রাজেন তরফদার : চিরকালের চলচ্চিত্রকার

রাজেন তরফদার :  চিরকালের চলচ্চিত্রকার

চতুর্থ ও পঞ্চম দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য পরিচালক রাজেন তরফদার। তিনি ছিলেন মধ্যপথের অনুসারী। চলতি অর্থে শিল্পমানসম্পন্ন ছবি নির্মার্ণে রাজেন তরফদার উৎসাহী ছিলেন না। মূলধারার স্রোতে গা ভাসায় যে সমস্ত ছবি—তার প্রতিও ছিল অনীহা। অর্থাৎ তিনি ছিলেন ঐতিহ্যনিষ্ঠ ছবির ঘরানায় বিশ্বাসী। যে ঘরানার পরিচালকেরা বিষয় ও শিল্পের বৈভবের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের ভালো লাগার দিকটাকেও মাথায় রেখে ছবি করেন।...আগামী ৭ জুন রাজেন তরফদারের ১০৯তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে এই রচনাটি পত্রস্থ হলো।

রাজেন তরফদার ছিলেন মূলত ফাইন আর্টিস্ট। এক বিজ্ঞাপনী সংস্থায় (জে ওয়াল্টার টমসন কোম্পানি) আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করতেন। ‘ভাস্করম’ নামে নাট্যদলও গড়ে ছিলেন। কিন্তু সব ছেড়ে চলচ্চিত্র মাধ্যমে আত্মনিয়োগ করেন; কেননা গণমাধ্যম হিসেবে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী। অবশ্য ছবি আঁকাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। তা কাগজেই হোক বা সেলুলয়েডে।

বাংলাদেশের রাজশাহীতে জন্ম নেওয়া রাজেন তরফদার ছোটবেলায় পাড়ার নাটকে অভিনয় করেছেন। পরবর্তী সময়ে চাকরি জীবনেও অভিনয় করতে দেখা গেছে তাঁকে। এছাড়া ১৯৫১ সালে কলকাতায় যখন জাঁ রেনোয়া এলেন, তাঁর ‘দি রিভার’ চলচ্চিত্রের শুটিং করলেন, বিষয়টি আরও অনেকের মতো রাজেন তরফদারকেও আকৃষ্ট করেছিল। অন্যদিকে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি, কলকাতার প্রথম চলচ্চিত্র উৎসব, ইতালিয়ান নিউ রিয়ালিজম ইত্যাদিও তাঁকে চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে ধাবিত করে।

রাজেন তরফদার একজন কমিটেড চিত্র পরিচালক। এবং কমিটমেন্ট, তাঁর ভাষায়, “সমাজের বঞ্চিত ও অবহেলিত ব্যাপকতম মানুষ এবং সমাজ বিবর্তনের ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক এক অমোঘ সত্যের কাছে”। উন্নত শিল্পের মাধ্যমে জীবনের সত্য ও সামাজিক বোধের বিকাশ সাধনই রাজেন তরফদারের ছবি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল।

রাজেন তরফদার সুদীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনে সাতটি কাহিনিচিত্র ও কয়েকটি প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করেছেন। তাঁর কাহিনিচিত্রের মধ্যে রয়েছে : অন্তরীক্ষ (১৯৫৭), গঙ্গা (১৯৫৯), অগ্নিশিখা (১৯৬২), জীবন কাহিনী (১৯৬৪), আকাশ ছোঁয়া (১৯৬৭), পালঙ্ক (১৯৭৫), নাগপাশ (১৯৮৭)।

উল্লেখ্য, ‘গঙ্গা’ ও ‘পালঙ্ক’-ই রাজেন তরফদারকে স্মরণীয় করে রাখবে। কেননা, এ ছবি দুটির মধ্যে এমন স্থায়ী সম্পদ রয়েছে—যা বহুদিন দর্শক স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।

‘গঙ্গা’ বাংলা চলচ্চিত্রের এক উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। এতে পশ্চিমবঙ্গের জেলে জীবনের নানা দিক, তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন অঙ্গগুলি চিত্রায়িত হয়েছে। কাহিনিচিত্রে ডকুমেন্টারির এই লক্ষণগুলি ছবিটির ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য। কেননা পরিচালক বাস্তবকে শুধু প্রামাণিকতা ও তথ্যের ভারে পিষ্ট করেন নি, শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তাকে লাবণ্যময় করে তুলেছেন। বলা যায়, স্টুডিও সীমানার বাইরে সম্পূর্ণ লোকেশনের অন্তর্গত একটা গোটা ছবির মধ্য দিয়ে এক বিশিষ্ট গোষ্ঠীমানবের প্রাত্যহিক জীবনবেদ রচনায় ‘গঙ্গা’ যুদ্ধোত্তর সিনেমা রীতির সার্থক উত্তরসূরি। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নিম্নশ্রেণির মাঝি-মাল্লাদের দৈনন্দিন জীবনের উত্থান-পতন, তাদের উপলব্ধি, তাদের পরিবেশ চেতনাকে অবলম্বন করে রাজেন তরফদার গঙ্গায় যে সমাজ জীবনের চিত্র এঁকেছিলেন তার পূর্ববর্তী বাংলা সিনেমায় তার কোনো লক্ষণ ছিল না। এদিক থেকে তিনি কৃতিত্বের অধিকারী।

‘পালঙ্ক’-এ দেশভাগের যন্ত্রণা, আর্থ-সামাজিক সমস্যা এবং হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি দেখানো হয়েছে। মানবিক মূল্যবোধে ভরপুর এ এক স্মরণীয় চলচ্চিত্র কর্ম।

হ্যাঁ, রাজেন তরফদারের ছবির বিষয়—‘মানুষ’, মানুষের সম্পর্ক। তবে এক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তি মানুষের চেয়ে মানুষের সামষ্টিক জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই তো জেলেদের জীবনকে নিয়ে (গঙ্গা) ও সার্কাসের মানুষদের নিয়ে ছবি নির্মাণ (আকাশ ছোঁয়া) করেছেন রাজেন তরফদার।

রাজেন তরফদারের ছবিতে বৃহত্তর মানুষের জীবন-সংগ্রাম ধরা পড়েছে। সেটা হতে পারে নদীর বুকে শ্রমজীবী মানুষের প্রাত্যহিক অস্তিত্বের লড়াই (গঙ্গা) কিংবা সার্কাসের মণ্ডপে জীবনকে বাজি রেখে ঝুঁকিপূর্ণ ক্রীড়া কৌশল প্রদর্শন (আকাশ ছোঁয়া) অথবা গ্রামীণ বাস্তবতার মধ্যে সামাজিক শোষণ অবক্ষয়ের কেন্দ্রমূলে বসবাসরত নিচুতলার মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই (নাগপাশ)। উল্লেখ্য, রাজেন তরফদার মানুষের এই জীবন সংগ্রামকে প্রকাশ করেছেন নদীকে কেন্দ্র করে—বিশেষত ‘গঙ্গা’ ও ‘নাগপাশ’-এ। ‘গঙ্গা’, ‘রায় মঙ্গল’ (নাগপাশ) ‘কুমার’ (পালঙ্ক)—এই সমস্ত নদীর পটভূমিতে তিনি ছবি নির্মাণ করেছেন। কেননা, নদীর প্রবাহের সঙ্গে মানুষের জীবন প্রবাহের একটা মিল রয়েছে। জীবনে মতো নদীর অনেক বাঁক, অনেক চড়া, ঘাট-অঘাট পেরিয়ে কূল ভেঙে কূল গড়ে এগোয়। শেষপর্যন্ত ধ্রুব একটি জিনিস, এই এগিয়ে যাওয়া, যেমন নদীর বেলায়, তেমনি জীবনের। তাই তো ‘নাগপাশ’ (১৯৮৭) ছবির শেষে বাইচ লড়াইয়ের মোটিফটা ফিরে আসে।

মহাশ্বেতা দেবীর কাহিনি নিয়ে রাজেন তরফদার নির্মাণ করেছিলেন ‘অগ্নিশিখা’ (১৯৬২)। এখানে এক তেজি মেয়ের জীবনদর্শন মূর্ত হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ‘জীবন কাহিনী’ (১৯৬৪) ছবিতে তিনি আত্মহত্যাপ্রবণ এক বৃদ্ধকে জীবনে টেনে আনার গল্প বলেছেন।

চলচ্চিত্র ভাষায় রাজেন তরফদারের অসাধারণ দখল ছিল। যেহেতু অঙ্কন বিদ্যা থেকে তিনি চলচ্চিত্রে এসেছিলেন, সেহেতু এর প্রভাব তাঁর চলচ্চিত্র কর্মেও পড়েছিল। তাঁর চলচ্চিত্রের বহু কম্পোজিশন চিত্রকলাধর্মী আলোকমাত্রা ও আয়তনিক বিন্যাসে লাবণ্যময়। চলচ্চিত্রে কম্পোজিশনের প্রতি খুবই দুর্বল ছিলেন রাজেন তরফদার। তিনি ভীষণভাবে সচেতন থাকতেন একটা ফ্রেম, তার কম্পোজিশন, ভিউপয়েন্ট যাতে যথাযথ হয় তার দিকে।

চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন বিষয়ে রাজেন তরফদার খুব খুঁতখুঁতে প্রকৃতির ছিলেন। তিনি ডিটেলসে বক্তব্য বিষয় প্রকাশ করতে চাইতেন। মেকআপ, সেট, ফোরগ্রাউন্ড ও ব্যাকগ্রাউন্ডের যথোপযুক্ত সম্পর্ক, ক্লোজআপের যথাযথ ব্যবহার ও প্রতিটি শটের আলো-আঁধারী পরিবেশ সৃষ্টির ওপরে গুরুত্ব দিতেন।

মনের মতো শট নেওয়ার জন্যে রাজেন তরফদার ভীষণ পরিশ্রম করতেন এবং অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কাজ করেছেন। ‘গঙ্গা’য় এমন কতগুলি শট আছে—যা সেই সময়ের বাংলা চলচ্চিত্রে সংগত কারণেই বিরল ছিল। যেমন, এ ছবিতে ছোট ছোট এফেক্ট শট আছে (কিছু কিছু ক্লোজ পায়ের শট)—যা জুমলেন্স দ্বারা পরবর্তী সময়ে করা হয়—কিন্তু সেই সময় যেহেতু জুমলেন্স আবিষ্কৃত হয় নি, সেহেতু ফোকাস শিফট করে রাজেন তরফদারকে এই এফেক্ট শটগুলি নিতে হয়েছিল।

রাজেন তরফদারের ছবি নির্মাণের পদ্ধতি ছিল এমন যে, তিনি কোনো কোনো শট বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলতেন এবং সম্পাদনার সময় পছন্দসই শটটি বেছে নিতেন। তাই তাঁর ছবি প্রসঙ্গে বেশি এক্সপোজারের কথাটি এসে পড়ে।

ছবি নির্মাণের পাশাপাশি রাজেন তরফদার কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে মৃণাল সেনের ‘খণ্ডহর’, ‘আকালের সন্ধানে’, শ্যাম বেনেগালের ‘আরোহন’, শেখর চট্টোপাধ্যায়ের ‘বসুন্ধরা’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া রাজেন তরফদার তরুণ মজুমদার পরিচালিত ‘সংসারে সীমান্তে’ (১৯৭৫) এবং ‘গণদেবতা’ (১৯৭৯) ছবির চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন যৌথভাবে।

১৯৮৭ সালের ২২ নভেম্বর রাজেন তরফদার মারা গেছেন, কিন্তু একজন সৃজনশীল পরিচালক হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর স্থান চিরকালের।

 

Leave a Reply

Your identity will not be published.