'অন্যদিন'-এর উপদেষ্টা সম্পাদক, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আর নেই। আজ বিকেল পাঁচটায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ ।
আগামীকাল সকাল এগারোটা থেকে জাতীয় কবিতা পরিষদের উদ্যোগে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মরদেহ জাতীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রাখা হবে। তার আগে সকাল সাড়ে দশটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কলা ভবনের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জামে মসজিদে জোহরের নামাজের পর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। তারপর সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হবে।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন প্রজ্ঞা আর মুক্ত মনের মেলবন্ধন। শুধু শিক্ষা, সাহিত্য আর শিল্প বিষয়েই তাঁর ভাবনা ছিল না, দেশ, সমাজ ও রাজনীতি নিয়েও তিনি ভাবতেন। কথা বলতেন। তবে সেইসব কথায় কোনো দলীয় রাজনীতির গন্ধ থাকতো না। এ বিষয়ে তিনি নির্মোহ ও নিরপেক্ষ ছিলেন।
সিলেটের মানুষ তিনি। সেখানে ১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেন। জীবনের প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে সিলেটেই। বাসার কাছাকাছি ছিল মণিপুরীদের মণ্ডপ, দুটি মন্দির, মসজিদ তো ছিলই। বলা যায়, একটি অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বেড়ে উঠেছিলেন। বাবা-মাও সব ধর্মের মানুষকে সম্মান করতে শিখিয়েছিলেন। বিষয়টি তাঁর মনের গভীরে গেঁথে গিয়েছিল।
সিলেটের পরে চার বছর কুমিল্লায় কেটেছে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের। কেননা তাঁর মা সেখানে নওয়াব ফয়জুন্নেসা স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। কুমিল্লার এমন জায়গায় তাঁদের বাসা ছিল, যেখানে একদিকে ছিল রানীর দীঘি, অন্যদিকে ভিক্টোরিয়া কলেজ। রানীর দীঘিতে তিনি সাঁতার কাটতেন। অবারিত প্রকৃতির মাঝে ঘুরে বেড়াতেন। বলা যায়, তাঁর ছিল পানি ও ডাঙার জীবন। প্রিয় খেলা ক্রিকেটেও হাতেখড়ি হয়েছিল সেখানে।
এরপর আবার সিলেটে প্রত্যাবর্তন। সিলেট তখন ছিল অসাধারণ শহর। সাইকেলে চড়ে সেই প্রিয় শহরের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন তিনি। শহরের নানা মাঠে ক্রিকেট খেলতেন। আসলে প্রথমে স্কুলে এবং পরে কলেজে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর ক্রিকেট টিমটি। ভালো বোলিং করতেন তিনি। হ্যাঁ, সিলেট থেকেই তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮১ সালে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্জন করেন পিএইচডি ডিগ্রি।
ছোটবেলায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম হতে চেয়েছিলেন পর্যটক। কেননা অ্যাডভেঞ্চারের বই পছন্দ ছিল তাঁর। আবার তাঁর বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হোক। মায়ের বাসনা ছিল ছেলেকে ডাক্তার হিসেবে দেখার। কিন্ত ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল যে, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম শিক্ষক হবেন। আসলে শিক্ষকতা তাঁর রক্তে ছিল। কেননা তাঁর বাবা-মাও ছিলেন শিক্ষক।
শিক্ষক হিসেবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন অসাধারণ। তিনি এক্ষেত্রে কোনো ফাঁকি দেননি। সময় মেনে চলতেন সব সময়। সব শিক্ষার্থীর প্রতিই ছিল তাঁর সমান নজর। এমনকি শেষ বেঞ্চে যারা বসতো তারাও ঠিকমতো তাঁর লেকচার শুনেছে এবং অনুধাবন করেছে কি না, এ বিষয়ে তিনি সজাগ থাকতেন। আর ব্যাপক প্রস্তুতি ছাড়া তিনি কোনো ক্লাস নিতেন না।
কানাডা থেকে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ফিরেছিলেন জাহাজে চড়ে। সঙ্গে ছিল অসংখ্য বই। এইসব বই তাঁকে সাহায্য করেছিল দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে লিখতে। তাঁর 'অলস দিনের হাওয়া' গ্রন্থে সেইসব লেখা ঠাঁই পেয়েছে। নন্দনতত্ত্ব এবং এদেশের চিত্রকলা ও চিত্রশিল্পীদের সম্পর্কেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ লেখা ও গ্রন্থ রয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম ও শামসুর রাহমান সম্পর্কে তাঁর রয়েছে মূল্যবান গবেষণাকর্ম।
স্বাধীনতার পরেই তিনি গল্পকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, সাপ্তাহিক বিচিত্রার মাধ্যমে। পরে আরও দুই-তিনটি গল্প লিখেন তিনি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক ও আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রশংসা তাঁকে অনুপ্রাণিতও করে। কিন্ত এরপর তিনি গল্প লেখায় দীর্ঘ বিরতি নেন। আশির দশকের শেষ পর্যায়ে আবার গল্প লেখায় মনোযোগী হন, সিরিয়াসভাবে। অবশ্য তিনি কয়েকটি উপন্যাসও লিখেছেন। সেখানেও ছড়িয়ে আছে তাঁর সৃজনশীলতার দ্যুতি।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের 'প্রেম ও প্রার্থনার গল্প' গ্রন্থটি ২০০৫ সালে প্রথম আলো বর্ষসেরা সৃজনশীল বইয়ের পুরস্কার পায়। তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৬) ও একুশে পদক (২০১৮)-ও লাভ করেছেন।
না-ফেরার দেশে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্যদিন ১০ অক্টোবর ২০২৫ ০ টি মন্তব্য
Related Articles
বেঙ্গল শিল্পালয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মরণসভা
অন্যদিন১৯ অক্টোবর ২০২৫গতকাল ১৮ অক্টোবর, বিকেলে ধানমন্ডিস্থ বেঙ্গল শিল্পালয়ে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও কালি ও কলমের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মরণসভা।
হুমায়ূন আহমেদ: প্রয়াণের এক যুগ
অন্যদিন১৮ জুলাই ২০২৪পাখি উড়ে যায়, কিন্তু তার পালক পড়ে থাকে। মানুষ চলে গেলেও তার চিহ্ন রয়ে যায়। সৃজনশীল মানুষের ক্ষেত্রে তো এ কথা আরও বেশি সত্য। হুমায়ূন আহমেদও না-ফেরার দেশে চলে গেছেন কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর অজস্র সৃষ্টি।
Leave a Reply
Your identity will not be published.