কক্সবাজার : এই সময়, সেই সময়

কক্সবাজার : এই সময়, সেই সময়

ছবিতে আমি যে জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে আছি, এটা কক্সবাজার হিলটপ সার্কিট হাউজের সামনের পশ্চিম দিক। এখান থেকে বেশ কিছু দূরে নীল সমুদ্র ও সাগর তীরের বিস্তীর্ণ ঝাউবন দেখা যায়। আমাদের ছোটবেলায় এখানে রেলিং ছিলো না, হালকা উঁচু নিরাপত্তা দেওয়াল বেষ্টনী ছিলো। কক্সবাজারের এই স্থানটি আমার অনেক পছন্দের ও ম্মৃতিবিজড়িত জায়গা। ইংরেজি ২০২৩ সালে আমরা সপরিবার ও আত্মীস্বজন নিয়ে যখন কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলাম, নস্টালজিক এই ছবিটি তখন তোলা হয়েছিলো। বহু বছর পর পুরোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে স্মৃতির বেড়াজালে কিছু সময়ের জন্য আমি আটকে পড়ে গিয়েছিলাম। কৈশোর থেকে জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আজ আমি প্রবীণদের খাতায় নাম লিখিয়েছি। এতোগুলা বছর কীভাবে যে কেটে গেলো তা বুঝতেই পারলাম না।

সত্তর দশকের দিকে বাবার চাকুরি সূত্রে আমরা কক্সবাজার থাকতাম। আমাদের বাসাটি ছিলো এই পাহাড়ের পাদদেশে। বাসার খুব কাছে হওয়ায় ছোটবেলায় সময়-সুযোগ পেলেই আমি পাহাড়ের এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে নীল সমুদ্র দেখতাম, ছোট ভাইয়ের সাথে গল্প করে সময় কাটাতাম। সেই সময়ে আমাদের বাসাটি কক্সবাজার শহরের একটি দৃষ্টিনন্দন। সরকারি বাংলো বাড়ি ছিলো। অনেক পর্যটক অনুমতি নিয়ে আমাদের বাসার সামনের গোলাপ বাগানের ছবি তুলতে আসতো। আমার মরহুম বাবার লাগানো অনেক শখের সেই গোলাপ বাগানটি আজ আর নেই। সময়ের বিবর্তনে বাড়িটি আজ জরাজীর্ণ ও বলতে গেলে একরকম পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে বাড়িটিতে বসবাসকারীদের একজন জানালেন, পুরোনো এই বাড়িটি ভেঙে নাকি সেখানে নতুন বাড়ি নির্মাণ করা হবে। আমাদের সময় সেই বাড়িটি আলো ঝলমল প্রাণবন্ত একটি আবাসস্থল ছিলো। বাংলো সংলগ্ন এই পাহাড়ের পশ্চিম পাদদেশে একটি প্রাচীন কবরস্থান রয়েছে, যেখানে চিরশায়িত আছেন আমার অনেক প্রিয় একজন মানুষ, যিনি আমাদের ছোটবেলায় অনেক আদরযত্নে  কোলেপিঠে করে বড় করেছেন। অনেক ইচ্ছে ছিলো সেই মানুষটির কবর  জিয়ারত করবো।  কিন্তু সুযোগ করে উঠতে পারি নেই।

একসময় আমার কক্সবাজারে বেড়ানোর মূল আকর্ষণ ছিলো সমুদ্র, পাহাড়, ঝাউবনসহ ছোটবেলার স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলো ঘুরে দেখা, বাবার আমলের পুরাতন মানুষদের সাথে দেখা করা। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, তাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। বাবার অফিস স্টাফদের পরিবারের সদস্যরা কে কোথায় আছেন তা-ও আমার জানা নেই। আমার ছোটবেলায় দেখা স্বপ্নের কক্সবাজার ঠিক আজ আগের মতো নেই। কলাতলী রোডের দুই পাশে কোনো বসতি ছিলো না। বর্তমানে সারি সারি সুউচ্চ আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও দালানকোঠায় ভরে গেছে কলাতলী রোডসহ পুরো কক্সবাজার শহরটি। অবশ্য দৃষ্টিনন্দন পর্যটন মোটেলগুলো ঠিক আগের মতোই রয়েছে। সাগরিকা ক্যান্টিনের দক্ষিণ দিকে আগে বেশ কয়েকটি পর্যটন কটেজ ছিলো। নব বিবাহিত দম্পতিরা মধুচন্দ্রিমায় বেড়াতে এলে সেখানে থাকতো। পুরোনো হয়ে যাওয়ায় সেই কটেজগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমাদের সময় কক্সবাজারে শহরের ভেতরের প্রধান রাস্তা দিয়ে শহরে প্রবেশ করতে হতো। মূল শহরের ভেতর যানবাহনের চাপ কমাতে শহরের ভেতর থেকে বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তর করা হয়ছে অনেক আগেই। সেখান থেকে পাহাড় কেটে রাস্তা বানিয়ে ডলফিন মোড় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কলাতলীর ডলফিন মোড় দিয়ে সকল যানবাহনকে বর্তমানে কক্সবাজার শহরে প্রবেশ করতে হয়।

সত্তর দশকের দিকে কলাতলীতে সমুদ্র পাড় ঘেঁষা সুন্দর একটি গ্রামীণ জনপদ ছিলো। বর্তমানে কক্সবাজার শহরে ভ্রমণের মূল আকর্ষণ হচ্ছে কলাতলী থেকে সমুদ্র তীর ঘেঁষে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্মিত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ পৃথিবীর দীর্ঘতম সুদৃশ্য মেরিন ড্রাইভ সড়কটি। এই সড়কটির একপাশে নীল সমুদ্র ও অপর পাশে পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য ভ্রমণপিয়াসী পর্যটকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।

আমাদের সময় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে কোনো সমুদ্র ভাঙন ছিলো না। বিশ্ব জলবায়ু উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জলবায়ু বিষেষজ্ঞরা মনে করছেন। অমাবস্যা, পূর্ণিমা কিংবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময় অস্বাভাবিক জোয়ারে সমুদ্র উপকূল ভাঙার প্রকোপ দেখা দেওয়ায় সমুদ্রের এই ভাঙন ঠেকাতে কক্সবাজার লাবনী পয়েন্টসহ আরও বেশ কিছু স্থানে জিও ব্যাগ ফেলে কোনো রকমে সমুদ্র ভাঙন ঠেকিয়ে রাখা হচ্ছে। আমাদের সময় সমুদ্র সৈকতের প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো ছিলো কক্সবাজারের মূল আকর্ষণ। দ্রুত নগরায়নের কারণে এখানকার প্রকৃতি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাড়িয়েছে। 

 সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িগুলো এখন আর তেমন দেখা যায় না। দেখা যায় না নির্জন সৈকত, খুব ভোরে সাগর সৈকতে লাল কাঁকড়ার দৌড়াদৌড়ি, মানুষের উপস্থিতি টের পেলে ওদের দ্রুত গর্তে লুকিয়ে পড়া ও সাগর তীরে সকাল বেলা ঝিনুকের ছড়াছড়ির দৃশ্য। অর্ধশতাধিক বছর পর অনেক বদলে গেছে আমার চিরচেনা সেই কক্সবাজার। শুধু বদলায় নি সাগরের জোয়ারভাটার সময়, জোয়ারের সময় ঢেউয়ের গর্জন, সেই অনাদিকাল থেকে সাগরের ঢেউ একের পর সাগর তটে আছড়ে পড়ার দৃশ্য। মনে পড়ে ছোটবেলায় আমরা যখন বাবার বদলি সূত্রে কক্সবাজারে প্রথম গেলাম, দূর থেকে সাগরের ঢেউয়ের গর্জন শুনে নির্জন সাগরপাড়ে যেতে রীতিমতো আমি ভয় পাচ্ছিলাম। আমি জানি না অন্যদের বেলায় আমার মতো ঠিক এমনটি হয়েছে কি-না! পরে অবশ্য আমার সেই ভয় ধীরে ধীরে কেটে যায়। জোয়ারের সময় বড় বড় ঢেউ কেটে অসংখ্যবার দলবেঁধে সাগরে গোসল করেছি।

তবে সাগরের ঢেউয়ের গর্জন যে কতোটা প্রলয়ংকরী হতে পারে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলবাসীরা তা প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সেই কালো রাত্রিতে উত্তাল সাগরের ঢেউ কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত ঘেঁষা পাহাড়ের ওপর আছড়ে পড়েছিলো। বিষয়টি কতোটা ভয়াবহ তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ বুঝতে পারবে না।    

বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরে কক্সবাজার বেড়াতে গেলে আমি আমার মনের ভেতর প্রচণ্ড রকম এক শূন্যতা অনুভব করি। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের হাত ধরে সেখানে অনেক ঘুরে বেড়িয়েছি। চাঁদনী রাতে নির্জন সৈকতে ঘুরে বেড়ানোর মজাটাই ছিলো আলাদা। বাবা-মায়ের আদর-স্নেহের  কথা আজ আমার খুব বেশি মনে পড়ে। নিজেকে অনেক বড় ভাগ্যবান মনে করি এই ভেবে যে, আমার শৈশব ও কৈশোরের একটা বড় অংশ কেটেছে পর্যটন শহর কক্সবাজারে। পর্যটকের অভাবে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ঢাকা থেকে কক্সবাজার সরাসরি সড়ক পথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিলো না। উন্নত সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হলে দ্রুত কক্সবাজারে পর্যটকদের চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। বছর দুয়েক হলো রাজধানী ঢাকা শহরের সাথে সরাসরি কক্সবাজারে উন্নত রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার সুবাদে সারাবছরই এখন সেখানে পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে।

ভালো থাকুক কক্সবাজার, ভালো থাকুক ভ্রমণপিয়াসী সকল মানুষ!

Leave a Reply

Your identity will not be published.