[এই ধারাবাহিক রচনাটিতে প্রয়াত চিত্রনায়ক রাজ্জাকের জীবন ও কেরিয়ারের নানা দিকের ওপর আলো ফেলা হবে। এখানে নায়করাজ রাজ্জাক সম্পর্কে পাঠকদের নানা কৌতূহল মিটবে, নানা প্রশ্নের উত্তর মিলবে।
এখানে মূর্ত হয়ে উঠবে রাজ্জাকের শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের দিনগুলি, জীবন সংগ্রাম, নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ এবং পর্যায়ক্রমে নায়করাজ হয়ে ওঠা...। থাকবে সেরা চলচ্চিত্র, সেরা গানের কথা। তাঁর নায়িকা ও পরিচালকদের প্রসঙ্গও উঠে আসবে। চলচ্চিত্রে যেসব কণ্ঠশিল্পীর গানের সঙ্গে তাঁর ঠোঁটের মেলবন্ধন ঘটেছিল, থাকবে তাঁদের কথাও। পরিচালক রাজ্জাক সম্পর্কেও পাঠকেরা জানতে পারবেন; জানতে পারবেন টালিউডে তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসের কথা। পরিশেষে অন্য এক রাজ্জাকের অবয়বও ফুটে উঠবে এখানে।
এবার তুলে ধরা হলো রাজ্জাকের অতীত জীবনের আরও কয়েকটি অধ্যায়।]
বোম্বেতে পাড়ি
১৯৬১ সালের শেষ পর্যায়ের কথা। তখন রাজ্জাকের বয়স আঠারো-উনিশ। একদিন পীযূষ বসু বললেন, ফিল্মে আসতে হলে জেনেশুনে শিক্ষা নিয়ে আসতে হয়। টালিগঞ্জের ফিল্মপাড়ায় ঘুরে কিছু শিখতেও পারবি না, কিছু হওয়ার চান্সও নেই। বরং বোম্বেতে আমার পরিচিত দুএকজন আছে। তুই রাজি থাকলে আমি তাদের বলে দিতে পারি।
গুরু পীযূষ বসুর কথা রাজ্জাকের মনে ধরে। চলচ্চিত্রাভিনয়ের আশায় তিনি পাড়ি জমান বোম্বেতে। বোম্বেতে (এখনকার মুম্বাই) তখন একটিই ফিল্ম ইন্সটিটিউট। ফিল্মালয়। পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউট তখনো প্রতিষ্ঠিত হয় নি। ফিল্মালয় ইন্সটিটিউটে রাজ্জাক নয় মাসের একটি কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু মাস দুয়েকের মধ্যে তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন। সেখানে ক্লাস নিতেন মি. নায়ার। কখনো-সখনো দিলীপ কুমার, শশধর মুখার্জি। বোম্বেতে সেই সময় রাজ্জাকের প্রচুর খরচ হয়। তারা কয়েকজন বাঙালি মিলে দাদড়া নামের জায়গায় একটি মেসে থাকতেন। আর যাবতীয় খরচ কলকাতা থেকে পাঠাতেন তার ভাইবোনরা। যাই হোক বোম্বেতে রাজ্জাকের বেশিদিন থাকা হয় নি। কারণ চলচ্চিত্রাভিনয়ের ওপর পদ্ধতিগত শিক্ষা শেষে তিনি যখন বোম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন, কেউই তাকে ব্রেক দিতে চায় নি। অবশ্য বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অবয়ব, আয়তন সম্পর্কে জানতে পারেন রাজ্জাক। পরবর্তী সময়ে এই শিক্ষা তার দারুণ কাজে লেগেছিল।
কলকাতায় প্রত্যাবর্তন এবং বিয়ে
বোম্বে থেকে কলকাতায় ফিরে রাজ্জাক আবার পীযূষ বসুর নাটকের দলে যোগ দেন। বলা যায়, ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি মঞ্চের একজন নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। কিন্তু চলচ্চিত্রাভিনয়ের নেশা তাকে এ মাধ্যম থেকে সাময়িকভাবে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। ফিরে এসে অল্প দিনের ব্যবধানে তিনি মঞ্চে আবারও নিয়মিত হন। শুরু হয় নাটককে ঘিরে রাজ্জাকের অষ্টপ্রহরের ভাবনা আর ব্যস্ততা। এ সময় অজিত চ্যাটার্জি পরিচালিত ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে রাজ্জাক অভিনয় করেন একস্ট্রা হিসেবে।
রাজ্জাক জীবনের প্রথম পর্যায়ে ছিলেন অস্থির প্রকৃতির। যেহেতু অল্প বয়সে বাবা-মা মারা যান, সেহেতু তিনি মুক্ত পাখির মতো সেই সময় বিচরণ করেছেন। তিনবার তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে ছিলেন। ১৪ বছর, ১৭ বছর এবং ১৯ বছর বয়সে। এমনকি রাঁচির দুর্গম জঙ্গলে কাটিয়ে ছিলেন ছয় মাস।...ওই তরুণ বয়সে তিনি ব্যবসাও করেছেন। কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছেন ঊষা কোম্পানীতে। মডেলিংও করেছেন।
অস্থির ও বাউণ্ডুলে রাজ্জাককে ঘরমুখো করার জন্য তার পরিবারের সদস্যরা উদ্যোগী হয়। ১৯৬২ সালের শুরুতে রাজ্জাক বিয়ে করেন। ৩ মার্চ তার ঘরে আসেন লক্ষ্মী ওরফে খায়রুন্নেসা। এ কোনো হৃদয়ঘটিত সম্পর্কের বিয়ে নয়। এ সম্পর্কে লক্ষ্মীর ভাষ্য হলো : ‘টালিগঞ্জে আমরা যে বাড়িতে থাকতাম, ঠিক সেই বাড়ির পাশে ওর এক আত্মীয় থাকতেন। একদিন বাড়ির গেটের সামনে আমি দাঁড়িয়েছিলাম, তখন নাকি তাদের কেউ আমাকে দেখে ফেলে। তারপরই ও বাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব আসে। এরপর তারা আমাকে দেখতে আসে এবং সেদিনই আংটি বদল হয়ে যায়। তখন আমার বয়স ১২ বছর। এর দুই বছর পর আমাদের বিয়ে হয়।’
রাজ্জাক তখন স্বপ্ন দেখছেন। লক্ষ্মীকেও জানান সেই স্বপ্নের কথা। বলেন, তিনি একদিন বড় অভিনেতা হবেন। দেশ-বিদেশের মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই নেবেন। লক্ষ্মী চুপ করে স্বামীর কথা শোনেন। মাথা নেড়ে সায় জানান স্বামীর কথায়। দুজন মিলে সিনেমা দেখতে যায়; যায় গঙ্গার ধারে বেড়াতে। তখন পরস্পরের হাত ধরাই যেন স্বর্গসুখ। রাজ্জাকের কথা হলো : ‘লক্ষী আমার অগোছালো জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটায়, আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আমি স্থির হতে বাধ্য হই।’ তারপর ১৯৬৪ সালে তাদের প্রথম সন্তান বাপ্পার জন্ম হয়।
এপার বাংলায় আগমন এবং জীবনসংগ্রাম
এ সময় শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। যদিও ছেলেবেলায় মুসলমান হিসেবে রাজ্জাককে কখনো আলাদাভাবে চিহ্নিত হতে হয় নি, তবুও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কলকাতার প্রতি তাকে বিরূপ করে তোলে। কেননা তখন তিনি উপলব্ধি করেন, সম্প্রীতির বন্ধন যেন ছিঁড়ে গেছে। পরিচিত অনেকের চোখে-মুখেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিদ্বেষ। পাড়ার বাতাসেও যেন সে বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের পুরো বাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। তখন তিনি কলকাতা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন আবার বোম্বে চলে যাবেন। কিন্তু বাদ সাধেন পীযূষ বসু। তিনি বলেন, চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রতি তোর যখন এতই দুর্বলতা, তুই বোম্বে না গিয়ে বরং পাকিস্তানে চলে যা। তাছাড়া বোম্বেতে প্রতিযোগিতা অনেক।
রাজ্জাকও ভাবলেন, বোম্বেতে তাকে সাহায্য করার কেউ নেই। সুতরাং পূর্ব পাকিস্তানে যাওয়াই ভালো। তাছাড়া তখন এখানে সবে মাত্র নতুন ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। ভেবে দেখলেন, সুবিধাটা ওপার বাংলায় হবে বেশি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আর বিলম্ব করলেন না। ১৯৬৪ সালের এপ্রিলে লক্ষ্মী ও বাপ্পাকে নিয়ে তিনি ঢাকায় চলে আসেন, সাতক্ষীরা অঞ্চল দিয়ে।
ঢাকায় আসার পর তখন ভীষণ কষ্টে রাজ্জাকের দিন কেটেছে। আর রাজ্জাকের স্ত্রীও অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন।
রাজ্জাক তখন ঢাকার কমলাপুরে থাকতেন, ঠাকুর পাড়ায়। মাসে ত্রিশ টাকা ভাড়ায়। বাপ্পার বয়স তখন আট মাস। তারপর কমলাপুর থেকে তারা চলে আসেন নয়াটোলায়। তারপর মগবাজারে। কেননা সেখান থেকে এফডিসি ছিল কাছে। রাজ্জাকের জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সময় ছিল তখন। কলকাতায় তিনি কখনো এত কষ্ট করেন নি। ঢাকায় এসে তিনি জীবনের সঙ্গে এক প্রকার যুদ্ধে জড়িয়ে যান। ...ঢাকায় আসার সময় পীযূষ বসু তার হাতে দুটি চিঠি লিখে দিয়েছিলেন, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট দু’জন লোকের কাছে। একজন হলেন পরিচালক-প্রযোজক আবদুল জব্বার খান। অন্যজন শব্দযন্ত্রী মনি বোস। কিন্তু সেই চিঠিতে রাজ্জাক তেমন কোনো ফল পান নি।
কলকাতা থেকে আসার সময় তিনি বেশ কিছু টাকা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। সেই টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। কিন্তু এক সময় সেই টাকাও শেষ হয়ে গেল। এরই মধ্যে রাজ্জাক পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে লাগলেন। কিন্তু কেউই তাকে সুযোগ তো দূরের কথা আশ্বাসও দিলেন না। শেষ পর্যন্ত সংসার চালানোর তাগিদে তিনি ইকবাল ফিল্মসে এসিস্টেন্ট হিসেবে চাকরি নিলেন। সেটাও ছিল অবৈতনিক। শুধু খাওয়া এবং শুটিং থাকলে যাতায়াত ভাতা পেতেন।
পরিচালক কামাল আহমেদ তখন ‘উজালা’ চলচ্চিত্রের শুটিং করছেন। প্রযোজনা ইকবাল ফিল্মস। একদিন কামাল আহমেদকে রাজ্জাক বললেন, ‘আমি অভিনয় করতে চাই।’ তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় আগমনসহ সব কথা খুলে বললেন। কামাল আহমেদ নীরবে সব শুনলেন। তারপর বললেন, আগে তোমাকে টিকে থাকতে হবে। যা হোক, তুমি এ কাজ করো। আমার সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করতে থাকো।
কামাল আহমেদের কথা শুনে রাজ্জাক মনে মনে ভাবলেন, ‘আগে তো এখানকার চলচ্চিত্রের সবাইকে চিনি। তারপর দেখা যাবে।’ এই ভেবে তিনি কামাল আহমেদের ‘উজালা’ চলচ্চিত্রে তৃতীয় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করতে লাগলেন। ধীরে ধীরে এফডিসির সবাইকে জানতে লাগলেন, চিনতে লাগলেন।
কিছুদিন পর কামাল আহমেদ আরেকটি নতুন ছবির কাজে হাত দিলেন। ছবির নাম ‘পরওয়ানা’। সেখানেও তৃতীয় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করতে লাগলেন রাজ্জাক। পাশাপাশি চলচ্চিত্রাঙ্গনের নানা জনকে বলছেন যে, তিনি অভিনয় করতে চান। শুনে সবাই আশ্বাস দেন। কিন্তু পরে তারা ছবি নির্মাণে হাত দিলেও রাজ্জাককে ডাকেন না।
একদিন এফডিসির সাদা-কালো ল্যাব থেকে দুটো ফিল্মের ক্যান নিয়ে বের হলেন রাজ্জাক। ধীর পায়ে হাঁটতে লাগলেন ডাবিং থিয়েটারের উদ্দেশে। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন তাকে ডাকল। তিনি পেছন ফিরে চেয়ে দেখেন, নায়ক রহমান অদূরে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজ্জাক তার কাছে যেতেই তিনি বললেন, তুমি না অভিনয় করতে চাও ? তাহলে ফিল্মের ক্যান টানছ কেন ? এভাবে চললে কেউ তোমাকে অভিনয়ের জন্য ডাকবে না। এসব ছাড়ো। পরিচালকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াও। এভাবে ক্যান টেনে বেড়ালে সারা জীবন তোমাকে এই কাজই করতে হবে।
সেই সময় ‘পরওয়ানা’-র কাজ আশি ভাগ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এই অবস্থায় রাজ্জাক পরিচালক কামাল আহমেদকে জানালেন, ভাই আমি আর অ্যাসিস্টেন্টগিরি করব না। আমি আপনাকে আগেই বলেছি যে আমি অভিনয় করতে চাই।
নায়ক রহমানের কথাটি রাজ্জাকের মাথায় গেঁথে গিয়েছিল। তিনি তাই পরিচালকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে লাগলেন। ছুটে গেলেন কাজী জহির, মুস্তাফিজ, সুভাষ দত্তের কাছে। তাদের জানালেন, আমি বোম্বের শশধর মুখার্জির ফিল্মালয় থেকে নয় মাসের কোর্স করেছি। কলকাতার ছবিতেও কাজ করেছি। কিন্তু কোনো পরিচালকই গুরুত্ব দিলেন না রাজ্জাককে।
কিন্তু যার একমাত্র ধ্যান অভিনয়, তিনি অভিনয় ছাড়া থাকেন কী করে ? সেই সময়ে তিনি আড্ডা দিতে আসতেন মালিবাগে। সেখানে তার পরিচয় হলো মুজিবুর রহমান চৌধুরী ও জহিরুল হকের সঙ্গে। এই দুজন তখন মঞ্চনাটক করতেন। তাদের সঙ্গেই ঢাকায় প্রথম নাটক করলেন ব্রিটিশ কাউন্সিলে। নাটকের নাম ‘পাত্রী হরণ’। নাট্যকার আবদুস সাত্তার। তখন ১৯৬৫ সাল। পরে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, পুরোনো ঢাকার লালকুঠিতেও নাটক করলেন রাজ্জাক। পরে ফার্মগেটে থাকার সময় তার সঙ্গে পরিচয় হয় খসরু নোমানসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের সঙ্গেও নাটক করতে লাগলেন। এমনকি কুমিল্লাতেও মঞ্চনাটকে অভিনয় করলেন। আসলে সেই সময়ে কলকাতার মতো ঢাকাতেও ক্লাবকেন্দ্রিক নাট্যচর্চা ছিল। হ্যাঁ, এখনকার মতো তখন গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন ছিল না। নাট্যদলও বলতে গেলে তেমন ছিল না। তবে প্রায় প্রতিটি অফিসেই নাটক হতো। ব্যাংকগুলোতে তো বছরে অন্তত একটা নাটক হতোই। যা হোক, রাজ্জাকের মঞ্চনাটক করার কথা বলা হচ্ছিল। সেই সময় তিনি প্রায় পঞ্চাশটি মঞ্চনাটক করেছিলেন। নায়িকা হিসেবে ছিল সুলতানা, মর্জিনা, নাজনীনসহ আরও কয়েকজন। তাদের সামান্য সম্মানী দেওয়া হতো। অন্যরা পকেটের টাকা খরচ করেই নাটক করত। সঙ্গত কারণেই এইসব নাটক করে রাজ্জাক কোনো টাকাপয়সা পান নি। ফলে রাজ্জাকের জীবনসংগ্রাম তীব্র আকার ধারণ করেছিল। দিন দিন আর্থিক কষ্ট তাকে কোণঠাসা করে ফেলছিল। এই কষ্টের দিনে অনেক সময় স্ত্রী-সন্তানসহ না খেয়েও থেকেছেন। ঘরভাড়ার টাকাও ঠিকমতো দিতে পারতেন না। কখনো কখনো তিন-চার মাসের ভাড়াও আটকে যেত। নায়ক হওয়ার আশা তো অনেক আগেই তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন যে-কোনো একটা চরিত্র পেলেই বেঁচে যান। কারণ সংসারই তার কাছে ছিল মুখ্য।
জীবনের এই পর্যায়ে এদেশের কিংবদন্তি পরিচালক জহির রায়হানের সঙ্গে রাজ্জাকের যোগাযোগ হয়। জহির রায়হান তখন ‘বাহানা’ ছবির শুটিং করছেন এফডিসির ১ নম্বর ফ্লোরে। ছবিটির সম্পাদক ছিলেন এনামুল হক। তার কাছে গিয়ে রাজ্জাক অনুরোধ করলেন, তিনি যেন জহির রায়হানের সঙ্গে তাকে আলাপ করিয়ে দেন। এনাম সাহেব রাজ্জাককে সাহায্য করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু দেখা গেল, জহির ভীষণ ব্যস্ত থাকছেন শুটিং ফ্লোরে। পাগলের মতো কাজ করছেন। অগত্যা এনাম সাহেবের কাছ থেকে জহিরের বাসার ঠিকানাটি একটি টিকিটের পেছনে লিখে রাজ্জাক এফডিসি ত্যাগ করলেন।
একদিন রোববার, ছুটির দিনে, রাজ্জাক গেলেন কায়েতটুলিতে, জহির রায়হানের বাড়িতে। বাসার ভেতরে একজনকে দিয়ে খবর দিলেন যে, তিনি জহির রায়হানের সঙ্গে দেখা করতে চান। দশ মিনিট পর জহির এলেন। রাজ্জাকের কথা বিস্তারিত শুনলেন। দেখলেন নাটকের ডিপ্লোমা বা অন্যান্য কাগজপত্র এবং কিছু স্টিল ছবি। সবকিছু দেখেশুনে জহির রায়হান বলেন, ‘আপনি একসপ্তাহ পরে আমার সঙ্গে দেখা করবেন, তবে দাড়ি কাটবেন না।’
দ্বিতীয়বার তার সঙ্গে দেখা হলে জহির রায়হান জানালেন—তার নিজের উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’-র চলচ্চিত্ররূপে তিনি নায়ক হিসেবে রাজ্জাককে নেবেন। এ বিষয়ে পরে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও ছাপা হয়। কিন্তু ‘বাহানা’ ফ্লপ করায় জহির এ প্রজেক্ট থেকে সরে আসেন।
Leave a Reply
Your identity will not be published.