চলতি সংখ্যা
বর্ষ ২৬ সংখ্যা ০২
গৌরবের ২৫ বছর

ছোটপর্দায় হুমায়ূন আহমেদের একজন মায়াবতী

ছোটপর্দায় হুমায়ূন আহমেদের একজন মায়াবতী

চ্যানেল আইতে গত ২২ মার্চ (২০১৪) থেকে শুরু হয়েছে ‘একজন মায়াবতী’। এই নতুন ধারাবাহিকটি কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন মাজহারুল ইসলাম। এটি তার নির্মিত প্রথম ধারাবাহিক। অবশ্য এই জগতে তিনি আগন্তুক নন। ইতিমধ্যেই তিনি নির্মাণ করেছেন এক পর্বের চারটি টিভি নাটক। তার অভিষেক টিভি নাটকের নাম ‘ভালোবাসা’। এটির রচয়িতা ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। পরে মাজহারুল ইসলাম নন্দিত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের গল্প অবলম্বনে তিনটি টিভি নাটক নির্মাণ করেন। 

মূল উপন্যাসের মৌলিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে ‘একজন মায়াবতী’ ধারাবাহিক নাটকে মানুষের যাপিত জীবনের আনন্দ-বেদনা, ভালোলাগা-ভালোবাসা, দাম্পত্যজীবনের টানাপোড়েন, মায়া-মমতা, আর্থিক সমস্যা, অসুখের ভয়াল রূপ, পরচর্চা, মানব-মানবীর প্রেমানুভূতি, পরশ্রীকাতরতা—সবই উঠে এসেছে। সমকালীন সমাজবাস্তবতার কিছু চিত্রও মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই ধারাবাহিকটি ঘিরেই গড়ে উঠেছে এবারের প্রচ্ছদ রচনা। আলোকচিত্র: ফজলে এলাহী ইমন।

মধ্যবিত্ত জীবনের অসামান্য রূপকার হুমায়ূন আহমেদ। উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং দরিদ্র মানুষদের যাপিত জীবনকেও পরম মমতায় সাহিত্যের দর্পণে তুলে ধরেছেন তিনি। বলা যায়, মানুষের মনের গভীরে ডুব দিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ ডুবুরির মতো এবং অমূল্য মানিক-রতন তুলে এনেছেন। তাই হুমায়ূন-সাহিত্যকে নিয়ে টিভি নাটক কিংবা চলচ্চিত্র নির্মাণে অনেকেই আগ্রহী। হুমায়ূন-সাহিত্যের এমন কয়েকটি সার্থক চলচ্চিত্র, টেলিফিল্ম ও টিভি নাটক আমরা দেখেছি। অবশ্য এক্ষেত্রে ধারাবাহিকের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি। যেমন— শুভ্র, মেঘ বলেছে যাব যাব, লীলাবতী...।

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে সম্প্রতি ধারাবাহিক নাটক ‘একজন মায়াবতী’ নির্মাণ করেছেন পাক্ষিক ‘অন্যদিন’ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম—যার টিভি নাটক নির্মাণে হাতেখড়ি হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদ রচিত একপর্বের নাটক ‘ভালোবাসা’র মাধ্যমে। এই নাটকে মলম পার্র্টির দৌরাত্ম তুলে ধরা হয়েছিল। পাশাপাশি বিপথগামী মানুষদের প্রতিও যে তাদের স্বজনদের টান থাকে, ভালোবাসা থাকে—সেটিও মূর্ত হয়ে উঠেছিল ‘ভালোবাসা’য়।

‘একজন মায়াবতী’ মাজহারুল ইসলামের প্রথম ধারাবাহিক নাটক। এখানে তার কঠোর পরিশ্রম, মেধা এবং সৃজনশীলতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রয়েছে। অত্যন্ত যত্ন ও ভালোবাসায় এই ধারাবাহিকটি তিনি নির্মাণ করেছেন। এক্ষেত্রে অবশ্য অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের সহযোগিতাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 

‘একজন মায়াবতী’র কাহিনিধারায় মূর্ত হয়ে উঠেছে— অন্য ধরনের ছেলে মনজুর। অন্তর্মুখী। কিছুটা বাউণ্ডুলে প্রকৃতির। সংসারে ওর কেউ নেই। বাবা-মা মারা গিয়েছেন। আপন বলতে আছে এক মামা। এই মনজুরের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল ধনী পরিবারের মেয়ে মীরার। মীরার একান্ত ইচ্ছাতেই এ বিয়ে হয়েছিল। তার বাবা-ভাইয়ের মত ছিল না। তারা অবশ্য বাধাও দেন নি। আদরের সন্তান/বোনের ইচ্ছাকেই মেনে নিয়েছিলেন।... মনজুর-মীরার একটি সন্তান হয়েছিল। কিন্তু সেই সন্তান যেমন বাঁচে নি, তাদের বিয়েও টিকে নি। সমঝোতার ভিত্তিতেই তিন বছর পর ওদের ডিভোর্স হয়ে যায়। এদিকে মনজুরের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তার একটি কিডনি অনেক আগেই কেটে ফেলা হয়েছে, অন্যটির অবস্থাও ভালো নয়। এই জন্য মনজুরকে প্রায়ই হাসপাতালে যেতে হয়। ডাক্তার তাকে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের কথা বলেছেন।

মীরা বড় ভাই জালাল সাহেবের বাসায় থাকে। সেখানে তার জন্য আলাদা একটি কক্ষ রয়েছে। নাম মীরা মহল। মীরা মহলে মীরা ভাবির আদর-যত্নে ভালোই আছে।... মনজুরের সঙ্গে ডিভোর্সের কিছুদিন পর আচমকা মীরার সঙ্গে যোগাযোগ হয় মইনের। মীরার খালাতো ভাই। অল্প বয়সে তাদের মধ্যে একধরনের ভালোলাগার সম্পর্ক ছিল। কিছুদিন পর মঈন আমেরিকায় চলে যায়। সেখানকার এক মেয়েকে বিয়ে করে। মইন জানায়, ওর স্ত্রী মিশেল চমৎকার। তাকে ভীষণ ভালোবাসে। তিনটি বাচ্চাকে তো পাগলের মতো ভালোবাসে।  মইনের সঙ্গে মীরা নানা জায়গায় দেখা করে। মইন মীরাকে একটি চাকরি জুটিয়ে দেয়। জনসংযোগ কর্মকর্তার কাজ। মীরার বড়ভাইয়ের অবশ্য বিষয়টি পছন্দ নয়। তার কথা হলো মীরা তার প্রতিষ্ঠানে যোগ দিক। মীরার সিঙ্গেল থাকার বিষয়টিও তার পছন্দ নয়। তাই কিছুদিন পরপরই মীরার ভাবি এক একজন পাত্রের সিভি ও ছবি তাকে দেখায়। মীরার কাউকেই পছন্দ হয় না।

জাহানারা, মনজুরের অফিসের এক কর্মী, যার চাকরি হয়েছিল মনজুরের মাধ্যমেই। সংসারে তার মা ও ছোটভাই। মনজুর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে জাহানারা ছুটে যায় তার পাশে। বাড়ি থেকে খাবার রান্না করে নিয়ে আসে তার জন্য। ছোটভাইকে রাতে হাসপাতালে মনজুরের দেখাশোনার জন্য রেখে যায়। মনজুর জাহানারার এই সহযোগিতাকে মেনে নিতে চায় না। বিরক্ত হয়।

মতিঝিলের যে অফিসে মনজুর কাজ করে, সেটি এক বন্ধুর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, থ্রিপি কনস্ট্রাকশন। যদিও এটি গড়ে তুলতে অমানুষিক পরিশ্রম করেছে মনজুর। সেই পরিশ্রমের ফল অবশ্য সে পায়। বন্ধু আফসার তাকে ব্যবসায়িক পার্টনার করে। মনজুরকে সে কোম্পানির ৫১% শেয়ার লিখে দিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়। মনজুর কোম্পানির কর্তাব্যক্তি হয়ে ওঠে—বিষয়টি অফিসের অ্যাকাউন্টটেন্ট চিত্তবাবুর পছন্দ হয় না। সে নানা গুজব ছড়ায়। মনজুর সবই টের পায়।

মীরার অফিসের জিএম মীরার রূপমুগ্ধ। তার মধ্যে কাব্যরোগ প্রবল হয়ে ওঠে। মীরাকে নিয়ে বেড়াতে যেতে চান; ডিনার খাওয়াতে চান। আরেক কলিগ মোসাদ্দেক সাহেব জিএম-এর বিষয়ে মীরাকে সতর্ক হতে বলেন। হয়তো তিনিও মীরার ঘনিষ্ঠ হতে চান।... মীরা মনজুরের খবর পায় মইনের কাছ থেকে। মইনও একদিন মনজুরের সঙ্গে দেখা করে। দুজনের কথোপকথনে জানা যায়, মীরা যে অফিসে কাজ করে সেই অফিসের মালিক মইন। মনজুর মইনকে অনুরোধ করে, সে যেন মীরাকে বিয়ে করে।... মীরা মনজুরের সঙ্গে দেখা করে। তার কাছ থেকে জানতে পারে যে, মইনের স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় সে আমেরিকা থেকে দেশে এসেছে। মনজুর মীরাকেও বলে সে যেন মইনকে বিয়ে করে। এদিকে মীরার সঙ্গে মনজুরের দেখা হওয়ার সংবাদ শুনে জাহানারা মনোযাতনায় ভোগে। মনজুরের শারীরিক অবস্থার আবার অবনতি ঘটে। সে হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডাক্তার  জানায় দ্রুত কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হবে নইলে মনজুর বাঁচবে না। জাহানারা ও মনজুরের মামা কিছুতেই মনজুরকে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করাতে রাজি করাতে পারে না। জাহানারার মনে হয়, মনজুরের প্রাক্তন স্ত্রী মীরার কথায় মনজুর রাজি হবে। জাহানারা ছুটে যায় মীরার কাছে। জাহানারার সঙ্গে কথা বলে মীরা বুঝতে পারে যে, মনজুরের মধ্যে এখনো মীরার প্রতি ভীষণ মায়া। মীরা আরও বুঝতে পারে যে, মনজুরের জন্য জাহানারারও রয়েছে প্রচণ্ড মায়া। সে জাহানারার সঙ্গে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেয়।

কিংবদন্তি সাহিত্যস্রষ্টা হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ‘একজন মায়াবতী’ উপন্যাসে মানবিক সম্পর্কের নানা দিক ও সমাজ বাস্তবতার কিছু বিষয়ের নান্দনিক উপস্থাপনা করেছেন। নাটক নির্মাণ করতে গিয়ে উপন্যাসের মূল সুর অক্ষুণ্ন রেখে এই বিষয়গুলো দৃশ্যবন্দি হয়েছে শৈল্পিকভাবে।

দাম্পত্য সম্পর্ক

সুখী ও অসুখী দু-ধরনের দম্পতিরই দেখা মেলে ‘একজন মায়াবতী’তে। কোনো কোনো দম্পতির অবশ্য দেখা পাওয়া যায় না, শুধু তাদের কথা শোনা যায়। যেমন মনজুরের মামাতো ভাই ও তার স্ত্রী। মীরার বড়ভাই-ভাবি সুখী দম্পতি। আর ‘এমন মানবজমিন রইল পতিত/আবাদ করলে ফলত সোনা’ এমন ব্যর্থ দম্পতিদেরও দেখা মেলে। যেমন মীরা ও মনজুর, মইন ও তার স্ত্রী।... মীরা মনজুরকে ঠিকমতো বুঝতে পারে নি। তার ধারণা, মনজুর অনেকটা রোবটের মতো। সে ভালোবাসতে জানে না। কথাটি শুনে মীরার বাবা বলে, ‘দিনের মধ্যে সে যদি এক শ’ বার বলে, ভালোবাসি, ভালোবাসি, তাহলেই ভালোবাসা হয়ে গেল? আমি তোর মার সঙ্গে বাইশ বছর কাটিয়েছি। এই বাইশ বছরে আমি তোর মাকে ভালোবাসি জাতীয় ন্যাকামি কথা একবারও বলেছি বলে তো মনে হয় না।’ উত্তরে মীরা বলে যে, ভালোবাসা বিষয়টি যেমন মনজুরের মুখে নেই তেমনি তার মনেও নেই। আসলে তার ভালোবাসার ক্ষমতাই নেই। মীরার অনুপস্থিতি তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করে নি, জীবনে কোনো পরিবর্তনই আসে নি। সে দিব্যি আছে। খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে, অফিস করছে। মীরা যদি ফিরেও যায়, মনজুরের জীবনযাপন পদ্ধতির কোনো পরিবর্তন হবে না। সে খুশিও হবে না, অখুশিও হবে না। পরে অবশ্য মীরার কথা  থেকে জানা যায় যে, অন্যের দুঃখে মনজুর বিচলিত হয়, তাদের দুঃখ দূর করার চেষ্টা করে। কিন্তু কেউ যদি মনজুরের দুঃখে সমব্যথী হয়, তাকে সাহায্য করতে চায়, ভালোবাসতে চায়, মনজুর বিরক্ত হয়। সাহায্য নিতে চায় না। ভালোবাসা গ্রহণ করতে চায় না।  এর প্রমাণ অবশ্য জাহানারার সঙ্গে মনজুরের ব্যবহারের মধ্যেই মেলে। যাহোক, শেষ পর্যায়ে জাহানারার কাছ থেকে মীরা যখন মনজুরের রাইটিং প্যাডের একটা পৃষ্ঠায় দেখতে পায়—গুটি গুটি করে অসংখ্যবার লেখা—মীরা মীরা, মীরা।... তখন সে বুঝতে পারে যে মনজুর তাকে ভালোবাসে।... পরস্পর পরস্পরকে বুঝতে পারে নি বলে মইন ও তার বিদেশিনী স্ত্রীর সম্পর্কও টিকে নি। আর দুজনের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া ছিল বলেই মীরার বাবা-মার দাম্পত্যজীবন টিকে ছিল। যেমন টিকে আছে মনজুরের মামা বদরুল আলম ও তাঁর স্ত্রীর সম্পর্ক। সবচেয়ে চমৎকার দাম্পত্য সম্পর্ক বিরাজ করছে মনজুরের মামা বদরুল আলমের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র মতিন ও তার স্ত্রীর মধ্যে। মতিন তার স্ত্রীকে খুবই ভালোবাসে। তাই তো নেইল কাটার দিয়ে বউয়ের পায়ের নখও কেটে দেয়।

মায়ার জগৎ

এ জগৎ মায়ার জগৎ। মানুষ মাত্রই মায়ার আধার। একজন নিষ্ঠুর মানুষও বুকের মাঝে কারও না কারও জন্য লালন করে মায়া।...‘একজন মায়াবতী’তে দেখা যায়, ডিভোর্স হওয়ার পরও মীরার হৃদয়ে মনজুরের বসবাস। মনজুরের অসুখের কথা শুনে সে উদাস হয়ে পড়ে, চোখ হয় সজল, মনে মনে ভাবে হাসপাতালে মনজুরকে দেখতে যাবে। আবার যখন সে শোনে, অফিসে মনজুরের শোচনীয় অবস্থা, তার বেতন হয় নি, কোনো কাজও তাকে দেওয়া হয় না। তখন মীরা আফসারের সঙ্গে দেখা করে এবং বলে মনজুরের যেন কোনো সমস্যা না হয়। আফসার নিশ্চয়তা দেয়, না, মনজুরের কোনো সমস্যা হবে না। শেষপর্যায়ে জাহানারা এসে যখন জানায়, মীরা বললে মনজুর কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে রাজি হবে এবং এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর মীরা হাসপাতালের উদ্দেশে ছুটে যায়।

মনজুরের জন্য জাহানারাও সঙ্গোপনে মায়া লালন করে। মনজুরের জন্যেই তার চাকরি হয়েছে—এই কৃতজ্ঞতাবশেই যে মনজুরকে পছন্দ করে তা নয়। মনজুরের ব্যক্তিত্বই জাহানারাকে আকর্ষণ করে। গভীর এক ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয় তার হৃদয়। মনজুরের অসুখে সে তাই চিন্তিত হয়ে পড়ে। তার দেখভালের জন্য ছোটভাই ফরিদকে নিযুক্ত করে। একপর্যায়ে সে কিডনি ডোনার হতে চায়।...একদিন মনজুরের মুখে জাহানারা যখন শোনে মীরা এসেছিল, তার ভালো লাগে না। এইসবই গভীর মমত্ববোধের ইংগিত বহন করে।

মনজুরের হৃদয় আকাশের মতো। সবার জন্যই তার মমতা। কারও বিপদ দেখলে সে অস্থির হয়ে পড়ে, তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যায়। চাকরিটা জাহানারার খুবই প্রয়োজন—এই বিষয়টা উপলব্ধি করার পর মনজুর তার চাকরির ব্যবস্থা করে। সে যে কম্পিউটার কম্পোজ করতে জানে না—এ বিষয়টিও তার বিবেচনায় আসে না। অফিসের পিয়ন কুদ্দুসের জন্যও মনজুরের মায়া হয়, এমনকি অ্যাকাউনটেন্ট চিত্তবাবু—যে নাকি মনজুরকে পছন্দ করে না, তার জন্যও মনজুর মমতাবোধ করে। অফিসের কর্তাব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার পরও চিত্তবাবুকে চাকরিচ্যুত করে না বরং তার কাজের প্রশংসাই করে। আর যদিও মীরা তিন বছর সংসার করার পরও বুঝতে পারে নি যে মনজুর কী গভীরভাবেই না ভালোবাসে মীরাকে, সেই মীরার জন্যও মনজুরের অসীম মায়া। 

বাবা, বড়ভাই ও ভাবিও ভীষণ ভালোবাসেন মীরাকে, গভীর মমতা হৃদয়ে লালন করেন মীরার জন্য। তারা মীরার সুখকেই বড় করে দেখেন। তাই মনজুরকে পছন্দ করলেও বিয়েতে বাধা দেন নি। আবার দাম্পত্য সংকট দেখা দিলে বাবা মীরাকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, মনজুরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ঠিক হবে না। স্বামীকে ডিভোর্স দেওয়ার পর মীরার ভবিষ্যৎ চিন্তা করে বড়ভাই ও ভাবি তাকে আবার অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার  চেষ্টা করেন। মীরা চাকরি নিলে বড়ভাইয়ের পছন্দ হয় না। মীরা যখন অন্যত্র থাকার পরিকল্পনা করে, তখনো বিষয়টি ভালো লাগে না ভাই-ভাবি দুজনেরই। মীরা সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এলে তারা ভীষণ খুশি হয়। এইসবই প্রমাণ করে যে, স্বজনদের কাছে মীরা কতটা আদরের; তারা কী গভীর মমতাই না তার জন্য হৃদয়ে ধারণ করে!

মনজুরের জন্য তার মামা বদরুল আলমেরও মায়া রয়েছে। যদিও তার বহিঃপ্রকাশ নেই। মনজুরের একটি মাত্র কিডনিও ড্যামেজ হয়ে গেলে চিকিৎসার জন্য টাকা দিতে প্রথমে অপারগতা প্রকাশ করেন মামা, পরে টাকা দিতে রাজি হন। এমনকি মনে মনে তিনি কিডনি ডোনার হওয়ার কথাও ভাবেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, পিতৃ-মাতৃহীন মনজুরকে তিনিই আশ্রয় দিয়েছেন, বড় করেছেন।

মনজুরের জন্য মায়া রয়েছে অফিসের পিয়ন কুদ্দুসের। তাই তো সে এটা-সেটা মনজুরের জন্য কিনে আনে, যদিও তা প্রকাশ করে না। 

আফসারও গভীর মমতা লালন করেন বন্ধু মনজুরের জন্য। একপর্যায়ে তিনি কোম্পানির ৫১% শেয়ার মনজুরের নামে লিখে দিয়ে বিদায় নেন। যাওয়ার আগে বলেন, ‘তোর মতো ভালো মানুষ পৃথিবীতে হয় নারে মনজুর। সবাই তোকে ছেড়ে চলে যায়। আমিও গেলাম। কিন্তু আমি জানি, তুই একাই এক শ’। ভালো থাকিস। আমি যাচ্ছি।’

মৃত্যুর ছায়া

হুমায়ূন আহমেদের গল্প-উপন্যাস-নাটক-চলচ্চিত্রে মৃত্যুর একটি ভূমিকা থাকে। এই ধারাবাহিকেও মৃত্যুর একটি প্রচ্ছন্ন ছায়া রয়েছে। আর এই ছায়া লক্ষ্য করা যায় মনজুরের মধ্যে। যদিও সে তা সহজভাবেই গ্রহণ করে। তাই একটি মাত্র কিডনিও ফেলে দিতে হবে শুনে ডাক্তারের দিকে চেয়ে মনজুর বলে, ‘যেটা আছে সেটাও ফেলে দিতে হবে? বলেন কী? হা হা হা হা...।’... কুদ্দুসের ছোট বোনের মৃত্যুসংবাদ (মিথ্যে সংবাদ) শুনে কী বলে সান্ত্বনা দেবে ভেবে পায় না মনজুর। তার মনে প্রশ্ন জাগে, আচ্ছা, মৃত্যুশোকে আচ্ছন্ন মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার উপায় কী? প্রশ্নটির উত্তর সে মীরার কাছ থেকে পায়। মীরা বলে, ‘কোনো কথাতেই সে সান্ত্বনা পাবে না। তুমি যদি তার গায়ে হাত দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকো, তাহলে খানিকটা সান্ত্বনা পেতে পারে।’ ...পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার পরও কিডনি ডোনার পাওয়া যায় নি শুনে চিত্তবাবু যখন বলে, ‘তাহলে তো বড় বিপদ হয়ে গেল’ কথাটি শুনে মনজুর জানায় যে, বিপদের কিছু নেই। সে অন্য অনেকের চেয়ে সুবিধাজনক জায়গায় আছে। কথাটির ব্যাখ্যা দেয় সে এভাবে : ‘মানুষ আসলে প্রতি মুহূর্তেই মৃত্যুর সম্ভাবনা নিয়ে বেঁচে থাকে। তবু এমন ভাব নিয়ে থাকে, যেন সে বহু বহু বছর বেঁচে থাকবে। আগামী দিনের পরিকল্পনা সাজায়। তারপর হঠাৎ একদিন তার মৃত্যু হয়। অপ্রত্যাশিত। আমি তার চেয়ে ভালো অবস্থায় আছি। কারণ আমি জানি যে, আমি আর বাঁচব না। মানসিক প্রস্তুতিটা অন্তত নিতে পারছি।’

ইমরুল— একটি কাল্পনিক চরিত্র

মনজুর প্রায়ই রাতে ইমরুল নামে এক বারো-তেরো বছরের কিশোরের সঙ্গে ফোনে কথা বলে। অথচ ফোনটি অচল। ডেড। ইমরুল, যাকে মনজুর ভিমরুল বলে ডাকে, সে মজার মজার কথা বলে। এই ইমরুল নামে কেউ নেই। সে মনজুরের অবচেতন মনের সৃষ্টি। আসলে ইমরুলের সঙ্গে মনজুরের যে কথোপকথন তা একধরনের হেলুসিনেশন। মনজুর নিজেও তা বুঝতে পারে। ডাক্তার মনজুরের কথা শুনে সায় দিয়ে বলে, রক্তে ট্রক্সিক মেটেরিয়াল বেড়ে গেলে হেলুসিনেশন হতে পারে। ডাক্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিতে বলে। কিন্তু মনজুর বলে যে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ আছে। হ্যাঁ, সত্যি কারণ আছে। কারণ ইমরুল শুধু মজার কথাই বলে না, সিরিয়াস কথাও বলে। বলা যায়, মনজুরের আরেক সত্তা, বিবেকের কাজ করে। কেননা টেলিফোনে শেষ কথোপকথনে ইমরুল মনজুরকে বলে, তোমাকে কিডনি দিচ্ছে যে ছেলেটা, পরে যদি কোনোদিন ওর একটা কিডনি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কীভাবে বাঁচবে ও? প্রশ্নটি মনজুরকে আলোড়িত করে। সে কিডনি ডোনার আমানুল্লাহর সঙ্গে নিজের খুব মিল খুঁজে পায়। আমানুল্লাহ একটি কিডনি বিক্রি করেছে। মনজুরও অল্প বয়সে তাই করেছিল। বাবার থ্রোট ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য সেটা তাকে করতে হয়েছিল। যদিও টাকা হাতে পাওয়ার দু-দিনের মাথায় মনজুরের বাবার মৃত্যু হয়।... ডাক্তারকে মনজুর বলে, ‘কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর আমানুল্লাহও আমার মতো একটি কিডনি নিয়ে বেঁচে থাকবে এবং দেখা যাবে যে একসময় তার কিডনিতেও আমার মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে।’ তাই মনজুর আমানুল্লাহকে টাকা দেওয়ার সময়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে আমানুল্লাহর কিডনি নেবে না। যে কদিন বাঁচবে নিজের যা আছে তা নিয়েই বাঁচবে। 

ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের চিত্র

মনজুরের যে অফিস, থ্রিপি কনস্ট্রাকশন, সেই প্রতিষ্ঠানের কিছু চিত্র ধারাবাহিকটিতে ফুটে উঠেছে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠার শুরুতে মনজুর ও আফসার কঠোর পরিশ্রম করেছে সেহেতু এখন আর তেমন পরিশ্রম করতে হয় না। মনজুর তো অফিসে যেয়ে কবিতার বই পড়ে। অসুস্থ বলে বিশ্রাম নেয়।... পিয়ন কুদ্দুস চা-নাস্তা খাওয়ানোসহ বিভিন্ন কাজ করে। জাহানারা কম্পিউটার অপারেটর। চিত্তবাবু অ্যাকাউনটেন্ট। পরিমল বাবু অফিস এক্সিকিউটিভ। এদের মধ্যে ধূর্ত মানুষ হলো চিত্তবাবু। সে অফিসের সব কিছু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। উচ্চাকাঙ্খীও। অফিসে মনজুরের দায়িত্বহীন অবস্থা, বেতন না পাওয়া, তার কাগজপত্র ঠিক করার জন্য আফসাররের নির্দেশ—এইসবের পরিপ্রেক্ষিতে চিত্তবাবু ধরে নেয় যে আফসার মনজুরকে অফিস থেকে বাদ দিয়ে দেবে। সে তাই মনজুরকে পাত্তা দেয় না। তার অফিসকক্ষটি ভবিষ্যতে সে ব্যবহার করবে—এমন মনোভাবও প্রকাশ করে। মনজুর অফিসের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠার পরও চিত্তবাবু গুজব রটায় যে অফিসের অবস্থা ভালো নয়। ঋণগ্রস্ত একটি প্রতিষ্ঠান এটি। মুনাফা লুটে আফসার মুমূর্ষু একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব মনজুরকে দিয়ে গেছে। মনজুর অবশ্য সবই বুঝতে পারে। এ ব্যাপারে সে চিত্তবাবুকে সতর্ক করে।...পরিমল সুবিধাবাদী লোক। সে চিত্তবাবু ও মনজুর—দুজনেরই মন রক্ষা করতে চায়। মনজুর প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার জন্য পরিমল ও চিত্তবাবু মোসাহেবি করতে থাকে মনজুরের। এইসব কর্মচারী সম্পর্কে বিদায়ের আগে মনজুরকে আফসার সতর্ক করে দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন : ‘কিছু ডিসঅনেস্ট কর্মচারী আমদের আছে। ডিসঅনেস্ট হলেও তারা খুব এফিসিয়েন্ট। ওদের কখনো হাতছাড়া করবি না। আবার কখনো এদের উপর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিবি না।’

সামাজিক চিত্র

এ দেশের অনেক মানুষ যে কুসংস্কারাচ্ছন্ন তা এই ধারাবাহিকে ফুটে উঠেছে। মনজুরের ড্যামেজ কিডনি ভালো করতে পারবে একজন— যিনি দিনের বেলা দোকানদার, রাতে পীর। মামার কথায় তার কাছে গিয়ে মনজুর বুঝতে পারে যে লোকটি ভ-। সে বিবমিষায় বমি করে ফেলে। অন্যদিকে চিত্তবাবু ও পরিমলও মনজুরকে সুস্থ করার জন্য তার ওপর নানা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা চালানোর প্রয়াস নেয়। এইসব চিকিৎসার অসারতাও মনজুর বুঝতে পারে।

শেষ কথা

শুধু মানবিক সম্পর্কের গল্প নয়, এই সমাজ ও চারপাশের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে ‘একজন মায়াবতী’তে, যা দর্শকদের সচেতন করবে নিঃসন্দেহে। আর মনজুর-মীরা-জাহানারা-মইনের উপাখ্যান তাদের আনন্দ যোগাবে—এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

শিল্পী, কলাকুশলী ও প্রযোজকের কথা

‘একজন মায়াবতী’ ধারাবাহিকের প্রধান অভিনয়শিল্পী ও কয়েকজন কলাকুশলীর কথা এখানে তুলে ধরা হলো। তুলে ধরা হলো প্রযোজকের কথাও।

মাহফুজ আহমেদ

দীর্ঘবিরতির পর তার নাট্যজগতে ফেরা। উপলক্ষটা অবশ্যই হুমায়ূন আহমেদ। নাটক বানানো, লেখা ও অভিনয়কে সহজ মনে হয় না মাহফুজের কাছে। সেদিক থেকে ‘একজন মায়াবতী’ নাটকের গল্প-সংলাপ, চিত্রায়ন, নির্দেশনা, আয়োজন, সব মিলিয়ে অনেকদিন পর মনের মতো একটি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। দর্শকদের সাহস ও আস্থা নিয়ে নাটকটি উপভোগ করতে উৎসাহিত করে বলেন, টেলিভিশন নাটকে অনেকদিন পর জমজমাট ফিকশান দেখবেন। নিজের অভিনীত চরিত্রের প্রেমে ও মায়ায় পড়েছেন এবং এ চরিত্র থেকে বের হতে সময় লাগবে বলে মনে করেন। তা ছাড়া হুমায়ূন আহমেদের প্রতিটা লেখা, শব্দ, চরিত্রের বর্ণনা প্রাঞ্জল ও মায়াময়ভাবে উপস্থাপিত হওয়ার ফলে যে-কোনো অভিনেতার পক্ষেই ভালো অভিনয় করা সম্ভব বলে মনে করেন মাহফুজ। পরিচালক মাজহারুল ইসলামের প্রসঙ্গে বলেন, প্রথম ধারাবাহিক হলেও কাজ এবং আয়োজনে বেশ পরিপক্ব। তাঁর নির্দেশনা প্রসঙ্গে বলেন, একজন পরিচালকের হাতে সমর্পিত হওয়ার মধ্যে আনন্দ আছে এবং তিনি পরিচালকের কাছে পুরোপুরি সমর্পিত হয়ে কাজ করে বেশ আনন্দ পেয়েছেন। তা ছাড়া অসাধারণ আয়োজন, টিমওয়ার্ক, পরিবেশ— সব মিলিয়ে এই ধারাবাহিকে অভিনয়ের সেরাটাই দিতে পেরেছেন বলে মনে করেন।

সুমাইয়া শিমু

‘একজন মায়াবতী’ নাটকের প্রস্তাব পেয়ে একবাক্যেই রাজি হয়ে যান সুমাইয়া শিমু, যিনি এই নাটকে মীরার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। যদিও অন্যান্য নাটকের প্রস্তাবে প্রথমেই গল্পের ধরন, পরিচালক প্রভৃতি নিয়ে জিজ্ঞাসা থাকে কিন্তু ‘একজন মায়াবতী’র বেলায় এরকম হয় নি। সাহিত্যনির্ভর বা উপন্যাসের এই নাট্যরূপ নিয়ে কিছুটা চিন্তা ও ভয় কাজ করছিল তার মনে, তবে কাজ শুরু করে আয়োজন, সহকর্মী, পরিচালক—সব মিলিয়ে সেটা দূর হয়ে গিয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে উল্লেখিত প্রত্যেকটা চরিত্রের বর্ণনা, পরিবেশ ও জায়গার বর্ণনা পরিচালক মাজহারুল ইসলাম অত্যন্ত দক্ষভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন যা বিশেষ ভালো লেগেছে। অভিনেত্রী হিসেবে বরাবরই ভালো স্ক্রিপ্টের অভাববোধ করেন এবং তিনি মনে করেন সাধারণ দর্শকেরা গল্পের টেকনিক্যাল বিষয়গুলো জানার প্রয়োজন মনে করে না। তারা মূলত গল্প ও অভিনয়কে বেশি পছন্দ করে শিমুর বিশ্বাস, এই নাটকে গল্প আর অভিনয় দুটোর চমৎকার মেলবন্ধন হয়েছে।

আনিসুর রহমান মিলন

এই ধারাবাহিকের মইন চরিত্রের অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলন মনে করেন, হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের নাট্যরূপ দেওয়াটা কঠিন। সেক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে অরুণ চৌধুরীর মানসিক একটা যোগাযোগ ছিল বলেই ‘একজন মায়াবতী’র নাট্যরূপ দিতে পেরেছেন। এ নাটকের প্রস্তাব পাওয়ায় নির্ভাবনায় কাজ করেছেন মিলন। নিজের অভিনীত চরিত্রটা নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন তিনি। এ নাটকে তাঁর চরিত্রের স্বতন্ত্র দিকটা বজায় রাখায় বেশ ভালো লেগেছে। পরিচালকের শিক্ষক সুলভ মনোভাব নিয়ে কাজ আদায়ের ভঙ্গিটাও বেশ পছন্দ হয়েছে। তা ছাড়া অন্যান্য নাটকে কাজ করার ক্ষেত্রে সহজেই অভিনয়ের প্রশংসা পেলেও ‘একজন মায়াবতী’ নাটকে পরিচালকের নির্দেশনায় চটজলদি প্রশংসার চেয়ে বারবার কাজ করার মধ্যে আনন্দ পেয়েছেন এবং মনে হয়েছে ভালো কিছু তৈরি হচ্ছে। তাছাড়া বাজেটের স্বল্পতা থাকলেও শুটিংয়ের আয়োজনে বিন্দুমাত্র ত্রুটি ছিল না বলে মনে করেন এ অভিনেতা। নাটকটি দর্শকনন্দিত হবে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।

ফারহানা মিলি

ধারাবাহিকটিতে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনসংগ্রামে লিপ্ত এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফারহানা মিলি। পরিবারের পুরো দায়িত্ব তার ওপরেই। পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছেন, চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় হন্যে হয়ে ঘুরছেন। অবশেষে মনজুর (মাহফুজ আহমেদ) তাকে চাকরি দেন। চরিত্রটির নাম জাহানারা।

নাটকটিতে কাজ করার অনুভুতি প্রকাশ করতে গিয়ে মিলি বলেন, হুমায়ূন স্যারের কোনো চরিত্রে প্রথমবারের মতো অভিনয় করেছি। স্যারের সঙ্গে কাজ করতে না পারার একটা আক্ষেপ তো ছিলই কিন্তু তাঁর সৃষ্ট কোনো চরিত্রে অভিনয় করতে পেরে সে আক্ষেপ ঘুচে গেছে অনেকটাই। সংলাপগুলোর মাঝে প্রতিমুহূর্তে অনুভব করেছি স্যারের উপস্থিতি। উপন্যাসটি পড়ে মনে হয়েছিল চরিত্রটিতে কাজ করার সুযোগ কম। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে অভিনয় করার যথেষ্ট জায়গা আছে। চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। মাজহার ভাই এক্ষেত্রে অনেক বেশি সহযোগিতা করেছেন। 

চরিত্রটিতে সুযোগ দেওয়ার জন্য মিলি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মাজহারুল ইসলামের প্রতি।

ফরিদুর রেজা সাগর
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চ্যানেল আই

এই ধারাবাহিকটি নির্মাণের পরিকল্পনা করার সময় কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক ও নির্মাণের  মহান কারিগর হুমায়ূন আহমেদের অনুপস্থিতি আমি অনুভব করি। তারপরই ভাবি যে, ‘একজন মায়াবতী’ নামটা তো রয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ দিয়ে গেছেন। তিনি অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন যে, তাঁরই একজন— তাঁর পরিবারেরই একজন, মাজহারুল ইসলাম, অনেক মায়া দিয়ে অনেক মমতা দিয়ে ধারাবাহিকটি তৈরি করবেন। আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, হুমায়ূন আহমেদের ভাবনা ঠিকই ছিল। সত্যি অনেক মায়া দিয়ে অনেক মমতা দিয়ে ‘একজন মায়াবতী’কে তৈরি করেছেন মাজহারুল ইসলাম। দর্শকরা অনেক আনন্দের সঙ্গে নাটকটি উপভোগ করবেন বলে আমার বিশ্বাস।

অরুণ চৌধুরী

চিত্রনাট্যকার। অরুণ চৌধুরী আগে হুমায়ূন আহমেদের বিপুল পাঠকনন্দিত দুটি রচনা ‘লীলাবতী’ ও ‘রুমালী’র চিত্রনাট্য লিখেছেন। নির্মাণ করেছেন নাটক। মাজহারুল ইসলাম যখন ‘একজন মায়াবতী’র স্ক্রিপ্ট লেখার কথা বললেন, তিনি একবাক্যে রাজি হয়ে যান। হুমায়ূন আহমেদের কাহিনি অবলম্বনে চিত্রনাট্য লেখার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর কাহিনিতে সংযোজন-বিয়োজনের কোনো প্রয়োজনই হয় না। ভাবতে হয় না খুব বেশি। প্রতিটি চরিত্রের বর্ণনা, ঘটনার বিন্যাস, পরিবেশের বর্ণনা এতটাই ডিটেইল থাকে খুব পরিশ্রমের প্রয়োজনই হয় না। এ ছাড়াও এর আগে ‘রুমালী’ এবং ‘লীলাবতী’ দুটি নাটকই ছিল গ্রামীণ পটভূমির। কিন্তু ‘একজন মায়াবতী’ নাটকটি শহরের পটভূমিতে, নগর জীবনের নানা ঘটনা, বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন উঠে এসেছে। এই বিষয়টিও কাজটির প্রতি আগ্রহের অন্যতম একটা কারণ। এখানে নতুন কিছু করা, নতুন কিছু পাওয়ার সুযোগ ছিল। জনপ্রিয় উপন্যাস থেকে চিত্রনাট্য করার ক্ষেত্রে সবসময় একটা চ্যালেঞ্জ থাকে পাঠকের কল্পনার কাছাকাছি যাওয়ার, ভাবনার কাছাকাছি থাকার। পাঠককে আঘাত করা যাবে না কিছুতেই। অনেক বড় বড় পরিচালককেও সাহিত্যের চিত্রায়ন করে সমালোচিত হতে হয়েছে পাঠকের কল্পনার কাছাকাছিও না পৌঁছাতে পারার জন্য। কিন্তু এই ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদকে তাঁর একেবারেই আলাদা মনে হয়। তাঁর মনে হয় হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে ডিটেইলিংটা এতটাই চমৎকার থাকে যে এই চ্যালেঞ্জটা অনেক কম থাকে। সব মিলিয়েই কাজটি করতে পেরে ভীষণ আনন্দিত তিনি। 

নিয়াজ মাহবুব

চিত্রগ্রাহক। হুমায়ূন আহমেদের প্রায় ১৫টির মতো নাটকে কাজ করার সুযোগ ঘটেছিল নিয়াজ মাহবুবের। সেই অভিজ্ঞতা অবিস্মরণীয়। নিয়াজ মাহবুব বলেন, মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে ‘একজন মায়াবতী’-ই আমার প্রথম কাজ কিন্তু একেবারেই আলাদা ইউনিট মনে হয় নি। পরিচালক হিসেবে মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নিয়াজ বলেন, ‘নির্মাণের সংখ্যার দিক থেকে হয়তো তাঁকে নতুন বলা যায় কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে একেবারেই মনে হয় নি তিনি এর আগে খুব বেশি কাজ করেন নি। সবসময়ই মনে হয়েছে তিনি জেনে, বুঝে, সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই কাজটি শুরু করেছেন।’

কাজের ক্ষেত্রে নিয়াজ পেয়েছেন শতভাগ স্বাধীনতা। যে-কোনো বিষয় পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করে নিয়েছেন। কখনো মত দ্বৈততা তৈরি হয় নি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মেতে উঠেছেন কখনো আড্ডা, গল্পে। ৬০ পর্বের নাটক, প্রায় আট-নয় মাসের জার্নি। পুরোটা সময় ভীষণ এনজয় করেছেন তিনি।

ছলিম উল্লাহ ছলি

সম্পাদক। ‘একজন মায়াবতী’ নাটকটির সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছলিম উল্লাহ ছলি। এ কাজটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাজহার ভাইয়ের সঙ্গে এর আগেও আমি কাজ করেছি। তো আমার মনে হয় যে-কোনো কাজের সফলতার পেছনে টিম ম্যানেজমেন্টটা খুব জরুরি। ‘একজন মায়াবতী’র টিমটি খুব ভালো পেয়েছি। অনেক সময় শুটিংয়ের অনেক খুঁত ঢাকার দায় বর্তায় সম্পাদকের ওপরেই। কাজটা তখন অনেক জটিল হয়ে যায়। ‘একজন মায়াবতী’র ক্ষেত্রে এই সমস্যাটিতে পড়তে হয় নি মোটেও। শুটিংয়ের কাজটি খুবই গোছানো ছিল। আর কাজটি করার ক্ষেত্রে নিজের সৃজনশীলতা, চিন্তাভাবনার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছি, স্বাধীনতা পেয়েছি শতভাগ। যে কারণে কাজটি করেও আনন্দ পেয়েছি অনেক। দর্শকদের একটা ভালো কাজ উপহার দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করেছি।

Leave a Reply

Your identity will not be published.