[এই ধারাবাহিক রচনাটিতে প্রয়াত চিত্রনায়ক রাজ্জাকের জীবন ও কেরিয়ারের নানা দিকের ওপর আলো ফেলা হবে। এখানে নায়করাজ রাজ্জাক সম্পর্কে পাঠকদের নানা কৌতূহল মিটবে, নানা প্রশ্নের উত্তর মিলবে।
এখানে মূর্ত হয়ে উঠবে রাজ্জাকের শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের দিনগুলি, জীবন সংগ্রাম, নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ এবং পর্যায়ক্রমে নায়করাজ হয়ে ওঠা...। থাকবে সেরা চলচ্চিত্র, সেরা গানের কথা। তাঁর নায়িকা ও পরিচালকদের প্রসঙ্গও উঠে আসবে। চলচ্চিত্রে যেসব কণ্ঠশিল্পীর গানের সঙ্গে তাঁর ঠোঁটের মেলবন্ধন ঘটেছিল, থাকবে তাঁদের কথাও। পরিচালক রাজ্জাক সম্পর্কেও পাঠকেরা জানতে পারবেন; জানতে পারবেন টালিউডে তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসের কথা। পরিশেষে অন্য এক রাজ্জাকের অবয়বও ফুটে উঠবে এখানে।
এবার তুলে ধরা হলো রাজ্জাকের অতীত জীবনের আরও কয়েকটি অধ্যায়।]
টিভি নাটকে অভিনয়
রাজ্জাক যখন আর্থিক অনটনে চোখে অন্ধকার দেখছেন, সেই সময় এদেশে টেলিভিশন চালু হলো। বাংলায় খবর পড়ার জন্য রাজ্জাক অডিশন দিলেন এবং পাসও করলেন। জুরি বোর্ডে ছিলেন প্রযোজক জামান আলী খান, চলচ্চিত্রাভিনেত্রী আজমেরী জামান রেশমার স্বামী। রাজ্জাককে চিনতে পেরে তিনি বললেন, আপনি না অভিনয় করেন ? খবর পড়লে তো সব শেষ হয়ে যাবে। কণ্ঠ চেঞ্জ হয়ে যাবে।
রাজ্জাক বললেন, আমাকে তো চলতে হবে।
জামান আলী খান বললেন, ও দেখা যাবে। চলার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তারপর তিনি জামিল চৌধুরীকে বললেন, রাজ্জাককে খবর পড়তে দিয়েন না।
কয়েকদিন পর জামান আলী খান ডেকে পাঠালেন। রাজ্জাক ফার্মগেট থেকে হেঁটে গেলেন ডিআইটিতে (বর্তমান রাজউক ভবন), টিভি স্টুডিওতে।
জামান আলী খান রাজ্জাককে দেখে বললেন, আপনার জন্য কাজের ব্যবস্থা করেছি। আপনি আমাদের ‘ঘরোয়া’ নাটকে অভিনয় করবেন। এটা উইকলি নাটক।
রাজ্জাক বললেন, তাহলে তো ভালোই। বেঁচে যাই।
জামান আলী খান বললেন, রিহার্সেলসহ সপ্তাহে তিন দিন আপনাকে সময় দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে সম্মানী পাবেন ৬৫ টাকা। রাজি তো ?
শুনে রাজ্জাক বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সপ্তাহে ৬৫ টাকা! মানে প্রতি মাসে ২৬০ টাকা। তিনি একবাক্যে জামান আলী খানের প্রস্তাবে রাজি হযে গেলেন। ‘ঘরোয়া’ নাটকে অভিনয় শুরু করে দিলেন।
এই নাটকে রাজ্জাকের স্ত্রীর চরিত্রটি করলেন আনোয়ারা বেগম। মেয়ের ভূমিকায় শিমূল বিল্লাহ (ইউসুফ)। বাসার কাজের ছেলের চরিত্রে লালু।...‘ঘরোয়া’ নাটকটি ঘর বা পরিবারের গল্পই ছিল। পারিবারিক কাহিনির মধ্যে নানা পণ্যের প্রচার করা হতো। যেমন একদিন সকালে রাজ্জাক দাড়ি কামাতে গিয়ে চিৎকার চেচামেচি করছেন। বলছেন, ‘এই লালু, আমার ব্লেড কোথায় ?’ লালু তখন বলছে, ‘স্যার, কোন ব্লেড আনমু ?’ উত্তরে রাজ্জাক বলছেন, ‘বলাকা ব্লেড আনিস। ওটাই সবচেয়ে ভালো ব্লেড।’ আবার আরেকদিন বাচ্চার দুধ শেষ। লালুকে রাজ্জাক নির্দেশ দিচ্ছেন, ‘যা, ডানো নিয়ে আয়। সঙ্গে... কোম্পানির নিপল।’ আরেক পর্বে বলছেন, টেরি টাওয়ালের কথা। কেননা ওই টাওয়াল বেশ ভালো।...‘ঘরোয়া’র স্ক্রিপ্ট লিখতেন আবদুল্লাহ আল মামুন, আশীষ কুমার লোহসহ আরও কয়েকজন। এটি ছিল টিভির প্রথম মেগাসিরিয়াল। কয়েক বছর ধরে চলেছিল। শুরুতে এটি পরিচালনা করতেন জামান আলী খান। পরে আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম, আবদুল্লাহ আল মামুনসহ আরও কয়েকজন।
স্টেশনমাস্টার থেকে মাতাল মক্কেল
এই সংগ্রামী জীবনে রাজ্জাক বিভিন্ন চলচ্চিত্রে ছোটখাট চরিত্রে অভিনয় করেন—‘আখেরি স্টেশন’-এ স্টেশনমাস্টার, ‘কার বউ’-এ বেবিট্যাক্সি ড্রাইভার, ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’-এ পাড়ার ছেলে মিন্টু, ‘ডাকবাবু’-তে কোর্টের কর্মচারী এবং ‘কাগজের নৌকা’-য় বাইজি পাড়ার মাতাল মক্কেল।
কিন্তু চলচ্চিত্র কিংবা মঞ্চনাটকে তখন অভিনয় করে সামান্য টাকা পেতেন রাজ্জাক। ছবি পিছু পঞ্চাশ টাকা। আর শুটিংয়ের দিন সামান্য কনভেন্স। উল্লেখ্য, চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেও তেমন টাকা পান নি। তখন সহকারী পরিচালকদের বেতনের নিয়ম ছিল না। যেদিন শুটিং থাকত, সেদিন শুধু কনভেন্স দেওয়া হতো। ওই আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন রাজ্জাক ও লক্ষ্মী। বাচ্চাদের দুধের পেছনেই সব টাকা খরচ হয়ে যেত। বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে স্বামী-স্ত্রী উপোষ করতেন।
‘বেহুলা’-র লখিন্দর
‘ঘরোয়া’-য় অভিনয় করতে গিয়ে রাজ্জাক জহির রায়হানের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। ভুলেই গিয়েছিলেন যে, তিনি কথা দিয়েছেন তাকে নায়ক করবেন।
একদিন রাজ্জাক ডিআইটি থেকে ‘ঘরোয়া’র রিহার্সেল করে বের হচ্ছেন, এ সময় হঠাৎ অভিনেতা মোহাম্মদ জাকারিয়া এসে হাজির। তিনি রাজ্জাককে দেখে বললেন, আরে আপনি এখানে! আর জহির রায়হান আপনাকে খুঁজে মরছেন।
কথাটি শুনেই রাজ্জাকের সব মনে পড়ে গেল। তিনি ভীষণ উত্তেজনা বোধ করলেন। ভাবলেন, কী ব্যাপার ? তবে কি জহির সাহেব অবশেষে ‘হাজার বছর ধরে’-র শুটিং শুরু করতে যাচ্ছেন ?...রাজ্জাক ডিআইটি থেকে সোজা চলে গেলেন জহির রায়হানের বাসায়। তাকে দেখে জহির বললেন, আমি নতুন ছবির কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। আপনি নায়ক, আর আপনার খবর নেই!
জহিরের কথা শুনে উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারলেন না রাজ্জাক। বললেন, আমি তাহলে সত্যি সত্যি ‘হাজার বছর ধরে’র নায়ক হচ্ছি ?
জহির বললেন, না, হাজার বছর ধরে এখন বানাতে পারছি না। তবে ঠিক করেছি, বেহুলার কাহিনি নিয়ে একটা বাংলা ফোক ছবি বানাব। নাম হবে ‘বেহুলা’। ওখানে আপনি লখিন্দরের চরিত্রে অভিনয় করবেন। এই বলে জহির পাঁচ শ’ টাকা সাইনিং মানি দিলেন রাজ্জাককে। পাঁচ শ’ টাকা পকেটে নিয়ে রাজ্জাক বেরিয়ে এলেন জহির রায়হানের বাসা থেকে। তার পা মাটিতে বটে কিন্তু আকাশে উড়ছেন। ভাবছেন নিদারুণ কষ্টের মধ্যে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দিন কাটাছিলেন। আঁধারের মাঝে একটুকরো আলো হয়ে দেখা দিয়েছিল টিভির ‘ঘরোয়া’ নাটকটি। নাটকের এক পর্বে অভিনয়ের জন্য এখন প্রতি সপ্তাহে ৬৫ টাকা করে পাচ্ছেন। এই টাকায় তার সংসার চলে যাচ্ছে বটে তবে ‘বেহুলা’-র নায়ক হলে নিশ্চয় অবস্থার আরও উন্নতি ঘটবে।
বাসায় পৌঁছে রাজ্জাক খুশিতে জড়িয়ে ধরলেন স্ত্রী লক্ষীকে। তার হাতে পাঁচ শ’ টাকা দিয়ে সবকিছু শুনে বললেন। শুনে খুশিতে ডগমগ হন না লক্ষ্মী। তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখান না। ভীষণ সাবধানী তিনি। রাজ্জাক তখন বলেন, কী ব্যাপার তুমি খুশি হও নি ?
লক্ষ্মী বলেন, আগে ছবি হোক, তোমাকে লখিন্দর করা হোক। ছবি ব্যবসা করুক। তারপর খুশি হব।
কিন্তু রাজ্জাকের খুশি কয়েকদিন পরেই উধাও। তিনি শুনলেন, তাকে নায়ক হিসেবে জহির রায়হান সিলেক্ট করেছেন শুনে প্রযোজনা সংস্থা স্টার গ্রুপের লোকজন আপত্তি জানিয়েছেন। তারা রাজ্জাকের মতো নতুন শিল্পীকে নিয়ে ছবি করতে চান না, ঝুঁকি নিতে চান না। তারা চান হাসান ইমাম কিংবা আখতার হোসেনকে। পাশাপাশি আবার এটাও শুনলেন যে জহির রায়হান গোঁ ধরে আছেন। তার এক কথা, আমি রাজ্জাককে কথা দিয়েছি। ‘বেহুলা’ করতে হলে ওকে নিয়েই করব। শেষ পর্যন্ত স্টার গ্রুপকে জহিরের প্রস্তাবেই সায় জানাতে হলো।
‘বেহুলা’-র শুটিং শুরু হয়েছিল সদরঘাটের একটি পুরোনো জমিদারবাড়িতে। প্রথম তিন দিন লখিন্দরের পোশাকে রাজ্জাককে স্রেফ বসিয়ে রাখা হলো। চতুর্থ দিন জহির রায়হান ডাক দিলেন রাজ্জাককে। বললেন, আপনার ধৈর্যের পরীক্ষা নিলাম। আজ থেকে আপনার শুটিং শুরু।
‘নাচে মন ধিনা ধিনা,/প্রাণেতে বাজে বীণা বাজেরে...’(সুর : আলতাফ মাহমুদ, কণ্ঠ : শাহনাজ বেগম) এই গানটির চিত্রায়ণ হলো। অংশ নিলেন রাজ্জাক (লখিন্দর) এবং সুচন্দা (বেহুলা)। চিত্রায়িত গানটি কয়েকদিন পরে সবাই একসঙ্গে বসে পর্দায় দেখলেন। সবাই খুশি। স্টার গ্রুপের কর্তাব্যক্তিরা মানলেন যে, জহির রায়হান কোনো ভুল করেন নি, তিনি যোগ্য ব্যক্তিকেই নায়ক হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। রাজ্জাক ‘বেহুলা’য় চুক্তিবদ্ধ হলেন পাঁচ হাজার টাকার সম্মানীতে। উল্লেখ্য, সুচন্দার সঙ্গে ‘বেহুলা’তেই কিন্তু প্রথম রাজ্জাক অভিনয় করেন নি।। এর আগে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে অভিনয় করেছিলেন কাজী খালেকের একটি প্রচারচিত্রে।
১৯৬৬ সালের ২৮ অক্টোবর মুক্তি পেল ‘বেহুলা’। সুপার-ডুপার হিট হলো। সিনেমাহলে একটানা পঁচিশ সপ্তাহ চলল।
‘আগুন নিয়ে খেলা’ থেকে ‘জীবন থেকে নেয়া’
‘বেহুলা’-র এমন অভূতপূর্ব ব্যবসার পরও এদেশের তৎকালীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা রাজ্জাকের ব্যাপারে উৎসাহী হন নি। তারা আড়ালে আবডালে বলছিলেন, ‘রাজ্জাক পৌরাণিক কিংবা ফোক ছবিরই যোগ্য শিল্পী। ওই ধরনের ছবিতেই দর্শকরা তাকে দেখতে চাইবে, সামাজিক বা সোশ্যাল ছবিতে নয়।’ জহির রায়হান অবশ্য তাদের কথা মানতে চাইছিলেন না। তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘রাজ্জাক সোশ্যাল ছবিরই শিল্পী।’ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, ওই সময় জহির রায়হানের প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবী দেবী প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছিলেন। ছবির নাম ‘আগুন নিয়ে খেলা’। পরিচালক আমজাদ হোসেন ও নুরুল হক বাচ্চু। এ ছবি দুই ভাইয়ের গল্প। বড়ভাই হিসেবে সুমিতা দেবী নির্বাচন করলেন শওকত আকবরকে। কিন্তু ছোটভাই কে হবেন ? এক্ষেত্রে রাজ্জাককে নেওয়ার জন্য সুমিতা দেবীকে পরামর্শ দিলেন জহির রায়হান। কিন্তু দেখা গেল তিনি ওই চরিত্রে নিতে চান সৈয়দ হাসান ইমামকে। তারও অভিমত, ফোক ছবির নায়ক হিসেবে রাজ্জাক ভালো করলেও সামাজিক কাহিনির ছবিতে হিরো হিসেবে তাকে মানাবে না। এইসব কথা কানে এল রাজ্জাকের। তিনি ভীষণ দুঃখ পেলেন।
জহির রায়হান টের পেলেন রাজ্জাকের মনের অবস্থা। দেখা হলে তিনি রাজ্জাককে বললেন, চিন্তা করবেন না। আপনাকে নিয়ে আমি আরেকটি ছবি করব।
যে কথা সেই কাজ। জহির রায়হান এবার সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রে হাত দিলেন।
বাংলার মুসলিম ঘরে ঘরে যে উপন্যাসটি সমাদৃত ছিল, সেই ‘আনোয়ারা’-কে রুপালি পর্দায় উপস্থাপন করতে চাইলেন। রাতারাতি তিনি ছবির চিত্রনাট্য লিখে ফেললেন। দিন পনেরো পর ছবির শুটিং শুরু হলো। সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ইউনিটের সবাই রাতে থাকে শহরে, দিনে চলে যায় গ্রামে—ছবির লোকেশনে। সেখানে মহাআনন্দে সবাই ছবির কাজ করতে লাগল।
সাত দিন পর সিরাজগঞ্জের সেই গ্রামের একটি বাড়ির উঠোনে শুটিং চলছে ‘আনোয়ারা’-র। হঠাৎ সেখানে এসে হাজির হলেন সুমিতা দেবী। তাকে দেখে জহির রায়হান একটা ঘরে ঢুকে গেলেন, তার সঙ্গে সুমিতা দেবী। তাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হতে লাগল। বাইরে থেকে অন্যরাও তা শুনতে পেল।
কিছুক্ষণ পর ঘরের ভেতর থেকে জহির রায়হান ডাক দিলেন রাজ্জাককে। রাজ্জাক ঘরে ঢোকার পর সুমিতা দেবী তার দিকে চেয়ে বললেন, আমি চাই ‘আগুন নিয়ে খেলা’-র হিরো আপনি হন।
রাজ্জাক বললেন, আপনি তো আমাকে রিফিউজ করেছেন। তারপরেও আমাকে কেন নেওয়ার কথা ভাবছেন ?
সুমিতা দেবী বললেন, বাদ দেন পেছনের কথা। আপনি রাজি হয়ে যান।
এসময় জহির রায়হান বলে উঠলেন, রাজ্জাক সাহেব বুঝেশুনে এই ছবিতে সাইন করবেন। কারণ ওরা আপনাকে একদিন রিফিউজ করেছিল। রাজ্জাক কিন্তু রাজি হয়ে গেলেন ‘আগুন নিয়ে খেলা’য় কাজ করার জন্য। ফলে ওই ছবির পাশাপাশি ‘আনোয়ারা’-য়ও কাজ করতে হলো তাকে। যেমন রাতে ‘আনোয়ারা’র কাজ করে সিরাজগঞ্জ থেকে ট্রেনে রওনা হতেন। দুদিন ঢাকায় ‘আগুন নিয়ে খেলা’-র কাজ করে আবার সিরাজগঞ্জে ফিরে যেতেন।
ঢাকায় ‘আগুন নিয়ে খেলা’র কাজ অনেকটা হয়ে গেল। এবার নিশ্চিন্তে রাজ্জাক কাজ করতে লাগলেন সিরাজগঞ্জে।
সামনেই কোরবানির ঈদ। কথা ছিল ঈদের দিন রাজ্জাক ঢাকায় চলে যাবেন। স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে দিন কাটাবেন। তাই ঈদের আগের দিন জহির রায়হানকে রাজ্জাক বললেন, জহির ভাই, আমি তাহলে কাল ঢাকায় যাচ্ছি।
জহির যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বলে উঠলেন, এটা কী করে হয় ? আপনি চলে যাওয়ার পর এতজন শিল্পী বসে থাকবেন ? না, সেটা হবে না। ঈদের দিনও শুটিং হবে। তা ছাড়া এখন তো আপনার কাজ করার সময়।
রাজ্জাক তখন উত্তেজিত হয়ে গেলেন। জহিরের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হতে লাগল তার। এক পর্যায়ে জহির বললেন, আপনি যদি ঢাকায় যান, তাহলে আমি আর এ ছবিই আর বানাব না।
রাগের মাথায় রাজ্জাক বলে উঠলেন, সেটা আপনার ইচ্ছা।
উত্তেজনা যখন তুঙ্গে তখন পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য সুচন্দা সরিয়ে নিয়ে গেলেন জহিরকে। কয়েক ঘণ্টা কেটে গেল। রাত একটার সময় জহিরের কাছে গিয়ে রাজ্জাক বললেন, ঠিক আছে, আসুন কাজ করব।
জহির রায়হান প্রধান সহকারী পরিচালককে নির্দেশ দিলেন শুটিং করার জন্য। লাইট জ্বলে উঠল। শুটিং চলতে লাগল। কিন্তু দেখা গেল, প্রতিটি শটই এনজি হচ্ছে। প্রধান সহকারী পরিচালক রাজ্জাককে কাজে মন দিতে বললেন।
রাজ্জাক বললেন, জহির ভাই যদি ক্যামেরার সামনে না এসে দাঁড়ান, লুক থ্রু না করেন, আমাকে দেখিয়ে না দেন, তাহলে এভাবে সারা রাত কাজ করতে হবে।
অদূরে বসে জহির সবই দেখছিলেন এবং শুনছিলেন। এবার তিনি উঠে এসে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন। লুক থ্রু করে নির্দেশনা দিতে লাগলেন অভিনয়শিল্পীদের। এভাবে শুটিং চলল। শেষ হলো গভীর রাতে।
পরদিন ঈদ। এই দিনে সবাই আনন্দ করছে আর রাজ্জাক করতে লাগলেন কাজ। ভোরবেলায় যমুনা নদীতে শুটিং। চলল একটানা বিকেল পর্যন্ত।
কাজ শেষে রাজ্জাক নদীর ধারে বসে আছেন। এমন সময় পেছন থেকে তার কাঁধে হাত রাখলেন জহির রায়হান। রাজ্জাক চমকে পিছন ফিরে তাকালেন। জহির বললেন, চলুন, বিশ্রাম নেবেন। তারপর একটু থেমে আবার বললেন, দেখুন, আমি জানি, আপনি আমার আচরণে কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু কী করব বলুন ? প্রযোজক যে টাকা দিতে চান না। কাজটা শেষ না করে বসে থাকলে সত্যিই আমরা ফেঁসে যেতাম। আপনার সঙ্গে অমন ব্যবহার করে আমিও কষ্ট পেয়েছি।
জহিরের হাত ধরে রাজ্জাকও দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, আপনার সঙ্গেও আমার ওভাবে কথা বলা মোটেই ঠিক হয় নি।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। ইউনিটের লোকজন থাকার জায়গায় চলে এলেন। জহির রায়হানের নির্দেশে খাসি কোরবানি হলো। সেটির মাংস দিয়ে তরকারি এবং পোলাও রাঁধা হলো। রাতে সবাই হইচই করে সেই খাবার খেল।
পরদিন ঢাকায় ফিরে এলেন রাজ্জাক। বাসায় এসে সব কথা বললেন লক্ষ্মীকে। রাজ্জাক যে ইউনিটকে না ফাঁসিয়ে ভালোয় ভালোয় কাজ শেষ করে ফিরেছে—একথা শুনে লক্ষ্মী খুবই খুশি হলেন। বললেন, ঈদের দিন আমিও একটি খাসি কিনিয়ে এনেছিলাম। সেটা কোরবানি দিয়েছি। তুমি আসো নি বলে ছেলেমেয়েরা অভিমান করেছিল। আমি ওদের সামলিয়েছি।
‘আনোয়ারা’র কাজ শুরু হয়েছিল আগে কিন্তু প্রথম মুক্তি পেল ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ১৯৬৭ সালের ২২ মার্চ। ছবিটি সুপার-ডুপার ব্যবসা করল। সামাজিক ছবির এমন ব্যবসা দেখে অন্য পরিচালকরা, যারা উর্দু ছবি নির্মাণ করছিলেন, তারাও বাংলা ছবি বানাতে লাগলেন।...১৪ জুলাই মুক্তি পেল ‘আনোয়ারা’। সাহিত্যনির্ভর এ চলচ্চিত্রটিও ব্যবসা সফল হলো।
এরপর রাজ্জাকের একের এক ছবি মুক্তি পেলে লাগল এবং ব্যবসা সফল হলো। বিশেষত ‘আবির্ভাব’, ‘এতটুকু আশা’, ‘মনের মতো বউ’। ‘আবির্ভাব’ ছবিতেই প্রথম কবরীর সঙ্গে অভিনয় করেন রাজ্জাক। যদিও প্রথম মুক্তি পায় ‘নিশি হলো ভোর’। পরে মুক্তি পায় ‘বাঁশরী’। উল্লেখ্য, এই সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দুই ভাই’ ছবিটি একটি কারণে উল্লেখযোগ্য। এ ছবিটি মাত্র ২৫ দিনে নির্মিত হয়। শুটিং থেকে শুরু করে সেন্সরে জমা দেওয়া পর্যন্ত। এখন পর্যন্ত এই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারে নি। এ ছবিতে অভিনয়ের সময় দিন রাত কাজ করেছেন রাজ্জাক। কখনো কখনো চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বিশ ঘণ্টা। এমনকি কোনো কোনো দিন না ঘুমিয়েও কাটিয়েছেন।
রাজ্জাক-কবরী জুটি গড়ে উঠল কিন্তু ‘ময়নামতি’-র মাধ্যমে। পরিচালক কাজী জহির।...একদিন জহির রায়হান খবর দিলেন কাজী জহির খুঁজছেন রাজ্জাককে।
রাজ্জাক বললেন, তিনি তো উর্দু ছবি করেন। আমি উর্দু ছবিতে কাজ করব না।
জহির বললেন, এভাবে বলবেন না। তিনি অনেক ব্যবসাসফল ছবির পরিচালক। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। আপনি কথা বলুন।
জহিরের কথা রাজ্জাক ফেলতে পারলেন না। গেলেন কাজী জহিরের কাছে। রাজ্জাককে দেখে কাজী জহির বললেন, আমি একটি ছবি বানাব। নাম ময়নামতি।
রাজ্জাক বললেন, ছবির গল্পটি বলুন।
এ কথা শুনে কাজী জহির উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। বললেন, আমি কাজী জহির গল্প শোনাব তোমাকে ? বলেই সেখান থেকে চলে গেলেন।
কয়েকদিন পর কাজী জহির ডেকে পাঠালেন রাজ্জাককে। রাজ্জাক যাওয়ার পর তাকে গল্পও শোনালেন।
রাজ্জাক বললেন, চমৎকার! খুবই ভালো গল্প।
কাজী জহির বললেন, এ ছবির প্রযোজক লাহোরের। তারা তোমাকে দশ হাজার টাকা দেবেন।
রাজ্জাক বললেন, আমি তো পঁচিশ হাজার টাকার নিচে এ ছবি করব না। রাজ্জাকের কথা শুনে কাজী জহির খুবই অবাক হলেন। বললেন, কেউ আমার কাছে এত টাকা চায় নি।
রাজ্জাক বললেন, চাইতাম না। যদি আপনি প্রযোজক হতেন। প্রযোজক যেহেতু লাহোরের সেহেতু কম টাকা নিতে যাব কেন ?
বিষয়টির কোনো ফয়সালা হলো না। রাজ্জাক তাই চলে এলেন।
কিছুদিন পর এক অবাঙালি ভদ্রলোক এলেন রাজ্জাকের কাছে। জানালেন ‘ময়নামতি’ ছবিটি তিনিই প্রযোজনা করছেন। তারপর জানতে চাইলেন, কিতনা রুপিয়া চাহিয়ে ?
রাজ্জাক বললেন, পঁচিশ হাজার। সাইনিং মানি দিতে হবে পাঁচ হাজার।
অবাঙালি ভদ্রলোক সেই টাকা দিয়েই চলে গেলেন।
‘ময়নামতি’ ছবির শুটিং করতে গেলেন রাজ্জাক। এক মাসের মতো শুটিং হলো। দেখলেন, কী ভীষণ খুঁতখুঁতে পরিচালক কাজী জহির। কিছুতেই সন্তুষ্ট হন না তিনি। কোনো দৃশ্য ভালো না হলে বলেন ভালো করতে। ভালো হলে বলেন আরও ভালো করতে। তাতেও তিনি খুশি হন না। আর ছবিতে যা যা দরকার সেটিই চাই তার। সেইসব জিনিস প্রোডাকশন ম্যানেজার না এনে দিলে শুটিং বন্ধ। এমন পারফেক্টনিস্ট পরিচালকের ছবি ‘ময়নামতি’ মুক্তি পেল ১৯৬৯ সালের ১৬ মে। ছবিটি দেখতে আবালবৃদ্ধবনিতা সিনেমাহলে ভিড় জমাল। ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হলো। একই সময়ে ছবিটির উর্দু সংস্করণ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে মুক্তি পেলে সেখানেও অভূতপূর্ব ব্যবসা করল ছবিটি। জুটি হিসেবে রাজ্জাক-কবরীর নাম ছড়িয়ে পড়ল সবখানে। ফলে ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’সহ এই জুটির সবগুলোর ছবি ব্যবসায়িক সফলতা পেল।
রাজ্জাকের বৃহস্পতি তখন তুঙ্গে। কোনোকিছুর কমতি নেই কোথাও। যা তার চাহিদা সবই পূরণ হচ্ছে। বাসায় টিভি তো আগেই এসেছিল। এবার কিনলেন গাড়ি। প্রথমে একটি পুরোনো গাড়ি। ব্লুবার্ড। পরে নাভানার শোরুম থেকে ৬৯ মডেলের নতুন টয়েটা গাড়িও।
গাড়ি কিনেই রাজ্জাক সোজা গেলেন জহির রায়হানের বাসায়। সেখানে পৌঁছে জহিরকে বললেন, জহির ভাই, গাড়ি কিনেছি। আপনি আর ম্যাডাম (সুচন্দা) না চড়লে এই গাড়িতে আমি বসব না।
অগত্যা জহির ও সুচন্দা বাসা থেকে বেরিয়ে রাজ্জাকের গাড়িতে উঠলেন। রাজ্জাক বেশ কিছুক্ষণ গাড়ি চালালেন। ঘুরলেন ঢাকার নানা জায়গা। তারপর আবার জহির ও সুচন্দাকে তাদের বাসায় নামিয়ে দিলেন। পরে তিনি গুলশানে জমি কিনে বাড়িও করেন।
১৯৬৯-এর শেষে জহির নির্মাণ করতে শুরু করলেন এদেশের প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’। একটি সংসারের মধ্য দিয়ে দেশের তৎকালীন অবস্থা তুলে ধরেছিলেন জহির রায়হান। এ ছবিটির যখন শুটিং চলছিল এফডিসিতে, তখন একদিন আর্মি এসে ফ্লোর ঘেরাও করল। জহির ও রাজ্জাককে বললেন তাদের সঙ্গে যেতে। তাদের দুজনকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হলো। তারপর বলা হলো তারা এন্টি-পাকিস্তানি কিছু করছে। জহির এব্যাপারে খোলাসা করে কিছু বললেন না। শুধু এটা বললেন, ‘তোমাদের তো বলার কিছু নেই। দেশে সেন্সর বোর্ড আছে। ছবি দেখো। এন্টি-পাকিস্তানি কিছু হলে ব্যবস্থা নাও। ছবি রিলিজ দিয়ো না।’ তারপর আবার জহির ও রাজ্জাক এফডিসিতে এলেন, শুটিং করতে লাগলেন। ছবিটি মুক্তির সময় আটকে দিতে চেয়েছিল পাকিস্তানিরা। কিন্তু জনদাবির মুখে তাদের সেই চেষ্টা সফল হয় নি। ‘জীবন থেকে নেয়া’ মুক্তি লাভ করে ১৯৭০-এর ১০ এপ্রিল।
Leave a Reply
Your identity will not be published.