বাংলাদেশ ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ (বিএফএফএস)-এর উদ্যোগে গতকাল ১৬ মে ২০২৬, শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে অনুষ্ঠিত হলো ‘জাতীয় চলচ্চিত্র সংসদ সম্মেলন ২০২৬’। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শতাধিক চলচ্চিত্র সংসদের প্রতিনিধি, সংগঠক ও স্বাধীন চলচ্চিত্রকর্মীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সম্মেলন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের বর্তমান বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এমপি এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পুরস্কার প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (পলিসি, তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক) ডা. জাহেদ উর রহমান।
সভাপতি জহিরুল ইসলাম কচি বলেন, “বিগত সময়ে সরকারের কাছ থেকে আমরা বাধাই দেখেছি, সহায়তা দেখি নি। তাই আমাদের একটিই চাওয়া : আমাদের কার্যক্রমে যেন বাধা না দেওয়া হয়।” তিনি আরও বলেন, “এদেশের চলচ্চিত্র সংসদসমূহের কাজ হচ্ছে শিক্ষামূলক। তাই এক্ষেত্রে সরকারের সাহায্য পেতে যে প্রক্রিয়া রয়েছে তা যেন সহজ করা হয়।”
সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরউল্লাহ বলেন, “আমাদের আজকের এই সম্মেলন স্বাধীন সুসংস্কৃতির পরিবেশ গড়ে তোলার দীর্ঘ পাঁচ দশকের লড়াই, সাধনা এবং চলচ্চিত্রের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক প্রমাণ। এই মিলনমঞ্চ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শক্তিশালী ইকোসিস্টেম তৈরির বীজতলা। আগামী বিশ্বে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে রাজত্ব করার বাস্তব সম্ভাবনার উপস্থিতি।”
তিনি বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ (বিএফএফএস)-এর পক্ষ থেকে সরকারের সদয় বিবেচনার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রস্তাবগুলো হলো : ১. দেশব্যাপী উৎসব আয়োজন; ২. বিশেষায়িত উৎসবের অনুমতি; ৩. পলিসি বা নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ; ৪. আর্থিক ও কাঠামোগত সহায়তা এবং ৫. নিয়মাবলীর শিথিলকরণ। তিনি বলেন, “একটা বই প্রকাশের আগে সরকারের অনুমতি নিতে হয় না। প্রকাশের পর সরকার চাইলে সেটা নিষিদ্ধ করতে পারে। তাই আমরা স্বনিয়ন্ত্রিত হতে চাই। বিদেশি সিনেমার অবাণিজ্যিক প্রদর্শনীর সাধারণ অনুমতি দেওয়া হোক; যে-কোনো সময় যে-কোনো সিনেমা নিষিদ্ধের ক্ষমতা তো সরকারের থাকছেই। আমাদের মনে রাখতে হবে যে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন যত সহজ হবে, দেশের সাংস্কৃতিক ভিত্তি ততটাই মজবুত হবে। মজবুত সংস্কৃতিই কেবল পারে দেশকে মৌলবাদী চরমপন্থী হওয়া থেকে রক্ষা করতে। আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে সিনেমা হবে মানুষের জ্ঞানচর্চা, মানসিকতা প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম। আজকের এই সম্মেলন সেই স্বপ্নযাত্রাই একটি সূচনা।”
দিনব্যাপী এই সম্মেলনে ছিল উদ্বোধনী পর্ব, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, মুক্ত আলোচনা, নেটওয়ার্কিং সেশন এবং পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারের আয়োজন করা হয়; ‘আঞ্চলিক চলচ্চিত্র সংসদ : অভিজ্ঞতা বিনিময়’ এবং ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র সংসদসমূহ : তারুণ্যের ভাবনা’। ফলে প্রান্তিক পর্যায় থেকে সাংস্কৃতিক সংগঠকদের কণ্ঠস্বর উঠে আসে এই আয়োজন থেকে।
সম্মেলনে প্রদর্শিত হয় অস্কার পুরস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত চলচ্চিত্র লিসা গাজী পরিচালিত ‘বাড়ির নাম শাহানা’ এবং মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র আকরাম খান পরিচালিত ‘নকশিকাঁথার জমিন (২০২৪)’। পাশাপাশি চলচ্চিত্র আন্দোলনকে যারা একজীবন সময়, শ্রম ও অর্থ দিয়ে চালিয়ে গেছেন, এবং বর্তমানে শত প্রতিকূলতা নিয়ে যে চলচ্চিত্র সংসদগুলো সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তাদের সকলের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে প্রদান করা হয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার-‘বিএফএফএস পদক ২০২৫ (বর্ষসেরা সংগঠন)’ এবং ‘চলচ্চিত্র সংসদ সম্মাননা ২০২৬ (বিএফএফএস আজীবন সম্মাননা)’। আজীবন সম্মাননা লাভ করেন মইনুদ্দীন খালেদ।

উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ দেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সংগঠন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রচর্চা, দর্শক উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ-এর সদস্য হিসেবে এটি বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে।
বিএফএফএস চলচ্চিত্র সংসদগুলোর কার্যক্রমকে গতিশীল রাখা, চলচ্চিত্র বিষয়ক নীতিনির্ধারণে সরকারকে সহযোগিতা করা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, সেমিনার, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ আয়োজনের মাধ্যমে একটি সুস্থ ও শিল্পমানসম্পন্ন চলচ্চিত্র সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সদস্য সংগঠনকে সাথে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড (অস্কার)-এর জন্য চলচ্চিত্র মনোনয়ন প্রদান এবং জাতীয় পর্যায়ে চলচ্চিত্র সংলাপ আয়োজনও সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অংশ।
Leave a Reply
Your identity will not be published.