চলতি সংখ্যা
বর্ষ ২৬ সংখ্যা ০২
গৌরবের ২৫ বছর

নাট্যসাহিত্যে ও মঞ্চে নারীর সাহসী এবং সংবেদনশীল অভিযাত্রা

নাট্যসাহিত্যে ও মঞ্চে নারীর সাহসী এবং সংবেদনশীল অভিযাত্রা

নারীর অবস্থান পৃথিবীর মর্মস্থলে প্রোথিত। তিনিই জননী, জায়া, বন্ধু, প্রেমদায়িনী এবং সংসারে সকল কর্মের অনন্ত সঙ্গী। নারী শৌর্যে-বীর্যে ও বীরত্বে পুরুষের তুলনায় কোনো অংশে ছোট নয়। নারীই দেশ ও স্বাধীনতা রক্ষায় স্বামী এবং পুত্রকে যুদ্ধে পাঠায়। ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে দেখা গেছে নারী বীরবেশে যুদ্ধে নেমেছে দেশের জন্যে, শুভ ও কল্যাণকে প্রতিষ্ঠিত করার নিমিত্তে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকের নন্দিনী সর্দারকে বলে— ‘আমি নারী বলে আমাকে ভয় করো না! বিদ্যুৎ শিখার হাত দিয়ে ইন্দ্র তাঁর বজ্র পাঠিয়ে দেন। আমি সেই বজ্র বয়ে এনেছি, ভাঙবে তোমার সর্দারির চুড়া’।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকের অনুবাদ Red Oleanders শিরোনামে বিলেতে প্রচারিত হলে নাটকটির নানা সমালোচনা হয়। কবি বিলেতের Zi The Manchester Guardian পত্রিকায় নাটকের অন্তর্গত বক্তব্য সম্পর্কে আলোকপাত করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতল ইংরেজি ভাষায় ব্যবহারের পাশাপাশি বক্তব্যের দার্ঢ্য রক্ষা করার জন্যে আমি তাঁরই নিজস্ব ইংরেজিতে লেখা থেকে উদ্ধৃত করলাম। “This personality-the devine essence of the infinate in the vessel of the finite – has its last tresure house in women's heart. Her pervading influence will some day restore the human to the desolated world of man.” সবশেষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের জানাচ্ছেন; নারীই একদিন পৃথিবীকে সকল হিংস্রতা থেকে মুক্ত করে তাকে মানুষের বাসযোগ্য করবে। এই আবিষ্কারের অনুরণন অন্তরে ধারণ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভয়ংকর ভীতিপ্রদ কালো ছায়ার বিপরীতে নন্দিনীর ছবিটি এঁকেছেন ‘রক্তকরবী’ নাটকে। নন্দিনী একদিন, কেবলমাত্র প্রেমের শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই লেখনীতে তিনি আরও জানিয়েছেন যে, শেকস্পীয়রের বিশ্ববিখ্যাত নাটক ‘ম্যকবেথে’র লেডি ম্যাকবেথের সঙ্গে যেন নন্দিনীকে তুলনা না করি। লেডি ম্যাকবেথ রক্তমাংসের এক শরীরী মানুষ, আর নন্দিনী চরিত্রের অন্তরে রয়েছে বিমূর্ততা। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সৃজনের অনেকখানি জুড়ে আছে বিমূর্ততা কারণ বিমূর্ততাই জীবনের সারাৎসার, যে তাকে নিয়ে যেতে পারে এক অনাস্বাদিত আনন্দলোকে। মূর্ত মানুষ বিমূর্ততা ছাড়া বাঁচতে পারে না; যা তাকে ‘চোখের আলোয়’ চোখের বাইরে দেখতে সাহায্য করে এবং জীবনকে প্রাত্যহিকতা থেকে বের করে এনে তার জীবন চর্যায় নতুন দ্যোতনা যোগ করে, সত্য ও সুন্দরের পথনির্দেশ করে। এই প্রসঙ্গে শেকস্পীয়রে'র ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের এক বিখ্যাত নারী চরিত্রের প্রসঙ্গ সহজাতভাবে চলে আসে। আমাদের দেশের গৌরব, অনন্য সাহিত্য স্রষ্টা সৈয়দ শামসুল হক ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের একটি অসাধারণ অনুবাদ করেছেন বাংলা ভাষায়, যার তুলনা অনুবাদ সাহিত্যে বিরল। এই উক্তি আমার নয়। বাংলা থিয়েটারের যশস্বী নাট্যকার নির্দেশক উৎপল দত্ত, সৈয়দ শামসুল হককে শেকস্পীয়রের নাটকের বিশ্বসেরা অনুবাদক হিসেবে মনে করতেন। ‘ম্যাকবেথ’ নাটকে ম্যাকবেথ কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও নাটকের প্রধান চালিকাশক্তি লেডি ম্যাকবেথ। পৃথিবীর নাট্য সাহিত্যে তাঁর মতো উচ্চাভিলাষী নারীর সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না, তেমনি উচ্চাভিলাষের অভিশাপে দগ্ধ, এমন নারীর সাক্ষাৎ নাট্য সাহিত্যে দুর্লভ। হয়তো, পুরুষের ক্ষেত্রে এমনটি হতো না। সৈয়দ শামসুল হক অনূদিত লেডি ম্যাকবেথের একটি সংলাপের অংশবিশেষ নিচে উদ্ধৃত হলো।

লেডি ম্যাকবেথ: কাকের কর্কশ কণ্ঠ চিরে যাক কাল-স্বাগতমে/ আমার এ দুর্গে এসে ডানকান যখন দাঁড়াবে/ প্রেতযোনি এসো তবে আমার এ প্রস্তুত অন্তরে/ নারীত্ব নিধন করো, এসো, এ দেহের প্রতি কোষে/ সঞ্চারিত করো তীব্র নিষ্ঠুরতা, দাও রক্তস্রোতে এমন প্রবাহ এনে নিমজ্জিত হয়ে যায় যাতে সব অনুতাপ বোধ, চিত্তকে কঠিন করে দাও/ যেন লক্ষ্যে কম্পিত না হই, স্তম্ভিত না হয়ে যায় উদ্দেশ্য সাধন।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সৈয়দ শামসুল হক ইংরেজিতে লেখা ‘unsex me here’-এর চমৎকার অনুবাদ করেছেন—নারীত্ব নিধন করো। নারীত্বের শুভ্রতা ও কোমলতা সম্পর্কে পৃথিবীর কোনো লেখকই অস্বীকার করেন নি। নারীত্ব নীধন করা ছাড়া কোনো নারীই নিষ্ঠুর কাজ করতে সক্ষম হয় না।

শেকস্পীয়রের আরেকটি বিখ্যাত কিন্তু দুরূহ নাটক সৈয়দ শামসুল হক অনুবাদ করেছেন। নাটকের শিরোনাম ‘ক্রয়লাস ও ক্রেসিদা'। এই নাটকটি বর্তমান লেখকের নির্দেশনায় নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় মঞ্চায়িত করে। আমরা ট্রয়ের হেলেন ও প্যারিসের প্রেম উপাখ্যান সম্পর্কে অনেকে জানি, কিন্তু ত্রয়ের রাজা প্রায়ামের কনিষ্ঠ পুত্র ত্রয়লাস ও রাজপুরুষ পান্দারাসের ভাইঝি ক্রেসিদার প্রেম উপাখ্যান সম্পর্কে তেমন জ্ঞাত নই। এই দীর্ঘ নাটকটিতে দেখা যায় অনেক চরিত্রের সমাহার ঘটেছে। গ্রীক ও ট্রোজান প্রায় প্রতিটি ঐতিহাসিক চরিত্রের সাক্ষাৎ মেলে এই নাটকে। এই নাটকটিও আমাদের বরেণ্য নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক অত্যন্ত পারঙ্গমতার সঙ্গে এই নাটকের অনুবাদ করেছেন। সৈয়দ শামসুল হক অনূদিত ‘ত্রয়লাস ও ক্রেসিদা’র একটি অনন্য দীর্ঘ সংলাপ শোনা যাক। প্রেমের সত্যতা ও যথার্থতা নিয়ে এমন অর্থপূর্ণ ও দ্যোতনাময় সংলাপ আমরা খুব কম নাটকেই দেখি। আমি এই সংলাপকে সাধারণ রোমান্টিক সংলাপের পঙ্ক্তিভুক্ত করতে চাই না।

ক্রেসিদা: এই যদি হয়, তবে হোক। আরও আমি যদি প্রমাণিত হই

বিশ্বাসঘাতক, যদি এক চুলও আমি সরে যাই

সত্য থেকে, তবে যখন এ বর্তমান হয়ে যাবে

অতীত প্রাচীন, সময় নিজেই ভুলে যাবে এই

সময়ের কথা, অবিরাম জলের ফোঁটায় এই

ত্রয়ের পাথরগুলো ক্ষয়ে যাবে যেদিন, যখন

জনপদগুলাকে গ্রাস করে নেবে মহাকাল, তারা

গত হবে বিস্মৃতিতে, যখন সাম্রাজ্য চূড়া চূর্ণ

হয়ে ধুলোয় মিশবে, তখন তো তার বিশ্বাসভঙ্গের

পরে আরো কত বিশ্বাসঘাতিনী—তখন আমাকে-

যদি হই বিশ্বাসঘাতিনী—আমাকেই হাত তুলে

তারা দেখাবে, ঘৃণায় মুখ ফিরে নেবে। তিরস্কারে

তারা যদি বলে—জলবায়ু ঘূর্ণিঝড় মরুভূমি

যেমন পতিত তারা স্বাভাবিক থেকে, বিন্দুমাত্র

যেমন বিশ্বাস নেই শেয়ালকে মেষের সমুখে,

নেকড়েকে বাছুর সমুখে, যেমন বিশ্বাস নেই

চিতাবাঘে, হরিণের দলে, অথবা সৎমার কাছে

পুত্রধন দিয়ে, বলুক তখন তারা, সেইসব

নারীরা বলুক, বলা শেষ হলে বলব তাদের,

সে বিশ্বাসঘাতিনীর বুকে ছুরি গেঁথে দিয়ে বোলো

‘ঠিক ক্রেসিদা যেমন একদিন বিশ্বাসঘাতিনী।'

আমার ধারণায় দেশ-বিদেশের নাটকে নারীকে প্রধান চরিত্র করে যেসব নাটক রচিত হয়েছে তার মধ্যে বাস্তবে না হলেও, রূপ-কল্পের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্ট ‘রক্তকরবী’ নাটকের নন্দিনীই সবচেয়ে ক্ষুরধার এবং শক্তিশালী। দুঃখই সৃজনের মূলমন্ত্র, যে দুঃখ থেকে বাল্মিকী মুনি ক্রৌঞ্চ-মিথুনের দুঃখে জগতে প্রথম শ্লোক রচনা করেছিলেন। এই বাল্মিকী মুনিই রামায়ণের রচয়িতা। ‘রক্তকরবী’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন্দিনী আমাদেরকে যাপিত জীবনের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে পরিচিত করে তোলে। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন প্রকৃতের হাতে রচিত যে বস্তু তার মৃত্যু নেই। মরে যতসব মানুষের রচা কৃত্রিম অসত্য বস্তু। রবীন্দ্রনাথ ‘রক্তকরবী’ নাটকে সে কথাই বলার চেষ্টা করেছেন। উনি আমাদেরকে জানাচ্ছেন—’আমার ঘরের কাছে একটি লোহালক্কড়জাতীয় আবর্জনার স্তূপ ছিল। তার নীচে একটা ছোট্ট করবীগাছ চাপা পড়েছিল। ওটা চাপা দেওয়ার সময়ে দেখতে পাই নি, পরে লোহাগুলি সরিয়ে আর চারাটুকুর খোঁজ পাওয়া গেল না। কিছুকাল পরে হঠাৎ একদিন দেখি ওই লোহার জালজঞ্জাল ভেদ করে একটি সুকুমার করবী শাখা উঠেছে একটি লাল ফুল বুকে করে। নিষ্ঠুর আঘাতে যেন তার বুকে রক্ত দেখিয়ে সে মধুর হেসে প্রীতির সম্ভাষণ জানাতে এল। সে বললে, ভাই মরি নি তো, আমাকে মারতে পারলে কই? তখন আমার মনের মধ্যে এই বিষয়ের প্রকাশ বেদনা দিল। নাটকটাকে তাই ‘যক্ষপুরী’, ‘নন্দিনী’ প্রভৃতি বলে আমার তৃপ্তি হয় নি, তাই নাম দিলাম ‘রক্তকরবী’।’ রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে এই কথাগুলো বলেছিলেন। তিনি আরও বলেছেন—’চারিদিকের পীড়নের ভেতর দিয়ে তার (নন্দিনীর) আত্মপ্রকাশ। ফোয়ারা যেমন সংকীর্ণতার পীড়নে হাসিতে অশ্রুতে কলধ্বনিতে উর্দ্ধে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে, তেমনি।’ ‘রক্তকরবী’ নাটকের মুখ্য চরিত্রে নন্দিনীকে নাটকের অন্যতম চরিত্র অধ্যাপক বলেন, ‘সকালে ফুলের বনে যে আলো আসে তাতে বিস্ময় নেই, কিন্তু পাকা দেয়ালের ফাটল দিয়ে যে আলো আসে সে আর-এক কথা। যক্ষপুরে তুমি সেই আচমকা আলো।’ রবীন্দ্রনাথ সৃষ্ট ‘রক্তকরবী’ নাটকের নন্দিনী এক অনন্য নাটকীয় চরিত্র; যে প্রাণ-শক্তিতে, ভালোবাসায় এবং চরিত্রের দার্ঢ্যে অনন্য হয়ে আছে। নন্দিনী এক অসাধারণ নাটকীয় চরিত্র যে মৃত্যুকে জয় করে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়েছে। নন্দিনী এক কথায় যুগপৎ শক্তি ও প্রেমের প্রতীক। এমন চরিত্রের সাক্ষাৎ হয়তো আমরা বাস্তব জীবনে পাই না কিন্তু আমাদের অন্তর্গত ভাবনায় ও স্বপ্নে তার সাক্ষাৎ পাই। নন্দিনী সেই দিক থেকে প্রেম ও জীবনদায়িনী এক কন্যার প্রতিভূ।

মঞ্চনাটকে এক অনন্য নারী চরিত্রের স্রষ্টা ছিলেন নরওয়ের নাট্যকার হেনরিক ইবসেন। এই নাটকের নাম ‘এ ডল’স হাউস’। এই নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হয় ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে কোপেনহেগেনের রয়েল থিয়েটারে। এই নাটকটি ছিল আগল ভাঙার নাটক, যে নাটকে পুরুষ শাষিত সমাজে নারীর সোচ্চার উচ্চারণ এবং স্ত্রীর গৃহত্যাগ সারা বিশ্বে এক বিপ্লবের অনুরণন তুলেছিল। সমগ্র পৃথিবীকে আলোড়িত করেছিল নারীর বিদ্রোহের এই রক্ত-পতাকা উত্তোলন, যা ছিল পুরুষ শাষিত সমাজের বিরুদ্ধে এক অনন্য প্রতিবাদ, যা সমগ্র বিশ্বের পুরুষ-সমাজকে লজ্জিত করেছিল। এক কথায়, সমগ্র বিশ্বকে স্তম্ভিত করছিল নাটকটি, যখন নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র, নোরা তিন শিশু পুত্র-কন্যাকে পেছনে ফেলে স্বামীর গৃহত্যাগ করে। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে, হেনরিক ইবসেনের জন্মশতবর্ষে ‘এ ডল’স হাউস’ পৃথিবীতে সর্বাধিক মঞ্চায়িত নাটকের মর্যাদায় ভূষিত হয়। ইউনেস্কো ইবসেনের স্বাক্ষরিত ‘এ ডল’স হাউসে’র পাণ্ডুলিপিকে ‘মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে’র অন্তর্ভুক্ত করে; নাটকটির ঐতিহাসিক মূল্যের জন্যে। এই নাটকটির বিপ্লবী বক্তব্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের নাট্য মঞ্চেও ঝোড়ো হাওয়া তুলেছিল এবং এখনো তুলছে। উভয় বঙ্গে নাটকটি আজও মঞ্চায়িত হয়ে চলছে। কিংবদন্তিসম অভিনেতা ও নাট্য নির্দেশক শম্ভু মিত্র ‘পুতুলের সংসার’ শিরোনামে নাটকটির রূপান্তর করেন এবং কলকাতার মঞ্চকে এই প্রযোজনা আলোড়িত করে। পরবর্তীকালে কলকাতার আরেক যশস্বী নাট্য নির্দেশক বিভাস চক্রবর্তী এই নাটকটির নির্দেশনা দেন। দু’টো প্রযোজনাই বর্তমান লেখকের দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল এবং দু'ই প্রযোজনাই ছিল অত্যন্ত মনোগ্রাহী। বাংলাদেশের অকাল প্রয়াত প্রতিভাবান অভিনেতা ও নাট্য নির্দেশক খালেদ খান ‘কণ্ঠশীলন’ আবৃত্তি ও নাট্যচর্চা গোষ্ঠীর হয়ে নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছিল, পুরোনো মহিলা মঞ্চে। আমি সে প্রযোজনাটিও দেখেছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। আমাদের দেশের অনন্য নাট্যকার  সৈয়দ শামসুল হক ঢাকায় ইন্টারন্যাশনাল ইবসেন ফেস্টিভেলের সময় একটি নাটক লেখেন, শিরোনাম ‘অপেক্ষমাণ’। নাটকটি উনি রচনা করেছিলেন তিনটি নাটকের খণ্ডাংশ এক সুতোয় গেঁথে। নাটক তিনটির মধ্যে দু'টি ছিল হেনরিক ইবসেনের ‘এ ডল'স হাউস’ এবং ‘এন এনিমি অব দ্যা পিপল’-এর খণ্ডাংশ। তৃতীয় নাটকটির খণ্ডাংশসৈয়দ শামসুল হকেরই নিজের অপূর্ব সৃজন ‘ঈর্ষা’ নাটকের ‘প্রৌঢ় ও যুবতী’ এর একটি অংশ নিয়ে। বর্তমান লেখক এই নাটকের নির্দেশকের দায়িত্ব পালন করেছিল এবং ইবসেনের ‘এন এনিমি অব দ্য পিপল’ নাটকে ড. স্টকম্যানের চরিত্রে অভিনয় করেছিল। এই নাটকটি আমন্ত্রিত হয়ে আন্তর্জাতিক কায়রো (মিশর) নাট্যোৎসবে প্রতিযোগিতামূলক শ্রেণিতে অংশগ্রহণ করেছিল। আজকের বিশ্বে ‘এ ডল'স হাউস’ নাটকটি কোথাও না কোথাও মঞ্চায়িত হয়ে চলেছে। খুব সংক্ষেপে নাটকটির কাহিনি হলো— নোরা ও তার স্বামীর টোরভাল্ডের সংসারজীবন ভালোই চলছিল। স্বামীর অসুস্থতার সময় নোরা লুকিয়ে টাকা ধার করে তার স্বামীর চিকিৎসার খরচ চালিয়েছিল। অনেক টানাপোড়েন, ছলনা, মিথ্যাচারের মধ্যেও নোরা ব্যক্তি চরিত্র হিসেবে ঝলসে উঠে নাটকের তৃতীয় অঙ্কে। নোরা তার স্বামীকে আট বছরের বিবাহিত জীবনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আজ পর্যন্ত তুমি আমাকে বুঝতে চাও নি। আমি ছিলাম তোমার সংসারের খেলার পুতুল, যেমন ছিলাম বাবার সংসারের খেলার পুতুল। তুমি আমাকে ব্যক্তি হিসেবে ভালোবাস নি। কেবল ভালোবাসার খেলায় মেতেছ। কিন্তু আমি একজন সত্যিকার মানুষ, অন্তত তাই হতে চাই।’ নোরা বেরিয়ে পড়ে অলীক সংসারের বন্ধন ছিন্ন করে। যাওয়ার সময় বিয়ের আংটিটিও খুলে রেখে যায়। যাওয়ার সময় স্বামীর অনেক অনুনয়ের উত্তরে বলে, আমি একজন অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সাহায্যও নিতে পারি না। বাচ্চাদের কথা মনে পড়বে তবুও আমাকে যেতে হবে পৃথিবীর পথে সত্যিকার মানুষের সম্ভ্রম ও সম্মান রক্ষার খোঁজে। স্বামীর প্রশ্নের উত্তের বলে—হ্যাঁ আমি এই সংসারে ফিরে আসতে পারি, যদি সেই অভাবিত কা-টি ঘটে নারী নয়, পুরুষ নয়, যেদিন এই সংসারে আমি সত্যিকারের মানুষের মর্যাদা নিয়ে ফিরে আসতে পারব। সেদিন আমাদের সত্যিকার বিয়ে হবে; মানুষের সঙ্গে মানুষের বিয়ে। সাধারণ অর্থে, ‘এ ডল'স হাউস’ কেবল নারীবাদী নাটক নয়, এই নাটক মানব সভ্যতার অনেক ভ-ামি ও মিথ্যাচারের মূলে আঘাত-হানা এক নাটক। এই নাটকের বক্তব্য যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে যতদিন আমরা সমাজে নারী ও পুরুষের সম অধিকারের বিভাজন না করে চলব।

আমাদের দেশের গৌরব কীর্তিমান লেখক প্রয়াত  সৈয়দ শামসুল হকের সৃজনের শেষ সংসার হলো মঞ্চনাটক। এর আগে উনি টেলিভিশানের জন্যে নাটক রচনা করেছিলেন। সৈয়দ হকের লেখা থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি, যা তাঁর নাট্য প্রবণতা ও অভীপ্সা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। উদ্ধৃতি— ‘কাব্যনাট্যই শেষ পর্যন্ত আমার করোটিতে জয়ী হয়, টি এস এলিয়টের কাব্যনাট্য ভাবনা আমাকে ক্রয় করে, আমি লক্ষ না করে পারি না যে, আমাদের মাটির নাট্যবুদ্ধিতে কাব্য এবং সংগীতই হচ্ছে নাটকের স্বাভাবিক আশ্রয়; আরও লক্ষ করি, আমাদের শ্রমজীবী মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাই হচ্ছে এক ধরনের কবিতাশ্রয়ী উপমা চিত্রকল্প, রূপকল্প উচ্চারণ করা। আমাদের রাজনৈতিক স্লোগানগুলো তো সম্পূর্ণভাবে ছন্দ ও মিল নির্ভর; লক্ষ করি আমাদের সাধারণ প্রতিভা এই যে আমরা একটি ভাব প্রকাশের জন্যে একইসঙ্গে একাধিক উপমা বা রূপকল্প ব্যবহার না করে তৃপ্ত হই না।...।’ এরপরে উনি আমাদেরকে জানাচ্ছেন যে, আমাদের লোকজ সাহিত্য এবং ধ্রুপদী গ্রীক নাটক তাঁকে আচ্ছন্ন করে এবং শেকস্পীয়র যাঁর কথা সৈয়দ হকের পিতা তাঁকে অক্লান্তভাবে বলে যেতেন, এইসব অনুসঙ্গ তাঁকে প্রভাবিত করে। এইসব নাট্য ভাবনা নিয়ে বিলেত থেকে সৈয়দ ঢাকায় এসে রাজধানী ঢাকা শহরের নাট্যতরঙ্গে বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে লন্ডনে ফিরে গিয়ে রচনা করেন, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। তাঁর ভাষ্য থেকে আমরা জানতে পারি—এক সংকীর্ণ ঘরে, টেবিলের অভাবে দেয়ালে পা ঠেকিয়ে হাঁটুর ওপর খাতা রেখে, অফিসে যাতায়াতের পথে পাতালরেলে মনে মনে; ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকটি রচনা শেষ করে উঠবার পর এই কবি-নাট্যকারের মনে হয়, দীর্ঘদিন থেকে এরই জন্যে উনি প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তাঁর আনন্দ-যন্ত্রণার ফসল হলো এই অসামান্য নাটক—‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। এই নাটকটি দেশের অন্যতম প্রধান নাট্য দল ‘থিয়েটার’ প্রযোজনা করে। নির্দেশনায় ও মাতবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন আমাদের দেশের প্রয়াত মেধাবী নাট্যকার অভিনেতা ও নির্দেশক আবদুল্লাহ আল মামুন। উনি নিজে মাতবরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন এবং আরেক কীর্তিমান অভিনেতা প্রয়াত মহাম্মদ যাকারিয়া এই নাটকে পীর সাহেবের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করে দেশে-বিদেশে সকল দর্শকদের প্রশংসার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়ান আমাদের দেশের স্বনাধন্য অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। এই নাটকটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত। এই নাটকের কিছু সংলাপ শুনলেই মনে হবে যে সৈয়দ শামসুল হকের নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এর সৃষ্ট চরিত্র ‘মেয়ে’ পৃথিবীর নাট্য সাহিত্যের অন্যতম শক্তিধর নারী। ‘মেয়ে’ চরিত্রটি মঞ্চে প্রথম আবির্ভূত হয় নিম্নোক্ত সংলাপগুলোর মাধ্যমে।

মাতবর: মা, মা-রে—

মেয়ে: মা বইলা কে ডাকে আমারে?

জিগ্যাসা করেন, জিগ্যাসা করেন, মিলিটারি সাব ক্যান আইসাছিলেন?

মাঝখানে পিতা-কন্যার বেশ কিছু সংলাপ আছে। মেয়েটির পিতা গ্রামের মাতবর। যে নিজ হাতে পাকিস্তানি মিলিটারি হাতে নিজের একমাত্র কন্যাকে সমর্পণ করতে চায় নিজেরা বাঁচার জন্য। এই ধরনের পিতা এই দেশের নিকৃষ্ট রাজাকারেরও অধম। মেয়ের দীর্ঘ সংলাপের একটি ভগ্নাংশ নিচে উদ্ধৃত হলো।

মেয়ে: ‘কী লাগবে? কী দিমু বা’জান?’

তার না দিয়ে উত্তর

‘তর মা-যে কই?’ বইলা ঘরের ভিতর

গিয়া কইলেন, পাকঘর থিকা শোনা যায়,

‘মেয়েটারে মিলিটারি চায়।’

কইলেন, ‘এতে কোনো দোষ নাই,

রাজি করছি সে হইবো আমার জামাই।’

কইলেন ‘কলমা পড়ায়া দিমু রীতিমতো বিয়া

না হয় দেশের ছেলে নাই হইলো, দেশ ধুইয়া

পানি খামু? দেইখ্যা নিও এই যুদ্ধ শেষ হইলে পর

সোনায় মুড়ায়া দিবে তোমার এ ঘর।’

 

এরপরে মেয়ে চরিত্রের কণ্ঠে শোনা যায়, পৃথিবীর অন্যতম সেরা সংলাপ যা মেয়ে পীর সাহেবকে বলে।

মেয়ে। বাবা, তাই যদি হয়, তবে অন্তরে আমার

কারও চেয়ে কিছু কম ঈমান ছিল না। পরিষ্কার

তবু ক্যান কিছুই বুঝি না। আল্লাহতালার

নাম যদি দয়াময়

যদি তিনি সত্যই পারেন দিতে বান্দারে নির্ভয়

যদি সত্যই সকল শক্তি তাঁরই হাতে হয়

যদি সত্যই সকল বিষ তাঁরই নামে ক্ষয়

তবে, কোথায় সে দয়াময় আছিলেন, কোথায়, কোথায়?—

কোথায় নির্ভয়দাতা আছিলেন, কোথায়, কোথায়?—

যখন আমার ঘরে কালসাপ উইঠা আসছিল

যখন আমার দেহে কালসাপ জড়ায়া ধরছিল

যখন আমার বুকে কালসাপ দংশাইয়াছিল

 বলেন, জবাব দেন, কোথায়, কোথায়?—

বেহেস্তের কোন বাগিচায়

বলেন থাকলে পর বান্দার কান্দন তার কানে না পশায়?

নাটকে মেয়ের শেষ সংলাপ আমরা শুনি তাঁর আত্মহননের পূর্বে:

মেয়ে: যখন আসল সত্য ওঠে লাফ দিয়া

তখন দুনিয়া

আচানক মনে হয় সোনার শিকল পাখির লাহান

দেখা যায় জমিন ও আসমান।

দেখেন, দেখেন, তবে, একবার ডানা ঝাপটায়

     এখনি উড়াল দিবে সমস্ত ফালায়া

মেয়ে হঠাৎ বিষপান করে এবং মাটিতে পড়ে যায়। গ্রামবাসী রমণীরা তাকে কোলে নেয়।

দীপ্ত প্রখর নারী চরিত্রের উল্লেখ করতে হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরও দু'টি নাটকের উল্লেখ করতে হয়। নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ দিয়ে শুরু করা যাক। মহাবীর অর্জুন দ্বাদশবর্ষব্যাপী ব্রহ্মচর্যব্রত গ্রহণ ক’রে ভ্রমণ করতে এসেছেন মনিপুরে। চিত্রাঙ্গদা মনিপুরের বীর্যবতী রাজকন্যা। তথাকথিত নারী সুলভ নম্র ও লাজুক স্বভাবের সে নয়। সে বনে-জঙ্গলে শিকার করে বেড়ায়। সে পুরুষ ও নারীর সনাতন বিভেদ বুঝে না। অর্জুনকে দেখে চিত্রাঙ্গদার নারী সত্তা জেগে উঠল; প্রেমের উদ্ভব হলো।

চিত্রাঙ্গদা: আমি তোমারে করিব নিবেদন আমার হৃদয় প্রাণ মন!

অর্জুন: ক্ষমা করো আমায়, বরণ্যযোগ্য নহি বরাঙ্গনে, ব্রহ্মাচারী ব্রতধারী।

চিত্রাঙ্গদা: হায় হায়, নারীরে করেছি ব্যর্থ দীর্ঘকাল জীবনে আমার ধিক্ ধনুঃশর! ধিক্ বাহুবল!

এরপরে মদন দেবের তপস্যা করে চিত্রাঙ্গদা তার পুরুষালি শিকারি রূপ থেকে মুক্ত হলো, সে হলো চিত্তহারী এক অপরূপা। অর্জুনের মুগ্ধ প্রশংসা চিত্রাঙ্গদাকে বিচলিত করল। তখন চিত্রাঙ্গদার মনে এই ভাবের উন্মেষ ঘটল যে, তার এই মিথ্যা রূপে বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুনকে বিমোহিত করা হবে অপরাধতুল্য।

চিত্রাঙ্গদা অর্জুনকে বলল:

‘সে আমি যে আমি নই, আমি নই—হায় হায়,

সে যে কোন দেবের ছলনা’।

অতঃপর, চিত্রাঙ্গদা আবার মদন দেবের তপস্যা করে তার আগের রূপ ফিরে পেল। অর্জুন তখন আগের দেখা চিত্রাঙ্গদাকে দেখে বলে উঠল—

এসো সুন্দর, যৌবন বেগে।

এসো দৃপ্ত বীর, নব তেজে।

অর্জুন চিত্রাঙ্গদার নিজস্ব স্বভাব ও রূপের প্রশংসা করে তাকে আশীর্বাদ করে। এভাবেই শেষ হয় নৃত্যনাট্যটি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নৃত্যনাট্য সম্পর্কে যা বলেছেন তা নিম্নে উদ্ধৃত হলো:

‘চিত্রাঙ্গদা, লিখেছিলেম কটকে, কদিন থেকে এসে হানা দিচ্ছে এই শিলাইদহে। অসুন্দরের মধ্যে একটা ভান থাকে কিন্তু সুন্দরের কোনরূপ ভান থাকে না, এটা লক্ষ করা গেছে, মিথ্যার আবরণে অসুন্দর নিজেকে আবৃত করে আসে, আর সুন্দর আসে অনাবৃত, সত্যের ওপরে তার প্রতিষ্ঠা। চিত্রাঙ্গদার মনে এই সত্যবোধের উদয় হয়, তাই সে পরিশেষে মিথ্যার আবরণ ছিন্ন করে সত্যরূপে আত্মপ্রকাশ করে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাজা’ নাটকের অন্তর্গত অর্থ সহজ নয়, কিছুটা দুরূহ এবং দুরগামীও বটে। ‘রাজা’ নাটকের দুই নারী চরিত্র রানী সুদর্শনা এবং রাজার দাসী সুরঙ্গমা দু'জনেই পাঠক ও নাট্য দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এ নাটকটি রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য নাটকের তুলনায় কিছুটা দুরূহ। এই নাটকে নিহিত আছে জীবনের গভীর দর্শন যা অনেকটাই রূপকের বেড়াজালে ঘেরা। এই নাটকের যে রাজা, রানী ও রাজার দাসীকে আমরা দেখি তা পার্থিব নয়; জীবন দর্শনেরই এক ভিন্ন চিত্র। এই দর্শন জীবন বিযুক্ত নয়, জীবনের গূঢ় ভাবনায় তার অধিবাস। সত্যিকার অর্থে রাজার দাসী সুরঙ্গমা রাজারই আত্মস্বরূপ বা দ্বিতীয় সত্তা। রবীন্দ্রনাথের এই নাটকের শুরুই হয় নিম্নোক্ত দু'টি সংলাপের মাধ্যমে:

সুদর্শনা: আলো, আলো, কই। এ ঘরে কি একদিনও আলো জ্বলবে না?

সুরঙ্গমা: রানীমা, তোমার ঘরে-ঘরেই তো আলো জ্বলছে। তার থেকে সরে আসবার জন্যে কি একটা ঘরেও অন্ধকার রাখবে না?

সুদর্শনা: কোথাও অন্ধকার কেন থাকবে!

সুরঙ্গমা: তাহলে যে আলোও চিনবে না, অন্ধকারও চিনবে না।

এই নাটকের রাজা ও রানী এক ঘরে থেকেও পরস্পর পরস্পরকে দেখে না। অন্ধকারের রাজা রানী সুদর্শনাকে নাটকের শেষ প্রান্তে জিজ্ঞাসা করছে—আমাকে সইতে পারবে?

সুদর্শনা বলছে; পারব রাজা পারব। আমার প্রমোদবনে, আমার রানীর ঘরে, তোমাকে দেখতে চেয়েছিলুম বলেই তোমাকে এমন বিরূপ দেখেছিলুম। তুমি সুন্দর নও প্রভু, তুমি সুন্দর নও, তুমি অনুপম। নাটক শেষ হয়, এই দুই সংলাপের মধ্য দিয়ে।

রাজা: আজ এই অন্ধকার ঘরের দ্বার একেবারে খুলে দিলুম। এখানকার লীলা শেষ হলো। এসো, এবার আমার সঙ্গে এসো, বাইরে চলে এসো, বাইরে চলে এসো—আলোয়।

সুদর্শনা: যাবার আগে আমার অন্ধকারের প্রভুকে, আমার নিষ্ঠুরকে, আমার ভয়ানককে প্রণাম করে নেই।

এই নাটকের ভাবার্থ হয়তোবা এমনও হতে পারে, অন্ধকারের রাজাই আমাদের জীবনের শেষ দর্শনদাতা, মৃত্যুর রং তো কালোই হয়ে থাকে। তাই সে অন্ধকারের প্রভু, নিষ্ঠুর ও ভয়ানক যার কাছে হেরে যাই আমরা সবাই।

নাটকের নারী চরিত্র সৃজনে জগদ্বিখ্যাত রাশিয়ান নাট্যকার আন্তব চেখভ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। তাঁর ‘সি গাল’ নাটকে চিরন্তন অসুখী মানুষের চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। নাটকটি শুরুই হয় একটি নারী চরিত্রের অসাধারণ সংলাপের মধ্য দিয়ে। নাটকের একটি চরিত্র মেডভেডোঙ্কো নারী চরিত্র মাশাকে জিজ্ঞেস করে; তুমি সব সময় কালো পোশাক কেন পরে থাকো? উত্তরে মাশা বলে: আমি আমার জীবনকে নিয়ে শোক পালন করছি। আমি অসুখী। সুখ আর দুঃখের দোলায়িত আমাদের জীবন। এই পৃথিবী ছেড়ে আমাদের চলে যেতে হবে, এইতো জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ। একটি জন্মের অর্থ হলো, আরেকটি মৃত্যু। তবুও আমরা বেঁচে থাকতে চাই, বেঁচে থাকতে ভালোবাসি, হয়তোবা আমাদের কবি জীবনানন্দের ভাষায় ‘আরেকটি প্রভাতের ইশারায় অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে’। এই নাটকের অন্যতম প্রধান নারী চরিত্রও একজন দুঃখী মানুষ। জীবনের টানাপোড়েনে সে উচ্চারণ করতে সেও বাধ্য হয় যে, জীবন অপরিছন্ন-বিদ্ঘুটে। সে নিজের জীবনকে একটি গাংচিলের সঙ্গে তুলনা করে এবং বলে—সে গুলি খেয়ে মরে যাওয়ার যথাযোগ্য পাত্রী। নাটকটিকে অনেক সমালোচক ট্র্যাজেডি না বলে, বলেছেন—এই নাটক বিদ্রুপাত্মক। আন্তম চেখভের ‘থ্রি সিস্টারস’ নাটকের তিন বোন—আইরিনা, মাশা ও ওলগার চরিত্রেও ফুটে উঠে জীবন যুদ্ধের টানাপোড়েনের এক বিদ্রুপাত্মক চিত্র। আমাদের জীবনকে আশা ও আশা-ভঙ্গের টানাপোড়েনে আমৃত্যু চালিয়ে নিতে হয়; তারই একটি চিত্র চেখভের ‘থ্রি সিস্টারস’ নাটকে অত্যন্ত সফলভাবে চিত্রিত হয়েছে।

সৈয়দ শামসুল হকের আরেকটি কাব্য নাটক হচ্ছে ‘ঈর্ষা'। এই নাটকটি পড়ার পরে নাটকের মানুষেরা ও পাঠকেরা সমস্বরে বলেছিল যে, এই নাটকটি অভিনয়-যোগ্য নয়। নাটকে রয়েছে তিনটি চরিত্র—প্রৌঢ়, যুবতী ও যুবক। এক একজন দীর্ঘ ১৮ মিনিট থেকে ২০ মিনিট সংলাপ বলে যায় বিরতিহীনভাবে, তাও আবার কাব্য ভাষায়। দর্শকদের ধৈর্যচ্যুতির ভয়ে এই নাটক কোনোদিন মঞ্চে আলো দেখবে না—এমনটিই ভাবা হয়েছিল। বর্তমান লেখক নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের হয়ে নাটকটি নির্দেশনা দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হলো। নাটকটি পুরোনো মহিলা সমিতির মঞ্চে অভিনীত হলো ১৯৯৯ সালে। অভিনয় করেছিলেন জামালউদ্দিন হোসেন, সারা যাকের এবং খালেদ খান। নাট্যকার ও নির্দেশক দুজনে খুব নার্ভাস ছিলেন। নাটকটির মঞ্চায়ণ সফল হলো। প্রায় প্রতিটি প্রদর্শনী মিলনায়তন পূর্ণ দর্শক এই নাটকটি মঞ্চে উপভোগ করেছিলেন। কলকাতায় অভিনয় শেষে, বাংলা নাটকের প্রতিভাবান নট ও নির্দেশক শম্ভু মিত্র এই নাট্য প্রযোজনার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। সেই নাটকেরই যুবতী চরিত্র সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করে এই লেখনীর ইতি টানব। ঈর্ষা নাটকের যুবতী চরিত্র অত্যন্ত সাহসী, দূরদর্শী এবং প্রতিভাবান একজন অঙ্কন শিল্পী। প্রসঙ্গত এই নাটকের তিনজন কুশীলবই চারুশিল্পী। এই নাটকের অন্যতম চরিত্র ‘যুবতী’র একটি সংলাপ দিয়ে এই লেখনী শেষ করব।

এতদিন মনে করতাম, প্রেম এসে যায়; আজ আমি জানলাম।

যে-কোনো প্রেমই কিন্তু আমাদের অর্জন করে নিতে হয়।

সে অর্জন ধরে রাখতে হয় জেগে থেকে।

যেমন গৃহস্থ ঘুমে নিশিরাতে জেগে থাকে ঘুমের মধ্যেই,

যেমন মেলার ভিড়ে একটা সতর্ক হাত ছুঁয়ে থাকে থলি।

যদি বা হারায়, অনেকেই ফিরে পায়।

খুঁজলে কি আমিও পাব না? স্যার, শুভেচ্ছা রাখবেন।

যেমন মানুষ খোঁজে ভাঙা হাটে লম্ফ হাতে হারানো আধুলি।

আমাকেও এখন বেরিয়ে আজ নিঃস্বের অন্ধকারে খুঁজে নিতে হবে

সামান্য এ জীবনের অসামান্য দুটি অর্জন;

আমার স্বামীর প্রেমে সংসারের ব্যঞ্জনে লবণ,

আপনার প্রতি প্রেমে আমাদের শিল্পের ভুবন।’

বিশ্বের সকল নারীর জয় হোক। তাঁরাই জীবনদাত্রী। তাঁরাই পৃথিবীর মর্মমূলে। তাঁদের ছাড়া জীবন অচল।

Leave a Reply

Your identity will not be published.