ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি `হেলেনিক সৌরভ' [পর্ব-১ ]

ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি `হেলেনিক সৌরভ' [পর্ব-১ ]

ভ্রমণ গদ্যের পাঠকদের কাছে একটি সুপরিচিত নাম, হুসেইন ফজলুল বারী। তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য হলো, তথ্য সমৃদ্ধ হলেও তা একঘেয়ে নয়। কেননা তথ্যগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে; মিশে থাকে গল্পের সঙ্গে। নিসর্গের বর্ণনা অপরূপ। আর তাঁর ভাষায় কবিতার গন্ধ রয়েছে। কখনো-সখনো অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহারও লক্ষণীয়। 
এই সংখ্যা থেকে ‘অন্যদিন’-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ শুরু হলো হুসেইন ফজলুল বারী’র ভ্রমণকাহিনি ‘হেলেনিক সৌরভ’। এটি গড়ে উঠেছে গ্রিসের পটভূমিতে—যেখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে সেই দেশের মানুষ, প্রকৃতি এবং পুরাণের নানা বিষয়।

গ্রিসের সান্তরিনি এয়ারপোর্টে পৌঁছে হাঁটছিলাম ফুরফুরে মেজাজে। কত সব মহান মানুষের পদচারণায় মুখর ছিল প্রাচীন গ্রিস। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটলদের বাড়ি এই দেশে! গ্রিসের অধিবাসীরা নিজ দেশকে বলে ‘হেলাস’ আর নিজেদের ‘হেলেনিক’ বলতে ভালোবাসে। গ্রিক ভাষায় ‘গ্রিক’ শব্দের ঠিকঠাক হদিশ পাওয়া যায় না। গ্রিকদের কেউবা ডাকত রোমিও। গ্রিসের ল্যাতিন নাম গ্রিসিয়া। আরবগণ ডাকত ইউনানি বলে। আমাদের দেশে প্রচলিত ইউনানি চিকিৎসার জন্ম কি গ্রিসে ? কী জানি, অতটা তলিয়ে দেখি নি। যেদিন থেকে হেলেনিকগণ তুর্কিদের অধীনে এল, তুর্কি পাশাগণ এদের তাচ্ছিল্য করে ডাকতে শুরু করলেন ‘গ্রিক’ বলে। তুর্কি ভাষায় গ্রিক মানে নাকি ক্রীতদাস। প্রায় পৌনে চার শ’ বছর ধরে হেলাস ভূমি ছিল তুর্কিদের জবরদখলে। একসময় অটোমান সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত গেলেও ইউরোপিয়ানদের মুখে এই গ্রিক নামে ডাকার অভ্যাসটি রয়ে গেছে। 
আমি দাঁড়িয়ে আছি গ্রিসে—দুনিয়ার মহৎ মাটিতে! সারা পৃথিবীর মানুষ এই মাটির কাছে ঋণী। এই দেশে একদিন জ্ঞান-দর্শন-রাষ্ট্রতন্ত্র-স্থাপত্যবিদ্যার বৈজ্ঞানিক উন্মেষ ঘটেছিল! আমি আপ্লুত বোধ করি। আগুয়ান এক নারী আচমকা আমার পা মাড়িয়ে দিলেন ট্রলি দিয়ে! একবারে রক্তারক্তি কারবার। 
ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে বললাম, ইজ ইট ফেয়ার ?
সুন্দরী নারী এগিয়ে এলেন কোমর বেঁধে, রীতিমতো গালি দিয়ে যা বললেন তার নির্যাস, কানা কোথাকার, ব্লাডি...!
ঢোঁক গিললাম। এই আগ্রাসী সুন্দরী লালঠোঁটে এসেছেন ঝগড়া করতে ? আমি ভাবতাম, প্রবালরঙা ঠোঁটের মূল কাজ প্রেমময় বাতচিত আর চুম্বন। পৃথুলা নারী ওষ্ঠ-অধর কাঁপিয়ে উল্টো গালাগাল শুরু করলেন আমাকে।
এই বুঝি হরিষে বিষাদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ! আমার কপালটাই এমন। কোন জাতের পাগলরে বাবা, এই বেটির সাথে কথা বলাই অপরাধ। কী জানি, লালমুখো এই রমণীর হয়তো ভদ্রতাজ্ঞান নেই। নিজের মান-ইজ্জতের হেফাজত নিজে করি। ভদ্রস্থ হয়ে নিশ্চুপ থাকি। বিমানবন্দরে বসে ফার্স্ট এইড খুঁজি আর হাজিরান মজলিশ দেখি। পুরুষগণের গায়ে হাওয়াই বা টি শার্ট, পরনে শর্টস আর পায়ে কেডস। কিছু মানুষের গায়ে কালো আলখাল্লা—এদের পদক্ষেপ গম্ভীর। বুঝলাম, এরা অর্থোডক্স গির্জার পাদ্রি। হাসিখুশি যাত্রীরা হাঁটছেন দলবেঁধে, কেউ হাঁটছেন একলা, কেউবা চলছেন সঙ্গীর কাঁধে হাত রেখে। লক্ষণীয়, এখানকার সিংহভাগ নারীর বেশবাস বেশ খোলামেলা। কত কিসিমের যে রঞ্জিত ঠোঁট এইসব উচ্ছল রমণীদের। লিপস্টিকের যে কত রকমফের। গবেষণায় এসেছে, গাঢ় লাল রং ওষ্ঠে মাখলে নাকি মেয়েদের আত্মবিশ্বাস চরমে ওঠে। পশ্চিমে প্রচলিত আছে, হোয়েন ইন আউট, চুজ রেড। পশ্চিমের দুই ডজন দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, কথাটা ষোলো আনা সত্যি। 


এই রঙিন রোমান্টিকতা আপাতত বাদ দিই। হেল্পডেস্কে গিয়ে আহত হওয়ার বিষয়টি জানালে তারা বললেন, তুমি কি ফর্মাল অভিযোগ করতে চাও ? সিসি টিভি দেখে বিচার হবে।
আমি বললাম, বিচার-আচার পরে, আগে পায়ের ব্যান্ডেজ বাঁধো। 
ডেস্কের মহিলা ফোন তুলে কার সাথে যেন শুরু করলেন খেজুরে আলাপ। কথার যেন দাড়ি-কমা নেই। বিরক্ত হলেও অপেক্ষা করা ছাড়া আমি কীই-বা করতে পারি!
খানিকক্ষণ পরে কাতরকণ্ঠে আবার বললাম, বোন, আমার পায়ের সত্বর চিকিৎসা দরকার। 
সে জিব কেটে বলল, আরে, তোমার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। দায়িত্বহীন আর কাকে বলে! তবে প্রায় দৌড়ে গিয়ে সে টেনে আনল এক প্যারামেডিক। মহিলার ধাক্কা খেয়েছি শুনে আগত স্বাস্থ্যকর্মীটি হেসে বললেন, ওই নারী তোমাকে একা দেখে ইচ্ছে করেই ধাক্কা দিয়েছে। 
আহাম্মকের মতো বললাম, মানে ?
আমার পা ড্রেসিং করতে করতে রসিক প্যারামেডিক বললেন, ওই গ্রিক দার্শনিক যে এরিস্টটল বলেছেন, যে একাকিত্বে আনন্দে থাকে, সে হয় দেবতা নয়তো পশু। আমি নিশ্চিত, একাকী—তুমি ওই দুই গোত্রের কেউ একজন! 
আমি বললাম, মানুষের প্রকৃতি এমনই যে, সে পশুত্ব ও দেবত্বের দ্বৈততায় বন্দি। 
তিনি মুখ টিপে হেসে যে তথ্য দিলেন তা শুনে আমার আক্কেল গুড়ুম—ওই মহিলা সম্ভবত কুলবধূ নন, বারবনিতা। 
আঁতকেই উঠলাম। বলে কী ব্যাটা ? কোথায় যেন পড়েছি, প্রাচীন গ্রিসে যৌনকর্মীরা ঠোঁট রাঙাতেন ভেড়ার ঘামের সঙ্গে কুমিরের পুরীষ মিশিয়ে। ওই রঙিন ওষ্ঠের মহিলা কি আদিম পেশার লোক ? মনে আবার খচখচ করছে, যাহ, তা কী করে হয় ? সক্রেতিসের দেশের আগ্রাসী নারী ‘সরি’ পর্যন্ত বলল না ? বিড়বিড় করি, যে দেশ সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের সূতিকাগার হয়ে দীপশিখার মতো জ্বলজ্বল করছিল, সেখানকার বর্তমান বাসিন্দার এ কেমন বর্বর আচরণ ?
ডেটল-টেটল লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে প্যারামেডিক বললেন, ওই বেটি সম্ভবত আমেরিকান।
আমি উচ্চহাস্যে বললাম, ঠিকই আছে, উনারা বড় দেশের বড় মানুষ, ইচ্ছে করলেই অনেক কিছু করতে পারেন। বেয়ারা দেশকে শায়েস্তা করতে হামলা-টামলা চালিয়ে মিসমার করতে পারেন, সে তুলনায় আমি তো নস্যি।
পৃথুল মানুষটি শরীর গমকে হাসলেন এই বলে যে, তুমি তো বেশ মজার লোক। 
লোকটি আবার বললেন, হাসলে কাটা-ব্যথার দ্রুত উপশম হয়। 
খানিকটা হাসতে পেরে সত্যিই আমি ভালো বোধ করি।
আমার অনুসন্ধিৎসা দেখে তিনি আরেক সবক দেন, গ্রিকদের দেহাবয়ব সুষমতর আর নাসিকা উন্নততর হয়—সান্তরিনিতে টের পাবে।
আমার মুগ্ধদৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, তবে তিন-চার  হাজার বছর ধরে গ্রিকদের দেহ-সৌষ্ঠব আর মার্জিত আচরণে চিড় ধরেছে। 
আমি ভদ্রলোককে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রিটাসের দেশে এসেই তোমাদের মানবিক পরিচর্যা পেয়েছি—আমি কৃতজ্ঞ। 
স্মর্তব্য, বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসাপদ্ধতির আঁতুড়ঘর এই গ্রিস। কোথায় যেন পড়েছি, প্রাচীন গ্রিসে রোগীকে পরীক্ষা করতে গিয়ে ওই সময়ের  চিকিৎসকগণ রোগীর লালা, রক্ত, বমি, এমন কী কানের ময়লা পরখ করতেন আঙুল চালিয়ে, গন্ধ শুঁকে বা জিব দিয়ে চেখে। এর আগে গ্রিসে মূলত রোগীদের ঝাড়ফুঁক করে নিরাময়ের চেষ্টা চালানো হতো। 
ধার্মিক স্বাস্থ্যকর্মীটি বুকে ক্রস এঁকে আমার সুস্থতার জন্য দোয়া করে বললেন, নিরাময়ের জন্য প্রয়োজন দাওয়া আর দোয়া।
পায়ের ক্ষত থেকে আমার মনোযোগ অন্যত্র সরাতেই সম্ভবত তিনি পরিচর্যার ফাঁকে এতা এত গল্প পাড়লেন। 
ভদ্রলোক সামনে এগোলে আমি একটা চেয়ারে বসে পায়ের ব্যান্ডেজের দিকে বারবার তাকাই। কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন বলল, পা ছিলে গেছে যাক, কিন্তু যাত্রার শুরুতে নারীর উষ্ঠা খাওয়া অপয়া কি ? জানি, এসব একান্তই কুসংস্কার যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বুঝলাম, কুসংস্কারের কুহক ঘাপটি মেরে আছে আমার নিউরনে। কীসব ভাবছি আবোলতাবোল! এয়ারপোর্টের এরাইভাল থেকে লক্ষ করলাম, কত কিসিমের যে মানুষের আনাগোনা এদিকটায়। প্রাচ্যের মানুষজন যেন হাঁটে না, রীতিমতো ছোটে।  
কিন্তু আমি ছুটব কী করে ? খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ধীরলয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়া ছাড়া আমার উপায় থাকে না। কারণ, একে তো আমি তো প্রতীচ্যের মানুষ—আমাদের চলাফেরা ধীরগতির, তার উপর এখন পায়ে কাঁচা জখম।
বলতে দ্বিধা নেই, গ্রিসের এই বিমানবন্দর দেখে খানিকটা হতাশই হয়েছি। ইউরোপের জমকালো বিমানবন্দরগুলোর তুলনায় সান্তরিনি এয়ারপোর্টে কেমন যেন গরিবি হালত। হলুদ-সবুজাভ বিস্তীর্ণ প্রান্তরে কয়েকটা জংধরা ছোট্ট বিমান চড়া রোদে  গা এলিয়ে ঝিমুচ্ছে বুঝি। একটা লালচে বিমান আকাশে উড়বার পাঁয়তারায় চলতে শুরু করেছে মৃদুলয়ে। অভ্যন্তরীণ বিমানভ্রমণ বলে এখানে ইমিগ্রেশনের ঝামেলা নেই। ট্রলি টেনে ঝটপট বের হয়ে দেখি, আধখাওয়া স্বাস্থ্যবতী কলাকে ঘিরে নীল মাছির মিছিল শুরু হয়েছে। বিচিত্র মানুষজন জড়ো হয়েছে এই এরাইভাল লাউঞ্জে। অদূরেই লক্কড়-ঝক্কর গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকজন বিড়িখেকো  দালাল। অনেকের মাথায় আবার কাউবয় হ্যাট। রংচঙে টুপির যে কত বাহার! এদের এড়িয়ে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করলাম। 
গাড়িতে বসে লক্ষ করলাম, রোদের তীব্র দহনে পাকা রাস্তায় যেন আগুনের আঁচ লেগেছে। দুপাশে শুধু পাথুরে পাহাড়-পর্বতের সারি। পাহাড়গুলোর কালচে বা লোহিতবরণ। এদিকে জনবসতি বেশ বিরলই বলতে হবে। আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করেছে ধীরলয়ে। ছন্নছাড়া রাস্তার মোড়ে মোড়ে অসংলগ্ন দোকানপাট। আগুয়ান পথচারীদের মাথার উপরে বিশাল বিশাল রাজছত্র।  সানগ্লাস মাথায় এঁটে  ভ্রু কুঁচকে তাকাই এদিক-সেদিক। সান্তরিনি দ্বীপে এসে বেশ মুশকিলেই পড়েছি বুঝি। কী নারকীয় রোদরে মাবুদ! চোখে লাগে রোদের ঝিলিক। চালকের গাড়ি চালনায় বেশ বেপরোয়া ভাব দেখে হালকা ঝাড়ি দিলাম। আরেকটু হলে দুর্ঘটনায় পড়তাম আর কি। চালক ব্যাটা গ্রিক উচ্চারণে বারবার বলল, মাই এপোলজিস। নিজেকে শুধাই, বিদেশ বিভুঁইয়ে মেজাজ হারানো ঠিক হবে না। এই রোদেলা দুপুরের আঁচ যেন নিজ মেজাজে না লাগে। মধ্যাহ্নের দহন লেগেছে কালচে রাস্তার বুকে। মাঝে মাঝে প্রতিফলিত রোদে হিরণ¥য় আলেয়ার রেশ দেখি। পেছন ফিরে দেখি, উঁচু উঁচু থাম, ঝাপসা স্থাপনা বা একটা-দুটো পাথুরে ঘর। সামনে একদম বিরানভূমি। 
পাকদণ্ডী ঘুরতেই দেখি—দুপাশে শুধু রোদস্নাত ন্যাড়া পাহাড়ের সারি! রোদেজ্বলা প্রকৃতি দেখে স্বগতোক্তি করলাম, সাবলাইম বিউটি—ভয়ংকর সুন্দর! কৌণিক দৃষ্টিতে দেখি, সফেদবরণ ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ নীল আসমানে যেন আটকে আছে। সমুদ্রমেখলা এই পাহাড়ি জনপদ বেশ স্থবির—গম্ভীর। এবড়োখেবড়ো পাহাড়ি শিলারও যে কত স্তর। মেটে বা হালকা কালচে রঙে পাহাড়ের গায়ে সবুজাভ মস বা ঘাসের বিস্তার। কোথাও-বা একদম ন্যাড়া পর্বত—রুক্ষ রুক্ষ চড়াই-উতরাই। ওই তো দেখা যায়, সুচালো শৃঙ্গ ভেঙে পাহাড়ের আগা সমতলের মতো হয়ে গেছে। একটু এগোতেই চোখে পড়ল, একটা ভয়ংকর গিরিখাত। নিচের দিকে তাকাতে ভয় হয়—ধোঁয়াশামাখা নদী বুঝি! ঠিক ওপারে কুহকী মেঘ বা ধোঁয়াশা। এদিকটায় ভেজা ভেজা হলদেটে রোদ। ছায়ার রাজত্বে আবার হামলে পড়ল রাজসিক রোদ—হীরকফলার মতো সূর্যের আলো আছড়ে পড়ল পাহাড়ের গায়। উঁচু বাঁধের মতো পথ থেকে লক্ষ করলাম, একটা জবুথবু গির্জার শিরে আবির রঙের আভা। পাহাড়ের রং কালচে, ধূসর, মেটে, লালচে বা সোনালি। এই পাষাণময় পাহাড়ের অপরূপ রূপ দেখি—কাব্যমগ্ন হয়ে বিড়বিড় করি—
আমি একটি পাহাড় কিনতে চাই।
সেই পাহাড়ের পায়ের কাছে  থাকবে গহন অরণ্য,
আমি সেই অরণ্য পার হয়ে যাব,
তারপর শুধু রুক্ষ কঠিন পাহাড়। 
একবারে চূড়ায়, মাথার খুব কাছে আকাশ 
নীচে বিপুলা পৃথিবী,
চরাচরে তীব্র নির্জনতা। 
        (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)  
নগ্ন-নির্জন এসব পাহাড়-পর্বতের কি বয়সের গাছপাথর আছে ? আমি স্মরণ করতে চাইলাম প্রাসঙ্গিক গ্রিক পুরাণ সৃষ্টির অমূর্ত শুরুতে ঘুমন্ত মাদার আর্থ পুত্রদ্বয় ইউরেনাস (আকাশ) ও ওশোনাসসহ (সাগর) জন্মদান করলেন পাহাড় পর্বত। নিদ্রায় অভিভুত মাদার আর্থকে দেখে পুত্র ইউরেনাসের কামনার শিখা জ্বলে উঠল। তাই সে মায়ের গোপন কোটরগুলি ঈষদুষ্ণ জলে ভরিয়ে দিল। ফলে জন্ম নিল গাছপালা, নদীনালা ও পশুপাখি এসব। মাদার আর্থ প্রসব করলেন তিন শ’ জন রাক্ষস পুত্র। ক্রমে ইউরেনাস ও মাদার আর্থের ভালোবাসায় জন্ম নিল আরও এক ডজন অসুর সন্তান—এদের নাম টাইটান। এই সৃজন প্রক্রিয়া ভালোই চলছিল। যা হয় আর কী, একটা পর্যায়ে দাম্পত্য সম্পর্ক ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে এল। মাদার আর্থের সাথে ইউরেনাসের দাম্পত্য কলহ চরমে উঠল। অসুখী আর্থ তার সন্তান টাইটানবাহিনীকে প্ররোচনা দিলেন, তাদের পিতা ইউরেনাসকে আক্রমণ করতে। জওয়ান টাইটানদের সাড়াশি আক্রমণে বুড়ো পিতা ইউরেনাস হলেন ধরাশায়ী। কনিষ্ঠ পুত্র টাইটান স্যাটার্ন ছিল ভয়াবহ রকমের পাঁজি। সে বাঁ হাতে ঝাঁপটে ধরে চকমকে পাথর দিয়ে গ্যাচাং করে কেটে ফেলল পিতা ইউরেনাসের পুংলিঙ্গ। সেদিন থেকে বাঁ হাত হয়ে গেল দুষ্ট বা মন্দ হাত! গ্রিসে এখনো কাউকে বাঁ হাতে কিছু দেওয়াকে চরম অপমানকর মনে করা হয়। 
ধ্বজভঙ্গ আদিপিতা ইউরেনাস আর কী করবেন ? তিনি কেঁদেকেটে স্যাটার্নকে অভিশাপ দিলেন, এক মাঘে শীত যায় নারে বেটা, তোর ছেলেরাও তোকে নিবীর্য-ক্ষমতাহীন করবে। তুই যা করছিস, তার ফল ভোগ করতেই হবে রে বদমাশ। স্যাটার্ন অনুচ্চস্বরে যা বললেন তার মর্মার্থ অনেকটা এরূপ—শকুনের দোয়ায় গরু মরে না, জনাব। তবে পিতৃদেব ইউরেনাসের এই শাপ-শাপান্ত শুনে স্যাটার্ন মনে মনে কিন্তু চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। সেজন্য নিজের মসনদ সুরক্ষার জন্য স্যাটার্ন সাহেব নিলেন অভূতপূর্ব পদক্ষেপ। তিনি আপন সন্তান জন্মগ্রহণের সাথে সাথেই আস্ত গিলে খেতে করে শুরু করলেন। একমাত্র ব্যতিক্রম তার পুত্র জুপিটার বা জিউস। জিউস ভূমিষ্ঠ হলে স্যাটার্নের স্ত্রী একটা পাথরকে ত্যানায় পেঁচিয়ে তুলে দিলেন স্যাটার্নের কাছে। সদ্যজাত শিশু মনে করে বাবা স্যাটার্ন সেই পাথরখণ্ডকে গলাধঃকরণ করে নিশ্চিন্ত হলেন। স্যাটার্নের মাথায় মনে হয় ঘিলু কম ছিল—নইলে তিনি মুখে পুরেও পাথর আর শিশুর পার্থক্য করতে পারলেন না ?
জিউসের মা আর দাদি—মাদার আর্থ মিলে নবজাতককে বাঁচাতে কৌশলে পাঠিয়ে দিলেন ক্রিট দ্বীপে।  আকাশ-পাতাল-মর্ত্য স্যাটার্নের নখদর্পণে বলে জিউসকে গাছের ডালে দড়ি বেঁধে পালন করা হয়। এভাবেই নাকি দুনিয়ায় প্রথম দোলনা আবিষ্কার হয়। স্যাটার্নের অনুচরেরা সারা গ্রিসে তন্নতন্ন করে জিউসকে খুঁজছিল। এরা ক্রিটেও এসেছিল। স্যাটার্নের গোয়েন্দা বাহিনী যাতে শিশু জিউসের কান্নাকাটি না শুনতে পায়, সেজন্য জিউসের শুভাকাক্সক্ষী ছাগল এদের দেখলেই ভ্যা ভ্যা করে চিৎকার করত। আর উপদেবতারা বল্লম-ঢাল বাজিয়ে বা উঁচুলয়ে গান গেয়ে শব্দের ঝংকার সৃষ্টি করত। শিশু জিউসকে মৌমাছিরা এসে মধু আর ছাগল এসে দুগ্ধপান করাত। একবার খেলতে গিয়ে শিশু জিউস ওই ছাগলের একটা শিং ভেঙে ফেলে, যা তার কেরামতিতে বেশুমার প্রাচুর্য বয়ে আনে। এখনো সনাতনপন্থী গ্রিকগণ আর্থিক উন্নতির আশায় টোটকা হিসেবে বাড়ির কোণে ছাগলের শিং টানিয়ে রাখে। 
যা হোক, ছাগদুগ্ধ আর মধু পান করে এক বছরেই শিশু জিউস হয়ে গেলেন তাগড়া যুবক। এক সময় মায়ের কৌশলে তিনি পিতা স্যাটার্নের সাকি নিযুক্ত হয়ে পিতার পানীয়তে মিশিয়ে দেন বমন উদ্রেককারী মিক্সচার। স্যাটার্ন শুরু করলেন প্রচণ্ড বমি। ফলে অক্ষত অবস্থাতেই আগে গ্রাস করা পুত্র-কন্যারা সবাই স্যাটার্নের পেট থেকে বেরিয়ে এল। 
মুক্ত পুত্র-কন্যাগণ জিউসের নেতৃত্বে স্যাটার্ন ও তার অমাত্যদের বিরুদ্ধে শুরু করল সম্মুখযুদ্ধ। সুরাসুরের এই যুদ্ধ চলল একটানা দশ বছর। যুদ্ধে জিউস-বাহিনী বিজয়ী হলো। বিজিত টাইটানদের নেতা যুদ্ধাপরাধী এটলাসের জন্য ঘোষিত হলো অমোঘ শাস্তি—যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, সে অনন্তকাল ধরে আকাশকে কাঁধে বহন করবে! সেই থেকে বেচারা এটলাস একটানা সেই ভার বহন করে চলেছে। তবে হাজার হাজার বছরের ঝাড়ঝাপটা আর প্রাকৃতিক পরিবর্তনে দণ্ডিত এটলাস নাকি এইরূপ শিলাময় পাষাণ-পর্বতে পরিণত হয়েছে। 
সান্তরিনির কিম্ভূতকিমাকার পাহাড় দেখতে দেখতে ভাবছিলাম এইসব উপকথা। পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলিষ্ণু মেঘ চলছে সামনের দিকে। অনেকটা দূরে উপত্যকা, ঝিরি, পাইনবন বা উদ্যানের মতো কিছু। এদিকে বিকটদর্শন পর্বতের মাথা ভেঙে কেলডেরা হয়ে গেছে। বৃহৎ পাহাড়ের অতিকায় জ্বালামুখ থেকেই এসব কেলডেরার জন্ম। আদতে এসব ছিল আগ্নেয়গিরি। পাহাড়ের শিখরের বুঝি সাধ হয়েছে আকাশ ছোঁয়ার ? ঝলমলে সূর্য কী রাজসিকভাবে ছড়িয়ে রয়েছে অনন্ত অম্বরে! বাঁক ঘুরলে দেখি, পাহাড়ের চড়াই-উতরাই—শৃঙ্গের পর শৃঙ্গ। আমি বেকুবের মতো পাহাড়ের আগামাথার শুমারি করি—এক, দুই, তিন— কোনো কূলকিনারা পাই না। চকিতেই কুয়াশার নেকাব এসে পাহাড়ে লাগে বা পাশ কেটে যায়। একটু যেন ছায়ার রেশ এল। খানিক পরেই দেখি, চারপাশে রৌদ্রের ঝিলিক। পাহাড়ি পথে গাড়ি থামিয়ে একবার আসমানের দিকে তাকাই। আবার তাকাই সামনের দিকে। কত সব অতল-গম্ভীর পর্বত আর গিরিপথ। হিরণ¥য় চূড়া ঝলসে ঝলসে ওঠে। দূরাগত আলোর মিছিল এসে দূরবর্তী পাহাড়-পর্বতের গা-মাথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।  সূর্যরশ্মি পাহাড়ের সর্বাঙ্গ দখল করে নেয়। আকাশের রং বদলে গেছে, সেই সঙ্গে মাটির রং। গিরিনন্দিনীর গায়ে কেউ বুঝি অর্বুদ-নির্বুদ স্বর্ণরেণু ছড়িয়ে দিল! শিলাময় সোনার কেল্লায় ঝলমলে আলোর রোশনাই। এই বুঝি রোদ-পাহাড়!

(চলবে)
 

Leave a Reply

Your identity will not be published.