বাংলা চলচ্চিত্রে গ্রীষ্মকাল

বাংলা চলচ্চিত্রে গ্রীষ্মকাল

এদেশের মানুষের জীবন ও মননে ষড়ঋতুর প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাই শিল্প-সাহিত্যে ষড়ঋতুর প্রবল উপস্থিতি সহজে চোখে পড়ে। চলচ্চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়।

এখানে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রে গ্রীষ্মকাল কীভাবে উঠে এসেছে, সেটি উল্লেখ করা হলো। লিখেছেন রওশন মোমেন।

গ্রীষ্মের রুদ্র রূপ দুই বাংলার চলচ্চিত্রে আমরা লক্ষ করি। বিশেষত ঝড় প্রায়শই সেলুলয়েডে মূর্ত হয়ে ওঠে। ঝড়ের এই ব্যবহার কখনো নান্দনিক কখনো তা হাস্যকর। এছাড়া উত্তপ্ত দুপুর, গ্রীষ্মের দহনে মানুষজনের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, বৃষ্টির অভাবে মাটি ফেটে চৌচির—এইসব বিষয়-আশয় কোনো কোনো চলচ্চিত্রে দেখা যায়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সাদেক খানের ‘নদী ও নারী’-তে দেখা যায় নদীতে প্রলয়ংকরী ঝড়ের দৃশ্য। চিত্রনাট্য থেকে সেই দৃশ্যটি তুলে ধরা যাক—১. নজুর নৌকা যাচ্ছে। পদ্মার পানিতে পাতলা কুয়াশা। ঢেউ বড্ড বেশি। শান্ত আর স্তব্ধ। ইদ্রিস ও রহমান পাল তুলে দিল। কিন্তু বাতাস এক ফোঁটা নেই। কপালের ঘাম রমজান হাত দিয়ে মুছল। বসির হাল ধরে। ২. নজু গম্ভীর হয়ে ছিল। নজু—রমজান, ইদ্রিস, বৈঠা ধরো। ৩. নৌকা দমকা বাতাসে টলে উঠল। বসির আকাশের দিকে তাকাল। বসির—ইয়া বদর বদর। পশ্চিমে ছোট এক টুকরো কালো মেঘ। ঘন। ৪. ইদ্রিস ও রমজান বাদাম নামিয়ে ফেলল। নজু বেরিয়ে এল বাইরে। আকাশের দিকে তাকাল। নজু—বড় গুমসা গরম। (স্বগত) নদীর ভাবসাব বড় ভালো মনে হইতেছে না। (তারপর বসিরের দিকে) হঠাৎ যেন বাতাস গরম হইল বসির ভাই ? ৫. ঘন মেঘ ছেয়ে ফেলেছে। গাংচিলেরা ভয়ে উড়তে লাগল। সূর্য ঢাকা পড়ে গেল। চারদিকে অন্ধকার। ৬. স্তিমিত আলোকে পদ্মা ফুঁসছে। বাতাস ভীষণ জোরে বইছে। বড় বড় ঢেউ এসে নৌকার ওপর পড়তে লাগল। নজু—কাইলবৈশাখী আইতাছে, নৌকা সামাল দেও।

‘নদী ও নারী’র উল্লিখিত দৃশ্যে আমরা লক্ষ করি, কালবৈশাখীর নাচনে পদ্মা নদী ফুঁসে ওঠে। ঢেউয়ের আঘাতে কেঁপে ওঠে নৌকা। হঠাৎ প্রচÐ বাতাসে নৌকার হাল ছিঁড়ে যায় আর বসির পানিতে পড়ে যায়।

কাজী জহির প্রযোজিত ‘স্বামীর ঘর’ ছবিতে দেখা যায়—বাসরঘরেই কালবৈশাখীর কবলে পড়ে স্বামী-স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, একজন আরেকজনের মুখ দেখার আগেই। এখানে ঝড়ের জন্যেই দুজনের বিচ্ছেদ। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পরে এই ঝড়ই আবার দুজনকে মিলিয়ে দেয়। 

ঝড়কে নান্দনিকভাবে চলচ্চিত্রে প্রয়োগ করেছেন সত্যজিৎ রায় ‘চারুলতা’ ছবিতে। এই ছবিতে দেখা যায়, ঝড়ের ভেতর ভ‚পতি ও চারুর সংসারে অমলের আগমন। পরে অমল ও চারুর মধ্যে হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ভ‚পতি ও চারুর স্বামী-স্ত্রীর সংসার ভেঙে যায়। এরই পূর্বাভাস চলচ্চিত্রকার রেখেছেন ঝড়কে ব্যবহার করে। অন্যদিকে, ঝড়ের যে হাস্যকর ব্যবহার—সেটি তো আমরা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বহু চলচ্চিত্রেই লক্ষ করি। নায়ক-নায়িকা কিংবা ছবির কোনো চরিত্রের বিক্ষুব্ধ মন ও ভেতরের অন্তর্দ্ব›দ্ব দেখানোর জন্যে এই চলচ্চিত্রকাররা ঝড়কে ব্যবহার করেন। যেমন, ‘সারা রাত মহিমের মনের ভিতর দিয়া ঝড় বহিয়া গেল’—শরচৎচন্দ্রের ‘গৃহদাহ’-এর এই লাইনটি সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে চিত্রনাট্যকার তথা চলচ্চিত্রকার হয়তো সত্যিকার ঝড়কেই ব্যবহার করলেন। দেখা গেল, বাইরে ঝড় হচ্ছে আর ঘরের ভেতর পায়চারি করছে মহিম। দেয়াল ঘড়ির পেÐুলাম দুলছে। বিদ্যুতের আলোয় ঘর ভরে গেল। মহিম পায়চারি করছে। দেয়াল ঘড়িতে সময় পেরোনোর চিহ্ন। মনের ঝড়ের ব্যাপারটি এইভাবেই চলচ্চিত্রকার হাস্যকরভাবে ছবিতে দেখালেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র থেকে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে—আজাদী হাসনাত ফিরোজ পরিচালিত ‘সবার উপরে প্রেম’ ছবিতে জীবনের (ফেরদৌস) বাবা হাজি সাহেব (খলিল) যখন অন্তর্দ্ব›েদ্ব ভুগে পায়চারি করছেন, তখন তার মনের ঝড়কে বোঝানোর জন্যে প্রাকৃতিক ঝড়কেই ব্যবহার করা হয়েছে।

কাজী জহির পরিচালিত ‘মধুমিলন’ ছবিতে আমরা লক্ষ করি, গ্রীষ্মের প্রখর রোদে ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে নায়ক (রাজ্জাক) ক্লান্ত হয়ে পড়ে, হয়ে পড়ে ভীষণ তৃষ্ণার্ত।

মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত ‘বৃষ্টি’ ছবিতে আমরা লক্ষ করি, গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি প্রতীক্ষিত গ্রামে পুথি পাঠের আসর—কারবালার কাহিনি বর্ণনা, ‘দুগা চাল দিবা গো/ ব্যাঙের বিয়া হবে গো’ গান গাইতে গাইতে নারী-পুরুষ-শিশুর গ্রাম প্রদক্ষিণ, চাল-হলুদ সংগ্রহ, কুলায় গৃহস্থ বধূর ঢেলে দেওয়া পানিতে ঘুরপাক খাওয়া, রং গোলা পানি গৃহস্থ বধূর উদ্দেশে ছুড়ে মারা ইত্যাদি ডিটেলসে ফুটে উঠেছে, এমনকি ব্যাঙ জুটির উপস্থিতিও। 

‘পালঙ্ক’ ছবিতে গ্রামের একদল কিশোর গ্রীষ্মকালের এক সকালে রাজমোহনের (উৎপল দত্ত) আম-বাগানে হামলা চালায় আমের জন্যে আর রাজমোহন দেখতে পেয়ে তাদের তাড়া করে। সিকোয়েন্স ৯ থেকে তুলে ধরছি—‘লাঠি হাতে ধেয়ে চলেন রাজমোহন বাগানের অন্যপ্রান্তে—রাজ : ওই. ওই হুয়োরের পুত। কে গাছে উঠছিস রে ? এতো চোইদ্দ গুষ্টির অ্যাজমালি গাছ পাইছিস রে হারামজাদার পাল ? লাম, লাম গাছ থিকা। লাম কইলাম! না তো তগো ছেরাদ্দ করি কেমুন কইরা দ্যাখ।... দূরে ঝাঁকড়া আমগাছ থেকে গুটিকয়েক ছেলে হুড়হাড় করে লাফিয়ে পড়তে পড়তে বলে—খাইছে রে, খাইছে! পালা পালা, বুইড়া হক্কুন, বুইড়া হক্কুন!... ছেলের দল পালাতে থাকে বাঁশবনের ভেতর দিয়ে, গালাগালি করতে করতে পিছু ধাওয়া করে চলেন রাজমোহন।’

তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রে দেখতে পাই, চলচ্চিত্রটির প্রধান চরিত্র আনু (নুরুল ইসলাম বাবলু)-র ছোট চাচা মিলন (শোয়েব ইসলাম) প্রগতিশীল। বামপন্থী চিন্তার অধিকারী। তিনি আনুর বাবা কাজি (জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়)-র অপছন্দ সত্তে¡ও ভাতিজা আনুকে চৈত্রসংক্রান্তির দিন বাঙালি উৎসব আর নৌকাবাইচ দেখাতে নিয়ে যান। চলচ্চিত্রে লোকগান, পুথিপাঠ, চড়কপূজা, সূচিকর্ম, গ্রামীণমেলা, বাহাস ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলার সংস্কৃতি ফুটে উঠেছে।

প্রয়াত নির্মাতা খালিদ মাহমুদ মিঠুর ছবি ‘গহীনে শব্দ’র শুরুতে দেখতে পাওয়া যায় মঙ্গল শোভাযাত্রা, যেখানে অংশ নেন ছবির নায়ক ইমন ও নায়িকা কুসুম। ছবিতে চারুকলার কিছু দৃশ্যও আছে—যেখানে কুসুমকে শোভাযাত্রার প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। সেখানে থাকেন ইমনও। মূলত রোমান্টিকতা ফুটিয়ে তুলতেই এ দৃশ্য রাখা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তারা মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেন।

চিত্রাভিনেত্রী মৌসুমী পরিচালিত প্রথম ছবি ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’। এই ছবিটিতে বৈশাখী আয়োজন দেখা যায়। মূলত বৈশাখী অনুষ্ঠানের মঞ্চে নায়ক রাজ্জাক ‘এক বৈশাখে লেখা প্রেমের চিঠি নির্জনে পড়ে নিয়ো’ গানটি গেয়ে ওঠেন। গানটির মূল শিল্পী বশির আহমেদ।

রেকর্ডসংখ্যক ১৭টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া ‘মৃত্তিকা মায়া’ চলচ্চিত্রটির গল্প আবর্তিত হয়েছে কুমার সম্প্রদায়কে নিয়ে। গল্পে উঠে আসে একটি বটগাছ। যাকে ঘিরে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলা। সেই বট গাছটি কেটে ফেলার হুমকি ও তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাকে ঘিরেই ছবিটি নির্মিত হয়েছে। এটি পরিচালনা করেছেন গাজী রাকায়েত।

এমনিভাবেই দুই বাংলার নানা চলচ্চিত্রে বৈশাখ তথা গ্রীষ্মকালের রেখাপাত আমরা দেখতে পাই। উল্লেখযোগ্য আরও চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—সূর্যদীঘল বাড়ি, দহন, অন্য জীবন, বাইশে শ্রাবণ, শীত-গ্রীষ্মের স্মৃতি ইত্যাদি

Leave a Reply

Your identity will not be published.