মাইল হাই সিটি। সিরাজুল কবির চৌধুরী

মাইল হাই সিটি। সিরাজুল কবির চৌধুরী

২০১৬ সালের ৪ জুন। মিজোরি থেকে আমরা ডেনভার যাব, পূরবী বসু ও জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের বাড়িতে। দুপুর দুটো বিশ মিনিটে আমাদের ফ্লাইট। স্কুলজীবনের বন্ধু শাহীনের গাড়িতে এয়ারপোর্টের উদ্দেশে বের হলাম। অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের নাম সুন্দর করে মার্ক করা থাকে। ফ্রনটিয়ার এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে কোনো ঝামেলা ছাড়া বোর্ডিং পাস পেয়ে গেলাম।

শাহীনকে বিদায় দিয়ে ভেতরে এসে লিজনাদের আর খুঁজে পাচ্ছি না। বোর্ডিং পাস আমার কাছে। ওদের কাছে ফোনও নেই। একটু পরে আমার মোবাইলে এক মহিলার ফোন। সে বলল, গেট নম্বর ৭-এ তোমার পরিবার অপেক্ষা করছে। আরিয়ানার কাছে আমার মোবাইল নম্বর লেখা ছিল। সে-ই ফোন করিয়েছে। পৌনে দুঘণ্টা সময় লাগল ডেনভার এয়ারপোর্টে পৌঁছতে।

পূরবীদিকে ফোন করলে তিনি বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে এয়ারপোর্ট থেকে পার্কিংয়ে আসতে হবে। ল্যাগেজ নিয়ে লেভেল ৫-এ এসে পূরবীদিকে পেয়ে গেলাম। বাইরে এসে দেখি, জ্যোতিদা ড্রাইভিং সিটে বসা।

হুমায়ুন আহমেদ তাঁর চিকিৎসার সময় ডেনভার বেড়াতে গিয়েছিলেন। উনার বেড়ানো জায়গাগুলোয় আমরাও যাব। জেমস ডব্লু ডেনভারের নামে গড়ে ওঠা ‘ডেনভার’ কলরাডো রাজ্যের রাজধানী। রকি মাউন্টেনের পূর্বদিকে এই শহরের অবস্থান। ডেনভারের ডাক নাম ‘মাইল হাই সিটি’। কারণ সী লেভেল থেকে এই শহরের উচ্চতা ঠিক এক মাইল।

এয়ারপোর্ট পার্কিং থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠেছি। ঝকঝকে রোদের মধ্য দিয়ে গাড়ি ১২০ মাইল বেগে ছুটে চলছে। চারদিকে বিস্তীর্ণ সমভূমি। শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চোখের দৃষ্টি পৌঁছাচ্ছে না। ন্যাড়া সমভূমিই বলা চলে। সোজা লম্বা রাস্তার শেষে যেন আকাশ নেমে পড়েছে। দূরে দূরে কিছু কলকারখানা চোখে পড়ছে। মানুষজন নেই বললেই চলে। জানতাম সব দেশের আকাশ এক। কথাটা ঠিক নয়। ডেনবারের আকাশ অন্যরকম। নেশাধরা আকাশ। কেবল চেয়ে থাকতে ইচ্ছা করে।

এনসেনাডা স্ট্রিট-এ পূরবীদি’র বাসা। ট্রিপ্লেক্স হাউজ। ছবির মতো সুন্দর। সামনে সবুজ ঘাসের উঠোন। বাড়ির পেছনে এক চিলতে লন। কাঠের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। নানা ধরনের ফুলের গাছ। কয়েকটি দেশি গাছও আছে। তাঁদের দুই ছেলেমেয়ে। মেয়ে জয়িসা ও ছেলে দীপন। দুজনের কেউই বাবা-মা’র সঙ্গে থাকে না।

এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় পৌঁছে জ্যোতিদা গাড়ি থেকে বাটন পুশ করতেই গ্যারেজের দরজা খুলে গেল। গাড়ি গ্যারেজে প্রবেশ করা মাত্রই আবার বাটন চেপে গ্যারেজের দরজা বন্ধ করে দিলেন। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে যাব, এমন সময় হুড়মুড় করে বাবল (পোষা কুকুর) লাফ দিয়ে প্রথমে আমার, পরে আমার স্ত্রী লিজনার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। লিজনা মাটিতে পড়ে গেল। বিষয়টি দিদি লক্ষ করে বললেন, নতুন কেউ এলে বাবল প্রথম প্রথম এ রকম করে।

ভেতরে ঢুকে সোফায় বসলাম। বাবল আবার আমার কোলে উঠতে চাইল। লিজনা ভয়ে দুপা সোফার ওপর উঠিয়ে রাখল। তারপরেও বাবল ওকে ছাড়ল না। জিহবা দিয়ে পা চাটতে লাগল। আনান এসে মাকে রক্ষা করল। সে বাবলকে সঙ্গে নিয়ে গেল।

বাবল হচ্ছে মাঝারি আকারের একটি কুকুর। দিদির মেয়ে জয়িসা বছর দুয়েক আগে নিউইয়র্ক থেকে ওকে কিনে আনে। কুকুরকে তারা মানুষের মতোই ভালোবাসে। ওর জন্যে বাগানে আলাদা কাঠের ঘরও তৈরি করা আছে। বেসমেন্টেও রয়েছে থাকার ব্যবস্থা।

৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। সন্ধ্যায় জ্যোতিদা আমাদের নদীর পাড়ের কাছাকাছি জায়গায় নামিয়ে দিলেন। চমৎকার ফায়ারওয়ার্কস হচ্ছে। প্রচুর মানুষ পরিবার নিয়ে দেখছে। দশটার সময় দাদা এসে আমাদের নিয়ে গেলেন।

রাত ২টা। লিজনা হাই তুলছে। দিদিকে বলে রেখেছি সকালের নাশতা আমরা নিজেরা তৈরি করে নিব। বিদায় নিয়ে শুতে গেলাম। রুমে গিয়ে দেখি, বাবল আমার বিছানায় শুয়ে আছে। আমি চাদরে জোরে টান দিলাম। বাবল নিচে পড়ে চিৎকার করতে করতে ওপরে চলে গেল। দাদা দৌড়ে এলেন। বললেন, কী ব্যাপার ? আনান বলল, বাবা বাবলকে টান দিয়ে ফেলে দিয়েছে। দাদা আমার ওপর বিরক্ত হলেন।   

পরেরদিন অনেক ভোরে ঘুম ভাঙলেও নয়টার সময় ওপরে এলাম।  দেখি পূরবীদি নাশতা বানাচ্ছেন। দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে শপিং সেন্টার “macy’s”-তে গেলাম। এটি মেসির সবচেয়ে বড় শোরুম।

৬ জুলাই ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতর। দেশের বাইরে প্রথম ঈদ। তাও সপরিবারে। সকাল ১০টায় ‘রেড রকস পার্ক অ্যান্ড এম্পিথিয়েটার’ দেখতে বের হলাম। এটি ডেনভার থেকে পনেরো মাইল পশ্চিমে একটি প্রাকৃতিক অবকাঠামোর অর্ধচন্দ্রাকারে সাজানো মুক্তাঙ্গণ। স্টেজ-এর পেছনে রয়েছে বিরাট আকৃতির পাথর। ডানে-বামে রয়েছে বিস্তৃত পাহাড়ের সারি।  পাথরের তৈরি আসন সংখ্যা ৯৫২৫। এটির আর্কিটেক্ট Burnham Hoyt. পৃথিবীর প্রথিতযশা কণ্ঠশিল্পীরা গত এক শ বছর ধরে এখানে সংগীত পরিবেশন করে আসছে। হুমায়ূন আহমেদও এখানে এসেছিলেন। প্রবেশপথের মূল দেয়ালে টাঙানো রয়েছে শুরু থেকে এ পর্যন্ত যে সকল শিল্পী গান গেয়েছেন তাদের ছবিসহ তালিকা। রয়েছে তাদের নানাবিধ ব্যবহৃত সামগ্রী। বিরাট আকারের লাল পাথরে ঘেরা অঞ্চলটিকে মনে হয় পৃথিবীর বাইরের কোনো গ্রহ।

গত রাতে ইরফান আমাদের ঈদের দাওয়াত দিয়েছিল। সে স্থপতি-নাট্যকার-ভ্রমণ লেখক শাকুর মজিদের বন্ধু। পূরবীদি বললেন, চল ইরফানদের বাসায় যাই। ওদের বাসায় যখন পৌঁছলাম, তখন তিনটা বেজে গেছে। ভেতরে ঢুকে দেখি শেষের দল খেয়ে বের হচ্ছে। টেবিলে বিরাট আয়োজন।

ঈদের পরের দিন। আজ আমরা দেখতে যাব ‘গার্ডেন অব গডস’। কলোরাডো স্প্রিং-এ অবস্থিত ডেনভারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান। দাদা ও পূরবীদিসহ এগারোটার দিকে বের হলাম।

পাহাড়ের গা বেয়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে আর একটার পর একটা বিরাট আকারের পাথরের মূর্তি সামনে এসে পড়ছে। জায়গায় জায়গায় নেমে ছবি তোলা হচ্ছে। ১৯৭১ সালে এটিকে ন্যাশনাল ন্যাচারাল ল্যান্ডমার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ জায়গাটিকে প্রথমে রেড রক কোরাল বলা হতো। ১৮৫৯ সালের আগস্টে ২ জন সার্ভেয়ার কলোরাডো রাজ্যের সম্প্রসারণ কাজে হাত দেন। এদের মধ্যে একজন রুফুস ক্যাবল পাথরের সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে বলেন, এর নাম হবে ‘গার্ডেন অব গডস’। ১৯০৯ সালে স্থাপিত এই গার্ডেনের আয়তন ১৩৬৭ একর।

ঘুরতে ঘুরতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ‘ব্যালেন্সড রক-এর’ নিচে এসে দাঁড়ালাম। মনে হচ্ছে এখনই গায়ে এসে পড়বে। আরিয়ানা ও আনান পাথরের গা বেয়ে ওপরে উঠে বসল। নামার সময় আঘাত পেয়ে আনানের মাথা কিছুটা কেটে গেল। পূরবীদি দোকান থেকে বরফ নিয়ে ওর মাথায় স্পঞ্জ করলেন।

৯ জুলাই। জ্যোতিদা আজ আমাদের নিয়ে যাবেন ‘ডেনভার মিউজিয়াম অব ন্যাচার অ্যান্ড সায়েন্স ’-এ। ১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মিউজিয়ামে রয়েছে ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞান শিক্ষার অপূর্ব সুযোগ। রয়েছে বিভিন্ন রকমের প্রদর্শনী, অনুষ্ঠান, নানাবিধ কার্যক্রম—যার মাধ্যমে দর্শনার্থীরা কলোরাডোসহ পৃথিবী ও বিশব্রক্ষ্মান্ডের যাবতীয় প্রাকৃতিক ইতিহাস জানতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন ধরনের এক মিলিয়ন বস্তু এখানে রয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলাদা আলাদা ক্লাসেরও ব্যবস্থা আছে।        

ইরফান মাঝেমাঝে এখানে কাজ করে। তার কাছে এন্ট্রি পাস আছে। বারোটার দিকে ইরফানের পরিবার ও আমরা একসঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করি। বা”চারা দারুণ খুশি। কোনটা বাদ দিয়ে কোনটা দেখবে! শূন্যে পরিভ্রমণ, রোবট বনাম মানুষের খেলা, ড্রাইভার ছাড়া রাস্তায় গাড়ি চালান,  নানান রকম মাইন্ড গেমস, ইলেকট্রিক সার্কিট তৈরি, নানা রকম কুইজ প্রোগ্রাম। একটা কুইজ প্রোগ্রামে সঠিক উত্তর দিয়ে আনান পুরস্কার পেয়ে গেল। ঘুরতে ঘুরতে সামনে পড়ল একটি বায়োলজিক্যাল ল্যাব। বাচ্চারা ডাক্তারের এপ্রোন পরে ভেতরে চলে গেল। এখানকার অধিকাংশ কর্মীই বয়স্ক। তারা সোশ্যাল সার্ভিস দিচ্ছে।

ডেনভারের আরেকটি প্রধান আকর্ষণীয় স্থান ‘রকি মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্ক ’। বিশেষ করে মাউন্টেন টেইলারদের জন্য এটি খুব আনন্দদায়ক জায়গা। যেতে সময় লাগবে তিন ঘণ্টা। এখানে দেখার মতো বিষয় হলো— রকি মাউন্টেন, লং পিক, বিয়ার লেইক, আলবার্টা ফলস, স্কয়ার লেক, ওজেল ফলস, প্রসপেক্ট মাউন্টেন, মোরেইন পার্ক মিউজিয়াম, দ্য স্ট্যানলি হোটেল ইত্যাদি। 

ইরফানরা চারজন আর আমরা সাতজন। মোট এগারো জনের দল। না এগারো নয়, সংখ্যাটা বারো হবে। বাবলও আমাদের সঙ্গে আছে। পূরবীদি খিচুড়ি এবং ডিম রান্না করে এনেছেন। আর মুকুল ভাবি এনেছেন মাংস। সঙ্গে কুল বক্সে কোক, পেপসি ও ঠান্ডা পানি।

এই প্রথম দীপন আমাদের সঙ্গে কোথাও যাচ্ছে। তাকে আবার সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে ফিরতে হবে। তার দুই বন্ধু আসবে। ঘণ্টাখানেক চলার পর পার্কে পৌঁছালাম। হরিণসহ কিছু জীবজন্তু চোখে পড়ল। দীপন গাড়ি থেকে নেমে বাবলকে কিছুক্ষণ হাঁটিয়ে আনল।

গাড়ি আবার চলা শুরু করল। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে কিছুক্ষণ চলার পর গাড়ি ‘স্কয়ার লেকে’ এসে থামল। ভীষণ গরম। লেকের পাড়ে কিছুক্ষণ বসলাম। এখানে আসার আরেকটি কারণ পরে জানলাম। এর খুব কাছেই ‘দ্য স্ট্যানলি হোটেল’। এই নামে আশির দশকে চমৎকার একটি সাইকোলজিক্যাল মুভি তৈরি হয়েছিল। শুধু ছবির চিত্রায়নের কারণে এখন হোটেলটি একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

রকি মাউন্টেনে পৌঁছে সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। প্রচণ্ড বাতাস। ঘন জঙ্গলের ভেতর নানা জায়গায় বসার বেঞ্চ । দ্রুত দুটি বেঞ্চ  দখল করে বসলাম। পিকনিকের মতো করে সবাই আরাম করে খেলাম।

আমরা যেখানে আছি তার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০০০ ফুট। খাওয়া শেষ করে লেক দেখতে যাওয়ার কথা। আমি, দীপন এবং দাদা-দিদি থেকে গেলাম। চারটা বেজে গেছে, দীপনকে ফিরতে হবে। ওদের সঙ্গে আমিও ফিরে এলাম। পরে শুনেছি, ইরফানরা অনেক কষ্ট করে এক গাড়িতে পাহাড়ের ওপরে রওনা দিয়েছিল। পূর্ণতা ও পূরককে গাড়ির পেছনে বসতে হয়েছিল। অবশ্য পুলিশ দেখতে পেলে বিপদ হতে পারত। লিজনাদের ফিরতে ফিরতে দশটা বেজে গেল। শুনলাম ওরা খুব মজা করেছে।

১১ জুলাই। ডেনভারে আজ শেষ দিন। আগেই বলেছি বাবল পূরবীদের পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সে প্রায়ই সুযোগ খুঁজত দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার। দুবার পালিয়েছেও। এই জন্য সামনের দরজা ব্যবহার করা হতো না। আমরা থাকা অবস্থায় কুকুরটি কিছুটা অসুস্থ ছিল। ঠিকমতো খাচ্ছিল না। দীপন দু’শ ডলার ফি দিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছে। ওদের কাছে পশুপাখি, বিশেষত কুকুর-বিড়াল, এই দুটো প্রাণীর মূল্য মানুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আমাদের কাছে কুকুর মানে কুকুরই।

আগামীকাল ওয়াশিংটন চলে যাব। দিদিরা চলে যাবে নিউইয়র্ক। সন্ধ্যা ৬:৪০-এ আমাদের ফ্লাইট। দাদা আমাদের চারটার মধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিলেন। গন্তব্য ওয়াশিংটন ডিসি। স্প্রিট এয়ারলাইন্সের ৭১৯ বিমান যোগে। প্রথম যাব লসএঞ্জেলস-এর লাসভেগাসে। সেখান থেকে ওয়াশিংটনের বাল্টিমোর। এয়ারপোর্টে। বিদায় মাইল হাই সিটি!

Leave a Reply

Your identity will not be published.