বাংলা চলচ্চিত্র সংগীত ও নজরুল

বাংলা চলচ্চিত্র সংগীত ও নজরুল

নজরুল ইসলামকে মূলত কবি হিসেবেই সাধারণ মানুষ চিনেন। চিনেন গীতি রচয়িতা হিসেবেও। তিনি যে গল্প-উপন্যাস লিখেছেন, লিখেছেন প্রবন্ধসহ বিভিন্ন গদ্য রচনা, সম্পাদনা করেছেন পত্রিকা—এইসব তথ্য খুব কম মানুষই জানেন। আরও কম মানুষ জানেন বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা। বিশেষত বাংলা চলচ্চিত্র সংগীতের বিষয়ে। এই সম্পর্কে আলো ফেলা হয়েছে এখানে, কবির ৫০তম প্রয়াণ দিবসকে সামনে রেখে। লিখেছেন মোমিন রহমান।

কাজী নজরুল ইসলাম ‘টকির স্বর্ণযুগ’-এ বাংলা ও হিন্দি ছবির সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি চলচ্চিত্রকার, চিত্রনাট্য-কাহিনি সংলাপ-গীত রচয়িতা, অভিনেতা, সুরকার ও সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৩টি চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে দশটি ছিল বাংলা সিনেমা। যথা, ধ্রুব (১৯৩৪), ‘পাতালপুরী’ (১৯৩৫), ‘গ্রহের ফের’ (১৯৩৭), ‘বিদ্যাপতি’ (১৯৩৮), ‘গোরা (১৯৩৮), ‘সাপুড়ে’ (১৯৩৯), ‘নন্দিনী’ (১৯৪১), ‘চৌরঙ্গী’ (১৯৪২), ‘দিকশূল’ (১৯৪৩) এবং ‘অভিনয় নয়’ (১৯৪৫)। অবশ্য শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, আব্বাস উদ্দীন, ওস্তাদ খসরু, নান্না মিয়া, সারোয়ার হোসেন প্রমুখের তৈরি প্রতিষ্ঠান ‘বেঙ্গল টাইগার পিকচার্স’ থেকে ‘মৃত্যুক্ষুধা’ অবলম্বনে ‘মদিনা’ নামে একটি ছবি নির্মিত হওয়ার কথা ছিল। এর জন্যে নজরুল গানও লিখেন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, নজরুলের অসুস্থতার কারণে পরবর্তী সময়ে সেই ছবি আর নির্মিত হয় নি।

কাজী নজরুল ইসলাম সবাক বাংলা ছবির শুরুতেই এ মাধ্যমটির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। তিনি ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে সেই সময়ের সুপ্রসিদ্ধ চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেডের সুর ভান্ডারী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। নজরুলের কাজ ছিল সবাক বাংলা ছবির আগমন পথকে প্রশস্ত করা। বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীর গান ও আবৃত্তির সবাকচিত্র নির্মাণ করাই ছিল তাঁর কাজ। এতে সংশ্লিষ্ট অভিনেতা-অভিনেত্রীর কণ্ঠস্বরের মান ধরা পড়ত। কিন্তু এ সময়ে চলচ্চিত্রে নজরুলের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। যদিও তাঁর ম্যাডান থিয়েটার্সে যোগদানের পরপর ৩০/৪০টি নির্বাচিত দৃশ্য (নাটক, আবৃত্তি ও সংগীত) বাকসংযোজিত হয়ে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মার্চ মুক্তি লাভ করে।

সত্যি কথা বলতে কী, ‘ধ্রুব’ (১৯৩৪) থেকেই চলচ্চিত্র মাধ্যমে নজরুলের সম্পর্কিত হওয়ার বিষয়টি জানা যায়। এ ছবিতে নজরুলের ছিল পরিচালক, কাহিনিকার, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, সংগীত পরিচালক, নেপথ্য নায়ক ও অভিনেতার একাধিক ভূমিকা। উল্লেখ্য, ‘ধ্রুব’ ছবির ১৮টি গানের মধ্যে ১৭টিরই রচয়িতা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। মাস্টার প্রবোধ, পারুল বালা, আঙ্গুর বালা ও নজরুলের কণ্ঠে ওইসব গান ‘ধ্রুব’ ছবিতে গীত হয় এবং সেই সঙ্গে ধ্রুব, মুনি পত্নী, সুনীতি ও নারদের ভূমিকায় তাঁদের অভিনয় করতেও দেখা যায়। কিন্তু এ ছবির অভিনয় ও পরিচালনার মধ্যে এমন একটি খাঁটি থিয়েটারি ভাব সুপ্ত ছিল যে, তা প্রকৃতপক্ষে নৃত্যগীত প্রধান একখানি অতি সাধারণ ‘বায়োস্কোপ-এ পরিণত হয়। এ ছাড়া নারদরূপ নজরুলকে তৎকালের চলচ্চিত্রদর্শক গ্রহণ করতে পারে নি।

১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত ‘পাতাল পুরী’-তে গীতিকার ও সংগীত পরিচালকের দ্বৈত ভূমিকায় নজরুলকে দেখা গেল। উল্লেখ্য, বর্ধমানের কয়লাখনির শ্রমিকদের জীবনভিত্তিক এ ছবির কাহিনি রচনা করেছিলেন নজরুলের বাল্যবন্ধু সুসাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। নজরুল ‘পাতালপুরী’-র গীত রচনা করার পূর্বে স্বচক্ষে বর্ধমানের কয়লাখনির শ্রমিকদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করেন এবং তারই ভিত্তিতে এ ছবির সাতটি গান (আঁধার ঘরের আলো’, ‘এলো খোঁপায় পরিয়ে দে’, ‘ও শিকারী মারিস না তুই’, ‘ধীরে চল চরণ টলমল’, ‘তাল পুকুরে তুলছিলো সে শালুক’, ‘ফুল ফুটেছে কয়লাফেলা ময়লা টবে ঝুড়িতে’, ‘দুখের সাথী গেলি চলে’) রচনা করেন। শুধু তাই নয়, সুর রচনায়ও নজরুল নতুনত্বের পরিচয় দেন। রাঢ় বাংলার প্রচলিত ঝুমুরের সঙ্গে তিনি মিলিয়ে দিলেন সাঁওতালকে। সম্পূর্ণ এক অভিনব সুরের স্বপ্নজাল বিস্তার করেছিলেন সমগ্র বাংলার আলোর হাওয়ায়। সেই সুরে ছিল বাংলার মাটির গন্ধ, সেই সুরে ছিল এক বিচিত্র আস্বাদ। এভাবে ‘পাতালপুরী’ ছবিতেই প্রথম জন্ম হলো ‘নজরুল ঝুমুর’-এর।

১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত চারু রায়ের ‘গ্রহের ফের’ চলচ্চিত্রে অজয় ভট্টাচার্য রচিত পাঁচটি গানে (‘গোধূলী বেলায় প্রদীপ ভাসানু’, ‘তবু মনে হয় ভোলে নি আমায়’, ‘সহসা পরাণে কে বাজাল বাঁশি’, ‘মোরা ডাক্তার সবে মিলে গাহি ছুরি ও কাঁচির জয়’, ‘একটি মধুরাত্রি’) সুরারোপ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি এ ছবির সংগীত পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন।

দেবকীকুমার বসুর গীতবহুল চলচ্চিত্র ‘বিদ্যাপতি’ (১৯০৮)-র কাহিনিকার ছিলেন কাজী নজরুল। এ ছবির জন্যে সম্ভবত কয়েকটি গানও তিনি রচনা করেছিলেন। অবশ্য অভিনেত্রী-গায়িকা কাননবালার কণ্ঠে গীত ‘রাই বিনোদিনী দোলো’ গানটির রচয়িতা যে নজরুলÑএ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

নরেশ মিত্র কর্তৃক রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ ‘গোরা’ (১৯৩৮)-তে সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন কাজী নজরুল ইসলাম। এ ছবির সাতটি গানের মধ্যে একটির রচয়িতা নজরুল স্বয়ং। গানটির প্রথম পঙ্ক্তি হচ্ছে ‘উষা এল চুপি চুপি সলাজ নিলাজ অনুরাগে’। ভক্তিময় দাসগুপ্ত গীত ও গানটিতে সুরারোপের কাজটি নজরুলের দ্বারা সম্পন্ন হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ‘উষা এল চুপি চুপি’ গানটি ‘গোরা’ ছবিতে চমৎকার এক সিচুয়েশনে ব্যবহৃত হয়েছে। ভোরের দৃশ্য। ললিতা ঘুমিয়ে আছে স্টিমারের কেবিনে। আর বিনয় কেবিনের বাইরে দুটি চেয়ার সামনাসামনি রেখে একটিতে বসে অন্যটিতে পা রেখে ঘুমিয়ে আছে।  নদীতে বিমুখগামী আরও স্টিমার দেখা যাচ্ছে। পূর্বদিকের মেঘের মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো উঁকি মারছে। তখনো আধো আলো—আধো আলো ভাব। হঠাৎ করে ললিতার ঘুম ভেঙে যায়। বিছানা ছেড়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখে জানালার ওপাশে বিনয় চেয়ারে ঘুমিয়ে আছে। গানের প্রথম দুটো লাইন ভেসে আসছে। একদিকে ভোর হয় হয় তার মাঝে আশাভোড়ী রাগে গানটি খুব সুন্দরভাবে এখানে চিত্রায়িত হয়েছে। ললিতা তখন বিছানা  থেকে গায়ে দেবার চাদরটি হাতে করে নিয়ে যখন ঘুমন্ত বিনয়ের গায়ে ঢেকে দিচ্ছে তখন গানের শব্দ ভেসে আসছে—‘সেবার লাগিয়া হাত দুটি/ মালার সম পড়ে লুটি/ কাহার পরশ রস মাগে।’ প্রভাতের সুন্দর পরিবেশে গানটি খুব উপভোগ্য হয়েছে।

দেবকীকুমার বসুর গীতবহুল আরেকটি বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘সাপুড়ে’-র কাহিনিকার ও গীতিকার ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। উল্লেখ্য, এ ছবির ‘সংগীত পরিচালক রাইচাঁদ বড়াল হলেও সাতটি গান রচনা, সুরারোপ এবং প্রশিক্ষণের সকল দায়দায়িত্ব পালন করেন কাজী নজরুল ইসলাম। ছায়াছবি-তে মোট গানের সংখ্যা আটটি। সাতটি রচনা করেন কবি নজরুল এবং বাকি একটি গান রচনা করেন অজয় ভট্টাচার্য।

‘সাপুড়ে’ ছবিতে নায়িকা-গায়িকা কাননবালার গাওয়া ‘হলুদ গাঁদার ফুল/ রাঙা পলাশ ফুল’, ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’, ‘কথা কইবে না বউ’ প্রভৃতি গানগুলি হয়েছিল অপূর্ব। এর পেছনে ছিল কবি নজরুলের নিরলস পরিশ্রম আর সৃজনশীলতার আনন্দ এবং এই আনন্দ তিনি গায়ক-গায়িকাদের মধ্যেও সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন বলেই সেকালে ‘সাপুড়ে’ ছবির গানগুলি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে নায়িকা-গায়িকা কাননবালা তথা কানন দেবী তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন নজরুল ইসলাম কর্তৃক ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায়’-এ গানটি শেখানোর কথা : “মনে মনে ছবি এঁকে নাও—নীল আকাশ—দিগন্ত ছড়িয়ে আছে তার সীমা নেই—দুদিক ছড়ানো তো ছড়ানোই। পাহাড় যেন নিশ্চিত মনে তারই গায় হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে। আকাশের উদারতার বুকে এই নিশ্চিত মনে ঘুমানোই প্রকাশ করতে হলে সুরের মধ্যেও একটা আয়েস আনতে হবে, তাই একটু ভাটিয়ালীর ভাব দিয়েছি। আবার এ পাহাড় ফেটে যে ঝর্না বেরিয়ে আসছে চঞ্চল আনন্দকে কেমন করে ফোটাব ? সেখানে সাদামাটা সুর চলবে না, একটু গীটকিরী তালের ছোঁয়া চাই। তাই রো-ও-ও অই বলে ছুটল আত্মহারা আনন্দে। এমনি করে তিনি (নজরুল) এই মেলানোর আনন্দ আমাদের হৃদয়েও যেন ছড়িয়ে দিতেন।”

‘নন্দিনী’ (১৯৪১) ছবিতে নজরুল একটি গান (‘চোখ গেল চোখ গেল/ কেন ডাকিসরে/ চোখ গেল পাখিরে/ চোখ গেল পাখি’) রচনা ও সুরারোপ করেন। গানটিতে কণ্ঠ দান করেন প্রখ্যাত গায়ক ও সুরকার শচীনদেব বর্মন। ছবিতে গানটি ব্যবহৃত হয়েছে চমৎকার এক সিচুয়েশনে। গৌরী রূপী নায়িকা সধ্যারানী পুকুরে স্নান করছে। সেই সময় জমিদার তনয় রবীন অর্থাৎ নায়ক ধীরাজ ভট্টাচার্য শিকারির বেশে এসে হাজির। তখনই ‘চোখ গেল’ পাখির ডাকের সঙ্গে গানের মিউজিক শুরু হয়। এদিকে স্নানরত গৌরী অপরিচিত যুবক রবীনকে দেখে দুহাতে মুখ ঢাকে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে রবীনকে দেখতে থাকে। সাউন্ডট্র্যাকে গানের প্রথম পঙ্ক্তি শোনা যায়Ñ‘চোখ গেল-চোখ গেল’। সেলুলয়েডে দেখা যায় গৌরী মুখ থেকে হাত দুটো সরিয়ে অঞ্জলি ভরে পানি নিয়ে চোখেমুখে ছিটা দিচ্ছে। আর মাঝে মাঝে আড়চোখে রবীনকে দেখছে। তখন সাউন্ডট্র্যাকে শোনা যায়—‘চোখের বালির জ্বালা জানে সবাইরে, জানে সবাই/ চোখে যার চোখ পড়ে তার ওষুধ নাইরে তার ওষুধ নাই’। এমনিভাবে ‘নন্দিনী’ চলচ্চিত্রে নজরুল রচিত গানটি সঠিক সিচুয়েশনে চমৎকারভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

‘চৌরঙ্গী’ (১৯৪২) ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি এ ছবির আটটি গানের রচয়িতা ও সুরকার ছিলেন। বাকি একটি গান—‘আরতি প্রদীপ জ্বালি আঁখির তারা’ রচনা করেন নব্যেন্দু সুন্দর এবং তাতে সুরারোপ করেন দুর্গা সেন। এ ছবির ‘চৌরঙ্গী, চৌরঙ্গী চৌরঙ্গী, চৌরঙ্গী/ চারদিকে রং ছড়িয়ে বেড়ায় রঙ্গীলা কুরঙ্গী’, ‘ঘরছাড়া ছেলে আকাশের চাঁদ আয়রে’ ‘রুম ঝুম ঝুম ঝুম/ রুম ঝুম ঝুম/ খেজুর পাতা নূপুর বাজায়ে কে যায়’ প্রভৃতি গানগুলি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

নিউ থিয়েটার প্রযোজিত ও প্রেমাঙ্কুর আতর্থী পরিচালিত ‘দিকশূল’ (১৯৪৩) চলচ্চিত্রের তিন গীতিকারের একজন ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। অন্য দুজন হলেন প্রণব রায় এবং ভোলানাথ মিত্র। এ ছবিতে নজরুল রচিত গানের মধ্যে রয়েছে—‘ফুরাবে না এই মালাগাঁথা মোর/ ফুরাবে না এই ফুল’ এবং ‘ঝুমকো লতায় জোনাকি মাঝে মাঝে বৃষ্টি’।

১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘অভিনয় নয়’ চলচ্চিত্রে একটি গান করেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং তা দ্বৈত কণ্ঠে (গৌরী চক্রবর্তী এবং শেফালি ঘোষ) গীত হয়।

এছাড়া ‘প্রহলাদ’ (১৯৩১) ‘বিষ্ণুমায়া’ (১৯৩২) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে নজরুলের গান ছিল বলে জানা যায়।

সবাক চলচ্চিত্রের শুরুতে ‘ধূপছায়া’ নামে ছবিতে নাকি নজরুল বিষ্ণুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। শুধু তাই যে, তিনি এ ছবির সংগীত পরিচালনা ছাড়াও এর নির্দেশনার দায়িত্বেও ছিলেন। কিন্তু এ ছবি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় নি। কেননা ‘ধূপছায়া’ নামক চলচ্চিত্রটি কোনো দিনই মুক্তি পায় নি। যা হোক হিন্দি-বাংলা মিলিয়ে ১৯টি চলচ্চিত্রের জন্য নজরুল পঞ্চাশের অধিক গীত রচনা করেছিলেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়। অবশ্য নজরুল চলচ্চিত্রে সুরকার তথা সংগীত পরিচালক হিসেবে তেমন প্রতিষ্ঠা পান নি। তাঁর প্রতিষ্ঠা ছিল চলচ্চিত্রে গীতিকার হিসেবে। উল্লেখ্য, চল্লিশ দশকের বাংলা চলচ্চিত্রে কমল দাশগুপ্তের সুরে নজরুল রচিত গান খুবই জনপ্রিয় হয়। যেমন ‘এই কি গো শেষ দান’ (গরমিল), ‘অনাদি কালের স্রোতে’ (চন্দ্রনাথ), ‘আমি বনফুল গো’ (শেষ উত্তর) প্রভৃতি গানগুলোর কথা বলা যায়।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ছবিতে কাজী নজরুল ইসলামের গান ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, ‘ভালো করে বিনোদ বেণী’ (দর্পচূর্ণ), ‘বসিয়া বিজনে কেন একা মনে’ (সমাপ্তি/ তিন কন্যা), ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল’(সুবর্ণ গোলক), ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাপার হে’ (দাদা ঠাকুর), ‘কে বিদেশী বন উদাসী বাঁশের বাঁশি বাজাও বনে’ (হাঁসুলী বাঁকের উপকথা), ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’, ‘সেদিন লব বিদায়’, ‘ভুলি কেমনে আজো মনে’ (দেবদাস ২য়), ‘চল চল ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ (চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন), ‘চোখ গেল চোখ গেল’ (বারবধূ), ‘তোমার ভুবনে প্রভু হারায় না তো কিছু’, ‘সৃজন ছন্দে আনন্দে নাচে নটরাজ’ (নীলকণ্ঠ), ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর’ (আগমন) প্রভৃতি গানগুলি পঞ্চাশ থেকে আশির দশকে পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলামের গান বাংলাদেশের কিছু চলচ্চিত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। অবশ্য এক্ষেত্রে প্রথম ব্যবহারের কৃতিত্ব খান আতাউর রহমানের। তিনি ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ চলচ্চিত্রে নজরুলের দুটি গান মূল সুরে ব্যবহার করেন। যা হোক এ পর্যন্ত বাংলাদেশের কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজী নজরুল ইসলামের ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফিরি একা’, ‘এই কূল ভাঙে ও কূল গড়ে’ (নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১ম ও ২য়), ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’, ‘এই শিকল-পরা ছল মোদের এই শিকল-পরা ছল’ (জীবন থেকে নেয়া), ‘জাগো জাগো বন্দি ওঠো যত’ (কোথায় যেন দেখেছি), ‘আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়’ (বধূ বিদায়), ‘পথহারা পাখি’ (চন্দ্রকথা), ‘পরো, পরো চৈতালী সাজে কুসুমি শাড়ি’, ‘হলুদ গাঁদার ফুল’, ‘তুমি কি দক্ষিণা পবন’, ‘দূরদীপ বাসিনী’, ‘আজো কাঁদে কাননে’, ‘প্রিয় এমন রাত’, ‘পরদেশী মেঘ’, ‘নহে নহে প্রিয়’, ‘পরজনমে দেখা হবে প্রিয়’ (মেহের নিগার), ‘আয় ওলো সই’, ‘ওরে নাইয়া ধীরে চালাও’ (রাক্ষুসী), ‘দূরদীপ বাসিনী’ (দারুচিনি দ্বীপ), ‘মোর প্রিয়া হবে ওগো রানী’ (দুষ্টু ছেলে মিষ্টি মেয়ে), ‘লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনু গো আঁখি খোল’ (লাইলী মজনু) প্রভৃতি গান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে এবং প্রায় প্রতিটি গানই সঠিক সিচুয়েশন অনুযায়ী ব্যবহারের প্রবণতা সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্রের পরিচালকদের মধ্যে দেখা গেছে।

Leave a Reply

Your identity will not be published.