আনিসুজ্জামান : চিরদিন, চিরকালের

আনিসুজ্জামান : চিরদিন, চিরকালের

সময়ের বাতিঘর আনিসুজ্জামান। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকার জন্য তাঁকে নানাভাবে অভিহিত করা যায়—লেখক, গবেষক, শিক্ষা-চিন্তক, সংস্কৃতিসাধক, মুক্তিসংগ্রামী, মানবাধিকার সংগঠক, সর্বোপরি জাতির বিবেক। আজ তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২০ সালের এই দিনে তিনি অনন্তলোকে মিশে গিয়েছেন।

গবেষক হিসেবে আনিসুজ্জামান অনন্য কীর্তির অধিকারী। বলা যায়, পুরোনো বাংলা গদ্য সম্পর্কে তাঁর গবেষণা বাংলা গদ্যের ইতিহাস পুনর্গঠনে সঞ্চার করেছে অনেক নতুন উপাদান।

ভাষা-আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন আনিসুজ্জামান। তিনি সেই সময়ে যুবলীগের পক্ষ থেকে প্রকাশ করেন ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন/ কি ও কেন ?’ এটি ছিল রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে ১৯৫২ সালে প্রকাশিত প্রথম পুস্তিকা। বায়ান্ন’র ২৫ ফেব্রুয়ারি ডাকা সাধারণ ধর্মঘট সফল করার জন্য লিফলেট ড্রাফ্ট, প্রকাশ এবং বিতরণের কাজও করেন আনিসুজ্জামান।...১৯৫৩-এর মার্চে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সাহিত্য সংকলনটি প্রকাশনার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। এখানে তাঁর লেখা একটি ছোটগল্প ঠাঁই পেয়েছিল। সংকলনটির উৎসর্গপত্রও তাঁর লেখা।

পাকিস্তান আমলে এদেশে যত রাজনৈতিক এবং সামাজিক আন্দোলন হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে কোনো না কোনো যোগাযোগ ছিল আনিসুজ্জমানের। চৌষট্টি সালে দাঙ্গাবিরোধী কাজকর্মের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি; কাজ করেছেন শরণার্থী শিবিরেও।

আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধেও আনিসুজ্জামানের রয়েছে উজ্জ্বল ভূমিকা। তিনি সেই সময়ে কলকাতায় শিক্ষক সমিতির হয়ে শিক্ষকদের কল্যাণে নানা কাজ করেছেন; শরণার্থী শিবিরগুলোতে স্কুল স্থাপন করেছেন। প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য হিসেবেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।...স্বাধীনতাত্তোরকালে বাংলাদেশের সংবিধান বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন নেয়ামাল বাসির এবং এ কে এম শামসুদ্দীনের সঙ্গে যৌথভাবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়েও বরাবরই তিনি ছিলেন সোচ্চার।

কুদরাত-ই খুদা শিক্ষা কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন, যেখানে জোর দেওয়া হয়েছিল সর্বজনীন বাধ্যতামূলক এবং অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার ওপর। আর বাংলাদেশের সংকটকালে বিপর্যস্ত অবস্থায় তিনি ছিলেন প্রতিবাদী ভূমিকায়।

আন্তর্জাতিক বিদ্বৎ সমাজে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন ছয় দশকের অধিক সময়। এক্ষেত্রে তাঁর মেধা ও মননশীলতার দ্যুতি ছড়িয়েছে সবগুলো মহাদেশে। তাই তো আনিসুজ্জামান সম্পর্কে সব্যসাচী লেখক ও কবি সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন পঙক্তিমালা : ‘মানুষ নেয় জন্ম এবং মানুষ বড় হয়-/ বয়সে বড় হয় সকলে, কর্মে কতিপয়।/ একজীবনের অর্জন কি এক কথাতে বলা যায় ?/ প্রতিদিনের চিত্রলেখা দিনের শেষে মুছে যায়।/ সবটাই কি মুছতে পারে কালের হাত চলমান ?/ অমোচ্য যে নামগুলো তার একটি আনিসুজ্জামান।’

দীপ্র মনীষা আনিসুজ্জামান, ‘অন্যদিন’ পরিবারের একজন, তিনি আমাদের চেতনার আকাশে চিরদিন জ্বলজ্বল করবেন।

 

Leave a Reply

Your identity will not be published.