[‘অন্যপ্রকাশ লাখ পেরিয়ে উদযাপন গল্পলেখা প্রতিযোগিতা’-য় ‘আত্মজা’ গল্পটি দশম স্থান অধিকার করেছে। এখানে সেই গল্পটি তুলে ধরা হলো।]

সকাল বেলা।

মিষ্টি রোদে ভরে গেছে চারদিক। ইতুইদের বাসাতেও সেই রোদের আভা এসে পড়েছে। ইতুইরা বাস করে তিতিরদের পাঁচতলা বাড়ির কাছেই পরিত্যক্ত একটা ঘরের মেঝেতে গর্ত করে। তিনদিন একটানা বৃষ্টির পর এই প্রথম রোদ্দুর উঠল। ইতুই চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে। কী যে সুন্দর লাগছে! ইরার চোখে অশ্রু এল। আজ ইতুইর বয়স তিন সপ্তাহ হলো। এরই মধ্যে সে বেশ ভালো রকমের দুষ্ট হয়ে উঠছে। সারাগর্তে ছোটাছুটি করে। গর্তের জিনিসপত্র বাইরে ছুড়ে ফেলে দেয়। এই তো সেদিন ও জন্মাল, কেমন গাঢ় গোলাপি রঙের ছিল। চোখ মেলে তাকাতে পারত না। এখন সমস্ত শরীর ছোট ছোট কালচে ধূসর রেশমি লোমে ভরে গেছে। এখন থেকে ওকে খুব চোখে চোখে রাখতে হবে। কখন না আবার গর্ত থেকে বের হয়ে যায়! ইরার চোখে রাজ্যের দুশ্চিন্তা এসে ভর করে। বাসায় কেবল ইতুইয়ের এ বেলার খাবারটুকু আছে। তারপর কী হবে! ইতুইকে ঘুম না পাড়িয়ে তো বাসা থেকে বের হওয়া যাবে না। ইতুইয়ের দাদি থাকলে অবশ্য এ নিয়ে তাকে ভাবতে হতো না। বাসায় একজন মুরব্বি থাকাটা যে কত জরুরি, হাড়েহাড়ে বুঝতে পারছে সে। যদিও ইরার শাশুড়ি, ইদিনা বেগম, সারা দিন ওর দোষ ধরাতেই ব্যস্ত থাকত। তার ছেলে নিখোঁজ হওয়ার জন্য সে ইরাকেই দায়ী করে।

ইরার শাশুড়ি ইদিনা বেগমের বেশ বয়স হয়েছে। প্রায় ৪৮ সপ্তাহ তো হবেই। শরীরটাও বেশ থলথলে এবং ভারী। সেইসাথে বাতের ব্যথা ও বয়স হওয়ার কারণে নানান রোগে আক্রান্ত। ব্যথার যন্ত্রণায় সে সারাক্ষণই কুটকুট শব্দ করে। তিন দিন আগে ভরসন্ধ্যেবেলা ইরা ঘুম থেকে জেগে দেখে, গর্তে কেমন অস্বাভাবিক নীরবতা। গর্তের ভেতরে প্রতিদিনের অভ্যেস হয়ে যাওয়া কুটকুট শব্দটা শুনতে পায় না। ভয়ে, আতঙ্কে সে গর্তের গোলপাশগুলোতে চোখ বুলায়। কিছু হলো না তো! গর্তে একটা চিঠি দেখতে পেল। ইদিনা বেগম কাগজে দাঁতের ছাপ ফেলে লিখেছে—

বৌমা,

দুশ্চিন্তা কোরো না। এভাবে না খেয়ে থাকলে কীভাবে টিকবে ? ইতুইয়ের কথা তো ভাবতে হবে! এইতো ক’দিন পর ইতুই চতুর্থ সপ্তাহে পা রাখবে। ওর জন্য তো খাবার মজুদ রাখা দরকার। এ সময়টা যে কত রিস্কি তা তুমি ভালো করেই জানো। দ্যাখোনা এখনই সে কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে! বারবার গর্তের বাইরে যেতে চায়। যাহোক আমি খাবারের সন্ধানে বেরুলাম। খাবার নিয়ে তবেই গর্তে ফিরব।

ইতি

ইতুইয়ের দাদি ইদিনা।

বিঃ দ্রঃ তোমাকে অহেতুকই দোষারোপ করি। আসলে দোষ আমার কপালের! নইলে আমার পনিরের টুকরা ইঁদুর ছেলেটা নিখোঁজ হবে কেন ? যদি ফিরে না আসতে পারি ক্ষমা করে দিয়ো।

ইরার চোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। স্বামী ইঁদুরটা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে ভয় আর উৎকণ্ঠা ভালোই জেঁকে বসেছিল তার ওপর। অবশ্য সে ভয়টা অমূলক ছিল না। গতকালই সে চরম সত্যিটা জানতে পেরেছে। ইতুয়ের দাদির মৃতদেহটা নিজের চোখের সামনে ড্রেনের পানিতে ভেসে যেতে দেখেছে। গতকাল বৃষ্টি আর বাতাসের বেগ এতটা বেশি ছিল যে, দৃশ্যটা চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। একটু যে ফুঁপিয়ে কাঁদবে তাও পারছে না। শাশুড়ির মৃত্যুশোকটা সে বুকের ভেতর পাথর চাপা দিয়ে রাখে। আজকাল ইতুই বড্ড প্রশ্ন করে।

কাঁদছো কেন মা ?

কই সোনা কাঁদছি নাতো!

হ্যাঁ, তুমি নিশ্চয়ই কাঁদছো। দাদির জন্য কাঁদছো, সে বাইরে চলে গেছে তাইতো! মা, চলো না আমরাও একটু বাইরে ঘুরে আসি। দেখো না কত সুন্দর! ইতুই গর্তের বাইরে উঁকিঝুঁকি মারে।

ইরা আর নিজেকে আর সামলাতে পারে না। কিচকিচ শব্দে গর্ত ফাটিয়ে কান্না জুড়ে দেয়।

মা কী হলো ? ইতুই এর আগে মাকে কখনো এতটা কাঁদতে দেখে নি। সে একছুটে মায়ের কোলের ভেতর ঢুকে পড়ল। নিজেকে সামলাল ইরা। একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক থেকে। ইতুই হয়তো জানতেই পারবে না, ওর দাদি ফিরবে না কোনোদিন। 

 

আফা ঘরে আবার ইন্দুর ঢুকছে!

রান্নাঘর থেকে রেনু চেঁচিয়ে বলল। তার কণ্ঠে উদ্বেগ ঝরে পড়ছে। রেনু এ বাসায় বছরখানিক ধরে কাজ করছে। পাঁচতলার সুন্দর এ ফ্ল্যাটটিতে ইঁদুর কীভাবে যে ঢুকে পড়ে তা রেনু কিছুতেই বুঝতে পারে না।

দিশার মেজাজ আজ এমনিতেই খুব খিঁচড়ে আছে। আগামীকাল মেহমান আসবে। মেহমান মাত্র দুজন কিন্তু আইটেম করতে হবে একগাদা। শোকেস থেকে সবচেয়ে দামি ডিনার সেট বের করে রাখতে হবে। আমেরিকাফেরত মেহমান বলে কথা! আজ অধিকাংশ কাজই বুয়াকে নিয়ে গুছিয়ে রাখতে হবে। নইলে কাল সব সামলানো কঠিন হয়ে যাবে। রেনু বুয়া থাকাতে ইদানীং কিছুটা ধকল কম হয় তার।

শাশুড়ি মা আবার ঘণ্টাখানিক আগে তাকে ডেকে ভর্তাও করতে বলেছেন। দিশার মেজাজ এ কারণে আরও বিক্ষিপ্ত।

বুঝছো দিশা, পিউলি ভর্তা-ভার্তি খুব পছন্দ করে। কয়েক রকম ভর্তা করবা। দেশি মুরগির ঝোল, করলা আর মাছ করবা দু-তিন রকমের। গলদা চিংড়ি, আইড় মাছ তো আছে ফ্রিজে। আর শোনো বড় কই মাছ আছে নাহ ? পোলাওর পাশাপাশি বাসমতি চালের ভাত রাইখো। ভালো হইতো খুদের জাউ করতে পারলে। ওইদিন খুদের জাউ আর ভর্তাটা খুব মজার বানাইছিলা। পারবা না বানাইতে ?

ফিরিস্তি শুনে দিশার ইচ্ছে করছিল দেয়ালের সাথে নিজের মাথাটা ঠুকে দিতে। কিন্তু সে মুখে হাসি ঝুলিয়ে কেবল বলল, জি মা, পারব।

আফাগো!

রেনুর আবার চিৎকার।

এইডা দেহি অনেক বড় ইন্দুর!

রেনু বুয়া চেঁচিয়ো না তো! যা করার তুমি করো। ঘরটা দেখি ইঁদুর, তেলাপোকা আর টিকটিকির দখলে। সেদিন বেসিনের পাশে দুটো টিকটিকি দেখলাম। কেবিনেটগুলো তো তেলাপোকায় ভর্তি। ইঁদুরের ওষুধ কেনো নি সেদিন ?

মুখ চালাতে চালাতে দিশা নোট বুকে লিখে রাখে—

১. পেঁয়াজ, আদা, রসুন সব মসলা ব্লেন্ড করা আছে।

২. ভর্তার সবজিগুলো আর চিংড়ি সিদ্ধ করা আছে, কেবল সরিষার তেলে ভেজে পিষে নিলেই হবে।

৩. করলা কেটে ধুয়ে রাখা আছে।

৪. গরুর মাংস কষানো আছে। অল্প পানি দিয়ে কয়েক মিনিট ফুটিয়ে নিলেই হবে।

৫. ফিরনি ফ্রিজে নীল কাচের বাটিতে। খাবারের দশ মিনিট আগে নামিয়ে নিলে হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি...

সেদিন দিশার সবকিছু গুছিয়ে উঠতে রাত দুটো বেজে যায়। রুমে এসে দেখে, রাশেদ তখনো জেগে আছে। আশ্চর্য! মানুষটা জেগে আছে অথচ সাহায্য করা তো দূরের কথা একবার দিশার খোঁজ নেওয়াটাও প্রয়োজন মনে করে নি। এতটা অমানবিক কী করে হয়!

কী অদ্ভুত তাই না! স্বামীর প্রাক্তনের জন্য রাত জেগে রান্নাবান্না করছি। এতই যখন খাওয়ানোর ইচ্ছা দু-একটা কাজে সাহায্য করতে তো পারো!

ফালতু কথা বোলো না। পিউলি আমার কাজিন। ও কোনোকালেই যে প্রাক্তন ছিল না তা তুমি বেশ ভালো করেই জানো।

ছিল না, সবাই এমনি বলে ?

মায়ের রাগ আমার ওপর ঝেড়ো না তো। রান্না করতে পারবে না বলে দিলেই পারো। আমি রেস্টুরেন্ট থেকে ব্যবস্থা করি।

এমনিতেই সারা দিনের খাটুনি তার ওপর রাশেদের চ্যাটাং চ্যাটাং কথা দিশার মনে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছিল। সেও কঠিন কিছু বলতে যাচ্ছিল তখনই দরজার ওপাশ থেকে তিতিরের গলার আওয়াজ শুনতে পায়।

মা, বাবা, জেগে আছো ?

দিশা দরজা খুলতেই দেখে তিতির বালিশ হাতে দাঁড়িয়ে।

ভয়ের স্বপ্ন দেখেছি, তোমাদের সাথে ঘুমাব।

তিতির মা-বাবার বালিশের মাঝখানে তার বালিশটা রেখে শুয়ে পড়ে। দিশা বেশ বুঝতে পারে বাবাকে বাঁচানোর জন্য সে এটা করছে। আমার মেয়েটা এত ভালো কেন ? দিশার চোখে জল টলোমলো করছে।

 

ঘুম ভাঙতেই মিষ্টি গন্ধটা নাকে এসে লাগে ইতুইয়ের। মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছিল সে। খুব সন্তর্পণে মায়ের লেজটা সরিয়ে নেয় গা থেকে। গুটিগুটি পায়ে সে গর্তের শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়ায়। মিষ্টি গন্ধটা বাইরে থেকে আসছে। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা গল্পটা মনে পড়ে তার। গল্পটা ঘুমানোর আগে মা তাকে শুনিয়েছিল। আর বলেছিল ইতুই যেন কখনো এরকম ভুল না করে। কিন্তু ইতুই কেমন মোহগ্রস্ত হয়ে গেছে। একবার পিছন ফিরে সে মায়ের অবস্থানটা দেখে নেয়। চোখদুটো বন্ধ করে একছুটে গর্তের বাইরে বের হয়ে আসে। গর্তের বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। আহা! কী যে ভালো লাগছে। ইতুই বুঝতে পারে না মা এত বোকা কেন ? এমন জায়গা রেখে কেউ গর্তে থাকে! সে প্রথমে খুব ছোটাছুটি করে এখান থেকে ওখানে। ওখান থেকে সেখানে। তখনই তার চোখে পড়ে যায় নীল রঙের রাস্তাটার দিকে। একেবারে সোজা আকাশের দিকে পৌঁছে গেছে। মিষ্টি গন্ধটা আসছে ওদিক থেকেই। একবার ওদিকটায় গেলে কেমন হয়! এক পা, দু’পা করে সে উঠতে শুরু করল। সে উঠতে পারছে। এবং সে উঠছে তো উঠছেই। হালকা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টিটাও খুব ভালো লাগছে। হঠাৎই সব যেন অন্ধকার। ইতুই ধাক্কা খেয়ে এ কোথায় পড়ল! আরে, সেই মিষ্টি গন্ধ তো এখানেই। কত যে খাবার! খাবারগুলো দেখে ইতুইয়ের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে।

রেণু রান্নাঘরের জানলার পাশে পিঁড়ি পেতে বসে আছে। খোলা জানলা থেকে বৃষ্টির ফোঁটা এসে তার চোখে মুখে ঝাঁপটা দিচ্ছে, পরনের কাপড় ভিজে যাচ্ছে। সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নাই। তার চোখ আটকে আছে ওভেনের পাশে ছোট্ট ইঁদুরটার দিকে। কী সুন্দর কাজল কালো জ্বলজ্বলে দুটি চোখ! সে চোখে যে কী মায়া। সে মায়াভরা চোখের দৃষ্টি মেলে দেখছে রেণুকে। রেণুর মনে হলো যেন তার মেয়ে কাজলী চেয়ে আছে তার দিকে। রেণুর চোখে উপচে পড়ছে অশ্রুর ধারা।

আহারে! কাজলীরে আমার! মেয়েডারে শেষ দেখাডাও দেখতে দিল না। রেণুর বুকের ভেতরটা আছড়ে পিছড়ে যায়। গ্রামের লোকজন বলাবলি করছে কাজলীরে নাকি শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ইঁদুর মারার বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে। রেণু যখন হিজলতলী পৌঁছায় তখন কাজলীর দাফন কাফনের কাজ সব শেষ।

রেণু বুয়া, তিতিরের বোতলে পানি ভরে দিয়ো তো।

ভেতরে ভেতরে তেতে ওঠে রেণু। রেণু বুয়া তিতিরের জন্য এই করো, রেণু বুয়া তিতিরের জন্য ওই করো। রেণু বুয়া, এ কদিন আসো নি কেন ? আজ তিতিরের জন্মদিন। এক্ষুনি কিচেনে যাও, রাজ্যের কাজ জমা হয়ে আছে। কেবল তিতির, তিতির আর তিতির। মেয়ে তার একলারই আছে ? আর কারও মেয়েকে যেন মেয়ে মনে হয় না!

এ কদিন আসো নি কেন ?

আসি নাই আমার মেয়েটা মইরা গেছে তাই আসি নাই, বুঝতে পারছিস ? মনে মনে সে দিশার উদ্দেশে কথাগুলো বলে। সমস্ত আক্রোশ এসে জমা হয় দিশার ওপর। মস্তিষ্কের ভেতরটা তার ক্রোধে দপদপ করতে থাকে। মহারানি কেবল হুকুম চালাবে। রেণু হিসাব করে দেখে, এ বাসায় এ পর্যন্ত সে ছয়টা ইঁদুর, ২১টা টিকটিকি মেরেছে। তেলাপোকা আর পিঁপড়ে যে কত মেরেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কেবল হুকুম আর হুকুম। ইঁদুর মারো, টিকটিকি মারো, তেলাপোকা মারো, তোমার মেয়ে কাজলীরে মারো। কাজলী রে...মারে আমার! সব আমার পাপে হইছে রে মা...কত মায়ের বুক যে খালি করছি!

রেণুর মাথার ভেতর সবকিছু কেমন জট পাকিয়ে যায়। ছোট্ট ইঁদুরটা আর তার মেয়ে কাজলী যেন এক, আলাদা নয়। তার দুচোখে ফুটে ওঠে প্রতিহিংসার আগুন। ধীর পায়ে সে খাবার ঘরে আসে। ডাইনিং টেবিলের উপরে তিতিরের পানির বোতল রাখা। কী সুন্দর নীল রঙের! সে ফিল্টার থেকে বোতলটাতে পানি ভরে নেয়। এখন একটু যদি ইঁদুরের ওষুধ ঢেলে দেওয়া যায়, কেমন হয়! রেণুর ঠোঁটের কোণে জান্তব হাসি ফুটে ওঠে। অদ্ভুত এক আক্রোশে সে রান্নাঘরের কেবিনেট থেকে ইঁদুর মারার বিষের প্যাকেটটা বের করে।

Leave a Reply

Your identity will not be published.