চলতি সংখ্যা
বর্ষ ২৬ সংখ্যা ০২
গৌরবের ২৫ বছর

সত্যজিৎ রায়ঃ অনন্যসাধারণ চলচ্চিত্রকার

সত্যজিৎ রায়ঃ অনন্যসাধারণ চলচ্চিত্রকার

আজ সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। শতবর্ষ আগে এই দিনে তিনি জন্মেছিলেন। বাংলা সাহিত্যে তিনি অমর হয়ে আছেন গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা এবং প্রফেসর শঙ্কুর জন্য। তবে বিশ্ববাসীর কাছে তিনি সুপরিচিত একজন সৃজনশীল চলচ্চিত্রকার হিসেবে। তাই চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ওপর এখানে আলো ফেলা হলো।সত্যজিতের শতবর্ষে অন্যদিন-এর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

সত্যজিৎ রায় এমন এক চলচ্চিত্রকার- যার আবির্ভাবে বাংলা ছবির সমগ্র অচলায়তনটি প্রথম ভেঙে পড়ে। তিনিই সেই প্রতিভাবান রূপকার যিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে সাহিত্যের দাসত্ব থেকে উদ্ধার করেন। যদিও সত্যজিৎ-পূর্ব বাংলা ছবিতে যে কোনো প্রকার সৌন্দর্য ছিল না এ কথা পুরোপুরিভাবে বলা যাবে না। বস্তুত যা কিছু নতুনত্বের লক্ষণ ছিল, তা খুবই সীমায়িত এবং সিনেমার শিল্পতত্ত্ব অনুযায়ী অত্যন্ত ম্লান। সত্যজিৎ রায় সেই চিরন্তন প্রেম, দ্বন্দ্ব, ভালোবাসা, স্নেহ, ক্রোধ লালসা এইসব স্থায়ীভাব অবলম্বনেই নিপুণভাবে বাংলা সিনেমায় বাস্তবতার মোড় ফিরিয়েছেন। সত্যজিৎই প্রথম বাংলা ছবিকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে, সাহিত্য অবলম্বন করেও সিনেমার মধ্য দিয়ে নতুন শিল্প সৃষ্টি সম্ভব।

সত্যজিৎ রায় ১৩২৮ সালের ১৮ বৈশাখ (১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ২ মে) উত্তর কলকাতার ১০০ গড়পার রোডে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা-বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়, মা সুপ্রভা রায়।

ছোটবেলা থেকেই আলোকচিত্রের প্রতি সত্যজিতের আগ্রহ ছিল। ফটোগ্রাফির রজন্যে ‘বয়েজ ওন পত্রিকা’র প্রথম পুরস্কার পান।

প্রেডিসেন্সী কলেজ পড়ার সময় সংগীত ও চলচ্চিত্রে আগ্রহ জন্মে এবং এখান থেকে ১৯৪০ সালে গ্রাজুয়েট হবার পর (বিষয় ছিল অর্থনীতি) সত্যজিৎ শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হন। কিন্তু এখানকার পড়াশোনা শেষ না করেই কলকাতায় ফিরে আসেন। ডিজে কীমার বিজ্ঞাপন সংস্থায় ভিসুয়ালাইজারের পদে যোগ দেন।

ডিজে কীমার-এ কাজ করার সময় ‘ঝিন্দের বন্দি’সহ কয়েকটি চিত্রনাট্য তৈরি করেন। এ সময়ে বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের কিশোর সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেঁপু’র ছবি আঁকতে গিয়ে এর ভিস্যুয়াল উপাদান প্রথম লক্ষ করেন।

সত্যজিৎ রায় কয়েকজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে ‘ক্যালকাটা ফ্লিম সোসাইটি’ গড়ে তোলার পর ছবি দেখা, চলচ্চিত্র মাধ্যম নিয়ে তাত্ত্বিক পড়াশোনা ও লেখালেখি শুরু করেন। বিজ্ঞাপনের ছবির চিত্রনাট্য লেখেন।

১৯৫০ সালে প্রখ্যাত ফরাসি চলচ্চিত্রকার জাঁ রেনোয়া ‘দ্য রিভার’ ছবির সূত্রে কলকাতায় এলে সত্যজিৎ রায় তাঁর সঙ্গে পরিচিত হন রেনোয়ার কাজ দেখেন। এ সময়ে ইংল্যান্ডে বেড়াতে গিয়ে প্রচুর ছবি দেখার সৌভাগ্য হয় সত্যজিতেরÑযা তাঁর মননে আলোড়ন তোলে। এবং দেশে ফিরে ‘পথের পাঁচালী’ ছবি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। যে ছবিটি ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ আগস্ট মুক্তি পায়। ‘দেশ’ পত্রিকায় শৌভিক ছদ্মনামে সমালোচক পঙ্কজ দত্ত লিখেন: “... ‘হয়তো’, ‘কিন্তু’, ‘যদি’, ‘বোধহয়’ জুড়ে সংকোচ বোধ করে বলা নয়, নির্দ্ধিধায় স্পষ্ট করে এ কথা আজ পৃথিবীকে বলবার সুযোগ পাওয়া গিয়েছে যে, আমাদের দেশ পরিমাণেই শুধু নয়, গুণের দিক থেকেও এমন ছবি তৈরি করতে পারে, যা পৃথিবীর সমগ্র চিত্রশিল্পের ইতিহাসেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি বলে পরিগণিত হওয়ার যোগ্য। একথা আজ সদর্পে বলতে পারা যাচ্ছে, ‘পথের পাঁচালী’ ছবিখানি দেখবার পর। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনবদ্য সাহিত্য সৃষ্টি এই ‘পথের পাঁচালী’, কিন্তু সত্যজিৎ রায় চিত্রনাট্য রচনার বাহাদুরিতে এবং পরিচালন সৌকর্যে এমন একটা মৌলিক জিনিস সামনে এনে হাজির করে দিয়েছেন, যা অন্তত এ দেশে চলচ্চিত্রের আদিকাল থেকে এ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি এমন কোনো ছবির কথা মনে করা যায় না, যাকে এর সঙ্গে তুলনার যোগ্য বলে গণ্য করা যায়।” এ সমালোচনায় আবেগ রয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, নিষ্ঠুর দারিদ্র্য যে কত রূপময়, প্রকৃতি যে কত বর্ণময়, মানুষের জীবন যে কত বৈচিত্র্যময় তা সত্যজিতের আগে বাংলা ছবিতে আর কেউ দেখাতে পারেন নি। বলা যায়, ‘পথের পাঁচালী’ বাংলা ছবির একটা টার্নিং পয়েন্ট। একটা মাইলস্টোন। এখান থেকেই বাংলা ছবির বিজয় যাত্রা শুরু। ‘টকি’র যথার্থ চলচ্চিত্রে উত্তরণ ঘটল এ সময় থেকে। চলচ্চিত্র তার নিজের ভাষা খুঁজে পেল।

‘পথের পাঁচালী’ থেকে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু। তারপর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ৩৬ বছরে তিনি পঁচিশটি পূর্ণদৈর্ঘ্যরে কাহিনিচিত্র, ছয়টি স্বল্পদৈর্ঘ্যরে ছবি এবং পাঁচটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের উল্লেখযোগ্য কাহিনিচিত্রের মধ্যে রয়েছে: পথের পাঁচালী (১৯৫৫), অপরাজিত (১৯৫৬), জলসাঘর (১৯৫৮), পরশপাথর (১৯৫৮), অপুর সংসার (১৯৫৯), দেবী (১৯৬০), তিন কন্যা (১৯৬১), কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২), চারুলতা (১৯৬৪), নায়ক (১৯৬৬), গোপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৮) অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৬৯), প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১), অশনি সংকেত (১৯৭৩), জনঅরণ্য (১৯৭৩), হীরক রাজার দেশে (১৯৮০), ঘরে বাইরে (১৯৮৪), শাখাপ্রশাখা (১৯৯০), আগন্তুক (১৯৯১) প্রভৃতি।

সত্যজিতের নির্মিত ছবির তিনটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে তিনি জীবন ও প্রকৃতির সৌন্দর্য পূজারী (‘পথের পাঁচালী’ থেকে ‘গুপী গাইন বাঘা রাইন’), দ্বিতীয় পর্যায়ে (‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ থেকে ‘হীরক রাজার দেশে’) জীবনের ঋণাত্মকতার মধ্যে ধনাত্মক অনুসন্ধান করেছেন এবং তৃতীয় পর্যায়ে (‘ঘরে বাইরে’ থেকে ‘আগন্তক’) পরিণত দৃষ্টিতে জীবন ও সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন।

সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে মানবিক ব্যাপার-স্যাপার সব সময়ই প্রাধান্য পেয়েছে। সামাজিক এবং কখনো কখনো রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে তার ছবির চরিত্রগুলোর মানবতাবোধ প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের বক্তব্য: “আমার সমস্ত ছবি বিচার করলে একটা থিম হয়তো বেরিয়ে আসতে পারবে, ‘মূল্যবোধের সংঘাত’, পুরোনো এবং নতুনের পাশাপাশি অবস্থান। পুরোনো মূল্যবোধ ও আজকের মূল্যবোধের পাশাপাশি অবস্থান। এবং দুই যুগ, দুটো যুগের মধ্যে যে সংঘর্ষ, দুই ভ্যালুজের মধ্যে যে সংঘর্ষ, সেইটাই হয়তো একটা থিম হতে পারে। সবসময় আমার ছবিতে মানুষের স্থান খুব বড়। মানুষ, চরিত্র, চরিত্রের পরস্পরের সম্পর্ক, এইটার স্থানই খুব বড়। এইটা ধরে নিতেই হবে, এইটা প্রত্যেক ছবিতেই আছে।” বলা যায়, প্রাক-সত্যজিৎ যুগের বাংলা ছবিতে মানুষের জীবন এমন গভীরভাবে চিত্রায়িত হয় নি। এমন সমগ্রতায় রূপ পায় নি, জীবনের সার্বিক সত্যের এমন তাৎপর্যপূর্ণ অভিব্যক্তি দেখা যায় নি। Totality of human being সত্যজিতের ছবির অন্তর্প্রেরণা। অপু ত্রয়ীর কেন্দ্র চরিত্রের মানবিক মূল্যায়নে, তার ক্রমবর্ধমান জটিল ভাবনা, মা ও ছেলের মধ্যে অপ্রতিরোধ্য করুণ বিচ্ছেদ ব্যবধান, ‘দেবী’ ছবির কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু সমাজের ক্ষতিকর স্বরূপ, ‘মহানগর’ ছবির সমস্যাবহুল নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন দ্বন্দ্ব, আশা নিরাশা, জলসাঘরের পতনোন্মুখ সামন্ততন্ত্রের অন্তঃসারশূন্য গ্ল্যামার, ‘পরশ পাথরের’ বিশুদ্ধ হাস্যরসের আধারে স্যাটায়ারের চমক, ‘কাঞ্চন জঙ্ঘা’র শ্রেণিচেতনা, আধুনিক সিনেমার বিস্ময়কর নৈপুণ্য, অভিজাত সম্প্রদায় ও মধ্যবিত্ত জীবনকেন্দ্রিকতার দ্বন্দ্ব, জয়-পরাজয়, ‘কাপুরুষে’ প্রতিফলিত নারীর মনস্তত্ত্ব, সমাজের উচ্চকোটিতে বিদ্যমান প্রচলিত সনাতন শৃঙ্খলা, পুরুষকারের অভাবজনিত আত্মগ্লানি, ‘নায়কে’র অর্থ ও যশের মধ্যবর্তী মানুষের আত্মিক দহন, গভীর শূন্যতা, বিচ্ছিন্নতা বোধ, ‘চারুলতা’ ছবির দাম্পত্য মনস্তত্ত্ব, ত্রিকোণ প্রেমের নতুন মূল্যায়ন, পিরিয়ড পিসের অনবদ্য প্রকাশ স্বরূপ, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র আধুনিক যুব মানসিকতা অ্যাডভেঞ্চার, ‘গুপি গাইন বাঘা বাইনে’র সংগীতমুখর অভিনব ফ্যান্টাসি, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র সাম্প্রতিক যুব নির্ভীকতা, শহরকেন্দ্রিক যুবকের গ্লানি, বিদ্রোহ, পরিবেশের কাছে আত্মসমর্পণ, ‘অশনি সংকেত’ ছবির ইতিহাস চেতনা, সংখ্যালঘিষ্ঠ গোষ্ঠীর দুর্নীতিপরায়ণতা, মানুষের তৈরি মানুষের মৃত্যুর নির্মম পরিহাসÑএই অসংখ্য বিষয়বস্তুর ব্যাপ্তিতে সত্যজিৎ যুদ্ধোত্তর বাংলা সিনেমাকে কালোত্তীর্ণ করে দিয়েছেন। অতলস্পর্শ জীবন অভিজ্ঞতার কৃতিতে সত্যজিতের দৃষ্টিতে বিশ্বপ্রকৃতির কোনো ব্যাপারই অসংলগ্ন নয়, বিচ্ছিন্ন নয়। তাই প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, ঘটনার সঙ্গে চরিত্রের সমন্বয় তাঁর ছবিতে অপূর্ব সৌন্দর্যম-মন্ডিত। খণ্ডিত বর্তমান জীবনকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতাকে তিনি প্রশ্রয় দেন নি, তাঁর শিল্পপরাকাষ্ঠায় জীবনের সার্বিক সত্য অভিব্যক্ত। মানুষের প্রতি কমিটেড এই চলচ্চিত্রকারের মানবতাবাদের স্বরূপ এমনি যা অনুভব করতে পারে মানুষ পূর্ণমাত্রায় সামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়েও এবং কখনো কখনো সেই অবস্থা থেকে মুক্ত হতে না পারলেও, তবু কোনো না কোনো সময় সে তার অবস্থাকে অতিক্রম করতে সক্ষম।

ভারতীয় তথা বাংলা চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায়ের সবচেয়ে বড় অবদান- এই মাধ্যমটির ক্ষেত্রে একটি জাতীয় চরিত্র দান করা। প্রাক্ সত্যজিৎ যুগের পরিচালকদের ভারতীয় মনের অভাব ছিল। তাঁরা হলিউডের ইংরেজি ছবি থেকে অনেক কিছু গ্রহণ করেছিলেন ঠিকই কিন্তু তা নিজস্ব অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে নেন নি। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রই সর্বপ্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্রকে সর্বজন স্বীকার্য ভারতীয়ত্বে ভুষিত করেছে। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় চলচ্চিত্র পেল তার জাতীয় শিল্পরূপ, অথচ যা একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভুবন থেকে অনেক কিছু নিয়েও সত্যজিৎ-চলচ্চিত্র স্বদেশী বা জাতীয় রূপ ধারণ করল। মনে হয়, ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে National styles in the Cinema এই প্রবন্ধ লেখার সময় থেকে তরুণ সত্যজিৎ খুঁজে বেরিয়েছেন এমন সব ‘জীবনের উপাদান’ যাকে তাঁর ভাষায়, ‘চলচ্চিত্রের উপাদানে রূপান্তরিত’ করেছেন এবং বিন্যস্ত করেছেন এমন এক ছন্দে, যার ধরন পাশ্চাত্য সিম্ফনি সংগীত থেকে গ্রহণ করলেও তার ছন্দকে ভারতের জাতীয় ছন্দের ধীরগতি ধারায়, মার্গ সংগীতের তালে লয়ে মিলিয়ে দিয়েছেন এক আশ্চর্য প্রতিভায়Ñএইখানেই সত্যজিৎ প্রতিভার জাদু।

বাংলা চলচ্চিত্রে সত্যজিতের আরেকটি অবদান, ডিটেলের প্রতি সজাগ দৃষ্টি। বস্তুত, খুঁটিনাটি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে পর্যবেক্ষণ এবং চিত্রে তার প্রতিপালনের বিষয়ে সত্যজিতের জুড়ি নেই। এছাড়া প্রতীক প্রয়োগের দ্বারা সত্যজিৎ বাংলা ছবির নান্দনিক রূপকে এক অবিস্মরণীয় সৌন্দর্যে মণ্ডিত করেছেন। এক্ষেত্রে বিশ্বের নন্দিত চলচ্চিত্রকারদের মতো সত্যজিৎও সিনেমার নিজস্ব ব্যাকরণ অনুযায়ী প্রতীকের ব্যবহার করেছেন। পরবর্তী সময়ে অন্য পরিচালকেরা যেমন মৃণাল সেন, তপন সিংহ, পূর্ণেন্দু পত্রী, পার্থপ্রতিম চৌধুরী এবং নতুন বাংলা ছবির তরুণ চলচ্চিত্রকারদের কেউ কেউ চিত্রকল্পের ব্যবহারে সত্যজিতীয় রীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। সত্যি বলতে কী, কোনো বিষয়ের উপস্থাপনা, কাহিনির প্রকাশভঙ্গি, চিত্রনাট্যের সংহত সমুন্নতি, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, বস্তুজগৎ ও চলচ্চিত্রের বাস্তবতার মধ্যে যে ফারাক রয়েছে তার তাৎপর্য অনুধাবন ইত্যাদি ব্যাপারে সত্যজিৎ পরবর্তী চলচ্চিত্রকাররা তাঁর সিনেমা রীতির দ্বারা অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত।

সত্যজিতের ছবির আঙ্গিক সনাতনপন্থী চলচ্চিত্রকারদের মতোই। তাঁর এই সিনেমারীতি মূলত বর্ণনাত্মক। বলা বাহুল্য ডিটেলের প্রতি সতর্ক মনোযোগ সত্যজিতের এই বর্ণনাত্মক রীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। এবং যেহেতু তিনি চলচ্চিত্রে মূলত গল্পই বলতে চান, সেহেতু একটি সাহিত্যকর্মকে প্রায়ই বেছে নেন। সাহিত্যানুসারী হলেও তিনি কখনোই গল্পকথক মাত্র নন। একদম চলচ্চিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সাহিত্যের কাহিনিকে অদলবদল ও কাহিনিসূত্রের যাচাই বাছাই করে নেন। ...তাঁর ছবি থেকে সাহিত্যের ন্যারেটিভ সরিয়ে নেবার পর চোখে পড়ে গঠনে সংগীতের প্রভাব, মোটিফের এক সমৃদ্ধ জগৎ এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রসঙ্গ অনুষঙ্গাদি।

প্রাক সত্যজিৎ যুগের বাংলা ছবির সঙ্গে সত্যজিতীয় চলচ্চিত্রের তুলনামূলক বিচারে বিশেষ এক দিকের প্রতি আমাদের দৃষ্টি চলে যায়, সেটি হচ্ছে বহির্দৃশ্য। সত্যজিতের আগেও বাংলা ছবিতে বহির্দৃশ্য গ্রহণের কিছু নমুনা পাওয়া গেছে। ঝড়, বৃষ্টি, বিদ্যুতের খেলা, নদীর পারে অস্তগামী সূর্যের শেষ আলোটুকু- অথচ সত্যজিৎকৃত পথের পাঁচালীতে দিগন্তবিস্তৃত মেঘের সঞ্চরণ, অঝোর বৃষ্টি, আর সেই বৃষ্টিতে অবিরাম ভেজার পর বন প্রান্তের দীর্ঘ গাছের তলদেশে সিক্তবসনে অপু ও দুর্গার পাশাপাশি বসার মধ্যে যে অপূর্ব সুষমা যে বাস্তবতার প্রলেপ, তা প্রাক-সত্যজিতীয় বাংলা সিনেমায় একেবারে অনুপস্থিত।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলা চলচ্চিত্রের অগ্রগতিতে সত্যজিৎ রায়ের ভূমিকা ও অবদান অনন্যসাধারণ।

Leave a Reply

Your identity will not be published.