[‘অন্যপ্রকাশ লাখ পেরিয়ে উদযাপন গল্প লেখা প্রতিযোগিতা’-য় অষ্টম স্থান অধিকার করেছে মারগুবা লিসার এই গল্পটি। এটি এখানে পত্রস্থ হলো।]
দুই কাপ চা দাও ছেলে।
ঘোলাটে পানিতে কাচের ছোট চায়ের কাপ ডুবিয়ে রাজু সামনে তাকাল। ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি গায়ে জড়ানো ষাটোর্ধ্ব লোকটি ইতিমধ্যে কাঠের বেঞ্চে বসে পড়েছেন। গলায় তার লাল মাফলার, বাদামি রঙের শাল গায়ে জড়ানো। হাতের লাঠিটা পাশে রেখে চোখের মোটা ফ্রেমের চশমা খুললেন তিনি। চশমাটা সময় নিয়ে পরিষ্কার করে ঘুরে তাকালেন রাজুর দিকে। অতঃপর প্রশ্ন ছুড়লেন, কাজ রেখে এদিকে কী দেখছো ?
রাজু তৎক্ষণাৎ দুদিকে মাথা নাড়ল। নিজের কাজে মনোযোগ দিয়ে ফের বয়স্ক লোকটির দিকে তাকাল। রাজু এই টং দোকানে কাজ নিয়েছে আজ ছ’দিন। টং দোকানে সকাল বিকেল প্রচুর ভিড় থাকে। সন্ধ্যার পর থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত নানান মানুষ আড্ডা জমায় এখানে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কত লোকের কত গল্প শোনে রাজু। তবে এই দেখতে অসুস্থ বৃদ্ধ লোকটা রাজুর মনোযোগ আকর্ষণ করে এসেছে প্রথমদিন থেকেই।
প্রতিদিন বুড়ো লোকটা শেষ বিকালে এই টং দোকানের কাঠের বেঞ্চে নিজের জায়গা করে নেয়। এ সময়টাতে রাজুর দোকানে তেমন মানুষের আনাগোনা থাকে না। এই সময়ে রাজুর খরিদদার বলতে একমাত্র এই বয়ষ্ক ভদ্রলোক। হয়তো তিনি জানেন, এ সময়ে তার নিশ্চুপ একাকী চায়ের আড্ডায় কেউ বিরক্তির কারণ হবে না। রোজ তিনি দু’কাপ চায়ের সুপারিশ করেন। একলা বসে সময় নিয়ে এককাপ চা শেষ করেন। দ্বিতীয় কাপের চা ততক্ষণে ঠান্ডা শরবত হয়ে যায়। ধীর স্থিরভাবে দুই কাপ চায়ের দাম মিটিয়ে হাঁটতে শুরু করেন নিজ গন্তব্যের দিকে।
রাজুর বড় ইচ্ছে হয় মানুষটার এহেন পাগলামির কারণ জানতে। বুড়ো বয়সে মানুষ কত অদ্ভুত হরকতই তো করে, তবে এমন কিছু করতে কাউকে দেখে নি রাজু। গতদিন মালিককে জিজ্ঞেস করেছিল লোকটার ব্যাপারে, মালিক বিষয়টা উড়িয়ে দিয়েছে। দুই কাপ চায়ের দাম দিচ্ছে এই তো যথেষ্ট, এক কাপ খেয়েছে কি নষ্ট করেছে এতে তার কি আসে যায় ? কত বিচিত্র মানুষই তো আছে এই জগতে, সবার ধার ধারলে কি হয় ?
চা তৈরি! ধোঁয়া ওঠা দু’কাপ চা রাখা হয়েছে বৃদ্ধ লোকের সামনে। তিনি সময় নিয়ে এক কাপ চা শেষ করলেন, যেন কোন তাড়া নেই তার! খানিক পর পাশ থেকে লাঠি তুলে উঠে দাঁড়ালেন। রাজুর সামনে দুই কাপ চায়ের টাকা রেখে পিছু ফিরলেন। পা বাড়ালেন সামনের দিকে; রাজু দোনোমোনো করে পিছু ডাকল—দাদু, একটা কথা ছিল।
লোকটা বেজায় বিরক্তি নিয়ে পিছু ফিরলেন। এ যেন রোজকার নিয়মের বহির্ভূত কিছু। বুড়ো মানুষটার হাবভাবের পরিবর্তন দেখে রাজু ভীত হলেও প্রশ্নটা করেই বসল, এক কাপ চা-ই যখন খাবে, তাহলে দু’কাপ-এর ফরমায়েশ দাও কেন ?
বুড়ো লোকটা একইভাবে কিছু সময় রাজুর দিকে তাকিয়ে রইল। রাজু খেয়াল করল, তার মুখের খিটখিটে ভাবটা হারিয়ে গেছে। কুঁচকানো কপাল শিথিল হয়েছে। বিরক্তি ভরা দৃষ্টিতে কেমন যেন মলিন ভাব দেখা দিয়েছে। তিনি লাঠি ভর দিয়ে আবার কাঠের বেঞ্চে বসলেন। উদাস দৃষ্টিতে রাজুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আরও দুই কাপ চা নিয়ে এসো।
রাজু অবাক চোখে চেয়ে রইল। এই প্রথম লোকটা দ্বিতীয়বার চায়ের ফরমায়েশ করেছে। আবার চুলায় চা বসাল রাজু। চায়ের পানি টগবগ করে ফুটতে লাগল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, সাথে কুয়াশা নিজের চাদরে মুড়িয়ে নিচ্ছে পরিবেশটাকে। একটু পরেই মানুষের আনাগোনা শুরু হবে এই ছোট্ট দোকানে। বৃদ্ধ লোকটা কেশে উঠলেন। দুর্বল হাতে আবারও চশমাটা পরিষ্কার করলেন, পাঞ্জাবির এক কোণের কাপড় দিয়ে। ছানিপড়া ছোট চোখ দুটো পিটপিট করে রাজুকে এক পলক দেখলেন। রাজু দুই কাপ চা নিয়ে গেল লোকটার সামনে। এবারে লোকটা এক কাপ চা রাজুর দিকে এগিয়ে দিলেন। রাজু ইতস্তত করল। তবু গ্রহণ করল এককাপ চা।
কুয়াশাঢাকা অন্ধকার সন্ধ্যায় আলোর একমাত্র উৎস হয়ে উঠল টং দোকানের হলদেটে বাল্ব। সেই আলোতে রাজু দেখল মানুষটার মুখটা যেন আরও গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
আমি আহমেদ। বৃদ্ধ, অসুস্থ, দুর্বল। তবে এই দুই কাপ চায়ের গল্প তখন শুরু হয়েছিল, যখন আমি তরতাজা যুবক। প্রতিদিনের এ দ্বিতীয় কাপ চায়ের অংশীদার, রেশমা। রেশমার বাড়ি পাশের গ্রামে। তার বাবা তেজি মানুষ, নামকরা ব্যবসায়ী। আমি তখন সামান্য স্কুলমাস্টার মাত্র। দুজনের দেখা হতো রাস্তায় যাওয়া-আসার সময়। কথা হতো না তখনো। একদিন, দুজনে সাহস জুটিয়ে এই বেঞ্চটায় দু’পাশে বসে পড়লাম। তারপর থেকেই কাঠের বেঞ্চটা হয়ে গেল আমাদের প্রতিদিনের ঠিকানা। প্রথমে শুধু চোখাচোখি, তারপর সামান্য কথা। ধীরে ধীরে কথার ফাঁকে খালি হতে শুরু করল চায়ের কাপ। এক কাপ থেকে দুই কাপ, কখনো তিন কাপ। কতটা চা খাওয়া হলো, তা গোনার সময় পাই নি। শুধু বুঝেছিলাম, চা খাওয়াটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তারচেয়েও বড় অভ্যাস হয়েছে, রেশমা নিজে।
রাজু ঝুঁকে পড়ে। আহমেদ সাহেব তার চায়ে চুমুক দিলেন। রাজুর চা খাওয়ার ইচ্ছে উড়ে গেছে। তার মনোযোগ আহমেদ নামক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের গল্পে।
তারপর ?
আহমেদ সাহেব হাসলেন। উদাস ভঙ্গিতে বললেন, তারপর কিছুই হয় নি, অথবা হয়তো অনেক কিছু হয়ে গিয়েছিল। একদিন রেশমা জানায়, তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। সেদিনও দুজনে চা খেয়েছিলাম। তবে কেউ একটি কথাও বলি নি। যাওয়ার সময় তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তবে কি, এটাই আমাদের শেষ দেখা ?’
রেশমা হেসেছিল। ওর চোখে একটু অশ্রুও ছিল। বলেছিল, আমরা আবার কোনো একদিন দেখা করব। কোনো এক সন্ধ্যায়, এই চায়ের দোকানে, এই বেঞ্চে।
রাজু ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে, তিনি এসেছিলেন ?
আহমেদ সাহেব একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। গলার মাফলারটা আরেকটু পেঁচিয়ে বললেন, রেশমার স্বামী তাকে নিয়ে ভিনদেশে পাড়ি দেয়। আর আমাকে দিয়ে যায় অপেক্ষাটা...আমি অপেক্ষায় থাকি, রেশমার সাথে আমার আরেকটিবার দেখা হবে। এই চায়ের দোকানে, এই কাঠের বেঞ্চে। রেশমা হয়তো তার কথা রাখতে ফিরবে, আবার একটি সন্ধ্যায় আমরা একসাথে কয়েক কাপ চা শেষ করব।
রাজু এবার কিছু বলতে পারে না। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। আহমেদ সাহেব নিজের চা শেষ করে মূল্য পরিশোধ করলেন। লাঠি হাতে এগিয়ে গেলেন রাস্তার দিকে। রাজু তাকে অন্ধকারে কুয়াশার মাঝে মিলিয়ে যেতে দেখল। আহমেদ সাহেবের চোখের কোণে কোথাও হয়তো হালকা অশ্রু জমা হয়েছিল। তিনি মুছে ফেললেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই টং দোকানে মানুষের আনাগোনা শুরু হলো। রাজু ব্যস্ত হয়ে গেল নিজের কাজে...
পরদিন আবার এলেন আহমেদ সাহেব। বসলেন, দুই কাপ চা চাইলেন, এককাপ খেলেন, অন্য কাপটি ছুঁয়েও দেখলেন না। প্রতিদিন রাজু তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। অসুস্থ লোকটির সঙ্গ যেন সে উপভোগ করতে শুরু করে। রোজ তিনি আসেন, পুনরাবৃত্তি হয় একই ঘটনার। প্রতিদিন রাজু লক্ষ করে আগের থেকে একটু দুর্বল আহমেদ সাহেবকে। আহমেদ সাহেব কথা বলেন না, রাজুও এগিয়ে যায় না। সে শুধু বৃদ্ধের নীরব অপেক্ষা দেখে, অপ্রকাশিত ভালোবাসা দেখে, আর দেখে একপাশে যত্নে রাখা ধোঁয়াউঠা চায়ের কাপ।
একদিন শেষ বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হলো, আহমেদ সাহেব চা খেতে এলেন না। রাজু অস্থির হয়ে চারপাশে তাকাচ্ছিল। প্রথম শেষ বিকালের খালি সময়টা আহমেদ সাহেবের উপস্থিতি ছাড়া কাটিয়ে দিল সে। সন্ধ্যার পর যথানিয়মে চলল রাজুর কাজ। মানুষে ভরে গেল তার ছোট্ট দোকান। কিন্তু রাজুর কাক্সিক্ষত বৃদ্ধ লোকটি এল না।
একদিন, দুইদিন, এক সপ্তাহ। এরপর পেরিয়ে গেল মাস। রাজু এক অদ্ভুত শূন্যতায় ভোগে। নিজের অজান্তে সে শেষ বিকেলে খালি বেঞ্চটাতে তাকায়। অপেক্ষা নামক শব্দটা কেমন যেন অভ্যাসে পরিণত হয় তারও। শীত পেরোয়, খালি বেঞ্চে শুকনো পাতা উড়ে এসে পড়ে। তবু রাজুকে কেউ দুই কাপ চা দিতে বলে না। শেষ বিকেলের সেই সময়টায় রাজুর দোকানের চুলা জ্বলে না।
অতঃপর একদিন, এমনই এক শেষ বিকেলের সময়ে, এক সাদা চুলের বৃদ্ধা মহিলা টং দোকানের সামনে এসে দাঁড়ান। শাড়ি তাঁর পরিপাটি, চুল আঁচড়ানো, চোখে হালকা কাজল। তিনি খালি বেঞ্চের ওপর থেকে পাতা ঝেড়ে একপাশে বসেন। রাজুকে উদ্দেশ করে বলেন, দুই কাপ চা দাও তো ছেলে।
কাচের গ্লাসে চা ঢালতে ঢালতে রাজুর চোখে অশ্রু জমে। রাজু জানে না তার মন ভারী হওয়ার কারণ, তবে সে কিছু বলে না। চুপচাপ ট্রেতে করে দু’কাপ চা রাখে সেই কাঠের বেঞ্চে। বৃদ্ধা এক কাপ হাতে তুলে নেন। আরেকটা কাপ ছুঁয়েও দেখেন না। একা একা বসে থাকেন অনেকক্ষণ। চা ঠান্ডা হয়ে যায়...
রাজু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের দিকে। নিভু নিভু আওয়াজে প্রশ্ন করে,
কারও জন্য অপেক্ষা করছেন ?
বৃদ্ধা রাজুর দিকে তাকান। তার চোখ হালকা ঝাপসা হয়, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি নিয়ে মাথা নাড়েন...
Leave a Reply
Your identity will not be published.