যেভাবে তৈরি হলো ‘মনপুরা’

যেভাবে তৈরি হলো ‘মনপুরা’

মন কেমন করা একটি চলচ্চিত্র ‘মনপুরা’। প্রেমের ছবি। দুজন মানব-মানবীর ভালোবাসার গল্প। সোনাই ও পরীর প্রেমের উপাখ্যান। ব্যথা জাগানিয়া একটি দীর্ঘশ্বাস। হাহাকার বয়ে যাওয়া হৃদয় জমিন। মর্মন্তদ ঘটনার কাহিনি। একটি ট্র্যাজিডির নাম। এই ছবি নির্মাণের নেপথ্য গল্প থাকছে এই রচনায়।

‌'অন্যদিন ঈদ ম্যাগাজিন ২০২১’ পড়তে এখানে ক্লিক করুন...

‘মনপুরা’ গানের ছবিও। এ দেশের মাটির মানুষকে যে গান আলোড়িত করে, সেই গান শোনা গেছে এ ছবিতে। জীবনের গল্পের সঙ্গে হৃদয়স্পর্শী অভিনয়ও এ ছবিতে প্রত্যক্ষ করেছে দর্শক। বলাই বাহুল্য, তা ক্যামেরার ভাষায়। মিশ্র মাধ্যম চলচ্চিত্রের নান্দনিক সৌন্দর্যও ‘মনপুরা’তে ফুটে উঠেছে।

‘মনপুরা’ মূলধারার মধ্যেই ভিন্ন কিছু করার প্রচেষ্টা। এ ছবিতে যারা অভিনয় করেছেন তারা সবাই ছোটপর্দার অভিনয়শিল্পী। তারপরও ছবিটি দর্শকদের মন জয় করছে। এখানেই এ ছবিটির সার্থকতা।

কাহিনিধারায় দেখা যায়- গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের কর্ণধার গাজী সাহেব। তার স্ত্রী আনু বিবির সঙ্গে স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক নেই। একমাত্র জোয়ান ছেলে হালিমের মাথা খারাপ। শখ করে গাজী সাহেব ছেলেকে আর্মিতে দিয়েছিলেন, কিন্তু ক্রমে ট্রেনিংয়ের সময় তার মাথা খারাপের লক্ষণ দেখা দেয়।

এদিকে সোনাই গাজী সাহেবের বাড়িতে খেয়ে পরে মানুষ। বাবা-মা নেই। অনাথ। সে গাজী সাহেবের বাড়িতে থেকে ফুট-ফরমাশ খাটে আর হালিমের দেখভাল করে। এক কথায় হালিমের কেয়ারটেকার। কোনো-এক বৃষ্টির রাতে মাখা খারাপ হালিম উন্মুক্ত অবস্থায় কাজের মেয়ে রহিমা বিবিকে খুন করে ফেলে। এরকম পরিস্থিতিতে আনু বিবির পরামর্শে গাজী সাহেব সোনাইকে এই খুনের দায়ভার নিতে অনুরোধ করে। সোনাই তার মনিব গাজী সাহেব কথা ফেলতে পারে না। সে দেশান্তরি হয়। মনপুরা দ্বীপে সোনাইয়ের নির্বাসিত জীবন শুরু হয়। মনপুরা গাজীর মালিকানাধীন আট-দশ একরের নতুন দ্বীপ।

মনপুরা দ্বীপে নিঃসঙ্গতা সোনাইয়ের অসহ্য বোধ হয়। তার কোনো নৌকা নেই, কথা বলার মতো মানুষ নেই। অবস্থা এতই চরমে পৌঁছে যে, সে নিজে নিজে কথা বলে, নিজেই সেই কথার উত্তর দেয়। সে কথা বলে খাঁচার পোষা ময়না পাখির সঙ্গে; কথা বলে ছাগল ও গরুর সঙ্গেও।

পরী হাকিম মাঝির মেয়ে। তরুণী পরী বাবাকে মাছ ধরার কাছে সাহায্য করে। একদিন পরীদের নৌকা মনপুরা’র তীর ঘেঁষে মাছ ধরার সময় সোনাই এবং পরীর দেখা হয়। এবং প্রথম দেখাতেই দুজন দুজনের প্রেমে পড়ে। অন্যদিকে শশধরের পীর সাহেব মাথা খারাপ হালিমকে সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয়। সোনাই এবং পরীর প্রণয় এগিয়ে চলে এবং একদিন গাজী সাহেব মনপুরায় এসে পরীকে দেখে হালিমের জন্য পছন্দ করে ফেলে গরিবের সুন্দরী কন্যা। বড় ঘরে হালিমের জন্য মেয়ে পাওয়া যাচ্ছিল না। সোনাইকে একথা জানাতেই সে বেঁকে বসে। হালিমের দোষ নিজ কাঁধে নিয়ে সে ভয়ে ভয়ে জীবন কাটাচ্ছে, এখন তার প্রেমিকাকেও ছিনিয়ে নিতে চায়! সে তার হতাশা ভরা হৃদয়ের কথা ব্যক্ত করে। গাজী সাহেব সোনাইয়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। এবং কথা দেন, সোনাইয়ের জন্য প্রস্তাব নিয়ে তিনি পরীদের বাড়ি যাবেন। সত্যি সত্যি তিনি এটি করেন। কিন্তু পরীর বাবা হাকিম মাঝি মনে করেন, তার মাথা খারাপ ছেলে হালিমের জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন তিনি। হাকিম মাঝি আগ বাড়িয়ে সমস্ত সম্পত্তি পরীর নামে লিখে দেওয়ার শর্ত দেয়। গাজী সাহেব রাজি হন। পরী ও সোনাই এ সিদ্ধান্ত কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। দুজন পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু পুলিশ এসে সোনাইকে ধরে নিয়ে যায়।

সোনাই যখন কারাগারে, তখন পরীর সঙ্গে হালিমের বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু পরী কিছুতেই স্বামী হিসেবে হালিমকে মেনে নেয় না। হালিমও কোনো ঝামেলা করে না। আনু বিবি ও গাজী সাহেব শলাপরামর্শ করে মিথ্যে প্রচার করে- নির্দিষ্ট দিনে সোনাইয়ের ফাঁসি হবে। এ কথা শুনে পরী আত্মহত্যা করে। অন্যদিকে জেল থেকে ছাড়া পায় সোনাই। সে যখন গ্রামে এসে পৌঁছায় এবং শোনে যে পরী আত্মহত্যা করেছে, তখন তার পুরো পৃথিবী দুলে ওঠে। সোনাই আবার দেশান্তরি হয়।

‘মনপুরা’তে আবহমান বাংলার মানুষের প্রেমই মূর্ত হয়ে উঠেছে। এ দেশের মানুষ হা হা করে হাসে। হু হু করে কাঁদে। তাদেরকে তাড়িত করে আবেগ। তাদের সঙ্গে সুন্দর প্রেমই এ ছবিটিতে পরিস্ফুটিত। যেমন যখন পরী জিজ্ঞেস করে সোনাইকে, বাড়িতে তোমার কে আছে? সোনাই বলে, বাড়ি-ধান জমি গাঙ্গের পেটে। জগৎ সংসারে আমি একা মানুষ।...পরী: এখনো একা তুমি? লগে আমি নাই? সোনাই: হাছাই তো আমি আর একা নাই।...লগে তুমি আছো। আমরা দুজন মিলে মিলে এক হলাম। পরী: সত্য? সোনাই: সত্য।...এই গাঙ্গ সাক্ষী...গাঙ্গের ঢেউ সাক্ষী। এই যে ভাষা, প্রেম প্রকাশের ধরন, তা এ দেশের জলমাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। হাজার বছরের বাংলাদেশ এখানে কথা কয়ে ওঠে।

‘মনপুরা’র গল্পে গ্রীক উপাখ্যান ‘হিরো এন্ড লিয়ান্ডা’র ছোঁয়া আছে। এই উপাখ্যানে দেখা যায় দুই তরুণ-তরুণী তারা সমুদ্রের দুই পাড়ে বাস করে। তারা পরস্পর প্রেমে আসক্ত হয়। মেয়েটি এক উঁচু টাওয়ারে বাস করে। যেখান থেকে সে রাতের বেলায় জ্বলন্ত মশাল তুলে ধরে। সেই আলো লক্ষ্য করে ছেলেটি সাঁতরিয়ে এপারে আসে। মেয়েটির সঙ্গে মিলিত হয়। একদিন মেয়েটি টাওয়ার থেকে মশালের আলো দেখিয়ে ছেলেটিকে দিকনিদের্শনা নিচ্ছে, ছেলেটি সেই আলো লক্ষ্য করে সাঁতরাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। মশালের আলো দপ করে নিভে যায়। ফলে ছেলেটি বেদিশা হয়ে পড়ে। লক্ষ্যহীন সাঁতরাতে থাকে। পরদিন সকালে দেখা যায়, সমুদ্রপাড়ে ছেলেটির মৃতদেহ পড়ে আছে। এটি দেখে মেয়েটি টাওয়ারের ছাদ থেকে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মারা যায়। এই গল্পের সঙ্গে মনপুরার কোনো মিল নেই। শুধু একটি সিকোয়েন্সে গ্রীক উপাখ্যানের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্য লক্ষ করা যায় এবং সেটি হলো এই যে, সোনাই এবং পরী দুজন পালিয়ে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। যেহেতু নিজ গ্রামের নদী তীরে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত মশাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে পরী, যেন সেই আলো লক্ষ্য করে সাঁতরিয়ে সোনাই পৌঁছাতে পারে। কিন্তু সেই সময় মনপুরা দ্বীপে পুলিশ হাজির হয় এবং সোনাইকে ধরে নিয়ে যায়। পরী এইসব কিছুই জানতে পারে না। সে বাড়ি ফিরে যায়।

‘মনপুরা’কে শুরুতে টিভি নাটক হিসেবে লিখেছিলেন গিয়াসউদ্দিন সেলিম, ১৯৯৭ সালে। সেই সময় পরীর চরিত্রে সিলেক্ট করেছিলেন আফসানা মিমিকে। কিন্তু আফসানা মিমি নাটকের স্ক্রিপ্ট পড়ে সেলিমকে বলেছিলেন, এটি কিন্তু সিনেমা হতে পারে। তুমি এটি রেখে দাও। পরে সিনেমা করো। মিমি’র মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন গিয়াসউদ্দিন সেলিম। তিনি স্ক্রিপ্টটি রেখে দিয়েছিলেন সিনেমা তৈরি করার জন্য।

‘মনপুরা’ নির্মাণে সেলিম হাত দেন ২০০৭ সালে। এর আগে তিনি অনেকবার ছবিটির স্ক্রিপ্টের ঘষামাজা করেছেন। পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন।

শুরুতে ‘মনপুরা’র প্রযোজক ছিলেন এনটিভি। প্রাথমিক অর্থ সংস্থান তারাই করেছিলেন। কিন্তু এনটিভিতে আগুন লাগার ফলে এনটিভি কর্তৃপক্ষ পিছিয়ে যায়, তারা মনপুরা প্রযোজনায় অপরাগতা প্রকাশ করে। ফলে গিয়াসউদ্দিন সেলিম নিজের এবং কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছবিটি নির্মাণে হাত দেন। একপর্যায়ে আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হন তিনি। ফলে সেলিম স্কয়ার-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী পিন্টুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি এক কথায় রাজি হয়ে যান। স্কয়ার তথা মাছরাঙা প্রোডাকশন অর্থ বিনিয়োগে করায় ছবি নির্মাণের বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে পড়ে।

দেশের কয়েকটি জায়গায় শুটিং করেছেন গিয়াসউদ্দিন সেলিম। যেমন, মনপুরা দ্বীপের লোকেশন ছিল বগুড়ার যমুনার চর, পরীদের বাড়ি পুবাইল, হালিমদের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারপাড়া এবং জেলের সিকোয়েন্সের শুটিং হয় ঢাকার এফডিসিতে।

পরী চরিত্রের জন্য ফার্স্ট চয়েজ ছিলেন আফসানা মিমি। গত শতকের নব্বই দশকের শেষ পর্যায়ের কথা বলছি। অতঃপর জয়া আহসান, তারপর প্রভা সবশেষে ফারহানা মিলি। মিলিই রূপালি পর্দায় পরীকে জীবন্ত করে তুলেছেন।

 সোনাই চরিত্রের জন্য গিয়াসউদ্দিন সেলিম প্রথমে ভেবেছিলেন রিয়াজকে। যখন পরীর চরিত্রে সেলিম জয়াকে ভেবেছিলেন তখন তার বিপরীতে মানানসই মনে হচ্ছিল জয়াকে। কিন্তু তা না হওয়ায় পরে চঞ্চল চৌধুরীকে সিলেক্ট করেন সোনাই চরিত্রে।

মনপুরার অন্যান্য প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মামুনুর রশীদ (গাজী সাহেব), শিরিন আলম (আনু বিবি), ফজলুর রহমান বাবু (হাকিম মাঝি), মুনির খান শিমুল (হালিম)। এইসব অভিনয়শিল্পীকে ছবিটি নির্মাণের কিছুদিন আগে নির্বাচিত করেন সেলিম। অন্যসব কলাকুশলী সেলিমের পরিচিত, দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে কাজ করেছেন।

ছবিতে গান রয়েছে পাঁচটি। এই গানগুলো হলো নিধুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুরে, যাও পাখি বলো তারে, আমার সোনার ময়না পাখি, আগে যদি জানতাম, সোনাই হায় হায়রে। চারটি গান লিখেছেন কৃষ্ণকলি এবং গিয়াসউদ্দিন সেলিম। একটি সংগৃহীত। আর গানগুলোতে সুর দিয়েছেন বা সঙ্গীতায়োজন করেছেন অর্ণব। তার কাজ চমৎকার। দর্শক-শ্রোতার কান তৃপ্তি পেয়েছে। হৃদয় স্পর্শ করেছে। এক্ষেত্রে অবশ্য কণ্ঠশিল্পীদেরও অবদান রয়েছে। গানগুলো গেয়েছেন চন্দনা মজুমদার, মমতাজ, কৃষ্ণকলি, ফজলুর রহমান বাবু এবং চঞ্চল চৌধুরী।

 একটি প্রেমের ছবি নির্মাণ করতে চেয়েছেন গিয়াসউদ্দিন সেলিম। এ ধরনের ছবি করা কঠিন। কেননা দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করা সহজ নয়। আর প্রেম যেমন করতে চাইলেই করা যায় না, তা হয়ে যায়। প্রেমের ছবিও করা যায় না, সেটি হয়ে ওঠে। মনপুরার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এটি প্রেমের ছবি হয়ে উঠেছিল। ফলে দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করতে পেরেছে।

২০০৭ সালের মে মাসে ‘মনপুরা’র ক্যামেরা ওপেন হয়। প্রথম শটটি ছিল মনপুরা দ্বীপে সোনাই। ময়নাসহ খাঁচা এবং জিনিসপত্র নিয়ে শনে বাঁধা ঘরের দিকে যাচ্ছে। ছবিতে আমরা তখন নেপথ্যে শুনতে পাই ‘নিধুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুরে’ এই গানটি। প্রায় পঞ্চাশ দিন বিভিন্ন জায়গায় যমুনার চর, কুষ্টিয়া, পুবাইল এবং এফডিসিতে ছবিটির শুটিং হয়েছে। প্রায় বছরখানেক লেগেছে।

দ্বীপের সবুজ ঘাসের ওপরে শুয়ে আছে সোনাই এবং পরী- টপ শটে ক্যামেরাবন্দি হয়েছে ওরা দুজন। এই শটটি নেওয়া হয়েছে যমুনা চরে। ওপরে দাঁড়ান ক্রেনের মাধ্যমে। আরেকটি টপ শট রয়েছে ছবিটির শেষে। দেখা যায় গন্তব্যহীন যাত্রা করছে সোনাই। এই টপ শটটি ধারণ করা হয়েছে কুষ্টিয়ার গড়াই ব্রিজের ওপর থেকে।

পুরো ছবিটির শুটিং করেছেন সবাই আনন্দের সঙ্গে। অনেক সময় কোনো শট ধারণ করার সময়ও কলাকুশলীরা মজা পেয়েছেন। যেমন, মনপুরা দ্বীপে খাসি ধরার জন্য সোনাই ও সারেং চাচা ছুটছে ওদের পেছনে। কিন্তু বরাবরই খাসিরা ফাঁকি দিচ্ছে সোনাই ও সারেংকে। শটটি ক্যামেরাবন্দি করার সময় কলাকুশলীরা ভীষণ মজা পেয়েছেন।...শুটিংয়ের এ রকম নানা মজার গল্প রয়েছে।

অবশ্য ভয়াবহ অভিজ্ঞতাও রয়েছে গিয়াসউদ্দিন সেলিমের। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যমুনা চরে শুটিং করার সময় খাড়িতে কাঠের তৈরি বজরা, যার নাম ছিল আন্ধার মানিক- সেটি রেখে চলে যেতাম শুটিং করার জন্য। তখন ছিল ঝড়বৃষ্টির সময়। একদিন বিকেলবেলা চরে শুটিং করছি। এই সময় কালবৈশাখীর মুখোমুখি হলাম। আর চরাঞ্চলে কালবৈশাখীর তাণ্ডব যে কী ভয়াবহ হয় তা ভুক্তভোগীরাই জানেন। যাহোক, প্রচণ্ড ঝড়ের সময় চরে দাঁড়িয়ে আছি আমি, আমার স্ত্রী এবং শিল্পী-কলাকুশলীরা। এই সময় লক্ষ করলাম যে আন্ধার মানিক ছুটে চলেছে অন্যদিকে। আমি জোরে চিৎকার দিলাম। মাঝির নাম ধরে ডাকলাম। কিন্তু সে  কর্ণপাত করল না। আমি তখন টেনশনে ভুগছি। কেননা ওই বজরার ভেতর ছিল আমার দুই ছেলে। ওদের কী হলো-সেই কথা ভেবে আমি তখন পেরেশান। যদিও নৌকার মাঝি ছিল বিশ্বস্ত, তবু পিতৃহৃদয় কি উদ্বেগমুক্ত থাকে? বাৎসল্য কাকে বলে, সেটি ভীষণভাবে সেদিন টের পেয়েছিলাম। যাহোক, ঝড় থেমে যাওয়ার পর আন্ধার মানিকের দেখা পেলাম। দেখা পেলাম সেই মাঝি এবং আমার দুই ছেলের। তখন আমি রাগে ফুঁসছি। বেইমান বলে মাঝির দিকে এগিয়ে গেলাম। সে তখন আমাকে বুঝিয়ে বলল যে, মাঝি জীবনে প্রথম শিক্ষা হলোই যে ঝড়ের সময় আগে নৌকাকে রক্ষা করতে হবে। তারপর অন্যদিকে দৃষ্টিপাত। সেই তাই করেছিল। আগে নৌকাকে রক্ষা করেছে। আর সেটি করেছে বলে আমার পাঁচ ও দশ বছর বয়সী দুই সন্তান অক্ষত আছে।’

‘মনপুরা’ নির্মাণ করতে গিয়ে সমস্যার মুখোমখি হতে হয়েছে গিয়াসউদ্দিন সেলিমকে। ছবির ফিল্ম পরিস্ফুটনের কাজ হয়েছে ভারতের চেন্নাইয়ের একটি ল্যাবে। তো ল্যাবে পাঠানোর আগে ক্যান বন্দি ফিল্ম স্কেন করে পাঠানো হতো। দেখা গেল যে, আলো ঢুকে যাওয়ায় ফিল্মগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। তাই এই ছবির কিছু অংশ রি-শুট করতে হয়েছে। আর তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, স্কেন না করেই ফিল্ম পাঠাতে হবে চেন্নাইতে। এরকম নানা সমস্যায় ভুগতে হয়েছে গিয়াসউদ্দিন সেলিমকে। তার ভাষায়, একটা বিল্ডিং বানাতে যেমন নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় একটি ছবি নির্মাণ করতে গেলেও নানা ক্রাইসিস ফেস করতে হয়।

চলচ্চিত্র তৈরির বিষয়টি একটি টিমওয়ার্ক। পরিচালকের কাজ হলো স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্নটি বিভিন্ন মানুষের সহায়তায় জীবন্ত করে তোলা। তাই সিনেমাটোগ্রাফি, এডিটিং, মিউজিক, সাউন্ডÑনানা বিভাগের মানুষের কাজকে সমন্বয় করেছেন গিয়াসউদ্দিন সেলিম। ফলে একটি ঐকতান সৃষ্টি হয়েছে; দর্শক-হৃদয় জয় করা একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

একটি সিকোয়েন্সে দেখা যায়, গাজী সাহেবের বাড়িতে এসেছে শশধরের পীর সাহেব। তিনি একটি ঘরে খাটের ওপরে বসে আসেন। গাজী সাহেবের সঙ্গে হালিম প্রবেশ করে সেই ঘরে। পীর সাহেব তার পায়ের শিকল খুলে দিতে বলেন। তাঁর নির্দেশ পালিত হয়। অতঃপর বাবা সালাম দিতে বললে হালিম সামরিক কায়দায় পীর সাহেবকে স্যালুট দেয়। পীর সাহেব তাকে বসতে বললে সে খাটের ওপরে গিয়ে পীর সাহেবের মতোই বসে, তার মতোই  তসবি জপে, বুকে ফুঁ দেয়। পীর সাহেব গাজী সাহেবকে নির্দেশ দেন হালিমকে শিকলবদ্ধ করার জন্য। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দৃশ্য। এখানে পীর সাহেবের ভণ্ডামি সূক্ষ্মভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে। গিয়াসউদ্দিন সেলিম অবশ্য বলেন অত ভেবেচিন্তে তিনি সিকোয়েন্সটি তৈরি করেন নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী ওই সিকোয়েন্সে কিছু সংলাপ তিনি বাদ দিয়েছেন সেন্সর বোর্ডের কথা চিন্তা করে। অই সংলাপগুলোতে ফুটে উঠেছিল একথাই যে গাজী সাহেব বড় শখ করে হালিমকে আর্মিতে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে কঠিন ট্রেনিং-এর কারণে তার মধ্যে স্কিজোফ্রেনিয়া দেখা দেয়। বলা যায়, সামরিক বাহিনীতে কঠিন ট্রেনিং ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন পরিচালক-চিত্রনাট্যকার গিয়াসউদ্দিন সেলিম। কিন্তু তখন দেশে ছিল সামরিক শাসন। সেন্সর বোর্ড হয়তো ছবিটিকে আটকে দিবে এই চিন্তা করে সেলিম সংলাপগুলো বাদ দিয়ে দেন।

‘যাও পাখি বলো তারে’ এই গানের একটি অংশের (‘মেঘের ওপর আকাশ ওড়ে/নদীর ওপর পাখির বাসা’) চিত্রায়নে এটিই ফুটে উঠেছে বা পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে- সোনাই ও পরীর মিলন হবে না, মুক্ত আকাশের মতোই তাদের সম্পর্ক। এ প্রসঙ্গে গিয়াসউদ্দিন সেলিম বলেন, ‘সচেতনভাবে এমনটি করি নি, হয়ে গেছে। আসলে সোনাই ও পরী দুজন দুজনের যে প্রেমে পড়েছে, দুজনের জন্য দুজনের যে আর্তি সেটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি আমি।’

‘মনপুরা’য় দেখা যায় যে পরীকে দেখার পর তার প্রেমে পড়ে সোনাই। তারপর শয়নে স্বপনে জাগরণে সে শুধু পরীর কথাই ভাবে। খাঁচায় আবদ্ধ ময়নার সঙ্গে কথা বলে। তাকে জিজ্ঞেস করে, আকাশের পাখি আর জলের মাছেরাও কি প্রেমে পড়ে? বলা যায়, প্রেমে পড়ে সোনাই দার্শনিক হয়ে ওঠে। একজন সাধারণ মানুষও যে গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে সোনাই চরিত্রের মধ্য দিয়ে গিয়াসউদ্দিন সেলিম সেটিই দেখিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দৈনন্দিন জীবনে মানুষের চিন্তার গভীরতা অনেক বেশি-এ তো আমরা চারপাশের মানুষকে লক্ষ করলেই বুঝতে পারি।’

এ ছবিতে সোনাই ও পরীর প্রেম প্রকাশের যে ধরন, তা এ দেশের জলমাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। অন্যকথায়, আমাদের এই সমতট অঞ্চলের তথা আবহমান বাংলার মানুষেরা কীরকমভাবে প্রেমে পড়ে, সম্পর্ক গড়ে তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ভাষ্য হলো: ‘সচেতনভাবে এমনটি আমি করি নি, অংকের মতো হিসাব করে করি নি, অনেক চিন্তা-ভাবনা করেও করি নি। এমনটি হয়ে গেছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়ে গেছে।...তবে আমার যে বোধ, আমার যে ফিলসফি তা হয়তো এই ছবির চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে আমি প্রকাশ করতে চেয়েছি।’

‘আমার সোনার ময়না পাখি’র চিত্রায়ণ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন মাত্রার ভিন্ন স্বাদের। এখানে একটি জায়গায় দেখা যাচ্ছে পরী মনপুরা দ্বীপের ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে। সে মাথার খোঁপা খুলে ফেলল। তখন সাউন্ডট্রাকে শোনা যায় কানের দুলের শব্দ। আবার দেখা যায় লম্বা ঘাসের মধ্যদিয়ে বয়ে যাচ্ছে বাতাস- তখন বাতাসের শব্দ শোনা যায়। ফলে দৃশ্যটি অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে ওঠে। এর কৃতিত্ব গিয়াসউদ্দিন সেলিম দিতে চান সাউন্ড ডিজাইনার জুয়েলকে।

শুরুতে ‘মনপুরা’ দেশের মাত্র ছয়টি হলে মুক্তি পেয়েছিল। পরে দর্শক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে হলের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এই সিনেমা ব্যবসার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। ঢাকার বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে একটানা নয় মাস ছবিটি চলেছিল। অন্যদিকে বলাকা সিনেমাহলে চলেছিল ছয়মাস। তবে গিয়াসউদ্দিন সেলিম বলেন, ‘মনপুরা থেকে যে অনেক-অনেক টাকা আমরা পেয়েছি এটি ঠিক নয়। ছবিটির নির্মাণ খরচ দুই কোটি টাকা। হয়তো খরচ উঠে এসেছিল। সামান্য লাভও হয়েছিল আমাদের।’

ছবিটি মুক্তি পাওয়ার সব শ্রেণীর দর্শকের মন জয় করে। বোদ্ধা দর্শকদের অনেকে প্রশংসা করে। যেমন আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একদিন গিয়াসউদ্দিন সেলিমকে বলেছিলেন: ‘তোমার ছবিটি আমি দু’বার দেখেছি।’ এদেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতা প্রয়াত হুমায়ূন ফরীদির ছবিটি ভীষণ ভালো লেগেছিল। আর আফজাল হোসেন তো ছবিটি মুক্তির আগেই একটি চমৎকার লেখা লিখেছিলেন ‘প্রথম আলো’তে।

 

Leave a Reply

Your identity will not be published.