দীপ ছিল, শিখা ছিল, বাঁশির সুরে বাঁজছিল একের পর এক হৃদয়স্পর্শী গান, এমনই এক মনোরম পরিবেশে গতকাল (৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের গ্রন্থ ‘শুধু মাধবীর জন্য’ থেকে নির্বাচিত পত্রকাব্য পাঠ, গান, নাচ ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ‘প্রতিধ্বনি ঢাকা’ নামক সংগঠনের উদ্যোগে দেশের প্রথিতযশা আবৃত্তি ও সঙ্গীত শিল্পীদের অংশগ্রহণে এই ‘মাধবী সন্ধ্যা’ ও মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি এমপি। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি, অ্যাটর্নী জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, অন্যপ্রকাশ-এর অন্যতম পরিচালক আবদুল্লাহ্ নাসের এবং দুর্বা গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কিউ এম ডি আহমেদ সুমন। অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তব্য রাখেন আইনমন্ত্রীর স্ত্রী শিরিন সুলতানা। উদ্বোধক ছিলেন কবি মোহন রায়হান।
জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন প্রতিধ্বনি ঢাকার নৃত্য দল। এরপর জারি গানে বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়। অতঃপর আদিত্য ও মাধবীকে নিয়ে পুথিপাঠ অনুষ্ঠিত হয়। লেখক মো. আসাদুজ্জামানের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। স্যুভেনিরের মোড়ক উন্মোচিত হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নূরুল ইসলাম মণি বলেন, ‘মাধবী’ কেবল কোনো ব্যক্তিবিশেষের জন্য লেখা নয় তা পুরুষ, নারী বা যেকোনো মাধবীর জন্যই হোক না কেন, চূড়ান্ত বিচারে তা এই দেশেরই জন্য। কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে মোহন রায়হান ও স্টালিনসহ অসংখ্য কবির কবিতায় যেমন বাংলাদেশ একাকার হয়ে আছে, তেমনি আসাদুজ্জামানও এই ‘দেশ’ নামক মাধবীকে বাঁচানোর অনন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যিনি আজ এই ‘মাধবী’ নিয়ে এসেছেন, তাকে আমরা একজন লেখক, কবি, সাহিত্যিক, দেশপ্রেমিক এবং আমাদের আইনমন্ত্রী হিসেবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই।’
নিজের লেখার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অবহেলা ও একাকিত্ব যখন আমাকে পোড়ায়, তখনই আমি লিখি। ঢাকা শহরের ট্রাফিক জামের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। উত্তরা থেকে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার পথে ট্রাফিক জামে বসে মনকে অন্যদিকে ঘোরাতেই আমি মাধবীর ভুবনে ঢুকে যেতাম।’ তিনি নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব’, সমরেশ মজুমদারের ‘কালবেলা’ ও ‘কালপুরুষ’ এবং শফিক রহমানের ‘মইন-মিলা’ সহ অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বইটির প্রধান চরিত্র ‘মাধবী’ প্রসঙ্গে তিনি জানান, মাধবীকে লেখা চিঠিগুলোতে মানুষের অন্তর্গত একাকিত্বের পাশাপাশি সুখ, দুঃখ, প্রেম, রাজনীতি, সমাজনীতি ও দর্শনের নানা দিক উঠে এসেছে। তিনি মাধবীকে মোট ২৫৩টি চিঠি লিখেছেন, যার প্রথম পর্যায়ে ১২৫টি চিঠি বই আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। পাঠকদের সাড়া পেলে পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হবে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান আরও বলেন, ‘মাধবী কেÑতা নিয়ে অনেক রকম উত্তর ও কৌতূহল আছে। মাধবী কার মধ্যে লুকিয়ে আছে, পাঠক তা যত খুঁজবেন, আমার পাঠক সংখ্যা তত বাড়বে এবং এই অনুসন্ধিৎসু মনই হবে আমার লেখার অপরাণ প্রেরণা।’
তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘আইনমন্ত্রী একজন ভালো বক্তার পাশাপাশি একজন চমৎকার লেখক। আমরা আজ তার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করলাম এবং ভবিষ্যতে এমন আরও বইয়ের মোড়ক উন্মোচন দেখতে চাই।’
ব্যরিস্টার রুহুল কবির কুদ্দুস বলেন, ‘শুধু মাধবীর জন্য’ আমি এক সময় পড়তাম রাজনীতির গতি-প্রকৃতির জন্য। কোন দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এ দেশের রাজনীতি তা বোঝার জন্য। এক্ষেত্রে মো. আসাদুজ্জামানের কোনো দিক-নিদের্শনা আছে কিনা তা জানার জন্যও ‘শুধু মাধবীর জন্য’ পড়তাম আমি।
উদ্বোধক মোহন রায়হান বলেন, ‘শুধু মাধবীর জন্য’ একটি সৃজনশীল গ্রন্থ। এখানে ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য, এমন কোনো বিষয় নেই যা তুলে ধরা হয় নি। লেখক দেশ-বিদেশের কবি-সাহিত্যিক, কণ্ঠশিল্পীসহ নানাজনের গল্প-উপন্যাস-কবিতা-গান ও বাণীর উদ্ধৃতিও দিয়েছেন।
আবদুল্লাহ্ নাসের বলেন, আমরা গত ত্রিশ বছর ধরে বহু লেখকের বই প্রকাশ করেছি, করছি। আমাদের প্রত্যাশা থাকে এমন এক পাণ্ডুলিপির, যা থেকে একটি চমৎকার বই হতে পারে। ‘শুধু মাধবীর জন্য’ ছিল তেমনই একটি অসাধারণ পাণ্ডুলিপি, যা কোনো পূর্ব যোগাযোগ ছাড়াই আমাদের হস্তগত হয়। এটি পড়ার পরই আমরা সিদ্ধান্ত নিই বইটি প্রকাশের। এক্ষেত্রে মো. আসাদুজ্জামানের লেখক-সত্তাটি আমাদের কাছে মুখ্য ছিল, তার অন্য কোনো পরিচয় নয়। আমরা আনন্দিত যে তার প্রথম গ্রন্থটি প্রকাশ করতে পেরেছি।
রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, ‘শুধু মাধবীর জন্য’ অমর হোক। আমরা মো. আসাদুজ্জামানের আগামী বইয়ের অপেক্ষায় থাকব।
শিরিন সুলতানা বলেন, আমিই মাধবী কিনা, এই বিষয়টি রহস্যই থাক। তবে সহধর্মিণী হিসেবে আমি লেখকের ছায়াসঙ্গী হিসেবে আছি, থাকব।
বইটির ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন বলেন, ‘লেখক এই বইতে তার রোজকার ভাবনা, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও দর্শন প্রকাশ করতে গিয়ে বারবার কবিতার দ্বারস্থ হয়েছেন। এতে যেমন এসেছে প্রেম ও মিথোলজি, তেমনি এসেছে ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও বিশ্ব রাজনীতির চিত্র। প্রেম ও প্রণয়ের গল্প বলতে বলতেই লেখক আবার দেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রের দুঃখ-দুর্দশা ও সাধারণ মানুষের বঞ্চনার কথা লিখেছেন। অনুভূতি প্রকাশের এই বৈচিত্র্য পাঠকদের ভীষণভাবে বিস্মিত করে।’
সাদাত হোসাইন আরও বলেন, ‘প্রায় প্রতিদিনের রোজগান যে তিনি লিখছেন, সেই লেখা বা অনুভূতি বা ভাবনার ভুবন যে কত বৈচিত্র্যময় ভাবলে অবাক লাগে। কখনো কখনো মনে হয় যেন আমার ভাবনাও তো এমনই। এই যে তিনি হুট করে মাধবীর সঙ্গে গল্প ফেঁদে বসলেন গ্রীক রোমান মিথোলজির প্রেমের দেবী আপদী তিনি সৌন্দর্য প্রেম প্রতিস্ব পরায়নতা নিয়ে। পড়তে পড়তে মনে হবে পৃথিবীর সব স্নিগ্ধতা, সব সুরভী, সব মায়া, মমতা, বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, সৌন্দর্যের উৎস যেমন প্রেম, তেমনি সব বিভেদ, বিদ্বেষ, বিভোমিশা, যুদ্ধ ও যন্ত্রণার যারা প্রেমিক যা বলছিলাম সে আক্ষতি দিবা ভেনাস কিনে লেখা প্রেম ও প্রণয়ের গল্প শেষ হতে না হতেই লেখক কি করে যেন পরের টিতে এই মাধবীর কাছে লিখতে বসেন দেশের রাজনীতি নিয়ে তার হতাশা ও আক্ষেপের গল্প রাষ্ট্রের দুঃখ দুর্দশার গল্প সাধারণ মানুষের বিষাদ ও বঞ্চনার গল্প। এইসব গল্প কিংবা অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বারবার আশ্রয় খুঁজেছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল জীবনানন্দ থেকে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল¬াহ পূর্ণেন্দু পত্রী থেকে হেলাল হাফিজ, এদের সবার কাছেই। আবার গানে মান্নাদে থেকে পুলক বন্দোপাধ্যায়, সাবিনা ইয়ামিন থেকে রুনা লায়লা, কবি সুমন প্রমুখের কাছে। এত এত অনুভূতি ভাবনা বিষয় প্রতিটি অধ্যায়ে যে আপনি বিস্মিত হবেন। ভীষণ বৈচিত্র্যময় ভাবনা এই বইতে প্রকাশিত হয়েছে। এই হয়তো আপনি হাবুডুবু খাচ্ছেন তুমুল প্রেমের অনুভবে। ঠিক পরক্ষণেই আপনাকে চলে যেতে হবে আইন আদালতের খটমটের কাঠগড়ায় কিংবা বারান্দায় কিংবা বিশ্ব রাজনীতির অর্থনীতির সমরনীতির ভাবনায়।’ সবশেষে তিনি বলেন, মো. আসাদুজ্জামান যেন তার লেখক-সত্তাকে হারিয়ে যেতে না দেন। তাহলে অসংখ্য পাঠকহৃদয় বলবে, ‘আপনাকে হারাতে দিলে নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিতে ছেয়ে যাবে আমাদের হৃদয়’।
মনোজ্ঞ এই সন্ধ্যায় আড্ডার পাশাপাশি ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। কবি আসাদুজ্জামানের পত্রকাব্য থেকে পাঠ করেন প্রখ্যাত আবৃত্তি ও অভিনয়শিল্পী বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী (কলকাতা), আফজাল হোসেন, খায়রুল আলম সবুজ ও শিমুল মুস্তাফা। সঙ্গীত পরিবেশন করেন ফাতেমা তুজ জোহরা, অণিমা রায়, মাহমুদুল হাসান এবং নোশিন তাবাসসুম স্মরণ। এছাড়া দর্শনীয় নৃত্য পরিবেশন করে ‘প্রতিধ্বনি’ নৃত্যদল।
জাতীয় নাট্যশালায় ‘শুধু মাধবীর জন্য’ অনুষ্ঠান
অন্যদিন ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০ টি মন্তব্য
Related Articles
বর্ষার কবিতা
অন্যদিন০২ জুলাই ২০২৫বর্ষা! এই ঋতুর প্রভাব বাঙালির জীবনে প্রবল। তাদের মননেও পড়ে বর্ষার ছায়া। তাই তো বাংলা সাহিত্যেও বর্ষার উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
এক ক্লিকেই অন্যদিন ঈদ ম্যাগাজিন ২০২২
অন্যদিন২৭ এপ্রিল ২০২২ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা পাক্ষিক অন্যদিন এখন অনলাইনে। কাগজ ও ওয়েব- দুই মাধ্যমেই পড়া যাচ্ছে পত্রিকাটি। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এরই মধ্যে প্রকাশ হয়েছে এর বিশেষ সংখ্যা। এতে রয়েছে বিশিষ্ট লেখকদের গল্প, কবিতা, উপন্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের রচনা।
প্রশাসন বা রাজনীতিতে যোগ দেয়া উচিত নয়: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
কাজল রশীদ শাহীন২৩ অক্টোবর ২০২৪সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবিতা-গল্প-উপন্যাস-ভ্রমণকাহিনি-প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সমালোচনা, নাটক—সবক্ষেত্রই সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর জাদুকরী ছোঁয়ায়। ...তাঁর সঙ্গে ‘অন্যদিন’ একান্ত সাক্ষাৎকারে মিলিত হয়। নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো।
শম্পা কী চায়? (সপ্তম পর্ব)
এশরার লতিফ০৩ জুন ২০২২জাহিদ ভাই, ‘সিরিয়াস সমস্যা হয়ে গেছে।’ কী সমস্যা? ‘একটু আগে কারা যেন আপনার একটা আপত্তিকর ভিডিও ছেড়ে দিয়েছে।’ আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। বললাম, ‘কোথায় ছেড়ে দিয়েছে?’
Leave a Reply
Your identity will not be published.