[‘অলাতচক্র’ একটা নারী গোয়েন্দা এজেন্সি। অলাতচক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পেশায় কাজ করে কিন্তু পাশাপাশি তারা অলাতচক্রের সদস্য। অলাতচক্র গ্রুপের নাম সদস্যদের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে বানান, মানে : অ = অনীলা। লা = লাবণি। ত = তন্বী। চ = চন্দ্রিমা। ক্র = ক্রমেলা।
এই থ্রিলার উপন্যাসটিতে দেখা যায়, পুরোনো ঢাকার মহররমের মিছিলে ‘তাতবির’ করতে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় প্রাণ হারায় তরুণ অপু। পুলিশ প্রাথমিক সুরতহালে একে অতিরিক্ত রক্তরক্ষণজনিত সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিলেও, সিআইডি এএসপি লাবণির তীক্ষè নজর এড়ায় নি এর পেছনের অসঙ্গতি। অপুর শরীরে অগণিত ধর্মীয় ক্ষতের ভিড়ে কি লুকিয়ে ছিল কোনো সুনিপুণ ঘাতকের ছদ্মবেশী আঘাত ? মৃত্যু-পূর্ববর্তী সেই রহস্যময় ফোন কল আর পাওনাদারের সাথে বিরোধ কি স্রেফ কাকতালীয়, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নিপুণ ষড়যন্ত্র ? মহররমের ভিড় আর মাতমের আবহে ঢাকা পড়া এক সন্দেহজনক মৃত্যুর জট খুলতে নামে ধীসম্পন্ন গোয়েন্দা লাবণি।]
৪
লাবণি আদার চা নিয়ে ডাইনিং রুমে আসতেই ওর মোবাইল বেজে উঠল। অ্যাডিশনাল এসপি শফিকুল আলম ফোন করেছেন। লাবণি অবাক হলো। এই ছুটির দিনে, তাও আবার সাতসকালে উনি কেন ফোন করেছেন! লাবণি ফোন ধরতেই শফিকুল আলম বললেন, এত ভোরে হুট করে ফোন করার জন্য দুঃখিত, লাবণি।
না, না, ঠিক আছে। কী ব্যাপার ? কোনো আর্জেন্ট কিছু ?
কক্সবাজারে দু-তিন ঘণ্টা আগে একজন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। নাম বরুণ মার্মা। ভদ্রলোক ঝিগাতলায় থাকতেন। কেসটা তোমাকে হ্যান্ডেল করতে হবে।
আচ্ছা, স্যার।
তোমাকে আজ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেতে হবে।
কোথায়, স্যার ?
কক্সবাজার।
কক্সবাজার! আজ তো ছুটির দিন, স্যার।
আনফরচুনেটলি আজই যেতে হবে।
লাবণি হতাশ কণ্ঠে বলল, এই কেসে সিআইডি জড়িত হচ্ছে কেন, স্যার ? কেসটা কি কমপ্লিকেটেড ?
বরুণ মার্মা কক্সবাজারে খুন হলেও উনি ঢাকার ‘অন্ধকার জগৎ’ পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার। বরুণ মার্মার চাচা একটা আদিবাসী সংগঠনের নেতা গোছের লোক। মন্ত্রী-মিনিস্টারদের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে। অলরেডি উপরমহলে খবর চলে গেছে।

মানে ওপর থেকে অর্ডার চলে এসেছে।
হ্যাঁ। পার্বত্য অঞ্চলে অনেক ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। কিন্তু কক্সবাজার একটা ট্যুরিস্ট সিটি। একটা কিছু হলে সবাই সঙ্গে সঙ্গে জেনে ফেলে। তার ওপর কে যেন বরুণ মার্মার ডেডবডির ছবি টিকটকে ছেড়ে দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে।
স্যার, বরুণ মার্মা ঢাকার সাংবাদিক। তাহলে উনি কক্সবাজারে কী করছিলেন ?
হয়তো বেড়াতে গেছেন কিংবা কোনো ক্রাইম রিপোর্ট নিয়ে কাজ করছিলেন। তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে উনি আসলে কী করছিলেন কক্সবাজারে, আর কেনই-বা উনি খুন হলেন।
লোকাল থানা নিশ্চয়ই এই কেস হ্যান্ডেল করছে। সেক্ষেত্রে আমি আজ না গিয়ে রবিবার কক্সবাজার যেতে পারতাম।
খুনটা সমুদ্রসৈকতে হয়েছে। এরকম কেস আমি আগেও হ্যান্ডেল করেছি। ওখানে জোয়ার-ভাটার ব্যাপার আছে। আমি লোকাল থানার ওপর রিলাই করতে চাই না।
মানে জোয়ারে ক্রাইম সিনের আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ব্যাপারটা বেশ জটিল হয়ে গেল।
হ্যাঁ, সেটাই সমস্যা। তোমার প্লেনের টিকিট বুক করতে বলেছি। একটু পর বুকিং ডিটেইলস পাঠাচ্ছি।
ফ্লাইট কটায়, জানেন স্যার ?
দুপুর বারোটায়। গুড লাক!
অসামাজিক হিসেবে পারিবারিক বলয়ে লাবণির যথেষ্ট কুখ্যাতি রয়েছে। আজ দুপুরে সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারে লাবণির খালাতো বোন কাকলির বিয়ে। লাবণি ভেবেছিল বিয়েতে উপস্থিত হয়ে অসামাজিকতার অপবাদ কিছুটা লাঘব করবে। কিন্তু অফিসের নির্দেশে দু ঘণ্টার ভেতর ব্যাগ রেডি করে লাবণি এয়ারপোর্টের উদ্দেশে রওনা হলো।
ইউএস-বাংলার প্লেনটা কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করল দুপুর একটা পাঁচে। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি সোমেন সমাদ্দার লাবণিকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে এসেছেন। সোমেন সমাদ্দার লাবণিকে সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন, আপা, আমি কক্সবাজার থানার ওসি। বরুণ মার্মার কেসটা আমি হ্যান্ডেল করছি। আপনি যে আসবেন সেটা ঢাকা থেকে জানিয়েছে।
থ্যাংক ইউ। বরুণ মার্মা খুনের ব্যাপারটা একটু এক্সপ্লেইন করুন তো।
আপা, আগে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিন।
আপনি এখুনি বলুন।
আপা, এই খুন নিয়ে খুব বেশি ব্যাখ্যা দেওয়ার কিছু নেই।
কেন ?
এটা ওপেন অ্যান্ড শাট কেস, আপা।
একটু ব্যাখ্যা করুন।
মব কালচার শুরু হওয়ার পর কক্সবাজারে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত অনেক বেড়ে গেছে। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা শিবির হয়ে এখানে ড্রাগ আসে। কিশোর গ্যাং এই ড্রাগে আসক্ত। ড্রাগ কেনার টাকার জন্য এরা যখন-তখন ছিনতাই করে। ছিনতাইয়ের সময় কেউ বাধা দিলে এরা রক্তারক্তি ঘটিয়ে ফেলে। কয়েকদিন আগে একজন স্টুডেন্ট লিডারকেও এরা খুন করেছে।
হ্যাঁ, পত্রিকায় পড়েছিলাম। ওই কেসের কোনো প্রগ্রেস হয়েছে ?
কিশোর গ্যাংয়ের চারজনকে আমি দু-দিনের ভেতরই জেলে ভরলাম। রিমান্ডে নিয়ে কয়েক ঘা লাগাতেই ফরফর করে স্বীকারোক্তি দিয়ে দিয়েছে। এজন্যই বলছি বরুণ মার্মার কেসটাও একটা ওপেন অ্যান্ড শাট কেস।
বরুণ মার্মার কেসে কাউকে ধরেছেন ?
আজই তো হলো। ধরে ফেলব, আপা, ধরে ফেলব। আপনাকে যে কেন পাঠাল সেটাই আমি বুঝতে পারছি না। আমি একটা কথা বলি ?
জি, বলুন।
এই কেস নিয়ে তো তেমন কিছু করার নেই। কক্সবাজারে যখন এসেছেন, বরং ইনানী বিচ, হিমছড়িটা ঘুরে দেখুন। আপনি চাইলে আমি সেন্ট মার্টিনস যাওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারি। সেন্ট মার্টিনসে কিন্তু এখন যে কেউ চাইলেই যখন-তখন যেতে পারে না, পারমিশন লাগে।
বরুণ মার্মার হত্যাকে আপনি যত ফেলনা ভাবছেন, সরকার তত ফেলনা ভাবছে না। এ কারণে সিআইডি হেড অফিস আমাকে তাড়াহুড়ো করে পাঠিয়েছে। কোনো কিছু ধরে না নিয়ে আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তদন্ত করতে হবে। অ্যাজ ফার অ্যাজ আই অ্যাম কনসার্নড, দ্য কেস ইজ ওপেন। এটা সমাধান না করে সেন্ট মার্টিনস কিংবা হিমছড়ি যাওয়ার কথা ভাবছি না সোমেন সাহেব।
সোমেন সমাদ্দার নিভু নিভু কণ্ঠে বললেন, অবশ্যই আপা, আপনি যা ভালো মনে করেন। যে-কোনো হেল্প লাগলে আমরা তো আছি।
ধন্যবাদ।
তাহলে এখন কোথায় যাবেন ? ক্রাইম সিনে নাকি হোটেলে ?
আগে ক্রাইম সিনে চলুন। কাইন্ডলি আমার লাগেজটা হোটেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।
লাবণী পয়েন্ট সমুদ্রসৈকতে অপরাধস্থল টেপ দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো এটা কোনো নির্জন এলাকা না। বরং লাবণী পয়েন্টেই সবচেয়ে বেশি লোক বেড়াতে আসে। এত লোকের চাপে ক্রাইম সিন ঠিক রাখতে গিয়ে পাঁচজন পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে। ওসি সোমেন সমাদ্দার সানগ্লাস পরতে পরতে বললেন, আপা, আমাদের ধর্মে বরুণ হলেন সমুদ্রের দেবতা। আর বরুণ মার্মার মৃতদেহ পাওয়া গেল কোথায় ? একদম সমুদ্রের কোলে, বেলাভূমিতে!
লাবণি বিরক্ত মুখে সোমেন সমাদ্দারের দিকে তাকাতেই উনি সিরিয়াস হয়ে বললেন, আপা, আপনি দুপুরের ভেতর চলে আসায় ভালো হয়েছে। এখানে বিকেলের জোয়ারটা স্ট্রং হয়। ক্রাইম সিন পর্যন্ত পানি এলে আলামত মুছে যাবে।
সেটা বিবেচনা করেই এত তাড়াতাড়ি আসতে হলো।
টেপ দিয়ে ঘেরা জায়গাটায় এসে লাবণি দেখল বালুতে রক্ত শুষে গেলেও রক্তাভ আভাসটা রয়ে গেছে। সোমেন সমাদ্দার বললেন, ডেডবডি মর্গে নেয়া হয়েছে, আপা। ভিক্টিমের সব পার্সোনাল আইটেম আমরা সিকিউর করেছি। বালুর আলামতও ফরেন্সিকের জন্য পাঠিয়েছি।
লাবণি এই প্রথম সোমেন সমাদ্দারকে নিয়ে একটু প্রসন্ন হয়ে বলল, বাহ, সব তো মেথডিক্যালি করেছেন। ফটোডকুমেন্টেশন কি করা হয়েছে ?
অবশ্যই আপা। আর আপনি জিজ্ঞেস করার আগেই বলে রাখি, আমরা এই স্পটে পায়ের ছাপের কিছু কাস্টিংও করেছি।
কাস্টিং কি স্প্রে করে করেছেন ?
অবশ্যই।
ব্লাড স্যাম্পল কি শুধু সারফেস থেকে নিয়েছেন ?
ওপরে স্লাইস কাটিং করেছি, তারপর নিচে ছয় ইঞ্চি ডিপ কলাম নিয়েছি। কক্সবাজারে দশ বছর ধরে কাজ করছি আপা। বালুর আলামত হ্যান্ডলিংয়ে এক্সপার্ট হয়ে গেছি।
ভেরি ইম্প্রেসিভ। অনেক কাজ এগিয়ে রেখেছেন।
লাবণি নিজেও ক্রাইম সিনের অনেকগুলো ছবি তুলল। তারপর অবাক হয়ে ভাবল, সমুদ্রের বিশালতার কাছে এসে মানুষের মন উদার হওয়ার কথা, তাহলে কীভাবে মানুষ সমুদ্রসৈকতে হত্যার মতো খারাপ কাজ করতে পারে! ওসি সোমেন সমাদ্দার কাছের দোকান থেকে দু-কাপ কফি এনে বললেন, আপা, কফি খান।
লাবণি কফির কাপে চুমুক দিতেই অতিরিক্ত চিনির কারণে মুখের ভেতরটা ঝিমঝিম করে উঠল। সোমেন সমাদ্দার বললেন, এখন কী করবেন ? মর্গে গিয়ে ডেডবডি দেখবেন নাকি হোটেলে যাবেন ?
ফর্মালিটির জন্য আগে একবার মর্গ ঘুরে আসাই ভালো।
আচ্ছা, চলুন তাহলে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে বিকেল তিনটা বেজে গেল। এই সপ্তাহটা লাবণির মর্গে মর্গেই কেটে যাচ্ছে। মৃতদেহগুলো জানান দিচ্ছে মানুষের জীবন কত নশ্বর, কত তুচ্ছ। ফ্রিজারের ট্রে থেকে বরুণ মার্মার মরদেহ বের করতেই লাবণি দেখল তার গলায় ক্ষুরের গভীর এবং লম্বা ক্ষত। লাবণি বলল, ফ্যামিলিকে জানানো হয়েছে ?
ওনার মামা কক্সবাজারেই থাকেন। সকালে খবর পেয়ে এসেছিলেন। বরুণ মার্মার স্ত্রী ঢাকা থেকে আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু টিকিট পান নি। আমি শিওর না উনি আসবেন কি আসবেন না। জানেন, খুব খারাপ লাগছে। শুনলাম ভদ্রলোকের ছয় বছরের একটা মেয়ে আছে। ওদের পুরো জীবনটা বদলে গেল।
লাবণি ভাবল, হঠাৎ ঝড় এসে মানুষের জীবন কখন কীভাবে পুরো বদলে দেয় তা কেউ কখনো আগে থেকে জানতে পারে না। সুজিত খুন হওয়ার পর ওর নিজের জীবনও হঠাৎ বদলে গিয়েছিল।
ুুঁ(চলবে)
Leave a Reply
Your identity will not be published.