চলতি সংখ্যা
বর্ষ ২৬ সংখ্যা ০২
গৌরবের ২৫ বছর

টেনশনমুক্তির উপায়

টেনশনমুক্তির উপায়

এমন একজন মানুষ কি আছেন যার কোনো টেনশন নেই? আসলে যান্ত্রিক সভ্যতার চরম বিকাশের লগ্নে আমরা কেউই টেনশনমুক্ত নই। জীবন ও জীবিকার প্রতিটি আনা কানাচে মিশে আছে সভ্যতার এই তীব্র অভিশাপ—টেনশন। ঘরে-বাইরে আর মনের। জটিল কোণে, কোথায় নেই টেনশনের বসবাস! এ বুঝি রূপকথার সেই ভয়াল দানব। অট্টহাস্যে গিলে খেতে উদ্ধৃত মানবসম্প্রদায়কে। টগবগে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন। বাড়ছে টেনশন। এ হলো কঠিন সময়ের প্রাত্যহিক জীবনসঙ্গী, প্রায় প্রতিটি মানুষই কম বেশি যার স্বরূপ জানেন। আশঙ্কা, উদ্বেগ, বিরক্তি, রাগ, ক্ষোভ, ভীতি, অসহায়তা, । অক্ষমতা, অস্থিরতা—এসব কিছু মিলিয়ে জট পাকানো এক জটিল মানসিক অবস্থার নাম টেনশন। জীবনের কোনো-না-কোনো পর্যায়ে সব মানুষই কম-বেশি এতে আক্রান্ত হন টেনশনের দংশনে অনেক সময় নাভিশ্বাস হয়ে উঠে। অনেকের পরিস্থিতি। কাজে-কর্মে আর চিন্তাচেতনায় ফুটে ওঠে অসংলগ্নতা। ক্ষেত্রবিশেষে যা শরীরকেও প্রভাবিত করে নানাভাবে।। স্বভাবতই এ সময়ের শান্তিপ্রিয় মানুষদের একান্ত আকাঙ্ক্ষা—টেনশনমুক্ত সজীব জীবন। ক্রমশ আগুয়ান আধুনিকতার  এক বিস্ময়কর মানবিক উপাদান।

টেনশন কী 

টেনশন (Tension) শব্দের আভিধানিক অর্থ টান। আরেকটা কথা গভীরভাবে বলা যায়, টেনশন মানে হলো মানসিক, আবেগজনিত অথবা স্নায়ুবিক চাপ। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় মানসিক উত্তেজনা বা অস্থিরতাকে এক কথায় টেনশন বলা হয়। আসলে পুঁথিগত পরিভাষায় টেনশনের স্বরূপ অনুসন্ধানের প্রয়োজন পড়ে। কারণ এই জিনিসটা যে কী, অথবা কাকে বলে টেনশন—তা প্রায় প্রতিটি মানুষই খুব ভালো জানেন।

টেনশনের উৎপত্তি

 টেনশনের উৎপত্তি হয় মানুষের মনের গহিনে। মন বলতে অনেকেই বোঝেন পানপাতা আকৃতির হৃৎপিণ্ডের ছবি। আসলে তা নয়। মনের অবস্থান মগজ বা মস্তিষ্কে । পারিপার্শ্বিক নানা ঘটনার প্রভাব পড়ে মানুষের মনে। খুব সামান্য ঘটনা বা পরিস্থিতি মানুষের অনুভূতিতে তৈরি করে প্রতিক্রিয়া। এসব প্রতিক্রিয়া একটু একটু করে দানা বাঁধে মানুষের মনে। অনুভূতিতে ছড়িয়ে দেয় ছোট ছোট ভয়, ক্ষোভ আর অসহায়তা। স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে এই অস্বস্তি আর অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে সর্বাঙ্গে। এভাবেই উৎপত্তি হয় টেনশনের। ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাপন। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আচরণে প্রকাশ পায় অসংলগ্নতা। মনে দীর্ঘদিন টেনশন ধরে রাখলে তা ক্ষেত্রবিশেষে স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে ব্যক্তির জীবন-চেতনায়। চিকিৎসাবিদদের মতে, মানুষের শরীরের মধ্যে বিশেষ এক ধরনের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফলে টেনশনের উৎপত্তি হয়। মানুষ কোনো সমস্যায় পড়লে পিটুইটারি, হাইপোথ্যালামাস, থাইরয়েড প্রভৃতি থেকে এক ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে টেনশনে।

টেনশনের প্রকাশ 

আপনি কিংবা আপনার কোনো কাছের বন্ধু কি টেনশনে ভুগছে? সচেতনভাবে। খানিকটা নজর দিলে সহজেই তা শনাক্ত করা যায়। আসলে টেনশন তো একটি মাত্র অনুভূতি নয়। অনেকগুলো অনুভূতি জট পাকিয়ে তৈরি হয় টেনশন। একেক ক্ষেত্রে এর প্রকাশ তাই একেক রকম। তারপরও কিছু সাধারণ লক্ষণ আছে যা থেকে অনুমান করা যায়, মানুষটি টেনশনে ভুগছে। যেমন—টেনশনগ্রস্ত প্রত্যেকের মাঝে দেখা যায় বিরক্তি ভাব। টেনশন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বিরক্তি বাড়তে থাকে। জগৎ-সংসারের প্রতি তীব্র অরুচি, ছোটখাটো ব্যাপারে অযথা আশঙ্কা... অনেকটা এ ধরনের মনোভাব প্রকাশ পায় তার আচরণে এবং কথাবার্তায়। মেজাজ হয়ে পড়ে খিটখিটে। কমে যায় সেন্স অব হিউমার। কেউ হাসি-ঠাট্টা করলে তাকে অসহ্য মনে হয়। দাম্পত্যজীবনে টেনশন যৌন আগ্রহ কমিয়ে দেয়। সারা দিনের পরিশ্রম শেষে স্বামী-স্ত্রী দুজনের দেহে নেমে আসে অশেষ ক্লান্তি, এতে ভাব-ভালােবাসার দেওয়া-নেওয়া তো হয়ই না—দুজনের যেটুকু কথা হয় তাতে মিশে থাকে উদ্বেগ, বিরক্তি আর আশঙ্কা। এভাবে দিনের পর দিন হয়তো সংসার টিকে থাকে, কিন্তু পারস্পরিক সম্পর্কে নেমে আসে বিপর্যয়। দুর্বিষহ হয়ে ওঠে জীবন-যাপন। দাম্পত্যসম্পর্ক থেকে সেটি গড়ায় সন্তান ও সংসারের অন্যদের মাঝে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সামাজিক বন্ধন। দাম্পত্যসম্পর্ক ছাড়াও টেনশন হতে পারে জাতীয় জীবনের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায়। মন জুড়ে ভিড় করে ভয়। টেনশন-আক্রান্ত ব্যক্তি অল্পেই উত্তেজিত হয়ে যান। কাল্পনিক ঘটনা বা অতীতচারণ করে নিজেই নিজের মানসিক উৎকণ্ঠার কারণ হন। টেনশনগ্রস্ত মানুষের ঘুমেও সমস্যা হয়। অধিক টেনশনে রাতের পর রাত ঘুম আসে না, কিংবা অনেক সাধ্য-সাধনায় ঘুম এলেও দুঃস্বপ্ন এসে ভিড় করে চোখের পাতায়। কমে যায় কর্মদক্ষতা, খাওয়া-দাওয়ায় আসে অরুচি। বিশ্রী অবস্থা। এসব মানসিক দুরবস্থার পাশাপাশি দেখা দেয় শারীরিক সমস্যা। টেনশন থেকে প্রেসার বেড়ে যায়। দেখা দেয় মাথা ধরা, পা কামড়ানো, হাত-পা কাপা, বুক ধড়ফড়, চমকে ওঠা, শ্বাসকষ্ট, ঘাড়ে ব্যথা, আলসার, কোষ্ঠকাঠিন্য, অ্যালার্জি, হাইপারটেনশন, হার্টঅ্যাটাক, সেরিব্রাল স্ট্রোক, ইনসমােনিয়া, ফ্রিজিডিটি, ইম্পােটেন্সি ইত্যাদি জটিল সব ব্যাধি।

টেনশন কাটানো আদৌ কি সম্ভব? 

শতভাগ টেনশনমুক্ত থাকা হয়তো সম্ভব নয়, আর তার প্রয়ােজনও নেই। কিছু পরিমাণ টেনশন অনেক ক্ষেত্রে জীবনের গতি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত টেনশন জীবনের অবস্থা করে তোলে বেগতিক। টেনশন যত কষ্টকর বা অসহ্যই হােক না কেন, এটা একটা সাময়িক অবস্থা। আপনা-আপনিই অনেক সময় তা কমে যায়। জীবনের প্রয়ােজনেই কিছু কিছু সময় তা কাটিয়ে দিতে হয়। জীবনভর কিছু আক্ষেপ থাকে। কিছু অপ্রাপ্তি বা হারানাের দুঃখ বইতে হয় আজীবন। ওসবকে টেনশন ভাবা ভুল। টেনশন আধুনিক জীবনযাপনের প্রত্যক্ষ ফসল... উদ্বেগ, রাগ, বিরক্তি, ভয়, অস্থিরতা, সংশয় ইত্যাদি অনুভূতির দলাপাকানো রূপ। এইসব টেনশন ধ্বংস করার জন্য আপনার ইচ্ছাশক্তি, সচেতনতা আর সদভ্যাসই যথেষ্ট। আসুন, সেই প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়েই উদ্ভাবন করি টেনশন থেকে মুক্ত থাকার কিছু উপায়।

কারা টেনশনে আক্রান্ত হন

সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষকালে প্রতিটি মানুষই কোনো-না-কোনো সময় কমবেশি টেনশনে ভোগেন। টেনশন কেবল ভীতু, নার্ভাস, অগোছালো মানুষদেরই আক্রমণ করে না—সপ্রতিভ, আত্মবিশ্বাসসম্পন্ন মানুষও কখনো কখনো টেনশনের শিকার হন। যারা একটু কল্পনাপ্রবণ, স্বপ্নবিলাসী ও সংবেদনশীল তাদের টেনশনের শিকার হতে দেখা যায় অতিমাত্রায়। যেসব মানুষ ছোটখাটো সমস্যায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন, যারা অন্যদের সঙ্গে ভালোভাবে মিশতে পারেন না, যারা বেশি দুশ্চিন্তা করেন, যাদের নিজের ওপর আস্থা কম—এ ধরনের মানুষদের খুব। সহজেই টেনশন জাপটে ধরে। এক্ষেত্রে টেনশন তাদের মানসিকভাবে খুবই দুর্বল করে দেয়। টেনশন ডিঙিয়ে বেরিয়ে আসা তাদের জন্য হয়ে ওঠে দুঃসাধ্য। ফলে সাফল্য হাতের মুঠো থেকে উড়ে যায়, আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হয়। তুলনামূলক আত্মবিশ্বাসী ও কর্মঠ মানুষদের টেনশন কমই বিভ্রান্ত করতে পারে। কখনোবা টেনশনগ্রস্ত হলেও সামর্থ্যবান মানুষেরা অল্প সময়েই তা থেকে নিজেদের উত্তরণ করতে পারেন।

টেনশনের ভালো-মন্দ

 বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে আছে লক্ষ কোটি নক্ষত্র। আজকের জীবনের যান্ত্রিক যাপনে এমনি লক্ষ কোটি কারণ আছে টেনশনের। আদিম জীবনে ফিরে যাওয়া ছাড়া টেনশনের হাত থেকে শতভাগ মুক্ত থাকা অসম্ভব। টেনশনের যেমন হাজারটা মন্দ প্রভাব আছে, কিছু কিছু ভালো দিকও তেমনি আছে। অনেক মনোবিজ্ঞানীই বলেছেন, জীবনে কিছু পরিমাণ টেনশন থাকা ভালো। নয়তো উন্নতি করা যায় না। আসলে কিছুটা টেনশন জীবনে কাজ করার উৎসাহ জোগায়, বেঁচে থাকায় নিয়ে আসে আনন্দ-উত্তেজনা এবং দূর করে জীবনের একঘেয়েমি। সুতরাং টেনশনের ভালো দিকও কিছু আছে। কেবল মাত্রা অতিক্রম করলেই বিপদ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা প্রায় সবাই সেই মাত্রা ডিঙিয়ে চলে যাই বহুদূর। সমস্যা সৃষ্টি হয় তখনই।। আনন্দ-আহ্লাদের বর্ণিত ছটা বর্ণহীন হয়ে যায়। ঘাড়ের ওপর বোঝার মতো মনে হয় জীবনটাকে। টেনশনে পড়ে ক্লান্ত কণ্ঠে বলি—আর পারছি না। 

কাল্পনিক ভয় থেকে মুক্ত থাকা

 ছোট বা বড় যে-কোনো রকম ভয় থেকেই তৈরি হতে পারে টেনশন। কোনো কাল্পনিক ঘটনা, সম্ভাব্য বিপদ, সম্ভাব্য পরিস্থিতি ইত্যাদি ভেবে অনেকেই আমরা টেনশনে ভুগি। যেমন—বাড়ি থেকে বের হতে একটু দেরি হয়ে গেছে। অফিস গেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চোখ রাঙানি সহ্য করতে হবে। এটা মনে হতেই আপনার ভেতর তৈরি হয়ে গেল টেনশন। জীবন বিপন্ন করে রুদ্ধশ্বাসে ছোটা শুরু করলেন। বাসে ড্রাইভার-হেলপারকে দ্রুত গাড়ি চালানোর জন্য বকাঝকা শুরু করলেন। বেহুশের মতো কোনো দিকে না তাকিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হলেন। এক সময় হয়তো অফিসে পৌঁছালেন। একবার ভেবে দেখুন তো বসের চোখ রাঙানির ভয়ে আপনি কতগুলো ঝুঁকি বহন করেছেন। আপনার জীবনের তুলনায় নিশ্চয়ই বসের চোখ রাঙানি বড় নয়। বরং দেরি হওয়ার কারণ ও পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলে নিশ্চয়ই আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতেই দেখবেন। তিনিও তো মানুষ। তার ক্ষেত্রেও তো এ রকম হতে পারে। সুতরাং অযথা ভয় পেয়ে। টেনশন করার কোনো মানে হয় না। এ ধরনের অসংখ্য অর্থহীন টেনশনে আমরা। ভুগি এবং নিজেরাই নিজেদের জীবনে বিপদ ডেকে আনি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যতটুকু না ক্ষতি হবে তার চেয়ে শতগুণ অবচেতনে ভেবে বসি। মনগড়া সমস্যা বা বিপদের কথা ভেবে ভুগতে থাকি ক্রনিক বা ক্রমাগত টেনশনে। সুতরাং পরিস্থিতি সম্পর্কে অনর্থক ভয় না পেয়ে, ঠান্ডা মাথায় সবকিছু বিবেচনা করবেন এবং শান্তভাবেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন। মনে রাখবেন, ভুল মানুষেরই হয়। ভুল করে ভয় পেয়ে সেই ভুল শোধরাতে আপনি কখনোই পারবেন না।

সময় সম্পর্কে সচেতনতা 

অজস্র ব্যস্ত মানুষ টেনশনে পড়েন সময়ের কাজ সময়মতো করতে না-পারার জন্য। কাজের তুলনায় তাদের মনে হয় সময় কম। তাড়াহুড়ো করে কাজ করতে গিয়ে তা সুচারু হয় না। আসলে সময় নিয়ে যারা এ ধরনের টেনশনে ভোগেন, তাদের প্রত্যেকেরই উচিত সময়ের সদ্ব্যবহার সম্পর্কে সঠিক চিন্তা-ভাবনা করা। এ জন্য চাই সুষ্ঠু পরিকল্পনা। আগের দিন রাতেই করে নেওয়া যেতে পারে আগামী দিনের পরিকল্পনা। দিনের কোন সময় কোন কাজ করবেন, ঠিক করে রাখুন এবং তা অনুসরণ করুন। মনে রাখবেন টেনশন শুধু সমস্যাই তৈরি করে, কাজের গতি কমিয়ে দেয়। কাজের মানও অক্ষুন্ন থাকে না। আবার অনেকেই আলসেমির কারণে আজকের কাজ কালকের জন্য জমিয়ে রাখেন, আর তাতে কাজের চাপ বেড়ে যায়। যার কারণে টেনশনের উৎপত্তি হয়; সুতরাং কষ্ট করে হলেও আজকের কাজ আজই সম্পন্ন করুন। কাজের গুরুত্ব ও পরিমাণ বুঝে ঠিক করে নিতে হবে কোন কাজ কতখানি সময়ে কখন সেরে নিতে হবে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেকগুলো কাজ আছে, সেগুলো সময়মতো করতে না পারলে একটার জের অন্যটার ওপর পড়ে এবং আগের কাজটাও ঠিকমতো করা হয় না। কাজের সময় যাতে অন্য কেউ ব্যাঘাত না ঘটান সেদিকে সচেষ্ট থাকুন, প্রয়োজনে বিনয়সহ জানান আপনার সমস্যার কথা। একটানা কাজ করতে করতে অনেক সময় বিরক্তিও এসে যায়। কখন কাজটা শেষ করতে পারব, কাজটা ঠিকমতো করতে পারব কি না—এ ধরনের টেনশন জাগ্রত হয়। এ থেকে উত্তরণের পথ হলো—কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু করে বিশ্রাম নেওয়া। এতে একঘেয়েমি দূর হয়। এই বিশ্রাম হতে পারে চুপ করে খানিকটা সময় বসে থাকা, গান শোনা, এককাপ চা খাওয়া কিংবা একটু ঘুরে আসা। সময়ের সদ্ব্যবহার করতে পারলে টেনশনে পড়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।

নিজের ওপর আস্থা বা আত্মবিশ্বাস 

আমাকে দিয়ে হবে না—এ ধরনের চিন্তা থেকে বিরত থাকুন, বরং ভাবতে চেষ্টা করুন অন্যেরা পারলে আপনি কেন পারবেন না? যেসব মানুষের নিজের ওপর আস্থা কম, তারা খুব সহজেই টেনশনে আক্রান্ত হন। নিজের ক্ষমতার প্রতি আপনার আসলে ধারণা নেই। চেষ্টা করলে কী না করা যায়! কিন্তু শুরুতেই যদি আপনি একেবারে হাল ছেড়ে দেন, তাহলে চলবে কেন? হয়তো প্রথম চেষ্টায় হলো না। আরেকবার চেষ্টা করুন—নিশ্চয়ই হবে। এত টেনশনের কী আছে? টেনশনের কারণেই আসলে আপনার পক্ষে কাজটি করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। টেনশনমুক্ত হয়ে চেষ্টা করে যান, একসময় ঠিকই আপনি কাজটি করে ফেলতে পারবেন। নিজের দক্ষতা বাড়াতে প্রয়ােজনে প্রশিক্ষণ নিন। নিজের ওপর পূর্ণ আস্থা নিয়ে কাজ করলে সফল না হওয়ার কোনো কারণ নেই। 

শরীরের প্রতি যত্ন ও পরিচর্যা

মন এবং শরীর এক সুতোয় বাঁধা, এ তো আমাদের সবারই জানা। টেনশনে মনের পাশাপাশি শরীরেরও একটি সম্পর্ক আছে। যারা নিজের শরীরের প্রতি যত্নবান নন, তাদেরকে টেনশন সহজেই কাবু করে ফেলে। শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকলে সহজেই টেনশনকে ডিঙানো সম্ভব। অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি, আমাদের শরীরের মধ্যে কোথায় কী ঘটছে। যার ফলে শারীরিক অস্বস্তি নিয়ে তৈরি হয় টেনশন। এক্ষেত্রে নিয়মিত ডাক্তারি পরামর্শ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা খুবই জরুরি। কিছু হালকা ব্যায়াম আছে যেগুলো নিয়মিত চর্চা করলে শারীরিকভাবে সবল হয়ে ওঠা যায়। তা ছাড়া ব্যায়াম বা শরীরচর্চা দেহ ও মনকে সজীব করে তােলে এবং তাতে টেনশনে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে প্রথম প্রথম দু-চারটা খালি হাতে ব্যায়াম অল্প সময় ধরে সাধ্যমতাে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তা বাড়িয়ে দিন। বাজারে প্রচুর ব্যায়ামের বই পাওয়া যায়, যা থেকে আপনি সহজেই ব্যায়ামের কৌশলগুলো রপ্ত করে নিতে পারবেন। নিয়মিত ব্যায়ামে মন প্রফুল্ল থাকে। টেনশন কাটাতে ব্যায়াম সহায়তা করে। 

সহজ ও সদয় মনোভাব

ভুল হতেই পারে, আপনার কিংবা আপনার পরিচিত যে কারও। নিজের বা অন্যের ভুল করাকে সহজভাবে নেওয়ার চেষ্টা করুন। এতে টেনশন কমে যাবে। অন্যের প্রতি সদয় থাকুন। রাগারাগি কিংবা হইচই কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। জীবনের অপ্রাপ্তি আর ব্যর্থতাকে সহজভাবে নেওয়ার চেষ্টা করুন। মানুষের সব আশা তো পূর্ণ হয় না। হতাশা মানুষের ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাসে ধ্বস নামায়, সামান্য কারণেই তখন টেনশন বেড়ে যায়। আসলে জীবনকে সহজ ভাবলে সহজ আর জটিল ভাবলে জটিল। অনেকের স্বভাব আছে সবকিছুর মধ্যে নেতিবাচক দিকটি খুঁজে বের করা এবং তা নিয়ে টেনশন বোধ করা। এটা ঠিক নয়। প্রতিটি কাজের মাঝে আগে সুন্দর দিকটা খুঁজে বের করুন। তাহলে কাজটি করতে আগ্রহ বোধ করবেন, আনন্দ পাবেন। টেনশন থেকে দূরে থাকতে পারবেন। আমাদের এই পৃথিবীটা বড় সুন্দর, আসুন সুন্দরের অনুসন্ধান করি। টেনশন থেকে নিজেদের দূরে রাখি। 

ইগো সমস্যা এবং বাস্তবতা উপলব্ধি

ইগো সমস্যার কারণে আমাদের ভেতর প্রায়ই টেনশন দানা বাঁধে। মানুষের ইগো একটি মারাত্মক জিনিস। কারণে অকারণে ইগো কমপ্লেক্সে ভুগবেন না। প্রথমে নিজেকে জয় করুন। নিজের অবস্থান বুঝতে চেষ্টা করুন। সহজভাবে অন্যের সঙ্গে মেশার মানসিকতা গড়ে তুলুন। এডাপটেশন পাওয়ার বাড়াতে সচেষ্ট হোন। | নিজের অবস্থান বুঝে বাস্তবতাকে মেনে নিন। বিপদ বা সমস্যা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। এমন কিছু ঘটনা বা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে যা এড়ানো সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে ওসবকে মেনে নিয়ে তার মুখোমুখি হওয়া উচিত। সেগুলোকে জয় করার জন্য চেষ্টা করা উচিত। বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার মনোভাব ধারণ করতে পারলে ইগাে প্রবলেম থাকবে না। মনে রাখবেন, প্রত্যেক | মানুষের কর্মক্ষমতার একটা সীমা থাকে। সেটা মেনে নিতে পারলেই ‘সব কাজ কেন করে উঠতে পারছি না’ ভেবে আর টেনশন হবে না।

দুঃখ-কষ্ট ভাগাভাগি

প্রতিটি মানুষেরই বুকের গহীনে কিছু জমাট বাঁধা দুঃখ-কষ্ট থাকে। এসব কষ্টের কথা মনে হলেই অনেকের ভেতর টেনশন তৈরি হয়। ক্যাথলিক গির্জায় কনফেশন বক্স নামের একটি জিনিস থাকে। পাপীরা এসে সেখানে পাপ স্বীকার করে ভারমুক্ত হন। মনে পাপ না থাকলেও অনেক সময়ই থাকে গোপন দুঃখের ভার। | কোনো কিছু করতে না পারার গ্লানি, কোনো কিছু না পাওয়ার স্মৃতি, কোনো অবাঞ্ছিত ঘটনা ইত্যাদি থেকে শুরু করে কোনো ভুল বা অন্যায় করে ফেলায় অপরাধবোধ মানুষের মনকে খারাপ করে। এক্ষেত্রে সমাধান হলো—কাছের একজনকে সবকিছু খুলে বলা, তাকে নিজের গোপন কষ্টের ভাগ দেওয়া। প্রায় সব ধর্মেই আছে পাপ বা গ্লানি অকপটে স্বীকার করে পাপমুক্ত হওয়ার রীতি। স্বামী-স্ত্রী পরস্পর বা কোনো নির্ভরযোগ্য বন্ধুর সঙ্গেও এটা করা যায়, তাতে অনেকখানি এড়ানো সম্ভব টেনশনের আক্রমণ। 

সামর্থ্য অনুযায়ী সীমিত চাহিদা 

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আমরা সামর্থ্যের কথা না ভেবে হাতে টাকা এলেই অপব্যয় করে ফেলি। যেমন মাসের শুরুতে বেতন পেয়ে ধুমসে খরচ করে মাসের মাঝামাঝি সময়ে পকেট প্রায় খালি করে ফেললাম। হঠাৎ খেয়াল হলো— হায় হায়। মাসের বাকি দিনগুলো কীভাবে কাটাব! শুরু হলো টেনশন। অথচ একটু বুঝে-শুনে খরচ করলে হয়তো এই টেনশনে পড়তে হতো না। অনেকেই আবার নিজের সামর্থ্যের বাইরে কোনো কিছু পাওয়ার কল্পনায় বিভোর থাকেন, আর অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা থেকে নিজের ভেতর জন্ম নেয় টেনশন। প্রতিটি মানুষেরই নিজের উপার্জনের ওপর ভিত্তি করে চাহিদা সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। নইলে সাধ থেকে যায় সাধ্যের নাগালের বাইরে, অপ্রাপ্তিজনিত টেনশন হয় নিত্যসঙ্গী।

মেধা বিনিয়োগ

প্রতিটি মানুষই কিছু-না-কিছু মেধা নিয়ে এই পৃথিবীতে আসে। কিন্তু আমরা এই মেধা আসল জায়গায় বিনিয়োগ করতে পারি না। নিজের মেধা অপরের ক্ষতির জন্য ব্যয় না করে তা নিজের উন্নয়নে ব্যয় করলে জীবনে আসে সমৃদ্ধি। সুতরাং আপনার সুপ্ত মেধাকে চেনার চেষ্টা করুন, মেধাকে কাজে লাগান। মেধা মানুষের এমন একটি উপাদান, যা কখনো অলসভাবে অব্যবহৃত অবস্থায় থাকতে পারে না। নিজের অজান্তেই মেধা রূপান্তরিত হয় আকাশ-কুসুম কল্পনায়, অসম্ভব ভাবনায়, উদ্বেগআশঙ্কায় ইত্যাদিতে। অব্যবহৃত মেধা তৈরি করে জটিল যন্ত্রণা। সুতরাং আপনার মেধাকে সুষ্ঠু পথে পরিচালিত করুন, দেখবেন অকারণে টেনশনে ভুগতে হবে না। 

সম্পর্কের উন্নয়ন

আমাদের জীবনে অনেক জটিল টেনশন জন্ম নেয় অন্যের সঙ্গে সম্পর্কজনিত কারণে। ঘরে বা কর্মক্ষেত্রে সবার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখলে অহেতুক টেনশন থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা যায়। যেমন—কর্মক্ষেত্রে আকস্মিক কোনো ভুল করে ফেলায় আপনাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডেকে পাঠাল। এক্ষেত্রে কর্মকর্তার সঙ্গে যদি আপনার ভালো সম্পর্ক থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই আপনি এতটা টেনশনে ভুগবেন। এভাবেই পেশাগত জীবনে অনেক উটকো টেনশন থেকে মুক্ত থাকা যায় সহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে। অন্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার প্রধান উপায় হলো আচার-আচরণে আন্তরিক হওয়া, মানুষের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা গড়ে তোলা। যতটা সম্ভব অন্যকে সহায়তা করুন, দেখবেন আপনার বিপদেও অন্যদের কাছ থেকে সে রকম সহযোগিতা পাচ্ছেন। এতে আপনার টেনশন কমে যাবে অনেকখানি।

নিজস্ব জগৎ বিনির্মাণ 

ছোট-বড় সব বয়সী মানুষের একটা আলাদা জগৎ দরকার। পরিশ্রম শেষে যেখানে আশ্রয় নিলে শান্তি পাওয়া যায়। বাইরের কাজ থেকে ফিরে, এমনকি ঘরে থাকলেও রোজ এমন একটি জায়গা পেলে ভালো হয়, যেখানে আর কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না নিজের একান্ত এই জগতে আপনি একা একা বই বা পত্র-পত্রিকা পড়তে পারবেন, গান শুনতে পারবেন, চা খেতে পারবেন, নিছকই চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে বসে থাকতে পারবেন এই যে কিছুটা সময় নিজের সঙ্গে কাটানো এটা উত্তেজিত বা শ্রান্ত মনের ওপর শান্তির প্রলেপ ছুঁয়ে দিতে পারে মনের ভঁজে জমে ওঠা টেনশনের ভার অনেকটা হালকা করে দিতে পারে নিজস্ব জায়গা বা নিজস্ব জগতের মূল কথাটি হলো প্রয়োজনে এমন একটি পরিবেশে চলে যাওয়া, যেখানে বাইরের জগতের দুর্ভাবনা বা টেনশন আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য ছুঁতে পারবে না

Leave a Reply

Your identity will not be published.