পরিচয়’, ‘অধিকার’, ‘বেঈমান’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘অনির্বাণ’ প্রভৃতি। পরবর্তীকালে ‘আমাদের সন্তান' ছবিতে রাজ্জাক-কবরীকে দেখা গেছে বয়স্ক বাবা-মায়ের ভূমিকায়। এই জুটি অভিনীত জনপ্রিয় গান ‘তুমি যে আমার কবিতা’ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ধ্রুপদী গানের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

সুচন্দা
সুচন্দার সঙ্গেই নায়ক হিসেবে রাজ্জাকের যাত্রা শুরু জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবিতে। তবে এই জুটির কালজয়ী ছবিটির নাম ‘জীবন থেকে নেয়া'। তাদেরকে অনেকে সর্বকালের সেরা জুটিও বলে থাকেন। ১৯৬৯ সালে কাজী জহির রায়হানের ‘আনোয়ারা’ এবং আমজাদ হোসেনের ‘জুলেখা’ ছবিতেও অভিনয় করেছেন এই জুটি। ষাটের দশকে রাজ্জাক-সুচন্দা জুটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে এই জুটির আর পুনরুত্থান হয় নি। রাজ্জাক-সুচন্দা জুটি হয়ে প্রায় ৩০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর বাংলাদেশে ভারতীয় ছবি আসা বন্ধ হয়ে গেলে বাংলা সিনেমার দর্শকেরা উত্তম-সুচিত্রা জুটির পর রাজ্জাক-সুচন্দা জুটিকেই সাদরে গ্রহণ করেছিল। সামাজিক-পারিবারিক ছবি থেকে লোককথার ছবিতে আলোচিত ছিল এই জুটি। তারা একসঙ্গে ‘আনোয়ারা’, ‘দুই ভাই’, ‘সুয়োরানী দুয়োরানী’, ‘কুচবরণ কন্যা’, ‘মনের মত বউ’, ‘সখিনা’, ‘জুলেখা’, ‘যোগ বিয়োগ’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘সংসার’, ‘প্রতিশোধ’, ‘জীবন সংগীত’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’— এইসব দর্শকনন্দিত সিনেমায় একসঙ্গে অভিনয় করেন।

সুজাতা
‘রূপবান’ করে খ্যাতি পাওয়া সুজাতার সঙ্গে বশীর হোসেনের ‘১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন’, আজীমের ‘প্রতিনিধি’, নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘এতটুকু আশা’, কামাল আহমেদের ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’ ইত্যাদি ছবিতে অভিনয় করেন রাজ্জাক। সত্তর দশকেই সুজাতা অভিনয় থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যান। রাজ্জাকের পাশে আর সুজাতাকে পাওয়া যায় নি।

শাবানা
শাবানার সঙ্গে নায়রাজের প্রথম সুপারহিট ছবি কাজী জহিরের ‘মধু মিলন’। পরে একই পরিচালকের ‘অবুঝ মন’ ছবিটি ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড গড়ে। শাবানার প্রথম প্রযোজিত ছবি ‘মাটির ঘরে’র নায়ক ছিলেন রাজ্জাক। এই জুটি সত্তর থেকে নব্বই— একটানা ছবি করেছেন। একাধিক ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন দেশীয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই দুই চিত্রতারকা। দু’জনের একসঙ্গে ছবি মানেই ছিল নিশ্চিত সাফল্য। প্রায় দুই যুগ ধরে এই জুটি বেশ কয়েকটি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র উপহার দেন। শাবানা চলচ্চিত্র থেকে বিরতি না নিলে হয়তো এই জুটিকে আরও বেশ কিছু ছবিতে দেখা যেত। এই জুটির উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে ‘মধু মিলন’, ‘অবুঝ মন, ‘পুত্রবধূ’, ‘অমর প্রেম’, ‘মাটির ঘর’, ‘সখী তুমি কার’, ‘ঝড়ের পাখি’, ‘মায়ার বাঁধন’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘রজনীগন্ধা’, ‘নাজমা’, ‘স্বামী স্ত্রী’, ও ‘অন্ধ বিশ্বাস’ অন্যতম।

ববিতা
নায়িকা হিসেবে ববিতার প্রথম ছবি ‘শেষ পর্যন্ত’ এবং শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম ছবি ‘সংসার’ নায়করাজের সঙ্গে। পরিচালক হওয়ার পর প্রথম ছবি ‘অনন্ত প্রেম’-এ রাজ্জাক বেছে নিয়েছিলেন ববিতাকেই। ববিতা আবার তার ব্যানারের প্রথম ছবি ‘ফুলশয্যা’য় রাজ্জাক ভিন্ন অন্য কারও কথা ভাবতে পারেন নি। ববিতার প্রথম জাতীয় পুরস্কার আসে রাজ্জাক অভিনীত ‘বাঁদী থেকে বেগম’ ছবিতে। রাজ্জাকের ৪০টি ছবির নায়িকা ববিতা। রাজ্জাক-ববিতা জুটির জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে ‘লাইলি-মজনু’, পিচঢালা পথ’, ‘বাঁদী থেকে বেগম’, ‘সোহাগ’, ‘বিরহ ব্যথা’, ‘প্রফেসর’ ও ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ উল্লেখযোগ্য। রাজ্জাক-ববিতা জুটির সূচনা খানিকটা ভিন্নভাবে। জহির রায়হান প্রযোজিত রাজ্জাক-সুচন্দার ‘সংসার’ (১৯৬৮) সিনেমায় তাদের মেয়ের চরিত্রে ববিতা প্রথম অভিনয় করেন। এরপর জহির রায়হানের আরেকটি চলচ্চিত্র ‘টাকা আনা পাই’ (১৯৭০) চলচ্চিত্রে রাজ্জাকের বিপরীতে ববিতা অভিনয় করেন। এই ছবিটি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এরই পথ ধরে নজরুল ইসলাম ‘স্বরলিপি’(১৯৭২) ছবিতে এই জুটিকে বেছে নেন। ছবিটি সুপারহিটের তকমা পাওয়ায় এই জুটি সবার পছন্দের শীর্ষে চলে যায়। ববিতার সঙ্গে জুটি বেঁধে রাজ্জাকের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় সিনেমার নাম ‘লাইলি-মজনু’। এ ছাড়া ‘অনন্ত প্রেম’ সিনেমাটিও বেশ আলোচিত হয়েছিল সেই সময়। অসংখ্য রোমান্টিক ছবি উপহার দিয়েছেন এই জুটি।

অঞ্জনা
আজিজুর রহমানের ‘অশিক্ষিত’ নায়করাজের সঙ্গে অঞ্জনার সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি। ‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে’ গানের জন্য বিখ্যাত এ ছবিটি। নায়করাজ তার নিজের প্রযোজনায়ও অঞ্জনাকে নিয়ে কাজ করেছেন ‘অভিযান’ ছবিতে। রাজ্জাক-অঞ্জনা অভিনীত ছবিগুলো দর্শকেরা বেশ পছন্দই করেছেন। শেষের দিকে দু’জনের আর ছবি করা হয় নি।

নূতন
নূতন সেই সৌভাগ্যবান নায়িকা যিনি সব সময় নায়করাজের সুনজর পেয়েছেন। নূতনকে নৃত্যপটিয়সী নায়িকা থেকে সুঅভিনেত্রী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় রাজ্জাকের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। রাজ্জাকের চরিত্রপ্রধান অনেক ছবিতেই নূতন অভিনয় প্রদর্শণের সুযোগ পেয়ে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। রাজ্জাকের পরিচালনায় ‘সৎ ভাই’ ছবির কথা এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে।

শবনম
নায়করাজের আরেক নন্দিত নায়িকা শবনম। ‘নাচের পুতুল’ সিনেমায় তারা একসঙ্গে অভিনয় করেন। রাজ্জাক-শবনম অভিনীত ‘যোগাযোগ’ ছিল তাদের সফল জুটির অন্যতম জনপ্রিয় ছবি। ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন’ গানটিকে বলা হয় নায়করাজের রোমান্টিক ইমেজের ট্রেডমার্ক। এ গানে ফোনের ওপাশে ছিলেন শবনম।

সুচরিতা
নায়করাজ সুচরিতাকে বিপরীতে পেয়েছেন তার ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংসে। চরিত্রাভিনেতা হিসেবে যখন রাজ্জাক দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেন, তখন তার নায়িকারা সিনেমা থেকে দূরে। কেবল সুচরিতাই ব্যস্ত রয়েছেন মা-ভাবির চরিত্রে। রাজ্জাক-সুচরিতা জুটির যৌবনে সবচেয়ে হিট ছবি দীলিপ বিশ্বাসের ‘সমাধি’।

রোজিনা
নায়করাজ ও রোজিনা দু’জনেই আশির দশকের ব্যস্ততম তারকা। তারপরও দু’জনে ছবি করেছেন হাতেগোনা। মূলত ফ্যান্টাসি ছবির প্রতি রোজিনার পক্ষপাত ও সামাজিক ছবির দিকে রাজ্জাকের দুর্বলতা ছবি কম করার কারণ। তারপরও এই দু’জন জুটিবদ্ধ হয়ে কিছু ছবিতে অভিনয় করেছেন।

অলিভিয়া
অলিভিয়ার সঙ্গে রাজ্জাক অভিনয় করেন প্রথম ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’ ছবিতে। পরে ‘যাদুর বাঁশি’সহ আরও কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন।

কাজরী
কাজরীকে নায়িকা হিসেবে ব্রেক দেন রাজ্জাক। কাজরী নামটিও তারই দেওয়া। তার সঙ্গে রাজ্জাক অভিনয় করেন ‘জোকার’, ‘মৌচোর’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে।

Leave a Reply

Your identity will not be published.