‘অন্যদিন’-এর উপদেষ্টা সম্পাদক, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম না-ফেরার দেশে চলে গেছেন, গত ১০ অক্টোবর, বিকেল পাঁচটায়।শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মরদেহ গত ১১ অক্টোবর, শনিবার, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে আনা হয়। এখানে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান, ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাজিন আজিজ চৌধুরী, ইংরেজি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, সংগীত বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ফুল দিয়ে মনজুরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এরপর মুষল ধারার বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, লেখক, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, বিশিষ্টজন ও সর্বস্তরের মানুষ। বলা যায়, কাজভেজা হয়ে সবাই প্রিয় মানুষটিকে বিদায় জানান। এ সময় অনেকেরই চোখ ছিল অশ্রুসজল। তাদের কান্না ও প্রকৃতির বৃষ্টি একাকার হয়ে গিয়েছিল।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনার পর সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের জীবন ও কাজ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমাদ খান বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বোন সাহিদা সাত্তার বলেন, আমার ভাই যে কতটা জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন...গত এক সপ্তাহে হাসপাতাল তাঁর ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি ও আজ এখানে বৃষ্টির মধ্যেও এত মানুষের সমাগমে আমরা অভিভূত হয়েছি।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন মেধাবী ছাত্র ও শিক্ষক। তাঁর বাবাও শিক্ষক ছিলেন। বাবার আদর্শ অনুসরণ করে তিনি আদর্শ শিক্ষক হয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি সাহিত্য, শিল্পকলার সমালোচনা, নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে উঁচু স্তরের লেখক ছিলেন। তিনি কখনো বিষণ্ন ও হতাশ হতেন না। বিনয়ী মানুষ ছিলেন। তাঁর প্রস্থানে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফুলার রোডে পাশাপাশি বাড়িতে অনেক বছর থেকেছি। তিনি ছিলেন খুবই জনপ্রিয় শিক্ষক। সেই জনপ্রিয়তা কত ব্যাপক, তা আজ এই বৃষ্টি উপেক্ষা করে এত মানুষের সমাগম দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তিনি নির্লোভ ও বিনয়ী ছিলেন। নতুন লেখকদের উৎসাহ দিতেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমরা দুজনেই সিলেটের মানুষ। আমরা পরিবেশ ইস্যুতে অনেক সময় একসঙ্গে কাজ করেছি। তিনি ছিলেন গভীর প্রজ্ঞাবান ও নিঃস্বার্থ মানুষ।
শ্রদ্ধা নিবেদন করে আরও বক্তব্য দেন অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন আমাদের বাতিঘর। আমাদের প্রাণের মানুষ। তাঁকে যে হারালাম, এ আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি। বড় বেদনার। এছাড়া গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফারায়েজিও বক্তব্য দেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী, শহিদুল আলমের নেতৃত্বে দৃক পিকচার লাইব্রেরি, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের পক্ষে মফিদুল হক, নাট্যজন ম হামিদ, ব্র্যাকের আসিফ সালেহ, কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান, প্রথম আলোর পক্ষ থেকে নির্বাহী সম্পাদক, কবি ও সাংবাদিক সাজ্জাদ শরিফ, প্রথম আলোর উপসম্পাদক এ কে এম জাকারিয়া, বাংলা একাডেমির পক্ষে মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, পরম কথার পক্ষে কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমান প্রমুখ।
শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু হয় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে। পরে শ্রদ্ধা নিবেদন করে কালি ও কলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ, ছায়ানট, ব্র্যাক পরিবার, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, জাতীয় জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট, কপিরাইট অফিস, ইউল্যাবের উপাচার্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা, সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ জাসদ, আর্কাইভ অধিদপ্তর, সিটি ব্যাংক, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বাসদ মার্ক্সবাদী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, কথাপ্রকাশ, প্রাচ্যনাট্য, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, উদীচী, শান্তা-মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, অ্যাপল্যাব, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলা, প্রথম আলো, নিজেরা করি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি, পথিকৃৎ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট, অন্যপ্রকাশ, হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, জাতীয় কবিতা পরিষদ, যুব ইউনিয়ন, শিল্পকলা একাডেমি, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জামে মসজিদে জোহরের নামাজের পর তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয় বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন প্রজ্ঞা আর মুক্ত মনের মেলবন্ধন। শুধু শিক্ষা, সাহিত্য আর শিল্প বিষয়েই তাঁর ভাবনা ছিল না, দেশ, সমাজ ও রাজনীতি নিয়েও তিনি ভাবতেন। কথা বলতেন। তবে সেইসব কথায় কোনো দলীয় রাজনীতির গন্ধ থাকত না। এ বিষয়ে তিনি নির্মোহ ও নিরপেক্ষ ছিলেন।
সিলেটের মানুষ তিনি। সেখানে ১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেন। জীবনের প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে সিলেটেই।
এরপর চার বছর কুমিল্লায় কেটেছে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের। এরপর আবার সিলেটে প্রত্যাবর্তন। সিলেট থেকেই তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮১ সালে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্জন করেন পিএইচডি ডিগ্রি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। অধ্যাপক হিসেবে ২০১৮ সালে তিনি অবসর নেন। এরপর তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এ যোগ দেন। ২০২৩ সালে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরিটাস অধ্যাপক করা হয়।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন অসাধারণ প্রাবন্ধিক। নন্দনতত্ত্ব এবং এদেশের চিত্রকলা ও চিত্রশিল্পীদের সম্পর্কেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ লেখা ও গ্রন্থ রয়েছে।
স্বাধীনতার পরেই তিনি গল্পকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, সাপ্তাহিক বিচিত্রার মাধ্যমে। পরে আরও দুই-তিনটি গল্প লিখেন তিনি। এরপর তিনি গল্প লেখায় দীর্ঘ বিরতি নেন। আশির দশকের শেষ পর্যায়ে আবার গল্প লেখায় মনোযোগী হন, সিরিয়াসভাবে। অবশ্য তিনি কয়েকটি উপন্যাসও লিখেছেন। সেখানেও ছড়িয়ে আছে তাঁর সৃজনশীলতার দ্যুতি।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ গ্রন্থটি ২০০৫ সালে প্রথম আলো বর্ষসেরা সৃজনশীল বইয়ের পুরস্কার পায়। তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৬) ও একুশে পদক (২০১৮)-ও লাভ করেছেন।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন একজন বিরল গোত্রের আলোকিত মানুষ। মৃত্যুর পরও তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মাঝে। আর আমাদের কাছে, ‘অন্যদিন’ পরিবারের একজন হিসেবে, ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে’।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের শেষযাত্রা : প্রাণ ও প্রকৃতির অশ্রুবিসর্জন
অন্যদিন ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ০ টি মন্তব্য
Related Articles
না-ফেরার দেশে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্যদিন১০ অক্টোবর ২০২৫'অন্যদিন'-এর উপদেষ্টা সম্পাদক, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আর নেই। আজ বিকেল পাঁচটায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ ।
হালফিল প্রাণিজগৎ।। আসিফ নূর
অন্যদিন২৮ অগাস্ট ২০২৪লালপিঁপড়ার ভয়ে বন থেকে পালাচ্ছে হাতিরা, / বানরের লম্ফেঝম্ফে গুহায় লুকিয়ে সিংহ রাজা;/ শিয়ালের পায়ে পায়ে ঘুরছে পরামর্শপ্রার্থী বাঘ—/ এ হলো অরণ্যের হালফিল প্রাণিজগৎচিত্র।
আকাশছোঁয়া একটি দৃপ্ত তর্জনীর গল্প: রিয়াজুল ইসলাম
অন্যদিন১৫ ডিসেম্বর ২০২২আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখি নি/ পাড়ার মাইকে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে একটি বজ্রকণ্ঠ শুনেছি/ যে কণ্ঠস্বর এখনো আলোড়িত করে বাংলার হৃদয়/ যে কণ্ঠস্বর নতুন প্রজন্মকে সুদৃঢ় চেতনার স্পষ্ট পথ দেখায়/ যে কণ্ঠস্বর ভালোবাসতে শেখায় বাংলার প্রতিটি কণা।
এপিটাফ সরণি
পিয়াস মজিদ২০ জানুয়ারি ২০২১And li po also died drunk He tried to embrance a moon in the yellow river Ezra pound : Epitaph কোথায় কবে যেন রিমন পড়েছিল—কবরেরও আছে শ্রেণিচরিত্র। কথাটি মিথ্যে নয় একেবারে। শ্রেণি ও অবস্থানভেদে কবরেরও ধরন নির্ধারিত হতে তো দেখা যায় সমাজে। কারো কপালে থাকে নিজস্ব পারিবারিক গোরস্থান আবার কারো বা অখ্যাত-অবজ্ঞাত পথপ্রান্তে মেলে অনন্তকালীন আশ্রয়। তবে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়ে মুহূর্তে- ‘জীবিতের শোক মৃত গ্রহণ করে না’। কিন্তু জীবিতজন কেইবা তা মানে! শোক প্রকাশের বিচিত্র রকম চর্চা রিমন দেখে আসছে চারপাশে তবে সবচেয়ে তাকে স্পর্শ করে এপিটাফগুচ্ছ।
Leave a Reply
Your identity will not be published.