[‘অন্যপ্রকাশ লাখ পেরিয়ে উদযাপন গল্পলেখা প্রতিযোগিতা’-য় নবম স্থান অধিকার করেছে খাদিজা আক্তারের গল্প ‘নীলচে সন্ধ্যার প্রতিজ্ঞা’। গল্পটি এখানে প্রকাশিত হলো।]
ঢাকার এক পুরোনো ভাড়া বাসায় থাকেন নূরজাহান। বাসাটি খুবই সাধারণ—টিনের ছাউনি, এক চিলতে বারান্দা, পুরোনো কাঠের দরজা, আর জানালার ওপারে আধা ঝাপসা রেললাইন। তবে এই সাদামাটা জায়গাটিই যেন তার যুদ্ধের দুর্গ। এই ছোট্ট ঘরেই প্রতিদিন সে নতুন করে বাঁচার সিদ্ধান্ত নেয়।
নূরজাহান, ২৮ বছরের একলা মা। ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে বাসায় বসেই কাজ করেন। প্রতিদিন ঘুম ভাঙে সকাল সাড়ে ছয়টায়, একটা কড়া কালো চায়ের কাপ আর অগোছালো বিছানার পাশে ছড়িয়ে থাকা রঙিন খাতা ও পেন্সিল দেখে বোঝা যায়—তার দিন শেষ হয় গভীর রাতে।
তার আট বছরের ছেলে, ইহান, অটিজমে আক্রান্ত। খুব স্পর্শকাতর—শব্দের প্রতি, আলো ও স্পর্শের প্রতিও। কোনো বড় আওয়াজ সে সহ্য করতে পারে না, হঠাৎ হঠাৎ চিৎকার করে, আবার কখনো চুপ করে বসে রঙিন কাগজে আঙুল দিয়ে চাঁদ আঁকে। সে কথা বলতে পারে, কিন্তু কম—তার কথা সীমিত, আবেগ গভীর।
তিন বছর আগে ইহানের বাবা, কামরুল, এক ভোরবেলায় হঠাৎ ঘর ছেড়ে চলে যায়। না কোনো চিঠি, না কোনো কৈফিয়ত। নূরজাহান প্রথমে ভেবেছিল—হয়তো রাগ করে গেছে, রাতে ফিরে আসবে। কিন্তু না—দিন পেরোয়, মাস পেরোয়—সে আর ফিরে আসে নি। শুধু থেকে যায় তার পরিবারের অবজ্ঞা আর সমাজের অসহ্য ফিসফাস।
স্বামী রেখে চলে গেছে ? নিশ্চয় কিছু করেছে মেয়েটা। বাচ্চাটা অমন হয়েছে বুঝি ? ওরে দেখলেই ভয় লাগে!
এইসব শব্দ গায়ে লাগত নূরজাহানের। কখনো মুখে কিছু বলত না, শুধু গভীর রাতে কাঁথার নিচে মুখ গুঁজে কাঁদত। কিন্তু কাঁদা শেষ হলে আবার ঘুরে দাঁড়াত—পরদিন সকালটা তো আসবেই।
শুরু হয় নতুন অধ্যায়
ছেলেকে নিয়ে নূরজাহান চলে আসেন ঢাকা শহরে। শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। ছেলেকে একটা সরকারি স্কুলে ভর্তি করেন। একটা এনসিড’র মাধ্যমে গ্রাফিক ডিজাইন প্রশিক্ষণ নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন।
একদিন ইহানের স্কুলে নতুন একজন শিক্ষক আসেন—সামির আহমেদ। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, চোখে চশমা, শান্ত ও স্থির ব্যক্তিত্ব। প্রথম মিটিং-এ দেখা হয় তার সঙ্গে। অন্য শিক্ষকরা যেভাবে তাড়াতাড়ি বলত—আপনার ছেলেকে নিয়ে বিশেষ স্কুলে যান, এখানে আমাদের পক্ষে আর সম্ভব না—সামির একদমই তা করেন নি।
বরং নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আপনার ছেলে শব্দ বুঝে না ঠিক, কিন্তু রঙে তার অনুভূতি অসাধারণ। আপনি ওকে আঁকতে দিন। রং তার ভাষা।
সেই মুহূর্তে নূরজাহান যেন একটু থেমে যায়। এতদিনে প্রথম কেউ তার ছেলেকে ‘সুবিধাবঞ্চিত’ না বলে ‘সৃজনশীল’ বলল।
এরপর সপ্তাহখানেক পর সামির একদিন ফোন করেন—আপনি ইহানকে প্রতিদিন সকালে ওর পছন্দের রং দিয়ে দিন শুরু করতে দিন। সেটা ওর মন শান্ত রাখবে।
নূরজাহান বিস্ময়ে ভরে যায়। এই লোকটা কেন এত আন্তরিক ? কেন তার প্রতি, তার ছেলের প্রতি এত মনোযোগ ?
একদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে পাড়ার এক মহিলা কটাক্ষ করে বললেন, এই সেই বাচ্চাটা ? কান্না করে পাগল বানায় চারপাশ! আর মা ? সারা দিন মোবাইলে নাটক দেখেন!
নূরজাহান থেমে যায়। মুখে কিছু না বলে ছেলের হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলে। ভেতরে যেন জ্বলে ওঠে আগুন। সেদিন রাতে সামিরকে মেসেজ করেন—দীর্ঘ একটা মেসেজ। যেখানে কাঁদতে কাঁদতে লেখেন—আমি কি খারাপ মা ? আমি কি যথেষ্ট করছি ? কেন সবাই আমাকে সন্দেহের চোখে দেখে ?
সামির উত্তর দেন কেবল চার শব্দে—আপনি তো হিরো, নূর।
নূরজাহান সেই মেসেজটা অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে দেখেন। চারটি শব্দই যেন আশার মশাল হয়ে জ্বলে উঠে তার ভেতরে।
সেই বিকেলটা ছিল ভীষণ অস্বাভাবিক। আকাশজুড়ে ছিল হালকা ধূসর, বৃষ্টির পর একটু কুয়াশা নেমেছিল। নূরজাহান বারান্দায় কাপড় তুলতে গিয়ে হঠাৎ দেখে, ঘরে ইহান নেই। দরজা আধখোলা, ঘরে অন্ধকার। বুকের ভেতরটায় হিম ঠান্ডা নেমে আসে।
ইহান! ইহান!
পাগলের মতো ছুটে বেড়ায় সে। পাড়ার দোকান, স্কুল, পার্ক—কোথাও নেই। চারপাশের লোকেরা কেবল তাকায়, কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় না।
ঠিক তখন, সামিরের ফোন—নূর! স্কুলের গ্যালারির নিচে একটা ছেলে বসে আছে। আমি ইহানের নাম ধরে ডাকতেই সে তাকাল।
নূরজাহান দৌড়ে যায়। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে। জীবনে প্রথমবার, নূরজাহান হাঁটু গেড়ে বসে, মাটিতে মুখ গুঁজে কাঁদে। কোনো শক্ত হয়ে থাকা আর দরকার নেই সেদিন।
সেদিন সন্ধ্যায়, সামির তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। তিনি কিছু বলেন না প্রথমে। তারপর শুধু বলেন—আপনি একা নন, নূর। আর কখনো একা হবেন না।
নূরজাহান চমকে তাকান। এতদিনের অভ্যাস—কাউকে বিশ্বাস না করা, কারও সাহায্য না চাওয়া। কিন্তু এবার যেন মন বলল—বিশ্বাস করো।
সেই রাতে, ছেলের মাথায় হাত রেখে, নিজেকে প্রতিজ্ঞা করান—আমি শুধু ইহানের জন্য না, আমার মতো সব মায়েদের জন্য কিছু করব। যেন তারা আর কোনোদিন এই একাকিত্বে ভেঙে না পড়ে।
ছয় মাস পরের এক সকাল। জানালার পাশে বসে নূরজাহান চা খাচ্ছেন। ছেলেকে ছোট্ট একটা আর্ট ক্লাসে পাঠিয়েছেন। সেখানে ও নিজে নিজে রং ব্যবহার করে, নিজের কল্পনায় ছবি আঁকে।
নূরজাহান এখন আর শুধু ফ্রিল্যান্সার নন। তিনি একটি ডিজাইন স্টুডিও খুলেছেন—নাম দিয়েছেন: ‘নীল প্রতিজ্ঞা’। এই স্টুডিওতে শুধু ক্লায়েন্টের কাজই নয়, কর্মশালাও হয়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের মা’দের শেখানো হয় ডিজাইন, ফ্রিল্যান্সিং এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। তাদের জন্য ফধুপধৎব ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃও রাখা হয়, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
এই জায়গাটা যেন নূরজাহানের দ্বিতীয় জীবন। আর সামির ? তিনি এখন শুধু শিক্ষক নন, বন্ধু, সহচর, একজন বিশ্বাসযোগ্য কাঁধ।
একদিন বিকেলে, ছাদে দাঁড়িয়ে নূরজাহান দেখেন, আকাশজুড়ে নীলচে আলো। হালকা বাতাসে উড়ছে তার ওড়না। সামির এসে পাশে দাঁড়ান।
তোমার সেই প্রতিজ্ঞা আমাকে বদলে দিয়েছে, নূর—সামির বলে।
নূরজাহান তাকিয়ে মুচকি হাসেন। তার ভেতরে জ্বলে ওঠা এক আলোর দুর্গ—যা কোনো অবহেলা, অপমান, কিংবা একাকিত্ব আর ধ্বংস করতে পারবে না।
এই গল্পটা একটা প্রশ্ন রাখে সমাজের সামনে—একজন একলা মায়ের যুদ্ধে আমরা কি তাকে বাহবা দিই, না কাঁধে হাত রাখি ? নাকি কেবল ছায়ার মতো এড়িয়ে যাই ?
নূরজাহান সেই প্রশ্নের উত্তর নিজের মতো করে দিয়ে গেছে—প্রতিদিনের যুদ্ধের মধ্যেও এক বিন্দু নীলচে আলো ধরে রেখে যে মা নিজের এবং অন্য অনেকের জীবনে আলো আনতে জানে—সে-ই সত্যিকার হিরো।
Leave a Reply
Your identity will not be published.