দেশের বরেণ্য অভিনেতা-নাট্যকার-নির্দেশক-লেখক আতাউর রহমান জীবনের মঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছেন। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার দিনগত রাত ১২টার দিকে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। এর আগে গত শুক্রবার বাসায় পড়ে যাওয়ার পর আতাউর রহমানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। এরপর প্রথমে তাঁকে গুলশানের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আইসিইউ সুবিধা ওই মুহূর্তে না পাওয়ায় পরে তাঁকে ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ভর্তির পরই তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। ওইদিনই শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু আবার অবস্থার অবনতি হলে গত ১০ মে, রোববার, তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
আতাউর রহমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বহুমাত্রিক পরিচয়ের অধিকারী। স্বাধীনতাযুদ্ধ-পরবর্তী মঞ্চনাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবেও পরিচিত তিনি।
আতাউর রহমান ১৯৪১ সালের ১৮ জুন তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) নোয়াখালী জেলার শস্যাঘটিয়া গ্রামে, নানাবাড়িতে, জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাহাবুবুর রহমান ছিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক। একটি সরকারি অফিসের চাকুরিজীবী। তাঁর মাতা জাহানারা বেগম সংস্কৃতিমনা ছিলেন। তাঁর মায়ের কাছেই তিনি বাইরের বই পড়ার শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর শৈশব কাটে নোয়াখালীতে তাঁর নানার বাড়িতে। সেখানেই তিনি প্রথম জুলভার্ন রচিত ‘টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ পড়েন। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য, উপন্যাস, ছোটগল্প, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনাবলী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনাবলীর সাথে পরিচিত হন। তবে তাঁকে আলোড়িত করেছিল বিখ্যাত মানুষদের আত্মজীবনী। যেমন, মহাত্মা গান্ধীর আত্মজীবনী, বার্ট্রান্ড রাসেলের আত্মজীবনী, নীরদচন্দ্র চৌধুরীর ‘অ্যান অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যান আননুন ইন্ডিয়ান’ ইত্যাদি।
আতাউর রহমান চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিষয়ে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনে আতাউর রহমান শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হতে চেয়েছিলেন। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে বাবার সুবাদে ‘এসজিএস’ (সোসাইটি জেনারেল দ্য সারভেলিয়েন্স) নামে একটি প্রাক জাহাজিকরণ ও জাহাজ থেকে অবতরণ পরবর্তী মালামাল পরিদর্শন কোম্পানিতে যোগ দেন, ঢাকা অফিসের ম্যানেজার হিসেবে। বেতন ছিল খুবই ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকের বেতনের চেয়ে অনেক বেশি। তবে ১৯৭৪ সালে আফ্রিকায় বদলি করায় এবং তিনি সেখানে যেতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এসজিএস। অতঃপর আতাউর রহমান বিভিন্ন ইনডেন্টিং জাতীয় ব্যবসা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সফল হন নি। সর্বশেষে ‘জরিপ ও পরিদর্শন কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি ইন্স্যুরেন্সের ক্ষয় ও ক্ষতি নিরুপণ এবং বিভিন্ন ব্যাংকের সম্পত্তি জরিপকারীর একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন, যা সফলতার সাথে টিকে থাকে। এছাড়া আতাউর রহমান বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর বন্ধু জিয়া হায়দার আমেরিকার ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার থেকে পাস করে দেশে এসে আতাউর রহমানকে মঞ্চনাটক করার প্রস্তাব দেন। ১৯৬৮ সালে ফজলে লোহানীর বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’। তিনি হন এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। পছন্দমতো মৌলিক নাটক না পাওয়ায় প্রথম নাটক মঞ্চস্থ করতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। ১৯৭২ সালে আতাউর রহমান তাঁর প্রথম নাটকের নির্দেশনা প্রদান করেন। তাঁর নির্দেশিত প্রথম মঞ্চনাটক মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত প্রহসন ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রঁ’-এ অভিনয় করেন লাকি ইনাম, আবুল হায়াত, ইনামুল হক, আলী যাকের ও ফখরুল ইসলাম। পরের বছর ১৯৭৩ সালে তিনি বাদল সরকার রচিত এবং আলী যাকের পরিচালিত ‘বাকি ইতিহাস’ মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন। এটি ছিল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের হয়ে তাঁর প্রথম অভিনয়। এটি ছিল বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাট্য প্রদর্শনী। উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই আতাউর রহমান মঞ্চনাটকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিলেন। টিভি ও রেডিও নাটকেও কাজ করেছেন। এমনকি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন।
আতাউর রহমান ৩৫টির বেশি মৌলিক এবং অন্য ভাষা থেকে অনুবাদ করা মঞ্চনাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন। এর মধ্যে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য নাটক হলো ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘ঈর্ষা’, ‘ক্রয়লাদ ও ক্রেসিদা’, ‘গ্যালিলিও’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘রক্তকরবী’, ‘অপেক্ষমাণ’।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের বাইরে আতাউর রহমান নির্দেশিত নাটক হলো- ‘আগল ভাঙার পালা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘নারীগণ’, ‘রুদ্র রবি ও জালিয়ানওয়ালাবাগ’।
আতাউর রহমান মঞ্চনাটক নিয়ে বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে-‘প্রজাপতি নিবন্ধ’, ‘মঞ্চ সারথির কাব্যকথা’, ‘নাটক করতে হলে’, ‘নাট্যপ্রবন্ধ বিচিত্রা’, ‘লেখনী’ ইত্যাদি।
আতাউর রহমান বাংলাদেশ সেন্টার অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সভাপতি থাকাকালীন ২০১১ সালের মে মাসে ১০ দিন ব্যাপী ১ম ঢাকা আন্তর্জাতিক থিয়েটার উৎসবের আয়োজন করেন। তিনি বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি ছিলেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের সাবেক সদস্য আতাউর রহমান বাংলাদেশ নাটকের আপিল কমিটি ও চলচ্চিত্র জুরিবোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে আতাউর রহমানের এক পুত্র এবং এক কন্যা রয়েছে। পুত্রের নাম শাশ্বত চৌধুরী এবং কন্যা শর্মিষ্ঠা রহমান। উল্লেখ্য, তিনি ১৯৭০ সালে বিয়ে করেন। তাঁর স্ত্রী ঝরনা রহমান।
মঞ্চ নাটকে অবদানের জন্য আতাউর রহমান পেয়েছেন বহু পুরস্কার। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে-
স্বাধীনতা পুরস্কার (২০২১); একুশে পদক (২০০১)। শহীদ মুনীর চৌধুরী পুরস্কার; লোক নাট্যদল স্বর্ণ পদক; অন্যদিন ও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম পুরস্কার; চ্যানেল আই রবীন্দ্রমেলা আজীবন সম্মাননা পুরস্কার; কাজী মাহবুবুল্লাহ আজীবন সম্মাননা পুরস্কার।
আতাউর রহমান বেঁচে থাকবেন অসংখ্য নাট্যপ্রেমীর হৃদয়ের মাঝে; তাঁর সৃষ্টির মাঝে। আর আমাদের কাছে, ‘অন্যদিন’ পরিবারের একজন হিসেবে, ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে’।
Leave a Reply
Your identity will not be published.