উত্তম-সুচিত্রা চিরকালীন জুটি

উত্তম-সুচিত্রা  চিরকালীন জুটি

চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকার জুটি কেন হয় ? কী তার কেমিস্ট্রি! বলা কঠিন। আর বোধহয় উত্তম-সুচিত্রা জুটির বিষয়ে কিছু বিশ্লেষণ করতে যাওয়াটা আরও অনেক কঠিন।

‘ব্যাঙ্গমা’ ছাড়া ‘ব্যাঙ্গমি’ যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনই ‘রাধাবিহীন কৃষ্ণের কল্পনা খুবই কষ্টকর’। পাশ্চাত্য সাহিত্যের রোমিও-জুলিয়েট বা প্রাচ্য ভাবনার লায়লা-মজনু চিরকালীন জুটি হিসেবে মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছে। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আজও এপিক জুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘গন উইথ দ্য উইন্ডের’ সেই বিখ্যাত দুই চরিত্র স্টারলেট ও হারা ও রেউ বাটলার। দ্বন্দ্ব, বিশ্বাস, ছন্দ-পছন্দের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ক্লার্ক গেবল ও ভিভিয়েন লি। ‘রোমান হলিডে’ দিয়েছিল আর এক অবিস্মরণীয় জুটি—গ্রেগরি পেক ও অড্রে হেপবার্ন।

ভারতের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। বিশ্বের সর্বাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণকারী দেশ হিসেবে ভারত বহু জুটির যুগলবন্দি তৈরি করে আসছে। সায়গল-কানন বা কানন-প্রমথেশ জুটি এবং পরবর্তীকালে দিলীপকুমার-সুরাইয়া, রাজ কাপুর-নার্গিস বা দেব আনন্দ-কল্পনা কার্তিক বহু পরীক্ষিত জুটি। কিন্তু চিরকালীন জুটি বলতে বোঝায় তেমন কোনো জুটির কথা যদি বলতে হয়, তবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাত দশক আগে যে জুটি তৈরি হয়েছিল, তার তুলনা বোধহয় পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সুচিত্রা-উত্তম। নাম দুটি একসঙ্গে উচ্চারিত হলেই আসমুদ্র হিমাচলের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক আশ্চর্য বাঁশির ধ্বনি বাজতে থাকে।

বাঙালি রোমান্টিসিজমের শেষ কথা এই উত্তম-সুচিত্রা জুটি। এই জুটির আবেদন আজও অটুট। বলা যায়, সময়ের কষ্টিপাথরে সমান ঔজ্জ্বল্যে অম্লান তাঁদের জুটি। বহু চলচ্চিত্রবোদ্ধা বহু লেখায় এই আশ্চর্য জুটির চিরস্থায়িত্বের কারণ বিশ্লেষণ করার প্রাণান্ত চেষ্টা করেও সত্যিকারের যুক্তিগ্রাহ্য কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেন নি। উত্তমকুমার আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ছেচল্লিশ বছর আগে। আর সুচিত্রা সেন নেই বারো বছর হলো। তবু বলা যায়, জুটি কেউ তৈরি করে না, জুটি তৈরি হয় দশর্কের ইচ্ছায়। দুজন অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণের মানুষ যখন পর্দার ওপর জনমানসের ভালোবাসার প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠে, তখনই সৃষ্টি হয় জুটির আর পরবর্তী জুটি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তারাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। বাংলা ছবিতে ঠিক তাই হয়েছে। উত্তম-সুচিত্রার পরে আর কোনো কম্বিনেশনই ‘মেড ফর ইচ আদার’ হতে পারে নি, তাঁদের কিছুটা কাছাকাছি গিয়েছিল বাংলাদেশের রাজ্জাক-কবরী জুটি। এমনই হয়। কোনো যুক্তি চলে না। কোনো ব্যাখ্যা চলে না এমন সর্বব্যাপী জনপ্রিয়তার।

সত্যি বলতে কী, উত্তম-সুচিত্রা জুটির মতো বিপুল জনপ্রিয়তা দুই বাংলাতে অন্য আর কোনো জুটি লাভ করতে সমর্থ হয় নি। প্রণয়ী যুগল হিসেবে উত্তম-সুচিত্রা এক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। কোনো ছবিতে এই জুটি একত্রিত হলেই তৎকালে (পঞ্চাশ/ষাট দশক) সেই ছবি দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের ভিড় উপচে পড়ত। এই জুটির ফ্যানদের আরও খুশি করার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো : ছবির ক্ল্যাইম্যাকস-এ রোমান্টিক যুগলের মিলনের মুহূর্তে উত্তম-সুচিত্রার নিবিড় আলিঙ্গন থাকবে। একজন অপরকে বুকে টেনে নেবে। শটটা এই রকম—দুজন পরস্পরের কাছ থেকে একটু দূরে মুখোমুখি দাঁড়াবে, তারপর পায়ে পায়ে পরস্পরের কাছে হয়তো একটু এগিয়ে আসবে অথবা দাঁড়িয়ে থাকবে এবং শেষে উভয়েই দ্রুত এগিয়ে এসে আলিঙ্গনবদ্ধ হবে। ছবি শেষ, দর্শক খুশি। এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় নি, অন্তত যে ছবিতে ওরা রোমান্টিক যুগল। অবশ্য শ্রীকান্ত-রাজলক্ষ্মী, শ্রীকান্ত-কমললতা, মহিম-অচলা বা অন্যান্য ক্ষেত্রে ফর্মুলাটি বাদ গিয়েছে। উল্লেখ্য, উত্তম-সুচিত্রা জুটি সম্পর্কে দর্শকের যে জল্পনা-কল্পনা ছিল, তার পুরোপুরি সুযোগ নিয়েছিলেন তৎকালের মূলধারার বাংলা ছবির নির্মাতারা। পাশাপাশি উত্তম-সুচিত্রা জুটির মধ্যে যাতে দর্শকের অপূর্ণ বাসনার চরিতার্থ ঘটে—সে ব্যাপারেও তারা ছিলেন সচেষ্ট। মজার বিষয় হচ্ছে যে, উত্তম-সুচিত্রা দুজনেই জুটির বাইরেই তাঁদের সেরা অভিনয় উপহার দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your identity will not be published.