অনেক দিন আগেই আমি ‘উয়ারি-বটেশ্বর’-এর কথা শুনেছিলাম। আবছা আবছা। ২০০০ সালের পর থেকে তা স্পষ্ট হতে থাকে। কানে ভেসে আসে এবং পত্র-পত্রিকায়ও পড়ি উয়ারী-বটেশ্বরের কথা। বলা যায়, হরপ্পার মহোঞ্জোদারো (পাকিস্তান)-য় নগর-সভ্যতার নানা নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা ‘সিন্ধু সভ্যতা’ নামে পরিচিত। পরে ভারতের রাখিগড়ি ও ধোলভিরার মতো স্থানেও এই সভ্যতার নির্দশন পাওয়া গেছে, যা এই উপমহাদেশের প্রাচীনতম নগর সভ্যতা। দ্বিতীয় নগর সভ্যতার বিকাশ ঘটে সিন্ধু সভ্যতার অমরাবতীতে। আর বাংলাদেশের উয়ারী-বটেশ্বর এবং পুন্ড্রনগরে তথা বগুড়ার মহাস্থানগড়ে।
২০০০ সালে পত্র-পত্রিকায় পড়েছিলাম নানা প্রতিবেদন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল নরসিংদীর উয়ারী গ্রামে আবিষ্কৃত হয়েছে একটি নগর সভ্যতার নানা নিদর্শন। এরপর নানা সময়েই ভেবেছি, উয়ারী-বটেশ্বর যাব। কিন্তু তা বাস্তবে রূপ লাভ করে নি। তাই কিছুদিন আগে যখন নরসিংদীর শিবপুরের চন্ডিবর্দি গ্রামে গেলাম, স্ত্রীর বড় বোনের বাসায়, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম উয়ারী-বটেশ্বর যাব। তখন পশ্চিমাকাশে সূর্য ডুবেছে, কিন্তু মনের আকাশে একটি বাসনার সূর্য জেগেছে। মনে পড়েছে এক পুরোনো বন্ধুর কথা। হাসান। ওর বাড়ি উয়ারী-বটেশ্বরের আশপাশে। বেলাবো’র বরইচ্চায়।
মোবাইলে কল দিলাম হাসানকে। কয়েক সেকেন্ড পর ভেসে এল হাসানের কণ্ঠ।
‘হ্যালো, কে বলছেন ?’
‘আমি মোমিন। পুরোনো ঢাকার দক্ষিণ মৈশন্ডিতে আমার বসবাস।’
‘আরে দোস্ত, তুমি! কত বছর পর তোমার কণ্ঠ শুনলাম। কেমন আছো ?’ তারপর কুশল বিনিময়সহ নানা কথা বললাম আমরা। একপর্যায়ে বললাম, উয়ারী-বটেশ্বর যাওয়ার কথা এবং কালই। শুনে হাসান বলল, ‘কাল তুমি রওনা দেওয়ার আগে আমাকে একটি কল দিয়ো। আমি যাওয়ার পথ বাতলে দেব। অবশ্য আমিও তোমার সঙ্গী হবো।’

২
পরদিন হাসানকে কল দিলাম। সে জানাল, আমাকে প্রথমে শিবপুরের কলেজ মোড়, সেখান থেকে জয়নগর, অতঃপর বটেশ্বর বাজারে যেতে হবেÑনানা বাহনে চড়ে।
আমি চন্ডিবর্দি গ্রাম থেকে হেঁটে, পুকুর, খেত, পোলট্রি, মানুষদের বসতি পেরিয়ে মূল সড়কে পৌঁছলাম। ‘কাউন্টার’ নামে এক জায়গায়। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটি সিএনজিতে চড়ে শিবপুরের বাসস্ট্যান্ডে এলাম। ডানদিকে কলেজ মোড়। কিন্তু আমি সেদিকে না গিয়ে কী মনে করে পথের ওপাশে গিয়ে এক ফলের দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘জয়নগরে যাব কীভাবে ?’ তিনি বললেন, ‘একটি রিকশাতে চড়ে বানিয়াদি ব্রিজের কাছে যান। সেখানে সিএনজি পাবেন, জয়নগর যাওয়ার।’ আমি তার নির্দেশমতো একটি রিকশাতে চড়ে দশ-বারো মিনিট পরে একটি ব্রিজের কাছে গিয়ে দেখলাম, অদূরে কয়েকটি সিএনজি দাঁড়িয়ে। বিশ টাকা ভাড়া নিয়ে রিকশাওয়ালা চলে গেল। আমি সিএনজিগুলোর কাছে গিয়ে জয়নগরের কথা বললাম। জানা গেল, এই ব্রিজ নয়, পাঁচ মিনিট হাঁটার পর বানিয়াদি ব্রিজে পৌঁছানো যাবে। অগত্যা হাঁটতে লাগলাম। পথে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে এক সময় পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।
বানিয়াদি ব্রিজের কাছে কয়েকটি সিএনজি ও অটোরিকশা দণ্ডায়মান। এর মধ্যে একটি সিএনজি যাবে জয়নগর। পাঁচজন যাত্রী বহন করবে। মাথাপিছু ভাড়া বিশ টাকা। কিছুক্ষণের মধ্যে সামনে দুজন এবং পেছনে তিনজন যাত্রী নিয়ে চালক যাত্রা শুরু করল। পীচ ঢালা পথ। মাঝে মাঝে ভাঙা। সেই সময় ঝাঁকুনি খেতে হচ্ছে। পথের দু’পথে গাছ। বেশ নির্জন। গা ছমছমে অনুভ‚তি জাগছে মনে। দশ মিনিট পরে মানুষের বসতি নজরে এল। দোকানপাটও। আরও কিছুক্ষণ পরে এলাম জয়নগর মোড়ে। একটি অটোরিকশা চোখে পড়ল। ‘বটেশ্বর বাজার, যাবে নাকি ?’ চালক মাথা নেড়ে সায় জানাল। দর কষাকষির পর ভাড়া বিশ টাকা নির্ধারিত হলো।
অটোতে চড়ে বসলাম। এই পথ তেমন নির্জন নয়। তবে চারদিকে সবুজ প্রকৃতি। সাত-আট মিনিট পরে হঠাৎ বৃষ্টি ঝরতে লাগল। চালক গতি বাড়িয়ে দিল। আমি দেখলাম, হুডটি শিকল দিয়ে বাঁধা। জানা গেল, সেটি ছেঁড়া। তাই ব্যাগ থেকে গামছা বের করে মাথায় দিলাম। উপরে গাছের আচ্ছাদন কিছুটা বাঁচিয়ে দিল বৃষ্টির জল থেকে।
কিছুক্ষণ পরে আধভেজা হয়ে পৌঁছলাম বটেশ্বর বাজার। এই সময় মোবাইল বেজে উঠল। তড়িঘড়ি অটোরিকশা চালককে বিদায় জানিয়ে ওয়ালেটে রক্ষিত মোবাইল বের করে কানে লাগালাম।
‘হ্যালো মোমিন, তুমি কোথায় ?’ হাসানের কণ্ঠ।
‘আমি বটেশ্বর বাজারের মোড়ে।’ ডিটেলসে লোকেশনের বর্ণনা দিলাম।
‘ঠিক আছে, আর বলতে হবে না।’ এই বলে হাসান কল কেটে দিল। আমি বৃষ্টিভেজা অবস্থায় চায়ের দোকানের সন্ধান করতে লাগলাম। এই সময় কাঁধে মানুষের স্পর্শ অনুভব করলাম। চেয়ে দেখি লম্বা চুল-দাড়ি আর কাঁধে ঝোলা নিয়ে পথের ওপর দাঁড়িয়ে আছে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ভদ্রলোক। আমার দিকে চেয়ে হাসল। মুহ‚র্তেই চিনে ফেললাম হাসানকে।

‘তুমি! একী অবস্থা!’ বলে জড়িয়ে ধরলাম বন্ধুকে। বিশ বছর পরে দেখা। কুশল বিনিময়, নানা কথার পর চা খেতে ঢুকলাম একটি দোকানে।
আরে এ যে বিশাল দোকান! চেয়ারের অসংখ্য সারি। কয়েকজন মানুষ বসে ভারতীয় সিনেমা দেখছে বিশাল স্ক্রিনে।
যা হোক, চা খেয়ে বের হয়ে এলাম। হাসান হাত তুলে একটি অটোরিকশাকে দাঁড় করাল। বলল, ‘হাবিবুল্লাহ পাঠানের বাড়ি যাইবা ? জাদুঘরে ?’
‘হ যামু। ওঠেন।’
আমরা দুজন উঠতেই অটোরিকশাটি চলতে শুরু করল।
৩
রিকশা চলেছে হাবিবুল্লাহ পাঠানের বাড়ির উদ্দেশে। আমার চেতনায় হানা দিল ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠা।
“প্রাগৈতিহাসিক যুগে উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে প্রথম মানব-বসতি আরম্ভ হয়েছিল। এখানে তাম্র-প্রস্তর যুগের নিদর্শন গর্ত-বসতিও আবিষ্কৃত হয়েছে। মুদ্রাতাত্তি¡ক প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায় যে, খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে নগরায়ন হয়েছিল। এ অঞ্চল মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনও ছিল।
উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে শুপ্ত যুগের পোড়ামাটির যক্ষ আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে গুপ্ত শাসনামলের কোনো নিদর্শন এখনো পাওয়া যায় নি। এ অঞ্চল সমতটের অংশ হলে বলা যায় যে, গুপ্ত শাসনের প্রভাব এ অঞ্চলে পড়েছিল। কেননা সমতট অঞ্চল গুপ্তদের করদ রাজ্য ছিল। গুপ্ত শাসকদের পরে এ অঞ্চলে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় স্বাধীন রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল। এ সময়ে রাত, খড়গ, দেব ও চন্দ্রবংশের শাসনের প্রমাণ পাওয়া যায়। মূলত খড়গ-শাসকদের শাসন কেন্দ্র ছিল লালমাই-ময়নামতি অঞ্চল। উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চল খ্রিষ্টীয় সাত-আট শতকে খড়গ বংশের শাসনাধীন ছিল। আশ্রাফপুর তাম্র-শাসন অনুসারে রাজা দেবখড়গ চারটি বিহার-বিহারিকার জন্য ভ‚মিদান করেছেন। সাম্প্রতিক প্রতœতাত্তি¡ক খননে জানখারটেকে ২৪ মিটার ী ২৪ মিটার একটি বৌদ্ধ বিহারিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। মন্দির ভিটা, ধুপিরটেকে ১১ মিটার ী ১১ মিটার ইট-নির্মিত যে স্থাপত্য আবিষ্কৃত হয়েছে সেটি একটি বৌদ্ধ পদ্ম-মন্দির। কার্বন-১৪ পদ্ধতিতে এর কালপর্ব পাওয়া গিয়েছে আট শতকের (৭৩০-৭৪০ খ্রিষ্টাব্দ) গোড়ার দিক। চাকবাড়ি, আশ্রাফপুরে একটি ইট-নির্মিত স্থাপত্যের (বিহার ?) অংশবিশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। টঙ্গীরটেকেও চলমান প্রতœতাত্তি¡ক খননে একটি অসাধারণ বৌদ্ধ মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছে।

কৃষিকাজ, বাগবাগিচা ও ঘরবাড়ির নিচে চাপা পড়ে ছিল, এখানে আছে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন একটি নগর। উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে ৫০টি প্রতœস্থান থেকে আবিষ্কৃত হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের পাথর ও জীবাশ্ম-কাঠের হাতিয়ার, তাম্র-প্রস্তর সংস্কৃতির গর্ত-বসতি এবং বাংলাদেশের ইতিহাস নতুন করে লেখার তাৎপর্যপূর্ণ সব প্রতœবস্তু। উয়ারী-বটেশ্বর ছিল বাংলাদেশের প্রাচীনতম মহাজনপদ। দুর্গ-নগরটি ছিল সেই মহাজনপদের রাজধানী। এটি গড়ে উঠেছিল সুপরিকল্পিতভাবে। ইতিমধ্যে এখান থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে দুর্গ-প্রাচীর, পরিখা, পাকা রাস্তা, পার্শ্ব-রাস্তাসহ ইট-নির্মিত অনন্য স্থাপত্য কীর্তি। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় অবস্থিত উয়ারী-বটেশ্বর ছিল একটি নদীবন্দর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র। মনে করা হচ্ছে, টলেমি বর্ণিত সৌনাগড়াই উয়ারী-বটেশ্বর। আরও মনে করা হচ্ছে, উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে ছিল গঙ্গাঋদ্ধি জাতির বাস। ভারতীয় উপমহাদেশের আদি-ঐতিহাসিক কালের অনেক নগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভ‚মধ্যসাগর অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল উয়ারী-বটেশ্বরের। ২৩০০ বছরের প্রাচীন ৪০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশ্ববিখ্যাত সিল্ক রুটের সঙ্গেও যে উয়ারী-বটেশ্বর সংযুক্ত ছিল, নানা নিদর্শনগত প্রমাণ থেকে তা উজ্জ্বল হয়ে উঠতে শুরু করেছে। উয়ারী-বটেশ্বরে বিকশিত হয়েছিল স্বল্প-মূল্যবান পাথরের নয়নাভিরাম পুঁতি তৈরির কারখানা। এখানে আবিষ্কৃত উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা ও মুদ্রাভান্ডার, অনন্য স্থাপত্যকীর্তি, হরেক রকমের পুঁতি, সুদর্শন লকেট ও মন্ত্রপূত কবচ, বাটখারা, পোড়ামাটি ও ধাতব শিল্পবস্তু, অলংকার, মৃৎপাত্র, চিত্রশিল্প ইত্যাদি শিল্পীর দক্ষতা, উন্নত শিল্পবোধ ও দর্শনের পরিচয় বহন করে।
উয়ারী ও বটেশ্বর ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত বেলাব ও শিবপুর উপজেলার দুটি লাগোয়া গ্রামের বর্তমান নাম। আড়াই হাজার বছর আগে এখানে নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে (শিবপুর, বেলাব, পলাশ ও রায়পুরা উপজেলা) খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে খ্রিষ্টীয় ৮ম শতক পর্যন্ত সময়কালের ৫০টি প্রতœপীঠ আবিষ্কৃত হয়েছে।
উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চল থেকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়েছে, যা ওই সময় থেকেই ধারাবাহিকভাবে এখানে মানব-বসতির ইঙ্গিত বহন করে। উয়ারী-বটেশ্বরে তাম্র-প্রস্তর সংস্কৃতির গর্ত-বসতিও আবিষ্কৃত হয়েছে। উয়ারী-বটেশ্বর ও সংলগ্ন ৫০টি প্রতœপীঠ থেকে আবিষ্কৃত উপমহাদেশের প্রাচীনতম মুদ্রা ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা, উত্তরাঞ্চলীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র, রোলেটেড মৃৎপাত্র, ধাতব নির্দশন, স্বল্প-মূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতি, পোড়ামাটি ও পাথরের শিল্পবস্তু, বাটখারা ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়েছে। কাচ ও স্বল্প-মূল্যবান পাথরের তৈরি পুঁতি ও মন্ত্রপূত কবচগুলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন : কুঠার দ্বারা শত্রæ ধ্বংস, কচ্ছপ দ্বারা দীর্ঘজীবন লাভ এবং হাতি দ্বারা সার্বভৌমত্ব বোঝায়।
প্রশস্ত পাকা রাস্তা, পার্শ্ব-রাস্তা, ইট-নির্মিত অনন্য স্থাপত্য একটি উন্নত নগর পরিকল্পনার পরিচয়বহ। উয়ারী-বটেশ্বর একটি প্রাচীন জনপদের রাজধানী, একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি নগর-সভ্যতা। বলা হচ্ছে উয়ারী-বটেশ্বরের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভ‚মধ্যসাগর অঞ্চলের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। মনে করা হয় উয়ারী-বটেশ্বর টলেমি বর্ণিত কেন্দ্র সৌনাগড়া। সম্প্রতি মনে করা হচ্ছে, গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার গঙ্গা নদীর পূর্বতীরে যে পরাক্রমশালী গঙ্গাঋদ্ধি জাতির কথা শুনেছেন তা ছিল আজকের উয়ারী-বটেশ্বর।”
৪
একসময় অটোরিকশা থামল। আমরা গন্তব্যে পৌঁছলাম। ডানদিকে হাবিবুল্লাহ পাঠানের (উয়ারী-বটেশ্বরের প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন সংগ্রহ ও গবেষণায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন) বাড়ি, সামনে জাদুঘর। এই সময় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। আমরা তাই জাদুঘরের দিকেই চললাম। ভাড়া চুকিয়ে দেওয়ার ফলে অটোরিকশাওয়ালা চলে গেল। আমরা জাদুঘরে ঢুকলাম। দেখলাম অদূরে মার্বেল পাথরের মূর্তি ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ঘোষণা। সেখানে লেখা রয়েছে : ‘গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘর, উয়ারী-বটেশ্বর নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন জনাব অ্যাড. নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন এমপি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। আলহাজ্ব আবদুল মতিন ভূঞা, চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদ, নরসিংদী।’ তারিখ লেখা রয়েছে ২৯ নভেম্বর ২০১৯। এই গঙ্গাঋদ্ধি জাদুঘরেই হাবিবুল্লাহ পাঠানের সংগৃহীত অধিকাংশ প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শনসমূহ সংরক্ষিত রয়েছে, যা তিনি পাশের উয়ারী গ্রাম থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। জানা গেল, জাদুঘরের পুরো কাজ শেষ হয় নি বলে এটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় নি। ঘরগুলো তালাবদ্ধ। আমরা সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় গেলাম। ঘুরেফিরে দেখে নিচে এলাম। দেখলাম, বৃষ্টি থেমে গেছে। অদূরে হাবিবুল্লাহ পাঠানের বাড়ি। আমরা সেই বাড়ির দিকে অগ্রসর হলাম, সেখানেও কিছু নিদর্শন রয়েছে দুটি ঘরজুড়ে। হাবিবুল্লাহ পাঠানের ভাতিজা তালা খুলে ঘর দুটির দরজা উন্মুক্ত করলেন। আমরা প্রবেশ করলাম। দেখলাম তালাবদ্ধ কয়েকটি আলমারিতে সংরক্ষিত মুদ্রা, মাটির পুতুল, ধাতব অলংকার ইত্যাদি। বইও রয়েছে।
এবার মূল জায়গার উদ্দেশে চললাম অর্থাৎ উয়ারী গ্রামের দিকে। সেখানেই আবিষ্কৃত হয়েছে প্রাচীন এক সভ্যতার নানা নিদর্শন। উয়ারী গ্রামের প্রবেশ পথেই দেখা গেল আরেকটি জাদুঘর। অবশ্য এখানে কোনো নিদর্শনই নেই। উয়ারী গ্রামের বাসিন্দাদের সন্তুষ্ট করার জন্য এটি নির্মাণ করা হয়েছে, সরকারি জায়গার ওপর। যা হোক, একসময় পৌঁছলাম গন্তব্যে—উয়ারী-বটেশ্বর দুর্গনগর উন্মুক্ত জাদুঘরে। ২০০০ সালে এটির যাত্রা শুরু হয়েছিল—১০টি আলোকচিত্র পাটের রশিতে ঝুলিয়ে। ২০১৮ সালে এটি স্থায়ীরূপ পায় বৃহত্তর আঙ্গিকে। যদিও আর্থিক কারণে সেটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে নি। খনন কাজ বন্ধ রয়েছে। অধিকাংশ নিদর্শনই ঢেকে রাখা হয়েছে। যেমন আট হাজার বছর আগের প্রাচীন ক‚পÑপোড়া মাটির এবং লাল মাটি কেটে সেইসব ক‚প নির্মিত হয়েছিল প্রধানত গৃহস্থালি-পানির জন্য। আড়াই হাজার বছর আগের প্রাচীন রাস্তা—যা মৃৎপাত্রের টুকরো, নুড়ি পাথর, ইটের টুকরো এবং চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি হয়েছিল। স্থায়ী সংরক্ষণের অভাবে ক‚প এবং প্রাচীন রাস্তা—দুটোই মাটি-চাপা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। তবে রাস্তাটির অনুকৃতি প্রদর্শিত হচ্ছে। আমরা সেটিই দেখলাম। দেখলাম অপূর্ব সব টেরাকোটার কাজ। গর্ত-বসতিও দেখলাম, যখন তিন-চার হাজার বছর আগে উয়ারী-বটেশ্বরের মানুষ সেইসব জায়গায় বাস করত—খরা-বন্যার হাত থেকে বাঁচার জন্য। আরও দেখলাম বৌদ্ধ ধর্মীয় ক‚প বা পুকুর। ধারণা করা হয়, এটি খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে ইট দিয়ে কাদামাটির গাঁথুনিতে নির্মিত হয়েছিল। তবে কোন ধরনের কাজে এটি ব্যবহৃত হতো তা জানা যায় নি। ...খনন কাজের মূল জায়গাটিও ঢেকে রাখা হয়েছে।
আবার টিপ টিপ বৃষ্টি ঝরছে। হ্যাঁ, যাওয়ার সময় হয়েছে বিহঙ্গের। আমি ও হাসান তাই ফেরার পথ ধরলাম।
বিদায় উয়ারী। বিদায় বটেশ্বর।
Leave a Reply
Your identity will not be published.