বর্ষার সেই রাতটির কথা মনে পড়লেই এখনো বুকের ভেতর কোথাও যেন একটা অদ্ভুত শীতলতা নেমে আসে, যেন কালের গহ্বর থেকে কোনো ভেজা, অন্ধকার স্মৃতি ধীরে ধীরে উঠে এসে আবারও চারপাশকে ঢেকে দেয়। আকাশজুড়ে তখন মেঘের স্তূপ, দূরে দূরে বিদ্যুতের ক্ষীণ রেখা, আর আমাদের টিনের চালের ওপর বৃষ্টির একটানা, বিষণ্ন, প্রায় সম্মোহিত করে ফেলা শব্দ, যেন কেউ অদৃশ্য আঙুল দিয়ে সময়ের শরীরে টোকা মেরে চলেছে।
সেই রাতে আমরা সবাই জড়ো হয়েছিলাম ভোদু নানার ঘরে। ঘর বললে অবশ্য একটু বাড়িয়ে বলা হয়, আসলে আধা-পাকা একটা কামরা, দেয়ালের প্লাস্টার উঠতে বসেছে, কোনায় কোনায় স্যাঁতসেঁতে দাগ, আর মাঝখানে একটা পুরোনো টেবিল, যার ওপর রাখা কেরোসিনের বাতিটা হলদে কাঁপতে থাকা আলো ছড়িয়ে ঘরের প্রতিটি ছায়াকে আরও গভীর করে তুলছিল।
ভোদু নানা আমাদের গল্প-নানা। সেই ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাদের ভূতের গল্প বলে ভয় দেখিয়ে আসছেন। বয়স সত্তর পার হয়েছে হয়তো। পেটানো শরীর। গাভর্তি ঘামাচি সারাবছর বয়ে নিয়ে বেড়ান। এই কারণেই কিনা, প্রায় সময়ই খালি গায়ে থাকেন তিনি। এক কোণে পিঁড়ির ওপর বসে ছিলেন। তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে স্থির, যেন অনেক দূরের কিছু দেখছেন। হাতে নাসির বিড়ি, মাঝে মাঝে লম্বা টান দেন, তারপর ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে ছেড়ে দেন—আর ঠিক সেই সময়টাতেই তার মুখের চারপাশে ছায়াগুলো যেন নড়ে ওঠে। শক্ত চোয়ালের চারপাশের পেশিগুলো ফুলে ওঠে।
আমরা ছিলাম পাঁচ-ছয়জন—আমি, রাব্বানী, আমার চাচাতো বোন চামেলি, পাশের বাড়ির করিম কাকা (যিনি নাকি সবকিছুর যুক্তি খুঁজে পান), আর বৃদ্ধা হাজেরা খালা, যিনি ছোটবেলায় নাকি ‘অনেক কিছু’ দেখেছেন বলে দাবি করেন। তবে বাতাসের সেই অশরীরীর কথা মুখে বলতে চান না। বাইরে থেকে মাঝে মাঝে ভিজে কাঁথা গায়ে জড়িয়ে টুঁ মারছিলেন জসিম দারোয়ান—তার চোখে এক ধরনের কৌতূহলী ভয়, যা তিনি লুকাতে পারেন না।
আমরা অনেকক্ষণ ধরেই নানাকে অনুরোধ করছিলাম—
“নানা, একটা গল্প বলেন না...ওইরকম...ভয়ানক একটা...”
নানা প্রথমে চুপ ছিলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বিড়িতে টান দিলেন। আগুনটা লাল হয়ে উঠল।
তিনি ‘থাক!’ করে এক পাশে থুতু ছিটিয়ে দিলেন, যেন কোনো অদৃশ্য কিছুকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন।
তারপর নিচু, ভারী গলায় বললেন, “এই গল্পটা...তোরা শেষ পর্যন্ত শুনতে পারবি তো ?”
আমরা কেউ উত্তর দিলাম না।
কারণ তার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যা প্রশ্ন না—একটা সতর্কবার্তা। আমি টেবিলের গা ঘেঁষে বসি, যেন খারাপ অবস্থা হলে কারও অবলম্বন পাই।
“অনেক দিন আগের কথা...” নানা শুরু করলেন—
“বাংগাবাড়ি ইউনিয়নে শিশাটোলা গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে; ঠিক দামুসের কান্ধাতে একটা বাড়ি ছিল। এটাকে ঠিক বাড়ি কহাও যাবে না। একটামাত্র ঘর, আর রান্নাঘরের পাঞ্জরে ছোট্ট একটা খুপরি যেখানে কুটুম আসলে থাকত। তবে তোরঘে এই বাড়ির মতোন লয় গো...বাহির থাক্যা কিছুই বুঝা যাইতক না...কিন্তু রাত হইলেই...”
তিনি থামলেন।
বাতির আলোটা হালকা দুলে উঠল। আমাদের শ্রোতাদের মাঝে চামেলি ঢাকায় থাকে। সে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সব আঞ্চলিক শব্দ বোঝে না। গল্পের মাঝেই সে প্রশ্ন করে বসে। তখন গল্পের মজা নষ্ট হয়ে যায়। তাই আমাদের অনুরোধে নানা এবার যতটা সম্ভব শুদ্ধ ভাষায় গল্প শুরু করেন।
“...ওই বাড়ির ভেতর রাত হলেই অন্য কিছু জেগে উঠত।”
হাজেরা খালা চুপচাপ ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে ফিসফিস করে আমার গায়ের সাথে লেপ্টে এলেন।
করিম কাকা হালকা হেসে বললেন, “এমন কিছু হয় না...”—কিন্তু তার গলার আত্মবিশ্বাসটা পুরোপুরি দৃঢ় ছিল না।
ভোদু নানা বিরক্ত না হয়ে আবার শুরু করেন—“প্রথমে এক মহিলা টের পায়...”
নানা তার নিজের গালটা ছুঁয়ে দেখালেন— “রাতে ঘুমাইতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো—কেউ যেন তার গালে ঠান্ডা কিছু ছুঁইতে দিচ্ছে...খুব হালকা... কিন্তু অচেনা...”
চামেলি আমার হাত চেপে ধরল।
“সে ভাবল—হাওয়া। কিন্তু জানালা বন্ধ ছিল।”
বৃষ্টির শব্দ তখন যেন আরও জোরে কানে আসছিল। এক রাতে বাড়ির সবাই ভাত খেয়ে ঘরের মধ্যে বসে আছে।
মাটির কুপির তেল কখন যে শেষ হয়ে নিভে গেছে কেউ টেরই পায় নি। অন্ধকারেই পান সাজাতে ব্যস্ত করিমন বেওয়া। কিন্তু এক ঠান্ডা স্পর্শে তার পানের হাত স্থির হয়ে যায়। কে যেন তার কব্জির ওপর অন্ধকারেই একটা শিতল স্পর্শ দিয়ে যায়। পানের থালা ঝনঝনিয়ে নিচে পড়ে যায় তার হাত থেকে।
নানার চোখ ধীরে ধীরে করিম কাকার দিকে গেল।
করিমন বেওয়া রাতের অন্ধকার ঠেলে কানের কাছে শব্দ শুনতে পায়... একটা গুঞ্জন...না পোকা, না মানুষ...যেন খুব কাছে এসে দাঁড়ায়...আবার মুহূর্তের মধ্যেই দূরে চলে যায়...একেবারে ঘরের অন্য কোণে!
ভোদু নানা এবার নিজেই “ঝ—...” করে একটা শব্দ করলেন—এতটাই সূক্ষ্ম যে, মনে হলো শব্দটা কানের ভেতর দিয়ে ঢুকে মাথার মধ্যে একটা স্থায়ী অনুরণন তৈরি করে গেল।
করিম কাকা এবার চুপ হয়ে গেলেন।
“একটা দশ-এগারো বছরের স্কুলপড়ুয়া নাতি ছিল করিমনের। সে একদিন তার নানিকে ভয় পেয়ে বলেছিল, কে যেন রাতের বেলা তার কানের কাছে এসে মিহি সুরে ডাকে। আমার গায়ে হাত দেয়। নাতির সে কথা এই নিকষ কালো রাতে মনে পড়ে তার।”
নানা এবার রাব্বানীর দিকে তাকালেন।
রাব্বানী অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল।
“নাতির শরীরে লাল দাগ...একটার পর একটা।”
হাজেরা খালা এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেলেন।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে জসিম দারোয়ান ঢুকে বলল, “নানা, বাইরে দাঁড়াইলে কেমন জানি লাগে...মনে হয় কেউ ঘুরতেছে...”
নানা তার দিকে তাকিয়ে রইলেন দীর্ঘক্ষণ।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “তোর ভয় অমূলক নয় রে জসিম। তারা প্রত্যেক বাড়িতেই আসে। সব সময়ই আসে। এই ঘরেও ঘাপটি মেরে আছে—আমি বিলক্ষণ টের পাচ্ছি। তবে তোরা ভয় পাবি না, আমি থাকা অবধি তোরা নিশ্চিন্ত থাক।” নানা এবার বিড়িতে জোরে জোরে টান মারেন। মুখভর্তি করে ধোঁয়া ছাড়তে থাকেন। ধোঁয়ায় ঘর আচ্ছন্ন হয়ে যায়। আমরা কাশতে থাকি।
নানা এবার একগাল হেসে বলেন, “এবার আর ভয় নাই। তারা ধোঁয়া কোনোমতেই সইতে পারে না।” এই মুহূর্তে ঘরের ভেতর যেন হঠাৎ ঠান্ডা একটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল, যদিও সব দরজা-জানালা বন্ধ।
আমাদের ভয়ে মুখ বন্ধ হয়ে আছে। এই ঘরেই এখন তারা আছেন!
“একদিন এক মেহমান এসেছিল করিমনের বাড়িতে...”
নানা আবার বিড়িতে টান দিলেন। “জোর মসজিদের ইমাম সাহেব, রাহাত হুজুর।”
“লোকটা খুব বিদ্বান... ভূতে বিশ্বাস করেন না। সবাই বলে, রাহাত হুজুরের জিন সাধন করা আছে। রাতের অশরীরী আত্মা তার কাছে ভিড়ে না।...কিন্তু সেই রাত্রে খাবারের কিছুক্ষণ পর তিনিও থেমে গেলেন...” নানা হঠাৎ সামনে ঝুঁকে এলেন—
“হুজুর চোখ বন্ধ করে বললেন, করিমন বুবু, ‘আপনাদের এখানে... কেউ আছে’ ?”
আমরা সবাই নিশ্বাস বন্ধ করে শুনছি।
“তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাহাত হুজুর নিজের গালে চাপড় মারলেন!”
চাপ!
নানা নিজের গালে জোরে শব্দ করে আমাদের বোঝালেন।
চামেলি চমকে উঠে প্রায় কেঁদে ফেলল।
“কিছুই ধরতে পারলেন না হুজুর...”
নানা ফিসফিস করে বললেন—“ও দেখা যায় না...শুধু কাছে আসে...খুব কাছে...”
নানার কণ্ঠস্বর হঠাৎ বদলে গেছে। যেন আমাদের চারপাশে ঘুরে ঘুরে অন্যলোক কথা বলছেন।
“তারপর...”
নানা ধীরে ধীরে হাত তুললেন।
“রাহাত হুজুর ঠিক করলেন—ওরে যে করেই হোক ধরবেনই...। তা ছাড়া তার এতদিনের দীক্ষা মিথ্যা হয়ে যাবে যে!”
বাতির আলো কাঁপছে।
বৃষ্টির শব্দ যেন দূরে সরে গেছে।
“রাত... গভীর...
সবাই ঘুমায়...”
তিনি ফিসফিস করে বলছেন—
“হঠাৎ... সেই শব্দ...”
আবার সেই গুঞ্জন—
“ঝ...”
আমার সত্যিই মনে হচ্ছিল, ঘরের ভেতরেই কিছু একটা উড়ছে।
“ও কাছে আসছে এবার!...”
নানা ধীরে ধীরে হাত বাড়ালেন—“আরও কাছে...কানের পাশে...”
আমরা কেউ নড়ছি না। সময় যেন থেমে গেছে।
হঠাৎ—চপ্পড়!
নানা নিজের হাতের তালুতে সজোরে আঘাত করলেন।
আমরা সবাই চমকে উঠলাম।
নানা ধীরে ধীরে হাতটা সামনে ধরলেন।
তার ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি।
তিনি বললেন—“এই যে এতদিনের অশরীরী আতঙ্ক...যে রাতে রাতে মানুষের ঘুম, রক্ত আর শান্তি খেয়ে যাচ্ছিল...”
তিনি আরেকটা টান দিলেন বিড়িতে—“এই যে, এই আত্মাই আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। এটা অশরীরী নয়, একেবারে শরীরী আত্মা!”
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে এসেছে।
“এইডা আছিল...”
ভোদু নানা একটু থামলেন এবার—
আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে তিনি হাতের তালু সবার সামনে প্রসারিত করলেন। আমরা স্পষ্ট দেখলাম, নানার হাতের তালুতে চ্যাপ্টা হয়ে লেগে আছে এক বিরাট মশা!
ঘরের ভেতর হঠাৎ হাসির রোল উঠল—করিম কাকা জোরে হেসে বললেন, “এইডাই নাকি ভূত!”
কিন্তু হাজেরা খালা চুপ।
জসিম দারোয়ান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। রাব্বানি ভয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে দিয়েছিল। আর আমি...
সেদিন রাতে ঘুমাতে গিয়ে যখন কানের পাশে হালকা সেই গুঞ্জনটা শুনছিলাম—মনে হচ্ছিল, ভোদু নানার গল্পটা হয়তো কেবল গল্প না...বরং এমন এক সত্য, যা প্রতিনিয়ত আমাদের ভয়ের মধ্যেই রাখে।
Leave a Reply
Your identity will not be published.