ভ্রমণ গদ্যের পাঠকদের কাছে একটি সুপরিচিত নাম, হুসেইন ফজলুল বারী। তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য হলো, তথ্য সমৃদ্ধ হলেও তা একঘেয়ে নয়। কেননা তথ্যগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে; মিশে থাকে গল্পের সঙ্গে। নিসর্গের বর্ণনা অপরূপ। আর তাঁর ভাষায় কবিতার গন্ধ রয়েছে। কখনো-সখনো অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহারও লক্ষণীয়।
‘অন্যদিন’-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে হুসেইন ফজলুল বারী’র ভ্রমণকাহিনি ‘হেলেনিক সৌরভ’। এটি গড়ে উঠেছে গ্রিসের পটভূমিতে—যেখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে সেই দেশের মানুষ, প্রকৃতি এবং পুরাণের নানা বিষয়।
কিছুটা অশান্ত হয়ে উঠেছে এজিয়ান সাগর। এদিকে জানালায়, কার্নিশে আর ছাদে জড়ো হয়েছে ঝাঁকে ঝাঁকে কইতর। এসব মায়াবী কপোতের রঙ মূলত শাদা, তবে ডানার দিকে গাঢ় নীল ছোপ। কিছু জোড়া কবুতর মধুর গুঞ্জরনে মুখর হয়েছে। এরা রাঙাপায়ে শ্বেতপাথরের গায়ে হাঁটে; একটু পাখা মেলে, আবার ডানায় রোদ লাগিয়ে ফিরে এসে নীল গম্বুজে বসে, আবার নেমে গিয়ে খুঁটে খায়—লাল ঠোঁট কাঁপিয়ে অকারণ বকবক করে। কোঠরে বসে কবুতরছানারা মা-পাখিকে দেখে চিঁচিঁ ডাকে, আদুরে ঠোঁটে আগত মায়ের মুখে-বুকে-পিঠে হুটোপুটি খায়। মায়াবতী পক্ষীমাতার বুক বেয়ে কয়েকটা বাসি পালক খসে পড়ল নুড়িময় পথে।
ওই পথেই একটা শাদা ঘোড়া হাঁটে খটখটিয়ে। সহিসের ঘণ্টা বেসুরে বাজে। সুঠাম অশ্ব পা আছড়ে আছড়ে বাঁক নেয় মোড়ের দিকে। ঘোড়সওয়ারি স্বল্পবসনা নারী কপট ব্রীড়ায় সঙ্গী-আরোহীর গায়ে আটকে থাকে বেতসলতার মতো। তার মসৃণ গ্রীবার পাদদেশে আর প্রায় উদোম ঊরু-নিতম্বে বর্ণিল ট্যাটু; নিটোল পায়ে আলতামাখা। এই দম্পতির খুনসুটিমাখা মাধুর্যময় হল্লা সংক্রামিত হয় আশপাশে—ধাবমান পথচারীরাও অকারণ হাসে, হাত নাড়ে, ছবি তোলে।
আগুয়ান ভ্রামণিকদের অনুসরণ করে আমিও হেঁটে চলি অনির্দিষ্ট লক্ষ্যে। একটা মেয়ে কেন যেন রেগেমেগে বয়ফ্রেন্ডকে বকাঝকা করে। পশ্চিমে মানুষজন এমনিতে ঘরের বাইরে খুব ভদ্রোচিত আচরণ করে। এই আচরণ ব্যতিক্রম। সবার উৎসুক দৃষ্টি দেখে মেয়েটা যেন খানিকটা লজ্জা পেয়েছে বোধহয়। ছেলেটা খুব ভালো, সে হেসে হেসে আমাদের বলল, আমরা কপট ঝগড়া করছি যাতে ভালোবাসাটা গাঢ় হয়। এবার মেয়েটি খিলখিল করে হেসে ওঠে। আমার মনে হলো, ছেলেটি তার সঙ্গিনীকে লজ্জা থেকে বাঁচিয়ে দিল। মনে পড়ল একটা গ্রিক গল্প—এক স্টয়িক দার্শনিকের একটা আলখাল্লা চুরি হলো। চোরা ব্যাটা বন্দরের এক কোণে বসেছে এই আলখাল্লা বিক্রি করতে। এক ভিনদেশি নাবিকের এই জামা দেখে খুব পছন্দ হলো। বিক্রেতা সুযোগ পেয়ে বেশ উঁচু দাম হাঁকালেন। খানিকটা ভিড় জমে গেল। দার্শনিকের এক চেলা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলল, এটা চোরাই দ্রব্য। নাবিক বলল, জামা কিনব, কিন্তু কেউ একজন বলতে হবে, জামাটি তোমার। ভিড়ের মধ্য থেকে আচমকাই দার্শনিক এসে বললেন, জি, জনাব, এই জামা আপনি নির্দ্বিধায় কিনতে পারেন। আমি সাক্ষ্য দিছি, এই মুহূর্তে এই জামাটির মালিক এই বিক্রেতা। মহান দার্শনিক গ্রিসের চোরা ব্যাটারও যে লজ্জা-আত্মমর্যাদা আছে, তা দেখালেন।
গ্রিসের এই মেয়েগুলোর কি লাজ-লজ্জা, মান-মর্যাদা নেই ? বেয়ায়া মেয়েরা প্রায় উদোম হয়ে সামনে এগোয়, কী যেন বলতে বলতে একে অন্যের গায়ে গড়িয়ে পড়ে। মাথা থেকে কবিতার লাইন টুটে গেল। সূর্যের আলোর প্লাবন এদিকে ফিরে ফিরে আসে। কী নারকীয় রোদ, মাবুদ! সোনালি আঁচে চারদিকে যেন আগুন ধরে যায়! সাদা পুরুষেরা খালি গায়ে হাঁটে বা বড়জোর গাইয়ে গেঞ্জি টেঞ্জি পরে। আলো-ছায়াময় স্থানে প্রায় নগ্নিকা কয়েকজন নারী শুয়ে-বসে সূর্যস্নানে মত্ত হয়েছে। কেউবা ঊরু উলটিয়ে একই রূপে বইয়ের পাতা উল্টায়। এভাবে নাকি ওরা অবসর উদ্যাপন করে। ওদের চোখে নীল-কালো রোদচশমা। তাদের সারা অঙ্গে যে পরিমাণ কাপড় আছে তা দেখে আমারই লজ্জা লাগছে। কিন্তু তাদের কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তবে কেউ কারও দিকে তাকায় না। হংস মাঝে বক যেথার মতো এই বাঙালিও একটা ইজি চেয়ারে বসে ক্লান্তি দূর করি। সাগরের হাহাকার ছাপিয়ে ঠান্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগে। আরামে চোখে বুজে আসে। বিশ্রামরত এক শ্বেতাঙ্গ যুবা সঙ্গিনীকে দূরবর্তী একটা প্রকাণ্ড ডুমুর গাছ দেখিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন আউড়ায়। জানি, অপরের কথায় আড়িপাতা ঠিক নয়। তবু গল্পের তালাশে গুপ্তচরের মতো কান খাড়া করলাম। সেমিটিক তরুণ তৌরাতে বর্ণিত ডুমুর গাছের মাহাত্ম্য জানায় তার উৎসুক প্রণয়িনীকে। অবশ্য সব ঐশীগ্রন্থই সাক্ষ্য দেয়, নিষিদ্ধ গন্ধম খেয়ে বিবস্ত্র হয়ে পড়লে লজ্জাতুর আদম ও বিবি হাওয়া ডুমুরপাতা দিয়ে লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করেছিলেন। প্রভু বিভিন্ন সময় এই পবিত্র গাছের কসম করে ঐশীবাণী পাঠিয়েছেন, প্রিয় বার্তাবাহকদের। এক সময় ডুমুরের ছায়া দীর্ঘ হয়ে জলমগ্ন প্রান্তর ছুঁয়ে যায়। এবার ছায়াচ্ছন্ন জলের বুকে হামলে পড়ল ক্ষুধার্ত পাখির দল।
বেলা বেশ পড়ে এসেছে। ঝিরিঝিরি বাতাসের ঢেউ জাগে। খানিকটা স্বস্তি পাই। বেশ স্বস্তি অনুভব করি। এদিকের সাগরতটের রং একদম কালচে। অগ্নুপাতের ফলে জ্বালামুখ থেকে যে অফুরান লাভা বেরিয়েছে তা থেকে নাকি এই দ্বীপের ভূপ্রকৃতি এমন হয়েছে। শুনেছি, আশপাশে কোথাও লোহিত বরণ সাগরতটও আছে। কত কিসিমের পর্যটকের যে মেলা বসেছে এদিকটায়। ঝুরঝুরে দেয়ালে হেলান দিয়ে এক উষ্কুখুষ্কু মানুষ দম দেয় লম্বা চুরুটে। কাছেই বিস্তৃত জলপাইগাছ দাঁড়িয়ে আছে একাকী—বিষণ্ন হয়ে। এর গোড়ায় একটা স্বাস্থ্যবান কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে দিবানিদ্রায় মগ্ন। উল্টোদিকে প্রাণময় তরুণীর দল সিনানের বেশে একটা ছোট্ট নৌকার দিকে টলমল পায়ে এগোয়। চোরা চাহনিতে একবার তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম—কী অপূর্ব দেহসৌষ্ঠব! তাদের ভারী নিতম্বজাত পায়ের ছাপ ধূসর বালিতে সেঁটে যায়—নিটোল আলপনার মতো হয়ে যায়। তুচ্ছ উপকূল বুঝি এভাবে ধন্য হয়ে ওঠে! এই নারীদের রাঙা ওষ্ঠে-মরাল গ্রীবায় সোনারোদ এসে হামলে পড়ে। এসব শ্বেতাঙ্গীরা হইহই করে ঝাঁপ দিল সাগরজলে। ঝুপ ঝুপ শব্দ হয়। জলতরঙ্গ উথলে ওঠে। উচ্ছ্বাসী তরুণীদের হাসির ঝংকার আর উল্লাসেরও বুঝি অবগাহনের শখ হয়েছে! সব ধ্বনি-প্রতিধ্বনিও যেন তাদের সহগামী হয়ে নিমজ্জিত হয় নীলজলে।
একটা গ্রিক মিথ মনে হলে ভয়ে দৃষ্টি অন্যত্র ফিরিয়ে নিই—
গ্রিক দেবী আর্টেমিস বনেবাদাড়ে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে সাঁঝের বেলায় নির্জন সরোবরে মনের সুখে অবগাহন করছিলেন। দেবতা সিপ্রোইটেস লুকিয়ে স্নানরত দেবীকে দেখছিলেন। দেবী তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। তিনি কুমারীব্রত নিয়েছিলেন, প্রিভেসি রক্ষায়ও বিচিত্র পদক্ষেপ নিলেন। ক্ষুব্ধ দেবী দৃষ্টিখোর এই বেচারাকে নারীতে পরিণত করে দিলেন! এবার ল্যাঠা শামলাও। তবে কোথায় যে পড়েছি ঠিক মনে নেই, কয়েক বছর পর দেবীর দয়া হলো। বছরখানেক পরে এই রূপান্তরিত নারীকে দয়াপরাবশ হয়ে দেবী বললেন, আচ্ছা, ভালো হয়ে যাও, তোমাকে আবার পুরুষ বানিয়ে দিই। নারী-সিপ্রোতিস নাকি এই প্রস্তাব উড়িয়ে দেন এই বলে যে, দরকার নেই, নারী হিসেবে তিনি নাকি সংগমের সময় অধিকতর যৌনসুখ অনুভব করেন!
হঠাৎ করে তলপেটে চাপ অনুভব করলে আমি বেশ বিপন্ন বোধ করি। নির্দেশক চিহ্ন দেখে সামনে এগোই। পাহাড়ের কোটরে পর্যটকদের জন্য আধুনিক সব টয়লেট, চেইঞ্জ রুম আর স্নানঘরের বন্দোবস্ত দেখে অবাক হলাম না। বুঝলাম, কেন সোয়া কোটি মানুষের গ্রিস দেশে বছরে সাড়ে তিন কোটি পর্যটক এসে হাজির হয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো এখানে জলশৌচের ব্যবস্থাই নেই বলে টিস্যু পেপারেই ভরসা রাখতে গিয়ে মনে খচখচ করল—ঠিকঠাক সাফসুতরো হব কি ? কোথায় যেন পড়েছি, প্রাচীন গ্রিসে মানুষজন পাথর দিয়ে পশ্চাৎদেশ মুছে নিত। পাথর তো আর অফুরান ছিল না। সেজন্য একসময় রাষ্ট্রীয় বিধি জারি হলো—পাকসাফ হতে তিনটি পাথরই যথেষ্ট। অভিজাতগণ নাকি নিজেরদের মতো করে মসৃণ পাথরের টুকরা বানাত যা দিয়ে ঢিলা- কুলুখের কাজ সারত। প্রতিশোধপরায়ণ অনেকে নাকি সেইসব পাথরে শত্রুর নাম খোদাই করে তা দিয়ে মলমূত্র মুছে বিমলানন্দ পেত!
হালকা হয়ে ফুরফুরে মেজাজে হাঁটতে থাকি সাগর-সন্নিহিত পাহাড়ি পথে। একটা সরু গুহা দেখে থমকে দাঁড়ালাম। অপরূপ সব জাদুর পাহাড়, দুর্গম গিরিপথ, ভগ্ন মন্দির, লোহার সেতু আর সুনীল সমুদ্রের ঢেউয়ে মিশে আছে নানান কিসিমের কিংবদন্তি। খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি। এক দালালমতো লোক আচমকাই এসে বলল, এই গুহাপথে ঢুকে উলটো দিকে বেরুলে সহজেই পৌঁছা যাবে অপরূপ সাগরতীরে। এতে নাকি সারা জীবনের পাপক্ষয় হবে!
কিছুটা অনুসন্ধিৎসা দেখিয়ে আরেক বিপদে পড়লাম।
ধূর্ত লোকটি এক খণ্ড মসৃণ কালো পাথর দেখিয়ে বলল, একে কোলে তুলে ১৩ পাক ঘুরলেও অজস্র সওয়াব।
১৩ বার শুনে একটু খটকা লাগল—পশ্চিমে তো এটি অপয়া সংখ্যা।
আমি জিজ্ঞাসায় লোকটি বলল, গ্রিসে ১৩ সংখ্যার মালিক দেবতা জিউস, সেজন্য গ্রিসে ১৩ সৌভাগ্যের প্রতীক।
আমি ছুঁতে চাইলাম ভাগ্যের পাথর।
লোকটি বলল, এর জন্য গুনতে হবে কিছু ডলার বা ইউরো।
এই পড়ন্ত বেলায় এসব ভোজবাজিতে না মজি। আর তীব্র গরমে গুহায় প্রবেশ করাও সমীচীন মনে হয় নি। আরও কিছু পর্যটক এসে হাসিহাসি মুখ করে দরদাম শুরু করেছে। এক চতুরমতো লোক বলল, দেবতা জিউসের আমলের পাথর ছুঁয়ে চোখ বন্ধ করে যা কামনা করবেন, তা ফলবে সহসা। এই টাউটের ইংরেজি জ্ঞান বেশ সমৃদ্ধ। আমি সটকে পড়ার আগেই এক গৌরী নারী এল। অবয়ব আর উচ্চারণে বুঝলাম, ভদ্রমহিলা ব্রিটিশ। ব্রিটিশ নারী এই ব্যাটার বাকচাতুর্যে মুগ্ধ হয়ে চোখ বন্ধ করে এই পাথর ছুঁয়ে ধ্যানমগ্ন হলো। ভাবলাম, এই বেকুব মহিলার পূর্বপুরুষগণ একসময় গ্রিসে অনেক ঠগবাজি করেছে, লুট করে নিয়ে গেছে গ্রিসের অপূর্ব সব ভাস্কর্য। এখন লুটেরাদের এই প্রজন্মের কেউ ঠকছে দেখে খানিকটা আনন্দ পেলাম। আমি বাঙাল মুলুকের মানুষ, এইসব তুকতাকে মজবার পাত্র নই। এই এলাকা ছেড়ে অন্যদিকে হাঁটি— যেখানে এইরূপ দুষ্টু লোক নেই।
এই রকমের টাউট-বাটপার গ্রিসে এসে দেখব কল্পনাও করি নি। আমাকে নিস্পৃহ দেখে আরেক বদমাশ ব্যাটা নাছোড়বান্দার মতো এসে আবার বলল, তোমাকে দেখেছি সাগরপাড়ে ধ্যান করতে। এই দেখো বিশেষ কাঁসার বাটি—মেডিটেশনে মনসংযোগে বেশ কার্যকর। এতে ধাতব দণ্ড দিয়ে বাড়ি মেরে চোখ বন্ধ করে দেখো—অপূর্ব অনুনাদ ভেসে আসছে সুদূরের অদূর থেকে। দাম মাত্র ১০০ ইউরো। বেশ বিরক্ত হলাম। তাকে কৌশলে এড়িয়ে সামনে এগোই। একটা জিনিস নিশ্চিত হলাম, জগতে বাটপারের অভাব নেই।
হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, যত সব লোক ঠকানো ফন্দি। আরেকটু হলে ধরা খেয়েছিলাম আর কী। এই মাহেন্দ্রক্ষণে মন এসব থেকে সরিয়ে দিই। ধাবিত হই সামনের দিকে। মোড়ের দিকে একটা ভারবাহী গাধা দেখে উঠল তারস্বরে। এই পাহাড়ি পথের অন্যতম বাহন ঘোড়া-গর্দভ। এই প্রসঙ্গে একটা মজার গ্রিক পুরাণ নিবেদন করছি।
দেবী হেস্তিয়া কুমারীব্রত নিয়েছেন। তিনি রান্নাবান্না, গার্হস্থ্য ও পরিবারের দেবী। স্বভাব চরিত্রে কোনো কালিমা নেই, অন্য সখীদের মতো বনে জংগলে টো টো করে বেড়ান না। মারামারি, কাটাকাটি থেকেও থাকেন যোজন যোজন দূরে। একবার দেবী হেস্তিয়া ঘুমিয়েছেন অলিম্পাস পাহাড়ের এক ওক গাছের ছায়ায়। প্রায়াপাস নামের অপদেবতা ঘুমন্ত হেস্তিয়াকে দেখে বেশ কামার্ত হয়ে উঠেন। তিনি মনস্থ করলেন ঘুমন্ত দেবীর সাথে ভালোবাসাবাসি করবেন। নিজের জামাকাপড় খুলে তিনি একদম হেস্তিয়ার গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ে খানিকটা বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। দেবী গভীর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু কিছু অনর্থ ঘটার আগেই একটা গাধা তারস্বরে ডেকে উঠল। গাধার বিশ্রী ডাকে ঘুম ভেঙে গেলে কুমারী দেবীর ইজ্জত-আব্রু রক্ষা পায়। সেজন্য গ্রিসে গাধাকে বেশ তাজিম-সমাদর করা হয়। শুনেছি, গাধার পায়ের নাল নাকি গ্রিকে নারী বশীকরণে ব্যবহৃত হয়।
সামনের গাধাটির পায়ে ধূলিময় নাল, এর গায়ে চাপানো হয়েছে সাতসতের জিনিসপত্র। অপরূপ পথ বানানো হয়েছে পাহাড়-গুহা কেটেকুটে। এদিকে ঝলমলে রোদ। হীরকফলার মতো আলোর রেখা স্ফুরিত হয়ে ফিরে আসে আমাদের দিকেই। পাহাড়ি পথ বেয়ে কিছুটা উপরের দিকে উঠলাম। কিছুটা হাঁপিয়ে উঠেছি। গাংচিলের ঝাঁক ভেজা পালকে রোদ মেখে ঊর্ধ্বমুখি হয়ে হারিয়ে যায় দূরে-আরও দূরে। সেদিকে সান্তরিনির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। ভবঘুরে মেঘেরা এসে এবার হানা দিয়েছে অপার্থিব রোদপাহাড়ে। নিচ থেকেই দেখা যায়, উঁচু পর্বতটির মস্তকে একটা ধূসর স্থাপনা। এর গম্ভীর বেষ্টনীতে ছায়াচ্ছন্ন ফিকে রং। পাহাড়টির ধার ঘেঁষে আদিগন্ত রোদরাঙা তেপান্তর। ঢেউময় সেই নীল পাথারে ছোট ছোট পাথুরে দ্বীপ আর বিচিত্র সব জলযান—ছোট বা বড়। বরফশুভ্র জলযানগুলি যেন মোচার খোলের মতো ভাসছে। উপকূলের দিকে ঝুঁকে থাকা কালো ক্যালডেরার আগায় রত্তি রত্তি পাখির দল উড়ে উড়ে নাচে। দুরবিনে নিরিখ করে দেখি, এরা কোন প্রজাতির পাখি। এই রুক্ষ প্রকৃতিতে এসব বিপন্ন বিহঙ্গ কী করে যে বাঁচে তা আমার বোধের অগম্য।
বলা দরকার, শুধু এজিয়ান সাগরের পাড় নয়, এখানকার সাগরগর্ভও কিন্তু প্রচণ্ড মরুময়। তাই এখানকার সাগরজলে মাছ বা জলজ প্রাণীর সংখ্যাও অতি নগণ্য। দূরে কোথাও বিশ্রী আর্তনাদের মতো ভেঁপু বেজে উঠলে পথের কোণে তাকালাম। আবার বিকেলের আবির পশ্চিম আকাশে নীরব অগ্নিবলয় সাজিয়ে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে ছড়িয়ে পড়েছে। রৌদ্রস্নাত আমি সমুদ্রমুখি হয়ে একটা মসৃণ পাথরে বসলাম। কিছুটা ক্লান্তও হয়ে পড়েছিলাম হয়তো। স্নিগ্ধ ঢেউয়েরা এসে সাগরতটে প্রণতি জানায়। রোদের ঝাঁজ মিইয়ে যাচ্ছে। বাতাসে যেন এখন নহবতের আলাপ। ভিজে বালিতে আরামসে পায়ের পাতা গেঁথে ধীরলয়ে শ্বাস নিলাম। আলতো করে চোখও বন্ধ করলাম। অদূরে কোথাও সারস কাঁদে দ্বিত্বস্বরে। ঢেউয়ের রাজ্যে সুর বাজে। নিউরনে শুনি চিরায়ত ইসমের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি : হু, হু। জলজ ঘ্রাণ এসে নাকে লাগল—ঠিক যেন আমার শৈশবের নদী ডাকাতিয়ার আঁশটে গন্ধ! আত্মবিস্মৃত হয়ে পা ছড়িয়ে স্থির বসে রই এই মায়াবী সৈকতে। আমার সময় একদম থমকে যায়। এই মাহেন্দ্রক্ষণে এই প্রাচীন জনপদের আলাদা একটা ফ্রিকোয়েঞ্চিও যেন টের পেলাম, নাকি কাকতাল ? এক সময় পায়ের পাতায় জলের ধারা এসে চামরের দোলা দেয়। ঘোরগ্রস্ত তুচ্ছ আমি থরথর করে কেঁপে উঠলাম। স্নিগ্ধ বাতাস বয়।
এক স্বেচ্ছাসেবক এসে শঙ্কিতস্বরে বলল, ইউ ওকে ? বেশ বিরক্তই হলাম—বেশ তো উপভোগ্য ছিল সাগরতটের এই অণুধ্যান। সংবিত ফিরে চোখ মেলে ভদ্রতা বজায় রেখে মুচকি হেসে ঠান্ডা পানিতে চুমুক দিই—ঠিক যেন আবে হায়াত!
সচেতন মনের ঝাড়ি খেলাম : কেন যেন মাঝে মাঝে ভড়ং ধর, কিন্তু আমি তো জানি, কোন কিসিমের সাধু-সন্ত তুমি!
আমি স্বগতোক্তি করি, তাই তো, কাম, ক্রোধ আর লোভের দাস এই তুচ্ছ মানুষের কী পাপতাপের শেষ আছে ? আমার আপন আঁধারের খবর আমিই কেবল জানি।
কিন্তু আমি নিজেই জানি না যে আমি কে।
কানে বাজে সাগরজলের নিরন্তর গর্জন। এজিয়ানের ঢেউ যেন দ্বিত্বলয়ে বলছে সক্রেতিসের অমোঘ বাণী—নো দাইসেলফ, নো দাইসেলফ—নিজেকে জানো।
(চলবে)
Leave a Reply
Your identity will not be published.