বিছানায় বসে লিখি প্রতিদিন। কখনো দুপুরে, কখনো গভীর রাতে। চারপাশ নিস্তব্ধ, কেবল শব্দেরা পাশে এসে বসে। এখন আমার কোনো অফিস নেই, ক্লক-ইন ক্লক-আউটের দাসত্ব নেই, সাফল্য মাপার কর্পোরেট মানদণ্ডও নেই। আমি শুধু নিজেকে নিয়ে আছি। এই ‘নিজেকে’ ফিরে পেতেই তো চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলাম।
দু’বছর আগেও আমি ছিলাম একটি নামি প্রতিষ্ঠানের মিডিয়া প্রধান। খ্যাতি, দায়িত্ব, গ্লোবাল মিটিং, নিত্য চলমান স্ক্রিনের আলো—সব ছিল। কিন্তু একদিন সুপর্ণা, আমার মেয়ে, হঠাৎ বলে উঠেছিল, মা, তুমি ঠিক আছো তো ? আমি তখন উত্তর দিতে পারি নি। সেই রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝেছিলাম, আমি নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি।
বিয়ের পরে সংসার, দায়িত্ব, মেয়েকে বড় করা, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা—সবকিছুর মধ্যে একসময় আমার নিজের মুখটাই আর চেনা থাকে নি। তাই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তটা একরকম আত্মর¶ার মতো ছিল। অনেকেই বলেছিল, তুমি কি ঠিক আছো ?—কিন্তু তখনই আমি বুঝেছিলাম, এই প্রশ্নটা আসলে আমাকে না, বরং সমাজের সেই চিরাচরিত কাঠামোকে করাই উচিত।
চাকরি ছেড়ে শুরু হয় একপ্রকার নিঃশব্দ সন্ন্যাস। শুরুতে অস্থিরতা ছিল—দিনগুলো যেন থেমে থাকা ক্যালেন্ডার, সময় যেন কাঁটার মতো বিঁধে থাকত। তখনই একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণার খবর পড়ি—টোকিও মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা বলছেন, অন্ধকারে থাকলে কিছু দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি মস্তিষ্ক থেকে মুছে যেতে পারে। পরিবেশের আলো স্মৃতি ধরে রাখে, আর তার অনুপস্থিতিতে নির্দিষ্ট ট্রমাগুলো হারিয়ে যেতে পারে।
গভীর রাতে ঘরের সব আলো নিভিয়ে তিন রাত নিজেকে একা রেখেছিলাম। ফোন বন্ধ, জানালার পর্দা টানা, কেবল নিশ্বাস আর কিছু অদৃশ্য শব্দ। প্রথম রাতে মনে পড়ল বাবার মৃত্যুদিন। আশ্চর্যভাবে সেই সময়ের অফিস প্রেজেন্টেশনের রং, সহকর্মীদের হাসি সব মনে পড়ল, কিন্তু বাবার মুখ কিছুতেই স্পষ্ট হলো না। দ্বিতীয় রাতে মনে পড়ল সেই দিন, যেদিন সুপর্ণা বলেছিল সে সাইকোলজি পড়তে চায়, আর আমি বলেছিলাম, ওটা পড়ে কী হবে ? তার দৃষ্টি আজও স্মৃতিতে তীক্ষ্ণ। তৃতীয় রাতে...কিছুই মনে পড়ল না। কেবল শব্দ ফিরল—‘¶মা’।
এই তিন রাত আমার জীবনের দিক বদলে দিয়েছিল।
তারপর থেকেই লিখতে শুরু করি। ছোট ছোট টুকরো লেখা—স্মৃতি, অপরাধবোধ, না-বলা কথা, ফেলে আসা চিঠি। লেখাগুলো কোনো এক অদৃশ্য আলোর দিকে এগিয়ে যায়। প্রতিদিন বিছানায় বসে আমি একটি করে পাতা লিখি। সেই পাতাগুলো যেন অন্ধকারে রেখে আসা দিনের মুখ খুলে দেয়।
সুপর্ণা একদিন হঠাৎ এসে বলে, মা, তুমি জানালার পর্দা সব সময় টেনে রাখো কেন ? এত অন্ধকার কেন ঘরে ? আমি হেসে বলি, বিজ্ঞান বলে, আলো ছাড়া কিছু স্মৃতি আর থাকে না। আমি তাকে বলি দ্রোসোফিলা মাছির সেই গবেষণার কথা, ঈজঊই প্রোটিন, চফভ নির্গমন—আর কীভাবে অন্ধকার মেমোরি মুছে দিতে পারে। সুপর্ণা হাসে। বলে, তুমি তো বিজ্ঞানের গল্প লিখছো এখন!
হ্যাঁ, আমি এখন লিখিড়্গল্প। যেখানে একজন নারী নিজেকে খুঁজে পায় চাকরি ছেড়ে, আলো নিভিয়ে, অন্ধকারে বসে। যে নারী ভুলতে চায়, কিন্তু লিখতে গিয়ে আসলে নিজের হৃদয়ের দরজা খুলে দেয়। সেই গল্পে সুপর্ণাও থাকে, এমনকি আমার পুরোনো সম্পর্কগুলোও, যেগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ছাড়াই ¶য়ে গিয়েছিল।
আমার সেই মানুষটা—যে একসময় স্বামী ছিল—সে আর ফিরে আসে না। কোনো চিঠি নেই, ফোন নেই, শেষ কথা নেই। একসময় ভাবতাম, সম্পর্কের শেষ মানেই তো একটা দৃশ্যপট থাকে, কান্না থাকে। কিন্তু এখন বুঝি, কোনো কোনো সম্পর্ক চুপচাপ শেষ হয়ে যায়, একফোঁটা শব্দ ছাড়াই। এই উপলব্ধিটাই আমার বড় মুক্তি।
আমার লেখা এখন ছাপা হয়। পাঠকেরা পড়ে, চিঠি লেখে। কেউ কেউ লেখে, এটা তো আমার মায়ের গল্প; কেউ লেখে, আপনি তো আমার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। তখন বুঝি, এই অন্ধকার শুধুই ব্যক্তিগত নয়—এ এক সামষ্টিক স্তব্ধতা, যার আলো খুঁজছে অনেকেই।
আজকের গল্পে আমি লিখছি এক নারীকে নিয়ে, যিনি আলো বন্ধ করে দিন কাটান। তার মনে আছে একটি ট্রমা, যা তিনি ভুলে যেতে চান। কিন্তু অন্ধকারে বসে থাকতেই তিনি খুঁজে পান একটি নতুন পথ—যেখানে ভোলার চেয়ে বেশি দরকার ¶মা করা, মেনে নেওয়া।
বাইরে আজ হালকা বৃষ্টি। আমি জানি, এই বৃষ্টির শব্দ একদিন কোনো নতুন গল্পের শুরু হয়ে উঠবে। হয়তো সেখানে কেউ নিজের অন্ধকার ঘরে বসে বলবে, আমি ভুলতে চাই, আর তখনই বুঝবে—ভুলে যাওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিজেকে বুঝে নেওয়া।
আমি এখন আর ভয় পাই না অন্ধকারকে। বরং তাকে পাশে বসিয়ে লিখি—একটা একটা করে হারানো আলোর গল্প।
আলোহীন ঘরের গল্প
মাহবুব আরা ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ০ টি মন্তব্য
Related Articles
নক্ষত্র-নূপুর (দ্বিতীয় খণ্ড)
এশরার লতিফ১৫ জুলাই ২০২৫হরদয়াল নামের এক শিক্ষককে ঘিরে বার্কলে ইউনিভার্সিটিতে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বাঁধছে। যে তিনজন প্রবাসী ভারতের স্বাধীনতার জন্য গদর পার্টি বানিয়েছে, হরদয়াল তাদের একজন।
নীল ধ্রুবতারা (পর্ব ২৬)
ফরহাদ হোসেন২৩ অক্টোবর ২০২২তোমার ওপরে আমার খুব রাগ বর্ষা। তুমি আমায় কেন বলো নি আগে? আমি ভেবেছিলাম অথবা তোমার কথায় আমার মনে হয়েছিলে ক্রিস শুধুই একজন বন্ধু তোমার। অথচ এখন দেখছি, সে বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু।...বলো নি যে তুমি ক্রিসকে ভালোবাসো।
নক্ষত্র-নূপুর (দ্বিতীয় খণ্ড)
এশরার লতিফ১০ অগাস্ট ২০২৫ইনেসার লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইচ্ছে দিনদিন বেড়েই চলেছে। সমাজতান্ত্রিক মহলে লেখকদের সবাই সম্মান করে। ইনেসা এই সম্মানটা চাচ্ছে।
'মুনীর চৌধুরী সম্মাননা' ও 'মোহাম্মদ জাকারিয়া স্মৃতিপদক' পাচ্ছেন কারা
অন্যদিন২৮ নভেম্বর ২০২৩অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ৯৮তম জন্মবার্ষিকী ছিল ২৭ নভেম্বর। এ উপলক্ষে থিয়েটার পদক প্রাপকদের নাম ঘোষণা করেছে। চলতি বছর 'মুনীর চৌধুরী সম্মাননা' পাচ্ছেন কামালউদ্দিন নীলু। অন্যদিকে 'মোহাম্মদ জাকারিয়া স্মৃতিপদক' পাচ্ছেন তরুণ নির্দেশক বাকার বকুল।
Leave a Reply
Your identity will not be published.