নীল কাগজের নৌকো

নীল কাগজের নৌকো

কৃষ্ণচূড়ার ডালে বসে দোয়েলটা শিস দিচ্ছে। সেই কোন সকালে ও এসেছে। ওর ডাকেই অমলাদেবীর ঘুম ভেঙে যায়। খোলা জানালা দিয়ে তার চিকন শিসে যেন গোটা ঘর ভরে গেল। আজকাল অমলাদেবীর ঘুম কমে গেছে। বয়স বাড়ছে। আগে কত সকাল সকাল উঠে কাজ সেরে নিতেন। অতুলের অফিসের তাড়া। ছেলেদের স্কুল। যতদিন শ্বশুর-শাশুড়ি বেঁচে ছিলেন তাদের দেখাশোনা। অমলাদেবী চরকির মতো ঘুরতেন। তারপর কী হলো ? একটু একটু করে একা হয়ে গেলেন। কেমন চুপচাপ হয়ে গেল বাড়িটা। ছেলেরা কাজ নিয়ে শহরে চলে গেল। একদিন হঠাৎ করে চলে গেল অতুল। তখন বয়সই-বা কত হয়েছিল ? অতুল তাকে বড় একা করে দিয়ে গেল। এত বড় বাড়িতে তার মন টিকে না। কিন্তু তার কোনো উপায় নেই। তার দুই ছেলেই প্রতিষ্ঠিত। বউমারা আছে। তাদের ছেলেমেয়ে। সেই পুজো ছাড়া আসে না। অমলাদেবী পুজোর দিন কটা খুউব আনন্দ করে কাটান। তাদের বাড়ি লাগোয়া ডুমনি নদী। এখন তার স্রোত নেই। তবু সে নদী। অমলাদেবী তাই-ই মনে করেন। নদীর উত্তর দিকে আন্ডিরণ গ্রাম, দক্ষিণে কাপাসডাঙ্গা, নওপুকুরিয়া, নবাব বাড়ি, বেগুনবাড়ি। আরও কত গ্রাম। এক ডাকে অতুলকে চিনত মানুষ। বিপদে আপদে ছুটে যেত ও। কী রাত কিবা দিন। কত মানুষ আসত তাদের বাড়ি। অতুল মানুষ ভালোবাসত। চোখের সামনে সব বদলে গেল। অমলাদেবী নিজেও কি বদলান নি ? অতুলকে সব সময় মিস করেন। অতুল বলত, আমি এই মানুষের মনে বেঁচে থাকব। আমার বাগানটা যত্ন নিয়ো অমলা। গাছগুলো কথা বলে। ওরা বোঝে। কিন্তু বলতে পারে না।

কী যে বলো না তুমি! গাছ কথা বলে কখনো ?

বলে গো বলে। যখন ফুল দেয়। সুগন্ধি ছড়ায়। পাতাগুলো তিরতির করে বাতাসে নড়ে। তুমি খেয়াল কোরো।

রাত হচ্ছে। আমি সকালে উঠতে পারব না।

কে তোমাকে উঠতে বলেছে ? এসো একটু আদর করি।

আঃ! কী হচ্ছে অতুল ?

আরে বাবা একটু দেখি তোমাকে চোখভরে। তুমি আছ বলেই এত সুন্দর লাগে সব।

আবার কাব্যি।

ও তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো।

কী বুঝব মশায় ? সেই তুমি ঘুমিয়ে যাবে। আমার রাত কাটবে একা একা। পাখির ডাক শুনে। অত রাতে কোন পাখি ডাকে কে জানে!

অমলাদেবী অন্যমনস্ক হয়ে ভাবছেন। এমন সময় তুলসী এসে ঘরে ঢোকে। হাতে চা।

মাসি, উঠবে না ? কত বেলা হলো। চা কখন খাবে বলো তো ?

তুলসী মাঝে মাঝে অমলাদেবীকে শাসন করে। ওর শাসন বেশ ভালোই লাগে।

ওঠো মাসি।

উঠছিরে। আজ রাতে ভালো ঘুম হয় নি।

ঘুমের বড়ি আজ খাও নি তুমি ?

ভুলে গেছিলাম।

দাদাবাবু ফোন করলে সব বলে দেব।

বলগে যা।

ঠিক আছে।

অমলাদেবী বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে আসেন। চাটা বাগানে দিতে বলেন। অমলাদেবী বাগানে চলে যান। দোয়েলটা উড়ে গেছে। তার আর ডাক শোনা যাচ্ছে না। অমলাদেবী তাকে খুঁজছেন। বকুল গাছটার নিচে এসে বসেন। তুলসী আবার চা গরম করে দিয়ে যায়। চায়ের সঙ্গে কিছু খান না। এই সময় বসে পাখি দেখেন। গাছ। ডুমনি নদী। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ডুমনিকে দেখা যায়। অতুলের লাগানো গাছগুলো দেখেন। গাছে ফুল এলে খুব খুশি হন। গন্ধ নেন নাক ডুবিয়ে। অতুলকে অনুভব করেন, যেন এখনো তার উপস্থিতি রয়েছে। মর্মে মর্মে তিনি তা অনুভব করেন। ছেলেরা ডাকলেও তিনি যেতে পারেন না। তাহলে অতুল একা হয়ে যাবে। কে তাকে দেখবে ? তার লাগানো গাছগুলো অনাথা হয়ে যাবে। এখানে তার শিকড় পোঁতা। তা ছিঁড়ে কি কখনো তার যাওয়া হবে ? পারবেন না। তিনি এখানেই থাকবেন। অতুলকে তিনি কী জবাব দেবেন ?

অতুল যখন বলবে, অমলা, চলে গেলে আমাকে একা রেখে ? আমি এখনো আছি এইখানে। তোমাকে ছেড়ে কোথায় যাই বলো তো ?

অমলাদেবীর চোখে জল। চা পড়ে থাকে পেয়ালাতে। তুলসীকে ডাকেন। হোম থিয়েটারটা অন করতে বলেন। ওর বড় ছেলে এনে দিয়ে ছিল। ওর মা গান শুনতে ভালোবাসেন বলে।

তুলসী চালিয়ে দেয়। রবীন্দ্রসংগীত বাজছে।

আমার হিয়ার মাঝে...

তার প্রাণ রবীন্দ্রনাথ। তিনি যখন ভেঙে পড়েন তখন রবীন্দ্রনাথকে শোনেন। মন ভালো হয়ে যায়। কেমন এক উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। ছাতিম পাতার আড়ালে যেন রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। তার সবখানে রবীন্দ্রনাথ।

ছাতিম গাছটা অতুল লাগিয়েছিল। আজ কত বড় হয়েছে। অমলাদেবী তাকিয়ে থাকেন এক দৃষ্টিতে। ছাতিম ফুলের গন্ধ অতুলের কথা মনে করিয়ে দেয়। মানুষটি তাকে সব সময় আগলে রেখেছে। আজ তার শূন্যতা অনুভব করেন। খেতে বসে বারবার তার মুখটা মনে পড়ে যায়। অতুল খেতে খুব ভালোবাসতে। পাত বিলের মাছ আনত নিজে কিনে। পাত বিলে সব রকম মাছ হতো। খেতেও খুব সুস্বাদু। পাত বিলে অতুল ছিপ নিয়ে কখনো-সখনো মাছ ধরতে যেত। ওর মাছ ধরা বাতিক ছিল। ডুমনিতেও ছিপ দিয়ে মাছ ধরত। এখানে অনেক মাছ হয়। অমলাদবী আর মাছ খান না। মাছ খেলেই অতুলের মুখটা মনে পড়ে যায়। আর মাছ মুখে তুলতে পারেন না। এখন আর মাছ বাড়িতে আসে না। তুলসীকে বলেন, মাছ আনতে তার জন্য। তুলসীও মাছ খায় না। ও বলে, মাসি, তুমি খাবে না। তাহলে একার জন্য মাছ এনে কী করব ?

অমলাদেবী এ কথা শুনে হাসেন। বলেন, আমি নাইবা খেলাম। তুই খাবি না কেন ?

দাদাবাবুরা এলে তখন খাব। এবার পুজোতে আসবে, তখন জমিয়ে রান্না করব। কী বলো মাসি ?

তা করিস।

তুমি একটু খাবে না ? পাত বিলের মাছ তুমি কতদিন খাও না!

তুলসী বলে কথাটা।

অমলাদেবী কিছু বলেন না। ঘরের দেওয়ালে টাঙানো অতুলের ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। মানুষটা তাকে একা রেখে পালিয়ে গেছে। কেমন একটা অভিমানে তার ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে। একা বিছানায় তার ঘুম আসে না। ছটফট করেন। রাতের তারাভরা আকাশ দেখেন। রাতচোরা পাখির ডাক শোনেন। ভোর হয়। তার আর ঘুম আসে না।

এমন সময় হঠাৎ একটা মাছরাঙা ডেকে উড়ে গেল ডুমনির ওপর দিয়ে। অমলাদেবী চমকে ওঠেন। কাপ থেকে চা ছলকে পড়ে যায়। বকুল ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে আছে বাগানময়। বুকভরে গন্ধ নেন। তার আপন বলতে এখন চারপাশের এই গাছগুলো, যাতে অতুলের স্পর্শ লেগে আছে। তাকে অনুভব করেন। অতুল কি বুঝেছিল যে সে আর বেশিদিন বাঁচবে না ? কখনো মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক থাকত। কথা বলত না। জানালা দিয়ে দূরের খেতি জমি দেখত। সে কি শেষ হয়ে আসছিল ভেতর ভেতর ? অমলাদেবী অতুলকে আগে কখনো এমন দেখেন নি। দুম করে চলে গেল। সব ফাঁকা হয়ে গেল। যা আর পূর্ণ হবে না কোনো দিনই।

অমলাদেবীর চোখে জল। চোখে ঝাপসা দেখেন। রবীন্দ্রসংগীত বাজছে। মন আজ তার তোলপাড়।

দূরে দূরে কোথায়...

রবিঠাকুর, হাতটি আমার ধরো। অমলাদেবী আপন মনে বলেন। বলে চলেন। চোখ ভিজে যায় জলে। তার মন বাঁশিতে লেগেছে আজ ব্যথার আঁচড়। তিনি ক্ষয়ে যাচ্ছেন একটু একটু করে। ফুরিয়ে আসছে বেলা। এই শেয বেলায় কি সবার সঙ্গে দেখা হবে ? সন্তানের মুখগুলো মনে পড়ছে। কেমন করে রেখে যাবেন তিনি ? কোন মায়াতে আটকে আছেন ? ছেঁড়া যায় না সম্পর্কের বাঁধন। জীবনের আর কটা দিনই-বা বাকি আছে ? দুচোখভরে দেখে যেতে চান। গোটা বাগানে আজ বকুল ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে। অমলাদেবী বকুল ফুল নিয়ে রাখেন ঘরে। রাতে অতুলের কথা ভাবেন। অতুল বকুল গাছটা এনে লাগিয়েছিল। দেখতে দেখতে গাছগুলো কত বড় হয়ে গেল! যেন ওর সন্তান। ওরাও বড় হয়ে তার কাছে থেকে দূরে চলে গেল। কাউকেই ধরে রাখা গেল না। ওরা ওদের জীবনে ওদের মতো করে বাঁচছে। মাঝেসাজে আসে। তখন বাড়িটা ভরে ওঠে। অমলাদেবীর বুকটাও ভরে থাকে ভালোবাসায়। নিজ হাতে রান্না করেন। তুলসীকে কিছুই করতে দেন না। তাই নিয়ে তুলসীর মুখ ভার। ওকে বোঝাতে হয়। আর সে বুঝবে না। রেগেমেগে বলবে, আমি কি খারাপ রাঁধি ? দাদাবাবুদের একটু রেঁধে খাওয়ার ভাগ্য কি আমার হবে না ?

রাগ করে রান্নাঘর থেকে চলে যায়। অমলাদেবী হাসেন।

অতুল যা রেখে গেছে তা শেষ হতে চলল। যেটুকু জমিজিরাত আছে তা থেকে কিছু আয় হয়। জমিল কাকা দেখেন। জমিতে সব রকমই ফসল হয়। জমিল কাকার বয়স হয়েছে। আর তেমন পারেন না কাজ করতে। ওর ছেলেরা যেতে দেয় না মাঠঘাটে।

জমিল কাকা ওদের বলেন, আমি না থাকলি মা’টা যে ভেসে যাবে। কে তাকে দেখবি বল ?

কাকা এলেই মনে হয় ওর বাবা এসেছেন। অমলাদেবী জমিল কাকার দিকে তাকিয়ে থাকেন। মানুষটা তাকে আগলে রেখেছেন। অতুল খুব ভালোবাসত জমিল কাকাকে। এ বাড়ির পুজোপাঠ থেকে শুরু করে বিয়ে থা সবতে জমিল কাকা। তিনি না থাকলে হবে না। জমিল কাকা একটু আসতে দেরি হলে হাঁকডাক পড়ে যেত। তারপর কাকা এসে এক মুখ হাসি নিয়ে বলতেন, আরি বাবা, আমার বয়স হয়েছে। এবার...!

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অতুল বলত, কাকা, তুমি না হলে বাড়ির কোনো কাজ মানায় ? বাবার মতো তুমি। বাবা নেই তাই আমরা তোমাকে মানি। এসো এসো সবগুলো দেখে নাও।

অমলাদেবী সব বুঝিয়ে দিতেন। সেসব দিনগুলো কত সুন্দর ছিল। সময়ের সঙ্গে কত কী-ই বদলে যায়। অমলা দেবী নিজেও কি বদলে গেছেন ?

উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকেন। তুলসী এবার ডাকবে জলখাবার খেয়ে নেওয়ার জন্য। আজকাল খিদেটাও মরে গেছে। খেতে ইচ্ছে করে না। অতুলের লাগানো আম গাছে কত আম আসে। তিনি একটিও মুখে দেন না। বাচ্চাদের সব দিয়ে দেন। বাচ্চাগুলো পাকা আম যখন আনন্দ করে খায়, তখন তিনি মনে মনে খুশি হন। তার নাতি-নাতনি এলে এভাবেই দিতেন খেতে। কিন্তু তাদের আসার সময় কোথায় ? যে যার মতো আছে। শুধু মনে মনে কষ্ট পোয়ানো। কিন্তু কষ্ট তো তাকে পেতেই হয়। একা মানুষ কীভাবে বাঁচে ? একাকিত্বের কষ্ট যে জানে সে জানে। জীবন বয়ে যায় ঠিক-ই। কিন্তু যে কষ্ট তা চিতা পর্যন্ত হয়তো জ্বলতেই থাকে বুকের ভেতর। সেই আগুনের ক’জন খোঁজ রাখে ?

এত দিন পর তা অনুভব করছেন তিনি। না, আজ সকালটা অন্য রকম তার কাছে। যতদিন যাচ্ছে তত বেশি ভাবনাগুলো তাকে চেপে ধরছে। এত ভাবনা নিয়ে কি বাঁচা যায় ? মনে কত কী-ই থেকে যায়। মাঝে মাঝে এসে ভিড় করে মনে। হঠাৎ সেদিন রাতে উমেশকে মনে পড়ে যায়। কলেজে এক সঙ্গে পড়ত। ভীষণ আলাপি। ওর সাথে মেলামেশা থেকে ভালোবাসা অবধি সম্পর্কটা এগিয়ে ছিল। উমেশকে অমলার বাবা মেনে নেন নি। উমেশ অনেক বড় বাড়ির ছেলে ছিল। তার কোনো অভাব ছিল না। অথচ বাবা কেন যে মেনে নেন নি তা আজও তার কাছে অধরা। দুম করে অতুলের সঙ্গে বিয়ে দেন। অমলা ধীরে ধীরে উমেশকে ভুলে গেল। সত্যিই কি ভুলে গেল ?

উমেশ বিয়ের পর দেখাও করেছে। ততদিনে অমলা মা হতে চলেছে। উমেশ আজও নাকি বিয়ে করে নি। উমেশ এখন কোথায় কে জানে!

অমলাদেবী এত বছর কেটে যাওয়ার পরও উমেশকে ভুলে যান নি। কখনো কোথাও গেলে তার চোখ খুঁজে চলে মানুষটিকে। কিন্তু কোথাও আর দেখা মেলে না। উমেশও কি তাকে খোঁজে ? এত দিন পর হয়তো সে ভুলে গেছে।

এমন সময় হঠাৎ তুলসী ডাকে, মাসি, এসো খাবে।

অমলাদেবীর চমকটা ভেঙে গেল। চা যেমনকার তেমনটিই আছে কাপে। ঠান্ডা। অমলাদেবী ধীরে ধীরে ওঠেন। হাঁটুতে ব্যথা। আজকাল শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। কখন কী হয় কে জানে! একটা মাছরাঙা ডুমনির দিকে উড়ে গেল ডেকে।

 

জমিল কাকা এসেছেন। খবরটা তুলসী দেয় শোবার ঘরে গিয়ে। অমলাদেবী এখনো বিছানা ছাড়েন নি। একটু দেরি করেই ওঠেন। ঘুমিয়ে থাকলে তুলসী ডাকে না। ও জানে ডাকলে মাসির মাথা ধরে। কিন্তু আজ ডাকতেই হলো। কাকাকে বসবার ঘরে বসাতে বলেন অমলাদেবী। তারপর বিছানা ছেড়ে ওঠেন।

কাকা এলেই বাবা বাবা গন্ধটা পান তিনি। জমিল কাকা না থাকলে তিনি একা থাকতে পারতেন না। ক’দিন ধরেই তিনি ভাবছিলেন কাকাকে নিয়ে। আজ ডেকেছেন কিছু বলার জন্য। অমলাদেবী বসেন সামনের চেয়ারে। তারপর আস্তে আস্তে বলেন, কাকা, আমি ভালো নেই। তাই ভেবেছি আমার সম্পত্তিটুকু যা আছে, আমি লিখে দিয়ে চাই। কাগজ দীনু কাকাকে রেডি করে নিয়ে আসতে বলেছি।

জমিল কাকা অবাক হয়ে তাকায় অমলা দেবীর দিকে। কী বলবেন ভেবে পান না। এত কাল এ বাড়ির সাথে একটা নিবিড় সম্পর্ক। আজ যেন তা ছিন্ন হতে চলেছে। তিনি তা করতে দিতে পারেন না।

মা, তুমি এ সব কী বলছো বলো দেনি ? আমি কী করব এ সব ?

কাকা, ছেলেরা আর এখানে আসবে না। আমি চলে যাওয়ার পর সব পড়ে থাকবে। আমার অতুল কার কাছে থাকবে কাকা ? এ বাড়িতে সে আজও আছে। থাকবে। কাকা, তুমি দেখো। তাই আমি লিখে দিতে চাই তোমাকে। আমি মরে শান্তি পাব।

এ সবের কোনো দরকার নেই মা। ছেলেদের হক। ওদের বঞ্চিত কোরো না মা। আমি দেখব সব। তুমি আরও অনেক কাল বেঁচি থাকো। জায়নামাজে বসে খোদার কাছে তোমার জন্যি দোয়া করি মা।

জমিল কাকার চোখে দুটো ছলছল করে ওঠে জলে। কথা বলতে পারেন না। জীবনের শেষ লগ্নে এসে অমলাদেবী আর সয়সম্পত্তি নিয়ে ভাবেন না। তাই দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আঁকড়ে ধরে কী লাভ ? অমলা দেবী এবার মুক্তি পেতে চান। তাকে ডুমনি মা ডাকছে। জমিল কাকা বসে আছেন। যেন তার বাবা বসে আছেন। মানুষটিকে অতুল খুব শ্রদ্ধা-ভক্তি করত।

বেশ কিছুটা সময় কেটে যায়। তুলসী চা দিয়ে গেছে। কিন্তু কেউই কাপ ছুঁয়ে দেখছে না। আজ সকালটা বড়ই মায়াবী। বাগানে ঘুঘু ডাকছে ঘুগ ঘুগ করে। অমলাদেবী এই সময় একটু বাগানে যান। পাখিদের সাথে মনে মনে কথা বলেন। গন্ধ নেন গাছের শুকনো পাতার। ডুমনির জলজ গন্ধ বুকভরে নেন। তার কত দিনের চেনা সব। পুজোর ধূপের গন্ধ আর জমিল কাকার মাঠ থেকে ফেরার মাটির সোঁদা গন্ধ তিনি আজও ভালোবাসেন। এ সব ছেড়ে যেতে তার কষ্ট হবে ঠিকই, কিন্তু যেতে তো হবেই। সংসারের চাবিগুচ্ছ রেখে যাবেন। তুলসী থাকল। জমিল কাকা। বাগানের গাছগাছালি। পাখি। অতুলের বকুল। ছাতিম। আম। সব। সব থেকে যাবে। শুধু অমলাদেবী থাকবেন না।

কাকা, আমি চলে গেলে ডুমনি মায়ের কাছে আমার শেষকৃত্য দেবেন। আমি শান্তি পাব।

মা, একী বলো তুমি ? এ কথা কি মুখে আনতি হয়!

ছেলেদের খবর দেবেন কাকা। আজকাল শরীর ভালো যাচ্ছে না। ডাক্তার দেখিয়েও লাভ কি ?

তা বলি এমন কথা বলো নি মা!

জমিল কাকার গলা ধরে আসে। কত সুখ-দুঃখের সাথি। একদিন না এলে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো তাকে। মা না থাকলে তিনি কি আর আসতে পারবেন এ বাড়িতে ? এ বাড়িতে যাতে আসতে পারেন সেই ব্যবস্থা করছে মা। না না, এমন হতে পারে না। লোকে কী বলবে ? জমিল আলি একটা ঠগবাজ! ছিঃ!

মা, কাগজগুলো ছিঁড়ে ফেলো। কী হবি এ সব ?

জমিল কাকা আর বসেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। তার জীবনে এমনও দেখতে হলো ?

মনে মনে ভাবেন তিনি।

অমলাদেবী একা বসে থাকেন। বাগানে ঘুঘুটা ডেকেই চলেছে। তুলসী কাপ নিতে এসে দেখছে। অমলাদেবী কাঁদছেন। এমন কখনো দেখে নি সে। মানুষটা সব সময় ওর সঙ্গে হেসে কথা বলেন। ও নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কী বলবে ভেবে পায় না। তারপর একটু সময় নিয়ে বলে, মাসি, তুমি কাঁদছো ? কেন গো ?

তুলসী, তুই এ বাড়িতেই থাকিস।

ও আরও অবাক হয়। সে তো এ বাড়িতেই আছে। এই মাসি আছে বলে আজ দুমুঠো তারা খেতে পায়। তার বাবা কাজ-কাম পারে না। অনেক দিন থেকে অসুখ। মাসি তাকে জায়গা দিয়েছিল।

মাসি, কী বলছো গো! আমি আর কোথায় যাব ? থাকব এখানেই।

থাকিস। চিরকাল এখানে থাকিস। আমি সব ব্যবস্থা করে দিয়ে যাব।

তুলসী এ কথার কোনো মানে বুঝল না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ঘুঘুটা আবারও ডাকছে।

অমলাদেবী আস্তে আস্তে বাগানের দিকে এগিয়ে গেলেন।

 

একটা একটা করে কাঠ বয়ে আনছিলেন জমিল কাকা। কী শান্ত ডুমনি আজ। জমিল কাকার চোখে জল। অমলাদেবীর ছেলেরা দাঁড়িয়ে। যাদের সঙ্গে আর শেষ দেখা হলো না অমলাদেবীর। নাতি-নাতনির মুখ ধরে শেষ চুমুটুকু দিয়ে যেতে পারলেন না। যাদের শেষ জীবনে আঁকড়ে ধরে থাকতে চেয়েছিলেন। তার মনের চিতা অনেক আগেই জ্বলেছিল। সেই আগুন আজ তাকে গিলে নিল।

Leave a Reply

Your identity will not be published.