বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি এক অভিনেতার নাম উত্তমকুমার। সিনেমা ভক্তদের ভাষায় গুরু, মহানায়ক। ভারতের সর্বকালের অন্যতম ব্যাপকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ অভিনেতা। একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেতা। কখনো পরিচালক। আবার সিনেমা প্রযোজক। সিনেমার নেপথ্য গায়ক, সংগীতকার ও সুরকার। তিনি বাণিজ্যিকভাবে সফল নায়ক। সেখানেই শেষ নয়। ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিলেন স্বাভাবিক অভিনয়ের জন্য।
উত্তমকুমারই প্রথম অভিনেতা, যিনি ১৯৬৭ সালে ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ এবং ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভে সম্মানিত হন। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষামূলক এবং জটিল চরিত্রে অভিনয় করেছেন। যার সংখ্যা উত্তমকুমার চলচ্চিত্র-তথ্যকোষ মতে ২০৩টি। বিশেষ সিনেমা ‘নায়ক’, ‘বিচারক’, ‘জতুগৃহ’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘চৌরঙ্গি’, ‘এখানে পিঞ্জর’ ইত্যাদি।
তিনি আলোছায়া ব্যানারের ‘সপ্তপদী’ সিনেমা প্রযোজনা করেন, যা বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়। সুচিত্রা সেনের সাথে উত্তমকুমার অভিনয় করে বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিক আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তবে তিনি সেখানেই থেমে থাকেন নি। সারা ভারতজুড়ে তাঁর নিজের জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতা প্রমাণ করতে ‘অমানুষ’, ‘আনন্দ আশ্রম’ নামের হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করেন। সুনামও অর্জন করেন।

১৯৮০। থমকে যাওয়া ভারত। ২৪ জুলাই। বৃহস্পতিবার। শোকের কালোমেঘের ছায়া নগর কলকাতায়। এক বিষাদময় শব্দ আকাশে বাতাসে ভেসে আসে। নেই। বাংলা চলচ্চিত্রে মহানায়ক নেই। উত্তমকুমার নেই।
দৃশ্য : ০
স্থান: বেলভিউ ক্লিনিক (জরুরি বিভাগ)।
দিন: বৃহস্পতিবার।
শিল্পী উত্তমকুমার, মেডিকাল বোর্ডের ডাক্তার, ক’জন নার্স।
মহানায়কের মহিমান্বিত মুখটি মেডিক্যাল বোর্ডের ডাক্তার কফিনের সাদা কাপড়ে ঢেকে দিলেন।
পত্রিকায় কালো অক্ষরে ভেসে উঠল, “বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের প্রয়াণ...তাঁর মতো নায়ক আর নেই—আর হবেও না।” সত্যজিৎ রায়। কাট
১
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তমকুমার শুধু জনপ্রিয় নায়ক নন। অভিনয়, ব্যক্তিত্ব, সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রের বিকাশে অসাধারণ অবদানের জন্য ‘মহানায়ক’। উত্তমকুমারের জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে তাঁর দর্শনগত বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। তিনি অভিনয়কে কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম মনে করেন নি। প্রতিটি চরিত্রকে বাস্তব, মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য গভীর প্রস্তুতি নিতেন। সংলাপ, শরীরী ভাষা, দৃষ্টি ও নীরবতার মাধ্যমে চরিত্র নির্মাণে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। প্রতিনিয়ত আত্মউন্নয়নের বিশ্বাস নিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও নিজেকে বারবার নতুন রূপে গড়তে চেয়েছেন। হয়েছেন প্রযোজক। কখনো ক্যামরায় চোখ রেখে শিল্পীদের নির্দেশ দিতে দিতে বলেছেন, “অ্যাকশন, কাট”। তিনি অনুভব করেছেন, চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের অনুভূতিরও বাহক।
এই ভাবনার প্রতিফলন দর্শক উপভোগ করেছে তাঁর অনেক সাহিত্যভিত্তিক ও মানসম্পন্ন সিনেমায়। উত্তমকুমারের সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে, যেমন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এবং সুপ্রিয়া দেবী-র বক্তব্যে তাঁর ভদ্র ব্যবহার এবং পেশাদার শৃঙ্খলার প্রশংসা বারবার উঠে এসেছে। চলচ্চিত্রের অভিনয়ে নতুন শিল্পীদেরও তিনি উৎসাহ দিতেন। সময়ানুবর্তিতা মেনে চলতেন। উত্তমকুমার বিশ্বাস করতেন, একজন অভিনেতার শেখার শেষ নেই। তাই নতুন পরিচালক, নতুন গল্প ও ভিন্ন ধরনের চরিত্র গ্রহণে আগ্রহী ছিলেন। এতসব তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারকে বৈচিত্র্যময় করেছে। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি শুটিং চালিয়ে গিয়েছিলেন। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির শুটিং চলাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়েন। এবং পরে হসপিটালে মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনা তাঁর কর্মনিষ্ঠার প্রতীক।
‘মহানায়ক’ উপাধি কোনো সরকারি সম্মান নয়; এটি দর্শক, সমালোচক এবং চলচ্চিত্র জগতের সম্মিলিত স্বীকৃতি। নানা মাত্রিক অভিনয় দক্ষতা, যেমন রোমান্টিক, ট্র্যাজিক, কৌতুক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক—প্রায় সব ধরনের চরিত্রে সমান সাফল্য। তাঁর অভিনয় বাংলা সিনেমাকে সর্বভারতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেয়। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং শিল্পের উন্নয়নে ঝুঁকি নিয়েছিলেন। উত্তমকুমারের জীবনদর্শনকে সারাংশ করলে জানা যায়—শিল্পকে ভালোবাসো। এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করো। থাকো দর্শকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। খ্যাতির মোহে না পড়ে কাজের মানকে বড় করে দেখো, যা সকল শিল্পী-কুশলীদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। এতসব কারণেই উত্তমকুমার শুধু একজন সফল অভিনেতা নন; বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘মহানায়ক’। উত্তমকুমার এমন এক শিল্পী, যিনি অভিনয়ের মান, ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তার মাধ্যমে যুগের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। এই নিবন্ধের মূল লক্ষ্য মহানায়ক উত্তমকুমার কেন সিনেমা প্রযোজনায় এবং পরিচালনায় এসেছিলেন।
সিনেমা প্রযোজনা মূলত একটি শিল্পধারণামূলক বিষয়, তবে এটি একই সঙ্গে ব্যবসায়িক এবং ব্যবস্থাপনাগত কর্মকাণ্ড। একজন প্রকৃত প্রযোজক কেবল অর্থের জোগানদাতা নন; তিনি চলচ্চিত্রের শিল্প-ভাবনা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের কৌশল নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। চলচ্চিত্র প্রযোজনা শুধু মূলধন বিনিয়োগ নয়; এটি একটি শিল্পদর্শনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সৃজনশীল প্রক্রিয়া।

২
শিল্পীরা চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনায় আসেন কেন ?
শুধু কি অভিনয়ের পাশাপাশি শৈল্পিক, সৃজনশীল চিন্তা অর্থে ? নিজের পছন্দের গল্প, চরিত্র, নির্মাতা ও শিল্পমান অনুযায়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারার স্বাধীনতায় ? নাকি ভালো গল্প বাস্তবায়ন করার প্রবল বাসনায় ? অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বা ভিন্নধর্মী গল্পে সাধারণ প্রযোজক বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন না। তখন অভিনেতারা নিজেরাই প্রযোজনা করেন। পছন্দের গল্পকে পর্দায় আনেন। আবার কারণ হিসেবে এটাও উল্লেখযোগ্য যে, চলচ্চিত্রের লাভের অংশীদার হওয়ার সুযোগ তৈরির আশায়। কখনো বয়স অথবা বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগ কমলেও প্রযোজক হিসেবে চলচ্চিত্রশিল্পে সক্রিয় থাকেন। অথবা নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একজন শিল্পী হিসেবে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করতেও কেউ কেউ চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসেন।
অভিনেতারা কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য প্রযোজনা করেন, এমন ধারণা সব সময় সত্য নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রযোজনা তাদের সৃজনশীল স্বাধীনতা, শিল্পদর্শনের বাস্তবায়ন, নতুন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং চলচ্চিত্রশিল্পে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। তাই সফল অভিনেতাদের অনেকেই সময়ের সঙ্গে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক বা কখনো পরিচালক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন।
এছাড়া কখনো নিজের পছন্দের সাহিত্যকে চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার জন্য। সিনেমা নামের শিল্প ক্ষেত্রে নিজের পরিধি বাড়াতে। অথবা সৃজনশীল স্বাধীনতা অর্জনের প্রয়োজনে। কিংবা নৈতিকভাবে লাভবান হতে। নায়কদের প্রযোজক বা পরিচালক হওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। নির্বাক যুগে ১৯৩০-এর দশকেই ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম জনপ্রিয় নায়ক, যিনি নিজের নামে চলচ্চিত্র প্রযোজনা বা পরিচালনা করেছেন—তিনি প্রমথেশ বড়ুয়া।
১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথম অভিনেতা-প্রযোজক: সোহেল রানা। তিনি ‘ওরা ১১ জন’ (১৯৭২) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। রাজ্জাক ১৯৭৭ সালে ‘অনন্ত প্রেম’ পরিচালনা করেন। ফতেহ লোহানী, খান আতাউর রহমান, নায়ক রহমানও ছিলেন শীর্ষস্থানীয় সিনেমা পরিচালক। আরও একজন আবদুল জব্বার খাঁ। এবং তিনি ছিলেন প্রথম দিকের শিল্পীদের একজন। যিনি অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনায় যুক্ত হন।
৩
মহানায়ক উত্তমকুমার কেন সিনেমা প্রযোজনায়
উত্তমকুমার শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে একজন অভিনেতা হিসেবে সব সময় নিজের পছন্দমতো গল্প, চরিত্র বা নির্মাণশৈলী বেছে নেওয়া সম্ভব হয় না। এই কারণেই তিনি প্রযোজনায় আসেন। প্রধান কারণগুলো হতে পারে প্রযোজক হলে তিনি নিজের পছন্দের সাহিত্যভিত্তিক গল্প, পরিচালক ও শিল্পী নির্বাচন করতে পারবেন। প্রয়োজনে বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি শিল্পমানও বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে। অথবা একজন অভিনেতা হিসেবে তিনি শুধু অভিনয় করতেন, কিন্তু প্রযোজক হিসেবে চিত্রনাট্য, বাজেট, কাস্টিং, নির্মাণের মান সবকিছুতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তাতে চলচ্চিত্রের মান উন্নয়ন হওয়ার সুযোগ ঘটবে। ১৯৫৭ সালে তিনি আলোছায়া প্রোডাকশন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রথম প্রযোজিত ছবি ‘হারানো সুর’। ছবিটির মাধ্যমে তিনি বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্য লাভের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পেলেন। জাতীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি লাভ করেন। তিনি এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যা দর্শকও গ্রহণ করবে এবং শিল্পমূল্যও বজায় থাকবে। পরবর্তী সময়ে ‘সপ্তপদী’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’ এবং ‘দুই পৃথিবী’ এই লক্ষ্যেই নির্মিত সফল উদাহরণ। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ছোটি সি মুলাকাত’ ছিল বাংলা সুপারহিট ‘অগ্নিপরীক্ষা’-র হিন্দি পুনর্নির্মাণ। উত্তমকুমারের উদ্দেশ্য ছিল সর্বভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্র বাজারে প্রবেশ করা। নিজের প্রযোজনা সংস্থাকে বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু ছবিটির নির্মাণ ব্যয় অত্যন্ত বেড়ে যায়। শুটিং দীর্ঘায়িত হয়। প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক সাফল্য লাভে ব্যর্থ হয়। তিনি বড় আর্থিক সংকটে পড়েন। এই ছবির ক্ষতি তাঁকে বহু বছর আর্থিক চাপের মধ্যে রেখেছিল।
উত্তমকুমারের প্রযোজিত চলচ্চিত্রগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, তিনি প্রযোজনায় এসেছিলেন মূলত পাঁচটি কারণে। সাহিত্যনির্ভর উৎকৃষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাণ, শিল্পীসত্তার স্বাধীন প্রকাশ, অভিনয়ের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি এবং সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা-প্রযোজক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

৪
উত্তমকুমারের পরিচালনা ও প্রযোজনা-দর্শন ছিল ‘তারকা হিসেবে জনপ্রিয়তা’ এবং ‘চলচ্চিত্রকার হিসেবে শিল্পচিন্তা’ এই দুইয়ের সমন্বয়। তাঁর প্রযোজিত চলচ্চিত্রগুলোর বিষয়বস্তু ও উৎস বিশ্লেষণ করলে সেই শিল্পদৃষ্টিই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। সেই অর্থে বলা যায় সিনেমাশিল্পের একজন প্রযোজকের শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ কেবল অর্থ বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তিনি চলচ্চিত্রের অন্যতম সৃজনশীল অংশীদারও বটে। উত্তমকুমার তাঁর চিন্তা জগতে বুঝতে পেরেছিলেন, চলচ্চিত্র একই সঙ্গে বিনোদনশিল্প এবং শিল্প-উদ্যোগ। ফলে সিনেমায় শিল্পমান বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। তাঁর সফল হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে তিনি হয়তো এক সত্য অনুভব করেছিলেন। তা হলো একটি শক্তিশালী চিত্রনাট্যই চলচ্চিত্রের ভিত্তি। উত্তমকুমার অভিনীত অধিকাংশ সিনেমা ছিল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নির্মিত। উত্তমকুমার অভিনয় করেছেন পেশাদার শিল্পী হিসেবে। হয়তো কোথাও ছিল না পরিচালকের সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রতি সম্মান। অথবা নতুন বিষয় ও নতুন নির্মাণশৈলীকে প্রযোজকরা মেনে নিতে সাহস পেতেন না—যা সিনেমায় সরল অঙ্কের মতো স্বাভাবিক ঘটনা। যেহেতু সিনেমা নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়, তাই মূলধন ফেরত আসা এবং লভ্যাংশ পাওয়া সব প্রযোজকেরই কাম্য। তাঁর প্রযোজিত চলচ্চিত্রগুলোর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে অনুমান করা যায় যে, তিনি প্রযোজক হলে অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। পরিচালকের শিল্পদৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ না করে পূর্ণ সহযোগিতা দেওয়ার স্বাধীনতা পাবেন। নিজের পরিচালিত-প্রযোজিত সিনেমার শিল্পীদের অভিনয়ে স্বাধীনতা দিবেন। অথবা বিপরীত চিত্রও হতে পারে। তাঁর স্টার ভ্যালু বিক্রি করে প্রযোজকরা কত লক্ষ কোটি টাকা উপার্জন করে। সেখানে শিল্পী হিসেবে শুধু তাঁর পারিশ্রমিক প্রাপ্য। প্রযোজক হয়ে অধিক মুনাফা পেলে ক্ষতি কি ?
৫
উত্তমকুমার যে দর্শনে চলচ্চিত্রকে শুধু বিনোদন নয়, বরং সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ নির্মাণের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখতেন, সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন তাঁর প্রযোজিত কয়েকটি চলচ্চিত্রে স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়, যা প্রমাণ করে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। তাঁর প্রযোজিত ছবির বিষয়বস্তু ও নির্বাচন থেকেই তা অনুমান করা যায়। নারী, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্ক কী, যেখানে দর্শক অনুধাবন করে মানবিক মূল্যবোধ কী। পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক নৈতিকতার সামাজিক জীবনের মূল্য। একজন সাধারণ মানুষও সম্মানের আশা করে। নগর শহরের একজন রিকশাওয়ালাকে ‘মামা’ বলে ডাকলে খুশি হয়—যা তার মর্যাদার স্বীকৃতি। এমনিই ভাব-ধারণায় সিনেমা নির্মিত হয়েছে, হবে।
স্পষ্ট করে বলা যায়, উত্তমকুমার-এর প্রযোজনা কার্যক্রমে শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর জনপ্রিয়তাকে তিনি প্রযোজকের সৃজনশীল স্বাধীনতা অর্জনের উপায় হিসেবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন। তার প্রমাণ বাংলা রোমান্টিক চলচ্চিত্রকে সর্বভারতীয় দিগন্তে নতুন রূপে উপস্থাপন করতে নির্মাণ করেছেন হিন্দি সংলাপে ‘ছোটি সি মুলাকাত’। তাঁর বিপরীতে অভিনয় করলেন হিন্দি সিনেমার নায়িকা বৈজয়ন্তিমালা। উত্তম প্রযোজিত অনেক সিনেমার সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রবীন চট্টোপাধ্যায় ও শ্যামল মিত্র। ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেছেন অধীর বাগচী ও নচিকেতা ঘোষ। কিন্তু ‘ছোটি সি মুলাকাত’ সিনেমায় হিন্দি গানের ধুন বা সাস্কৃতিক দাবি পূরণ করতে উত্তম সাহায্য নিলেন শংকর জয়কিশনের। এটা ছিল তাঁর সামগ্রিক চিন্তা। তা না হলে হিন্দি ভাষার বৃহৎ দর্শকের কাছে বাঙালিয়ানা রোমান্টিক সিনেমা কী করে পৌছে যাবে ? সংক্ষেপে বলা যায়, একজন প্রযোজক তখনই প্রকৃত চলচ্চিত্র-প্রযোজক হয়ে ওঠেন, যখন তিনি কেবল অর্থের বিনিয়োগকারী নন; বরং শিল্পবোধ, সাংস্কৃতিক দায়িত্ব, সৃজনশীল দূরদৃষ্টি এবং দর্শক-সচেতনতার সমন্বয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সহযাত্রী হন। তাঁর লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন চলচ্চিত্র নির্মাণে সহায়তা করা, যা একদিকে নান্দনিকভাবে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে সামাজিকভাবে অর্থবহ এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই।
উত্তমের অধিকাংশ প্রযোজনায় পরিবার, দাম্পত্য, মানবিক সম্পর্ক, আত্মমর্যাদা, নারী-পুরুষের সামাজিক অবস্থান এবং নৈতিক সংকট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। এগুলো সমাজকে সরাসরি পরিবর্তন করার আহ্বান না জানালেও মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে। ধর্মের চাইতে মানুষ বড়—এই সত্যবিশ্বাসে উত্তম প্রযোজনা করেন ‘সপ্তপদী’। এর ধারাবাহিকতায় উত্তমকুমার প্রযোজনা করেন উইলিয়াম শেক্সপিয়র-এর নাটকের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-কৃত বাংলা রূপান্তরের চলচ্চিত্র ‘ভ্রান্তি বিলাস’ (১৯৬৩)। এতে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন উত্তমকুমার—যা চলচ্চিত্রটির অন্যতম আকর্ষণ। ‘জতুগৃহ’ (১৯৬৪) সুবোধ ঘোষ-এর গল্প অবলম্বনে।, ‘উত্তর ফাল্গুনী’ (১৯৬৩) নীহাররঞ্জন গুপ্ত-এর রচনা এবং ‘গৃহদাহ’ (১৯৬৭) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর উপন্যাস। এগুলো ছাড়াও আরও সিনেমা প্রযোজনা করেন। উত্তমকুমার শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন না; তিনি চলচ্চিত্রকে একটি সৃজনশীল শিল্পমাধ্যম হিসেবে দেখতেন। তিনি যে ছবিগুলো প্রযোজনা করেছেন, সেগুলোর তালিকা দেখলেই একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা যায়। সব মিলিয়ে বলা যায়, উত্তমকুমার প্রযোজনায় এসেছিলেন শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়; বরং বাংলা সিনেমাকে আরও উন্নত, রুচিশীল এবং শিল্পসম্মত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই। তিনি বুঝেছিলেন, একজন মহান অভিনেতার পাশাপাশি একজন প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রের ভাষা ও মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যায়।

৬
উত্তমকুমার কেন সিনেমা পরিচালনায়
উত্তমকুমার পরিচালক হিসেবে এমন বিষয় নির্বাচন করেছিলেন, যা তাঁকে অভিনেতা হিসেবে নতুনভাবে প্রকাশের সুযোগ দেয়। সাহিত্যনির্ভর কাহিনি, শক্তিশালী চরিত্র এবং উন্নত নির্মাণশৈলী তাঁর প্রযোজনা-পরিচালনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে কমার্শিয়াল সিনেমার নায়ক হয়েও অথবা দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় শিল্পমানসম্পন্ন চলচ্চিত্র উত্তমকুমার নির্মাণ করতে জানেন। এবং পারেন। করেছিলেনও। পরিচালক হিসেবে তাঁর স্বীকৃত চলচ্চিত্রের সংখ্যা তিনটি। তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘শুধু একটি বছর’ (১৯৬৬), এক হাস্যকর পরিস্থিতি যেখানে জয়াকে (সুপ্রিয়া) তার বাবার ইচ্ছানুযায়ী একজন সম্পূর্ণ অপরিচিতকে বিয়ে করতে হয়। এটি ছিল উত্তমকুমার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র, যার চিত্রনাট্যও তিনি লিখেছিলেন। চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছিল এবং বক্স অফিসে প্রায় ১০০ দিন চলেছিল। যদি বিস্তারিত বর্ণনায় যাই, এ প্রসঙ্গে আসবে প্রথমেই উত্তমকুমার পরিচালিত এবং প্রযোজিত ও তাঁর চিত্রনাট্যে রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাস অবলম্বনে ‘বনপলাশীর পদাবলী’ (১৯৭৩) সিনেমার কথা। এটি উত্তমকুমারের সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। যে সিনেমায় বাংলার ইতিহাস, লোকঐতিহ্য ও গ্রামীণ সমাজকে চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে। গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে। ‘বনপলাশীর পদাবলী’ শুধু বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নয়, সাংস্কৃতিক স্মৃতি সংরক্ষণেরও একটি প্রচেষ্টা। গ্রামীণ বাংলার পটভূমিতে নির্মিত মানবিক ও সামাজিক নাট্যধর্মী চলচ্চিত্র। যে গল্পে ছিল বাঙালির ইতিহাস, সাহিত্য, পারিবারিক সংস্কৃতি। পাশাপশি ছিল লোক-ঐতিহ্যের শিল্পিত প্রয়োগ। লোকবাংলার শিকড় থেকে সংগ্রহ করা উপাদান, যা ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা।
এই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা যায়, উত্তমকুমারের প্রযোজনাগত পরিচালনার ধারণাগত দর্শন ছিল ‘শিল্প, সংস্কৃতি, সমাজ ও বাজার—এই চারটির সমন্বয়ে একটি টেকসই বাংলা চলচ্চিত্রধারা নির্মাণ।’ তাঁর প্রযোজিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ‘বনপলাশীর পদাবলী’ এই দর্শনের সবচেয়ে পরিণত ও প্রতিনিধিত্বশীল একটি চলচ্চিত্র। যে সিনেমায় চিত্রগ্রহণ, শিল্প নির্দেশনা, অভিনয়, সম্পাদনা, শব্দ ও সংগীতের সৃজনশীল আবেদন দর্শক দেখেছেন। অনুভব করেছেন, কেবল তাৎক্ষণিক মুনাফা নয়, নতুন নির্মাতা, লেখক, অভিনেতা ও প্রযুক্তিবিদদের বিকাশে বিনিয়োগ করাও একজন দূরদর্শী পরিচালক ও প্রযোজকের দায়িত্ব।
Leave a Reply
Your identity will not be published.