যখন নিভে গেল জীবনের দীপ
যে-কোনো মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে কেউই গ্রহণ করতে পারে না। প্রতিটি মৃত্যুই বিষাদের বিবর্ণতা ছড়িয়ে প্রিয়জনকে বিহ্বল করে তোলে। অনেকেই দিশেহারা হয়ে যান। কিন্তু মনে রাখতেই হবে, বেদিশা আবেগের চেয়ে বাস্তবতাকে এক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হয়। আপনজনদের কাছে দ্রুত মৃত্যুসংবাদ পৌঁছানো সবচে’ জরুরি। সেই সঙ্গে ধর্মীয় কিছু বিধি অনুসরণের ব্যাপারটিও এসে যায়। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী মারা যাওয়ার পরপরই মুর্দার দেহ এমনভাবে শুইয়ে দিতে হয় যেন মাথা থাকে উত্তরে আর পা থাকে দক্ষিণ দিকে। মুখটাকে কেবলামুখি (পশ্চিম) করে হেলিয়ে দিতে হয়। এ সময় মৃত ব্যক্তির যদি চোখ খোলা কিংবা জিহ্বা খানিকটা বের হয়ে থাকে, তাহলে চোখ বন্ধ বা জিহ্বা মুখের ভিতর অবশ্যই ঢুকিয়ে দিতে হবে। পরিচ্ছন্ন চাদরে লাশের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে আতর-গোলাপজল ও অন্যান্য সুগন্ধী ছিটানো, মৃতের অদূরে আগরবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া, কোরআন তেলওয়াতের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি হলো ইসলামের প্রচলিত রেওয়াজ। হিন্দু ধর্ম অনুসারীগণ শুরুতেই শবকে শয্যাসহ দেউরির বাইরে নিয়ে আসেন। মৃতের কপালে এঁকে দেন চন্দনের তিলক। এ ক্ষেত্রে অবশ্য হিন্দুদের বর্ণ-শ্রেণি-জাত-গোত্র ভেদে নানা প্রথার প্রচলন আছে। খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মানুসারীরা মৃতের কাছাকাছি ধর্মগ্রন্থ পাঠের বন্দোবস্ত করে। মৃত্যুটি যদি অস্বাভাবিক হয় তাহলে ডাক্তারি সার্টিফিকেট অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে। রোগ কিংবা অন্য কারণে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একজন এম.বি.বি.এস. ডাক্তারের দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করাটাই ভালো। দুর্ঘটনা-মহামারি কিংবা কোনো প্রকার অপঘাতে মৃত্যু হলে প্রয়োজন পড়ে পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্তের। ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্য হলো মৃত্যুর কারণটি উদ্ঘাটন করা। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা আছে। যে ঘরে লাশের ব্যবচ্ছেদ করা হয় তাকে বলা হয় লাশকাটা ঘর। যারা লাশ কাটাকাটির কাজটি করে তাদের বলা হয় ডোম। কমপক্ষে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে মৃতের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করা হয়। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি হওয়ার পর লাশ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য সামাজিক বিধি-সংস্কার
প্রতিটি ধর্মেই মৃতদেহের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি নির্দেশ রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব মৃতের দাফন বা সৎকারের ব্যবস্থা না করলে লাশে পচন ধরার সম্ভাবনা রয়ে যায়। সাধারণত মৃতুর ১৮ ঘণ্টা পরে মৃতদেহে পচন ধরে। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় দাফন বা সৎকারের জন্যে লাশ দূরে কোথাও স্থানান্তরের প্রয়োজন পড়ে। আবার অনেক সময় খুব কাছের মানুষের দূরে অবস্থানের কারণে শেষ দেখার জন্যে দীর্ঘক্ষণ লাশ সংরক্ষণের প্রয়োজন পড়ে। তবে এ সবকিছুর আগে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি এসে যায়। মৃতব্যক্তি মুসলমান হলে বড়ুই বা নিমপাতার গরম পানিতে মুর্দাকে গোসল দেওয়া হয়। পুরুষদের মধ্যে পুরুষ ও মহিলাদের জন্যে মহিলাদেরই গোসল দিতে হয়। গোসল করানোর সময় কিছু অপরিহার্য বিধি পালন করতে হয়। প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় থাকে এসব ধর্মীয় বিধানসমূহ জানা লোকজন। বিশেষ করে মসজিদের ইমাম বা মোয়াজ্জিন এ ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারেন। তা ছাড়া কাফন বিক্রির বিভিন্ন দোকানে গোসলদারদের খোঁজ করলেই পাওয়া যায়। পেশাজীবী গোসলদারদের এজন্যে হাদিয়া প্রদান করতে হয়। রাজধানীতে বেশ কিছু দোকান আছে যেখানে কেবল কাফনের কাপড়, মুর্দার বাক্স, সুগন্ধী ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি হয়। ঢাকার চানখারপুলের ‘বিদায় স্টোর’ ও ‘চিরবিদায় স্টোর’-এ বিভিন্ন ধরনের কাফনের সেট পাওয়া যায়। লাশ গোসল দেওয়া থেকে শুরু করে কবরে শোয়ানোর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত যেসব সামগ্রীর প্রয়োজন হয় তার সবই থাকে একেকটি কাফন সেটে।
কাফনের কাপড় ছাড়াও আরও নয় প্রকার সামগ্রী (যেমন : সাবান, আতর, লোবান-কর্পূর, আগরবাতি, গোলাপজল, তুলা, ঢিলা কুলুপ, খিলাল, বুরুশ প্রভৃতি) মিলিয়ে প্রতিটি সেটের মূল্য ৪৫০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা। তবে উন্নত মানের পপলিন কাপড়ের কাফন সেট ৯৫০ টাকা থেকে ১২৫০ টাকায় পাওয়া যায়। মগবাজারে বিদায় বেলা স্টোর, সায়েদাবাদে আখেরি বিদায়, বনানীতে আল বিদায় স্টোর ইত্যাদি দোকানগুলোতে ৫০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকায় বিভিন্ন মানের কাফন সেট বিক্রি হয়। কাফন সেট ছাড়াও এসব দোকানে বিক্রি হয় লাশ বহনের বাক্স। আম কাঠে তৈরি এসব বাক্সের বিক্রি মূল্য ৪০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা। লাশ সংরক্ষণের জন্যে প্রয়োজন হয় চা-পাতি। চা-পাতির কেজি ৪০ ও ৫০ টাকা। এসব দোকান থেকে বরফও সরবরাহ করা হয়। বাচ্চাদের কাফনের মূল্য ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এ ধরনের দোকানগুলো দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। লাশ বহনকারী গাড়ি, মাইক্রোবাস, ট্রাক ইত্যাদি এখান থেকে ভাড়ায় পাওয়া যায়। ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় লাশ বহনের জন্য সবচে’ সুবিধাজনক দেড় টনের মিনি ট্রাক ভাড়ায় পাওয়া যায় চাঁনখারপুল, নিমতলি এবং সাতরাস্তা এলাকায়। এছাড়া বিভিন্ন রেন্ট-এ-কারে ভাড়ায় মাইক্রোবাসে করেও লাশ স্থানান্তর করা সম্ভব। লাশ বহনের গাড়ির ক্ষেত্রে ফেরি পারাপারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। লাশের গাড়ির সামনে লালসালু কাপড়ের টুকরা বেঁধে দিলে সুবিধা পাওয়া যায়। ১৮ ঘণ্টা যেতে না যেতেই লাশের পচন প্রক্রিয়া শুরু হয়, এ কারণে গোসল ও কাফন জড়ানোর পর লাশ বাক্সে ঢুকিয়ে তাতে বরফ এবং চা-পাতি ছড়িয়ে দেওয়া লাগে। চা-পাতি ছড়িয়ে দেওয়া হলে মৃতদেহ পচন প্রক্রিয়া থেকে রক্ষা পায়। অনেক ক্ষেত্রে নানা কারণে লাশকে বেশ কয়েকদিন সংরক্ষণ করার প্রয়োজন পড়ে। রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত বারডেম হাসপাতালে রয়েছে একটি শীতল কক্ষ, যাতে দিনপ্রতি ৯০০ টাকা চার্জ প্রদানের মাধ্যমে যে-কোনো লাশ সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
ইসলাম ধর্মানুসারীদের ক্ষেত্রে মুর্দার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ মৃত ব্যক্তির বাড়িতেই করা হয়। গোসল করার সময় দাঁত পরিষ্কার, নখ কাটা, লোম কাটা, মূত্র-মলদ্বার পরিষ্কার করা ইত্যাদি কাজগুলো সম্পন্ন করতে হয়। তারপর লাশকে কাফন পরিয়ে দেওয়া হয়। কাফনের মধ্যে থাকে তিনটি অংশ—কামিজ, লেফাফা ও চাদর। মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অতিরিক্ত দুটো ওড়না। এইসব আবশ্যিকতা সম্পন্ন হয়ে গেলে লাশকে খাটিয়ায় করে জানাজার নামাজ পড়ানোর জন্যে স্থানান্তর করা হয়। পাড়া-মহল্লার প্রতিটি মসজিদেই লাশ বহনের জন্যে রয়েছে খাটিয়া।
হিন্দুদের ক্ষেত্রে শব দেহের স্নান করানোর কাজটি শ্মশানে সম্পন্ন হয়। স্নান করবার পর কিছু পূজা-অর্চনার মাধ্যমে মৃতদেহ সাদা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। বাড়ি থেকে যখন শব শ্মশানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন শবযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা মুখে শ্লোক আওড়ায়...হরি বল্ বল্ হরি। মৃত ব্যক্তির পুণ্য কামনায় শবযাত্রায় মিঠাই-বাতাসা ছিটানো হয়ে থাকে।
খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও মৃতদেহকে গোসল করানোর কাজটি বাধ্যতামূলক। গোসল দেওয়ার পর মৃতকে ভালো জামাকাপড় (স্যুট, শার্ট-প্যান্ট, ম্যাক্সি, গাউন, শাড়ি ইত্যাদি) পরিয়ে দেওয়া হয়। তারপর মৃতদেহকে কাঠের তৈরি কফিনে প্রবেশ করিয়ে অন্তিম প্রার্থনার জন্য চার্চে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে আর্থিক অসচ্ছলতার ক্ষেত্রে কফিনের পরিবর্তে সাদা কাপড় মুড়িয়ে কাজ চালানো যেতে পারে।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বেলায় শ্লোক ও মন্ত্র জপার মাধ্যমে মৃতদেহের স্নান করানোর বিধানটি মানা হয়।
শেষ প্রার্থনা এবং অন্তিম বন্দোবস্ত
মুর্দার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে সেজদা-রকুবিহীন দুই রাকাত জানাজা নামাজ আদায় করা হয়। ইসলাম ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী এক ব্যক্তির একাধিকবার জানাজা হতে পারে। এমনকি মৃতদেহের অনুপস্থিতিতে গায়েবানা জানাজা পড়ানো যেতে পারে। মৃত ব্যক্তির পুত্র কিংবা নিকট আত্মীয় জানাজার নামাজে ইমামতি করতে পারলে ভালো হয়। অন্যথায় মসজিদের ইমামকে দিয়েও জানাজা করানো যেতে পারে। খোলা ও উন্মুক্ত স্থানে মুর্দার খাটিয়াকে সামনে রেখে দাঁড়িয়ে জানাজা পড়া হয়। জানাজার আগে মুর্দার পুত্র-পোষ্য কিংবা আইনত উত্তরসূরি উপস্থিত জমায়েতে উচ্চস্বরে মৃতের সকল দায় ও পাওনা পরিশোধের অঙ্গীকার করেন এবং মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সকলের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। জানাজার নামাজ শেষে মুর্দার খাটিয়াকে কবরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় খাটিয়ার সামনের দুটো হাতল বহন করেন মৃতব্যক্তির পুত্র কিংবা নিকটাত্মীয় পরিজন। লাশ কবরে নিয়ে যাওয়ার সময় বহনকারীরা সম্মিলিত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন কলেমা শাহাদাত—আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহু...। ঢাকায় সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত কবরস্থানগুলো হলো—আজিমপুর, বনানী, স্বামীবাগ ও মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান। এসব কবরস্থান এখন প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। বনানী ও মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে অল্পসংখ্যক সংরক্ষিত স্থায়ী কবর রয়ে গেছে। দেশের বৃহত্তম কবরস্থান আজিমপুর। গড়ে প্রতি ঘণ্টায় এখানে একটি করে কবর খোঁড়া হচ্ছে। আজিমপুর গোরস্থানের নতুন ও পুরাতন দুটি অংশের কোনোটিতেই সংরক্ষণ করার মতো স্থায়ী কোনো কবর বর্তমানে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালে আজিমপুর কবরস্থানে শেষ স্থায়ী কবরটি বিক্রি করা হয়। সেই সময় সাড়ে তিন হাত মাটির বিক্রয় মূল্য ছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা। আজিমপুরে এখন সব কবরই অস্থায়ী ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ কবর দেওয়ার বছর খানেক পরে ড্রেজার দিয়ে সব কবর মিলিয়ে ফেলা হয় এবং ওই জায়গায় নতুন কবর খনন করা হয়। লাশ দাফনের জন্যে আজিমপুর গোরস্থান প্রতিদিন ভোর ছয়টা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকে। গোর দেওয়ার ছয় ঘণ্টা পূর্বে কর্তৃপক্ষকে পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির কবরের জন্য ৫০৯ টাকা এবং ৮ বছরের কম বয়সী লাশের জন্য ২৯২ টাকা জমা দিতে হয়। লাশ দাফনের যাবতীয় খরচ এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে (যেমন : মাটি কাটা, বাঁশ ও চাটাইয়ের খরচ)। সিটি কর্পোরেশন নির্ধারিত এই চার্জের বাইরে অন্য কোনো টাকা দিতে হয় না। তবে অনেকেই মাঝে-মধ্যে গরিব গোরখোদকদের কিছু অতিরিক্ত বখশিশ দিয়ে থাকেন। টেন্ডারের মাধ্যমে আজিমপুর গোরস্থান প্রতিবছর সর্বোচ্চ দর আহ্বানকারীর ঠিকাদারের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। ঠিকাদারের অধীনেই গোরখোদক ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত কর্মচারীরা কাজ করে থাকে। বনানী ও মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানও অনুরূপ পদ্ধতিতে ঠিকাদারদের কাছে ইজারাকৃত। চালুনী-গোর অর্থাৎ অস্থায়ী কবরের ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনকে নির্ধারিত পূর্বোক্ত চার্জ প্রদান করতে হয়।
বনানী কবরস্থানে কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে যা জন্যে অবস্থান ভেদে চার থেকে ছয় লাখ টাকা প্রদান করতে হয়। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্থায়ী কবরের জন্য প্রয়োজন হয় দেড় লাখ টাকা। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী মুর্দার জন্য সাড়ে তিন হাত লম্বা ও গভীর এবং দুই হাত প্রশস্ত কবর খনন করতে হয়। লাশ শুইয়ে কবরের উপরে সারিবদ্ধ করে বাঁশের টুকরা ও চাটাই বিছিয়ে দেওয়া হয়। তারপর কমপক্ষে দেড় হাত পরিমাণ মাটি দিয়ে বাঁশ বা চাটাইকে ঢেকে দিতে হয়। দাফনের পর আত্মীয়স্বজনদের ফাতিহা পড়ার মাধ্যমে মুসলমানদের মৃতদেহ শেষ বন্দোবস্ত করার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে সাদা কাপড় পেঁচিয়ে শবদেহকে শ্মশানের চিতায় উঠানো হয়। মৃতদেহের নিচে বিছানো থাকে শুকনো লাকড়ি। চিতায় শুইয়ে দেওয়ার পর মৃতদেহের ওপর চাপানো হয় আরও কিছু লাকড়ি। শুধু মৃতের মুখটি বেরিয়ে থাকে। মুখে খানিকটা ঘি ঢেলে দেওয়া হয় আর লাকড়িতে ঢাকা দেহে ছিটানো হয় পেট্রোল কিংবা কেরোসিন। মৃতব্যক্তির পুত্র বা নিকট-আত্মীয় একটি শলাকায় আগুন নিয়ে মুখাগ্নি করিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে গোটা দেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একটি শব পুরোপুরি পুড়তে সময় নেয় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। এ সময় শ্মশানের পুরোহিত ও মৃতের আত্মীয়স্বজন কিছু মাঙ্গলিক পুজো সম্পন্ন করে। ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে একসময় কিছুই থাকে না বাকি, খালি রাশি রাশি ছাই। এই ছাইয়ে জল ঢেলে শ্মশানঘাট পার্শ্ববর্তী দিঘি বা নদীর জলের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। শবের নাভি পোড়ে না বলে তা মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। শোকাহত আত্মীয়স্বজন শ্লোক আওড়াতে আওড়াতে ঘরে ফিরে। সাত দিনের কম বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে মৃতদেহকে আগুনে না পুড়ে মাটিতে পুঁতে সমাধিস্থ করার ধর্মীয় বিধান রয়েছে। ঢাকার পোস্তাগোলার শ্মশানঘাটটি শতাব্দী-প্রাচীন সমাধিস্থল। রায়ের বাজার ও টঙ্গী তুরাগ নদীর পাশেও রয়েছে শ্মশান ঘাট। এসব শ্মশানে শুধু লাকড়ির মূল্য বাবদ মণ প্রতি ২৫০ টাকা প্রদান করতে হয়। এছাড়া পুরোহিতকে স্বেচ্ছায় সবাই কিছু দান করে যান।
ঢাকায় রয়েছে খ্রিষ্টানদের জন্যে দুটি সমাধিস্থল। একটি ওয়ারীতে টিপু সুলতান রোডে এবং অপরটি তেজগাঁ চার্চ সংলগ্ন। তেজগাঁতে এখন স্থায়ী কোনো সমাধির জায়গা নেই। দুই বছর পরপর মাটি ফেলে নতুন সমাধির ব্যবস্থা করা হয়। এসব বাবদ যা খরচ হয় তা বহন করে ব্যাপ্টিস্ট চার্চ কর্তৃপক্ষ। টিপু সুলতান রোডের সমাধিস্থলে সংরক্ষিত কিছু জায়গা ফাঁকা আছে। এক্ষেত্রে খ্রিষ্টান কম্যুনিটি কর্তৃক মনোনীত লোকদের জন্য এ জায়গা সংরক্ষিত। কফিন মাটি চাপা দেওয়ার পরে সমাধির প্রান্ত ভাগে একটি ক্রুশ চিহ্ন কাঠ বা অন্য কিছু দিয়ে তৈরি করে গেঁথে দেওয়া লাগে। ক্রুশে মৃত ব্যক্তির নাম পরিচয়, জন্ম ও তারিখ উল্লেখিত থাকে। কফিন মাটি চাপা দেওয়ার পর চার্চের ফাদার বাইবেল থেকে কিছু শ্লোক পাঠ করে মৃতের আত্মার মঙ্গল কামনা করেন।
বৌদ্ধদের ক্ষেত্রে একমাত্র বাসাবো শ্মশান ছাড়া ঢাকায় পৃথক কোনো শ্মশানের অস্তিত্ব নেই। বৌদ্ধ ধর্মানুযায়ী ভিক্ষুরা ত্রিপিটক থেকে কিছু মন্ত্র পাঠ করতে করতে মৃতদেহ কাঠের পেটিকায় বদ্ধ করে। এ সময় মৃতব্যক্তির আত্মীয়স্বজন আসনে বসে বুদ্ধের বন্দনা করতে থাকে। অতঃপর মৃতদেহের পেটিকার ওপর লাকড়ি চাপিয়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। বাসাবোতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মৃতদেহ সৎকার করার খরচ বহন করে বুড্ডিস্ট ফাউন্ডেশন।
তবুও জীবন বহমান
প্রিয়জনকে কবরে শুইয়ে দিয়ে কিংবা শব দাহ করে স্বজনেরা ঘরে ফিরে। বুকে থাকে চলে যাওয়া মানুষটির অসংখ্য স্মৃতি। একদিন...দুদিন যায়, তারপর মাস...মাস পেরিয়ে বছর। একসময় স্মৃতিগুলোও ফিকে হয়ে আসে। সবকিছুকে খুব স্বাভাবিক মনে হয়। মানুষ আসে, মানুষ যায়...সবাই একদিন পৌঁছায় অন্তিম লক্ষ্যে।
ওরা থাকে মানুষের মৃত্যুর অপেক্ষায়
শকুন কিংবা শৃগাল নয়, ওরাও মানুষ। ওদের জীবনেও আছে আনন্দ-বেদনা, কান্না-হাসি। শুধু জীবিকাটি ‘মৃত্যু’ নির্ভর। মানুষের মৃত্যু ওদের মুখে অন্ন জোগায়। বেঁচে থেকেও ওদের জীবনের ভাঁজে ভাঁজে জড়ানো থাকে কেবলই মৃত্যু। মরা মানুষকে আঁকড়ে ধরে ওরা এক জীবন দেয় পাড়ি। প্রতিদিন ওরা অপেক্ষায় থাকে কখন আসবে লাশ। যত বেশি লাশ ততই ওদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের প্রলেপ। তাই বোধ করি স্বপ্নেও ওরা দেখে লাশ সারি সারি ‘...আনো লাশ, আরও লাশ, লাশের পাহাড়’। এমনি কিছু পেশাজীবী মানুষের মুখোমুখি হওয়া যাক।
গোরখোদক
মানুষের অন্তিম গৃহের কারিগর ওরা। কোদাল হাতে গোরখোদকেরা কবর খোঁড়ে। সাড়ে তিন হাত মাটির ঘর তৈরিতে তারা বিশেষজ্ঞ। ওদেরই একজন ইদ্রিস আলী। আজিমপুর গোরস্থানে সে কাজ করে। এ পেশায় আছে পনেরো-ষোলো বছর। দেশের বাড়ি ফরিদপুর। ইদ্রিস জানাল, জিয়ার আমলের খাল খনন কর্মসূচিতে প্রথম কোদাল হাতে নেয়। তারপর হাত থেকে সেটি আর নামে নি। তবে খাল খননের পরিবর্তে এখন সে কবর খনন করে। পরিচিত এক লোক তাকে নিয়ে আসে এই পেশায়। ইদ্রিস আরও জানায়, সে ঠিকাদারের অধীনে বান্ধা কাজ করে। প্রতিদিন হাজিরা বাবদ পায় নব্বই টাকা। আর খোরাকি বাবদ বিশ টাকা। তবে মাঝে মধ্যে ওভার টাইমও খাটতে হয়। তখন পারিশ্রমিক পায় কবর প্রতি চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা। তা ছাড়া কবর খোঁড়া ভালো হলে মুর্দার আত্মীয়স্বজন খুশি হয়ে বখশিশ দেয়। এটাই তার আউট ইনকাম। অবশ্য কেউ কেউ কবর দেখাশোনা বা পরিষ্কার করা বাবদও কিছু দেয়। তার জীবনের সবচে’ দুঃখের স্মৃতি নিজের ঔরসজাত বড় ছেলের কবর নিজ হাতে খনন করা। আল্লাহর কাছে ইদ্রিসের প্রার্থনা, কেউ যেন আর এমন অবস্থার মুখোমুখি না হয়। এ অভিজ্ঞতা বড় কষ্টের।
দিনু মিঞার অভিজ্ঞতা
বনানী গোরস্থানের গোরখোদক দিন মোহাম্মদ। সবাই ডাকে দিনু মিঞা নামে। বংশপরম্পরায় দিনু এ পেশায় নিয়োজিত। শৈশবে বাবাকে কবর কাটতে সহযোগিতা করতে করতে এক সময় এ কাজটি সে রপ্ত করে ফেলে। তারপর অন্য কিছু করার কথা আর ভাবে নি। জীবন বাঁধা পড়ে গেছে কবরস্থানে। দিনু মিঞার বাবা বাড্ডা এলাকার নূরের চালা মওতাখোলার ছিল বাঁধা কামলা। কবর কাটাসহ দেখাশোনার দায়িত্বও ছিল তার। শাহজাদপুর নূরের চালার সেই চেনা মওতাখোলাটিতেই তিনি মাটির বিছানায় ঘুমিয়ে আছেন। কবর কর্মী দিনু মিঞা তার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন, ‘কবরস্থান গোরস্থানকে সবাই ভয় পায়। অনেকে মনে করে কবরস্থানে ভূত-জিন-প্রেতাত্মা থাকে। এইসব ভুয়া কথা। কই আমার চোখে তো কোনোদিন কিছু পড়ে নাই। আসলে কবর-গোরস্থান হলো পাক-পবিত্র স্থান। আল্লাহর পছন্দের জায়গা। এখানে শয়তান-জিন-প্রেত কোনোমতেই ঢুকতে পারে না। কেউ যদি আমাকে এসব দেখাতে পারে তাহলে আমি কবর কাটা ছেড়ে দেব।’ দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞ গোরখোদক দিনু মিঞার কাছ থেকে তার নিজের চোখে দেখা মৃতদেহ রূপান্তরের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত হই, যা নিঃসন্দেহে অভূতপূর্ব।
(১) লাশ কবরে প্রবেশের ৮ ঘণ্টা গেলেই পচন ধরে যায়। তবে শীতকালে এবং কেমিক্যাল দেওয়া লাশের বেলায় আরও সময় নিয়ে থাকে। সবার আগে মৃতের চোখ পুঁজের মতো গলে বেরিয়ে আসে। অন্যদিকে মাংসপেশি নরম হয়ে আসে। লাশের দেহ ফুলে ওঠে। আলগা হয়ে যায় কাফনের কাপড়। তারপর পাঁজর, মেরুদণ্ড, অস্থি, হাড় থেকে নরম মাংস ক্রমশ খসে খসে পড়ে। এরকম চলে মৃত্যুর তিন দিন থেকে সপ্তাহখানেক। এ সময় পঁচা মাংসের ভয়াবহ দুর্গন্ধে গোটা কবর ভরে যায়। শেয়াল-বেজি তাতে আকৃষ্ট হয়ে কবর ঘিরে দাপাদাপি করে। মাঝেমধ্যে ছিন্নভিন্ন মাংস খণ্ড কিংবা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কবরের বাইরে নিয়ে আসে।
(২) সপ্তাহখানেক পরে মাংসের সাথে হাড়ের কোনোই সম্পর্ক থাকে না। অস্থি-হাড়ের জয়েন্টগুলো আলগা হয়ে পড়ে। আর ওদিকে দেহে মাংস বলতে কিছুই বাকি নেই, পরিণত হয়েছে থকথকে তরলে। লালচে-কালো পীতবর্ণের ঘন কাদা ঘণ্টায় ঘণ্টায় আরও তরল হতে থাকে। ওসব যে মানবদেহের তা-ই বোঝা যায় না। দেহ রূপান্তরিত তরলটি হয়ে ওঠে বেজি-চিকা-ইঁদুরের প্রিয় খাদ্য, সুস্বাদু পানীয়। এ সময় দুর্গন্ধটা অ্যাশটে অ্যাশটে হয়ে ওঠে।
(৩) কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই দেহ নামের দগদগে তরলটি হয়ে পড়ে বর্জ্যভোগী প্রাণীদের জন্যও অখাদ্য। কারণ ইতিমধ্যে তাতে দেখা দিয়েছে ছোট্ট ছোট্ট কীট সাদা রঙের ‘কীড়া’। এসব দেখতে খানিকটা গরুর নাড়ি-ভুঁড়িতে লেগে থাকা কৃমি-কীটের মতো। কীড়াগুলো দ্রুত বাড়তে থাকে। দুর্গন্ধ উধাও হতে হতে কিছুই থাকে না। কবরজুড়ে কেবল কিলবিল কিলবিল। হাজারে হাজার-লাখে লাখে। দিনু মিঞার মতে, কীড়াগুলো এ তরল পদার্থ খেতে থাকে। কারণ কদিন যেতেই দেখা যায় ওগুলো মোটাতাজা হয়ে উঠেছে এবং কোথা থেকে যেন একই রকম দেখতে বড় বড় কীড়ার আবির্ভাব হয়। দিনু মিঞার বিশ্বাস—এগুলোই আসলে ‘গোর আজাব’, যে যত বেশি পাপী তাকে খাবে তত বেশি কীড়া এবং সেই সাথে তা হবে দীর্ঘস্থায়ী। নিরক্ষর দিনু মিঞার এটি একেবারে নিজস্ব দর্শন ও বিশ্বাস। মাস দেড়-দুই থেকে তিন কি চার এমনকি ছয় মাস ধরেও এমনটি চলতে পারে।
(৪) ‘কীড়া’গুলির দিনও একসময় ফুরিয়ে যায়। গোরখোদক দিনু মিঞার ভাষ্যমতে, মানব দেহাবশেষ থকথকে কাদা পুরোটুকু কীড়া বা কীটেরা খেয়ে ফেলে। তারপর ওগুলো খাদ্যের অভাবে কিলবিল করতে করতে মরে যায়। কবরে বিছানো থাকে কেবল মানুষের হাড়-গোর। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সব কীড়া-কীট মাটিতে মিশে যায়। হাড়-অস্থিতে জমতে থাকে মাটির আচ্ছাদন। প্রথমে মাটি দিয়ে ধীরে ধীরে ভরাট হয় চোখ-মুখ-নাকের কোটর। মাটির স্তর ধীরে ধীরে ঢেকে দেয় গোটা কঙ্কাল। পরতে পরতে মাটি ভরতে থাকে কবরের শূন্যস্থানগুলো। অনেক দিনের পুরোনো কবর খুঁড়লে তাই দেখা যায় মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে মৃত মানুষটার শেষচিহ্ন কিছু হাড়-গোড়। দিনু মিঞা জানে, মাটিই মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি। দিনু মিঞার কাছে জানতে চাইলে সে বলে, এ অভিজ্ঞতা তার একদিনে হয় নি। অজানাকে জানার দুর্বার কৌতূহলে দিনের পর দিন সে কাজ ছাড়াই ‘মওতাখোলা’য় পড়ে থেকেছে। বিনা পারিশ্রমিকে কবরসমূহের পরিচর্যা করেছে। ফাঁকে ফাঁকে নানা কবরের বাঁশের বিছানা সরিয়ে সে মানবদেহের চূড়ান্ত পরিণতিকে চিনতে চেয়েছে। অজানাকে জিতে নেওয়াটাই তো মানুষের চিরায়ত প্রবৃত্তি। মানুষ কেবল জানে না, মৃত্যুর রহস্য।
ডোম
অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে লাশের পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত করে মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন করা হয়। কমপক্ষে একজন তালিকাভুক্ত এমবিবিএস ডাক্তারের উপস্থিতিতে যারা লাশের ব্যবচ্ছেদ করে তাদের বলা হয় ডোম। ঢাকা মেডিকেল কলেজের লাশকাটা ঘরের একজন ডোম হারুন মৃধা। সে জানায়, লাশ কাটার সময় তার কোনোই প্রতিক্রিয়া হয় না। তার মরহুম পিতাও এই কাজ করত। বংশপরম্পরায় ডোমরা এই পেশায় নিয়োজিত হয়। হারুন আরও জানায়, তার আরেক ভাইও এই কাজ করে। ছোটবেলায় বাবার কাজে সাহায্য করতে করতে লাশের কোথায় কোথায় কাটতে হয়, সেলাই কীভাবে দিতে হয়—এইসব কাজ সে শিখে ফেলে। কখনো সে এই কাজ করতে গিয়ে বিব্রত বোধ করে না। অবশ্য কবর থেকে উঠানো চার-পাঁচ দিনের পচা লাশ কাটতে হারুনের একটু বিরক্ত লাগে। সে ক্ষেত্রে কাবলিক এসিড ও কেরোসিন ছিটিয়ে দুর্গন্ধটা দূর করতে হয়। সে স্বীকার করে নেয়, কাজ করার সময় একটু নেশা করে নিতে হয়। সব ডোমই তা করে। নয়তো মাঝে মধ্যে বমি চলে আসে। ডোম সম্প্রদায়ের এক-তৃতীয়াংশই হলো বিহারি। তবে এখন তারা আর স্বদেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে না। বাংলাদেশকেই নিজের দেশ বলে মনে করে।
গোসলদার
মুর্দাকে শেষবারের মতো গোসল করানো ওদের কাজ। গোরস্থানের মধ্যে ছোট্ট সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকে—‘মুর্দাকে শরীয়ত মতো গোসল করানোর জন্য যোগাযোগ করুন...।’ তাছাড়া বিভিন্ন মসজিদের ইমাম বা মোয়াজ্জিন এদের খবর রাখেন। অনেক সময় মোয়াজ্জিন নিজেই লাশ ধৌত করার দায়িত্ব নেয়। লাশকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কিছু নিয়ম আছে। নখ কাটা পশম কাটা, মশারির নিচে শোয়ানো, নিম বা বড়ুই পাতা দিয়ে ফুটানো পানি ব্যবহার, আতর-কর্পূর দিয়ে কাফন পরিয়ে দেওয়া প্রভৃতি নিয়ম অনুসরণ করে লাশের গোসল দেওয়া হয়। আবদুল মালেক নামে একজন গোসলদার জানালেন, লাশের গোসল দেওয়াটাকে একক পেশা হিসেবে কিছুতেই অবলম্বন করা সম্ভব নয়। এ কাজের পাশাপাশি তিনি ছেলেদের সুন্নতে খাৎনা করান এবং আজমীর শরিফের তাবিজ বিক্রি করেন। আবদুল মালেক বলেন, গোসল করানোর কাজে নির্দিষ্ট কোনো পারিশ্রমিক নেই। খুশি মনে যে যা দেয় তাই নিতে হয়। তবে পঞ্চাশ-একশ’র নিচে কেউ দেয় না। তিনি আরও জানান, মহিলাদের গোসল দেওয়ার জন্যে তার কাছে ‘ধাই’-এর সন্ধান আছে। তার স্ত্রীও এই কাজ করে থাকে। গোসলদার আবদুল মালেকের জীবনে বছর দুই আগে মগবাজারে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়। মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তিনি মৃতের বাড়িতে যান। মৃত্যুর ঘণ্টা চারেক পর মৃত ব্যক্তিকে গোসলের জন্যে আনা হয়। গোসল করানো যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, এমন সময় লাশটা হঠাৎ নড়েচড়ে ওঠে। উপস্থিত অন্যরা তো ভয়ে সবকিছু ফেলে দিয়ে দৌড়। মালেকও ভীষণ ভয় পেয়েছিলেন। আসলে লোকটি মরে নি, ওই বাড়ির সবাই ভেবেছিল ‘সব শেষ’। ভাগ্যিস কবরে শোয়ানোর আগেই জ্ঞান ফিরেছিল বেচারার।
কাফনবিক্রেতা
সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিমে, স্বামীবাগ মেইন রোডে আখেরি বিদায় স্টোরের মালিক মোঃ ফজলু মিয়া। ফজলু মিয়া জানায়, কাফন বাক্স বিক্রি করে তারা খুব কম লাভ করে। কারণ মৃত্যুর সাথে তো আর ব্যবসা চলে না। মানুষের শেষ কাজে কাউকে ঠকালে তার স্থান হয় হাবিয়া দোজখে, এটি কাফনবিক্রেতা ফজলু মিঞার একান্ত বিশ্বাস। তিনি এই ব্যবসাকে সওয়াবের কাজ বলে মনে করেন। কীভাবে এই ব্যবসায় এলেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাবা ছিল পিরোজপুর কবরস্থানের মোতওয়াল্লী। তখন বাবাই কবরস্থানের পাশে একটি দোকান নিয়ে তাতে কাফনের কাপড়, মুর্দার বাক্স, আগরবাতি, মোমবাতি, গোলাপজল ইত্যাদি বিক্রির কাজে তাকে বসিয়ে দেন। দাখিল পাশ করার পর তিনি পিরোজপুর থেকে ঢাকায় আসেন। অনেক চেষ্টা করেও কোনো চাকরি সংগ্রহ করতে না পারায় শেষে এক বন্ধুর সাথে পার্টনারশিপে সাতরাস্তায় কাফনের দোকান নিয়ে বসেন। ওই বন্ধুর সাথে বনিবনা না হওয়ায় এখন স্বামীবাগে ফজলু মিঞা নিজেই দোকান খুলে বসেছেন। ফজলু মিঞা জানালেন, বেচা-কেনা মোটেও ভালো না। গত দুই দিনে মাত্র একটা বাচ্চার কাফন বিক্রি করেছে। শীতকাল হচ্ছে তার বিক্রির মৌসুম। কারণ শীতকালে মানুষের মৃত্যুর হার বেড়ে যায়। ফজলু মিঞা বলেন, অনেক সময় দেখা যায় পার্টির কাফনের কাপড় কেনার মতো টাকা-পয়সা নেই। তখন কী আর করা...ফেরানো যায় না। লস গুনতে হয়।
ফজলু মিঞা আরও জানালেন,এই কাজের পাশাপাশি তিনি হাজমের কাজও (সুন্নতে খাৎনা) করে থাকেন।
বর্ষ ৫ সংখ্যা ১০, জুলাই ২০০০
Leave a Reply
Your identity will not be published.