[্এখানে প্রথিতযশা নাট্যজন প্রয়াত আতাউর রহমানের স্মৃতিকথা প্রকাশিত হলো। এতে তাঁর শৈশব-কৈশোরের নানা ঘটনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। অবশ্য পরিণত বয়সেরও কিছু বিষয় রয়েছে। উল্লেখ্য, এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘অন্যদিন’ ঈদসংখ্যা ২০২৪-এ।-বি.স]
প্রাককথন
আমি এই দীর্ঘ জীবনে অনেক বিখ্যাত ও স্বল্পখ্যাত মানুষের আত্মকথা পড়েছি। আত্মকথা বা স্মৃতিকথা অনেক সময় উপন্যাস বা কল্পকথার চেয়েও আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে। বেশ কয়েকটি আত্মজীবনী আমাকে আলোড়িত করেছে। আমার বিভিন্ন বয়সে পড়া নীরদচন্দ্র চৌধুরীর ‘অ্যান অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যান আন্ নুন ইন্ডিয়ান’, মহাত্মা গান্ধীর আত্মজীবনী, বার্টান্ড রাসেলের আত্মজীবনীসহ আরও বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির একাধিক আত্মকথা আমাকে আলোড়িত করেছে। এই পঠনের সবই যে প্রশংসনীয় ছিল তা নয়। নিজের মনের ভেতরে পঠিত আত্মকথা সম্পর্কে ভালো-মন্দ মিলিয়ে একটি চিত্র তৈরি করেছিলাম, যা হয়তো একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনারই অন্তর্গত হয়ে আছে।
একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার আত্মকথা নিজের কাছেই বিচিত্র আর অদ্ভুত মনে হয়। জন্ম নোয়াখালীতে, নানার বাড়িতে। স্কুলজীবন শুরু হয় বাবার কর্মস্থল চট্টগ্রামে। আমি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র ছিলাম। তখনকার দিনে সেই বিখ্যাত স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশান (বর্তমানে এসএসসি সমতুল্য) পরীক্ষায় পাশ করে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করি এবং তারপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। স্কুলজীবনে ছাত্র হিসেবে মোটামুটি ভালোই ছিলাম। পরবর্তী সময়ে বাইরের আরও অনেক বাউন্ডেলপনার চক্রে পড়ে মাঝারি মেধার ছাত্রে পরিণত হয়েছিলাম। আমি দু’বছর পড়াশোনায় নষ্ট করি। চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময়ে আমি পদার্থ ও রসায়নশাস্ত্রের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাশে নিয়মের অতিরিক্ত বেশিদিন অনুপস্থিত থাকার কারণে ডিসকলেজিয়েট হয়েছিলাম।
আমার বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগত না। আমার জনক পুত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে, যথা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য আমাকে বিজ্ঞান পড়তে একরকম বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু আমার ঝোঁক ছিল গল্প, কবিতা, নাটক পড়া ও গান শোনার প্রতি। খেলাধুলায়ও আমার আগ্রহ কম ছিল না। চলচ্চিত্র বা সিনেমা দেখার নেশাও ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি পড়তে এসে সেশন জটে আরও এক বছর নষ্ট হয়। যাহোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে এমএসসি পাশ করি মৃত্তিকা বিজ্ঞানে। ছাত্রজীবন শেষ করে এক বিচিত্র জীবনের পথিক হয়ে পড়ি। জীবনের সব হুল্লোড়ই আমার ভালো লাগত। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি খেলা থেকে নিয়ে যত ইনডোর খেলাধুলা যেমন—কেরাম, লুডু, পিংপং (টেবিল টেনিস) খেলায় ছিল আমার সমান আগ্রহ। অল্প বয়সে তাসের প্রায় সব খেলাই শিখে ফেলছিলাম; ব্রিজ, হাইড্রোজেন, পোকার, রামি ইত্যাদি। সিনেমা দেখা, বই পড়া, কবিতা পাঠ করা এবং অভিনয়শিল্পের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল অপরিসীম। তবে সবচেয়ে আনন্দ পেতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতে বা গল্পগুজবে মত্ত থাকতে। উল্লেখ্য যে, গল্পগুজবের রসদ হিসেবে দেশ ও বিদেশের বাংলা ও ইংরেজি সাময়িকীগুলো পরম নিষ্ঠার সাথে পড়তাম এবং সেগুলো মহাগরিমায় বন্ধুদের সাথে আড্ডার সময় কাজে লাগাতাম। যেহেতু আমাকে দিয়ে সংগীত ও সাহিত্যচর্চা তেমন যুৎসই হলো না, নাট্যপ্রীতিই আমাকে স্থান করে দিল শিল্পের ভুবনে।
আমি আমার এই জীবনে নানা বর্ণিল ও দুঃখের বাতাবরণ পার হয়ে আজ প্রবীণত্বে পৌঁছেছি। আমি নিজ দেশের আনাচে কানাচে ঘুরেছি। পাকিস্তানি শাসনের রক্তচক্ষু দেখেছি। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে নিমগ্ন বাঙালির গৌরব অনেক কীর্তিমান পুরুষ ও নারীকে সামনা-সামনি দেখেছি। কারও জীবন যদি একরৈখিক হয়ে যায় তাহলে জীবন যাপনের আনন্দ নষ্ট হয়ে যায় বলে আমি মনে করি। আমি মনে করি, বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি এবং জীবনসংগ্রামই মানুষকে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। যদি সংগ্রামই না থাকে, সেই জীবন আমার কাছে একেবারে বর্ণহীন বলে মনে হয়। আমি আজ বুক ফুলিয়ে বলতে চাই, সব সুন্দর ও অসুন্দরকে আলিঙ্গন করে আমি যে মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছি, সেই মাটি বা দেশকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছি। মঞ্চনাটকের বেদিতে নিজেকে সমর্পণ করে জীবনকে সার্থক করে তুলেছি। স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয় দেখেছি। সিরিয়া, রাশিয়া, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, গ্রীস, মিশর, চীন, জাপান, ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছি। নিজের টাকায় তেমন ঘুরতে পারি নি, কখনো বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ঘুরেছি, কখনো-বা বিভিন্ন সংস্থা বিদেশ ভ্রমণের অর্থ জুগিয়েছে। আমি চাইলে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারতাম, যেমন বাংলাদেশের অনেক মানুষই স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাস করছে। আমার ভাবনা ছিল একটাই; যাকে আমি বেদ বাক্যের মতো মনে করি, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কথায়—‘আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতেই মরি’ এবং পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের লেখা আমাদের জাতীয় সংগীতের চরণ—‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়ন জলে ভাসি’ এই চরণটি শোনার পরে সত্যিই আমি নয়ন জলে ভাসি। প্রসঙ্গত বিলেত-ফেরা তরুণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখনকার পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে থাকার সময়ে গগন হরকরার লেখা বাউল গান—‘আমি কোথায় গেলে পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে’ অবলম্বনে আমাদের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ রচনা করেছিলেন। ১৯০৫ সালে গানটি বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন উপলক্ষে রচিত হয়েছিল। এই গানটিকেই আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
আমার জন্ম ১৯৪১ সালে; ব্রিটিশ ইন্ডিয়াতে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকেরা ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে সম্মিলিত নেতৃবৃন্দের মতাভিমত ও দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে অখণ্ড ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে দুটি রাষ্ট্র; যথা—ভারত ও পাকিস্তান। বাংলাদেশের বাঙালিদের জুড়ে দেওয়া হলো হাজার মাইল দূরে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে; কেবল মাত্র ইসলাম ধর্মের ভিত্তিতে। আমরা হয়ে গেলাম পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা। পশ্চিম পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমানের পাকিস্তান হয়ে গেল আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। আমরা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকের সমতুল্য হয়ে পড়লাম। বলা যায়, আমরা হয়ে গেলাম পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের ক্রীতদাস। তারই ফলে শুরু হয়ে গেল পাকিস্তান সরকার নির্ধারিত সকল বৈষম্যের বিরূদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরের মানুষের সংগ্রাম। পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা আশাহত হওয়ার মতো জাতি ছিল না। আমরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিপীড়িত ও নিগৃহীত হতে লাগলাম, তবুও আত্মবিশ্বাস হারালাম না। শুরু হলো আমাদের রক্তক্ষরণের সংগ্রাম। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪-২৫ বছর ক্রীতদাসের জীবনযাপন করার পরে আমাদের দেশের বরেণ্য পুরুষদের নেতৃত্বে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আমাদের গলায় স্বাধীনতার অনাস্বাদিত মালাটি পরিয়ে দিলেন আমাদের দেশের বীর সন্তানেরা—যার সর্বাধিনায়ক ছিলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রায় ত্রিশ লক্ষ বাঙালির জীবন এবং দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছিলাম। ইতিহাসের চাকা ঘুরে গেল।
এই ভূমিকা দিয়ে আমার সাধারণ অথচ দীর্ঘ জীবনের আত্মকথার সূচনা করলাম।
১
আমার সামান্য জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি হয়ে আমার হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেঁড়ে বসে আছেন আমার নানা, অর্থাৎ আমার মায়ের বাবা। আমার শৈশবকাল এবং পরবর্তী সময়ে যখন চট্টগ্রাম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তখন ছুটি পেলেই নোয়াখালীর শল্যাঘটিয়া গ্রামে চুম্বকের আকর্ষণে ধাবিত হতাম।
নোয়াখালীর শল্যাঘটিয়া গ্রামে ছিল আমার নানা এবং মাতুলালয়ের নিবাস। সেখানে নোয়াখালী জেলার সোনাপুর স্টেশনে নেমে কখনো হেঁটে এবং পরবর্তী সময়ে গরুর গাড়ি এবং তারও অনেক পরে রিকশায় করে আমার নানার বাড়িতে পৌঁছাতাম। অনেকে মনে করেন নোয়াখালী নামে কোনো জেলা ছিল না; মাইজদী কোর্ট বা মাইজদীই হলো নোয়াখালী জেলা। আমি শৈশবে নোয়াখালী জেলা দেখেছি, যা পরবর্তী সময়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ছবির মতো ছোট শহর ছিল। ওবায়দুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারের বাড়ির সামনে দিয়ে আমরা যাতায়াত করতাম। উনি ছিলেন বিলেত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার। ‘বিলেত ফেরত’ কথাটার ওপর তখন অনেক জোর দেওয়া হতো। কারণ ব্যাপারটাকে তখনকার দিনে অনেক বড় মনে করা হতো। খুব সম্ভবত উনি ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। অনেক পরে তাঁর পরিবারের সাথে আমাদের বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তা হয়। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের পুত্র আমার এক খালাকে বিয়ে করেছিলেন। আজ সেই পরিবারের সবাই প্রতিষ্ঠিত এবং সম্ভ্রান্ত হিসেবে পরিচিত। কথিত আছে, ‘নয়াখাল’ (নতুন খাল) থেকে নোয়াখালী জেলার নামকরণ করা হয়েছিল।
আমার নানার বাড়িতে আমার জন্ম। আমার মা ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। তবে পড়াশোনার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল। উনি ক্লাশ সেভেন পর্যন্ত পড়েছিলেন। কারণ রুগ্ন শরীরের জন্য বেশিদূর পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন নি। তবে পড়াশোনার প্রতি প্রবল ভালোবাসা ছিল। কবিতা, উপন্যাস ও ছোটগল্প পড়তে ভালোবাসতেন। আমার জনকের সাথে কলকাতার সিনেমা হলে বসে দেখা ‘মুক্তি’, ‘দেবদাস’ এবং ‘কিসমত’ ছবির গল্প আমাকে শোনাতেন। ‘কিসমত’ সেই পুরোনো দিনে এক হলে পুরো এক বছর চলেছিল। আমার জীবনে যা কিছু সামান্য অর্জন আছে তা আমি আমার নানা, নানি, খালাদের কাছ থেকে পেয়েছি বলে আমার মনে হয়। সবার উপরে মা-বাবার ভূমিকা তো অনস্বীকার্য।
আমার দাদার বাড়ি নোয়াখালীর আমিরাবাদ গ্রামে। আমার দাদাকে আমি দেখি নি। তবে বাবা এবং চাচাদের মুখে তাঁর অনেক গল্প শুনেছি। তিনি ছিলেন সাবরেজিস্ট্রার। যেদিন রেজিস্ট্রার পদে উন্নীত হয়েছিলেন, সেদিনই হঠাৎ করে হার্ট অ্যাট্যাকে উনি মারা যান। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পরে আবার তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন খানদানি (উচ্চ বংশজাত) বংশে, চৌধুরী মিয়া মোক্তারের পরিবারে। দাদার বাড়ির অনেক কাহিনি আছে। আমার দাদা এক নম্বরের জন্য বিএ পাশ করতে পারেন নি। উনি ‘নকু মিয়া সাব্রেস্ট্রার’ (সাবরেজিস্ট্রার) নামে পরিচিত ছিলেন। শুনেছি তার নামের পাশে লিখতেন বিএ (প্লাকড) অর্থাৎ বিএ পরীক্ষায় ফেল করেছেন। তখনকার দিনে বিএ প্লাকড হওয়াটাও বিরাট গৌরবের ব্যাপার ছিল। আমার বাবা অর্থাৎ তাঁর বড় ছেলে জনকের সেই আশা পূরণ করেছিলেন। বাবা ছিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের বিএ। ভালো ইংরেজি লিখতেন। আমার বাবার এক ভাই, আমার রমজান চাচা, বার্মা মুল্লুকের (তখন তাই বলা হতো) আরাকানে থিতু হয়েছিলেন। শুনেছিলাম, বেশ কয়েকজন বর্মী মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। তখনকার দিনে সেটাই রেওয়াজ ছিল।
আমার বাবার আরেক চাচাত ভাই বার্মা মল্লুক থেকে মাঝে মাঝে দেশে আসতেন। শুনেছি উনিও চার-পাঁচটা বিয়ে করেছিলেন। আমার ধারণায় বিবাহিত স্ত্রীদের অনেকটা নারী-শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তিনি মাঝে মাঝে দেশে ফিরে এসে সরাসরি বাড়িতে না ঢুকে একটি গাছের ওপর চড়ে বসে নিজ বাড়ির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কয়েক ঘণ্টা নিরীক্ষণ করতেন, অনেকটা অবজারভেটরি টাওয়ার থেকে যেভাবে দেখা হয় ঠিক সেভাবে। দেখার উদ্দেশ্য ছিল—তাঁর স্ত্রীর কাছে অন্য কোনো বেগানা পুরুষের (অনাত্মীয় পুরুষের) মাখামাখি আছে কি না। তারপরে নিশ্চিত হয়ে বাড়ি ঢুকতেন। হায়রে জীবনের পরিহাস—যে পুরুষটি বার্মা মুল্লুকে ৪-৫ টা বিয়ে করেছে, সে দেশে ফিরে এসে তাঁর স্ত্রীর সতীত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইতেন! শরৎচন্দ্রকে আমার এই জন্যই খুব বড় ঔপন্যাসিক মনে হয়, কারণ তিনি জীবনের এই সুখ-দুঃখের কাহিনিগুলোকে একাধিক উপন্যাসের মধ্য দিয়ে সহজিয়া-সৌন্দর্যে রূপদান করেছেন।
আমার সেজ চাচা ব্রিটিশ আর্মিতে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার ছিলেন। পরবর্তী সময়ে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার হয়েছিলেন। তাঁর চেম্বারে টাঙানো বোর্ডে লিখতেন—ড. মোমলুখুর রহমান (সি, কিউ, এম, এইচ)। আমরা মনে করতাম এটা বোধহয় কোনো বড় মেডিকেল ডিগ্রি হবে। একদিন আমার ছোট বোনের জেরার সামনে পড়ে উনি স্বীকার করেছিলেন যে—সি, কিউ, এম, এইচ-এর বিস্তারিত অর্থ হলো কোম্পানি কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার। উনি তার মিলিটারিতে চাকরির পদবিকে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের মেডিকেল ডিগ্রি অথবা ডিপ্লোমা হিসেবে ব্যবহার করতেন।
নানার বাড়ির কথায় আবার ফিরে যাই। আমার নানা ছিলেন রেভিনিউ পেশকার। তাঁর যে চেহারাটা আমার মনে গেঁথে আছে তা হলো, সাদা শ্মশ্রুধারী লুঙ্গি এবং পাঞ্জাবি পরিহিত ফর্সা একজন মানুষ। প্রচলিত লুঙ্গি উনি পরতেন না। লংক্লথ জোড়া দিয়ে তিনি লুঙ্গি বানাতেন এবং সাদা কাপড়ের পাঞ্জাবি পরতেন। বৃহৎ হার্নিয়ার অর্থাৎ পেটের ভেতরে অন্ত্রের টানে উনি কুঁজো হয়ে হাঁটতেন। বাড়িতে খুটিওয়ালা খড়ম পরতেন এবং বাইরে যাওয়ার সময় রাবার বা চামড়ার পামসু। হার্নিয়ার হঠাৎ বিপদ এড়াতে কোমরে ‘ট্রাস’ নামে এক ধরনের আংটার মতো বেল্ট পরতেন। গায়ের রং ফর্সা ছিল এবং অবয়বে চোখের চাহনিতে তীক্ষèতা ছিল। বলতেন, তাঁদের পূর্বপুরুষ ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং আদি পুরুষেরা আর্য ছিলেন। আমি তাঁর চেহারায় বইতে পড়া ও দেখা আর্যদের চেহারার সাথে কিছুটা মিল খুঁজে পেতাম। শুনেছি, ইসলাম ধর্মের সাম্যের বাণী যখন প্রচারিত হওয়া শুরু হলো তৎকালীন ভারতবর্ষের আনাচে কানাচে, তখন বিভিন্ন বর্ণ ও গোত্রের মানুষেরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। তবে তাঁর মধ্যে অযাত্রা, কুযাত্রা ইত্যাদির সংস্কার আমি লক্ষ করেছি। কোথাও যাওয়ার সময় ঝাড়ুদার, ডোম, মুচি, নাপিত গোত্রের মানুষদের সামনে পড়লে কুযাত্রা হবে বলে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। অনেক সময় বাড়িতে ফিরে এসে তারপর অপেক্ষা করে যাত্রা শুরু করতেন। জানি না, হয়তো উনি উচ্চ বর্ণের হিন্দু থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন বলে এমন আচরণ করতেন। উনি পঞ্জিকার দিনক্ষণ দেখে কাজ শুরু করতেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর কাছে মহাভারত, রামায়ণ, বেদ-উপনিষদের গল্প তেমন একটা শুনি নি যতটা শুনেছি আমাদের মহানবী হযরত মহাম্মদ (দঃ)-এর বিভিন্ন উপাখ্যান এবং ইংরেজ নাট্যকার বার্নাড শ’য়ের গল্প। উনি মহানবীর খুব ভক্ত ছিলেন। উঠানে মেহেদি গাছের নিচে পবিত্র কোরান শরীফ তেলাওয়াত করতেন অথবা ‘দোয়ায়ে গঞ্জুল আরশ’ পড়তেন। পরে শুনেছি ‘দোয়ায়ে গঞ্জুল আরশ’-এর বর্ণনায় সত্যের অপলাপ আছে। তবে তাঁর পড়ার ধরন ও উচ্চারণে একটা সিরিওকমিক ব্যাপার ছিল। আমরা নাতিরা পেছনে হাসাহাসি করতাম। নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত পড়তেন। খুব ভাবাবেগে আবিষ্ট হয়ে মাঝে মধ্যে হেঁড়ে গলায় গান গাইতেন। তাঁর প্রিয় গান ছিল—“যদি কুমড়োর মতো চালে ধরে রত/ পান্তোয়া শত শত/ আর সরষের মতো হতো মিহিদানা/ বুন্দিয়া-বুটের মতো”। উনি খুব ভোরে উঠতেন এবং গান গাইতে গাইতে প্রাতঃকৃত্য সম্পন্ন করতেন। আজকের টয়লেট অর্থাৎ ওয়াশরুম, তখনকার ‘লেট্র্রিন’ নিয়ে তাঁর বড়াইয়ের অন্ত ছিল না। নোয়াখাইল্যা ভাষায় বলতেন, আমার পায়খানা পাকা। পাকা বলতে গাছ-গাছালির জঙ্গলের ভেতরে একটা কংক্রিটের স্ল্যাব বা প্লেট বসানো ছিল, মাঝখানে ছিল বড় একটা ছিদ্র। এটাকেই তিনি পাকা পায়খানা বলতেন। উনি পেশায় ছিলেন রেভিনিউ পেসকার। যদি আমরা নাতিরা জিজ্ঞাসা করতাম—‘নানা আমনে এন্ট্রান্স (মেট্রিকুলেশান/এসএসসির সমতুল্য) পাশ কইচ্ছেননি ?’ উনি সরাসরি উত্তর দিতেন, ‘নারে। হেদ্দুর (ততদূর) হইয্যন্ত যাইতাম হারিন’। অর্থাৎ, উনি ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছিলেন। কখনো তাঁর ঘরে বসে এসব কথোপকথন হতো অথবা মেহেদি গাছের নিচে বসে, কখনো বা ‘গাঁডার আগে’ অর্থাৎ বাড়ির বহির্ভাগে বহিরাগমনের মুখে পুকুর পাড়ে বসে বা দাঁড়িয়ে এসব কথাবার্তা হতো। তাঁর মতো তীক্ষèধী এবং ইন্দ্রিয়-সজাগ মানুষ আমি জীবনে খুব কম দেখেছি। ক্লাসে টেন অব্দি পড়াশোনা করা একজন মানুষই আমার দেখা সবচেয়ে তীক্ষèধী, বুদ্ধিমান, প্রত্যুৎপন্নমতিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। মাঝে মাঝে আমার মনে হতো উনি অনেকটা গ্রীক পুরাণের টাইরিসিয়াসের মতো ত্রিকালদর্শী ও বিজ্ঞ ছিলেন। তিনিই ছিলেন আমার জীবনের দেখা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী মানুষ। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তাঁর মধ্যে এর অস্তিত্ব উপলব্ধি করেছিলাম।
আমার বাবার সাথে আমার মা’র ১৩ তেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। আমার বাবা তখনকার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পাশ করে একটি সরকারি অফিসে চাকরি করতেন। মাসিক বেতন ছিল খুব সম্ভবত ৪৫ টাকা। বাবাকে আমার নানা সব সময় অপরিণামদর্শী বলতেন। আমি একদিন রাগ করে বলেছিলাম, তাহলে আমার মায়ের সাথে বাবার বিয়ে দিয়েছিলেন কেন ? উনি উত্তর দিয়েছিলেন—বুইঝলি না, হেতার বাফে (মানে আমার দাদা) ফারসি ভাষায় কবিতা লিখত। শুনে অবাক হয়েছিলাম; একজন মানুষের সাহিত্য ও কাব্যপ্রীতির কথা ভেবে।
মেয়েকে যার হাতে তুলে দিয়েছেন তার জনক একজন কবি ছিলেন এবং সেটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় বিবেচনা। আমার পিতা অপরিণামদর্শী ছিলেন কিনা জানি না। আমরা অসহায় মানুষ; কেউ নিজেদের পরিণাম সম্পর্কে যথার্থভাবে বলতে পারি না। তবে আমার জনক, চাণক্য মুনির দর্শনে বিশ্বাস করতেন—ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ; যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ। অর্থাৎ ঋণ করে হলেও ঘি খাও, যত দিন বাঁচো, সুখে বাঁচো।
আমরা বাবাকে আমি হিরোই মনে করতাম, কারণ তিনি খুব ভালো ফুটবল খেলতেন এবং আনন্দ-বিলাসী ছিলেন। উনি ভালো বাজার করতেন, ঈদ উদ্যাপন করতেন সাড়ম্বরে, আমরা খুশি হতাম। আমরা ছয় ভাই, দুই বোন। আমার বাবা-মা খুব সুখী দম্পতি ছিলেন। তবে তাঁদের জীবনে ঝড় উঠেছে একাধিকবার। এই পার্থিব জীবনে কেউ তো সর্বোতভাবে সুখী হতে পারে না। সমাজের ধনী, মধ্যবিত্ত, দরিদ্র সব স্তরের মানুষকে কিছু না কিছু দুঃখের জলাশয় পার হতে হয়। এই পরিণত বয়েসে আমি প্রায়ই আপন মনে কিছু কবিতার লাইন উচ্চারণ করি। তার মধ্যে আমার অন্যতম প্রিয় লাইন হলো কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার একটি লাইন—
‘চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বত্থের কাছে
এক গাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা একা;
যে-জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের—মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা এই জেনে’।
আমাদের বাংলাদেশের বরিশালের দুঃখী কবি জীবনানন্দ দাশ, আমার ধারণায় তৃতীয় নয়নের অধিকারী ছিলেন। সেজন্য আমার এই পরিণত বয়সের নাট্য প্রযোজনা উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের ‘হ্যামলেট’, যার অসাধারণ অনুবাদ করেছেন প্রয়াত বহুপ্রভা লেখক আমার হৃদয়ের মানুষ সৈয়দ শামসুল হক। সবাই তাঁকে সব্যসাচী লেখক হিসেবে জানে, কিন্তু আমি তাঁকে অভিহিত করি ‘বহুপ্রভা’ বলে। আমার ‘হ্যামলেট’ নাটকের যবনিকা উত্তোলন হয় জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার এই লাইনটি দিয়ে—“অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়-/ আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে/ আমাদের ক্লান্ত করে, ক্লান্ত-ক্লান্ত করে;...”। নাটকটির অন্তর্গত সত্য হচ্ছে দ্যোদুল্যমান পৃথিবীর ধূসরতা এবং সে জন্যই আমি তৃতীয় নয়নের অধিকারী (রূপকার্থে) আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন দিয়ে শুরু করেছি। আমি যদিও বিদ্বজন নই অথবা ভালো ছাত্র ছিলাম না; তবে যে-কোনো ধরনের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আমাকে দেশ-বিদেশের সাহিত্যসম্ভারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমি চলচ্চিত্র দেখারও পোকা ছিলাম, সেই আমার স্কুলজীবন থেকে। সব খেলাধুলা যেমন, ফুটবল, ক্রিকেট, হকি কমবেশি খেলেছি কিন্তু কোনোটাতেই তেমন সুনাম অর্জন করতে পারি নি। জীবনে শিল্প-সাহিত্য ক্রীড়া এবং সর্বোপরি এই বিশ্বজগতকে নানা দিক থেকে জানার বিপুল আগ্রহ ছিল আমার; যা আজ এই পরিণত বয়সেও সম্ভবত ধরে রাখতে পেরেছি। আমার স্কুলের এক শিক্ষক বলেছিলেন—“প্রশ্ন করতে শিখবি”। কথাটা আমার খুব মনে ধরেছিল; আমি আজও আগ্রহ নিয়ে সব-বিষয়ে যতটুকু সাধ্যে কুলোয় জানতে চেষ্টা করি। আমি মনে করি—‘কৌতূহল’ই মানুষকে জীবন ও জগতকে জানার পথে এগিয়ে নিয়ে যায় অনেকখানি।
একদিন প্রায় সারা রাত জেগে ইন্টারনেটে জগতের বিভিন্ন ধর্মবিষয়ক ইতিহাস পাঠ করেছিলাম। এইভাবে স্টিফেন হকিং-এর ‘এ ব্রীফ হিস্ট্রি অব টাইম’ খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েছি এবং খুব আনন্দ পেয়েছি। আমি অনেক সময় আপাত অর্থহীন লেখা, এমনকি ছাপার অক্ষরে সামান্য লেখা কাগজের টুকরোও পড়েছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সব লেখা তো আছেই, তবে আমাকে তাঁর প্রবন্ধ সাহিত্য বিপুলভাবে আমাকে আকর্ষণ করে। এই মুহূর্তে মনের আনাচে কানাচে আমেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্টের ‘Stopping by Woods on a Snowy Evening’-এর কবিতার লাইন আনাগোনা করছে।
‘The woods are lovely dark and deep
But I have promises to keep
And miles to go before I sleep,
And miles to go before I sleep’.
অনুবাদে অনেকটা এরকম দাঁড়ায়—
‘বনানী কি সুন্দর, গভীর ও সবুজ
কিন্তু আমারতো রাখতে হবে কথা
যেতে হবে অনেকদূর।
ঘুমিয়ে পড়ায় আগে’।
আমি একটি নির্ঝঞ্ঝাট জীবনের প্রত্যাশা করেছিলাম। সম্পূর্ণ সফল হই নি। আমি কোনো সাধু পুরুষ নই। মনে হয়, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা অজান্তে কোনো অন্যায় বা অসৎ কাজ করেছি। হয়তো পৃথিবীর কোনো মানুষই এই কলুষ থেকে মুক্ত নয়। সত্য-সুন্দর প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ দেওয়াতে মহত্ব আছে এবং বিশ্ব-মানব তাদের যুগ যুগ ধরে মনে রাখে। আমার নানা, যাঁর বাড়িতে আমার শৈশবকাল কেটেছে, তাঁকে দেখেছি প্রৌঢ়ত্বে বাড়ির জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে নোয়াখাইল্যার ভাষায় বলতেন, ‘এরে আঁরে কে যেন দইরত (ধরতে) আইতেছে’। উনি রেভিনিউ পেসকার ছিলেন। হয়তো যৌবনের কোনো অপরাধবোধ তাঁকে এমন উচ্চারণের দিকে ধাবিত করত। আমি নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি এবং মনে করি, জগতে খুব কম মানুষই আছে যাদের মধ্যে কোনো না কোনো অপরাধবোধ কাজ করে। বৃদ্ধ বাবা-মাকে অবহেলা করে কেবল নিজের সংসার নিয়ে বিমোহিত থাকা পুরুষ বা নারীও এই ধরনের সুপ্ত অপরাধবোধে ভোগে বলে আমার মনে হয়। দেশ ও বিদেশের বৈচিত্র্যময় কিছু লেখা ও দর্শন ভাবনার মধ্য দিয়ে আমার জীবন বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে বলে আমি মনে করি। আমার জীবনের সামান্য কিছু কথা বলার চেষ্টা করছি মাত্র। তবে কখনো তা গোছানো হবে না। কখনো আগের কথা পরে আসবে, পরের কথা আগে আসবে। আমি ব্যক্তিগত জীবনেও খুব একটা গোছানো মানুষ ছিলাম না কখনো এবং আজও নেই।
এখন আমি আবার ফিরে যাব আমার নানা ও দাদার বাড়িতে। যেখানে আমার ভাবনার জগৎ তৈরি হয়েছে, নানা বিচ্ছিন্ন ও বৈচিত্র্যময় ঘটনাবলির মাধ্যমে।
২
আমার জীবনকথার শিকড় প্রোথিত আছে আমার নানার বাড়িতে। দীর্ঘ জীবনের প্রান্ত সীমায় দাঁড়িয়ে বারবার শিকড়ের কাছেই ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কত কথা, কত স্মৃতি, বলে শেষ করা যাবে না। স্মৃতিময় ঘটনাবলির পরম্পরাও রক্ষা করা যাবে না। অতি শৈশবের ঘটনা দিয়ে শুরু করি। আমি বেশির ভাগ সময় তখন মা’র সাথে নানার বাড়িতেই থাকতাম। আমার বাবা কলকাতায় সরকারি অফিসে চাকরি করতেন। ছুটিতে এসে আমার নানা অর্থাৎ তাঁর শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন এবং এক দুই দিনের জন্য দাদার বাড়িতে যেতেন। আমার দাদা প্রয়াত হয়েছিলেন অনেক আগেই। আমি আর আমার মা তাঁকে দেখি নি। এমনকি আমার প্রথম দাদি অর্থাৎ আমার বাবার মাকেও আমরা দেখি নি। আমরা দাদি হিসেবে পেয়েছিলাম আমার দাদার দ্বিতীয় স্ত্রীকে অর্থাৎ আমার বাবার দ্বিতীয় মা’কে। আগেই বলেছি যে, খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের সুজাত কন্যা ছিলেন তিনি। আমার আগের দাদির ঘরে আমার বাবা, তিন ভাই ও এক বোন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেই বোন অর্থাৎ আমার বড় ফুফুকে আমি দেখি নি। আমার জন্মের আগেই তিনি প্রয়াত হয়েছিলেন। আমার মা-বাবা কলকাতায় আমার বড় ফুফু ও ফুফার সাথে যৌথভাবে এক বাড়িতে কিছুদিন বসবাস করেছিলেন। আমার দ্বিতীয় দাদির ঘরে আমার দুই চাচা (পিতৃব্য) ও দুই ফুফুকে আমি খুব ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছি এবং তাঁদের সবার সাথেই আমার খুব হৃদ্যতা ছিল। এই প্রসঙ্গে একটু বিস্তারিত আলোচনা করব, যদিও এই আগেও কিছুটা বলেছি।
আমার মাতৃকুল ও পিতৃকুল দুদিকের সঙ্গ লাভ করেই আমি আজ দীর্ঘ জীবনের প্রান্ত সীমায় উপনীত হয়েছি। তারই কিছু কথকতা আমার এই আত্মকথায় কিছুটা হলেও প্রতিফলিত হবে। আমার সমগ্র জীবন সুখ-দুঃখের লীলাভূমিতে কেটেছে, যেমন কাটে আর দশজন মানুষের। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারারের চাকরির একটি সম্ভাবনা ছিল। প্রতিযোগিতামূলক সিএসএস পরীক্ষায় লিখিত অধ্যয়ের বৈতরণী পার হয়েছিলাম। তবে চাকরি পেলেও একেবারে নিচের দিকে অন্তর্ভুক্ত হব, এই আশঙ্কায় মৌখিক পরীক্ষার সম্মুখীন হই নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার-এর চাকরির জন্য মৌখিক পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলাম। অন্য শিক্ষকমণ্ডলীর উপস্থিতিতে পরীক্ষা নিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য এম, ও, গনি মহোদয়। খুব সম্ভবত মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। আমাকে ছয় মাস পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতি বা নেতিবাচক ফলাফল জানাবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। আমার ভাগ্য ভালো ছিল বলতে হয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির ফলাফলের আগে আমার জনকের সুবাদে এস, জি, এস নামে একটি প্রাক জাহাজিকরণ ও জাহাজ থেকে অবতরণ পরবর্তী মালামাল পরিদর্শন কোম্পানিতে ঢাকা ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করেছিলাম। কোম্পানিটির হেড অফিস ছিল সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায়। আমার প্রারম্ভিক মাসিক ছিল বেতন ৭৫০/- যা আমার ধারণায় সিএসএস পাশ করা পরীক্ষার অধীনে চাকরিসমূহ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকের বেতনের চেয়ে ছিল বেশি। আমাকে ব্যবহারের জন্য ১২ হাজার ৯০০ টাকা দামের একটি নতুন ফোক্স ওয়াগন গাড়ি কিনে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬৫ সালে আমি চাকরিতে যোগদান করেছিলাম। হেড অফিস পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থিত ছিল। আমার কাজ ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত বিভিন্ন সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে ব্যবসাকে যথার্থভাবে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং তাকে বর্ধিত করার প্রয়াসও এর মধ্য নিহিত ছিল। সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা ছিল আমার প্রধান কাজ। চট্টগ্রামের ম্যানেজার ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। তার কাজ ছিল বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জাহাজ থেকে অবতরণ পরবর্তী রপ্তানিকৃত মালামাল দৈহিক উপস্থিতিতে পরিদর্শন করা। উনি সবদিক থেকে আমার সিনিয়র ছিলেন। আমি বিয়ে করি ১৯৭০-এর দিকে। বাবা-মায়ের সাথে একই সংসারে বসবাস শুরু করেছিলাম। আমরা ছিলাম ছয় ভাই এবং দুই বোন। বাবা-মা তো ছিলেনই, তার সাথে নতুন এক সদস্য যুক্ত হলো।
সবই ঠিকঠাক চলছিল। তবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ইতিমধ্যে পাকিস্তানি উপনিবেশিক শাসকচক্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আমরা অজস্র মৃত্যুরে পার হয়ে নব প্রভাতের চূড়ায় এসে দাঁড়ালাম। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমরা বিজয় লাভ করেছিলাম এবং বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে আরেকটি নতুন দেশ যুক্ত হলো।
খুব সম্ভবত ১৯৭৪ সালে আফ্রিকার কোনো দেশে আমাকে সুইজারল্যান্ডে অবস্থিত প্রতিষ্ঠান এস, জি, এস (সোসাইটি জেনারেল দ্য সারভেলিয়েন্স) বদলি করেছিল। আমি নিজের দেশ ছেড়ে যেতে রাজি হই নি বলে আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। প্রায় সাত-আট বছরের চাকরির কিছু প্রাপ্য গ্রাচ্যুইটি (আনুতোষিক) বাবদ কিছু অর্থ প্রাপ্তি হলো। বিরাট সংসারে আমি ছিলাম জ্যেষ্ঠ সন্তান। আমি বিবাহিত, পিতা অবসরে চলে গিয়েছিলেন। স্ত্রী ও শিশু কন্যা শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে প্রায় রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি জীবনে আর কোনো চাকরি করি নি। এস, জি, এস, কোম্পানির অনুদান হিসেবে প্রাপ্ত কিছু অর্থ নিয়ে দুঃখী মানুষের মতো জীবন যাপন করেছিলাম। আসলে প্রত্যেক মানুষের জীবনে সংগ্রাম থাকে। আমি সেই সংগ্রামের সুখ-দুঃখের জীবন তরী চালিয়ে আসছি আমার এই দীর্ঘ জীবনে। প্রসঙ্গত আমার নাটকের জীবন পাকিস্তানি আমলে শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে বিভিন্ন সময় নানা প্রতিষ্ঠানের হয়ে মঞ্চে নাটক করেছি। পাকিস্তান টেলিভিশন কেন্দ্রে (পিটিভি) ১৯৬৫-৬৬ সাল থেকেই আমার নাটকের অভিনয় শুরু হয়েছিল। টেলিভিশন, রেডিও নাটকের পাশাপাশি আমি বিভিন্ন দল-উপদলের হয়ে মঞ্চনাটকের কাজে নিযুক্ত ছিলাম। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে আরেকটি অধ্যায়ে বিবরণ দেব। আজ দেশের মানুষের কাছে আমার সামান্য পরিচিতি, তা আমার নাট্য কার্যক্রমের জন্যই। আমার জীবনের গূঢ়-গাঢ় নির্যাস হলো, সত্যিকার অর্থে জীবনের প্রারম্ভ থেকে শুরু করে এই পড়ন্ত বেলায় আজও জীবন অতিবাহিত করছি জীবনযুদ্ধের ভেতর দিয়ে। এই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমি জীবনে সীমাহীন আনন্দ পেয়েছি, কারণ নিস্তরঙ্গ জীবন আমার ধারণায় কোনো জীবন নয়। কখনো দুঃখ ও হতাশায় ভেঙে পড়েছি এবং আবার উঠে দাঁড়িয়েছে এই ভেবে যে, মানুষের একটিই জীবন এবং তাকে যাপন করতেই হয়। কারণ বেঁচে থাকার আনন্দ যে সীমাহীন। আরেকটি সূর্যালোক ও চন্দ্রলোক সব সময় আমাকে হাতছানি দিয়ে প্রলুব্ধ করেছে। বেঁচে থাকার আনন্দ ও নেশাই যে জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ-নেশা।
আমি জীবিকা অর্জনের জন্য রাস্তার ধারে কোনো পণ্যসামগ্রী অথবা চায়ের দোকান দিতেও রাজি ছিলাম। আমি এস, জি, এস-এর সম্ভ্রান্ত চাকরি ছাড়ার পর বিভিন্ন ইনডেন্টিং জাতীয় ব্যবসার চেষ্টাও করেছি। টাকা-পয়সা কিছু উপার্জন করেছি কিন্তু কোথাও মন লাগে নি। অনেক পরে স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র বাংলাদেশে ‘জরিপ ও পরিদর্শন কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি ইন্সুরেন্সের ক্ষয় ও ক্ষতি নিরূপণ এবং বিভিন্ন ব্যাংকের সম্পত্তি জরিপকারীর একটি প্রতিষ্ঠান খুলেছিলাম। যে কোম্পানিটি বিভিন্ন ব্যাংক ও ইন্সুরেন্স কোম্পানি দ্বারা নিযুক্ত হয়ে বিভিন্ন সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি এবং বিভিন্ন ব্যাংকের বন্ধকজাত সম্পত্তির মূল্যায়ন সুনামের সাথে আজও চালিয়ে আসছে। আমার জীবনের অনেক দুর্বল দিক আছে কিন্তু জ্ঞাতসারে আর্থিক সততার স্খলন জীবনে কখনো ঘটে নি। এর জন্য আমাকে বিভিন্ন সময়ে বিপদেও পড়তে হয়েছিল। বিপন্ন হয়েছি বারবার এবং উঠে দাঁড়িয়েছি।
৩
ব্রিটিশ ভারতে আমার জন্ম, সে কথা আগেই বলেছি। তিনটি রাষ্ট্রে ছিল আমার নিবাস। প্রথম ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষে। দ্বিতীয়, পাকিস্তানে। পাকিস্তানের দুটো অংশ ছিল; পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান। বিলেতি সাহেবরা তাদের শাসনের শৃঙ্খল থেকে ভারতকে মুক্ত করে ১৪ই আগস্ট ১৯৪৭ সালে ভারত ভূমি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতকে বিভক্ত করেছিল। যার ফলে জন্ম হলো দুটি রাষ্ট্রের যথা ভারত ও পাকিস্তান।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবের আগে বাবা-মায়ের সাথে আমি কলকাতায় বসবাস করতাম। আমার বাব যেখানে একটি সরকারি অফিসে চাকরি করতেন। খুব সম্ভবত এই অফিসের মূল কাজ ছিল সরকারি কাজের জন্য বিভিন্ন দ্রব্যাদি দর-পত্র আহ্বানের মাধ্যমে ক্রয় করা। অফিসটির শিরোনাম ছিল ‘ডাইরেক্টরেট অব সাপ্লাই এন্ড ডেভেলপমেন্ট’। কলকাতার সুরেশ সরকার রোডের একসাথে লাগানো অনেকগুলো বাড়ির একটিতে আমরা ভাড়া থাকতাম। তখনকার বাড়িগুলো এক তলা, দোতলা, বড়জোর তিন তলা পর্যন্ত হতো। মাল্টিস্টোরিড দালান নির্মাণের ধারণা তখনো মানুষের ভাবনায় আসে নি। ছোট বাড়ি, দুরুমের ঘর। একটি শোবার ঘর এবং অন্যটি বসার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। একটি রান্নাঘর, শৌচাগার এবং স্নানের ঘর যুক্তভাবে ছিল। আমার বয়েস তখন তিন কি সাড়ে তিন বছর কিন্তু এখনো ঘুমের মাঝে আবছা স্মৃতিগুলো হানা দেয়। আমাদের বাসার দুই-তিন বাসা পরে এক হেকিম সাহেব থাকতেন। তিনি বিবিধ অসুখের দাওয়াই (ওষুধ) বানাতেন। তাঁর তিন জন স্ত্রী ছিলেন এবং তাঁরাই লতাপাতা গাছের ছাল সিদ্ধ করে নানা ধরনের হেকেমি ওষুধ বানাতেন। আজ পরিণত বয়েসে বসে বসে ভাবি, স্ত্রী নামে তিন মহিলা দ্বৈত ভূমিকা পালন করতেন; প্রথমত, বৈধ স্ত্রী, দ্বিতীয়ত, হেকিম সাহেবের দাওয়াই বানাবার কর্মী।
কলকাতার সেই বাড়িতে থাকাকালীন অবস্থায় আমি ট্রাকের নিচে পড়ে গিয়েছিলাম। নোয়াখালী থেকে আমার নানি কোনো এক বাহকের হাতে শাক্কোর খোরা (আজকের চিনিগুঁড়া অথবা কালিজিরা সমতুল্য) চাল পাঠিয়েছিলেন। এই চাল দিয়ে পোলাও রান্না করা হতো। আমার মায়ের শখ হয়েছিল নারকেলের দুধের পোলাও খাবে। আমাকে কিছু দূরে রাস্তার ওপারে মুদির দোকান থেকে নারকেল কিনতে পাঠিয়েছিলেন। নারকেল কিনেছিলাম, তবে আজ আর দামটা মনে নেই। বাসায় ফেরার পথে আমি ট্রাকের নিচে পড়ে গিয়েছিলাম। ট্রাকটি মাত্র স্টার্ট দিয়ে চলতে শুরু করেছিল। রাস্তার ধারের লোকেরা চিৎকার করে ট্রাক ড্রাইভারকে বলতে লাগল, ‘এক লাড়কা গির গিয়া; এক লাড়কা গির গিয়া’, ট্রাক ড্রাইভার তখন ট্রাকটি হার্ড ব্রেক করে থামিয়েছিল। আমাকে রাস্তার আশেপাশের লোকেরা টেনে বের করেছিল। জানে বেঁচে গিয়েছিলাম কিন্তু ডান পাটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। হাড় প্রায় কোরানো নারকেলের মতো গুঁড়া হয়ে গিয়েছিল; তবে ভাঙে নি। প্রচুর রক্তপাত হয়েছিল। আমার বাবার ছোট ভাই, আমার মেজ চাচা, আর্মিতে ছোট চাকরি করতেন। খুব সম্ভবত সৈনিকের চাকরি করতেন। উনি আমাদের বাসাতেই থাকতেন। বাসায় খবর এল। নাইট ডিউটি করে উনি ঘুমুচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে আমার অ্যাক্সিডেন্টের খবরটা পাড়ায় জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। আমার মেজ চাচা ঘুম-চোখে ঘটনাস্থলে গিয়ে আমাকে উদ্ধার করে কোলে করে বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। তখনকার দিনে টেলিফোন ছিল না। আমার মেজ চাচা বাবার অফিসে গিয়ে আমার বাবাকে দুঃসংবাদটা দিয়েছিলেন। আমার বাবা ছিলেন আমার কাছে বীর পুরুষ। কারণ উনি ছিলেন একজন ফুটবল প্লেয়ার। সেদিন তাঁকে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে দেখেছিলাম। আমার মেজ চাচা আমার আম্মাকে ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন—এতটুকু ছেলেকে উনি কেন দোকানে নারকেল কিনতে পাঠিয়েছিলেন ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি সেবারের মতো বেঁচে গিয়েছিলাম, তবে দু’মাস লেগেছিল নতুন করে হাঁটা শিখতে। আমি পায়ের পাতা ও নলার সন্ধিস্থলে সেই দাগটি নিয়ে আজও ঘুরে বেড়াচ্ছি। এইভাবে জীবনে আমি বেশ কয়েকবার মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে এসেছি। একবার নোয়াখালীতে নানার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নারকেলগাছ থেকে পতিত হয়ে নিচে পুকুরে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন সবেমাত্র পেনিসিলিন ইঞ্জেকশান বাজারজাত করা হয়েছিল। সেই ইঞ্জেকশান নিয়ে সম্পূর্ণ ভালো হতে বেশ কিছুদিন লেগেছিল। আরেকবার নারকেল গাছকে জড়িয়ে ধরে গাছের নিচে পুকুরে পড়ে গিয়েছিলাম। বুকের চামড়ার ক্ষত সারতে অনেকদিন লেগেছিল। নানার বাড়িতেই আমি বড় পেয়ারা গাছের ডাল ভেঙে মাটিতে পতিত হয়েছিলাম। ভালো হতে সময় লেগেছিল। পরবর্তী জীবনে আছাড় খাওয়া, পড়ে যাওয়া, অনেকটা আমার জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল।
যৌবনে পাকিস্তানের করাচিতে গিয়ে চাকরির সুবাদে চলন্ত গাড়ির ধাক্কা খেয়ে রাস্তার ওপর ছিটকে পড়েছিলাম। পাকিস্তানি সহকর্মীদের তত্ত্বাবধানে তাড়াতাড়ি সেরেও উঠেছিলাম। এরপরে ঢাকার শহীদ মিনারের পাশে একটি টয়লেটে গিয়ে আছাড় খেয়ে প্রায় মারা পড়েছিলাম। বন্ধুরা সবাই টেনে বের করে চিকিৎসা করে ভালো করেছিল। নাটকের নির্দেশনার কাজ সেরে শিল্পকলা একাডেমী থেকে হেঁটে ঢাকা ক্লাবে যাওয়ার সময় রমনা পার্কের গেটের সামনে বালির স্তূপে পা আটকে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলাম। একজন অচেনা যুবক আমাকে তুলে রিকশায় করে ‘মনোয়ারা হাসপাতালে’ নিয়ে গিয়েছিল। সারা শরীর ভেসে গিয়েছিল রক্তপাতে। আমি হার্টের সমস্যার জন্য ব্লাড থিনার ট্যাবলেট খেতাম। রক্তপাত বন্ধ হলেও ঘা শুকাতে অনেকদিন সময় লেগেছিল। নাকের নিচে পতন-সৃষ্ট ক্ষতের সাদা চিহ্ন নিয়ে আমি আজও ঘুরে বেড়াচ্ছি।
নাটকের সহযাত্রীরা আমাকে বাসায় দেখতে এসেছিল। আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছিন্নপত্র’ অবলম্বনে সৈয়দ শামসুল হক রচিত ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘পালাকার’ নাট্যগোষ্ঠীর অভিনেতাদের দিয়ে রিহার্সাল করিয়েছিলাম। এর পরেও আমি রাস্তায় অথবা বাসার সামনে আরও দুই-তিন বার আছাড় খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। মনে হয় আমার কচ্ছপের প্রাণ; প্রতিবারই বেঁচে গিয়েছি। পতনের রোগ থেকে আমি আজও নিস্তার পাই নি। এই অধ্যায় শেষ করছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর আগে লেখা তাঁর ‘দুঃখের আধার রাত্রি’ কবিতার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করে—
“দুঃখের আঁধার রাত্রি বারে বারে
এসেছে আমার দ্বারে;
একমাত্র অস্ত্র তার দেখেছিনু
কষ্টের বিকৃত ভান, ত্রাসের বিকট ভঙ্গি যত—
অন্ধকার ছলনার ভূমিকা তাহার।
যতবার ভয়ের মুখোশ তাঁর করেছি বিশ্বাস
ততবার হয়েছে অনর্থ পরাজয়”।
৪
জীবন হচ্ছে রৌদ্র ছায়ার খেলা। এই দীর্ঘ জীবনে কখনো মনে হয়েছে; কী লাভ বেঁচে থেকে, কিছুই তো করতে পারলাম না, কিছুই তো হতে পারলাম না। তারপরেও মরা সহজ নয় বলে আজও বেঁচে আছি। আজ এই সুদীর্ঘ বয়সের পদপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি প্রায়ই উচ্চারণ করি আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগে’ কবিতার কয়েকটি লাইন—
‘গলিত স্থবির ব্যাঙ আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে
আরেকটি প্রভাতের ইশারায়—অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।’
তবে আমি উপসংহারে উপনীত হতাম এই ভেবে যে, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার নেশাই সবচেয়ে বড় নেশা। আরেকটি ভোরের সূর্যের সাক্ষাৎ পাওয়ার মতো পরিতৃপ্তি জীবনে আর কী হতে পারে; এমনকি মৃত্যু পথ-যাত্রীরও! যাই হোক, আমি আবার ফিরে যাচ্ছি আমার কৈশোর কালের ছোটখাটো ঘটনায়, যা এখনো আমি স্মৃতিতে কিছুটা হলেও ধরে রেখেছি।
আমার নানার বাড়ির ছোটখাট ঘটনা আজও আমার হৃদয়ে প্রোথিত হয়ে আছে। আমি কৈশোরকালে কিছুটা দুরন্ত প্রকৃতির ছিলাম। মা-খালা-বাবা-নানা অথবা সম্মানীয়রা যা বলতেন তার উল্টোটা করতাম। একা একা বাড়ির আশেপাশের জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম। বড়শি ফেলে সারা দিন মাছ ধরার জন্য বাঁশের কঞ্চির ছিপ নিয়ে বসে থাকতাম। পুকুরে ঝাঁপ দিতাম, গাছে চড়ে বসে থাকতাম। গল্প শুনতে ভালোবাসতাম। যে-কোনো কল্পকথাই আমাকে টানত। তখন কল্পকথা বা রূপকথার সত্যি-মিথ্যা যাচাই করার বোধ বুদ্ধি জন্মায় নি। সবকিছুকে সত্য বলে ভাবতাম। খালা-মামা-চাচারা আমাকে ‘বোকা ছেলে’ বলেই মনে করত। কথাটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো ছিল না।
বাল্যশিক্ষা পড়া অথবা অঙ্ক কষায় আমার মন তেমন সায় দিত না। পুকুরে বা নালায় টাকি বা শৈল মাছের বাচ্চাদের সাঁতার দেখার জন্য বসে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাঁশের বাঁশিও বাজাবার চেষ্টা করতাম। কিছুই হতো না। বাঁশি বাজানো যে কত কষ্ট-সাধনার কাজ তা অনেক পরে বুঝতে পেরেছিলাম। আমার দুরন্তপনার জন্য বেচারি মা আমাকে পাশের বাড়িতে এক অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন দরবেশের কাছে পাঠিয়েছিলেন। আমার নানার বাড়ির প্রাক্তন কর্মী আলী আহমেদ মামা (যাকে আমরা ‘আম্মদি মামা’ বলে সম্বোধন করতাম) আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই বুজুর্গ দরবেশের কাছে দোয়া-ফুঁ দেওয়ার জন্য যাতে আমি ভালো হয়ে যাই। উনি আমাকে দেখে দোয়া দুরূদ পড়ে মাথায় ফুঁ দিয়ে বলেছিলেন—‘আগে বালু আছিল, কে কী খাওয়াই নষ্ট করিয়া দিছে’। অর্থাৎ আগে ভালো ছিলাম, কেউ একজন কিছু খাইয়ে আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। এই পরিণত বয়েসে এই ঘটনাগুলো আমাকে আজও আন্দোলিত করে। জীবন তো দুঃখ-বেদনা আর আনন্দের সমাহার।
আম্মদি মামা আমাদের এক প্রিয় মানুষ। আমার নানার বাড়িতে এক সময়ে গৃহকর্মী ছিলেন। তাঁর ভালো নাম ছিল আলী আহমেদ, সংক্ষেপে আমরা নোয়াখাইল্যা ভাষায় বলতাম আম্মদি মামা। আমরা চট্টগ্রাম বা ঢাকা থেকে নোয়াখালীতে গেলে উনি আমার নানা-নানির বাড়িতে চলে আসতেন এবং তাঁদের কিশোর, নব্য যুবক, নাতি এবং কিশোরী নাতনিদের দেখাশোনা করতেন।
মুকবুল খাঁ আমার নানার বাড়ির প্রধান গৃহকর্মী ছিলেন, যাকে আমরা ভাই বলে ডাকতাম এবং আমার মা-খালারা মামা বলে ডাকতেন। প্রসঙ্গত মনে পড়ে গেল, মুকবুল খাঁর ছেলে হেঁজু মিয়াকে আমার ছোট খালু, যিনি একটি ব্যাংকের প্রধান ছিলেন, ঢাকায় একটি চাকরি দিয়েছিলেন। হেঁজু মিয়া চাকরিতে বেশি দিন টিকতে পারে নি। নোয়াখালীতে আবার ফিরে এসেছিল। সেও আমার নানার বাড়িতে খণ্ডকালীন চাকরি করত। সে ঢাকায় কোনো এক ব্যাংকে স্বল্পকালীন পিয়নের চাকরির সুবাদে একটি কথা শিখেছিল—‘পুটআপ’; অর্থাৎ ফাইল ‘পুট আপ’ করো। সে নিজ বাড়িতে তার স্ত্রীকে দুপুর ও রাতে খাওয়ার সময় বলত, ভাত ‘ফুট-আপ’ করো। মুকবুল খাঁ প্রায়ই বলতেন—মাইনষে ‘খাঁড় বাহাদুর’ (খান বাহাদুর) ফাইবার জইন্যে অর্থাৎ পাবার জন্য সাবেগো (সাহেবদের) হিছে হিছে ঘুরে; আর আমরা জন্মগতভাবে ‘খাঁড় বাহাদুর’। আমার নানার সাথে মুকবুল ভাই প্রায়ই কথা কাটাকাটি করত। আমার নানা খেপে গিয়ে বলতেন, তোর বাফতো আছিলো ‘গাইচ্ছা’ অর্থাৎ বিভিন্ন গৃহস্থদের গাছে চড়ে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে গাছ-গাছালি পরিষ্কার করত।
একবার নানা কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে অধিক রাগান্বিত হয়ে আহাররত মুকবুল ভাইয়ের খাবার মাটির সানকি লাথি মেরে ভেঙে ফেলেছিলেন। আমার নানার রাগ ছিল পাগলা রাগ, আবার কিছুক্ষণ পরেই ঠান্ডা হয়ে যেতেন। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘শর্ট টেম্পারড’, উনি তাই ছিলেন। সেদিন সকলের অনুরোধ উপেক্ষা করে মুকবুল ভাই আমার নানার বাড়ি ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছিলেন। আমি তখন চার-পাঁচ বছরের শিশু। আমাকে নানি এবং খালারা বললেন—সাজু তুই গিয়ে হাত ধর, তাহলে মুকবুল খাঁ হয়তো থেকে যাবে। আমি কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে বললাম, ‘ভাই তুঁই যাইও না’। ব্যস বরফ গলে গেল, মুকবুল ভাই আমাকে কোলে তুলে নিলেন এবং আমার নানার বাড়িতে থেকে গেলেন।
এই মুকবুল খাঁ অর্থাৎ ভাইয়ের কাঁধে চড়ে আমার মা'য়ের ইচ্ছায় আমি তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে ‘ছনখোলার’ দরবেশের বাড়িতে গিয়েছিলেম; যাতে তাঁর দোয়ায় আমি জীবনে উন্নতি করতে পারি। আজ এই পরিণত বয়সে মনে হচ্ছে আমি যখন ‘দরবেশের’ দোয়া নিয়ে অনেকটা রূপকথার তেপান্তরের মাঠ ভেঙে নানার বাড়ি ফিরছিলাম, তখন দিগন্ত রেখা কালো হয়ে ভীষণ ঝড় উঠেছিল। মুকবুল ভাই গামছা দিয়ে আমাকে কোমরের সাথে বেঁধে নিয়েছিলেন, যাতে বাতাসের ধাক্কায় পড়ে বা উড়ে না যাই। চারিদিক চরাচর নিকষ কালো হয়ে গিয়েছিলেন। আমরা দুই জন যেন অনিঃশেষ এক যাত্রার পথিক। যৌবনকালে ঢাকায় এসে সৈয়দ শামসুল হক অনূদিত ‘ম্যাকবেথ’ নাটকে আমি ব্যাঙ্কোর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র উচ্চাভিলাসী ম্যাকবেথের সাথে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ প্রায় অন্ধকার দিনে তিন ডাকিনীর দেখা হয়ে যায়। প্রতিভাবান অভিনেতা আলী যাকের ম্যাকবেথের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল। আমি অভিনয় করেছিলাম ব্যাঙ্কোর ভূমিকায়। সেই কিশোর বয়সের 'ছনখোলা'র দরবেশের বাড়ি থেকে ফেরার দৃশ্যটি আমার স্মৃতিতে নাড়া দিয়ে গেল। আজ মনে হয়—আমি যেন ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের ডাকিনীদের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলাম।
১ম ডাকিনী : ডোরাকাটা মার্জার মিউ মিউ তিন বার।
২য় ডাকিনী : শূয়োরের ঘোৎ ঘোৎ তিনবার একবার।
৩য় ডাকিনী: ‘এই বেলা’, ‘এই বেলা’, প্যাঁচাটার চিৎকার।
নোয়াখালীর কাহিনি এখনো শেষ হয় নি। নতুন অধ্যায়ে আসবে আরও কিছু সুখ-দুঃখের আনন্দের কথা।
আমার সারাটা জীবন দুঃখ-কষ্টের পাশাপাশি হাসি-ঠাট্টা হুল্লোড়ে কেটেছে। আমার স্কুলজীবন যেমন ছিল আনন্দের তেমনি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল না করার জন্য ছিল গ্লানির। আমার মা-বাবার ধারণা ছিল আমি খুব বিদ্যান হব। চারিদিকে স্কলার হিসেবে আমাকে নিয়ে হৈচৈ পড়ে যাবে। তারপরে স্কলারশিপ পেয়ে চলে যাব অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে। তখনো হার্ভাড বা এমআইটি তথা আমেরিকা, জার্মানি এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে আমাদের পরিচয় ছিল না। আমার জীবনের কেন্দ্রে ছিল, দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে আনন্দ উদ্যাপন। আমি যা করতাম, অন্তরের তাগিদেই করতাম। তখনো ভাবতে শিখি নি জীবন তো একটাই; যত পারি উপভোগ করে নেই। কার্যত ‘আমি তাই করেছি’, বুঝে হোক বা না বুঝে হোক।
প্রতিটি মানুষের জীবনে যেমন দুঃখের ছায়াপাত ঘটে; তেমনি আমার জীবনে বারবার দুঃখের ছায়াপাত ঘটেছে। তবে দুঃখের ছায়াকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অতিক্রম করে আমি আনন্দলোকে ভ্রমণ করেছি। সামান্য কথায় এবং তুচ্ছ ঘটনায় হেসে গড়াগড়ি খেয়েছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শ্রুতি লেখনের মাধ্যমে যে চারটি কবিতা লিখেছিলেন; তার একটির উল্লেখ আগেই করেছি। এই কবিতার শিরোনাম হলো, ‘দুঃখের আঁধার রাত্রি’ যার শেষের দুটো লাইন উদ্বৃত হলো—
“যতবার ভয়ের মুখোশ তার করেছি বিশ্বাস
ততবার হয়েছে অনর্থ পরাজয়।”
রবীন্দ্রনাথের কবিতার এই কথাগুলো আমার এই সামান্য জীবনে সঞ্জীবনী সুধার মতো কাজ করেছে। আমাকে জীবনযুদ্ধে শক্তি জুগিয়েছে। আমি এবং আমার বন্ধু-স্বজনেরা কত তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে হাসাহাসি করে জীবনে কতবার যে আনন্দের স্রোত বইয়ে দিয়েছি তার ইয়ত্তা নাই।
আমার মনের অজান্তে একটি বোধের জন্ম হয়েছিল—জীবন তো একটিই, সুতরাং জীবনের দুঃখ-বেদনাকে অতিক্রম করে আনন্দলোকে স্নাত হওয়ার প্রয়াস নেওয়াটাই ভালো। অতি তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে বন্ধুরা সবাই মিলে হাসাহাসি করেছি। কার পায়জামা বেঁটে, কার কোট নিতম্ব ঢাকে না, কার কোট প্রায় শেরওয়ানির মতো লম্বা ইত্যাদি।
মনে পড়ে গেল আমাদের দেশের সোনার কলমধারী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কথা। আমার পরিণত বয়েসে তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়েছিল। আমি তাঁর সর্বাধিক নাটকের নির্দেশনা দিয়েছি। উনি আমার ৭০তম জন্মদিনে একটি কবিতা লিখে আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। আমার নির্দেশিত মঞ্চনাটক নিয়েও বড় আকারের একটি লেখা উনি লিখেছিলেন। তাঁর কলম নিঃসৃত এই লেখা দুটিকে আমি আমার জীবনের সেরা পুরস্কার বলে মনে করি। উনি কোনো ব্যক্তিকে লম্বা পাঞ্জাবি পরতে দেখলে বলতেন অজানু লাঞ্ছিত পাঞ্জাবি, অর্থাৎ তার হাঁটুর ঘর্ষণে পাঞ্জাবি বাড়ি খেয়ে লাঞ্ছিত হচ্ছে। আমার সত্তর বছর বয়সের জন্মদিনে ‘আতাউর যখন সত্তরে’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছেন যা উদ্ধৃত হলো:
আতাউর যখন সত্তরে
সৈয়দ শামসুল হক
আপনারও তবে সত্তর হলো! হলো তো হলো!
আপনার বা আমাদের তো বয়েই গেলো!
পৃথিবীর স্বাদ গন্ধ স্পর্শ আপনি দশ আঙুলে ও বিবর জিহ্বায়
আর আপনার সংবেদী ত্বকে গ্রহণ করে চলেছেন
আজও সেই প্রথম দিনের মতো যখন যৌবন প্রথম,
যখন আপনার প্রথম পদপাত শিল্পের প্রাঙ্গণে
যখন আপনার ইন্দ্রিয়সকল সূর্যমুখী দল মেলতে শুরু করেছে প্রথম।
আপনার সঙ্গ আমাকে প্রাণিত করে!
পাখি পায় পাখার সঙ্গে নীলিমাকে মেলাবার প্রেরণা,
আপনার নাট্যসৃজন আমাকে আলোকিত করে,
আমাকে দ্বিতীয় পাঠ দেয় সৃজনের—
তোরণের ওপর আলো ঝলমলিয়ে ওঠে উৎসবের রাতে।
আর, আমার যে নাট্যকল্পপ্রতিমা, যখন তা নিঃসঙ্গ এই নগরে,
আপনি তাকে স্থাপন করেন আপনারই ধূপগন্ধী মণ্ডপে।
ওই ধূপে যে ধিকিধিকি আগুন জ্বলে
বস্তুত সে আপনারই মেধাবী রক্তের প্রবাহে।
আপনার হাতের আংটিতে আমি দেখি সেই আলোর বিচ্ছুরণ
যা আপনার মঞ্চকে করে তোলে ইন্দ্রজালিক ভূমি,
আপনার পায়ের ছাপে আমি দেখি সেই বিশ্বাসের অংকন
যা আমাদের জীবনবীক্ষা ধারণ করে আছে প্রতিটি পাটাতনে।
আপনাকে আমার নাট্যে পেয়েছি বৃক্ষের পাতা যেমন মধ্যাহ্নে।
পরস্পরের আলোয় আমরা অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি, আতাউর,
এখনো আরো অনেক পথ, আরো অনেক অপেক্ষমানতা,
ঈর্ষার ঊর্ধ্বে, এই বাংলার মাটি বাংলার জলেই
আমাদের প্রতিনিয়ত যে জন্ম নারীগণের গর্ভে,
সেখানে এই সত্তর কিছু নয়, বয়সটা নিতান্তই খড়ির একটা দাগ,
সময় বহমান সে কেবল আপনি মানুষটা
মৃতের দেশে সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকেন বলেই,
বেঁচে থাকেন নগরের পূতিগন্ধময় সড়কে
নিজেকে রেণু রেণু করে হাওয়ায় মাখিয়ে দিতে পারেন বলেই,
বেঁচে থাকেন আপনি ভয়াবহ স্তব্ধতার পাহাড়ে
নিজেকে শব্দিত করে তুলতে পারেন বলেই।
আতাউর, আপনার ভেতরে আমি প্রত্যক্ষ করেছি—
সেই ইন্দ্রজাল, সেই আলোকসম্পাত, সেই ধ্বনি সংস্থাপন।
জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন ॥
Leave a Reply
Your identity will not be published.