বাংলা চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথ : রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্র-ভাবনা

বাংলা চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথ :  রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্র-ভাবনা

আগামী ২৫ বৈশাখ তথা ৮ মে হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে পত্রস্থ করা হলো এই বিশেষ রচনাটি। লিখেছেন মোমিন রহমান।

রবীন্দ্র-সাহিত্যের প্রথম চলচ্চিত্রায়ন হচ্ছে ‘মানভঞ্জন’ (১৯২৩)। নরেশ মিত্র পরিচালিত এ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন নরেশ মিত্র, ইন্দু মুখোপাধ্যায়, তিনকড়ি চক্রবর্তী, নীলিমারানী, দুর্গাদাস এবং লীলা। তাজমহল ফিল্ম প্রযোজিত নির্বাক-পর্বের এই বাংলা চলচ্চিত্রে গল্পের রস অক্ষুণ্ন থাকে নি, এটি দর্শক হৃদয় ছুঁতে পারে নি। এ প্রসঙ্গে নাচঘর, ১৩৩১ সালের আশ্বিন সংখ্যায় লেখা হয় : “মানব চিত্তের সূক্ষ্ম লীলা, কি প্রচণ্ড সত্য ইহার মধ্যে নিহিত রহিয়াছে, সে গল্পটি তাজমহল কোম্পানি এমন পৎঁফব করিয়া ফিল্মে দেখাইলেন যে তার ভিতরকার রস শুকাইয়া ঝরিয়া গেল।”

‘মানভঞ্জন’-এর পরে বাংলা চলচ্চিত্রের নির্বাক পর্বে আরও চারটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়—গিরিবালা (১৯৩০), দালিয়া (১৯৩০), বিচারক (১৯৩২) এবং নৌকাডুবি (১৯৩২)। প্রথম দুটি চলচ্চিত্রের পরিচালক নরেশ মিত্র। অবশ্য চারটি চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘গিরিবালা’ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কেননা, নির্বাক যুগে এটি ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘মানভঞ্জন’ গল্পের দ্বিতীয় চলচ্চিত্ররূপ এবং এর চিত্রনাট্য সংশোধন করে দেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তিনি এ চলচ্চিত্রের নামও বদলে রেখেছিলেন ‘গিরিবালা’। এমনকি চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেলে রবীন্দ্রনাথ প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবিটি দেখেছিলেনও। পরিচালক মধু বসুকে তিনি আশীর্বাদও করেছিলেন। ১৯৩০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘বায়াস্কোপ’ পত্রিকা চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে লিখেছিল : “...আমাদের দেশে যথেষ্ট অসুবিধা সত্ত্বেও আলোকচিত্র যে এত সুন্দর হতে পারে তা আমরা কল্পনাও করতে পারি নি।” ললিতা দেবী (গিরিবালা), ধীরাজ ভট্টচার্য (গোপীনাথ) এবং নরেশ মিত্রের (গোপীনাথের বন্ধু) অভিনয়েরও প্রশংসা করেছিলেন সেই সময়ের সমালোচকরা। উল্লেখ্য, নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে এ কথা বলতেই হয় যে, নির্বাক পর্বের বাংলা চলচ্চিত্রে রবীন্দ্র-সাহিত্যের শৈল্পিক রূপায়ণ ঘটে নি।

বাংলা চলচ্চিত্রের সবাক যুগে রবীন্দ্র-সাহিত্যের প্রথম চলচ্চিত্রায়ন হচ্ছে ‘চিরকুমার সভা’ (১৯৩২)। পরিচালনা করেছিলেন প্রেমাংকুর আতর্থী এবং বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেনÑতিনকড়ি চক্রবর্তী (চন্দ্র), দুর্গাদাস (পূর্ণ), ইন্দু মুখোপাধ্যায় (শ্রীশ), নিভাননী (শৈলবালা), সুনীতিবালা (নীরবালা), অন্নপূর্ণা (নূপবালা) প্রমুখ।

১৯৩২ সালে মুক্তি পায় ‘নৌকাডুবি’। পরিচালক নরেশ চন্দ্র মিত্র।

১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথের দুটি উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ দেওয়া হয়Ñ‘গোরা’ এবং ‘চোখের বালি’। নরেশ চন্দ্র পরিচালিত ‘গোরা’-তে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন জীবন গাঙ্গুলী। অন্য প্রধান চরিত্রের অভিনয়শিল্পীরা হলেনÑপ্রতিমা দাশগুপ্তা, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য এবং নরেশ মিত্র।

অন্যদিকে সতু সেন পরিচালিত ‘চোখের বালি’-র অভিনয়শিল্পীরা হলেনÑসুপ্রভা মুখোপাধ্যায়, ইন্দিরা রায়, ছবি বিশ্বাস, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য।

উল্লেখ্য, দুটি ছবির মধ্যে ‘গোরা’ দর্শক-সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। নির্মলকুমার চক্রবর্তী বলছেন : “তৎকালীন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে নতুন চিন্তাধারার প্রবর্তনে রবীন্দ্র-কাহিনির চিত্ররূপ এক দুঃসাহসী প্রচেষ্টা। বিশেষ করে নরেশচন্দ্র মিত্র পরিচালিত রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘গোরা’-র চিত্ররূপ।”

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল তখন। সেই সময় অবিভক্ত ভারতবর্ষে অবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছিল। বলা যায়, নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল যেন। এক শ্রেণির মানুষের হাতে কাঁচা পয়সা এসেছিল, তারা দ্রুত ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল; অন্যদিকে দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দরুন সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা গিয়েছিল। বাংলা চলচ্চিত্রেও এর ছোঁয়া লেগেছিল। চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যাও বেড়েছিল। কিন্তু তাতে রবীন্দ্রকাহিনির চলচ্চিত্ররূপ ছিল হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর মাত্র দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। ছবি দুটি হলো : সৌমেন মুখোপাধ্যায়ের ‘শোধবোধ’ (১৯৪২) এবং পশুপতি চট্টোপাধ্যায়ের ‘শেষরক্ষা’ (১৯৪৪)।

‘শোধবোধ’ ছিল সৌমেন মুখোপাধ্যায়ের প্রথম চলচ্চিত্র। নিউ থিয়েটার্স লিঃ প্রযোজিত এ ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন অনাদি দস্তিদার। অভিনয়শিল্পীরা হলেনÑশ্রীলেখা, সুপ্রভা মুখোপাধ্যায়, রতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, শীলা ভট্টাচার্য, ছবি বিশ্বাস, মলিনা দেবী, ইন্দু মুখোপাধ্যায়, শৈলেন চৌধুরী, রেবা প্রমুখ। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ, কলকাতার চিত্রা প্রেক্ষাগৃহে। এর সঙ্গে ম্যাডানের স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র ‘অমর লিপি’ প্রদর্শন করা হয়েছিল।

‘শেষরক্ষা’ অবিভক্ত বাংলার প্রথম মহিলা প্রযোজক প্রতিভা শাসমল প্রযোজিত চলচ্চিত্র। পরিচালক স্বনামধন্য সাংবাদিক-সমালোচক পশুপতি চট্টোপাধ্যায়। প্রধান চরিত্রসমূহে অভিনয় করেছিলেনÑবিজয়া দাশ (পরে বিজয়া রায়, বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার প্রয়াত সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী), পদ্মা দেবী, অমর মল্লিক (এন.টি), প্রভা দেবী, রেবা দেবী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, মনোরমা (ছোট), বিপিন মুখার্জী, আশালতা, মিহির ভট্টাচার্য, নরেশ বসু (এন.টি), বীরেন ভঞ্জ, কালীদাস মুখার্জী। চলচ্চিত্রটি কোয়ালিটি ফিল্মসের পরিবেশনায় ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিলাভ করে নীতিন বসু’র ‘নৌকাডুবি’। বাংলা চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগে রবীন্দ্রনাথের এই উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ দিয়েছিলেন নরেশ মিত্র। যাহোক, নীতিন বসু’র ‘নৌকাডুবি’ সম্পর্কে ১৪ বর্ষ, ৪৭ সংখ্যায় ‘দেশ’-এর সমালোচক লিখছেন : “রবীন্দ্রনাথের ‘নৌকাডুবি’-কে সার্থকভাবে চিত্রে রূপায়িত করার জন্য চিত্রনাট্যকার সজনীকান্ত দাস ও পরিচালক নীতিন বসু প্রশংসার দাবী করতে পারেন। মূল কাহিনিকে অনুসরণ করে সহজ স্বচ্ছন্দ গতিতে ছবিখানি চরম পরিণতির দিকে এগিয়ে গেছে।” উল্লেখ্য, ‘নৌকাডুবি’-র তিনটি প্রধান চরিত্রে অভি ভট্টাচার্য, মীরা সরকার এবং মীরা মিশ্র চরিত্রানুগ চমৎকার অভিনয় করেন।

১৯৪৮ সালে নীতিন বসু রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘দৃষ্টিদান’-এর চলচ্চিত্ররূপ দিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচয়িতা ছিলেন সজনীকান্ত দাস। অভিনয়শিল্পীরা হলেনÑসুনন্দা দেবী, অসিতবরণ, ছবি বিশ্বাস, বিমান ব্যানার্জী, অরুণ কুমার (উত্তমকুমার), অসিত বসু, বেণু মিত্র, কেতকী, খগেন পাঠক, শান্তি ভট্টাচার্য, প্রফুল্লবালা, পাপা ব্যানার্জী, উষাবতী (পটল), মনোজ চ্যাটার্জী, আশুতোষ চ্যাটার্জী, কৃষ্ণচন্দ্র দে, সন্ধ্যারানী, শিবানী, সুশীল চ্যাটার্জী, যুথিকা দেবী, পচাবাবু, সরোজ মিত্র, ম্যালকম, সুখেন দাশগুপ্ত। চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এ প্রসঙ্গে ‘দীপালি’ (১৬ বৈশাখ ১৩৫৫) পত্রিকার সমালোচক লিখেছিলেন : “চিত্ররূপান্তরিত করিবার জন্য কাহিনির পরিবর্তন প্রয়োজন হয়, কিন্তু অনর্থক কাহিনিকে বিকৃত করা উচিত নয়। এই গল্পটিকে চিত্ররূপায়িত করিবার জন্য দুটি চরিত্র আমদানি করিতে হইয়াছেÑজমিদার এবং অন্ধ ভজন দাস। ভজন দাসের নাম রবীন্দ্রনাথের গল্পে শুধু একস্থানে আছে। রবীন্দ্রনাথ লিখিতেছেনÑ‘তাঁহার সেই মৃদুকল্পিত প্রাচীন দুর্বল কণ্ঠে আমাদের গ্রাম্য সাধু ভজন দাসের দেহতত্ত্ব-গান করুণ স্বরে শুনিতে পাইলাম না।’ কাহিনির সহিত ভজন দাসের সম্পর্ক এই মাত্র, কিন্তু সেই ভজন দাস চিত্র-কাহিনিতে একটি সুদীর্ঘ ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছে কিন্তু এই চরিত্রটির জন্য কাহিনি মন্থর হইয়া পড়িয়াছে। কিন্তু সর্বাপেক্ষা বিস্মকর জমিদারের চরিত্র সৃষ্টি। ...পরিচালকের অহেতুক ভয়ও বিস্ময়কর। যে বৃদ্ধের নাতনির ওলাওঠা হইয়াছে, রবীন্দ্রনাথ তাহাকে মুসলমান করিয়াছেন, কিন্তু চিত্রে তাহাকে হিন্দু দেখানো হইয়াছে। এই অযথা ভীতি কেন ? ...পরিচালনা সুন্দর। আলোক চিত্রগ্রহণ অত্যন্ত সুন্দর... সম্পাদনা উচ্চস্তরের নহে। এক একটি দৃশ্য এবং কথা শেষ হইবার পূর্বেই সেই দৃশ্য ডিজলভ করিয়া আর এক দৃশ্যে গিয়াছে। একটু সতর্ক দৃষ্টি রাখিলে এরূপ হইত না।” উল্লেখ্য, ‘দৃষ্টিদান’-এর মাধ্যমেই মহানায়ক উত্তমকুমার আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তখন তাঁর নাম ছিল অরুণকুমার। তিনি এ চলচ্চিত্রে অসিতবরণের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

১৯৪৮ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘বিচারক’ (পরিচালক দেবনারায়ন গুপ্ত) এবং ১৯৫১ সালে নরেশচন্দ্র মিত্রের ‘গোরা’।

১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তি পেয়েছিল রবীন্দ্র সাহিত্যাশ্রয়ী তিনটি চলচ্চিত্রÑ‘মালঞ্চ’, ‘বৌঠাকুরানীর হাট’ এবং ‘শেষের কবিতা’।

রবীন্দ্রনাথের ‘মালঞ্চ’ উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ দিয়েছিলেন প্রফুল্ল রায়। সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক কমল দাশগুপ্ত। অভিনয়ে যমুনা বড়ুয়া, প্রণতি, প্রভাত মুখার্জী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, পাহাড়ী সান্যাল এবং আরও অনেকে। শিল্পনিদের্শক চারু রায়।

‘বৌঠাকুরানীর হাট’-এর পরিচালক নরেশ মিত্র। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের এই চলচ্চিত্ররূপটিতে অভিনয় করেছিলেনÑপদ্মা দেবী, মঞ্জু দে, রুমা দেবী, নীতিশ মুখার্জি, পাহাড়ী সান্যাল, উত্তম কুমার, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, শম্ভু মিত্র, নরেশ মিত্র, পঞ্চানন ভট্টাচার্য, জীবন গাঙ্গুলী, সন্ধ্যা দেবীসহ আরও অনেকে।

তবে রবীন্দ্র-উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্ররূপ হচ্ছে ‘শেষের কবিতা’। চলচ্চিত্রটির পরিচালক মধু বসু এবং চিত্রনাট্যকার নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেনÑদীপ্তি রায় (লাবণ্য), নির্মলকুমার (অমিত), সাধনা বসু (কেটি), বীরেন চ্যাটার্জি (নরেন), উৎপল দত্ত (কুমার মুখোপাধ্যায়), রমলা চৌধুরী (লিসি), চন্দ্রাবতী (যোগমায়া), বনানী চৌধুরী (সিসি), প্রীতি মজুমদার (গোসাই), সমর রায় (শোভনলাল), অনিলকুমার (যতিশঙ্কর), ছবি বিশ্বাস (অবনীশ)সহ আরও অনেকে।

উপন্যাস থেকে চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে ‘শেষের কবিতা’ সম্পর্কে কী ভাবনা কাজ করেছিল মনেÑএই প্রসঙ্গে অন্যতম চিত্রনাট্যকার নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন : “আজ মনে পড়ে যেদিন কবিগুরু ‘শেষের কবিতা’ লিখে নিজে পড়ে শোনালেন। সেদিন রবীন্দ্র-ভক্তদের মধ্যে এই বই-এর উদ্দেশ্য ও মর্মার্থ নিয়ে নানা রকমের আলোচনা চলতে থাকে। প্রত্যেকেই এক একটা থিওরী বা তত্ত্ব ব্যাখ্যাস্বরূপ গড়ে তোলেন এবং মজা হলো, কারোর ব্যাখ্যার সঙ্গে কারো ব্যাখ্যা মেলে না। তখন একদিন আমরা স্বয়ং কবিগুরুকে এই নিয়ে প্রশ্ন করলাম। তিনি হেসে বললেন, ‘আমার একটা দুর্ভাগ্য আছে, যেখানে আমার হাঁটুজল, লোকে সেখানে ডুব জল ধরে নেয়। ব্যাখ্যা বা তত্ত্বের কথা বাদ দিয়ে, আমার অনুরোধ ‘শেষের কবিতা’-কে তোমরা একটা সোজা গল্প হিসেবে দেখো।’...বহুদিন পরে আজ যখন ‘শেষের কবিতা’ ছায়াচিত্রে রূপান্তরিত হচ্ছে, কবিগুরুর এই কথাটি দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।” চলচ্চিত্রটির সমালোচনা করে ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ডিসেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হয়েছিল : ‘একদিন যা সবায়ের মনে অভাবনীয় বলে প্রতীয়মান হয়েছিল, তাকেই সবায়ের কাছে মনোজ্ঞ করে তুলে ধরার একটি স্মরণীয় কৃতিত্ব ‘শেষের কবিতা’র চিত্ররূপ। ...কাব্যের ছন্দাভরণকে যথাসম্ভব অলঙ্কৃত রেখে সোজাভাবে একটি সহজ প্রেমের গল্পকে সামনে তুলে ধরায় চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনা উভয় দিক থেকেই অসাধারণ শিল্পকারিতার পরিচয় পাওয়া যায়। ...আঙ্গিক পারিপাট্যের দিক থেকে ছবিখানি বাংলা চিত্রশিল্পের গৌরব করার মতো কৃতিত্ব প্রকাশ করেছে।” ১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় হেম চন্দ্র ও সৌরেন সেনের যুগ্ম পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের অসামান্য গীতিকাব্য ‘চিত্রাঙ্গদা’-র চলচ্চিত্ররূপ।

১৯৫৬ সালে ‘চিত্রকুমার সভা’ আবার নির্মিত হয়। দেবকী কুমার বসু পরিচালিত এই চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উত্তমকুমার। এটি উপভোগ্য চলচ্চিত্র হিসেবে দর্শকদের চিত্ত জয় করতে সক্ষম হয়।

১৯৫৬ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পের চিত্ররূপ দেন তপন সিংহ। ১৯৬০ সালে মুক্তি লাভ করে রবীন্দ্র-কাহিনিভিত্তিক দুটি চলচ্চিত্রÑঅগ্রদূত পরিচালিত ‘খোকাবাকুর প্রত্যাবর্তন’ এবং তপন সিংহের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’।

১৯৬১ সাল ছিল রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ পূর্তির তাৎপর্যপূর্ণ সময়। এ উপলক্ষে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রযোজনায় ‘অর্ঘ্য’ নিমার্ণ করেন দেবকী কুমার বসু। এটি ছিল ‘পুরাতন ভৃত্য’, ‘পূজারিনী’, ‘নটীর পূজা’ এবং ‘অভিসার’Ñএই চারটি রবীন্দ্রকাব্য’র চলচ্চিত্ররূপ। তবে এ সময়ের স্মরণীয় সৃষ্টি হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের ‘তিনকন্যা’Ñরবীন্দ্রনাথের ‘মণিহারা’, ‘পোস্টমাস্টার’ এবং ‘সমাপ্তি’Ñএই তিনটি ছোটগল্পের চলচ্চিত্ররূপ।

১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের ‘কঙ্কাল’ অবলম্বনে ‘সন্ধ্যারাগ’ নির্মাণ করেন জীবন গঙ্গোপাধ্যায় এবং ১৯৬৩ সালে ‘অগ্রগামী গোষ্ঠী তৈরি করেন ‘নিশীথে’। কিন্তু এই দুটি চলচ্চিত্রই রবীন্দ্রÑকাহিনির ব্যর্থ চলচ্চিত্ররূপ।

১৯৬৪ সালে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের চিরসবুজ চলচ্চিত্র, রবীন্দ্র-সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্ররূপ ‘চারুলতা’। একই বছর মুক্তি পেয়েছিল পার্থপ্রতিম চৌধুরীর ‘শুভা ও দেবতার গ্রাস’।

১৯৬৫ সালে তপন সিংহ নির্মাণ করেন ‘অতিথি’। বলা যায়, রবীন্দ্র-চলচ্চিত্রমালায় একটি অসামান্য সংযোজন।

‘চারুলতা’র পরে সত্যজিৎ রায়ের রবীন্দ্র-কাহিনিভিত্তিক আরেকটি স্মরণীয় চলচ্চিত্রকর্ম ‘ঘরে বাইরে’ (১৯৮৪)।

তপন সিংহের ‘অতিথি’ (১৯৬৫) থেকে সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’ (১৯৮৪)-র মধ্যবর্তী সময়ের রবীন্দ্রকাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তথা তেমন সার্থক নয় এমন চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছেÑঅরুন্ধতী দেবীর ‘মেঘ ও রৌদ্র’ (১৯৬৯), মৃণাল সেনের ‘ইচ্ছাপূরণ’ (১৯৭০), অজয় করের ‘মাল্যদান’ (১৯৭০) ও ‘নৌকাডুবি’ (১৯৭৯), স্বদেশ সরকারের ‘শাস্তি’ (১৯৭০), বীরেশ্বর বসুর ‘বিসর্জন’ (১৯৭৪), পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘মালঞ্চ’ (১৯৭৯), শংকর ভট্টাচার্যের ‘শেষরক্ষা’ (১৯৭৭) এবং স্বদেশ সরকারের ‘দিদি’ (১৯৮৪)।

উল্লেখ্য, ২০০১ সাল পর্যন্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রবীন্দ্র-কাহিনিভিত্তিক ৪১টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। সর্বশেষ চলচ্চিত্রটি ছিল সন্তোষ ঘোষাল পরিচালিত ‘ছেলেটা’। ২০০৮ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘চতুরঙ্গ’, পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়, অভিনয়ে ঋতুপর্ণা, ধৃতিমান, কবীর সুমন, সুব্রত দত্ত। আর ২০১০ সালে মুক্তি পেয়েছে ‘ল্যাবরেটরি’। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের এই চলচ্চিত্ররূপটির স্রষ্টা রাজা সেন। মুক্তি পেয়েছে ‘শেষের কবিতা’ও। ২০১১ সালে মুক্তি পায় ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ‘নৌকাডুবি’। অভিনয়ে রাইমা সেন, রিয়া সেন, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং যীশু সেন গুপ্ত।

এছাড়া দুটি চলচ্চিত্রকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতেই হবে। আর সেই দুটি চলচ্চিত্র হচ্ছে পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘স্ত্রীর পত্র’ এবং ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চোখের বালি’।

‘স্ত্রীর পত্র’ (১৯৭৩)Ñরবীন্দ্রনাথের গল্পের এই চলচ্চিত্ররূপটি তৎকালে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। এখানে চলচ্চিত্র-ভাষার প্রয়োগে পরিচালক স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। একই কথা বলা যায়, ‘চোখের বালি’র ক্ষেত্রেও।

‘স্ত্রীর পত্র’ সম্পর্কে চলচ্চিত্র সমালোচক সোমেন ঘোষের ভাষ্য হচ্ছে : “প্রথম প্রয়াস ‘স্বপ্ন নিয়ে’ ছবিতে পূর্ণেন্দু পত্রীর যে দুর্বলতা ও ক্রটির ব্যাপার ছিল ‘স্ত্রীর পত্রে’ তা থেকে তিনি কেবল মুক্তই নন, সিনেমা মাধ্যম সম্পর্কে তাঁর সুস্থ শিল্পিত চিন্তা, গভীর ভালোবাসা আর নিষ্ঠা তাঁকে শিল্পমনস্ক পরিচালক-রূপে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ভালো সাহিত্য থেকে ভালো ছবি করার ক্ষেত্রে যে সহজাত দক্ষতা ও মানসিকতা থাকা দরকার পূর্ণেন্দুবাবু বহুলাংশেই তার অধিকারী। চলচ্চিত্র নির্মাণও যে অন্যান্য সব শিল্প শাখার মতো প্রভূত পরিশ্রম ও প্রযত্ন সাপেক্ষ ব্যাপার পূর্ণেন্দুবাবুর কাজের মধ্যে সে পরিচয় বিশেষভাবেই বর্তমান। বিক্ষিপ্ত, এলোমেলো অসংখ্য নিকৃষ্ট কাজের মধ্যে পূর্ণেন্দ্র পত্রীর ছবি বিশিষ্টতায় চিহ্নিত হবার যোগ্য। বাংলা সিনেমার প্রবহমান তথাকথিত ট্রাডিশনের বাইরে এসে ছবি করার ক্ষেত্রে যে প্রত্যয় ও পরিমিত বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োজন তাঁর কাজের মধ্য থেকে সেটুকু বুঝে নিতে কষ্ট হয় না।”

এবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। এদেশে প্রথম রবীন্দ্র-সাহিত্যের চলচ্চিত্ররূপ দেন চাষী নজরুল ইসলাম। চলচ্চিত্রটি হলো ‘শাস্তি’। পরে তিনি রবীন্দ্রনাথের আরেকটি গল্প ‘শুভা’-কেও সেলুলয়েডে মূর্ত করে তোলেন। কাজী হায়াৎ নির্মাণ করেছেন ‘কাবুলিওয়ালা’। তারপর মুক্তি পেয়েছে ‘অবুঝ বউ’। রবীন্দ্রনাথের ‘সমাপ্তি’ গল্প অবলম্বনে এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন নার্গিস আখতার। ২০১৭ সালে রবীন্দ্রনাথের কবিতা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ‘হঠাৎ দেখা’। পরিচালক রেশমী মিত্র (ভারত) এবং শাহাদাত হোসেন বিদুৎ (বাংলাদেশ)। প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন এবং দেবশ্রী রায়। ২০১৮ সালে মুক্তি পায় ‘হৈমন্তী’। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের এই চলচ্চিত্ররূপে অভিনয় করেছেন তিথী বসু (ভারত) এবং সকাল রাজ (বাংলাদেশ)। পরিচালক ডায়েল রহমান। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্র-ভাবনা

বাংলার সংস্কৃতিতে বিংশ শতাব্দীর প্রধান পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমরা জানি, সব্যসাচী এই শিল্পী জীবনের শেষ পর্যায়ে চিত্রকলার দিকে ঝুঁকেছিলেন এবং তার আঁকা সেইসব ছবি ‘আগামী যুগের আর্ট’ বলে স্বীকৃত। কিন্তু আমরা অনেকে জানি না যে, রবীন্দ্রনাথ বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিস্ময়কর শিল্প ও গণমাধ্যম চলচ্চিত্রের প্রতিও আকৃষ্ট ছিলেন। মধু বসু পরিচালিত ‘গিরিবালা’ (১৯২৯) ছবির চিত্রনাট্য তিনি সংশোধন করে দেন—যা ছিল তাঁরই গল্প ‘মানভঞ্জন’-এর চলচ্চিত্র রূপ। ১৯৩০ সালে ধীরেন গাঙ্গুলীর অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ‘তপতী’-র চিত্রনাট্য রচনার দায়িত্ব নেন। এ বিষয়ে ১৯২৯ সালের ২২ ডিসেম্বর, ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি’-তে খবর বের হয় ‘তপতী’-র সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংশ্লিষ্টতা প্রসঙ্গের। অবশ্য এর আগে ৪ ডিসেম্বর ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ লিখেছিল। “উৎ জধনরহফৎধহধঃয ঞধমড়ৎব ধঢ়ঢ়বধৎং ভড়ৎ ঃযব ভরৎংঃ ঃরসব ড়হ ঃযব ংপৎববহ রহ ঃযব ষবধফরহম ঢ়ধৎঃ ড়ভ ঃযব ভরষস াবৎংরড়হ ড়ভ ঃযব ঢ়ড়বঃ'ং ষধঃবংঃ ফৎধসধ বহঃরষবফ ‘ঞধঢ়ধঃর” ঞযব ংপবহধৎরড় যধং নববহ ৎিরঃঃবহ নু উৎ. ঞধমড়ৎব যরসংবষভ.” এ ছবিতে রবীন্দ্রনাথের অভিনয় করারও কথা ছিল। কিন্তু ছবিটি শেষ পর্যন্ত হয় নি। ধীরেন গাঙ্গুলীর ভাবনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্র-ভাবনা মেলে নি। তবে ১৯৩২ সালে ‘নটীর পূজা’-র অংশবিশেষ সেলুলয়েডে ধারণ করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের নির্দেশনায় তা ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন নীতিন বসু। রবীন্দ্রনাথ উপালির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ‘নটীর পূজা’ মুক্তি পেয়েছিল চিত্রা প্রেক্ষাগৃহে, ১৯৩২ সালের ২২ মার্চ।

হ্যাঁ রবীন্দ্রানাথের চলচ্চিত্রবিষয়ক নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ছিল। রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্র-ভাবনার প্রথম পরিচয় পাওয়া যায় ১৯২৯ সালে লেখা একটি চিঠিতে। এই চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ীর ছোটভাই মুরারী ভাদুড়ীকে। এখানে রবীন্দ্রনাথের লেখা সেই চিঠিটি আমরা তুলে ধরছি। তিনি লিখেছিলেন—

কল্যাণীয়েষু,

উপকরণের বিশেষত্ব অনুসারে কলারূপের বিশেষত্ব ঘটে। আমার বিশ্বাস ছায়াচিত্রকে অবলম্বন করে যে নতুন কলারূপের আবির্ভাব প্রত্যাশা করা যায় এখনো তা দেখা দেয় নি। রাষ্ট্রতন্ত্রে স্বাতন্ত্র্যের সাধনা কলাতন্ত্রেও তাই। আপন সৃষ্ট জগতে আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রত্যেক কলাবিদ্যার লক্ষ্য। নইলে তার আত্মমর্যাদার অভাবে আত্মপ্রকাশ ম্লান হয়। ছায়াচিত্র এখনো পর্যন্ত সাহিত্যের চাটুবৃত্তি করে চলেছে—তার কারণ কোনো রূপকার আপন প্রতিভার বলে তাকে এই দাসত্ব থেকে উদ্ধার করতে পারে নি। করা কঠিন, কারণ কাব্যে বা চিত্রে বা সঙ্গীতে উপকরণ দুর্মূল্য নয়। ছায়াচিত্রের আয়োজন আর্থিক মূলধনের অপেক্ষা রাখে, শুধু সৃষ্টিশক্তির নয়।

ছায়াচিত্রের প্রধান জিনিসটা হচ্ছে দৃশ্যের গতিপ্রবাহ। এই চলমান রূপের সৌন্দর্য বা মহিমা এমন করে পরিস্ফুট করা উচিত যা কোনো বাক্যের সাহায্য ব্যতীত আপনাকে সম্পূর্ণ সার্থক করতে পারে। তার নিজের ভাষার উপর আর একটা ভাষা কেবলি চোখে আঙুল দিয়ে মানে বুঝিয়ে যদি দেয় তবে সেটাতে তার পঙ্গুতা প্রকাশ পায়। সুরের চলমান ধারায় সঙ্গীত যেমন বিনা বাক্যেই আপন মাহাত্ম লাভ করতে পারে তেমনি রূপের চলৎ প্রবাহ কেন একটি স্বতন্ত্র রস সৃষ্টি রূপে উন্মেসিত হবে না ? হয় না যে সে কেবল সৃষ্টিকর্তার অভাবেÑএবং অলস চিত্ত জনসাধারণের মূঢ়তায়, তারা আনন্দ পাবার অধিকারী নয় বলেই চমক পাবার নেশায় ডোবে।                                                                ইতি

২৬ নভেম্বর, ১৯২৯                                                                                                    শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মুরারী ভাদুড়ীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই চিঠিতে তিনটি বিষয় সুস্পষ্টÑ ১. চলচ্চিত্রে সংলাপের চেয়ে ইমেজের প্রাধান্য, ২. প্রত্যেক শিল্প মাধ্যমের স্বতন্ত্র চরিত্র এবং ৩. সাহিত্যের চলচ্চিত্র রূপ প্রসঙ্গ।

চলচ্চিত্রের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। তাঁর নানা লেখায় চলচ্চিত্র প্রসঙ্গ এসেছে। কখনো সিনেমা, কখনো ফটোগ্রাফ বা চলচ্চিত্র, কখনো ক্যামেরা বা ক্যামেরাওয়ালা, কখনো ছায়াছবি বা চলচ্ছবি, এমনকি কখনো তাঁর লেখায় আমরা লক্ষ করি ইংরেজি ‘ঋওখগ’ শব্দটিও।

রবীন্দ্রনাথের নানা লেখায়, চিঠিতে আমরা দেখতে পাই চলচ্চিত্র প্রসঙ্গ। যেমনÑ‘ছেলেবেলা’ গ্রন্থের ভূমিকা লিখতে বসে আচমকা লিখে বসেছেন রবীন্দ্রনাথ, “কিছুকাল হলো একটা কবিতা বইয়ে এর কিছু কিছু চেহারা দেখা দিয়েছিল, সেটা পদ্যের ফিল্মে। বইটার নাম ‘ছড়ার ছবি’।”

১৯২৭ সালের ১৪ জুলাই রবীন্দ্রনাথ বেড়াতে বেরিয়েছিলেন জাভা বালি ইত্যাদি মিলিয়ে পূর্ব দ্বীপপুঞ্জের দিকে। সেখান থেকে লিখে পাঠানো পত্রগুচ্ছই গ্রন্থিত হয়ে বের হয় ‘জাভা যাত্রীর পত্র’ নামে। এই বইটির মধ্যে আমরা লক্ষ করি অসংখ্যবার চলচ্চিত্র-কথা। যে-কোনো প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এখানে বলেছেন ক্রটি-বিচ্যুতিসহ সিনেমার ভালো-মন্দ নিয়ে নানা কথা। এইসব কথা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

‘জাভা যাত্রীর পত্র’-এর ১১নং চিঠিতে নাচের টানে এসেছে চলচ্চিত্র প্রসঙ্গ। বালি দ্বীপের নাচ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেখানে যুদ্ধের মাঝেও নাচের ছন্দ। এই যুদ্ধ-নাচের প্রসঙ্গ থেকেই শেকসপিয়রের নাটক আর সেখান থেকে চলচ্চিত্র-প্রসঙ্গÑ“কিন্তু যদি কোনো স্বর্গে এমন বিধি থাকে যে ছন্দে যুদ্ধ করতে হবে, এমন যুদ্ধ যাতে ছন্দোভঙ্গ হলে সেটা পরাভবেরই সামিল হয, তবে সেটা এই রকমের যুদ্ধই হত। বাস্তবের সঙ্গে এই অনৈক্য নিয়ে যাদের মনে অশ্রদ্ধা বা কৌতুক জন্মায়, শেকসপিয়রের নাটক পড়ে তাদের হাসা উচিতÑকেননা, তাতে লড়তে-লড়তেও ছন্দ, মরতে-মরতেও তাই। সিনেমায় আছে রূপের সঙ্গে গতি, সেই সুযোগটিকে যথার্থ আর্টে পরিণত করতে গেলে আখ্যানকে নাচে দাঁড় করানো চলে। বলা বাহুল্য, বাইনাচ প্রভৃতি যেসব পদার্থকে আমরা নাচ বলি তার আদর্শ এ নাচের নয়। জাপানের কিয়োটোতে ঐতিহাসিক নাট্যের অভিনয় দেখেছি, তাতে কথা আছে বটে, কিন্তু তার ভাবভঙ্গি চলাফেরা সব নাচের ধরনে; বড় আশ্চর্য লাগে তার শক্তি।” ‘জাভা যাত্রীর পত্র’-এ রবীন্দ্রনাথের এই লেখা প্রসঙ্গে লেখক-চিত্রশিল্পী-চলচ্চিত্রকার পূর্ণেন্দু পত্রী-র মন্তব্য হচ্ছেÑ “বড় আশ্চর্য  লাগে এখানে রবীন্দ্রনাথকেও। চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে কোনোরকম প্রত্যক্ষ সংযোগÑসম্বন্ধ ছাড়াই তিনি এই মাধ্যমের তৎকালে চর্চিত সীমাবদ্ধতার সমালোচকই নন শুধু, ভবিষ্যতকালে কোনখান থেকে এই মাধ্যম খুঁজে নিতে পারবে অসুস্থ অথবা অক্ষমতা-আক্রান্ত জীর্ণ শরীরের মৃতসঞ্জীবনী, ঠিকানা বাতলে দিচ্ছেন তারও। একেই বলে সময়ের থেকে এক-পা এগিয়ে থাকা প্রতিভা। তিনি কিন্তু তখনো জানেন না যে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র-প্রতিভা, যাঁর নাম আইজেনস্টাইন। তিনিও তাঁর চলচ্চিত্র ভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছেন জাপানি নো-নাটকের নৃত্যভঙ্গিমা থেকে উপকরণ খুঁটে নিয়ে। পেয়ে যাচ্ছেন নিজের বিশিষ্ট মন্তাজ থিয়োরির স্বপক্ষে যুক্তি-শৃঙ্খলার যথোপযুক্ত উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথের এই চিঠি লেখার কত বছর পরে আজ পৃথিবীর চলচ্চিত্রে আমরা অবিরত প্রত্যক্ষ করে চলেছি স্লো-মোশানে দৃশ্যের গতিতে এসে যাচ্ছে হুবহু নাচের ছন্দ।”

‘জাভা-যাত্রীর পত্র’-এ যেমন আধুনিককালের গতিকে অবলম্বন করে রবীন্দ্রনাথ পৌঁছেছিলেন চলচ্চিত্রে, ‘পশ্চিম যাত্রীর ডায়ারি’-তে তেমনি চলচ্চিত্রকে স্পর্শ করে আধুনিক কালের গতির প্রসঙ্গে মুখর হন রবীন্দ্রনাথÑ“এবারে জাহাজে সিনেমা দেখা আবার ভাগ্যে ঘটেছিল। দেখলুম, তার প্রধান জিনিসটা হচ্ছে দ্রুত লয়। ঘটনার দ্রুততা বারেবারে চমক লাগিয়ে দিচ্ছে। ...ইংরেজিতে যাকে সাকসেস বলে, তার প্রধান রাহন হচ্ছে দ্রুত নৈপুণ্য।”

১৯৩০ সালে সংঘটিত হয় এক ঐতিহাসিক ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছবির প্রদর্শনী উপলক্ষে জার্মানির মিউনিখে গেলে সেখানকার ‘উফা’ ফিল্ম কোম্পানি চলচ্চিত্রের জন্যে একটি চিত্রনাট্য লিখে দিতে অনুরোধ জানায়। ফলশ্রুতিতে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিতের রচনা করেন ‘ঞযব পযরষফ’। এই চিত্রনাট্যটি বই আকারে লন্ডন থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। প্রকাশক ছিল অ্যালেন এন্ড আনউইন কোম্পানি। বর্তমানে বইটি দু®প্রাপ্য। যাহোক জার্মানির ‘উফা’ কোম্পানি ‘ঞযব পযরষফ’-এর চলচ্চিত্র রূপ প্রদান করেছিল কিনা জানা যায় না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ‘ঞযব পযরষফ’-র ইংরেজি চিত্রনাট্য থেকে বাংলাতে ‘শিশুতীর্থ’ নামক গদ্য কবিতা লেখেন। এ থেকেই রবীন্দ্রনাথের লেখা চিত্রনাট্যের প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে। যা হোক, ‘শিশুতীর্থ’-এর রয়েছে দশটি অংশ। প্রথম অংশে রয়েছে অন্ধকার রাতে মানবতার বীভৎস চিত্রকল্প—

পাহাড়তলীতে অন্ধকার মৃত রাক্ষসের চক্ষুকোটরের মতো

স্তূপে স্তূপে মেঘ আকাশের বুক চেপে ধরেছে।

পুঞ্জপুঞ্জ কালিমা গুহায় গর্তে সংলগ্ন।

মনে হয়, নিশীথরাত্রের ছিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ।

দিগন্তে একটা আগ্নেয় উগ্রতা।

ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে আর নেভে—

‘শিশুতীর্থ’-র দ্বিতীয় অংশে—

ঊর্ধ্বে গিরিচূড়ায বসে আছে ভক্ত তুষারশুভ্র নীরবতার মধ্যে।

আকাশে তার নিদ্রাহীন চক্ষু খোঁজে আলোকের ইঙ্গিত।

মেঘ যখন ঘনীভূত, নিশাচর পাখি চিৎকারশব্দে যখন উড়ে যায়,

সে বলে ভয় নেই ভাই, মানবকে মহান বলে জেনো।

উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ ‘ঞযব পযরষফ’ চিত্রনাট্য লেখার অনুপ্রেরণা পান ১৯৩০ সালে সোভিয়েত রাশিয়া ভ্রমণের সময়। সেখানে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র ‘দি ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন’ ও ‘ওল্ড অ্যান্ড নিউ’ দেখে মুগ্ধ হন রবীন্দ্রনাথ। ছবি দেখার পর সমবেত সোভিয়েত চলচ্চিত্রপ্রেমীদের সঙ্গে আলোচনার এক পর্যায়ে ‘ঞযব পযরষফ’ চিত্রনাট্যের একটি দৃশ্য বর্ণনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বলেছিলেন, একটি পর্বত, বিন্ধ্যের চূড়ার মতো সুউচ্চ। সেই শীর্ষ দেশ ছাড়িয়ে একটি দীপ্যমান তারা। পর্বত শীর্ষে বসে আছেন এক সন্ন্যাসী—এইটুকু বলেই রবীন্দ্রনাথ সেদিন চুপ করে গিয়েছিলেন। আর কোনো কথা বলেন নি তিনি। এরপর ১৯৩০ সালেই মিউনিখে থাকার সময় রবীন্দ্রনাথ দেখতে গিয়েছিলেন, যিশুখ্রিষ্টের জীবনী অবলম্বনে, সেখানকার বিখ্যাত ‘প্যাশান-প্লে’। এ ঘটনার পর যখন জার্মানির ‘উফা’ কোম্পানি রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করল একটি মৌলিক চিত্রনাট্য লিখে দেওয়ার জন্য, ‘প্যাশান-প্লে’ দেখায় অভিভূত রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিতে লিখলেন ‘ঞযব পযরষফ’।

মুরারী ভাদুড়ীকে লেখা চিঠি ও ‘শিশুতীর্থ’ কবিতা থেকে বোঝা যায় যে, চলচ্চিত্র-ভাষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের জ্ঞান ছিল। চলচ্চিত্র মানেই যে ইমেজ ও শব্দÑএই বোধ তাঁর ছিল। তাই তো ‘শিশুতীর্থ’-র প্রতিটি অংশ চলচ্চিত্র উপযোগী ইমেজে পরিপূর্ণ। দেখা যাচ্ছে, চলচ্চিত্র সম্পর্কেও ছিল রবীন্দ্রনাথের অগ্রসর চিন্তা-ভাবনা। উল্লেখ্য, যে ‘প্রতিভাবান রূপকার’-এর জন্য রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করেছেন, সেই রূপকার-এর আবির্ভাব ঘটেছিল ১৯৫৫ সালে। তাঁর নাম সত্যজিৎ রায়। আর তাঁর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘পথের পাঁচালী’।

শেষ কথা

এটা এখন স্পষ্ট যে, চলচ্চিত্রের সঙ্গে নানাভাবেই রবীন্দ্রনাথের যোগ করেছে। যেমন, কাহিনিচিত্রের অন্যতম উৎস হতে পারে রবীন্দ্র-সাহিত্য। যদিও ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির দ্বারা চালিত হওয়ার দরুন খুব কম প্রযোজক-পরিচালকই রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাস-কবিতা-নাটক-গীতিনাট্য অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রয়াসী হয়েছেন। যদিও রবীন্দ্র-কাহিনির চলচ্চিত্ররূপও ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়েছে। এক্ষেত্রে তপন সিংহের ‘কাবুলিওয়ালা’ একটি মাইলস্টোন। আর শৈল্পিকভাবে উত্তীর্ণ প্রথম চলচ্চিত্র হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের ‘তিন কন্যা’—রবীন্দ্রনাথের তিনটি ছোটগল্পের চলচ্চিত্ররূপ।

দেখা যাচ্ছে, রবীন্দ্র-সাহিত্যের সফল চলচ্চিত্রায়নের সংখ্যা খুবই কম (বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত রবীন্দ্র-সাহিত্যাশ্রয়ী কোনো সার্থক চলচ্চিত্র নির্মিত হয় নি)। এর কারণ প্রধানত দুটি। প্রথমত, রবীন্দ্র-সাহিত্যের মমার্থ অনুধাবনে অধিকাংশ চলচ্চিত্রকারের ব্যর্থতা। দ্বিতীয়ত, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের পারস্পরিক সম্পর্কটি সঠিকভাবে না বুঝে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা।

সত্যি কথা বলতে কী, রবীন্দ্র-সাহিত্য প্রধানত মননশীল ও প্রায় ক্ষেত্রেই তা দার্শনিক তত্ত্বে সমৃদ্ধ। তাই রবীন্দ্র-সাহিত্য অবলম্বনে চিত্রনাট্য রচনা করার সময়ে সার্থকভাবে চলচ্চিত্র উপযোগী অংশ বাছাই করা উচিত। এবং মূল কাহিনিতে নতুন উপাদান সংযোজনের ক্ষেত্রে লক্ষ রাখা দরকার যেন তা মূলের ক্ষতি না করে। এভাবে গ্রহণ-বর্জন-সংযোজনের কাক্সিক্ষত ও সঠিক প্রয়াসে রবীন্দ্র-সাহিত্যের সফল চলচ্চিত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে।

 

 

 

 

Leave a Reply

Your identity will not be published.