সেরা দশ প্রেমের ছবি

সেরা দশ প্রেমের ছবি

প্রেম হলো জলের মতো সর্বত্রগামী। চলচ্চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশ্বের নানা দেশের চলচ্চিত্রে মূর্ত হয়ে উঠেছে মানবিক এই বিশেষ অবস্থাটি। এইসব চলচ্চিত্র উপভোগ করেছে অসংখ্য মানুষ; আলোড়িত হয়েছে তারা। এখানে সেরা দশটি প্রেমের ছবির ওপর আলো ফেলা হলো। লিখেছেন মৌমিতা রহমান।

 

সপ্তপদী

সুচিত্রা-উত্তম জুটির অবিস্মরণীয় এক ‘সপ্তপদী’। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ ছবিটির চিত্রনাট্যকার ছিলেন বিনয় চট্টোপাধ্যায় এবং পরিচালক অজয় কর। ছবিটি মূলধারার মধ্যে ছিল এক ভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা। ১৯৬১ সালের ২০ অক্টোবর ছবিটি মুক্তি পায়।

কাহিনিধারায় দেখা যায়—মেডিকের কলেজের ছাত্র কৃষ্ণেন্দু। সহপাঠিনী রিনা ব্রাউনকে খেপিয়ে সে মজা পায়। রিনার চোখ থেকে আগুন ঝরে। ব্যবহারে প্রকাশ পায় ঘৃণা। ঘটনাচক্রে কলেজে অভিনীত শেক্সপিয়রের ‘ওথেলো’ নাটকের নির্বাচিত কিছু অংশে দুজন অভিনয় করতে গিয়ে পরস্পরের প্রেমে পড়ে যায়। এদিকে কৃষ্ণেন্দুর মা মারা যায়। তবে পরীক্ষায় খুবই ভালো রেজাল্ট করে সে। ফার্স্ট হয়। কৃষ্ণেন্দু রিনার বাবা মি: ব্রাউনের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়। তিনি রাজি হন এবং শর্ত জুড়ে দেন যে কৃষ্ণেন্দুুকে খ্রিষ্টান হতে হবে। কৃষ্ণেন্দু রাজি হয়। এদিকে কৃষ্ণেন্দুর বাবা আসেন রিনার কাছে। তিনি মিনতি করে বলেন, ‘তোমার কাছে আমি আমার সন্তানকে ভিক্ষা চাইছি।’ রিনা তাকে কথা দেয়, সে কৃষ্ণেন্দুর জীবন থেকে দূরে সরে যাবে। তাই কৃষ্ণেন্দু ধর্মান্তরিত হয়ে তার কাছে এলে সে রেগে যায় এবং কৃষ্ণেন্দুকে ফিরিয়ে দেয়। তারপর দু’জনের পথ দুদিকে বেঁকে যায়। দুজনের মাঝে আসে বিরাট পরিবর্তন। নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতের পর অবশ্য তাদের মিলন হয়।

রিনা ব্রাউনের ভূমিকায় সুচিত্রা সেন অসাধারণ অভিনয় করেছেন। এ চরিত্রের মধ্যে নানা স্তর আছে—কখনো রিনা উচ্ছ্বল-চঞ্চল তরুণী যে নাকি ভারতীয়দের ঘৃণা করে। কখনো সে মায়াবতী নারী—প্রেমিকা; কখনো আবার জীবনযুদ্ধে বিধ্বস্ত এক তরুণী—জগৎ-সংসার, ঈশ্বর কোনো কিছুর প্রতি তার বিশ্বাস নেই। এই চরিত্রটি সেলুলয়েডে জীবন্ত করে তুলেছেন সুচিত্রা সেন। একই কথা বলা যায়, উত্তমকুমারের ক্ষেত্রেও। কৃষ্ণেন্দু চরিত্রটি সফলভাবে রূপায়ণ করেছেন তিনি। মজার বিষয় হলো, উত্তম-সুচিত্রার ব্যক্তিগত সংঘাতের কারণে ছবিটি তৈরি হতে দেরি হয়েছিল। আর ছবিটির একটি অংশে শেক্সপিয়রের ‘ওথেলো’-র নাট্যরূপে উত্তম ও সুচিত্রার হয়ে কণ্ঠ দিয়েছেন উৎপল দত্ত ও জেনিফার কেন্ডল। এতে বলা বাহুল্য, দৃশ্যটি আরও নান্দনিক ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। আর ছবিটিতে রয়েছে একটি স্মরণীয় গান : ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো ?’ এই সাড়া জাগানো গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।

 

মনপুরা

মন কেমন করা একটি চলচ্চিত্র ‘মনপুরা’। প্রেমের ছবি। দুজন মানব-মানবীর ভালোবাসার গল্প। সোনাই ও পরীর প্রেমের উপাখ্যান। ব্যথা জাগানিয়া একটি দীর্ঘশ্বাস। হাহাকার বয়ে যাওয়া হৃদয়-জমিন। মর্মন্তুদ ঘটনার কাহিনি। একটি ট্রাজেডির নাম।

‘মনপুরা’ গানের ছবিও। এদেশের মাটির মানুষকে যে গান আলোড়িত করে, সেই গান শোনা গেছে এ ছবিতে। জীবনের গল্পের সাথে হৃদয়স্পর্শী অভিনয়ও এ ছবিতে প্রত্যক্ষ করেছে দর্শক। বলা বাহুল্য তা ক্যামেরার ভাষায়। মিশ্র মাধ্যম চলচ্চিত্রের নান্দনিক সৌন্দর্যও ‘মনপুরা’-তে ফুটে উঠেছে।

‘মনপুরা’-ও মূলধারা মধ্যেই ভিন্ন কিছু করার প্রচেষ্টা। এ ছবিতে যারা অভিনয় করেছেন তারা সবাই ছোটপর্দার অভিনয়শিল্পী। যেমন চঞ্চল চৌধুরী (সোনাই), মিলি (পরী), মুনির খান শিমুল (হালিম), মামুনুর রশীদ (গাজী সাহেব), শিরিন আলম (আনু বিবি), ফজলুর রহমান বাবু (হালিম মাঝি), তারপরও ছবিটি দর্শকদের মন জয় করেছে। এখানেই এ ছবিটির সার্থকতা।

কাহিনিধারায় দেখা যায়—গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের কর্ণধার গাজী সাহেবের স্ত্রী আনু বিবি পঙ্গু। একমাত্র জোয়ান ছেলে হালিমের মাথা খারাপ। সে এক বৃষ্টির রাতে কাজের মেয়ে রহিমা বিবিকে খুন করে ফেলে। এরকম পরিস্থিতিতে আনুবিবির পরামর্শে গাজী সাহেব সোনাইকে এই খুনের দায়ভার নিতে অনুরোধ করে। সোনাই তার মনিব গাজী সাহেবের কথা ফেলতে পারে না। সে দেশান্তরি হয়। মনপুরা দ্বীপে তার যাপিত জীবনে আসে প্রেম। হাকিম মাঝির মেয়ে পরীর সঙ্গে তার হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

কিন্তু ঘটনাচক্রে সোনাই যায় কারাগারে এবং পরীর সাথে হালিমের বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু পরী কিছুতেই স্বামী হিসেবে হালিমকে মেনে নেয় না। হালিমও কোনো ঝামেলা করে না। আনু বিবি এবং গাজী সাহেব শলাপরামর্শ করে মিথ্যে প্রচার করে—নির্দিষ্ট দিনে সোনাইয়ের ফাঁসি হবে। একথা শুনে পরী আত্মহত্যা করে। অন্যদিকে জেল থেকে ছাড়া পায় সোনাই। সে যখন গ্রামে এসে পৌঁছায় এবং শোনে যে পরী আত্মহত্যা করেছে, তখন তার পুরো পৃথিবী দুলে ওঠে। সোনাই আবার দেশান্তরি হয়।

‘মনপুরা’-তে আবহমান বাংলার মানুষের প্রেমই মূর্ত হয়ে উঠেছে। এদেশের মানুষ হাহা করে হাসে। হুহু করে কাঁদে। তাদের তাড়িত করে আবেগ। তাদের সহজ-সুন্দর প্রেমই এ ছবিতে পরিস্ফুটিত। যেমন যখন পরী জিজ্ঞেস করে সোনাইকে, ‘বাড়িতে তোমার কে কে আছে ?’ সোনাই বলে, ‘বাড়ি-ধান জমি সব গাঙ্গের পেটে। জগৎ সংসারে আমি একা মানুষ।’ ... পরী: ‘এখনো একা তুমি ? লগে আমি নাই ?’, সোনাই: ‘হাছাই তো আমি আর একা নাই... লগে তুমি আছো। আমরা দুজন মিলে মিশে এক হলাম।’ পরি: ‘সত্য ?’ সোনাই : ‘সত্য। ... এই গাঙ্গ সাক্ষী... গাঙ্গের ঢেউ সাক্ষী।’ এই যে ভাষা, প্রেম প্রকাশের ধরন, তা এদেশের জল-মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। হাজার বছরের বাংলাদেশ এখানে কথা কয়ে ওঠে।

 

টাইটানিক

আধুনিককালের প্রেমের ছবি হিসেবে টাইটানিককে এখন পর্যন্ত কোনো চলচ্চিত্র ছাড়িয়ে যেতে পারে নি। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া টাইটানিক সিনেমাটি দেখেন নি, এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার। টাইটানিক জাহাজকে কেন্দ্র করে সমাজের দুই স্তরের দুজন মানব-মানবীর প্রেমগাথা অমর হয়ে আছে এ চলচ্চিত্রটিতে।

ঐতিহাসিক একটি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে কাল্পনিক দুটি চরিত্র সৃষ্টি করে চলচ্চিত্রটির কাহিনি নির্মিত হয়েছে। সিনেমার নামকরণ করা হয়েছে আরএমএস টাইটানিক নামের যাত্রীবাহী জাহাজটির নামে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জাহাজ টাইটানিক ১০ এপ্রিল, ১৯১২ সালে ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে নিউইয়র্কের পথে যাত্রা করে। ১৪ এপ্রিল জাহাজটি আটলান্টিক মহাসাগরে বিশালাকারের বরফের চাইয়ের সঙ্গে ধাক্কা খায় এবং এতে জাহাজ ফুটো হয়ে পানি ঢুকতে থাকে। পরের দিন সকালের দিকে জাহাজটি আটলান্টিকের অতলে তলিয়ে যায়। জাহাজের ২,২২৩ জন লোকের মধ্যে ১,৫১৭ জনই মারা যায়। এ ঘটনার ওপর জেমস ক্যামেরুন চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য তিনি নিজেই ছবির কাহিনি বিন্যস্ত করে এর চিত্রনাট্য রচনা করেন। তিনি চেয়েছিলেন এ মর্মান্তিক ঘটনার আবেগময় দিকটি মানুষের কাছে তুলে ধরতে। এক্ষেত্রে তিনি মনে করেন জাহাজডুবির সঙ্গে কোনো প্রেমের গল্প জুড়ে দিলে দর্শকের কাছে তা অধিক আবেদন সৃষ্টি করবে। তাই তিনি রোজ এবং জ্যাকের প্রেম উপাখ্যান সংযোজিত করেন। বলাই বাহুল্য, এই প্রেম বিয়োগান্তক। তবু সিনেমা শেষ হলেও দর্শকের ঘোর কাটে না। জ্যাকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রোজের সঙ্গে সে বিচ্ছেদ সৃষ্টি হয়, তার হাহাকার টাইটানিকের করুণ পরিণতির সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে যায়।

সিনেমায় জ্যাকের ভূমিকায় অভিনয় করেন লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও। জ্যাকের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য টম ক্রুজসহ আরও অনেক নামি-দামি স্টাররা আগ্রহী ছিল। কিন্তু জেমস ক্যামেরুন একজন তরতাজা যুবককে চাচ্ছিলেন, যে ২০ বছর বয়সী জ্যাকের চরিত্র সুন্দরভাবে ফুঁটিয়ে তুলতে পারবে। ডি ক্যাপ্রিওর বয়স ছিল তখন ২২ বছর। অত্যন্ত সুন্দরভাবে ক্যাপ্রিও তাঁর চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন।

রোজের ভূমিকায় অভিনয় করেন কেট উইন্সলেট। চরিত্রটি পেতে রোজকে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়। উইন্সলেটের সুন্দর মুখশ্রী এ ছবিতে রোজের আবেদনকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে।

জেমস হর্নারের মিউজিক পুরো সিনেমায় সৃষ্টি করে অপূর্ব ব্যঞ্জনা। বিশেষ করে সেলিন ডিওনের কণ্ঠে ‘মাই হার্ট উইল গো অন’ গানটি ক্লাসিক প্রেমের গান হিসেবে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।

১৯৯৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর মুক্তির পর পরই টাইটানিক দারুণভাবে বক্স অফিসে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়। এগারোটি ক্যাটাগরিতে অস্কার জিতে চলচ্চিত্রটি। ২০১০ সালে ক্যামেরুনের পরিচালিত অ্যাভাটার মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত ১২ বছর ধরে টাইটানিক সর্বোচ্চ ব্যবসাসফল ছবির রেকর্ড ধরে রাখে।

 

রোমান হলিডে

প্রেমের চলচ্চিত্র হিসেবে রোমান হলিডে দর্শকের হৃদয়ে আজও চিরসবুজ হয়ে আছে। গ্রেগরি পেক ও অড্রে হেপবার্নের অসাধারণ অভিনয় আর ব্যতিক্রমী গল্পের জন্য দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে চলচ্চিত্রটি।

উইলিয়াম ওয়েলারের পরিচালনায় ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছেন ইয়ান ম্যাকলেলান হান্টার ও জন ডিগটন। ছবির কাহিনিকার ডালটন ট্রাম্ববো। সম্পাদনায় ছিলেন রবার্ট সুইঙ্গ। আর এদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা পর্দায় রূপ দিয়েছেন গ্রেগরি পেক, অড্রে হেপবার্ন ও ইডি অ্যালবার্ট। ২৭ আগস্ট, ১৯৫৩ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমাটির দৈর্ঘ্য ১১৮ মিনিট।

ছবির কাহিনিতে দেখা যায় রাজকুমারী অ্যান (হেপবার্ন) রাজকীয় জীবনের কঠিন শৃঙ্খলায় হাঁপিয়ে উঠেছেন। ইউরোপের বেশকিছু রাজধানী ঘুরে তিনি এসেছেন রোমে। কঠিন রাজকীয় দায়িত্বে অতিষ্ঠ অ্যান বাড়াবাড়ি রকমের রাজকীয় নিরাপত্তার বেষ্টিত হয়ে চলতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। এবং একদিন একজন সাধারণ মানুষের মতো একাকী স্বাধীনভাবে ঐতিহ্যবাহী রোম শহরের সৌন্দর্য-সুধায় অবগাহন করার জন্য অ্যাম্বাসি থেকে পালিয়ে যান।

রোমের রাস্তার একটি বেঞ্চিতে রাজকুমারী ঘুমিয়ে পড়লে জো ব্রাডলে (গ্রেগরি পেক) তাকে দেখতে পান। ব্রাডলে রোম প্রবাসী একজন আমেরিকান এবং তিনি ডেইলি আমেরিকান পত্রিকার রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছেন। জো’র কাছে রাজকুমারী নিজেকে ‘অ্যানা স্মিথ’ নামে পরিচয় দেন। সেই রাতটা রাজকুমারী জো’র অ্যাপার্টমেন্টেই কাটান।

বলা যায়, রাজকুমারীর সঙ্গে একজন সাধারণ সাংবাদিকের প্রেম ও বন্ধুত্ব এবং নিজের পছন্দমতো জীবনযাপন করার ইচ্ছা এ দুটি থিম নির্ভর সিনেমা রোমান হলিডে। ছবির নামের মধ্যেই ছবির থিমকে খুঁজে পাওয়া যায়। ছুটির দিনে ইচ্ছেমতো ঘোরা যায়। যার সঙ্গে খুশি, যেথায় ইচ্ছে, সেখানে যাওয়া যায়। কিন্তু ছুটির দিন কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ছুটি ফুরোলেই আবার বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়ে মানুষকে কর্মস্থলে ফিরে যেতে হয়। একইভাবে রাজকীয় জীবনের কঠিন দায়িত্বের শিকলে বন্দি অ্যানও চিরদিনের জন্য মুক্তির স্বাদ পেতে পারে নি। একদিনের জন্য তার ইচ্ছেমতো বাঁচতে পেরেও ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বড় কঠিন। স্বপ্নময় একটি দিন কাটিয়ে আবার বাস্তবতার কাছে, কর্তব্যের কাছে তাকে ফিরে যেতে হয়েছিল। তবুও সিনেমাটিতে এ বিষয়টি নয়, রাজকুমারীর সঙ্গে সাধারণ এক রিপোর্টারের প্রেমের বিষয়টি দর্শকমনে জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়। সেই প্রেমের রাজ্যে অ্যান রাজকুমারী নয়, কিংবা জো-ও সাধারণ কোনো সাংবাদিক নয়। উভয়েই মানব-মানবী।

মজার বিষয় হলো, ছবিটির কাহিনি লেখার সময় জো’র চরিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছিল ক্যারি গ্রান্ডকে মাথায় রেখে। কিন্তু অল্পবয়েসী হেপবার্নের বিপরীতে তিনি অভিনয়ে অস্বীকৃতি জানালে গ্রেগরি পেককে নেওয়া হয়। অন্যদিকে রাজকুমারী অ্যানের চরিত্রটিও তৈরি করা হয়েছিল এলিজাবেথ টেলরের কথা চিন্তা করে। কিন্তু স্ক্রিন টেস্টের পর হেপবার্নকে কাস্ট করা হয়। হেপবার্নের অভিনয় এতটাই মনোমুগ্ধকর হয় যে বেস্ট অ্যাকট্রেস হিসেবে তিনি একাধিক পুরস্কার লাভ করেন। ব্রিটিশ অভিনেত্রী হেপবার্নের এটাই ছিল অ্যামেরিকান কোনো ছবিতে প্রথমবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়।

 

লাভ স্টোরি

লাভ স্টোরি মানে ভালোবাসার গল্প। সিনেমার নামের মতোই এর কাহিনি। এতে আছে ভালোবাসার গল্প, ভালো হওয়ার গল্প। যদিও চলচ্চিত্রটি একটি ট্রাজেডি। তবুও এর গল্প হৃদয় ছুঁয়ে যায় সবার।

এরিক সেগালের রচনা ও আর্থার মিলারের পরিচালনায় অসাধারণ এক প্রেমের গল্প লাভ স্টোরি। এই ছবির কাহিনী নিয়ে এরপর ভূরি ভূরি সিনেমা তৈরি হয়েছে, বিশেষত অনেক বাংলা সিনেমার কাহিনি এ চলচ্চিত্রটির কাছে ঋণী। কিন্তু আবেদনের দিক দিয়ে লাভ স্টোরিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে নি আর কোনো সিনেমা।

ছবির গল্পে দেখা যায় অলিভার ব্যারেট (৪র্থ) সম্পদশালী ও হারবার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত ও সম্মানিত একটি পরিবারের সন্তান। হারবার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন র‌্যাডক্লিফ লাইব্রেরিতে জেনিফার ক্যাভালরি নামের শ্রমিক শ্রেণির কিন্তু প্রত্যুৎপন্নমতিসম্পন্ন এক মেয়ের সঙ্গে অলিভারের দেখা হয় এবং তারা প্রেমে পড়ে। জেনি তখন রাডক্লিফ কলেজের ছাত্রী। গ্রাজুয়েশন চলাকালীন তারা অলিভারের বাবার অসম্মতি সত্ত্বেও বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়।

অলিভার বাবার অর্থনৈতিক সার্পোট হারিয়ে তাঁর হারবার্ট ল স্কুলের বেতন পরিশোধে দারুণ অসুবিধার মধ্যে পড়ে। জেনি একজন প্রাইভেট স্কুলটিচার হিসেবে কাজ নেয় এবং তারা অলিভারের ল স্কুলের কাছেই ১১৯ অক্সফোর্ড স্টিটে উপরতলার একটি ঘর ভাড়া করে সংসার পাতে। ক্লাসের মধ্যে তৃতীয় হয়ে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে অলিভার নিউইয়র্কের সুপ্রতিষ্ঠিত একটি ‘ল’ ফার্মে কাজ নেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুরারোগ্য ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হয়ে জেনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।

লাভ স্টোরি সিনেমাটি দুটি লাভ স্টোরির ইঙ্গিত দেয়। পাঠক ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছেন যে প্রথমটা হলো অলিভার-জেনির। দ্বিতীয় ভালোবাসার গল্প হলো পিতা-পুত্রের। বাবা সিনিয়র ব্যারেট ও ছেলে অলিভার ব্যারেটের (৪র্থ) মধ্যেও অবিচ্ছেদ্য এক ভালোবাসার সম্পর্ক লুকিয়ে ছিল। বাবার অমতে বিয়ে করায় কিছুকাল তিনি ছেলের থেকে মুখ ফিরিয়ে ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে, যখন তিনি জানতে পারলেন ছেলে তার বউয়ের অসুস্থতার জন্যই তাঁর কাছ থেকে টাকা ধার করেছে, তখনই তিনি ছুটে যান ছেলের কাছে। পুত্রবধূকে জীবিত দেখতে না পেলেও শেষ সময়ে মনে হয় তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পারেন। যে জন্য জেনি মারা গেলে ছেলের কাছে তিনি মাফ চাইতেও দ্বিধা করেন নি। ছেলে তখন বাবাকে সেই অবিস্মরণীয় কথাটি ‘ভালোবাসায় কখনো সরি বলার প্রয়োজন হয় না’ বলেছিল, যেটি একদিন জেনি তাকে বলেছিল, যখন সে জেনির ওপর রাগ করে, পরে অনুতপ্ত হয়েছিল।

সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৭০ সালের ১৬ ডিসেম্বর। জেনির ভূমিকায় অভিনয় করেন আলী ম্যাকগ্রা এবং অলিভারের ভূমিকায় রায়ান ও’নেইল। অলিভারের বাবার ভূমিকায় ছিলেন রে মিলান্ড।

 

প্রিটি ওমান

প্রেমের কাছে সামাজিক মর্যাদা গুরুত্বপূর্ণ নয়—এই বিষয়টাই পাওয়া যায় প্রিটি ওমান চলচ্চিত্রটিতে। প্রেমের মহিমার কাছে ধনী কিংবা গরিব, অন্তপুরবাসিনীর কিংবা বারাঙ্গনার কোনো ভেদাভেদ নেই। সেজন্য প্রিটি ওমান চলচ্চিত্রটি এক অপূর্ব ব্যঞ্জনা নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয়।

১৯৯০ সালে মুক্তি পাওয়া রোমান্টিক এ সিনেমাটির কাহিনি লিখেছেন জেএফ লটন। গ্যারি মার্শালের পরিচালনায় অভিনয় করেছেন রিচার্ড গিয়ার, জুলিয়া রবার্টস ও হেকটর এলিজন্ডো। সিনেমাটি অসাধারণ হয়ে উঠেছে এর নায়িকা জুলিয়া রবার্টসের অনবদ্য অভিনয়ের গুণে। একজন যৌনকর্মীর চরিত্রটি রবার্টস অতি নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন। আর সেই কারণেই ৪৮তম গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডে সেরা অভিনেত্রীর মুকুটটি ওঠে তাঁর মাথায়।

এডওয়ার্ড লুইস (রিচার্ড গিয়ার) একজন সফল ব্যবসায়ী, একদিন বিকল্প পথে হলিউড বুলভার্ডে পথচারীদের কাছে পথের নিশানা চান। ভিভিয়ান ওয়ার্ড (জুলিয়া রবার্টস) নামের একজন রূপবতী বারাঙ্গনা এডওয়ার্ডকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেন। পরের দিন এডওয়ার্ড সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে তাঁর এসকর্ট হিসেবে ভিভিয়ানকে এক সপ্তাহের জন্য ভাড়া করেন ৩,০০০ ডলারের বিনিময়ে। ভিভিয়ান এডওয়ার্ডের ক্রেডিট কার্ড নিয়ে শপিংয়ে গেলে মলিন পোশাকের জন্য দোকানের কর্মচারীরা তাঁকে অবজ্ঞা করে। এডওয়ার্ডের হোটেল ম্যানেজার বার্নাড থম্পসন (হেকটর এলিজন্ডো) ভিভিয়ানকে দেখে অবাক হন। যাহোক তিনি ভিভিয়ানের প্রতি সদয় হয়ে পোশাক কেনায় সাহায্য করেন ও খাবার টেবিলের ম্যানার শেখান। হোটেলে ফিরে এডওয়ার্ড ভিভিয়ানের পরিবর্তন দেখে দারুণভাবে আশ্চর্য হন। কিন্তু তাঁর ব্যবসায়িক নৈশভোজটি সফল হয় না। যা হোক ঘটনার পরম্পরায় ভিভিয়ান স্বীকার করেন যে তিনি এডওয়ার্ডকে ভালোবেসে ফেলেছেন। এডওয়ার্ডও বুঝতে পারেন ভিভিয়ান তাঁর জীবনের কতখানি দখল করে ফেলেছে, যখন ভিভিয়ান এডওয়ার্ডকে ছেড়ে চলে যান। ড্রাইভারের সাহায্যে ভিভিয়ানের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে উপস্থিত হন এডওয়ার্ড। একটি গোলাপ নিয়ে ফায়ার এস্কেপের সিঁড়ি বেয়ে এডওয়ার্ড উপরে ওঠেন। মিলন হয় ভিভিয়ান-এডওয়ার্ডের। ফায়ার এস্কেপের সিঁড়িতে ভিভিয়ান-এডওয়ার্ড-এর চুম্বনরত অবস্থায় সিনেমা শেষ হয়।

দেহ-পসারিণীর সঙ্গে সমাজের উঁচু স্তরের একজন ব্যবসায়ীর প্রেম ও মিলনের ছবি প্রিটি ওমান সকলের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

 

সান ফ্লাওয়ার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় দুজন মানব-মানবীর প্রেম ও বিচ্ছেদের এক অপূর্ব দলিল সান ফ্লাওয়ার। যুদ্ধ কীভাবে একজন নারীর জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সান ফ্লাওয়ার। সোফিয়া লোরেন ও মার্সেলো মাসট্রোইয়ান্নির সু-অভিনয়গুণে সিনেমাটি হয়ে উঠেছে আরও মনোগ্রাহী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইটালিতে অ্যান্টোনীয় (মার্সেলো মাসট্রোইয়ান্নি) ও গিয়োভান্নার (সোফিয়া লোরেন) দেখা হয় এবং খুব তাড়াতাড়ি তারা একে অন্যের প্রেমে পড়ে। যুদ্ধের অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের প্রেমের সম্পর্ককে সংরক্ষণ করতে তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং শিগগিরই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি আশা করে। যুদ্ধ ঘোরতর হতে থাকলে অ্যান্টোনিয়কে আর্মিতে যোগ দিয়ে হয় এবং তাকে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। একসময় সর্বনাশা যুদ্ধ শেষ হয়। কিন্তু অ্যান্টোনিয় ফিরে না এলে গিয়োভান্না তাকে খুঁজতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

অনেক চড়াই-উতড়াই পেরিয়ে অ্যান্টোনিওকে যখন গিয়োভান্না খুঁজে পায়, তখন সে এক রাশিয়ান মহিলার স্বামী ও তার সন্তানের জনক। যে প্রেমের কারণে এত কষ্ট স্বীকার করে, এতদিন স্বামীর স্মৃতি বুকে ধারণ করে গিয়োভান্না যে অ্যান্টোনিয়র পথ পানে চেয়ে বসে ছিল, সেই অ্যান্টোনিয়র এত বড় পরিবর্তন দেখে গিয়োভান্না নিদারুণ কষ্ট পায়। তার হৃদয় ভেঙে যায় এবং আর কখনো অ্যান্টোনিয়কে দেখার আশা না করে ফিরে আসে। অ্যান্টোনিয়ও গিয়োভান্নাকে দেখতে ইটালিতে ফিরে আসে। যাহোক, ভাগ্যক্রমে তাদের দেখা হয় এবং অ্যান্টোনিয় গিয়োভান্নাকে সবকিছু খুলে বলে। মৃত্যুর দুয়ারে গিয়ে কীভাবে সে পরিবর্তিত হয়ে গেছে তা গিয়োভান্নাকে বুঝাতে চেষ্টা করে। সে গিয়োভান্নাকে ফারের সেই রুমালটি দেয়, যেটি বিদায়ের সময় তাকে দেওয়ার জন্য অ্যান্টোনিয় প্রতিজ্ঞা করেছিল। অনেক পরিপক্বতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে সব দিকের পরিস্থিতি বিচার করে অ্যান্টোনিয় ও গিয়োভান্না পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নেয়। অনিশ্চয়তার কাছে গিয়োভান্নাকে ফেলে রেখে অ্যান্টোনিয় রাশিয়াতে ফিরে যায়।

প্রেম ও যুদ্ধের গল্প সানফ্লাওয়ার পরিচালনা করেছেন ভেট্টোরিয়া ডি সিকা। হেনরি মানচিনির মিউজিক অসাধারণ। ১৪ মার্চ, ১৯৭০ সালে মুক্তি পায় সিনেমাটি।

 

কাসাব্লাঙ্কা

মাইকেল ক্রুটজ-এর পরিচালনায় কাসাব্লাঙ্কা মুক্তি পায় ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে। চারিদিকে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। সিনেমার পটভূমিকায় আছে প্রেম ও যুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথমদিকে মরোক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কা শহরটি সমগ্র পৃথিবীর বিশেষভাবে নাৎসি দখলকৃত ইউরোপের লোকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নির্গমন পথ ছিল। ইউরোপ থেকে বের হওয়ার জন্য অনেক মানুষই ক্যাসাব্লাঙ্কায় প্রবেশ করত। এদের অধিকাংশই রিকস ক্যাফেতে জড়ো হতো। এ ক্যাফেটির মালিক ছিল রিক ব্লেইন (হ্যামফ্রে বগ্রাট) নামের একজন আমেরিকান।

উগারেট নামে এক ব্যক্তি সমগ্র ইউরোপ ভ্রমণের একটি ট্রানজিট লেটার নিয়ে আসে এবং রিকের ক্যাফেতে নিলামে বিক্রি করতে চায়। নিলামের আগেই উগারেট নাৎসিদের হাতে আটক হয় এবং নাৎসিদের অগোচরে রিকের কাছে ট্রানজিট লেটারটি দিয়ে যায়। রিকের জীবনে আবারও বিষাদ নেমে আসে, যখন এলসা লন্ড (ইনগ্রিড বার্গম্যান) তার স্বামী ভিক্টর ল্যাজলো (পল হেনরিড)-এর সঙ্গে ক্যাসাব্লাঙ্কায় আসে এবং সেই ট্রানজিট লেটারটি কিনতে চায়। কারণ এক সময় এলসা ও রিকের মধ্যে প্যারিসে দেখা হয়েছিল। এলসা তার স্বামীকে মৃত ভেবে রিকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। কিন্তু যখন সে জানতে পারে তার স্বামী তখনো জীবিত, তখন রিককে কিছু না জানিয়েই সে তাকে ত্যাগ করে স্বামীর কাছে ফিরে গিয়েছিল। ক্লাবে রিক এলসার কোনো কথাই শুনতে চায় না। এমনকি এলসা বন্দুক হাতে শাসালেও রিক এলসাকে ট্রানজিট লেটারটি দেয় না। এলসা রিককে গুলি করতে পারে না, কারণ সে তখনো রিককে ভালোবাসে। পরে রিক ল্যাজলোকে সাহায্য করে এই আশায় যে হয়তো এলসা রিকের কাছে থেকে যাবে। সিনেমার শেষ পর্যন্ত রিক প্রেম ও ল্যাজলোকে সাহায্য করা এই দুয়ের দোলাচলে রক্তাক্ত হতে থাকে। যা হোক, একটা পর্যায়ে রিক এলসা-ল্যাজলোর নিরাপদ প্রস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়।

যুদ্ধ কীভাবে অনেকগুলো মানুষকে কঠিন সম্পর্কের সমস্যায় ফেলে দেয়, তার একটি খণ্ডচিত্র পাওয়া যায় কাসাব্লাঙ্কা সিনেমাটিতে।

 

মুঘল-এ-আজম

ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা সম্ভবত মুঘল-এ-আজম। আনারকলি-সেলিমের প্রেমকাহিনি মানুষের মুখে মুখে ফিরত একসময়। মুঘল সম্রাট আকবর ও যোধা বাইয়ের সন্তান শাহজাদা সেলিম এবং তাঁদের রাজনর্তকী আনারকলির প্রেম এই সিনেমার উপজীব্য। সুদর্শনা নর্তকী আনারকলি নিপুণ নাচের অপূর্ব মুদ্রায় শুধু রঙ্গালয়েই ঝড় তোলে নি, তুলেছিল শাহজাদা সেলিমের হৃদয়েও। আনারকলির প্রেমে পাগলপ্রায় সেলিম রাজপরিবারের মর্যাদার কথা চিন্তা না করেই গোপনে মিলিত হতো তার প্রেয়সীর সঙ্গে। এমনকি আনারকলিকে বিয়ে করে এ অপূর্ব প্রেমের বৈধতা দিতেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল সে। কিন্তু তাদের প্রেমের কুসুমরাজ্যে বিষাক্ত কীটের মতো প্রবেশ করে বাহার। বাহারের উচ্চাকাক্সক্ষার কাছে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পড়ে আনারকলি। ঈর্ষার আগুনে পুড়ে সে সেই আগুনে জ্বালিয়ে দিতে চায় আনারকলিকেও। আনারকলি-সেলিমের প্রেম প্রকাশ করে দিলে সম্রাট আকবরের নির্দেশে কয়েদখানায় বন্দি করা হয় আনারকলিকে। পুত্র সেলিম আনারকলিকে ভিক্ষা চায় পিতা আকবরের কাছে। কিন্তু সম্রাট কীভাবে একজন নর্তকীর সঙ্গে তাঁর নিজের পুত্র, পরবর্তী সম্রাটের বিয়ে দিতে পারেন ? প্রেমের আগুনে পিতার প্রতি ক্ষুব্ধ সন্তান খড়গ তোলে। যুদ্ধে পরাজিত হয় সে। পুত্রের প্রতি পিতার মমত্বকে অস্বীকার করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিতে বাধ্য হয় পিতা। সামান্য নর্তকীর একমাত্র সম্বল নিজের প্রাণের বিনিময়ে সম্রাটের কাছে ভিক্ষা চায় প্রেমিক সেলিমের প্রাণ। মায়ের সহায়তায় আনারকলিকে প্রাণ নিয়ে নির্বাসনে পালাতে হয়। রাজ্যময় রটে যায় আনারকলিকে হত্যা করা হয়েছে। এ নিষ্ঠুর সংবাদে হৃদয় ভেঙে যায় সেলিমের।

সিনেমায় আনারকলির ভূমিকায় অভিনয় করেন মধুবালা, আর সেলিমের ভূমিকায় দীলিপকুমার। সম্রাট আকবরের চরিত্রে রূপদান করেন পৃথ্বিরাজ কাপুর এবং যোধা বাইয়ের চরিত্রে দুর্গা খোতে। ৫ আগস্ট, ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পনেরো বছর ধরে সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমার রেকর্ড ধরে রাখে। প্রযোজক ও পরিচালক কে আসিফ নয় বছর ধরে বহু যত্নে নির্মাণ করেন সিনেমাটি। যখন একটি বলিউডের ফিল্ম তৈরি করতে মাত্র ২০ হাজার মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতো, সেই সময় সিনেমাটির কাজ শেষ করতে ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়। এত অর্থ ব্যয়ে, অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলও পেয়েছেন আসিফ। দারুণ ব্যবসাসফল হওয়ার পাশাপাশি ১৯৬১ সালে ফিল্মফেয়ার সেরা মুভি হয় সিনেমাটি। ২০০৪ সালে স্টারলিং ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন প্রাইভেট লি সিনেমাটির রঙিন সংস্করণ মুক্তি দেয়, যা বক্স অফিসে বিপুলভাবে সাফল্যের ঝড় তোলে।

সিনেমাটি বিপুলভাবে জনপ্রিয় হওয়ার আরও একটি কারণ এর হৃদয়ছোঁয়া মিউজিক। নওশাদের মিউজিকে সিনেমার গানগুলো পেয়েছে আলাদা মাত্রা। বিশেষ করে ‘পেয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া’ গানটি তো এখনো মানুষের মুখে মুখে ফিরে। গানটির লেখক শাকিল বাদাউনিকে ১০৫ বার গানটি কাটাছেঁড়া করতে হয়েছে। লতা মুঙ্গেশকরের কণ্ঠে গানটি চির অমর হয়ে আছে।

 

 

Leave a Reply

Your identity will not be published.