যুক্তরাষ্ট্রে যেমন ছিল ডিসি বইমেলা...

যুক্তরাষ্ট্রে যেমন ছিল ডিসি বইমেলা...

চার বছর অতিক্রম করল যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিসি বইমেলা’। বেশ কয়েক বছর আগে, কয়েকজন মননশীল মানুষের উদ্যোগে মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া, ডিসি এই তিন স্টেটের সমন্বিত এলাকায় গড়ে উঠেছিল একটি সাহিত্যচর্চার প্ল্যাটফর্ম, যার নাম ছিল, ‘গানের ছোঁয়ায় কবিতা’।

এরই ধারাবাহিকতায় ‘বিশ্বজুড়ে বাংলা বই’ এই স্লোগান নিয়ে ২০১৮ সালে বৃহত্তর বৃত্তে অঙ্কুরিত হয়েছিল ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকার নিজস্ব বইয়ের মেলা ‘ডিসি বইমেলা’। শাখা-প্রশাখা আর ফুলে-ফলে পল্লবিত হয়ে যা আজ পরিণত হয়েছে এক মহীরুহে। এই মেলা এখন দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি লেখক, পাঠক, প্রকাশক এবং সাহিত্যানুরাগীদের আকাক্সিক্ষত মিলনস্থল। শেকড়ের টানে প্রবাসের এই মেলা প্রাঙ্গণে এভাবেই তারা খুঁজে ফিরছে তাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। স্বদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি-কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের লালনে সবাই সহযাত্রী।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা এখন বাংলাদেশের গন্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। তারই ধারাবাহিকতায় ‘বিশ্বজুড়ে বাংলা বই’ এই স্লোগানে ‘ডিসি বইমেলা’ ২০২৩ উদ্যাপিত হলো গত ২৬ ও ২৭ আগস্ট, যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের স্টারলিং শহরে। 

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিকে কেন্দ্র করে ভার্জিনিয়া ও মেরীল্যান্ডকে সঙ্গে নিয়ে পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চল ট্রাই-স্টেট এলাকা। এখানে চতুর্থবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো ‘ডিসি বাংলা বইমেলা।’ বাদ্য-বাজনা আর মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধন করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা মামুনুর রশীদ। পরে ফিতা কেটে এবং প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে শুরু হয় দুইদিনব্যাপী বইমেলার আনুষ্ঠিকতা। উদ্বোধনী পর্বে অতিথিদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান, মুক্তিযোদ্ধা এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক ও বিজ্ঞানী ডক্টর নুরুন নবী, ড. আব্দুন নূর, ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান, সাংবাদিক রোকেয়া হায়দার, কিংবদন্তি রেডিও এবং টিভি ব্যক্তিত্ব সরকার কবির উদ্দিন, ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান, বিশিষ্ট সাংবাদিক, সংবাদ উপস্থাপক ও আবৃত্তিকার ইকবাল বাহার চৌধুরী, জনপ্রিয় ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন প্রমুখ। জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে স্থানীয় বর্ণমালা সংগঠনের বিভিন্ন বয়সী শিল্পীরা।   

এবারের মেলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে যেমন, তেমনি পার্শ্ববর্তী দেশ কানাডা এমনকি বাংলাদেশ থেকেও এসেছিলেন কবি-সাহিত্যিক, লেখক, সাহিত্যপ্রেমী এবং শিল্প ঘনিষ্ঠ মানুষেরা। এসেছেন দুই বাংলার বাঙালিরাও। মেলায় দুটি মিলনায়তনের নামকরণ করা হয় বেগম রোকেয়া এবং কবি সুফিয়া কামালের নামে। ছিল শহীদ রুমি চত্বর। শতাধিক কবি-সাহিত্যিকের উপস্থিতিতে বিশাল এই যজ্ঞে আরও উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর ফকরুদ্দিন আহমেদ। বলা যায়, দুদিনের বইমেলা পরিণত হয়েছিল বাংলার ভাষা-সংস্কৃতির চারণভূমিতে। 

মেলায় ছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সেমিনার, বঙ্গবন্ধুর ওপর আলোচনা, বই নিয়ে নানা আয়োজন। ছিল বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, সেমিনার, বই ও লেখক পরিচিতি, চিত্রকলা প্রদর্শনী, স্বরচিত ছড়া ও কবিতা পাঠ। বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ও প্রবাসের দশটি প্রকাশনী সংস্থা বইয়ের স্টল দিয়েছে এবারের বইমেলায়। পুস্তক প্রদর্শনী ছাড়াও এবারের বইমেলায় ছিল লোকজ অনুষ্ঠান, ছোটদের পরিবেশনা ও চিত্রাঙ্কন আসর, গানের ছোঁয়ায় কবিতা, নৃত্য, মণিপুরি নৃত্য, নাটক, কর্মশালা, পুঁথি পাঠ ইত্যাদি। বইয়ের স্টলের পাশাপাশি মৃৎশিল্পের প্রদর্শনীও দর্শক-পাঠকদের নজর কাড়ে।

প্রথম দিনের আকর্ষণ ছিল নৃত্য সারথি শিল্পী লায়লা হাসানের একক নৃত্য এবং কাজী নজরুল ইসলামের ওপর আসিফ এন্তাজ রবি এবং দিনার মনির মন মাতানো পরিবেশনা, গীতিআলেখ্য ‘আমারে দেব না ভুলিতে’। ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান, কিংবদন্তি রেডিও এবং টিভি ব্যক্তিত্ব সরকার কবির উদ্দিন আবৃত্তি করেন কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতা ‘আমি আজ কারও রক্ত চাইতে আসি নি’, যা উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়ে শোনেন। 

প্রথমদিনের শেষ আকর্ষণ ছিল ইতিহাসভিত্তিক গীতি নৃত্যনাট্য ‘জয় বাংলা’। লাস ভেগাস, নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেসের পর এবার ‘জয় বাংলা’র চতুর্থ মঞ্চায়ন হলো ডিসি বইমেলাতে। নিউইয়র্কের বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ পারফরমিং আর্টস (বিপা)’র শিল্পীদের মনোমুগ্ধকর এই পরিবেশনা দেখে আবেগাপ্লুত হন উপস্থিত সবাই। এতে তুলে ধরা হয় বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের নেপথ্যে সাংস্কৃতিক যুদ্ধের পটভূমি।

বইমেলার দ্বিতীয় দিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল, বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের পরিচালনায় নাট্য কর্মশালা। তাঁকে সহযোগিতা করেন অভিনয়শিল্পী তমালিকা কর্মকার। এছাড়াও ছিল নৃত্যশিল্পী তামান্নার মণিপুরী নৃত্য এবং বাংলাদেশের শিল্পী আনিলা চৌধুরী এবং পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী সাহানা ভট্টাচার্যের গান। 
‘ডিসি বইমেলা’র আনন্দময় উদ্বোধনের পর সফল সমাপ্তির মাঝে বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব, যুক্তরাষ্ট্র’র একটি অনিন্দ্যসুন্দর আয়োজন ‘জনকের কথা ও কবিতা’ দর্শক নন্দিত হয়েছে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. নুরুন নবী, বিশেষ অতিথি সিরু বাঙলি, প্রধান আলোচক লুৎফর রহমান রিটিনসহ আলোচক প্যানেল যুদ্ধ অপরাধ ট্রাইবুনালের আইনজীবী অমর ইসলাম, প্রবীণ সাংবাদিক মাহমুদ উল্লাহ, কবি ও কথাসাহিত্যিক শাহাব আহমেদের কথা ও কবিতা পাঠে অংশ নেওয়া, আবৃত্তিকার, কবিসহ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক, ছড়াকার মনজুর কাদেরের উপস্থাপনা ছিল মনে রাখার মতো। 

বইমেলার পুরো দুইদিন ‘কবিতার সাথে’র সরাসরিতে কবি দিলওয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উপস্থিত কবি, লেখক এবং গুণীজনদের। বইমেলা উপলক্ষে ‘পুস্তকা’ নামে একটি নান্দনিক স্মরণিকা প্রকাশিত হয়, যার গ্রন্থনা এবং প্রচ্ছদ করেছেন কথাসাহিত্যিক ইকবাল আনোয়ার। সম্পাদনায় ছিলেন ইকবাল আনোয়ার, অ্যান্থনি পিউস গোমেজ, আশরাফ আহমেদ, ফাতেমা সিদ্দীক, আমীনুর রহমান, রায়হান আহমেদ প্রমুখ। উল্লেখ্য, এবারের বইমেলার প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন ড. নজরুল ইসলাম এবং আহ্বায়ক ছিলেন দোস্তগীর জাহাঙ্গীর।

বেশ কয়েকবছর ধরে এই মেলা উত্তর আমেরিকায় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। পরিণত হয়েছে মিলনমেলায়। লেখক-পাঠক-প্রকাশক এবং সাহিত্যানুরাগীদের মাঝে ভিন্নমাত্রার সেতুবন্ধন গড়ে তোলার জন্য এ এক অনন্য প্রয়াস। আনন্দের আবহে একুশের বইমেলা যেভাবে প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছে, সারাটি মাসজুড়ে সবাই এসে হাজির হয়ে যায় একুশে বইমেলা চত্বরে, মেতে ওঠে প্রাণের ছোঁয়ায়, ঠিক তেমনি দেশের বৃত্ত পেরিয়ে আজ প্রবাসের বিভিন্ন প্রান্তেও আয়োজন হচ্ছে বইমেলার—‘ডিসি বইমেলা’ এমনি আয়োজনের মাঝে একটি অন্যতম সংযোজন।
 

Leave a Reply

Your identity will not be published.