চলতি সংখ্যা
বর্ষ ২৬ সংখ্যা ০২
গৌরবের ২৫ বছর

ডিজিটাল লাইফঃ স্বস্তি ও বিড়ম্বনা

ডিজিটাল লাইফঃ স্বস্তি ও বিড়ম্বনা

ডিজিটাল দুনিয়ায় আমাদের বাস। একুশ শতকে পৃথিবী আবদ্ধ হচ্ছে অন্তর্জালে। তথ্যভাণ্ডারের এই যুগে সবকিছু এখন এক ক্লিকে। নতুন দিগন্ত উন্মোচন হচ্ছে যোগাযোগ মাধ্যমে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় জীবনযাপন হয়েছে আরও সহজ। ইন্টারনেটের বদৌলতে সমগ্র পৃথিবী যেন একটি নিরবচ্ছিন্ন গ্রাম। মানব সমাজে এর উপকারী ভূমিকা এতই ব্যাপক যে, তা এই স্বল্পপরিসরে বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। মূলত তথ্যপ্রাপ্তি, শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ, গবেষণা ও বিনোদনের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী মাধ্যম এই ইন্টারনেট। সময়টা ডিজিটাল রূপান্তরের। জীবনযাপন, যোগাযোগ, দরকারি সেবা, অর্থনীতি সবকিছুতে ডিজিটাল প্রযুক্তির নতুন ধারা চলছে। এই বিশ্বায়নের যুগে তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও দ্রুত বিস্তারের ফলে সারা বিশ্ব এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। ২০২০ সালের দ্বারপ্রান্তে এসে এবারের প্রচ্ছদের আয়োজন ডিজিটাল লাইফের নানা দিক নিয়ে।

ডিজিটাল লেখাপড়া

ডিজিটাল লেখাপড়া বলতে সাধারণত ই-লার্নিং-এর বিষয়টি বোঝানো হয়ে থাকে। বর্তমান সময়ে ই-লার্নিং খুবই আলোচিত একটি বিষয়। দেশে কিংবা বিদেশে, সবখানেই এর জয়জয়কার। ধরাবাঁধা শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে হওয়ায় দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই শিক্ষা ব্যবস্থাটি। বইমেলায় কাগজের বইয়ের পাশাপাশি ই-বুকের চাহিদা বাড়ছে। প্রতিদিনই উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে প্রযুক্তি। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। আর এরই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে প্রচলিত অনেক কিছুই। শিক্ষা ব্যবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। ইন্টারনেট আর কম্পিউটারের হাত ধরে এখানে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। জ্ঞানার্জনের বিষয়টি এখন আর কোনোভাবেই দুই মলাটের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। একটি স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটার আর সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে যে-কোনো জায়গায় বসেই বিভিন্ন বিষয়ের ওপর দক্ষতা অর্জন আজকাল মামুলি ব্যাপার। মূলত প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরাসরি ক্লাস করা কিংবা কোনো বিষয়ের ওপর জ্ঞানার্জন করার পদ্ধতিই ই-লার্নিং নামে পরিচিত। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে ই-লার্নিংয়ের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ই-লার্নিংয়ের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থের অভাবে কিংবা অন্যান্য পারিপার্শ্বিক কারণে অনেক শিক্ষার্থীই মাঝপথে পড়ালেখা ছাড়তে বাধ্য হয়। এ ছাড়া দেশের অনেক অঞ্চলেই এখনো সেভাবে শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয় নি। এসকল স্থানে ই-লার্নিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সম্ভব। আগে পড়াশোনা ছিল পাঠ্যবইতেই সীমাবদ্ধ। ইন্টারনেটের বদৌলতে যে-কোনো বিষয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা, সেই সংবলিত বিভিন্ন তথ্য বা ভিডিও দেখা সম্ভব মুহূর্তের মাধ্যই। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ই-লার্নিং। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে ই-লার্নিং বিপুল পরিবর্তন এনেছে। আজকাল ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাড়িতে বসেই বিভিন্ন প্রজেক্ট, এ্যাসাইনমেন্ট, মিউজিক ওয়েব ডিজাইনিং ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের কোর্স করা যায়। এই ওয়েবসাইটগুলোতে ভিডিওসহ  কোর্স আপলোড করা থাকে। এর সঙ্গেই থাকে আলোচনার ফোরাম, গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক, প্রাসঙ্গিক কেস স্টাডিজ। অনেক অক্ষেত্রেই এই ধরনের কোর্স করার পর সার্টিফিকেটও মেলে। তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক হিসেবে ই-লানিং-এর সুযোগ আশীর্বাদ বলা চলে। ঢাকার বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তি ও ডিজিটাল মিডিয়া। পাঠ্য বিষয়বস্তু বোঝানো হয় টু ও থ্রি-ডি অ্যানিমেশন, অডিও এবং ভিডিও ক্লিপিং-এর মাধ্যমে। ফলে আধুনিক পড়াশোনা অনেক বেশি উপভোগও হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল মিডিয়াকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে, অনায়াসেই বাচ্চাদের মনে নতুন তথ্য সম্পর্কে কৌতূহলের সঞ্চার করা যেতে পারে।

ডিজিটাল সেবা

দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অনলাইন নির্ভরতাও বাড়ছে। বর্তমানে স্মার্টফোন গ্রাহকরা বেশিরভাগ সময় অ্যাপের ওপরই নির্ভর করেন। বলা যায়, তাদের জীবন অনেকটা অ্যাপনির্ভর হয়ে গেছে। ঘুম থেকে ওঠার মধ্য দিয়ে সবার দিন শুরু হয়। আর অ্যাপ ব্যবহারের শুরুও যেন তখন থেকেই। মূলত অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকে অ্যাপ তৈরি ও ব্যবহারের বিপ্লব শুরু হয়। বর্তমানে এমন কোনো বিষয় নেই, যেগুলোর ভিত্তিতে অ্যাপ তৈরি হয় নি। লেখাপড়া, খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা, ব্যায়াম, চিকিৎসা, যাতায়াত ইত্যাদি সবকিছুরই অ্যাপ রয়েছে এখন। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা সেগুলোর সাহায্য নিচ্ছেন নিয়মিত। অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারকারীরা আছেন অ্যাপের স্বর্গরাজ্যে। তারা সব ধরনের অ্যাপের সাহায্য নিতে পারেন কোনো জটিলতা ছাড়াই। যেখানে অন্য অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারকারীদের কিছু জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। অবশ্য সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব জটিলতা কমছে। দেশে একদিকে অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে নির্মাতার সংখ্যাও। বাংলাদেশ থেকে এখন সরাসরি অ্যাপ স্টোরে অ্যাপ সরবরাহ করা যায়। এতে নির্মাতারা বেশ আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে অ্যাপের বাজার আরও বড় হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে অ্যাপের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কারণ সম্পর্কে অ্যাপ এনি জানায়, বিশ্বে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। মানুষ এখন অ্যাপে অনেক  বেশি সময় দিচ্ছে। লেখাপড়া বা নতুন শহরে রাস্তা খোঁজা তথ্য সংক্রান্ত যে-কোনো খবর মুহূর্তে জানতে ইন্টারনেটের ওপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই। আঙুলের কয়েকটি ক্লিকেই বাড়ির দোরগোড়ায় হাজির হচ্ছে গাড়ি কিংবা পছন্দের রেস্তোরাঁর খাবার। বিভিন্ন অনলাইন সেবার ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের গুরুত্ব অপরিসীম, যে-কোনো ধরনের বিল জমা দেওয়া, চাকরির খোঁজখবর, রেলের টিকিট, পরীক্ষার ফরম পূরণ, হোটেল বুকিং, টাকাপয়সার লেনদেন থেকে শুরু করে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট খোলা সবটাই হচ্ছে মোবাইলের মাধ্যমে।

বর্তমানে বেশিরভার সেবারই নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট রয়েছে। ফলে কয়েক বছর আগেও যে সেবা পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হতো, সেই কাজই হচ্ছে একটি ক্লিকে। এতে যেমন সময় বাঁচছে, তেমনি কমছে পরিশ্রম। এই প্রসঙ্গে অনলাইন কেনাকাটার কথা না বললেই নয়। জামা, জুতা তো বটেই, আজকাল ইলেকট্রনিক জিনিস থেকে শুরু করে ফার্নিচার সবই বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে। ঘরে বসে যদি পছন্দের জিনিস হাতের কাছে এসে হাজির হয়, তাহলে ক্ষতি কি? ফলে ইন্টারনেটের ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বাড়ছে হু-হু করে। বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ ব্যাকিং সেবা দিচ্ছে। যেমন বিকাশ, রকেট, নগদসহ নানা অ্যাপ আর্থিক লেনদেনে ভূমিকা রাখছে। যাতায়াতে সুবিধা দিচ্ছে উবার, পাঠাও, নানা অ্যাপ। অনলাইন কেনাকাটার জন্য রয়েছে দরাজ, চালডালসহ বিভিন্ন অ্যাপ সুবিধা। এখন প্রত্যেক সেবার জন্য নানারকমের অ্যাপ। যার ফলে অ্যাপভিত্তিক হয়ে উঠছে আমাদের জীবন। পণ্য প্রচারের জন্য রয়েছে অনলাইন ভিত্তিক কার্যক্রম। গ্রাহক সহজে জানতে পারছে পণ্য সম্পর্কে। অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে সব কিছু এখন হাতের মুঠোয়।

ডিজিটাল বিনোদন

অন্য সবকিছুর সঙ্গে অবধারিতভাবে পরিবর্তন এসেছে বিনোদনমাধ্যমে। প্রযুক্তির কল্যাণে বিনোদনমাধ্যমে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে বিনোদন গ্রহণের ক্ষেত্র। সিনেমা হল, টিভি, ডিভিডি ছাড়িয়ে বিনোদন স্থান করে নিয়েছে ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে। একটা স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যে কেউ জামার পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারে বিশ্বের বিনোদনের জগৎ। টেলিভিশন যেমন পরিবারের অনেক সদস্য মিলে একসঙ্গে দেখেন, সেখানে ডিজিটাল বিনোদন অনেকটাই পার্সোনালাইজড। এক পরিবারের তিনজন সদস্য থাকলে তিনজনই আলাদা আলাদা মোবাইলে সিরিজ দেখতে পারেন। ফলে কমিউনিটি ভিউয়ারশিপের বদলে পার্সোনাল ভিউয়ারশিপের সংখ্যা বাড়ছে। ট্র্যাডিশনাল মিডিয়ার বাইরে পৃথিবীব্যাপী দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম। ডিজিটাল বিনোদন প্ল্যাটফর্মের কথা শোনা মাত্রই যারা এগুলো সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন তাদের মানসপটে ভেসে ওঠে বিভিন্ন ধরনের মোবাইল অ্যাপস এবং ভিডিও স্ট্রিমিং ওয়েবসাইট। কেননা এগুলোর মাধ্যমে যে কেউ খুব সহজেই উপভোগ করতে পারেন বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট। এর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ওয়েব সিরিজ এবং চলচ্চিত্র।

হলে সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে কত রকম ঝক্কি—যানজট ঠেলে হলে যাওয়া, টিকিট কাটা বা নির্দিষ্ট শোর সময় মেনে সিনেমা দেখার বাধ্যবাধকতা। এইসব ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো। বিশেষ করে তাদের মৌলিক প্রযোজনাগুলো। ডিজিটালভাবে মুক্তি পাওয়া মাত্রই একযোগে সেসব দেখার সুযোগ পাচ্ছেন সারা বিশ্বের দর্শক। টিভি সিরিজের ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সপ্তাহজুড়ে অপেক্ষায় থেকে একটি একটি করে নতুন পর্ব দেখার দিন শেষ। এমন বার্তাই দিচ্ছে নেটফ্লিক্সের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো। কোনো অপেক্ষার বালাই নেই, মুক্তির দিনেই সব এক বসায় দেখে ফেলার সুযোগ আছে এই প্ল্যাটফর্মে। ফলে গ্রাহকেরা শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে, জ্যামে থেমে, চলন্ত গাড়িতে যখন সময় মিলছে, টপাটপ দেখে ফেলছেন প্রিয় ধারাবাহিকের একেকটা পর্ব। বাংলাদেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে বেশ কিছু স্ট্রিমিং সাইট। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বায়োস্কোপ,  আইফ্লিক্স, বাংলাফ্লিক্স, বঙ্গবিডি, টফি নানা স্ট্রিমিং সাইট।  সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের হইচই, জিফাইভ।

প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের জন্য বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। তবে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, হুলু, এইচবিও নাও ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে ডিজনি প্লাস। ‘কনটেন্ট ইজ দ্য কিং’— কথাটি বহুল প্রচলিত। বর্তমান সময়ে দর্শক কন্টেন্টকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। আর এসব দর্শকদের আকৃষ্ট করতে স্ট্রিমিং সাইটগুলোও নির্মাণ করছে ভিন্ন আঙ্গিকের কন্টেন্ট। পৃথিবীর সবথেকে বড় অন-ডিমান্ড ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সের কথা আমরা সবাই জানি। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে  নির্মাণ করেছে অসংখ্য জনপ্রিয় টিভি শো এবং চলচ্চিত্র। মানসম্পন্ন এসব কন্টেট দর্শকদের কাছে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে।  অন্যদিকে, বাকি স্ট্রিমিং সাইটগুলোও গুণগত কন্টেন্ট নির্মাণে সমানতালে এগিয়ে চলছে। একটা দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট থাকলেই হাতের মুঠোয় চলে আসছে দেশি-বিদেশি হাজারো কনটেন্ট। আবার প্রতিটি প্ল্যাটফর্মেই পুরোনো আর ক্ল্যাসিক প্রযোজনার পাশাপাশি থাকছে তাদের নিজস্ব মৌলিক কনটেন্ট। একেকটি প্ল্যাটফর্ম কিছু কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে নিজেদের আকর্ষণীয় করে তুলছে সবার কাছে। একেকটা অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম দর্শকদের দিয়েছে বিনোদনের স্বাধীনতা, অর্থাৎ স্বাধীনভাবে বিনোদন বেছে নেওয়ার সুযোগ। এ সময়ে ভিডিও মানেই যেন ইউটিউব। এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন, যিনি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন অথচ ইউটিউব ব্যবহার করেন না। শিক্ষা, বিনোদন, খেলা, সংবাদ, প্রযুক্তি, সাজসজ্জা, রান্না ও ভ্রমণ থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের ভিডিও রয়েছে ইউটিউবে। ইউটিউব যেমনি শিক্ষা-বিনোদনের এক অনন্য মাধ্যমে পরিণত হয়েছে, তেমনি ইউটিউব বর্তমান সময়ে অর্থ উপার্জনেরও একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। ইউটিউবে চ্যানেল তৈরি করে আপনি যেমন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, তেমনই আয় করতে পারেন। সফল ইউটিউবার হতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই ধৈর্য ও সততার পরিচয় দিতে হবে। আপনার ভিডিওর বিষয়বস্তু হতে হবে স্বতন্ত্র। চ্যানেল তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গেই হাজার হাজার ভিউ ও সাবস্ক্রাইবার হয়ে যাবে অথবা হাজার হাজার টাকা আয় হবে। এটা ভাবা ঠিক নয়। সফলতার জন্য সময় ও শ্রম দিতে হবে। প্রচারমাধ্যমের উন্নয়নে আবিষ্কার হয়েছিল টেলিভিশন যন্ত্রটি। এরপর এতে যুক্ত হয় বিনোদনের নানা আয়োজন। একসময় মঞ্চ থেকে নাটকও উঠে এসেছিল টিভি পর্দায়। কয়েক দশকের পালাবদলে টেলিভিশনের জন্যই নির্মিত হতে লাগল নাটক ও টেলিছবি, যা এখন রীতি। জীবনের নানামুখী চাপ সামলে মানুষ একটু স্বস্তি পেতে চান। একটু স্বপ্নময় জগতে বিচরণ করতে চান, দেখা পেতে চান একটু আনন্দের। নানা অভাব, অগোছালো ছাপোষা জীবন গুটিয়ে রেখে টিভির সামনে তারা বসেন খানিকক্ষণ, গোছালো একটি নাটক, রিয়েলিটি শো, রান্না, রূপচর্চা, গেম শো বা শিশুতোষ অনুষ্ঠান দেখবেন বলে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। এখন টেলিভিশন থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন দর্শক। গত কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশের দর্শকরা টেলিভিশনে নাটক বা টেলিছবিগুলো দেখছেন না। বলা ভালো, নাটক টেলিভিশনে নয়, দর্শক দেখছেন ইউটিউবে। ফলে বলা যায়, দর্শক এখন টিভি ছেড়ে অনলাইনের দিকে ঝুঁকছেন। টেলিভিশনের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে। সাধারণত টেলিভিশনে প্রচারের জন্যই নাটক তৈরি হতো এত দিন। ইউটিউব আসার পরে সেই নাটকগুলো টেলিভিশনে প্রচারের পর ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হতো। এখনো এই ধারা চলছে। তবে বছরখানেক ধরে নতুন আরেক চিত্র দেখা গেছে টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে। এখন ইউটিউবের জন্যই নাটক তৈরি হচ্ছে। সেই নাটকগুলো একবার প্রচারের জন্য বিক্রি করা হচ্ছে টিভি চ্যানেলে। তাতে টেলিভিশন থেকে এককালীন একটা অর্থ পাচ্ছেন প্রযোজক। আবার ইউটিউব থেকেও আসছে অর্থ। গান একদিকে মনের খোরাক, অন্যদিকে অনেক শিল্পী কিংবা প্রতিষ্ঠানের কাছে আয়ের উৎস। বর্তমানে অন্যসবের পাশাপাশি গানের প্রচারমাধ্যম যেমন বদলে গেছে তেমনই বদলে গেছে আয়ের উৎসও। গান মানেই এখন মিউজিক ভিডিও। আর ভিডিও’র প্রকাশ মাধ্যম ইউটিউব। হাতে হাতে স্মার্টফোন। বিনোদনের বড় মাধ্যম এটি। গান শুনতে কিংবা ভিডিও দেখতে হাতের মুঠোয় থাকা ফোনের ইউটিউব অ্যাপটিই যেন মানুষের প্রথম পছন্দ। ক্ষেত্রবিশেষে কম্পিউটার। মাধ্যম বদলালেও শ্রোতাদের হাতের মুঠোয় গান পৌঁছে দিতে চান শিল্পী ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো। ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট ইউটিউব হয়ে উঠেছে গান দেখা ও শোনার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম। এ জন্য গান প্রকাশকরা ইট-কাঠের অফিসঘর পাল্টে ইউটিউবে খুলেছেন নিজস্ব চ্যানেল। চ্যানেলের গ্রাহক বাড়াতে চালাচ্ছেন নানা কৌশল। ইউটিউবে অবাধ ব্যবসার জন্য প্রতিযোগিতা করছেন ভেরিফায়েড চ্যানেলের জন্য। এতে ব্যবসায় আসছে স্বচ্ছতাও। কিন্তু কয়েক বছর আগেও ইউটিউব থেকে ভালো টাকা পেত গানের পৃষ্ঠপোষক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এখন চিত্র পাল্টে গেছে। ইউটিউবে গান প্রকাশ করে সাবস্ক্রাইবার বাড়ানো এবং শিল্পী ও প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি ছাড়া সেই অর্থে আর বেশি কিছু জুটছে না। শুরুতে বেশ বড় বাজেটে ভিডিও বানিয়ে ইউটিউবে আপলোড করা হলেও এখন সেই চিন্তা থেকে সরে এসেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। অল্প বাজেটে গান তৈরি করে ইউটিউবে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গানের বাজার এখন পুরোপুরি ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে সঙ্গীতাঙ্গন ‘যা ইচ্ছে তাই’-এর কবলে পড়েছে। বাজার এখন ‘ভাইরাল জ্বর’-এ আক্রান্ত। যার ফলে কেউ কেউ উদ্ভট, মানহীন, দুর্বল কথার গানের পাশাপাশি কুরুচিপূর্ণ মিউজিক ভিডিওর আশ্রয় নিচ্ছেন। এখন কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা প্রযোজকের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে না গান প্রকাশের জন্য। সুরকার, শিল্পী, গীতিকার, ইভেন্ট অর্গানাইজার, সঙ্গীত সংশ্লিষ্ট এমন অনেকেই নিজেদের মতো গান তৈরি করে অনলাইনে ছাড়ছেন। সেখান থেকে বিক্রি-বাট্টাও খারাপ আসছে না। এ জন্য গানের বাজার হয়ে পড়ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং লাগামহীন। শুধু নাটক বা গানই নয়, এখন পুরো চলচ্চিত্রও মুক্তি পাচ্ছে ইউটিউবে। একটা সময় পত্রপত্রিকায় নতুন ছবির বিজ্ঞাপন করা হতো নানা কায়দায়। এখন ইউটিউবে সিনেমার ট্রেলার ও গানও ছাড়া হচ্ছে। আর সে কারণেই এখন অনেক পরিচালক বা নাটক নির্মাতা এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে ‘বক্স অফিস’ বলে অভিহিত করছেন। যেহেতু এখন টেলিভিশনের দর্শকরা ইউটিউবের দিকে ঝুঁকছেন, সে কারণেই এখন দেশের প্রায় সব বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের রয়েছে নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল। আর এসব চ্যানেলের সাবস্ট্ক্রাইবারও লাখ লাখ। প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন সাবস্ক্রাইবার।

বেশিরভাগ তারকার ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রামসহ সোস্যাল মিডিয়ার নানা মাধ্যমে নিজস্ব পেজ রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ইউটিউব চ্যানেল। ফলে তারকাদের সব খবর সহজেই পেয়ে যায় ভক্তরা।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-এর উপযোগিতা

সোস্যাল মিডিয়ার প্রধান লক্ষ্য অবশ্যই আমাদের সামাজিক করে তোলা। জনসংযোগ বাড়াতে এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ছেলেবেলার বন্ধু, হাইস্কুলের শিক্ষক, বিদেশ-বিভুঁইতে থাকা আত্মীয় থেকে পাড়ার বন্ধু সকলকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। এখন খবর জানার জন্য খবরের কাগজ পড়ার আর প্রয়োজন পড়ে না। বিষয়টি ইতিবাচক বা নেতিবাচক যাই হোক, এর নেপথ্যেও রয়েছে সেই সোস্যাল মিডিয়াই। সৃজনশীলতার এক অভিনব প্ল্যাটফর্ম রূপে পরিণত হয়েছে সোস্যাল মিডিয়া। সোস্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে আমাদের সাবলীলতাও। মুখচোরা ছেলেটিও আজ নিজের ওয়ালে শব্দের জোরে আলোড়ন তুলতে পারছে। নিছক শখ করে তোলা ছবিও হাজার হাজার লোকের নজর কাড়ছে, বাহবা কুড়াচ্ছে। নাচ, গান, শটফিল্ম, রান্না, আঁকা থেকে শুরু করে যাবতীয় শিল্প বিশ্বের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করছে সোস্যাল মিডিয়া। বিজনেস প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও সোস্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তা এখন বেশ বেড়েছে। নিজের র্স্টাট অ্যাপ খুলেছেন অথচ লোকের কাছে কীভাবে সেই খবর পৌছে দেবেন, বুঝতে পারছেন না। জনে জনে বলে বেড়ানো তো সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে সেই সোস্যাল মিডিয়ার দ্বারস্থ হচ্ছেন। পরিচিতদের মাধ্যমেই খবর ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। সমাজকে নানাভাবে সচেতন করে তুলতেও এই প্ল্যাটফর্মগুলির কৃতিত্ব অসীম। হ্যাঁ ট্যাগ কিংবা ট্রেঞ্জি-এর মতো ফিচারগুলির মাধ্যমে রাতারাতি খবর ভাইরাল হয়ে পড়ছে। মন ভালো রাখতে মন খুলে কথা বলার চেয়ে ভালো উপায় বোধহয় আর কিছু নেই। আর সোস্যাল মিডিয়া যে আমাদের সেই সুযোগ করে দিতে সক্ষম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইউটিউবের মতো ভিডিও পোর্টালের আগমনে অনেক হতাশাগ্রস্থ মানুষ প্রায় বিনামূল্যে মোটিভেশনাল ভিডিও বা টেড টকের সুবিধা লাভ করছেন। চটজলদি বিমর্ষ হয়ে থাকা ব্যক্তিদের উৎফুল্ল করে তোলার ক্ষেত্রে জুড়ি নেই এই ভিডিওগুলির।

ডিজিটাল আসক্তি

এক সময় ঢাকা শহরে পাড়াভিত্তিক অনেক পাঠাগার ছিল, ছিল ব্যায়ামাগার, অনেক ক্লাব ছিল তা-ও হারিয়ে গেছে। স্কুলে খেলাধুলার কোনো ক্লাসই নেয়া হয় না। বেশিরভাগ স্কুলেই খেলার মাঠ নেই। পার্কের সংখ্যা হাতে গোনা। সিনেমা হল এখন একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সকলেই গৃহবন্দি হয়ে ভিডিও গেমস থেকে শুরু করে ডিজিটাল নানা মাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। কেউ যদি ইন্টারনেটে অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং এ কারণে যদি তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয়, তখনই বাধে সমস্যা। এর ফলে ভুক্তভোগীর পাশাপাশি সমস্যায় পড়তে হয় বন্ধু, পরিবার ও সমাজকে। অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহার অনেকটা মাদকাসক্তির মতো। এতে করে স্থূলতা দেখা দেওয়া, ঘুম কমে যাওয়া, সৃজনশীল চিন্তাভাবনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়া, মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়াসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। ডিজিটাল ডিজওর্ডার হলো (অতিরিক্ত) ইন্টারনেট আসক্তি, এক মনোব্যক্তিগত ব্যাধি। বিশ্বজুড়ে স্মার্ট ফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেটে আসক্তি এখন কোনো মিথ নয়, সহজ সরল এক বাস্তবতা। ‘মানসিক ব্যাধির ডায়াগনস্টিক এবং পরিসংখ্যান ম্যানুয়াল’ অনুযায়ী কম্পিউটার গেম ও ইন্টারনেটে আসক্তি এখন যথারীতি মানসিক রোগের অন্তর্ভুক্ত।

টেলিভিশন, কম্পিউটার ক্রমে ল্যাপটপ শেষে স্মার্টফোনের যুগ। সুতরাং, এই অনেকের পাশে বসেও একলা হওয়া। আমরা অনেকে একসঙ্গে বসে আছি, অথচ সকলেই ব্যস্ত যে যার মোবাইল ফোনে। ডিজিটাল আসক্তির প্রথম কারণ, আমাদের নাগরিক ক্লান্তি। আসলে আমরা ঠিক যতটা ভালো নেই, ঠিক ততটা ভালো দেখাতে চাই। সোশ্যাল মিডিয়ায় সুখী হওয়ার বিজ্ঞাপন দেখাতে আমাদের ভালো লাগে। এর পেছনে আছে আমাদের নিজেরদের ভালো না থাকা। অথচ ভেতরের কথা কেউ জানতে পারল না, এদিকে বাইরে ভালো থাকা। আমাদের মধ্যে রয়েছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। আসলে বাস্তব আমাদের যে স্বপ্ন দেখায় না, সেই স্বপ্ন আমাদের দেখায় ভার্চুয়াল জগৎ। তাই সমাজবদ্ধ হতে চাওয়ার সেই আদিম ইচ্ছাটির আধুনিক সংস্করণ হচ্ছে ‘ফেবো’ (মিডিয়ার অফ মিসিং আউট)। এই ফেবোকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয় অধিকাংশ ওয়েবসাইট এবং অসংখ্য অ্যাপ। চেনা পরিজন হোক, পছন্দের সেলেব্রিটি, তাদের জীবনের খুঁটিনাটি সম্পর্কে সর্বদা আপডেট থাকতে অনলাইনে অত্যধিক সময় কাটিয়ে ফেলেন বহু মানুষই। বাবা-মার সঙ্গে কমিউনিকেশন গ্যাপ, বৃহত্তর পরিবার থেকে ফ্ল্যাটের ক্ষুদ্র গণ্ডি, একাকীত্ব, অবসাদ, সবকিছু থেকে প্রাণপথে একেবারে ডিজিটালে আত্মসমর্পণ। আট থেকে আশি, যে-কোনো বয়সের মানুষই ডিজিটাল মিডিয়ায় আসক্ত হয়ে পড়তে পারেন। তবে বয়ঃসন্ধির সময় থেকেই ডিজিটাল মিডিয়ার আর্কষণ বাড়ে। সেখানে ভিডিও গেম, চ্যাট, ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড, ওয়েব সিরিজ সব মিলিয়ে একটা ইউটোপিয়ান বিশ্ব রয়েছে। দেখা যাচ্ছে বাস্তব জগতে যারা বেশি মুখচোরা কিংবা উপেক্ষার বস্তু তারা সাধারণত ইন্টারনেট আসক্তির সমস্যায় বেশি ভোগেন। তবে মনোবিদরা জানাচ্ছেন নিজের পেশাগত বা ব্যক্তিগত সাফল্য এলে ভার্চুয়াল জগতের মায়াজাল আনেকটাই কেটে যায়। সোজা কথায় অবিরত নোগিসিজাম। ধরা যাক একের পর এক সেলফি আপলোড করে চলেছেন কেউ, নিজের আপলোড করা অ্যাপ বা কমেন্টের নিচে লাইকের তালিকাও লম্বা হচ্ছে, আর সেই সঙ্গে সেই ব্যক্তিরও অল্পবিস্তর গর্ব হচ্ছে। কেউ আবার দুঃসাহসিক সেলফি তোলার রের্কড করতে গিয়ে প্রাণও হারাচ্ছেন। তবে এ নেশা যাওয়ার নয়। মনোবিদদের যাতে, ডিজিটাল আসক্তির লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অন্যান্য নেশার বিশেষ পার্থক্য নেই। ডিজিটাল মিডিয়ায় মোহগ্রস্ত মানুষ হাতের কাছে কামনা বা নেশার বস্তুটি খুঁজে না পেলে চাপা ক্রোধ বা অবসাদে ভুগতে থাকেন। অনেকেই নিজেকে গুটিয়ে বা একঘরে করে নেন। ইন্টারনেটের ব্যবস্থা না থাকলে সহজেই উৎকণ্ঠা বা উদ্বেগের শিকারও হন তারা। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন তথ্য সংগ্রহ করা ক্রমশই সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। তবে তার দরুন  কিছু সমস্যা লক্ষ করা গিয়েছে। নিছক কৌতূহলের বশেই অনেক অপরিণত বয়সের ছেলেমেয়ে সহজেই পর্ন বা ‘অ্যাডাল্ট কনটেন্ট’কে নিমেষেই হাতের মুঠোয় পেয়ে যাচ্ছে। নিষিদ্ধ বা অবৈধ আনন্দের তাড়নায় তারা অজান্তেই পর্ন অ্যাডিক্ট হয়ে পড়ছে বহু ক্ষেত্রেই। এই অকালপক্কতার কারণে তারা সহজেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, যৌনতা নিয়ে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। সোস্যাল মিডিয়ার আসক্তির কারণে বহু ব্যক্তি ক্রমশ অবসাদের শিকার হয়ে পড়ছেন। তাছাড়া অনেকে অনলাইন নিগ্রহের শিকারও হন। এই আসক্তি আামাদের সহজাত দায়িত্ববোধ বা উচ্চাকাঙ্খার ক্ষয় ঘটিয়ে জীবনের প্রতি উদাসীন করে তোলে। তাতে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিও পেশায় ঠিকঠাক মনোনিবেশ করতে ব্যর্থ হন এবং সময়ের কাজ সময়ে সম্পূর্ণ করতেও হিমশিম খান।

এই নেশার কারণে বহু দাম্পত্যে অকালেই চিড় দেখা দেয়। তাছাড়াও এই সর্বনাশা নেশার ফলে আমাদের অন্যান্য ব্যক্তিগত সম্পর্কেও দূরত্ব দেখা দিতে পারে। শো অফ করাই বর্তমান যুগের ধারা। সুখী হওয়ার দৌঁড়ে কে এগিয়ে, তা প্রমাণ করার তাগিদই জন্ম দিচ্ছে এই ধরনের পরিস্থিতির। আর পরিস্থিতির চাপে আলগা হচ্ছে সম্পর্কের সুতা। মুঠোফোনের পর্দা সবসময় আলোকিত। সকলেই ছুটে চলেছে, কিন্তু নজর সব সময় হাতের মুঠোফোন বা ট্যাবলেটে। সর্বদা সকলের দৃষ্টি ‘ডাউন টু আর্থ’। আশেপাশের জগৎ তো বাদই দিলাম, পাশের মানুষটির দিকে তাকানোর মতো সময়টুকুও আজ কারও নেই। বাস্তব জীবনের চেয়ে আজকাল মানুষ তাদের ভার্চুয়াল সত্তাকে প্রাধান্য দেয় বেশি। দিনের সব খুঁটিনাটি তথ্য ঘনঘন সোস্যাল মিডিয়ায় আপলোড করা, অহরহ সোস্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস আপডেট আর তার রিঅ্যাকশন বা ভিউজ নিয়ে মাথা ঘামানোও কিন্তু আসক্তিরই ফল।

তথাকথিত এই ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ ক্রমশঃ আমাদের আনসোশ্যাল আর অলস করে তুলছে। সমীক্ষা বলে,  যে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় যত বেশি সক্রিয়, সামাজিক জীবনে ঠিক ততটাই নিষ্ক্রিয় তিনি। এ কথার সত্যতা নিয়ে সন্দেহের সত্যি কোনো অবকাশ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার আরও এক অবদান সাইবার বুলিং। ট্রোলস, মেমস ইত্যাদি শব্দগুলোর সঙ্গে আমাদের পরিচয় তো সোস্যাল মিডিয়ার হাত ধরেই।

আপাতদৃষ্টিতে  এগুলোকে নিরীহ সমালোচনা বা ঠাট্টা মনে হলেও, কাউকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট। ফলে আপাত নিরীহ ট্রোল বা মেম থেকেও সৃষ্টি হচ্ছে নানা সমস্যা। কখনো কখনো তা এতটাই হেয় পড়েছে যে, তা মানুষকে চরম কোনো সিদ্ধান্ত নিতেও বাধ্য করছে। সোস্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তার সঙ্গে বাড়ছে সাইবার ক্রাইম। অবশ্য এক্ষেত্রে সোস্যাল মিডিয়ার পাশাপাশি আমরাও সমানভাবে দায়ী। প্রাত্যহিক জীবনের সব খুঁটিনাটি যদি অবলীলায় সকলের হাতে তুলে দেন, তাহলে স্বাভাবিভাবেই তার অপব্যবহারের কিছু দায় আপনার ওপরও বর্তায়। তাছাড়া সাধারণত আমরা যে অ্যাপ ব্যবহার করি, সেগুলোর প্রতিটিতেই অ্যাকাউন্ট খোলার আগে দীর্ঘ টামর্স এ্যান্ড কন্ডিশনস দেওয়া থাকে। কীভাবে সেই অ্যাপ ব্যবহার করা উচিত, কোন কোন ক্ষেত্রে অ্যাপ কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ করতে পারেন, বিভিন্ন সমস্যা এড়াতে কী করবেন বা কীভাবে নিরাপদ থাকবেন ইত্যাদি যাবতীয় তথ্যের বিস্তর বর্ণনা দেওয়া থাকে তাতে। কিন্তু তা পড়ে দেখার মতো ধৈযই তো কারও নেই। তবে এখন অপরাধমনস্কতাও যে বহুগুণে বেড়েছে, সে কথা অস্বীকার করারও উপায় নেই। প্রায়ই প্রোফাইল হ্যাকিং আইডেন্টিটি থেপট, হারাসমেন্টের মতো ঘটনা চোখে পড়ে। সামান্য একটু জনপ্রিয়তার জন্য অপরিচিত ব্যক্তিদের ফ্রেন্ড রিকোরেস্ট অজানা বিপদ ডেকে আনতে পারে। দিনভর মোবাইল বা ল্যাপটপের আলো চোখে চাপ সৃষ্টি করে। ফলত বাড়ছে চোখের নানা সমস্যা। তাছাড়া অনবরত কিপ্যাডের ব্যবহার আঙুলের হাড়েও চাপ ফেলে। ফল স্বরূপ বাড়ছে কার্পাল টানেল সিনড্রোম (আঙুল তথা হাতে তাৎক্ষণিক অসাড়তা বা চিনচিনে ব্যথা, মাঝে মধ্যে শকের মতো অনুভূক্তি, অকারণে হাত কাঁপা বা দুর্বলতা, সহজে হাত থেকে জিনিসপত্র পড়ে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ এই সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।) এ ছাড়া স্লিপিং ডিজঅর্ডার এবং তা থেকে হজমের নানা সমস্যার প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে।

আসক্তি নিরাময়ের উপায়

ডিজিটাল ডিটিক্সিফিকেশন হলো এমন একটা সময়সীমা যেখানে একজন ব্যক্তি ইন্টারনেট কানেক্ট করা যায় এমন সমস্ত যন্ত্র, যেমন, স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার থেকে দূরে থাকবেন। শুনতে যতটা বোরিং লাগল, আসল ব্যাপারটা ততটাই আনন্দের এবং গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন সময় ঠিক করে নিন। এই সময়টা সমস্ত স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপকে দূরে সরিয়ে রাখুন। ইন্টারনেট থেকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সম্পূর্ণ ডিসকানেক্ট করে নিন নিজেকে। প্রকৃতিকে দেখুন, শরীর চর্চা করুন, ভাবুন, লিখুন, নিজেকে সময় দিন, পরিবারকে সময় দিন। ইন্টারনেট ছাড়া অন্য অনেক কিছুই তো আছে করার।

বাস্তব আর ভার্চুয়াল দুনিয়ার পার্থক্য বুঝতে শিখুন। সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারে দাড়ি, কমা বসান। সম্প্রতি ফেসবুক সেটিং-এ ‘সে ইওর টাইম অন ফেসবুক’ বলে একটা নতুন ফিচার যোগ করা হয়েছে। সেখান থেকে জেনে নিতে পারেন, আপনার দৈনিক ফেসবুক ব্যবহারের সময়সীমা এবং সেইমতো তা নিয়ন্ত্রণও করতে পারেন। কোনো অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খোলার আগে তার টামর্স অ্যান্ড কন্ডিশনস-এ একবার চোখ বুলিয়ে নিন। কোনো সমস্যায় পড়লে সরাসরি অ্যাপ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজনে আইনের সাহায্য নিতেও ঘাবড়াবেন না।

অহরহ সোস্যাল মিডিয়ার পোস্ট, সব ব্যাপারে আগ বাড়িয়ে নিজের মতামত দেওয়া ইত্যাদি অভ্যাসগুলো যতটা সম্ভব কমান। মনে রাখবেন, কোনো কথা বলা আর সেটা বাস্তবে করার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে লিখে সমাজের বাস্তব চিত্রগুলো বদলানো সম্ভব নয়। বরং কাজের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করুন। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো তথ্য পেলেই তা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করবেন না। নিজে তার সত্যতা যাচাই করে নিন। সোশ্যাল লাইফ আর ব্যক্তিগতজীবন আলাদা রাখুন। সোস্যাল লাইফে ব্যক্তিগতজীবনের প্রবেশ থাকলেও, ব্যক্তিগতজীবনে যেন সোশ্যাল মিডিয়া প্রভাব না ফেলতে পারে, সেটা নিশ্চিত করুন।

Leave a Reply

Your identity will not be published.