জাতীয় জাদুঘরে কবি মোহন রায়হানের ৭০ বছরপূর্তি উদযাপন

জাতীয় জাদুঘরে কবি মোহন রায়হানের ৭০ বছরপূর্তি উদযাপন

গতকাল ২২ আগস্ট, শনিবার, স্বনামধন্য কবি ও সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব মোহন রায়হানের ৭০ বছরপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর শাহবাগস্থ  জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সংগীত, আবৃত্তি, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন ও কাব্য নৃত্যনাট্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় কবির জন্মবার্ষিকী। এ আয়োজনে কবির দীর্ঘ সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও সংগ্রামী জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দেশের বিশিষ্ট কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শুভানুধ্যায়ীরা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের মাননীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান আসাদ এমপি, ৭০ দশকের বিশিষ্ট কবি মতিন বৈরাগী, বিশিষ্ট সাংবাদিক আবু সাইদ খান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ‘মোহন রায়হান ৭০ বছর উদযাপন পরিষদ’-এর আহ্বায়ক, লেখক ও গবেষক ড. সলিমুল্লাহ খান।

একঝাঁক তরুণ সংগীতশিল্পীদের উপস্থাপনায় উদ্বোধনী সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে কবি মোহন রায়হানের বিপ্লবী বর্ণাঢ্য জীবনের ওপর নির্মিত প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘অগ্নিপথের কবি’ প্রদর্শিত হয়। মাসুদ করিম নির্মিত এই চলচ্চিত্রে কবির শৈশব, বেড়ে ওঠা, সাহিত্য জীবনের বিকাশ, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অবদানের নানা দিক মূর্ত হয়ে ওঠে। কবি মোহন রায়হানের জন্মদিন উপলক্ষে সংবর্ধনাগ্রন্থ ‘রাজপথের কবি মোহন রায়হান’ ও ‘নির্বাচিত ১০০ কবিতা’ সংকলনের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। ‘নির্বাচিত ১০০ কবিতা’ প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। কাব্য সংকলনটির মোড়ক উন্মোচনের সময় অন্যদের সঙ্গে ‘অন্যপ্রকাশ’-এর অন্যতম পরিচালক আবদুল্লাহ নাসেরও উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে ‘রাজপথের কবি মোহন রায়হান’ প্রকাশ করেছে ‘অয়ন প্রকাশন’। গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচনের সময় প্রকাশক মিঠু কবির মঞ্চে ছিলেন।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জনাব নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “আমি কবি মোহন রায়হানের দীর্ঘায়ু কামনা করি। তার মতো কবি এদেশের জন্য প্রয়োজন। তিনি আরও কবিতা লিখুক এবং দেশের সাহিত্যাঙ্গনে অবদান রাখুক এই কামনা করি।”

বিশেষ অতিথি কবি মতিন বৈরাগী বলেন, “কবি মোহন রায়হান কখনোই ক্ষমতালোভী নন। তিনি চাইলেই হয়তো ক্ষমতা পেতে পারতেন কিন্তু সেটা না চেয়ে তিনি মানুষের চেতনার বিকাশে কাজ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

কমরেড সাইফুল হক বলেন, “কবিরা না থাকলে এই পৃথিবী বাসযোগ্য হতো না। কবি মোহন রায়হান আমাদের সমাজ বিনির্মাণের জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন।”

সভাপতির বক্তব্যে ‘মোহন রায়হান ৭০ বছর উদযাপন পরিষদ’-এর আহ্বায়ক ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, মোহন রায়হানের জীবন বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর সৃজন ও সংগ্রামের মূল্যায়ন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবনাদর্শ ও সাহিত্যকর্ম পৌঁছে দেওয়াই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

আলোচনা পর্ব শেষে কবি মোহন রায়হানকে শুভেচ্ছা জানায় জাতীয় কবিতা পরিষদ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, জাতীয় কবিতা পরিষদ মানিকগঞ্জ, শাউল হার্ট সেন্টার, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট, পার্টি, জাগ্রত জুলাই ফোরাম, বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলন, আগামী প্রকাশনী, অন্যপ্রকাশ, অন্যধারা, সিরাজগঞ্জের সংস্কৃতিজন ফোরামসহ বহু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। উল্লেখ্য, ‘অন্যপ্রকাশ’-এর পক্ষে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান অন্যতম পরিচালক সিরাজুল কবির চৌধুরী কমল।

অনুষ্ঠানে মোহন রায়হানের কবিতা আবৃত্তি করেন অনন্যা লাবণী পুতুল, মনিরুজ্জামান রোহান, শিমুল পারভীন, মেহেদী হাসান ও মাহমুদুল হাসান।

অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে কবি মোহন রায়হান বলেন, “স্বাধীনতা, আমার প্রিয়তম স্বাধীনতা। তোমার জন্য যত রক্তপাত, নিবেদিত শব্দাবলী। আসলে আমার কিছুই বলার নেই, আমি মুগ্ধ ও বিমোহিত। আপনারা যারা এখানে উপস্থিত হয়েছেন, তারা হয়তো আমাকে ভালোবাসেন, নয়তো পছন্দ করেন। না হলে এত দূর-দূরান্ত থেকে নিজেদের মূল্যবান সময় ব্যয় করে এখানে উপস্থিত হতেন না। আমি জীবনে কিছুই হতে চাই নি, কোনো কিছু পেতে চাই নি; শুধু মানুষকে ভালোবাসতে চেয়েছি। শৈশবেই এ দেশকে ভালোবাসতে শিখেছিলাম উত্তরাধিকার ও পারিবারিক সূত্রে। আমার বাবা আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতাজি সুভাষের সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই দেশপ্রেম ও মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছি।”

মোহন রায়হান আরও বলেন, “জীবনে কিছুই করতে পারি নি, আমি একজন ব্যর্থ ও পরাজিত মানুষ। তবুও আপনারা আমার এই জন্মদিন উদযাপন করছেন ও ভালোবাসা জানাচ্ছেন, সেজন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ। অনেকে প্রত্যাশা করেছেন আমি আমার কবিতায় বা বক্তৃতায় যা বলেছি, যেন আমার সেই নীতি-আদর্শে একনিষ্ঠ ও অবিচল থাকতে পারি। আমি কথা দিচ্ছি, আপনাদের প্রত্যাশার সঙ্গে বা এ দেশের জনগণের সঙ্গে কখনো বেইমানি করব না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে প্রভু তোমার চরণধূলার তলে।’ আমি তার প্রত্যুত্তরে ছাত্রজীবনে কবিতা লিখেছিলাম, ‘আমার মাথা নত হয় না, নত হয় না।’ ক্ষমতার অনেক সুযোগ আমার কাছে ছিল, এখনো আছে; কিন্তু আমি তা বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছি। ভবিষ্যতেও কোনো ক্ষমতা, পদ-পদবি বা অর্থ-বিত্তের কাছে মোহন রায়হান বিক্রি হবে না।”

সবশেষে দেখানো হয় মোহন রায়হানের কবিতা অবলম্বনে কাব্য নৃত্যনাট্য ‘মোহন বাঁশি’।

Leave a Reply

Your identity will not be published.