বুড়িগঙ্গা বয়ে চলেছে। সূর্যাস্ত। রাজউক-এর ঘড়িতে ছয়টা ত্রিশ।
১. টেলিফোন এক্সচেঞ্জ-এর কাছে মিনিবাস ও ট্যাম্পুর হেল্পাররা জোরালো কণ্ঠে গন্তব্যস্থানের নাম উচ্চারণ করছে। আরোহীরা ব্যস্ত পায়ে গাড়িতে উঠছে। তাদের কারও হাতে ব্যাগ, কারও হাতে আবার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
২. গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনে ‘প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ’ বোর্ড টাঙানো। টিকেট ব্ল্যাকারদের উৎপাত এবং দর্শকদের উন্মত্ততা। একজন প্রতিবন্ধী ভিখারি ছেঁড়া চটে ক্ষতস্থান বেঁধে নিয়ে সামনের ফুটপাতে পিঠ ঘষে-ঘষে এদিক থেকে ওদিকে সরে যাচ্ছে। খুচরো পয়সার শব্দে তার এনামেলের বাটি ঝনঝন করে বাজছে। কেউ কেউ এনামেলের বাটিতে পয়সা ছুড়ে দিচ্ছে, কেউ আবার পাশ কাটিয়ে সিনেমা হলে ঢুকে পড়ছে। একটি রিকশা ফুটপাত ঘেষে থামল। চারজন মেয়ে নামল। পরনে শালোয়ার কামিজ। উৎকট সাজসজ্জা। সর্বাঙ্গে লাস্যময়ী ভাব।
৩. বঙ্গবন্ধু এভিনিউর ফুটপাতে হরেক রকমের বই ও পত্রিকা। অর্র্ধপর্ণ বই ও পত্রিকাও উঁকি মারছে। পথ চলতি মানুষজনের কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে সেইসব পত্রিকা পড়ছে। কেউ আবার অর্থের বিনিময়ে পত্রিকা কিনছে। একজন লোক অনুচ্চ স্বরে পথচারী মানুষদের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলছে : ‘লাগবো নাকি ইন্ডিয়ান বই ? ছবির বইও আছে’।
৪. বায়তুল মোকাররমের মসজিদে নামাজিদের সমাবেশ। আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
৫. গুলিস্তানের গণ শৌচাগারের সামনের ফুটপাত। একজন শ্মশ্রুমণ্ডিত লোক একটি ওষুধের গুণকীর্তন করছে। তার সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ওষুধি গাছ, লতাপাতা, তেল, হ্যাজাক বাতি ইত্যাদি। চারপাশে মানুষজন জড়ো
হয়ে লোকটির কথা শুনছে।
রাজউক-এর ঘড়িতে ছয়টা পঞ্চাশ
৬. ইংলিশ রোডের কান্ডুপট্টি এলাকা। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় নর্দমা ভাসা
নোংরা আবর্জনা স্পষ্ট। সংকীর্ণ গলি। গলির ভেতরে গলি—যা বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আলো আঁধারিতে সেই গলিতে বেশ কয়েকটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। অজস্র ববচুল, শ্যাম্পু করা আলুলায়িত কেশ, বিচিত্র খোঁপা, বিভিন্ন ধরনের কামিজ, ম্যাক্সি ছাপিয়ে উঠলে ওঠা স্তন, অর্ধ নগ্ন বিভিন্ন আকার ও গড়নের পা এবং যান্ত্রিক পেশাদারি আপ্যায়নের স্থুল ভঙ্গি ও রসালো হাসিতে গলিটি ঠাসা। কোথা থেকে যেন সস্তা হিন্দি গানের পঙ্ক্তি ভেসে আসছে।
৭. নবাবপুরের আরজু হোটেল। প্রবেশ পথের সামনে একটি কুকুর। একটি রিকশা এসে থামল। দুজন যুবক-যুবতী নামল। তাদের সঙ্গে কোনো রকম লাগেজ নেই। যুবকটি মানি ব্যাগ থেকে টাকা বের করে রিকশার ভাড়া মেটাল। যুবতীটি টাকার দিকে চেয়ে থাকল। যুবকটি কুকুরটির গা ঘেঁষে সঙ্গিনীকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।
৮. হোটেল শেরাটন। বিকল্পের একটি ট্যাক্সি এসে থামল। চালক ট্যাক্সি থেকে নেমে পেছনের দরোজা খুলে ধরল। এক বিদেশি ও বাংলাদেশি এক সুদর্শনা নেমে দাঁড়াল।
৯. রমনা পার্ক। দুজন যুবতী পার্কে ঢুকছে। নিয়নের মায়াবী আলোয় দেখা যায়—সস্তা সিল্কের শাড়ি মেয়ে দুটির পরনে। চোখে-মুখে বিচিত্র মেকআপ। ওরা দুজন যুবককে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়, অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
১০. সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ঝোঁপের নিচে আপত্তিকর অবস্থায় যুগল মূর্তি।
উপরে নিয়নের জন্ডিস আলো।
১১. কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি। অডিটোরিয়ামের বাইরে প্রান্তিক অংশের জমাট বাঁধা আঁধারে অস্পষ্ট দুটি ছায়া। দ্বৈত কণ্ঠে স্বরবর্ণের দুটি বিশেষ ধ্বনির প্রলম্বিত উচ্চারণ।
রাজউক-এর ঘড়িতে সাতটা ত্রিশ
১২. টি. এস. সি চত্বর। ছেলেমেয়েরা নানাদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে/ বসে সময়কে উপভোগ করছে। উত্তপ্ত শব্দ, কবিতার পঙ্ক্তি, নাটকের সংলাপ, জীবন ঘেঁষা উচ্চারণ, প্রেমবিষয়ক কথোপকথন শোনা যাচ্ছে।
১৩. তোপখানা রোড। প্রেস ক্লাব চত্বরে সভা। লাউড স্পিকারে সতেজ ভাষণ। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইটের ঘনঘন বর্ষণ।
১৪. ঢাকা স্টেডিয়াম। ফ্লাড লাইটের আলোয় চারদিক উদ্ভাসিত দর্শকদের চিৎকারে মুখর প্রাণবন্ত পরিবেশে মাঠে ফুটবল খেলা চলছে।
১৫. শান্তিনগরের শামীমা বিবাহঘর'। আলোকমালায় সজ্জিত। ভেতরে সুবেশ পোশাকধারী নারী-পুরুষ। বাইরে ছিন্ন, মলিন বস্ত্র পরনে কৃপা প্রার্থীর দল।
১৬. বেইলী রোডের মহিলা সমিতিতে লোকজনের গুঞ্জরণ। নাটকের দর্শক এঁরা। কেউ কেউ সঙ্গিনীকে নিয়ে চলে যাচ্ছে, কেউ আবার নাটক, কুশীলব, টিভি, চলচ্চিত্র, ভিডিও, রাজনীতি, কবিতা, সাম্প্রতিক গুজব—এমনকি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়েও আলাপ করছে।
১৭. মৌচাক এলাকা। রিকশার টুংটাং, গাড়ির হর্ন, মোটর সাইকেলের শব্দ, বিভিন্ন বয়সী এবং শ্রেণির মানুষের কথাবার্তা, ফেরিওয়ালার হাঁক, সম্ভাব্য আরোহীর রিকশাওয়ালার উদ্দেশে ডাক, রেস্টুরেন্ট-অডিও রেকর্ডিং-এর দোকান থেকে হিন্দি, বাংলা ও ইংরেজি গানের পঙ্ক্তি যুক্ত হয়ে এক বিচিত্র পরিবেশ।
রাজউক-এর ঘড়িতে আটটা পনেরো
১৮. চাংপাই চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। সুবেশী লোকজন কলরব করতে করতে খাবার খাচ্ছে।
১৯. নবাবপুর রোডের সাধারণ এক রেস্টুরেন্ট/ হোটেল। মানুষজন খাচ্ছে।
২০. ফুটপাতের হোটেল। শ্রমজীবী মানুষজন রুটি, ভাজি, ভাত, তরকারি, ডাল খাচ্ছে।
২১. মুক্ত আকাশের নিচে এক পরিবার সংসার পেতেছে। তারা রাতের আহার সেরে নিচ্ছে। এক নেড়ি কুকুর জিব নাড়ছে। খাওয়ায় ব্যস্ত এক বালক কিছু খাবার দিল কুকুরটিকে।
রাজউক-এর ঘড়িতে আটটা পঞ্চাশ
২২. ঢাকা ক্লাব। রাজনীতি, ব্যবসা, চক্রান্ত, আমোদ, বিনোদন ও খেলার জগতে মত্ত সমাজের উঁচু তলার মানুষ।
২৩. শাহবাগ। জাতীয় সম্প্রচার কেন্দ্রে একটি গাড়ি ঢুকল। ভেতর থেকে মানুষজনের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে।
২৪. হোটেল সোনারগাঁ। বলরুমে প্রখ্যাত এক ভারতীয় শিল্পীর একক সংগীতানুষ্ঠান। মানুষজনের গুঞ্জরণ।
২৫. ফার্মগেট। চারদিকে জীবনের জ্যান্ত ছবি। সংগ্রামী কর্মধারার বিচিত্র শব্দ।
২৬. এফ.ডি.সি। আমতলা চত্বরে কজন এক্সট্রা শিল্পী—কখন ডাক আসে তার অপেক্ষায় বসে/দাঁড়িয়ে কথা বলছে। প্রশাসনিক ভবনের সামনে উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থাপনায় শুটিং হচ্ছে। ফ্লোরের ভেতর থেকে বাইরে চুঁইয়ে পড়ছে আলো। শোনা যাচ্ছে—ক্যামেরার মৃদু শব্দ, মানুষজনের চিৎকার এবং সংলাপ।
রাজউক-এর ঘড়িতে নয়টা ত্রিশ
২৭. রামপুরা টিভি ভবন। আলো, গাড়ির হর্ণ, ক্যামেরার মৃদু শব্দ-মানুষজনের কথাবার্তায় চারদিক মুখর।
২৮. রামপুরা বাজার। আনাজ-তরকারি-ফলওয়ালাদের চিৎকার ও কথাবার্তা। প্রাইভেট কার, ট্রাক, মিনিবাস, রিকশা, ট্যাম্পু, বাস ও মানুষজনের আসা-যাওয়া।
২৯. রামপুরা রেলগেট। গার্মেন্টসের মেয়েরা রেললাইনের কাছ দিয়ে রাজপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে, হাতে ছাতা/ টিফিন ক্যারিয়ার।
রাজউক-এর ঘড়িতে দশটা বিশ
৩০. বলধা গার্ডেনের সমুখের চৌরাস্তা। প্রায় জনশূন্য রাজপথ দিয়ে তেরপলে ঢাকা একটি ট্রাক ছুটে চলেছে। ট্রাফিক পুলিশ সংকেত দেয়। ট্রাকটি থেমে যায়। পুলিশ ভদ্রলোক জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয় এবং উদ্ভাসিত মুখে হাত বের করে পকেটে ঢোকায়।
৩১. স্বামীবাগের নির্জন রাস্তা। দুজন লোক টলটে টলতে হেঁটে যাচ্ছে। একজন দোহারা গড়নের, অন্যজন একহারা। হঠাৎ দোহারা গড়নের মানুষটি রাস্তার পাশে, ড্রেনের ধারে উবু হয়ে বসে পড়ে। লোকটি বমি করছে।
৩২. সায়েদাবাদের বস্তি এলাকা। রেললাইনের ওপর বসে চারজন লোক ফেনসিডিল খাচ্ছে। অদূরে দাঁড়িয়ে ছয়-সাত বছরের একটি মেয়ে ফ্রকের নিচের জামাটি নামিয়ে তলপেটের ভারী চাপ হালকা করে নিচ্ছে। কোথায় যেন একটি শিশু কেঁদে উঠল। তারপরই এক মহিলার বকবকানি এবং পুরুষ কণ্টের কাঁচা খিস্তি শোনা গেল।
৩৩. নিউমার্কেট এলাকা। দুজন যুবক দৌড়ে নীলক্ষেতের দিকে গেল। হুইসেলের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
৩৪. বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। গুলির শব্দ।
৩৫. শাহবাগের কাটাবন এলাকা। একটি আর্তচিৎকার। ধুপধাপ পায়ের
আওয়াজ।
রাজউক-এর ঘড়িতে দশটা পঞ্চাশ
৩৬. মিন্টু রোড। চারদিক সচকিত করে একটি অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলেছে।
ঘূর্ণায়মান লাল আলো জ্বলছে।
৩৭. ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগ। ইমারজেন্সিতে প্রাণচাঞ্চল্য। প্রবেশ পথে এম.এল. এস দাঁড়িয়ে। একটি বেবী ট্যাক্সি এসে থামল। দুজন যুবক একজন আহত যুবককে ধরাধরি করে ট্যাক্সি থেকে নামাল।
একজন যুবক প্রবেশ পথের উত্তর দিকের কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করল, ইমারজেন্সি অফিসারের রুমে দৌড়িয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে সে ওয়ার্ড বয়/ স্টেচার নিয়ে এসে আহত যুবকটিকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। ইমারজেন্সি বিভাগের প্রসারিত করিডরের একদিকে কালো পর্দার অন্তরাল সৃষ্টি করে পুরুষ রোগীদের সিট রাখা হয়েছে। অন্যদিকে মহিলা রোগীর রুম। আহত যুবকটিকে সিটে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। বেদনা কাতর ধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
৩৮. আজিমপুর কবরস্থান। দুটি ট্রাক এসে প্রবেশ পথের সামনে থামল। ট্রাক থেকে মাথায় টুপি পরা/ রুমালবাঁধা লোকজন (কেউ প্যান্ট-শার্ট, কেউ পাজামা-পাঞ্জাবি, কেউ লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরিহিত)। নামল। সামনের ট্রাক থেকে খাটিয়ায় শায়িত লাশ নামানো হলো। চারজন লোক সেই খাটিয়া কাঁধে নিয়ে কবরস্থানের ভেতরে ঢুকল। তাদের পেছনে অন্যান্য মানুষজন, মুখে আরবি ধ্বনির মৃদু উচ্চারণ।
৩৯. জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি বিমান ল্যান্ড করল।
৪০. হোটেল সোনারগাঁ, শেরাটন, পূর্বানীর আলোকিত ভুবন। বিভিন্ন ধরনের গাড়ি এসে থামছে। বিদেশি পর্যটকরা লাগেজপত্রসহ নামছে।
৪১. কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। তুর্ণা নিশীথা দণ্ডায়মান। যাত্রীরা ট্রেনে উঠছে, নামছে। চা, পান-বিড়ি সিগারেট বিক্রেতারা হাঁক দিচ্ছে, জিনিসপত্র বিক্রি করছে। ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভাসমান মানুষেরা ঘুমিয়ে আছে। কেউ কেউ এখনো জেগে আছে। কথা বলছে। কেউ কেউ আবার ভিক্ষা করছে। টোকাইরা
যাত্রীদের জিনিসপত্র ট্রেনে তুলে দিচ্ছে, লজেন্স বিক্রি করছে, ডান হাত প্রসারিত করে কৃপা প্রার্থনা করছে।
৪২, সায়েদাবাদের বাস টার্মিনাল। লাকসাম, সোনাইমুড়ি, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজারের কোচ সার্ভিস। যাত্রীদের ব্যস্ততা। ‘কন্টিনেন্টাল’, ‘সোনারগাঁ’, ‘ঢাকা মুসলিম’, ‘সাবিনা’, ‘এম আর হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টে’র জমজমাট অবস্থা। বেয়ারারা হাঁপিয়ে উঠেছে।
৪৩. রামকৃষ্ণ মিশন রোড। ইত্তেফাক ভবন। বার্তা বিভাগে প্রাণচাঞ্চল্য। রিপোর্টারেরা শেষ মুহূর্তের খবর দ্রুত লিখছে। ফ্যাক্স মেশিন সক্রিয়। নিউজ এডিটর সংবাদ বাছাই করছে।
রাজউক-এর ঘড়িতে এগারোটা পঁয়ত্রিশ
৪৪. শিল্পকলা একাডেমী। মাঠজুড়ে প্যান্ডেলে দর্শকরা যাত্রা উপভোগ করছে।
৪৫. সদরঘাট। রূপমহল সিনেমা হল। নাইট শো ভাঙল। হুড়মুড় করে লোকজন হল থেকে বেরিয়ে এল।
৪৬. সদরঘাটের লঞ্চঘাট। মানুষজন প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছে। কেউ-বা এক চেয়ারে বসে আরেক চেয়ারে পা তুলে দিয়ে ঘুমোচ্ছে। অনেকে আবার খালি জায়গায় বিছানা পেতে শুয়েছে।
৪৭. ওয়াইজ ঘাট। ভাসমান হোটেলগুলোতে ভাসমান / দরিদ্র মানুষেরা নিচতলা ও দোতলাতে ঢালাও বিছানাতে চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছে। তেতলার কেবিনে মহিলা, শিশু ও পুরুষেরা ঘুমোচ্ছে।
রাজউক-এর ঘড়িতে বারোটা দশ
৪৮. কালিগঞ্জের গুদারাঘাট। বুড়িগঙ্গার জলে আলম মার্কেটের অসংখ্য বাতির প্রতিবিম্ব।
৪৯. রাতের আকাশে দু'একটি তারা জ্বলজ্বল করছে।
৫০. ফুটপাতে মানুষজন ঘুমিয়ে আছে।
৫১. শ্যাম বাজার। নৌকা, স্টিমার থেকে আনাজ-তরকারি কুলিরা বয়ে
এনে আড়তে রাখছে। আড়তের ভেতর মহিলারাও কাজ করছে।
৫২. লোহার পুল সংলগ্ন সূত্রাপুরের কোতোয়ালী থানা। ওসি ফোনে কথা বলছেন। ডিউটি অফিসার ডাইরি লিখছেন—তার সামনের চেয়ারে দুজন লোক বসে আছে। একজন শ্যামলা, অন্যজন ফর্সা। শ্যামলা বর্ণের লোকটি অনুচ্চ স্বরে কথা বলছে। সেলে আটক কয়েকজন মানুষ, যাদের বয়স বিশ থেকে চল্লিশ।
রাজউক-এর ঘড়িতে বারোটা চল্লিশ
৫৩. বাকল্যান্ড বাঁধ রোড। বাইতুন নাজাত জামে মসজিদে কয়েকজন মানুষ সৃষ্টিকর্তার ধ্যানে মগ্ন। পথের ধারের ‘হোটেল মদিনা’, ‘গাউছিয়া হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট', ‘খাজা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট’-এ মানুষজন খাচ্ছে।
৫৪. আহসান মঞ্জিলের পূর্ব-উত্তর কোণের চত্বরের সমুখের ফুটপাত। দুজন টোকাই শুয়ে আছে।
৫৫. চকবাজার। রাস্তার এক ধারে গভীর গর্ত খনন করা হচ্ছে। ‘ঢাকা ওয়াসা’-র পাইপ বসানোর কাজ চলছে। মজুরেরা মাটি, ইট ও পাথরের খণ্ড টুকরিতে বহন করে অন্যত্র ফেলছে।
রাজউক-এর ঘড়িতে একটা পনেরো
৫৫. নাজিমউদ্দিন রোড। হযরত বাবা মাক্কুশা মাজার শরীফের সামনে একজন লোক হাঁটু মুড়ে বসে দু’হাত তুলে মোনাজাত করছে। ভ্যান্টলিটরের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে মাজারের একাংশ, লালশালু, মোমবাতি, ধূপকাঠি।
৫৬. চানখারপুল। ‘শাহীন হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট’, ‘মিতালী হোটেল ও রেস্টুরেন্ট’, ‘সোহাগ হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট’-এ খদ্দেরের হাঁকডাক, বেয়ারারা ছোটাছুটি করছে।
৫৭. চানখারপুলের বস্তি। বাঁশের চাটাই, ছেঁড়া কাপড় ও পলিথিন দিয়ে তৈরি ঝুপড়ির ভেতরে কয়েকজন যুবক এ্যালুমিনিয়ামের ফয়েলে করে মুখ ও নাক দিয়ে হেরোইন সেবন করছে।
৫৮. সেক্রেটারিয়েট / স্যার সৈয়দ আহমদ রোড। ‘ঢাকা ফার্মেসী’, ‘শাহজালাল ফার্মেসী’, ‘ইসলাম ফার্মেসী’, ‘ডে-নাইট ফার্মেসী’-তে কর্মব্যস্ততা। মানুজন ওষুধপত্র কিনে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলের দিকে রওনা হচ্ছে।
রাজউক-এর ঘড়িতে দুইটা পাঁচ
৫৯. হাইকোর্ট। বাবা ওলি বাংলা ওরফে হযরত শাহ খাজা শরফুদ্দিন চিশতী (রাঃ)-র দরবার শরীফের প্রাঙ্গণ। লোকজন মোম / আগর বাতিসহ অন্যান্য জিনিসপত্র কিনে দরবার শরীফের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভিখারিরা ভিক্ষা চাইছে। তাবিজ, পাথর, মালা ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। ‘সুর তরঙ্গ বাউল শিল্পী গোষ্ঠী’-র সাইনবোর্ড সংলগ্ন স্থানে চাটাইয়ের ওপর বসে আছে দুজন মানুষ। একজন শ্মশ্রুমণ্ডিত পুরুষ, অন্যজন মহিলা। মহিলাটি পুরুষটির ঊরু টিপে দিচ্ছে। দুজনের মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত। অন্যদিকে গানের আসর বসেছে। এক মহিলা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছে ‘দুঃখ কার কাছে জানাই/ ও বাসুদা
বলেছিলি তুই, বুকে দিবি ঠাঁই’।
৬০. আবদুল গণি রোড। খাদ্য ভবনের দেয়ালে দুটি ছেলে দেয়াল লিখনে ব্যস্ত। লেখার ভঙ্গিতে একটা উদ্দাম বিদ্রোহের চেহারা পরিস্ফুটিত। দেয়ালের অনেকটা জায়গা নিয়ে মাটির ভাঁড়ে রক্ষিত রঙে ব্রাশ ডুবিয়ে দেয়াল লিখনের কাজে নিয়োজিত এই তরুণ।
৬১. সোনারগাঁ রোড। কালার লাইন প্রিন্টার্স। প্রেসের অভ্যন্তরে কর্মব্যস্ততা। একটি পাক্ষিক পত্রিকার চূড়ান্ত কাজ সংঘটিত হচ্ছে। ম্যানেজার চেয়ারে বসে কর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছে। কাগজপত্র পরীক্ষা করছে। মেঝেতে অনেকটা জায়গাজুড়ে পাঁচজন মানুষ কাজ করছে—পত্রিকার ফর্মা মেলাচ্ছে, প্রচ্ছদের মলাটের ভেতর আবদ্ধ করছে। টিস মেশিনে পত্রিকাগুলি সংযুক্ত হচ্ছে এবং সর্বশেষে কাটিং মেশিনে তা কাটা হচ্ছে।
রাজউক-এর ঘড়িতে তিনটা বিশ
৬২. সোনার গাঁ রোড দিয়ে একটি বেবি ট্যাক্সি ছুটে চলেছে। সামনের কাঁচে লালশালুতে লেখা—সংবাদপত্র।
৬৩. হাতিরপুল। দুটি কুকুর মারামারি করছে। একটি বিড়াল পথ পেরিয়ে সংকীর্ণ গলির ভেতর ঢুকে গেল।
৬৪. শাহবাগ। ‘মালঞ্চ’, ‘সানফ্লাওয়ার’, ‘পুষ্প মঞ্জুরী’, 'করবী' ও ‘মাধবী' পুষ্পকেন্দ্রের ভেতর উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলোতে গোলাপ, রজনীগন্ধা, বেলী, বকুল, কসমস, ডালিয়া, একজোড়া, গাদা, গ্লোরিয়াস ও আলমেন্টার চেহারায় ভাবের অভিব্যক্তি।
৬৫. প্রেস ক্লাব। যাত্রী ছাউনির নিচে, ফুটপাতে মানুষজন শুয়ে আছে।
৬৬. ডিআইটি এভিনিউ। ‘সংবাদপত্র’ ব্যানারযুক্ত বেবি ট্যাক্সিটি ফুটপাত ঘেঁষে থামল। ভূঁইয়া পরিবহণের কোচ দণ্ডায়মান। নেত্রকোণা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বি.বাড়িয়া প্রভৃতি জেলাগুলোতে এই পরিবহণের মাধ্যমেই পত্রিকা পৌঁছবে।
৬৭. মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা। ‘জনকন্ঠ’ পত্রিকার সমুখের রাজপথে শাহীন / মোয়াজ্জেম পরিবহণের গাড়ি থেমে রয়েছে। যশোহর, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, বগুড়া, মাগুড়া, রাজশাহী, সিলেট, জামালপুর, চট্টগ্রাম, পাহাড়তলি, সিতাকুণ্ড প্রভৃতি জেলাগুলোতে এই দু'টি পরিবহণের ব্যবস্থাপনায় ঢাকায় প্রকাশিত পত্রিকা পৌঁছে যায়।
৬৮. রামকৃষ্ণ মিশন রোড। ‘ইনকিলাব’ ভবনের সামনে পত্রিকা বহনকারী বেবি ট্যাক্সিটি থামল। দুটি ছেলে দাঁড়াল। ট্যাক্সি থেকে পত্রিকার প্যাকেট নামাল। অদূরে থেমে থাকা সিরাজ পরিবহণের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কাছে প্যাকেটগুলো পৌঁছিয়ে দিল। ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স বহুমুখী সমবায় সমিতির ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দ্বারা চালান শিপে সই করিয়ে নিল। এখন এই পত্রিকাগুলো পটুয়াখালী, বরিশালে পৌঁছিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তাদের।
রাজউক-এর ঘড়িতে পাঁচটা পাঁচ
৬৯. মোহাম্মদপুর, আসাদ গেট। যাত্রী ছাউনি সংলগ্ন রাজপথে একটি ট্রাক এসে থামল। ডেসপ্যাচ-এর লোকেরা ‘ইত্তেফাক’-এর স্তূপ নামাল। অদূরে ফুটপাতে বসে দুই কিশোরী খড়কুটো জ্বেলে উষ্ণতা পেতে চাইছে।
৭০. গাবতলি। আইল্যান্ডের ওপরে মা ও শিশু বসে আছে। শিশুটি মায়ের
দিকে চেয়ে কাঁদছে।
৭১. সদরঘাট। বাকল্যান্ড বাঁধ রোড। বাইতুন নাজাত জামে মসজিদে আজান হচ্ছে।
৭২. আহসান মঞ্জিল সংলগ্ন ফুটপাত। দুই টোকাই আড়মোড়া ভাঙল।
৭৩. আকাশে উড়ন্ত কাকের চিৎকার।
৭৪. শ্যামবাজার। মানুষজনের কর্মব্যস্ততা। হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি। আনাজ-তরকারি বহন করে মিন্তিরা ক্রেতার পেছন পেছন হাঁটছে।
পুব আকাশে রক্তিম সূর্য। বুড়িগঙ্গা বয়ে চলেছে।
[১৯৯৭ সালের এপ্রিলে অন্যদিন-এ প্রকাশিত]
Leave a Reply
Your identity will not be published.