বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক এবং চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান আমীরুল ইসলাম না-ফেরার দেশে যাত্রা করেছেন।
আজ ১১ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার, রাত ১টা ৭ মিনিটে তিনি কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর। আমীরুল ইসলাম হাসপাতালে কয়েকদিন ধরে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
আজ বাদ জুম্মা দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে তেজগাঁওস্থ চ্যানেল আই কার্যালয়ে তাঁর প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে।
সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আমীরুল ইসলামের মরদেহ বিকেল ৩টায় বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে রাখা হবে। সেখানে বিকেল সাড়ে তিনটায় তাঁর দ্বিতীয় জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে।
এরপর মিরপুরের গোলারটেক ঈদগাহ জামে মসজিদে তাঁর তৃতীয় জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে।
তৃতীয় জানাজার নামাজ শেষে মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে মায়ের কবরে তাঁকে সমাহিত করা হবে।
১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকার লালবাগে জন্মগ্রহণ করেন আমীরুল ইসলাম। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি মূলত শিশুদের জন্য গল্প, ছড়া ও বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল লেখা রচনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। প্রকাশিত প্রায় সব বইই শিশুসাহিত্যের। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: উপন্যাস : অচিন জাদুকর (১৯৮৫), আশ্চর্য এক অ্যাডভেঞ্চার (১৯৯২), একাত্তরের মিছিল (১৯৯৭)। গল্পগ্রন্থ : আমি সাতটা (১৯৮৫), দশটা দশ রকম (১৯৮৯), আমি মুক্তিযোদ্ধা হতে চাই (১৯৯৩), শাদা ভূত কালো ভূত (১৯৯৬)। ছড়াগ্রন্থ : খামখেয়ালি (১৯৮৪), রাজাকারের ছড়া (১৯৮৯), আমার ছড়া (১৯৯২), ‘আয়রে আমার ছেলেবেলা’, ‘বারোয়ারি বারো গল্প’। এছাড়া শিশুসাহিত্য নিয়ে আমীরুল ইসলামের দুটি স্মরণীয় গ্রন্থ হচ্ছে: শিশুসাহিত্যের আলোছায়া’ এবং ‘শিশুসাহিত্যের চেনা অচেনা’।
ব্যক্তিগত জীবনে আমীরুল ইসলাম ছিলেন কৌতুকপ্রিয়, আড্ডাবাজ, জীবন-রসিক ও ভোজনপ্রিয়। ঘুরেছেন পৃথিবীর প্রায় বিখ্যাত সব শহর। তাঁর প্রিয় শখ ছিল বইপড়া, পুরোনো বই ও চিত্রকলা সংগ্রহ, দাবা খেলা।অকৃতদার এই মানুষটি ছিলেন কিছুটা বোহেমিয়ান প্রকৃতির। বন্ধুবৎসল। অসম্ভব স্মরণশক্তির অধিকারী। সাহিত্য, ইতিহাস, গাছপালা, নানা কিছু সম্পর্কে ছিল তাঁর অগাধ জ্ঞান। বলা যায়, যে-কোনো বিষয়ে তাৎক্ষণিক বলতে পারতেন তিনি। নানা বিষয়ে খোঁজখবর রাখতেন।
গুণী মানুষদের সম্মান করতে জানতেন আমীরুল ইসলাম। কেউ জাতীয় পর্যায়ে কৃতিত্বের পরিচয় দিলে বা পুরস্কৃত হলে চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি ত্বরিত গতিতে তাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করতেন কিংবা রাজধানীর কোনো পাঁচ তারকা হোটেলে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। যেমন, ২০২৫ সালে প্রথিতযশা নজরুল-সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা একুশে পদক পাওয়ার পর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন আমীরুল ইসলাম।
শিশুসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া সাহিত্যচর্চায় অবদানের জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। আমীরুল ইসলাম পাঁচবার অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। এ ছাড়া তিনি সিকান্দার আবু জাফর সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৩), পদ¶েপ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৫), ছোটদের পত্রিকা পুরস্কার (২০০৭), ছোটদের মেলা পুরস্কার (২০০৯-১০), জাতীয় ছড়া উৎসব সম্মাননা (২০১১) এবং শামসুর রাহমান সাহিত্য পুরস্কার (২০১১) লাভ করেন। ২০১১ সালে ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল পুনর্মিলনী সম্মাননাও পান তিনি। পরের বছর কলকাতা থেকে লাভ করেন অন্নদাশঙ্কর সাহিত্য পুরস্কার। সাহিত্যের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমের সাথেও যুক্ত ছিলেন আমীরুল ইসলাম। শুরুতে তিনি অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক বাংলা’র কিশোরদের পাতার বিভাগীয় সম্পাদক ছিলেন। পরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত কিশোর পত্রিকা ‘আসন্ন’ সম্পাদনা করেন এক দশক। এরপর তিনি চ্যানেল আইয়ের জন্মলগ্ন থেকে অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাহিত্য ও গণমাধ্যম, দুই অঙ্গনেই ছিল তাঁর পদচারণা এবং দুই ক্ষেত্রেই ছিলেন তিনি সফল।
Leave a Reply
Your identity will not be published.