উত্তম স্মরণে পঙক্তিমালা

উত্তম স্মরণে পঙক্তিমালা

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ

উত্তমকুমার ক্রশরোড

 

ভালোবাসার বদলে ঈর্ষা পেটে নিয়ে

উত্তমকুমারকে দেখা, এক শিহরণ, যখন

সুচিত্রা সেনকে চোখের ওপর রেখে আবিষ্টমনে বলে উঠত, রমা!

 

তখন বুঝে যাই বাঙালি ঘরে উত্তমকুমার এতটাই মহানায়ক,

যতটা বুকে বিপ্লব থাকে আগুনের।

ততটাই উত্তমহাসিতে বাঙালি রমণীরা বিকেলের নরম আলো হয়ে উড়ত কলকাতার রুপোলি আকাশে।

 

শতাব্দী ধরে কতবার তার চোখে জ্বলে

হারানো দিনের নীল আলো,

কতবার তার সংলাপেই কত নারীর

গোপন তাকে রাখা তালা গেছে খুলে।

 

কতবার পুরুষেরা চায়ের কাপে

ঈর্ষা লুকিয়ে রেখে পর্দা নামলেই বলেছে—

ইশ, আরেকবার হোক!

 

কতবার উত্তমকুমারের সাথে সুচিত্রা সেনের আলিঙ্গনে আমিও কতবার হারিয়েছি,

কতবার চোখের মাঝে বলে গেছি, রমা!

প্রেম মানে শুধু কাছে পাওয়া নয়,

দূর থেকেও তোমাকে উচ্চারণ করা বহুবার।

 

বহুবার পুরোনো গ্রামোফোনের মায়াবী গানে

অথবা শতকের ক্রশরোডে দাঁড়িয়ে বুঝি—

বাঙালির ভালোবাসার ভেতর অনন্তকাল

মহানায়ক উত্তমকুমারের সংলাপে আমিও মুখোমুখি সুচিত্রা সেনের, আবেশে একবার!

 

 

 

শান্তা মারিয়া

উত্তমকুমার

 

ষাটের দশকে অকাল বিধবা মাতামহী

সাদা শাড়ির ভাঁজে নিজের সকল আকাক্সক্ষাকে সযত্নে মুড়ে

সসংকোচে কোনো নিজস্ব বিকেলে

ম্যাটিনি শোর পর্দায় উত্তমকুমারের পৌরুষদীপ্ত অবয়বে

ছুড়ে দিতেন লাজুক দীর্ঘশ্বাস।

এবং এখনো স্মৃতিভ্রষ্ট বৃদ্ধা মায়ের ঘোলাটে চোখে

ঝলসে ওঠে মহানায়কের অরুণ-আভার হাসি

একান্ত উত্তম, সাদাকালো ভালোবাসা, টিভির মোহন বাক্সে

মধ্যবিত্ত এক আটপৌরে নারীর একমাত্র অবন্ধিত প্রেমে স্বামীর প্রশ্রয়

কখনো শ্রীকান্ত, কখনো মহিম হয়ে ফিরে আসে।

 

আশি আর নব্বই দশকে

‘পথে হলো দেরী’, কিংবা ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’ ছুঁয়ে

কিশোর প্রেমের স্বপ্নে এসেছিলেন কি দূরাগত নক্ষত্রের সিঁড়ি বেয়ে ?

অন্তত এটুকু জানি, তরুণ বেলায় আমি কোনোদিন

সুচিত্রা, সুপ্রিয়া, সাবিত্রী, মাধবী হতে চাই নি ভুলেও

হলেনই-বা উত্তম, কোনো পুরুষের প্রতি

অমন সর্বত্যাগী ন্যাকামণি প্রেম আমার কুষ্ঠিতে নেই।

তবু এই অর্ধশতক ধরে বোনা

মধ্যবয়সের যাবতীয় সাফল্যের চাদর সরিয়ে

খুব নিভৃত নির্জনে ধুলোপড়া গ্রহে

উত্তমকুমার হয়তো-বা হাতছানি দেন।

অকস্মাৎ মনে হয়, ছিল বটে সে এক পুরুষ

যাকে চাওয়া যেত সর্বাত্মক রক্ত কণিকায়,

ষোলো সহস্র গোপিনীকে পরাজিত করে এভারেস্ট চূড়ায়

থাকত আমার নাম

সে নায়ক আর কেউ নয়

একমাত্র উত্তমকুমার।

Leave a Reply

Your identity will not be published.