চলতি সংখ্যা
বর্ষ ২৬ সংখ্যা ০২
গৌরবের ২৫ বছর

ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবঃ তারিখ ও ঘটনাপঞ্জি

ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবঃ তারিখ ও ঘটনাপঞ্জি

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল পুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫)। তাঁর সংগ্রামী জীবনের শ্রেষ্ঠ ফসল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে তিনি মানুষকে সংগঠিত করেছেন, সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছেন, নিজে কঠিন ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জেল-জুলুম-নির্যাতন মাথা পেতে নিয়েছেন; কিন্তু আদর্শ এবং অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে এক চুলও নড়েন নি।  গত শতাব্দীর পূর্ববঙ্গে সংঘটিত ভাষা-আন্দোলন ছিল এমনই এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যা বাংলার ইতিহাসের বাঁককে বদল করে দিয়েছে এবং জাতিকে দিয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা ও শক্তি।

এই ভাষা-আন্দোলনের সামনের কাতারের নেতা ছিলেন তখনকার উদীয়মান ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনায় তাঁর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। সমকালীন পত্র-পত্রিকা, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি, ভাষাসংগ্রামীদের স্মৃতিচারণ প্রভৃতির আলোকে এখানে আমরা ভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের স্বরূপ দিন-ক্ষণ-তারিখ ও ঘটনাসহ তুলে ধরব।

ডিসেম্বর, ১৯৪৭ 

সাতচল্লিশের দেশভাগের পর শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ববঙ্গে চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। এখানে এসে ওঠেন ১৫০ মোগলটুলীর কর্মী শিবিরের অফিসে। ভাষা-আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি এই আন্দোলনে যুক্ত হন। ‘১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি (শেখ মুজিবুর রহমান) ছিলেন অগ্রসেনানীর ভূমিকায়।’১ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ছাড়াও গণতান্ত্রিক যুবলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে অন্যতম প্রধান সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন।২ তা ছাড়া তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে গঠিত প্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তিনি যোগদান করেছেন।৩ ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পূর্ববঙ্গের ১৪ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী রাষ্ট্রভাষা দাবিসহ ২১ দফা দাবি-সম্বলিত একটি পুস্তিকা৪ প্রচার করেন। ওই পুস্তিকায় ২১ দফা দাবির মধ্যে ২ দফা ছিল রাষ্ট্রভাষা-সংক্রান্ত। পুস্তিকাটি প্রণয়নের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তিনি তাতে স্বাক্ষরও করেছিলেন। সৈয়দ আনোয়ার হোসেন লিখেছেন :

পাকিস্তান সৃষ্টির তিন-চার মাসের মধ্যেই পুস্তিকাটির প্রকাশন ও প্রচার তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের অধিবাসীদের জন্য পাকিস্তান নামের স্বপ্ন সম্পৃক্ত মোহভঙ্গের সূচনার প্রমাণ বহন করে। পুস্তিকাটি যাঁদের নামে প্রচারিত হয়েছিল তাঁরা সবাই অতীতে ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনে সম্পৃক্ত নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। উল্লেখ্য, এদেরই একজন ছিলেন ফরিদপুরের (বর্তমান গোপালগঞ্জ) শেখ মুজিবুর রহমান; পরবর্তীকালে যিনি বঙ্গবন্ধু হিসেবে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।৫

ওই সময় ভাষা-আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে অপপ্রচার চালায় বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো। এর জবাবে ‘অতিবামপন্থী বিভেদকারীদের সম্পর্কে হুঁশিয়ারী’ শিরোনামের এক লিফলেটে পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বলা হয়:

যে সবার আগে কারাবরণ করেছে এবং আজও যে কারাপ্রাচীরের অন্তরালে আবদ্ধ আছে সেই মুজিবর রহমান নিখিল পূর্ব্ব পাক মুসলিম ছাত্রলীগের মত ভূঁইফোঁড়, প্রতিক্রিয়াশীল, দালাল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাত মেলাতে ব্যস্ত এরূপ প্রলাপোক্তি ফেডারেশনের “আত্ম-প্রতারিত মূর্খরাই” করতে পারেন এবং তারাই এটা বিশ্বাস করতে পারেন। ফেডারেশনী চমুরা এমনি ধরনের অনেক প্রলাপোক্তিই করেছেন। আমরা জানি ছাত্রসমাজ সেগুলোকে উপেক্ষাই করবেন। কিন্তু এইসব অপপ্রচারের মধ্যে ফেডারেশনের যে বিভেদ সৃষ্টিকারী রূপ প্রকাশিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে পূর্ব্ব-পাকিস্তানের ছাত্র সমাজকে আমরা সতর্ক করে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছি।৬

৪ঠা জানুয়ারি ১৯৪৮

১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, নাইমউদ্দীন আহমদ, আবদুর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ, আবদুল মতিনসহ আরও কয়েকজন মিলিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলে। সেখানেই গঠিত হয় পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ গঠনের গোড়ার কথা বলতে গিয়ে ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিন বলেছেন :

শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘আপনারা এগিয়ে আসুন, আমরা একটি নতুন ছাত্র সংগঠন গড়ে তুলি।’ আমি তাঁর প্রস্তাবে রাজি হলাম। মোগলটুলীর ওয়ার্কাস ক্যাম্প সমর্থিত নেতৃত্বস্থানীয় ছাত্ররা শেখ মুজিবুর রহমানের আবেদনে সাড়া দিলেন। অলি আহাদ, নাইমউদ্দীন আহমদ, আবদুর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান এবং আমিসহ আরো কয়েকজন নেতৃত্বস্থানীয় ছাত্র ফজলুল হক হল মিলনায়তনে এক কর্মীসভায় বসি। এ সময় আমরা পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করি।৭

২৬শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮

পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষাবিষয়ক প্রস্তাব নাকচ হয় ১৯৪৮ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি। পরদিন ২৬শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও স্কুলের ছাত্ররা ‘ক্লাস বর্জন করে বাংলা ভাষার সমর্থনে স্লোগান দিতে দিতে রমনা এলাকা প্রদক্ষিণ করে।’৮ এই মিছিলের সমগ্র ব্যবস্থাপনায় ও পরিচালনায় শেখ মুজিব বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দান করেন।৯ পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তৃতা করেন ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নাইমউদ্দীন আহমদ, ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্র-সংসদের ভিপি মোহাম্মদ তোয়াহা প্রমুখ।

১লা মার্চ, ১৯৪৮

পাকিস্তান গণপরিষদে কংগ্রেস দলীয় সদস্য কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উত্থাপিত প্রস্তাবের বিপক্ষে খাজা নাজিমুদ্দীন যে বক্তব্য দেন, তাতে তিনি উর্দুর প্রতি পূর্ববঙ্গের মানুষের সমর্থন আছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন : ‘উর্দুই একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইতে পারে বলিয়া পূর্ব্ববঙ্গের অধিকাংশ লোকের অভিমত। বাংলাকে সরকারি ভাষা করিবার কোনই যুক্তি নাই।’১০ তাঁর এই বক্তব্যের প্রতিবাদে পূর্ববঙ্গের সর্বমহলে নিন্দার ঝড় ওঠে। খাজা নাজিমুদ্দীন পূর্বপাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীর এই মত কবে এবং কোথায় পেলেন, তাও সর্বসাধারণ জিজ্ঞাসা করেন।১১ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান শেখ মুজিবুর রহমানসহ পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্য নেতৃবৃন্দ। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়:

Secret information received on 1.3.48 that the subject [Sheikh Mujibur Rahman] along with others were contemplating to agitate against the Hon’ble Khaja Nazimuddin on his return from Karachi for the latter’s support of Urdu language in the Constituent Assembly. These agitators planned to stage blak flag demonstration either at the aerodrome or at the residence of the Chief Minister on his return from Karachi. The subject gave out that the students were determined to insult that molest the Hon’able Khaja Nazimuddin, which they intend to do by violating the orders u/s 144 Cr. p.c. if necessary.১২

২রা মার্চ ১৯৪৮

১৯৪৮ সালের ২রা মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠিত হয়। আহ্বায়ক নির্বাচিত হন শামসুল আলম। ‘এই সংগ্রাম পরিষদ গঠনে শেখ মুজিব বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন এবং তাঁর ভূমিকা ছিল যেমন বলিষ্ঠ তেমনি সুদূরপ্রসারী।’১৩ ভাষা-আন্দোলনের সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে পুনর্গঠন করা হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।’১৪

৪ঠা মার্চ, ১৯৪৮

১৯৪৮ সালের ৪ঠা মার্চ পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের বি. এল ক্লাসের প্রথম বর্ষের ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি লিফলেট বিলি করা হয়। ওই লিফলেটে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়।১৫ ১৯৪৮ সালের ৪ঠা মার্চ পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়:

Dacca, 4 March 1948 : Copy of the report of a D. I. O. dated 4/3/48. I have the honour to report the particulars of the members of the Provisional Organising Committee of East Pakistan Muslim Students League as fellow. They were the signatories the leaflet which advocated Bengali to be the State Language for Pakistan.

    4. Sk. Mujibur Rahman s/o Sk. Lutfar Rahman of Tungipara, Faridpur. Student 1st Yr. B.L., Dacca University, attached to S. M. Hall, at present c/o Kamruddin Ahmed, 150, Moghultulli, Dacca.১৬  

৫ই মার্চ, ১৯৪৮

১৯৪৮ সালের ২রা মার্চ ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ পুনর্গঠনের পর ৫ই মার্চ বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।১৭ এদিকে ১১ই মার্চের কর্মসূচি ঘোষণার পর জেলা ও মহকুমা শহরগুলোতে ভাষা-আন্দোলনের কর্মকা- ছড়িয়ে দিতে কেন্দ্রীয় নেতৃবন্দের পাশাপাশি মাঠে নামেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ সাংগঠনিকভাবে এই আন্দোলনকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন :

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুধু ঢাকায়ই সীমাবদ্ধ ছিল না। ফরিদপুর ও যশোরে কয়েক শত ছাত্র গ্রেপ্তার হয়েছিল। রাজশাহী, খুলনা, দিনাজপুর ও আরও অনেক জেলায় আন্দোলন হয়েছিল। নিখিল পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ চেষ্টা করেছিল এই আন্দোলনকে বানচাল করতে, কিন্তু পারে নাই।১৮

শুধু তাই নয়, ১১ই মার্চ ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণার পর ছাত্রলীগ নেতারা জেলায় জেলায় প্রচারের জন্য বের হন। পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের উপর দায়িত্ব পড়ল ফরিদপুর, যশোর, দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের ছাত্রসমাজকে ভাষা-আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার কাজে। তিনি ওই সব অঞ্চল সফর করে ছাত্রদের ভাষা-আন্দোলনে যুক্ত করেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন : ‘সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম। আমি ফরিদপুর, যশোর হয়ে দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করে ঐ তারিখের তিন দিন পূর্বে ঢাকায় ফিরে এলাম।’১৯ 

১০ই মার্চ ১৯৪৮

‘গণ-পরিষদের সরকারি ভাষা-তালিকা থেকে বাংলাকে বাদ দেওয়া, পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকিটে বাংলা ব্যবহার না করা ও নৌ-বাহিনীতে নিয়োগের পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে এবং অবিলম্বে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব-পাকিস্তানের সরকারি ভাষারূপে ঘোষণা করার  দাবিতে ১১ই মার্চ’ ধর্মঘট পালন করা হয়। এই ধর্মঘট সফল করার জন্য ১০ই মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান সন্ধ্যার দিকে ঢাকা পৌঁছেন এবং দফায় দফায় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে ১১ই মার্চের কর্মসূচি ঠিক করেন। এ প্রসঙ্গে অলি আহাদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন : ‘সেদিন সন্ধ্যায় যদি মুজিব ভাই ঢাকায় না পৌঁছাতেন তাহলে ১১ মার্চের হরতাল, পিকেটিং কিছুই হতো না।’২০ ঢাকা শহরের কোন কোন স্থানে পিকেটিং করা হবে, কে কোথায় অবস্থান করবে সবকিছু ঠিক করা হয়। পুলিশি গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।২১

১১ই মার্চ, ১৯৪৮

১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট পালিত হয়। এই ধর্মঘটে পিকেটিং করতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি হন। ১১ই মার্চের ধর্মঘট ও নিজের গ্রেপ্তার হওয়া প্রসঙ্গে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন:

১১ই মার্চ ভোরবেলা শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং, জেনারেল পোস্ট অফিস ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করলো। ... সকাল নয়টায় ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনের দরজায় লাঠিচার্জ হল। খালেক নওয়াজ খান, বখতিয়ার, শহর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম. এ. ওয়াদুদ গুরুতররূপে আহত হল। ...আমাদের উপর কিছু উত্তম মধ্যম পড়ল এবং ধরে নিয়ে জিপে তুলল।... অলি আহাদও গ্রেফতার হয়ে গেছে। ...আমাদের প্রায় সত্তর-পঁচাত্তরজনকে বেঁধে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল সন্ধ্যার সময়।২২

১৫ই মার্চ, ১৯৪৮

১৫ই মার্চ মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ঐ চুক্তি স্বাক্ষরের আগে কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য নেতৃবৃন্দকে দেখানো হয়। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছেন:

আমরা ছাড়া পাওয়ার পূর্বে জেল গেটে সেদিনই কমরুদ্দীন, আবুল কাসেম, নূরুল ইসলাম প্রভৃতি গিয়েছিলেন আমাদের সঙ্গে চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করতে। আমরা অনুমোদন করেছিলাম।২৩

চুক্তির শর্ত মেনে ১৫ই মার্চ ভাষা-আন্দোলনের বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হলেও এটা ছিল মূলত, জিন্নাহর পূর্ববঙ্গ সফরকে কেন্দ্র করে আন্দোলন থামানোর সাময়িক কৌশল। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল সরকার পক্ষের বড় ধরনের ভাঁওতাবাজি। ফলে শেখ মুজিবসহ ভাষা-আন্দোলনের নেতারা এটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে গাজীউল হক বলেছেন:

মুক্তিলাভের পর শেখ মুজিবুর রহমান দেখলেন, আট দফা চুক্তির নামে খাজা নাজিমুদ্দীনের সরকার ছাত্র নেতৃবৃন্দকে প্রকৃতপক্ষে প্রতারিত করেছে। আট দফায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য কোন প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়নি। সুতরাং শেখ মুজিব আট দফা চুক্তি প্রত্যাখান করলেন।২৪

১৬ই মার্চ ১৯৪৮

১৬ই মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সংগ্রাম পরিষদের সভায় সর্বসম্মতিক্রমেই শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।২৫ ওই সভায় অনেকেই বক্তৃতা করেন। সভার সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা শেষে ছাত্ররা স্লোগান দেয়, ‘চলো চলো এ্যাসেম্বলি চলো।’ তারপর শুরু হয় বিক্ষোভ মিছিল।২৬ মিছিল থেকে ধ্বনি ওঠে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘পাকিস্তানি জিন্দাবাদ’, ‘উর্দু বাংলা ভাই ভাই, উর্দুর সঙ্গে বিরোধ নাই।’ মিছিলটি পরিষদ ভবনের কাছে পৌঁছালে পুলিশ বাঁধা দেয়। ছাত্ররা পুলিশি জুলুমের প্রতিবাদ করে এবং প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে। একপর্যায়ে পুলিশ বেপরোয়াভাবে লাঠিচার্জ করে এবং ফাঁকা গুলি চালায়। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি থেকে জানা যায়:

ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় মি. গফুর ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রহমতুল্লাহর নেতৃত্বে একদল পুলিশ এসে ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ, ফাঁকা গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়লো তারা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরেও গুলি ছুড়লো। লাঠিচার্জে ১৯ জন মারাত্মকভাবে আহত হলো। শওকত তাদের অন্যতম।২৭

শওকত আলীর আহত হওয়া প্রসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন:

হঠাৎ খবর এল, শওকত মিয়া আহত হয়ে হাসপাতালে আছে। তাড়াতাড়ি ছুটলাম তাকে দেখতে। সত্যই সে হাতে, পিঠে আঘাত পেয়েছে। পুলিশ লাঠি দিয়ে তাকে মেরেছে। আরও কয়েকজন সামান্য আহত হয়েছে।২৮

মূলত, শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলেই ১৬ই মার্চের পর ভাষা-আন্দোলন ‘তমদ্দুন মজলিস বলয়ের বাইরে ছাত্রলীগের নেতৃত্বভুক্ত হয়ে পড়ে।’২৯ শুধু তাই নয়, ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ থেকে ভাষা আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের মুক্তি লাভের পর আন্দোলনে নেতৃত্ব মুখ্যত শেখ মুজিবের হাতেই আবার চলে আসে।’৩০  

১৭ই মার্চ ১৯৪৮

১৯৪৮ সালের ১৭ই মার্চ পূর্ববঙ্গের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। বেলা ১২.৩০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নাইমউদ্দীন আহমদ। সে সভায় শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, আবদুর রহমান চৌধুরীসহ অন্য ছাত্রনেতারা অংশগ্রহণ করেন। ওই সভা সম্পর্কে তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন :

সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের প্রতিবাদসভায় যোগ দিলাম। সভাপতিত্ব করলেন নাইমউদ্দীন সাহেব। ছাত্র ফেডারেশনের কর্মীরা তাদেরকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে হট্টগোল বাঁধাবার চেষ্টা করেছিল।৩১

এ সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুর রহমান চৌধুরী, অলি আহাদ প্রমুখ। সভায় ১৬ তারিখ অপরাহ্ণে পরিষদ ভবনের সম্মুখে পুলিশি জুলুমে আহতদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে পুলিশি জুলুমকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করা হয়।

২১শে মার্চ ১৯৪৮

১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। ঐ সংবর্ধনা-সভায় শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। সেদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন:

জিন্নাহ পূর্বপাকিস্তানে এসে ঘোড় দৌড় মাঠে বিরাট সভায় ঘোষণা করলেন, “উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।” আমরা প্রায় চার পাঁচ শত ছাত্র এক জায়গায় ছিলাম সেই সভায়। অনেকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিল, ‘মানি না।’৩২

৩০ শে মার্চ ১৯৪৮

মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা ত্যাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের সামনে অনুষ্ঠিত এক সভায় কতিপয় ছাত্রনেতার উর্দুপ্রীতিমূলক বক্তৃতার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। এ বিষয়ে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন:

জিন্নাহ চলে যাওয়ার কয়েকদিন পরে ফজলুল হক হলের সামনে এক ছাত্রসভা হয়। তাতে একজন ছাত্র বক্তৃতা করছিল, তার নাম আমার মনে নাই। তবে সে বলেছিল “জিন্নাহ যা বলবেন, তাই আমাদের মানতে হবে। তিনি যখন উর্দুই রাষ্ট্রভাষা বলেছেন তখন উর্দুই হবে।” আমি তার প্রতিবাদ করে বক্তৃতা করেছিলাম, আজও আমার এই একটা কথা মনে আছে। আমি বলেছিলাম, “কোন নেতা যদি অন্যায় কাজ করতে বলেন, তা প্রতিবাদ করা এবং তাকে বুঝিয়ে বলার অধিকার জনগণের আছে। যেমন হযরত ওমরকে (রা.) সাধারণ নাগরিকরা প্রশ্ন করেছিলেন তিনি বড় জামা পরেছিলেন বলে। বাংলা ভাষা শতকরা ছাপ্পান্নজন লোকের মাতৃভাষা, পাকিস্তান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সংখ্যাগুরুদের দাবি মানতেই হবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। তাতে যাই হোক না কেন, আমরা প্রস্তুত আছি।” সাধারণ ছাত্ররা আমাকে সমর্থন করল। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও যুবকরা ভাষার দাবি নিয়ে সভা ও শোভাযাত্রা করে চলল।৩৩

১৭ই নভেম্বর, ১৯৪৮

১১ই সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হলে লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর ঢাকা আগমনকে কেন্দ্র করে ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি বৈঠক বসে। আজিজ আহমদ, আবুল কাসেম, শেখ মুজিবুর রহমান, কামরুদ্দীন আহমদ, আব্দুল মান্নান, আনসার এবং তাজউদ্দীন আহমদ এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।৩৪ এতে ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও আজিজ আহমদ বাংলা ভাষার দাবির পক্ষে তাঁদের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান। বৈঠকে লিয়াকত আলী খানকে একটি স্মারকলিপি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১৮ই নভেম্বর লিয়াকত আলী খান ঢাকা সফরে এলে ‘ছাত্রসমাজ বিক্ষোভ প্রদর্শন ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবি উত্থাপন করে।’৩৫ তবে লিয়াকত আলী খান অতি কৌশলে এসব দাবির বিষয় এড়িয়ে যান।

এভাবে অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, ভাষা-আন্দোলনের প্রথম পর্বে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল অতি উজ্জ্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ও পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তিনি এই আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন।  

৫২-র ভাষা আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু ‘পাকিস্তানের নিরাপত্তা আইনে কারাবান্দি ছিলেন। বন্দি অবস্থায়ও তিনি আন্দোলনে দিক-নির্দেশনমূলক ভূমিকা পালন করেন।’৩৬ কারাগার থেকে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করতে আনা হলে তিনি ‘ছাত্রলীগ ও আন্দোলনের অন্য কর্মীদের’৩৭ এবং গোপালগঞ্জ কারাগারে স্থানান্তরের সময় নারায়ণগঞ্জের নেতা-কর্মীদের ভাষা-আন্দোলনে করণীয় সম্পর্কে ‘নির্দেশনা দেন।’৩৮ ‘বঙ্গবন্ধু ১৯৫০ সালে গ্রেফতার হন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে গুলি হয়। সালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেক শহীদ রক্ত দেয়। বঙ্গবন্ধু তখনো বন্দি। বন্দি থাকা অবস্থায়ও ছাত্রদের সাথে সব সময় তাঁর যোগাযোগ ছিল। তিনি যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্রসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতেন।’৩৯ ভাষা-আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে বারবার জেলে গেলেও বঙ্গবন্ধু তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। তাই ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি জেলে থেকেও নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন এবং চিরকুট পাঠিয়ে আন্দোলনের কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন।

১৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯৫২

১৯৫২ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর কারাগারে নিজেদের মুক্তি ও  ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে’৪০ অনশন শুরু করেন শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদ। ১৯৫২ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেল কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে এক পত্রে এ বিষয়টি জানান।৪১ শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদের অনশনের সংবাদটি সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ছাপা হয় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : ‘আমরা জেলগেটে এসে দেখি, জেলার সাহেব, ডেপুটি জেলার সাহেব এসে গেছেন। আমাদের তাড়াতাড়ি ভিতরে নিয়ে যেতে বললেন। তাঁরা পূর্বেই খবর পেয়েছিলেন। জায়গাটাও ঠিক করে রেখেছেন, তবে রাজবন্দিদের সাথে নয়, অন্য জায়গায়। আমরা তাড়াতাড়ি ঔষধ খেলাম পেট পরিষ্কার করবার জন্য। তারপর অনশন ধর্মঘট শুরু করলাম।’৪২ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘শেখ মুজিবরের অনশন ধর্মঘট’ শীর্ষক সংবাদে এ প্রসঙ্গ উল্লেখ আছে।৪৩ 

দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’ শিরোনামের এক সংবাদে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদের অনশন ধর্মঘট সম্পর্কে বলা হয়:

আটক বন্দী শেখ মুজীবুর রহমান ও মউিদ্দিন আহমদ গোপালগঞ্জ জেলে বিগত নয় দিবস ধরিয়া অনশন ধর্ম্মঘট চালাইতেছেন বলিয়া জানা গিয়াছে। অনশনের ফলে তাঁদের স্বাস্থ্য ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে বলিয়া প্রকাশ। এ-সংবাদ নিশ্চয়ই দুঃখজনক। সরকারের নিকট আমরা অবিলম্বে ইহাদের মুক্তি দাবী করি। আর বন্দদ্বয়কে আমাদের অনুরোধ, তাঁরা এই অনশন ধর্ম্মঘট ত্যাগ করুন।৪৪

তাঁদের অনশন ধর্মঘটের সংবাদ বাইরে প্রচার হলে ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে লিফলেট ছেপে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রস্তুতকৃত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনেও একই কথা বলা আছে।৪৫ 

পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনসমূহে দেখা যায়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে, সেখানে বসেই শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করেন।৪৬ ১৯৫১ সালের ৩০শে আগস্ট থেকে ১৯৫২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে বেশ কয়েকবার ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে সময় আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, ছাত্রনেতা, চিকিৎসক, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন।৪৭ ১৯৫১ সালের ১৩ই নভেম্বরের গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওইদিন সকাল ৯টায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে তাঁর কয়েকজন পুরোনো বন্ধু, আনোয়ারা বেগম এমএনএ, খয়রাত হোসেন এমএনএ, মানিক মিয়া, আহমদ হোসাইন এবং প্রায় ৩০ জন মেডিকেল ছাত্র তাঁর সঙ্গে দেখা করেন।৪৮ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ৩০শে নভেম্বর ১৯৫১ তারিখ সকাল ৯.১৫টায় শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খান ও জনৈক নূরুল ইসলাম। তাঁরা ৯.১৫টা থেকে ৯.৪৫টা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় আব্দুস সালাম খান নামক এক গোয়েন্দা সদস্য একটু দূরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাঁরা কী বিষয়ে আলাপ করেন তা শুনতে পান নি বলে ৩০শে নভেম্বর, ১৯৫১ তারিখের রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন।৪৯ ২৫শে জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেবিনে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান, আজিজ আহমদ; পূর্বপাকিস্তান যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ; পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুল হক চৌধুরী, ও সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুুব। তাঁরা সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়ে নানা আলাপ করেন।৫০ এভাবে হাসপাতালের কেবিন থেকে নিরাপত্তা-বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান ‘পুলিশের নজরকে ফাঁকি দিয়ে তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে দেশের সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলোচনা এবং ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে পরামর্শ প্রদান’৫১ করেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ১৯৫২ সালে ২৭শে জানুয়ারি পল্টন ময়দানে জিন্নাহর উক্তি পুনর্ব্যক্ত করে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে পূর্ববঙ্গের ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কারাবন্দি শেখ মুজিবের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের আলোচনা হয়। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং একুশে ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালনের। কেবল তাই নয়, ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র আহ্বায়ক যাতে ছাত্রলীগ থেকেই করা হয়, সে বিষয়েও শেখ মুজিবুর রহমান নির্দেশনা দেন। এ প্রসঙ্গে অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং বিভিন্ন ভাষণে তিনি বিস্তারিত বলেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন:

আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে।  আমি ওদের রাত একটার পরে আসতে বললাম। আরও বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পিছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাতজন এসেছে। ... বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হল। অলি আহাদ ও তোয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে। ...সেখানেই ঠিক হল, আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত গঠন করতে হবে।৫২

২৯শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২

২৯শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-র গোয়েন্দা প্রতিবেদনে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দীন আহমেদের মুক্তির দাবি-সংবলিত আরেকটি লিফলেটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রচারিত হয় পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে। এই লিফলেটে তখনকার মুসলিম লীগ সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট’ অভিহিত করে তাদের অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।৫৩ কেবল লিফলেট বিতরণ নয়, অনশনরত শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়।৫৪ কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল একই দাবি উচ্চারিত হয়।৫৫  ঢাকায় পুলিশের গুলিবর্ষণে ছাত্রজনতার শহীদ হওয়ার খবর শেখ মুজিবুর রহমান জেলখানা থেকেই জানতে পারেন। এই মর্মান্তিক খবর শুনে তিনি বেদনা-ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন। সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভরা মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন :

২১ ফেব্রুয়ারি আমরা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন কাটালাম, রাতে সিপাহীরা ডিউটিতে এসে খবর দিল, ঢাকায় ভীষণ গোলমাল হয়েছে। কয়েকজন লোক গুলি খেয়ে মারা গেছে। রেডিওর খবর। ফরিদপুরে হরতাল হয়েছে, ছাত্রছাত্রীরা শোভাযাত্রা করে জেলগেটে এসেছিল। তারা বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বাঙালিদের শোষণ করা চলবে না’, ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’, আরও অনেক স্লোগান। ... রাতে যখন ঢাকার খবর পেলাম তখন ভীষণ চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়লাম। কত লোক মারা গেছে বলা কষ্টকর। তবে অনেক লোক গুলি খেয়ে মারা গেছে শুনেছি। ...খুব খারাপ লাগছিল, মনে হচ্ছিল চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলেছি।৫৬

১৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২

ভাষা-আন্দোলনের সময় শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য বন্দিদের মুক্তির ব্যাপারে পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগসহ অন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নানা দাবি-দাওয়া করেন। পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুল হক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক খালেক নওয়াজ খান,  জিল্লুর রহমান, গাজীউল হক, নাদেরা বেগমসহ অন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন। ১৫ই ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তরের পর ১৮ই ফেব্রুয়ারি ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে কারাগার থেকে একটি গোপনীয় চিঠি আসে, যাতে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দীন আহমেদের অনশন ও মুক্তির প্রসঙ্গ উল্লেখ ছিল। এর ফলে ১৯শে ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রসভা হয়।৫৭ ওইদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিনসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি দারি করে পোস্টারও দেওয়া হয়।৫৮ এর আগে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভায় আবেদন করা হয়। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় :

পাকিস্তান সংগ্রামের জঙ্গী কর্মী, ছাত্র-যুব আন্দোলনের অগ্রনায়ক ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বিনা বিচারে দীর্ঘ কারাবাস ও বন্ধ দিনগুলির নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে জীর্ণ স্বাস্থ্যের জন্য উৎকণ্ঠার ও ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ তুলিয়া প্রদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই প্রদেশের সকল রাজনৈতিক কর্মী বিশেষ করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনের আশু মুক্তির প্রশ্নে পূর্ববঙ্গ পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে এক আবেদনপত্র পেশ করিয়াছেন। স্বাক্ষরকারীগণ বলেন- সর্বশক্তি নিয়োজিত করিয়া আপনারা পাকিস্তানে আইন ও নীতির শাসন, সৌভ্রাতৃত্ব ও গণতন্ত্র কায়েম করুন। ...আসুন আসুন, আপনারা পরিষদের ভিতরে আর আমরা বাহিরে পূর্ববঙ্গের রাজবন্দীদের বিশেষ করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনের মুক্তির দাবিতে আওয়াজ তুলি।৫৯

কেবল রাজপথ এবং সভা-সমাবেশে নয়, বঙ্গীয় আইন পরিষদেও শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি তোলা হয়। তাঁর ‘অনশন পালন বিষয়ে আলোচনার জন্য পূর্ব পাকিস্তান এ্যাসেম্বিলিতে আনোয়ারা খাতুন এমএলএ  মুলতবি প্রস্তাব পর্যন্ত উত্থাপন করেছিলেন।’৬০ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ‘মানবতার নামে’ শীর্ষক এক পৃথক বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমদের মুক্তির দাবি জানান।৬১ কারাগারে গিয়েও শেখ মুজিবুর রহমান কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। এতে আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছে। কখনো গোপনে সাক্ষাৎ করেছেন, কখনো চিরকুট বা চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন। গাজীউল হক লিখেছেন :

১৯৫২ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারী তারিখ ভোরে জেলখানা থেকে পাচার হয়ে একটি গোপনীয় চিঠি আসে। সে চিঠিতে বলা হয় যে, জনাব শেখ মুজিবুর রহমান এবং জনাব মহিউদ্দীন আহমদÑএ দু’জন অনশন ধর্মঘট করছেন। ... ১৯ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজবন্দীদের মুক্তির দাবী করা হয়।৬২

শেখ মুজিবের মুক্তিলাভ

১৯৫২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিলাভ করেন। ঐদিনের সরকারি এক প্রতিবেদনে বলা যায়: ÔSecurity prisoner Sk. Mujibur Rahman broke his fast on receipt of the Govt. order for his release on the afternoon of 25. 2. 52. He was let off from the jail on the morning of 27. 2 পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দীন আহমেদের মুক্তি প্রসঙ্গে বলা হয়: ÔGovt. orders for the release of Security Prisoners Sk. Mujibar Rahman and Muhiuddin Ahmed were served on them on 25.2.52 and 28.2.52 but they were actually relieved from the jail Hospital on 27.2.52 respectively.’৬৩  নিজের মুক্তি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বিন্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।৬৪

১৯৫২ সালের ৩১শে মার্চ প্রকাশিত সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার এক সংবাদে বলা হয়:

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারী মুক্তি পাইয়া (২৭ শে ফেব্রুয়ারি মুক্তির আদেশ পান) জনাব শেখ মুজিবুর রহমান তার গ্রামের বাড়ীতে অবস্থান করিতেছেন। তাহার স্বাস্থ্যের অবস্থা এখনও উদ্বেগজনক। ঢাকায় ছাত্রদের উপর গুলি চালনা ও ধরপাকড়ের খবরে তিনি অতিশয় মর্মাহত হইয়াছেন। তিনি শহীদদের শোকসন্তপ্ত পরিবার পরিজনকে সমবেদনা জ্ঞাপন করিয়াছেন।

জনাব রহমান শীঘ্রই চিকিৎসার জন্য ঢাকা আসিবেন। আড়াই বৎসর কারাবাসের ফলে তাহার স্বাস্থ্যের অবস্থা একদম ভাঙ্গিয়া গিয়াছে।৬৫

কারামুক্ত হয়ে কিছুদিন গ্রামে অবস্থান করে শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় চলে আসেন এবং নিরাপত্তা-বন্দিদের মুক্তি দাবিতে বিবৃতি দেন। পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়ে তিনি একটি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বিস্তারিত লিখেছেন।৬৬

২৭শে এপ্রিল, ১৯৫২

১৯৫২ সালের ২৭শে এপ্রিল ঢাকার বার লাইব্রেরি হলে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন পুনর্গঠিত ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র আহ্বায়ক আতাউর রহমান খান। এতে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন।

এই সম্মেলনে শেখ মুজিব রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন। তিনি রাষ্ট্রভাষার উপর গণভোট দাবি করেন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে এ বিষয় উল্লেখ আছে।৬৭

১৫ই মে, ১৯৫২

১৫ই মে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র উদ্যোগে দেশজুড়ে ‘স্বাক্ষর অভিযান’ আরম্ভ হলে শেখ মুজিবুর রহমান তাতে সম্পৃক্ত হন।

২০শে এপ্রিল, ১৯৫২

কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে বক্তৃতা-বিবৃতি প্রদান করে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সোচ্চার হন। ১৯৫২ সালের ২০শে এপ্রিল বরিশালে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি সরকারের সমালোচনা করে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন। এ সম্পর্কে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বিস্তারিত বলা হয়েছে৬৮।

এরপর লাহোরে গিয়েও তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ‘পূর্বপাকিস্তানের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গন্য করার দাবী জানান।’৬৯ ১৬ই জুন ১৯৫২ দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় এ সংবাদ প্রকাশিত হয়।

জুন, ১৯৫২

ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে একটি বিবৃতি দেন। তাঁর ওই বিবৃতি সরকারসমর্থক পত্র-পত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। এতে ভাষা-আন্দোলনকারীরা বিব্রত হন এবং তাঁর বিবৃতির প্রতিবাদ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীর এই মত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালের জুন মাসে তিনি লাহোরে যান এবং ভাষা-আন্দোলনের পক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমর্থন আদায় করেন। শুধু তাই নয়, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তাঁকে দিয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করান। ১৯৫২ সালের ২৯শে জুন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ওই বিবৃতি প্রকাশিত হয়।

সেপ্টেম্বর, ১৯৫২

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য চীন সফরে যান। সেখানে গিয়ে তিনি ‘মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেছিলেন।’৭০ চীন সফরের সেই স্মৃতি স্মরণ করে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন :

পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম।...কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না? ভারত থেকে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করলেন। পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। ...আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পরে মনোজ বসু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক, কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছে আমরা বাংলা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি।৭১

৫ই ডিসেম্বর, ১৯৫২

১৯৫২ সালের ৫ই ডিসেম্বর ‘বন্দিমুক্তি দিবস’ উপলক্ষে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র উদ্যোগে আরমানিটোলা ময়দানে আরও একটি বিরাট সমাবেশ হয়। আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত ওই সমাবেশে বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, ছাত্রলীগ নেতা কামরুজ্জামান, দেওয়ান মাহবুব আলী, ইব্রাহিম ত্বাহা, সুলেমান খান, আশরাফ ফারুকী, মুহম্মদ এমাদুল্লাহ, গাজীউল হক প্রমুখ।৭২ ১৯৫২ সালের ২০শে ডিসেম্বর মতামত পত্রিকায় বলা হয়:

ঢাকা, ৮ই ডিসেম্বর (বিলম্বে প্রাপ্ত)Ñগত ৫ই ডিসেম্বর ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে বন্দীমুক্তি দিবস উপলক্ষে এক বিরাট সমাবেশ হয়। ...ঐদিন ঢাকায় আরমানিটোলা ময়দানে রাষ্ট্রভাষা কমিটির কনভেনর ও আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে এক বিরাট সভা হয়। সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, “মওলানা ভাসানীসহ বহু কর্মী বিনা বিচারে আটক রহিয়াছেন, ভাষা আন্দোলন ছাড়াও জনতার অন্যান্য দাবী নিয়া যাঁহারা লড়িতেছিলেন তাঁহাদের অনেককে সরকার ইতঃপূর্বে আটক রাখিয়াছে। মওলানা ভাসানী ও সহকর্মীরা জেলে থাকিলে আমরা বাহিরে থাকিতে চাহি না। সরকার অবিলম্বে বন্দীদের মুক্তি না দিলে দেশব্যাপী গণ-আন্দোলন সৃষ্টি হইবে। ...সভায় ইসলামিক ভ্রাতৃসংঘের ইব্রাহিম ত্বাহা, তমদ্দুন মজলিসের আশরাফ ফারুকী, ছাত্রলীগের কামরুজ্জামান, গণতন্ত্রী দলের দেওয়ান মাহবুব আলী, খেলাফত পার্টির সুলেমান খান, মহম্মদ ইমাদুল্লা, গাজীউল হক বক্তৃতা করেন।৭৩

১৯৫২ সালের আন্দোলন কেবল ভাষা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এ আন্দোলন ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।৭৪ কারাগারে বন্দি থেকেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও অন্য সংগঠনের নেতা-কর্মীদের এ আন্দোলন সফল করতে নির্দেশনা দেন। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু আন্দোলন-সংগ্রামে দেখা যায়, অনেক নেতা কারাগারে থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটে নি। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি কারাবন্দি থাকলেও, তাঁর নেতৃত্বেই বাঙালি পেয়েছে পরাধীনতা থেকে মুক্তির মূলমন্ত্র। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন এমনই এক আন্দোলন ছিল, যে আন্দোলনে কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান রেখেছেন অসামান্য অবদান।   

তথ্যসূত্র

১.    মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, ‘কথামুখ’, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এম আর মাহবুব, অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা : ফেব্রুয়ারি ২০১৩; পৃ. ৭

২.    মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, ‘কথামুখ’, রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এম আর মাহবুব, পৃ. ৭

৩.    অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, ‘ভাষা সংগ্রাম: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভূমিকা’, ভালোবাসি মাতৃভাষা, পৃ. ১১৭

৪.    শায়খুল বারী, রাষ্ট্রভাষা- ২১ দফা ইস্তেহার, ঐতিহাসিক দলিল, পুনঃপ্রকাশ, জানুয়ারি ২০০২

৫.    উদ্ধৃত, এম আর মাহবুর, রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ. ৩০

৬.    ‘অতিবামপন্থী বিভেদকারীদের সম্পর্কে হুশিয়ারী’; উদ্ধৃত, বদরুদ্দীন উমর, ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ: কতিপয় দলিল-১, পৃ. ২১৮-২২২

৭.    আবদুল মতিন, ‘একুশের হয়ে ওঠা’, একুশের পটভূমি একুশের স্মৃতি, পৃ. ৭২

৮.    বশীর আল্হেলাল, ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ. ২৪৫

৯.    মযহারুল ইসলাম, ভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব, পৃ. ১৯-২০

১০.  দৈনিক আজাদ, ২৬শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮

১১.  দৈনিক আজাদ, ২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮

১২.   Sheikh Hasina [edited], ÔSecret  Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman (1948-1971),Vol–1, Hakkani Publishers, Dhaka : September, 2018; p. 16

১৩.   মযহারুল ইসলাম, ভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব, দ্বিতীয় মুদ্রণ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা : এপ্রিল ২০১৭; পৃ. ২০

১৪.   বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৭০

১৫.   শামসুজ্জামান খান, ‘পাকিস্তান আমলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের নিরিখে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম’, দৈনিক প্রথম আলো, ঢাকা ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০১৮

১৬.   Sheikh Hasina [edited], ÔSecret  Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman (1948-1971), Vol–1, p. 7

১৭.   ‘আমি এফ এইচ হলে গেলাম। বিকেল সাড়ে ৫টায় তোয়াহা সাহেবের সঙ্গে নাস্তা ও দুধ খেলাম। রাষ্ট্রভাষা কমিটির সভা চলছে। এ সময় মুজিব ঢাকা হল থেকে এলেন।’Ñ৫ই মার্চ ১৯৪৮; তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি ১৯৪৭-১৯৪৮, প্রথম খণ্ড, পৃ. ২২২ 

১৮.   শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ৯৮

১৯.   শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ৯২ 

২০.   অলি আহাদ, সাক্ষাৎকার; ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪; পৃ. ২৫

২১.   মোহাম্মদ সেলিম, ‘পাকিস্তানি গোয়েন্দা নজরদারিতে শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর রাজনীতি’, উত্তরণ, ড. নূহ-উল-আলম লেনিন [সম্পাদিত], ঢাকা: অক্টোবর ২০১৮

২২.   শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ৯৩

২৩.   মোহাম্মদ এ আরাফাত ও অন্যান্য, ভাষাসংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু, সুচিন্তা ফাউন্ডেশন, ঢাকা : ফেব্রুয়ারি ২০১৮; পৃ. ১৯

২৪.   শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, পৃ. ২০৬

২৫.   মযহারুল ইসলাম, ভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব, পৃ. ২৫

২৬.   শেখ মুজিবুর রহমান, ‘ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ’, ভালোবাসি মাতৃভাষা, পৃ. ৩

২৭.   তাজউদ্দীন আহমদ, ১৬ই মার্চ, ১৯৪৮; তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি ১৯৪৭-১৯৪৮, প্রথম খণ্ড, পৃ. ২৩১

২৮.   শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ৯৭

২৯.   শেখ মুজিবুর রহমান, ‘ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ’, ভালোবাসি মাতৃভাষা, পৃ. ৩

৩০.   আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ‘একুশকে নিয়ে কিছু স্মৃতি: কিছু কথা,’ ভালোবাসি মাতৃভাষা, পৃ. ২৬৪

৩১.   তাজউদ্দীন আহমদ, ১৭ই মার্চ, ১৯৪৮; তাজউদ্দিন আহমদের ডায়েরি ১৯৪৭-১৯৪৮, প্রথম খণ্ড; পৃ. ২৩১

৩২.   শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ৯৯

৩৩.   শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, পৃ. ২০৬

৩৪.   বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১২৬৪

৩৫.   আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন [সম্পদিত], ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস, পৃ. ১৩

৩৬. হারুন-অর-রশিদ, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পুনর্পাঠ, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা :  ২০১৩; পৃ. ৪০

৩৭.   হারুন-অর-রশিদ, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পুনর্পাঠ, পৃ. ৪০

৩৮. হারুন-অর-রশিদ, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পুনর্পাঠ, পৃ. ৪০

৩৯.   শেখ হাসিনা, নির্বাচিত প্রবন্ধ, চতুর্থ মুদ্রণ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা: জুলাই ২০১৮; পৃ. ৭৫

৪০.   বেবী মওদুদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবার, পৃ. ৬৩

৪১.   উদ্ধৃত, এম আর মাহবুব, রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ. ৮৮

৪২.   শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২০১

৪৩.   দৈনিক আজাদ, ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২

৪৪.   দৈনিক আজাদ, ২৫ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২

৪৫.   Sheikh Hasina (edited), Secret Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol-2, p. 140-141

৪৬.   Sheikh Hasina (edited), Secret Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol-2, (1951-1952), P. 137

৪৭.   বিস্তারিত দেখুন: Sheikh Hasina (edited), Secret Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol-2, (1951-1952), Hakkani Publishers, Dhaka : February, 2019; P. 116

৪৮.   Sheikh Hasina (edited), Secret Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol-2, (1951-1952),  P. 116

৪৯.   Sheikh Hasina (edited), Secret Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol-2, (1951-1952), P. 123

৫০.   Extract from Secret information, dated 18.2.52 GOEB, Home Poll, F/N, 606-48PF, Part-3; উদ্ধৃত, ড. সুনীল কান্তি দে, বায়ান্নে গোয়েন্দা নজরে শেখ মুজিবের দৈনন্দিন জীবন, গতিধারা, ঢাকা : ফেব্রুয়ারি ২০০৯; পৃ. ১৬

৫১.   ড. সুনীল কান্তি দে, বায়ান্নে গোয়েন্দা নজরে শেখ মুজিবের দৈনন্দিন জীবন, গতিধারা, ঢাকা : ফেব্রুয়ারি ২০০৯; পৃ. ১৭

৫২.   শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১৯৬-১৯৭

৫৩.   শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা, পৃ. পৃ. ২০৪-২০৫

৫৪.   Sheikh Hasina (edited), Secret Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol-2, p. 141-142

৫৬.   Sheikh Hasina (edited), Secret Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol-2, p. 142

৫৬.   শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২০৩

৫৭.   বশীর আল্হেলাল, ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ. ৩৪৩ ; 

৫৮.   বশীর আল্হেলাল, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ. ৩৪৩ 

৫৯.   সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৯৫২

৬০.   হারুন-অর-রশিদ, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পুনর্পাঠ, পৃ. ৫১

৬১.   আহমদ রফিক, একুশের দিনলিপি, পৃ. ৯৮

৬২.   গাজীউল হক, ‘একুশের স্মৃতিচারণ’, বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, পৃ. ৫৬

৬৩. Sheikh Hasina (edited), Secret Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol-2, (1951-1952), p. 151

৬৪.   শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২০৫-২০৭

৬৫.   ইত্তেফাক, ৩১শে মার্চ ১৯৫২

৬৬. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২১২

৬৭.   সাপ্তাহিক সৈনিক, ৪ঠা মে, ১৯৫২

৬৮   Sheikh Hasina [edited], Secret Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman 1951-1952, Vol-2, P. 163-164

৬৯.   শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২১৮

৭০.   সাপ্তাহিক সৈনিক, ১৩ই জুলাই ১৯৫২

৭১.   উদ্ধৃত, নিতাই জানা (সম্পাদিত), মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ঢাকা : ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮; পৃ. ৬৯-৭০

৭২.   বশীর আলহেলাল, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ. ৫৮০

৭৩.   সাপ্তাহিক মতামত, ২০শে ডিসেম্বর ১৯৫২

৭৪.   শেখ মুজিবুর রহমান, ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭১-এর প্রথম শহীদ মিনারে প্রদত্ত ভাষণ।

Leave a Reply

Your identity will not be published.