স্মৃতি জাগানিয়া জয়শ্রী

স্মৃতি জাগানিয়া জয়শ্রী

[গত ১২ জানুয়ারি লন্ডনে না-ফেরার দেশে যাত্রা করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের স্বনামধন্য অভিনেত্রী জয়শ্রী রায় তথা জয়শ্রী কবির। তাঁর ছেলে লেনিন জানিয়েছেন, জয়শ্রী নানা ধরনের রোগে ভুগছিলেন।

২০০৩ সালের মার্চে জয়শ্রীর মুখোমুখি হয়েছিলেন পাক্ষিক ‘অন্যদিন’-এর মোমিন রহমান ও কাজল রশীদ শাহীন। জয়শ্রী কবিরের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ হিসেবে সেই সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে ধরা হলো।]

 

জয়শ্রী। স্মৃতি জাগানিয়া একটি নাম।

এই নামের অধিকারিণী স্মৃতিপটে ভেসে উঠলে আমাদের মনে পড়ে যায় যে, একদা তিনি হয়েছিলেন ‘মিস ক্যালকাটা’; বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে চলচ্চিত্রের আলো-আঁধারের জগতে এসেছিলেন; সমরেশ বসুর বিতর্কিত উপন্যাস ‘বিবর’-এর মঞ্চ-রূপায়ণে তিনি নায়িকা নীতার চরিত্রে অভিনয় করে চারদিকে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন।

আমাদের মনে পড়ে যায়, ‘সূর্যকন্যা’ ছবিতে অভিনয়ের সূত্রে জয়শ্রী এদেশে আসেন এবং পরে পরিচালক আলমগীর কবিরকে বিয়ে করে এদেশেই থেকে যান।

এক যুগেরও বেশি সময় জয়শ্রী এদেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। প্রথম থেকেই জয়শ্রী ছিলেন ইমেজ সচেতন; এক বিশেষ শ্রেণির দর্শকদের কাছে প্রিয় নাম। মার্জিত রুচিসম্পন্ন জয়শ্রী সুনির্বাচিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘রূপালি সৈকতে’, ‘পুরস্কার’, ‘মোহনা’—জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পমানসম্পন্ন এইসব ছবিতে যেমন জয়শ্রী অভিনয় করেন পাশাপাশি ‘শহর থেকে দূরে’, ‘দেনা পাওনা’, ‘নালিশ’-এর মতো মূলধারার চলচ্চিত্রেও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। চমৎকার অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে জয়শ্রী বাচসাস পুরস্কার পেয়েছেন।

আমাদের চলচ্চিত্রের দিগন্তে একদা স্বতন্ত্র মর্যাদায় জ্বলজ্বল করা সেই তারকা-অভিনেত্রী জয়শ্রী। যিনি এখন বসবাস করছেন লন্ডনে। এক যুগ পর আবার এসেছিলেন বাংলাদেশে। উঠেছিলেন প্রয়াত আলমগীর কবিরের ভাগ্নে চিত্রশিল্পী-নির্মাতা খালেদ মাহমুদ মিঠুর ধানমন্ডিস্থ অ্যাপার্টমেন্টে।

মিঠুর অ্যাপার্টমেন্টেই একদিন সন্ধ্যায় জয়শ্রীর মুখোমুখি হয় অন্যদিন। অন্যদিন-এর আহ্বানে ফেলে আসা জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করেন জয়শ্রী। স্মৃতির পাখিরা ভিড় জমায় তাঁর মনের আকাশে।

নস্টালজিক জয়শ্রীর ফেলে আসা দিনগুলোর কথাই তুলে ধরা হলো এখানে।

 

মোমিন রহমান : জয়শ্রী, আমরা আপনার জীবনের কথা শুরু থেকে জানতে চাই। আপনার পরিবার প্রসঙ্গে কিছু বলুন।

জয়শ্রী কবির : আমার জন্ম কলকাতায় ১৯৫২'র ২২ জুন। বাবা অমলেন্দু দাশগুপ্ত ছিলেন সেসময়ের একজন বিখ্যাত সাংবাদিক। সাংবাদিকতায় ক্ষুরধার লেখনী শক্তি বলতে যা বোঝায় তা ছিল বাবার মধ্যে।

আমার বাবা-মা দুজনেই ছিলেন চাটগাঁয়ের লোক। মা শান্তি দাশগুপ্ত বার্মা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিস্ট্রিতে মাস্টার্স করেন।

মা কেন্দ্র সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী পদে চাকরি করতেন। আমাদের ‘নিরুপমা প্রিন্টিং হাউস’ নামে একটি পাবলিশিং হাউস ছিল। সেখান থেকে বিখ্যাত লেখকদের গ্রন্থাদি প্রকাশের পাশাপাশি পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হতো। বাবা ’৮০ সালে মারা যাওয়ার পর মা-র পক্ষে একা পাবলিশিং হাউসটি পরিচালনা করা সম্ভব হয় নি। আমরা চার বোন, আমাদের কোনো ভাই নেই। আমি সবার বড়। আমার এক বোন সুমিতা ‘মহানায়ক’ ছবিতে অভিনয় করেছিল। বোনেরা এখন নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত।

মোমিন রহমান : আপনি তো ১৯৬৮ সালে মিস ক্যালকাটা হয়েছিলেন। এ ব্যাপারে কিছু বলুন।

জয়শ্রী কবির : এ ব্যাপারে আসলে বলার মতো কিছু নেই। জাস্ট জোকস করতে গিয়ে সিলেক্ট হয়ে গেলাম। আমি খুব বাবা-ভক্ত ছিলাম। বাবা আমার বন্ধু, অভিভাবক দুটোই ছিলেন। আমি বাবাকে বললাম ‘মিস ক্যালকাটা’ অনুষ্ঠানটা দেখতে যাব। অন্তত হেভি একটা ডিনার খাওয়াতে হবে। তখন আমার বয়স ১৬। কনটেস্টটা ছিল ১৮-এর বেশি বয়সীদের জন্য। তখন অলরেডি প্রাথমিক সিলেকশন হয়ে গেছে। আমি বাবাকে বললাম, আমি প্রতিযোগিতাতে অংশগ্রহণ করব।

বাবা তো হেসেই উড়িয়ে দেয় আর কী! এরকম জোকস করতে গিয়েই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি এবং মিস ক্যালকাটা নির্বাচিত হই। আমিই সম্ভবত প্রথম বাঙালি মেয়ে যে মিস ক্যালকাটা নির্বাচিত হই। বিষয়টি চারদিকে বেশ হৈচৈ ফেলে দেয়। মিডিয়াতেও ব্যাপক লেখালেখি হয়। এই লেখালেখির সুবাদে হয়তো মানিকদা (সত্যজিৎ রায়) আমার সম্পর্কে জেনে যায়। উনি তাঁর এক বন্ধুকে বললেন, অমল বাবুকে একটু বলো তো, আমি মেয়েটা সম্পর্কে এত শুনছি। আমি ওকে একটু দেখতে চাই।

বাবাকে নিয়ে মানিকদা'র সঙ্গে দেখা করতে যাই। মানিকদা তখন ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর কাজ করছিলেন। ওনার সঙ্গে দেখা হলো, কথা হলো এই পর্যন্তই। ঠিক একবছর পর মানিকদা’ ফোন করলেন এবং বললেন, আমি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ নামে একটি ছবি করছি, জয়শ্রীকে মেইন চরিত্রটা করতে হবে। এই বিষয়টি আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মিডিয়াতে কাজ করব—এই বিষয়টা আমার মাথায় কখনোই ছিল না। আমার ইচ্ছে ছিল বাইরে জার্নালিজম পড়তে যাব। এডুকেশনের ওপর পারিবারিকভাবেই আমার ঝোঁকটা বেশি ছিল। সত্যজিতদা’র ডাক শুনে বাবা বললেন, যে-কোনো প্রফেশন তুমি করতে পারো। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে সেটা যেন সিনসিয়ারলি হয় এবং কমিটমেন্টের জায়গাটি যেন ঠিক থাকে।

মোমিন রহমান : সত্যজিৎ বাবুর ছবিতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতাটা বলুন।

জয়শ্রী কবির : ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। আমার অভিনয়ের কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না। তবে খুব ছোটবেলা থেকে নাচ প্রাকটিস করে এসেছি। আমি বেঙ্গল মিউজিক কলেজ থেকে ক্ল্যাসিকেল ডান্সের ওপর গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছি। এসবের জন্য স্টেজ পারফরমেন্সের যে অভিজ্ঞতাটা থাকা প্রয়োজন সেটা আমার ছিল। আর ক্যামেরা-ভীতির কথা যদি বলেন, তাহলে একটা সিগনিফিকেন্ট ঘটনার কথা বলা যায়, প্রথম দিনের শুটিংয়ের ইনট্রোডাকশন শটটা ছিল এরকম—একটা অন্ধকার বাড়ি। ফিউজ জ্বলে গেছে। মেয়েটি ফিউজ লাগাতে পারছে না। রাস্তা থেকে একটি ছেলেকে ডেকে সে ফিউজ সারানোর কথা বলে। ছেলেটি ফার্স্ট ম্যাচ জ্বালায়। আলোতে মেয়েটির মুখে ধরা পড়ে। এটিই ছিল প্রথম দিনের প্রথম শট। আমি শটটা দিলাম। মানিকদা বললেন, খুব ভালো হয়েছে। আচ্ছা তাহলে আর একটি শট করি। আমার কাছে মনে হলো, হয়তো প্রসেসটা এরকম। মানিকদা পরপর সাত-আটটা শট নিলেন এবং প্রত্যেকটিতেই বললেন, খুব ভালো হয়েছে। আমরা দেখি, যেটা সবচে' বেশি ভালো হবে, সেটাই রেখে দেব। এভাবে দিনের পর দিন শুটিং চলতে থাকল। সবাই বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। ফিল্মের পরিবেশের সঙ্গেও বেশ খাপ খাইয়ে নিয়েছি। জগতটাকে তখন আর অচেনা মনে হয় না। এই অবস্থায় ১০-১২ দিনের মাথায় মানিকদা আমাকে বললেন, জয়শ্রী, মনে আছে—প্রথমদিনের ওই প্রথম শটটির কথা ? আমি বললাম, হ্যাঁ, মনে আছে। জয়শ্রী, আমরা ওই শটটি আজ আবার নেব। অথচ প্রথমদিনের প্রথম শটে মানিকদা যদি বলতেন, হয় নি, ভালো হয় নি। তাহলে আর কোনোদিন আমি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতাম না। আর কোনোদিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান হতো না। এই যে ক্যামেরার ভয় ভেঙে গেল, সেদিন থেকে আজোবধি ক্যামেরা আমার সবচে’ প্রিয় বন্ধু। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে আমি পেছনের সবকিছু ভুলে যাই। সেখানে হাজার লোক কিংবা একজন লোক দাঁড়িয়ে থাকলেও আমার কিছুই যায় আসে না। এটা শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, আমি যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাদের ভেতরেও এটা লক্ষ করেছি। উত্তমকুমার, সৌমিত্র মুখোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক—সবার কাছেই ক্যামেরা বেস্ট ফ্রেন্ডের মতো।

মানিকদার মতো বড় মাপের পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছি বলে, তাঁর গাইডেন্সটা পেয়েছি বলেই আমার চলার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা আসে নি। বাংলাদেশের অনেকেই হয়তো আমার কলকাতার ব্যাকগ্রাউন্ডটা ভালোভাবে জানে না। অথচ কলকাতাতে আমি অনেক বেশি কাজ করেছি। মেজর ছবি করেছি ১৮টির মতো। উত্তমদা’র সাথে ছবি করেছি ৩টি; সৌমিত্র, রঞ্জিতসহ কয়েকজনের সঙ্গে কাজ করেছি।

মোমিন রহমান : কলকাতায় আপনার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবির কথা বলুন।

জয়শ্রী কবির : উল্লেখযোগ্য ছবির কথা প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয় ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র কথা। এছাড়া আজকের নায়ক, পিকনিক, একদিন সূর্য, সব্যসাচী, এক যে ছিল বাঘ।

কাজল রশীদ শাহীন : মঞ্চেও আপনি কাজ করছেন বলে আমরা জানি। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন কি ?

জয়শ্রী কবির : হ্যাঁ, আমি শুধু চলচ্চিত্রেই অভিনয় করি নি, কলকাতার মঞ্চেও কাজ করেছি। সমরেশ বসু’র বিখ্যাত উপন্যাস ‘বিবর’ রবি ঘোষের নির্দেশনায় আমরা মঞ্চায়ন করি। আমি নীতার চরিত্রে অভিনয় করি। আমার বিপরীতে নায়ক চরিত্রে ছিল শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। ‘বিবর’ সেই সময়ের আলোচিত মঞ্চ-নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম। যার হাজার রজনী পর্যন্ত মঞ্চায়ন হয়েছে। ‘বিবর’-এ অসিত বরণ, চিন্ময়, গীতা দে প্রমুখ অভিনয় করেছেন। নাটকে আমিই ছিলাম সবচেয়ে কমবয়সী অভিনেত্রী এবং যার কোনো মঞ্চনাটকে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। মঞ্চের জয়শ্রীকে তৈরি করেছে রবি ঘোষ, আমার প্রিয় রবিদা।

মোমিন রহমান : ‘বিবর’-এ একটি ক্যাবারে ডান্স ছিল এবং অভিযোগ উঠেছিল মঞ্চনাটকে কমার্শিয়াল দৃশ্য রাখা হয়েছে।

জয়শ্রী কবির : আসলে ওটি ক্যাবারে ডান্স-এর দৃশ্য ছিল না। বলা যায়, ‘মডার্ন ডান্স’-এর একটি দৃশ্য ছিল।... আমি চলে আসার পর ‘বিবর’-এর কয়েকটি মঞ্চায়ন হয়। কিন্তু নীতার চরিত্রে দর্শকরা অন্যকে গ্রহণ না করায় মঞ্চায়ন বন্ধ হয়ে যায়। এবং আজও ‘বিবর’ মঞ্চায়ন হয় নি। তবে ‘বিবর’ই আমার একমাত্র মঞ্চনাটক।

কাজল রশীদ শাহীন : সত্যজিৎ রায় ছাড়া আর কোনো পরিচালক আপনার অভিনয়শৈলীকে প্রভাবিত করেছেন ?

জয়শ্রী কবির : এটা তো সেভাবে বলা মুশকিল। এক-একজন পরিচালক এক-একভাবে কাজ করেন, করতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন। মানিকদা’র যে বিষয়টি ছিল তা হলো, তিনি চরিত্রগুলো বেছে নিতেন এমনভাবে যে, সেই চরিত্রে নতুন করে আর অভিনয় করতে হতো না। ধৃতিমানকে ৫০০ ছেলে অডিশন দেওয়ার পর খুঁজে বের করেছিলেন। মানিকদা তো ফিল্মের সকল বিষয় জানতেন। তিনি যেহেতু আর্টিস্ট ছিলেন সেহেতু টোটাল বিষয় মুহূর্তে স্কেচ করে ফেলতেন। সব বিষয়ে নির্দিষ্ট লোকজন থাকার পরেও মানিকদা সবকিছুই করতেন। মানিকদা সম্পর্কে এককথায় বলা যায়—হি ওয়াজ এ টোটাল ফিল্ম মেকার। মানিকদা’র মতো করে যদি কাউকে খুঁজে নিতে হয়, তাহলে অবশ্যই কবিরের (আলমগীর কবির) নাম বলতে হয়। এ ধরনের পরিচালকরা আর্টিস্ট দেখেই বুঝতেন এর দ্বারা কী ধরনের কাজ করানো যাবে। কতটুকু কাজ আদায় করা সম্ভব হবে। এবং ওই আর্টিস্টের লিমিটেশনটাই-বা কোথায় এবং উত্তরণ সম্ভব কীভাবে। সেই সময় আমাদের টিমওয়ার্কটা খুব ভালো ছিল। এখানে আনোয়ার ভাই. বুলবুল এদের সঙ্গে অনেক কাজ করেছি।

আমার কাছে প্রত্যেক পরিচালকই গুরুত্বপূর্ণ। দু-একজনের নাম বলে সেটা বোঝানো সম্ভব নয়। আর এক একজনের কাজ একেক রকম। যেমন, কবিরের কোনো স্ক্রিপ্ট থাকত না। ও সকালবেলা শুটিংয়ে বসে কী করবে তার একটি ছক তৈরি করত এবং শুটিং শেষ হওয়ার পর এডিটিং টেবিলে গিয়ে গাঁথুনিটা তৈরি করত। গল্প বোনা হতো। আর মানিকদা ছিলেন এর পুরো উল্টো। মানিকদা পুরোটা আগে রাইট-আপ করে নিতেন। ইভেন এভরি শট ওয়াজ ডিটেইলস। কিরণদা, পিযুষদা প্রত্যেকেই একজন সাকসেসফুল পরিচালক। এঁরা আবার স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করতেন।

কাজল রশীদ শাহীন : মঞ্চ এবং চলচ্চিত্র এই দুইয়ের সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটা কেমন ?

জয়শ্রী কবির : দুটোই তো সম্পূর্ণ ডিফারেন্ট মাধ্যম। মঞ্চের ফিলিংসটা পুরোটাই আলাদা। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’—এই বাক্যটি শুধু মঞ্চেই হাজার রকম করে বলা সম্ভব। মঞ্চে প্রতিদিন নিজেকে তৈরি করা যায়। মঞ্চের অভিনয়ে নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার যে সুযোগ বিদ্যমান তেমনটি আর কোথাও নেই। আমার সৌভাগ্য যে, মঞ্চে আমি উৎপল দত্ত, রবি ঘোষের মতো লোকজনদের সান্নিধ্যে থেকে নিজেকে তৈরি করতে পেরেছি।

মোমিন রহমান : ‘বিবর’-এর মতো বাস্তববাদী একটি উপন্যাসের মঞ্চায়ন প্রসঙ্গে বলুন।

জয়শ্রী কবির : ‘বিবর’-এ আমার চরিত্রটা ছিল খুবই জটিল। আমি সেই সময়ের কলকাতার মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ের জীবনের নানাদিকগুলোকে তুলে ধরেছি। এবং একটি চরিত্রের মধ্যে অন্যান্য চরিত্রের বিভিন্ন দিকগুলোকেও ধারণ করতে হয়েছে। ‘বিবর’ দেখার পর সমরেশ বসু বলেছিলেন, “আমি যেটা কল্পনা করেছিলাম নীতার চরিত্রে যেটা হাওয়া উচিত ছিল এবং সেটা আমি চাওয়ার পরেও হয়তো বইয়ে প্রকাশ করতে পারি নি। সেটা জয়শ্রী তার অভিনয়ের মাধ্যমে নীতার চরিত্রে ফুটিয়ে তুলেছে।” মঞ্চের অভিনয় প্রসঙ্গে উৎপলদা আমাকে বলেছিলেন, “মঞ্চে তুমি হাসলে দর্শক হাসবে, তুমি কাঁদলে দর্শক কাঁদবে। যেদিন তুমি এই ডিকটেশনটা দিতে পারবে সেদিন তুমি বুঝবে, ইউ আর দ্য মাস্টার দ্য আর্ট অব স্টেজ” আর নীতার চরিত্রটিকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। এই নাটকটা যখন বন্ধ হয়ে গেল তখন প্রোডাকশন ম্যানেজারকে রবিদা বলেছিলেন, “এই স্ক্রিপ্টটা তোরা রেখে দে, নষ্ট করিস না। আজ থেকে ১৫/২০ বছর পরে স্ক্রিপ্টের মূল্যায়ন হবে।”

‘বিবর’ সম্পর্কে আমি কিছুদিন পূর্বে কলকাতার ওদের বলেছি যে, এই স্ক্রিপ্টটা নিয়ে ইতিপূর্বে ওরা যেভাবে কাজ করেছিল সেভাবে আমরা আবার করি। হয়তো সবাইকে একসঙ্গে পাব না। শুভেন্দুদা হয়তো করতে পারবে না। তবে ওরা যদি আবার সেভাবে কাজ করতে পারে তাহলে আমি কাজ করতে ইচ্ছুক। আমার তো মনে হয় একজন শিল্পীর কাছে মঞ্চে কাজ করাটা জরুরি, এখানে শিল্পীর উৎকর্ষতার সুযোগ থাকে।

কাজল রশীদ শাহীন : আপনি বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ দুই জায়গাতেই কাজ করেছেন। সেই সময়ে এখানকার কাজের পরিবেশ কেমন লেগেছিল আপনার ?

জয়শ্রী কবির : আলমগীর কবিরের ছবির কাজ যখন আমি করতে আসি, তখন এফডিসি’র বাইরে বেশিরভাগ কাজ করানো হয়েছিল। পূর্বাণী হোটেলে কাজ হয়েছে। কিংবা আউটডোরে কাজ হয়েছে। কাজ ছাড়া আমি হোটেলেই সারাক্ষণ থেকেছি। একদিন কি দু'দিন আমাকে প্রেসের লোকজনের মুখোমুখি করানো হয়েছে। শহর থেকে দূরে আউটডোর শুটিংয়ে যখন কাজ করেছি, তখন যেমন সবার সহযোগিতা পেয়েছি তেমনি ইনডোর শুটিংয়েও ইউনিটের সকলের সহযোগিতা পেয়েছি।

কাজল রশীদ শাহীন : আপনি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছিলেন কি ?

জয়শ্রী কবির : হ্যাঁ, আমি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছি। ছবির নাম ‘মোহনা’, পরিচালক ছিলেন আলমগীর কবির। আমি ও আমার এক বান্ধবী যৌথভাবে প্রযোজনার কাজটি করেছিলাম।

মোমিন রহমান : চলচ্চিত্রে অভিনয়, প্রযোজনা ছাড়া উল্লেখ করার মতো কিছু করেছেন কি ?

জয়শ্রী কবির : উল্লেখ করার মতো কি-না সেটা তো বলতে পারব না। তবে অনেক কিছুই করেছি। কেননা, ইউনিটের সব কাজকেই তখন আমরা নিজেদের কাজ বলে মনে করতাম। আমি কোরিওগ্রাফি করেছি, আমি সংগীতে কণ্ঠ দিয়েছি, কস্টিউম ডিজাইন করেছি। কবিরের ‘সীমানা পেরিয়ে’-র ওয়েস্টার্ন ডান্সটা আমার করা, পাহাড়ি মেয়ের ডান্সটাও আমার করা।

কাজল রশীদ শাহীন : আপনি তো এখন লন্ডনে অবস্থান করছেন। সেখানকার কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আপনি কি জড়িত।

জয়শ্রী কবির : আমি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। যেমন, ওখানে কবি নজরুল সেন্টার বলে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যারা মূলত নজরুলের ওপর বিভিন্ন রকমের কাজ করে থাকে। এছাড়া বাংলা ভাষায় যত আর্ট এন্ড কালচার রয়েছে সেখানকার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেগুলো তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। লোকাল গভর্মেন্ট ফান্ডের অর্থানুকূল্যে। বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থার গভর্নিং বডিতেও আমার অংশগ্রহণ রয়েছে। এসবের সঙ্গে আমি রয়েছি এ কারণে যে, এর মধ্য দিয়ে আমাদের আর্ট এন্ড কালচার-এর কন্ট্রিবিউশনটা সম্ভব হচ্ছে। যখন দেখব সম্ভব হচ্ছে না, তখন ছেড়ে দেব। একটি স্কুলের গভর্নিং বডির সঙ্গেও যুক্ত রয়েছি। আমি এশিয়ার প্রথম মেয়ে যে, লন্ডনের স্কুলের গভর্নিং বডির সিলেক্টেড মেম্বর। ডকুমেন্টারি ফিল্মের কাজের সঙ্গেও আমি জড়িত। সালমান রুশদী, তসলিমা নাসরিনের ওপর তৈরি ডকুমেন্টারিতে ভয়েস (কণ্ঠ) দেওয়ার পাশাপাশি আনুষঙ্গিক কাজও করতে হয়েছে।

মোমিন রহমান : প্রায় ১৩ বছর পর ঢাকায় এসে কেমন লাগছে আপনার ?

জয়শ্রী কবির : অবশ্যই খুব ভালো লাগছে। এত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে যে, ভালো লাগাটাই স্বাভাবিক। এফডিসি আমাকে একটি সংবর্ধনা জানিয়েছে। সেখানে আমাদের সময়কালের এবং আমাদের সিনিয়র-জুনিয়র অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়েছে।

সবার সঙ্গে দেখা করা তো সময়ের ব্যাপার। তাই মিঠুর (খালেদ মাহমুদ মিঠু) সঙ্গে আলাপ করে বাসাতেই ক’টি পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে একজায়গায় সবার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হলো। আহমেদ শরীফ, বুলবুল, হুমায়ূন ফরীদি, সুবর্ণা মুস্তাফা, আজিজুল হাকিম থেকে শুরু করে ফেরদৌস পর্যন্ত এসেছিল।

কাজল রশীদ শাহীন : দীর্ঘসময় বাইরে থাকাকালে কোনো বাংলাদেশি ছবি দেখেছেন কি ?

জয়শ্রী কবির : হ্যাঁ দেখেছি, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’। আর একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখেছি ‘ইতিহাস কন্যা’ নামে।

মোমিন রহমান : বর্তমান সময়ের সিনেমা না দেখলেও শুনেছেন নিশ্চয়। এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী ?

জয়শ্রী কবির : আমি সব সময়ই আশাবাদী। যদিও সকল দিক থেকে আমাকে শুধু নেগেটিভ দিকগুলো জানান হচ্ছে। কোথাও কোনো পজিটিভ কিছু হচ্ছে এমনটি কেন জানি আমাকে জানানো হচ্ছে না। তারপরেও আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি—জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্রের সুদিন আসবেই আসবে।

মোমিন রহমান : আপনি কি এখনো চলচ্চিত্রে কাজ করতে ইচ্ছুক ?

জয়শ্রী কবির : আমি করতে চাই একথা বলব না। তবে কাহিনি যদি সেরকম হয় এবং এমন পরিচালক যদি হয় যিনি ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’র জয়শ্রী’র যে ইমেজ সেই ইমেজ অক্ষুণ্ন রাখতে পারবেন তা হলে সে ধরনের কাজের অফার এলে আমি কাজ করব। মোট কথা সমন্বয়টা ঠিকমতো হলে আমি অবশ্যই কাজ করব। যদি কামব্যাক করতেই হয় তাহলে বেটার কামব্যাক নিশ্চিত করা জরুরি।

মোমিন রহমান : আগামী দিনগুলোর চিন্তা-ভাবনা সম্পর্কে বলুন।

জয়শ্রী কবির : যদি সম্ভব হয় তাহলে ডিরেকশনে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা আছে। সেট, মঞ্চ কিংবা চলচ্চিত্র দুটোর যে কোনো একটা হতে পারে। আর একটি জিনিস হতে পারে, সেটি হলো আমি গত ১২ বছর ইংলিশ লেকচারার ছিলাম হায়ার এডুকেশনের ওপর। ফলে এডুকেশনের মডেলটা, প্রসেসটা আমার ভালো জানা আছে। অতঃপর এই অভিজ্ঞতাটাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়—সেটি নিয়ে কিছু ভাবনা-চিন্তা রয়েছে। এবার এসে আমি অনেক কিছুই তো দেখে গেলাম। এখন দেখা যাক কী করা যায়। আর সত্যি কথা বলতে কী, আমার তো এপার বাংলা-ওপার বাংলার গত ১৩ বছরের বাস্তবতা, পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিযোজন ভালোভাবে জানা ছিল না। মিঠু যে এত ভালো কাজ করে—এটাই তো আমার জানা ছিল না। আমি মনে করি, মিঠু এখন আলমগীর কবিরের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। কবির ফিল্মে ছিল, মিঠু রয়েছে টিভি মিডিয়ায়। এক সময় হয়তো ও ফিল্মেই কাজ করবে।

কাজল রশীদ শাহীন : আপনার সন্তান লেনিন সম্পর্কে বলুন।

জয়শ্রী কবির : আমার ছেলেকে যখন এখান থেকে নিয়ে গেলাম তখন ওর ১০ বছর বয়স। বাবার মৃত্যু বাবুর জন্য একটি বড় রকমের ধাক্কা। বাবু খুব চুপচাপ। খুব শান্ত প্রকৃতির ছেলে। বাবু এডুকেশনে ভীষণ ভালো। স্কলারশিপ পেয়েছে। বিএসএসসি অনার্স কমপ্লিট করেছে ২০০১-এ, ইকোনোমিকস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টে। এখন সে আমেরিকান কো অপারেটিভ ব্যাংকে ফাইনানশিয়াল অ্যানালিস্ট রিপোর্টিংয়ের সঙ্গে সে কাজ করে। বাবু অসম্ভব স্ট্রাগল করে। এই মুহূর্তে বাবু এটা করছে। আই ডোন্ট নো, আজ থেকে পাঁচ বছর পর সে কী করবে। কবিরও তো প্রথমেই ফিল্মে কাজ করে নি। সে তো ইঞ্জিনিয়ার ছিল, পরে সাংবাদিকতা করেছে, তারপরে সে ফিল্মে ইন করেছে। ফলে বাবু সম্পর্কে এখনো কিছু বলার সময় আসে নি। কেননা ওর ভেতর স্পার্কটা তো রয়ে গেছে। এখনো টেকনিক্যালি ফিল্ম নিয়ে আলোচনা করলে বোঝা যায়, বাবু ইজ মাস্টার।

মোমিন রহমান : এখানে এসে কেমন লাগল আপনার ?

জয়শ্রী কবির : খুব ভালো লেগেছে। সবাই আপনজনের মতো করে আমার সঙ্গে মিশেছে, কথা বলেছে। আমার তো মনেই হচ্ছিল না যে, মাঝে একটা দীর্ঘ সময় আমি এখানে ছিলাম না।

 

জয়শ্রী একের পর এক তাঁর ফেলে আসা অতীতের কথা বলে চলেছেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে চলেছি। বর্ণাঢ্য জীবনের গল্পগাথা শেষ হওয়ার নয়। ঘড়ির কাঁটা বলছে আর কিছুক্ষণ পর তাঁর ফ্লাইট উড়ে যাবে লন্ডনের উদ্দেশে। উঠতে হলো আমাদের। বিদায়ের কালে জয়শ্রী বললেন, দেখা হবে আগামীতে। তখন আরও কথা হবে।

Leave a Reply

Your identity will not be published.