ধারাবাহিক উপন্যাস : মহররমের মিছিলে

ধারাবাহিক উপন্যাস :  মহররমের মিছিলে

[‘অলাতচক্র’ একটা নারী গোয়েন্দা এজেন্সি। অলাতচক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পেশায় কাজ করে কিন্তু পাশাপাশি তারা অলাতচক্রের সদস্য। অলাতচক্র গ্রুপের নাম সদস্যদের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে বানান, মানে : অ = অনীলা। লা = লাবণি। ত = তন্বী। চ = চন্দ্রিমা। ক্র = ক্রমেলা।

এই থ্রিলারে উপন্যাসটিতে দেখা যায়, পুরোনো ঢাকার মহররমের মিছিলে ‘তাতবির’ করতে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় প্রাণ হারায় তরুণ অপু। পুলিশ প্রাথমিক সুরতহালে একে অতিরিক্ত রক্তরক্ষণজনিত সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিলেও, সিআইডি এএসপি লাবণির তীক্ষè নজর এড়ায় নি এর পেছনের অসঙ্গতি। অপুর শরীরে অগণিত ধর্মীয় ক্ষতের ভিড়ে কি লুকিয়ে ছিল কোনো সুনিপুণ ঘাতকের ছদ্মবেশী আঘাত ? মৃত্যু-পূর্ববর্তী সেই রহস্যময় ফোন কল আর পাওনাদারের সাথে বিরোধ কি স্রেফ কাকতালীয়, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নিপুণ ষড়যন্ত্র ? মহররমের ভিড় আর মাতমের আবহে ঢাকা পড়া এক সন্দেহজনক মৃত্যুর জট খুলতে নামে ধীসম্পন্ন গোয়েন্দা লাবণি।]

 

সানজানাকে হাসপাতালের লবিতে রেখে লাবণি মর্গে এসেছে।

ডোম ফ্রিজারের ড্রয়ার টানতেই হিমবাষ্প বেরিয়ে এল। ভেতরে একটা সাদা বডিব্যাগ। বডিব্যাগের জিপার খোলার পর লাবণির মন খারাপ হয়ে গেল। অপুর মুখ দেখে মনে হচ্ছে এখনো সে জীবনীশক্তিতে ভরপুর। যেন জোর করে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে সমুদ্রের গর্জন। কত বছর হয়ে গেল লাবণি গোয়েন্দা বিভাগে আছে। তবু কোনো টগবগে যুবক কিংবা যুবতীর মৃত্যু ওকে এখনো একইভাবে ব্যথিত করে। সঙ্গে আসা তরুণ ফরেন্সিক ডাক্তার আহকামুল্লাহ বললেন, বুকে কতগুলো কাটা দাগ দেখেছেন ?

লাবণি ক্ষতগুলো লক্ষ করে বলল, সেলফ ইনফিক্টেড উন্ড। এই ক্ষতগুলোর মাঝে কোনো অতিরিক্ত ক্ষত লুকিয়ে আছে কি না সেটা একটা ভাববার বিষয়। পিঠের দিকটা দেখতে পারি ?

ডাক্তারের ইশারায় ডোম শরীরটা ঘুরিয়ে দিলেন। ডাক্তার বললেন,  দেখুন পিঠেও একই অবস্থা। প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে।

এভাবে হঠাৎ করে ব্লিডিং হয়ে মরে যাওয়া কি স্বাভাবিক ? আমি শুনেছি ইনি প্রতি বছর মহররমের মেলায় আসতেন। ওনার এসবের অভ্যাস ছিল।

সুপারফিসিয়াল ইনজুরি থেকে এতটা ব্লিডিং হওয়ার কথা না। তবে ভিকটিমের যদি সম্প্রতি কোনো ক্রনিক ইলনেস হয় তাহলে এত ব্লিডিং অসম্ভব না।

কী ধরনের অসুখ ?

এই ধরুন লিভারের সমস্যা, হিমোফিলিয়া বা যদি অন্য কোনো কারণে ইমিউন সিস্টেম কোলাপ্স করে থাকে, তাহলে খুব ছোট ক্ষত থেকেও রক্তরণ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

তাহলে এসব না জেনে তো স্বাভাবিক মৃত্যু বলা ঠিক না। আপনি কেবল বলতে পারেন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু।

আমরা তো সেটাই বলেছি, কিন্তু পরবর্তী সিদ্ধান্ত তো পুলিশের।

বুঝেছি। আপনাদের কথা মিসইন্টারপ্রটেড হয়েছে। আচ্ছা, আমরা সিআইডি থেকে ময়নাতদন্তের অনুরোধ পাঠাচ্ছি। আমি ধানমন্ডি থানার ওসিকেও জানিয়ে রাখছি।

ঠিক আছে। ফরমাল রিকুইজিশন লেটারটা চলে এলেই আমরা ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু করে দেব।

সুরতহাল রিপোর্টে আপনারা ব্লিডিংয়ের কথা বলেছেন। আপনি এখন যা বললেন সেটা রিপোর্টে থাকলে ভালো হতো।

লাবণি বেরিয়ে যেতেই ডোম নিঃশব্দে জিপারটা টেনে বন্ধ করে দিল। চাকার কর্কশ শব্দে ভারী স্টিলের ড্রয়ারটা আবার ঢুকে গেল ফ্রিজারের হিমশীতল অন্ধকারে। লাবণি ধানমন্ডি থানার ওসিকে ফোন দিতেই ওসি বললেন, হাসপাতালে গিয়েছিলেন ? স্যরি, আমি আরেকটা কেস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আসতে পারলাম না।

অসুবিধা নেই। আপনারা এটাকে ওপেন অ্যান্ড শাট কেস হিসেবে ধরে নিয়ে মহররমের মেলার দুর্ঘটনা বলছেন। ডাক্তারের সাথে কথা বলে ব্যাপারটা আমার কাছে এত সহজ মনে হচ্ছে না। আমি ময়নাতদন্ত ছাড়া কনফার্ম হতে পারছি না।

ওসি ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতে চাইলেন, কিন্তু লাবণি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আপাতত আমি আপনার সাথে কোনো তর্কে যাব না। আমি সিআইডি থেকে ফরমাল ময়নাতদন্তের রিকুইজিশন পাঠাচ্ছি। ব্যাপারটা আপনাকে জানিয়ে রাখার জন্যই ফোন করলাম।

ওপাশ থেকে ওসি ‘ঠিক আছে’ বলতেই লাবণি ফোনটা কেটে দিল। ওসি সাহেবকে খুব একটা খুশি মনে হলো না, তার ইগোতে আঘাত লেগেছে। হাসপাতালের লবিতে এসে লাবণি দেখল, সানজানাও পাংশুটে মুখে কারও সাথে ফোনে কথা বলছে। লাবণিকে দেখে কথা দ্রুত শেষ করে সানজানা বলল, তানিয়া অনেক কান্নাকাটি করছে। আমি এখন ওর বাসায় যাব। তুই আসবি ?

আমি কিন্তু এখনো এই তদন্তের অংশ না। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে সন্দেহজনক কিছু পেলেই আমরা তদন্তে পুরো শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারব। ইন দ্য মিন টাইম আমি আনঅফিসিয়ালি তানিয়ার সাথে কথা বলে কাজ এগিয়ে রাখতে পারি।

তুই তাহলে আসবি নাকি আসবি না ?

চল।

তানিয়াদের অ্যাপার্টমেন্ট লালবাগ কেল্লার কাছে। তানিয়ার হাজবেন্ড আহসান একটা মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংকে কাজ করেন। মেয়ে ছোট বলে তানিয়া আপাতত চাকরি থেকে বিরতি নিয়েছে। পরিচয়পর্ব সেরে তানিয়াই কথা শুরু করল, এই বাড়িটা আমাদের, মানে আমার আব্বা হাউজবিল্ডিংয়ের লোন নিয়ে বানিয়েছিলেন। অপু উপরের ছোট ফ্ল্যাটে থাকে। আগে আম্মু আর অপু একসাথে থাকত। আম্মু মারা গেছে দু বছর হলো।

আর চাচা ?

আব্বু নেই ছয় বছর হয়ে গেল। এখন অপুও নেই।

তানিয়া, অপুর মৃত্যুটা স্বাভাবিক হতে পারে আবার নাও হতে পারে। আমরা ময়নাতদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ময়নাতদন্তের পর স্পষ্ট করে বলতে পারব কোনো ফাউল প্লে আছে নাকি। আপাতত আমি আনঅফিসিয়ালি কিছু প্রশ্ন করতে পারি ?

হ্যাঁ।

অপু কি চাকরি করত ?

হ্যাঁ, ও নোভা ফার্মাসিউটিক্যালে সায়েন্টিফিক অফিসার হিসেবে কাজ করত।

ওর ব্যাচেলর কি ফার্মাসিতে ?

না, অপু বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি পড়েছে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর আর অ্যান্ড ডিতে এই সাবজেক্টে পড়া ছাত্রদের অনেক চাহিদা শুনেছি।

সে ক্ষেত্রে স্যালারি নিশ্চয় ভালো ?

হ্যাঁ, খুব হ্যান্ডসাম স্যালারি। ওর টাকা-পয়সার কোনো সমস্যা ছিল না।

ওর কোনো মেডিকেল হিস্ট্রি আছে নাকি জানো ? কোনো মেডিকেশন নিত ?

অপুর স্বাস্থ্য সব সময় খুব ভালো ছিল। আমি কোনো মেডিকেশনের কথা শুনি নি। এজন্যই ভাবছি এত তরতাজা ছেলে কীভাবে হুট করে মারা যাবে!

ওরা কথা বলতে বলতে তানিয়ার স্বামী আহসান ড্রয়িংরুমে ঢুকে বলল, আপনি তো গোয়েন্দা লাবণি ?

জি।

সানজানার মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। কী থেকে কী হয়ে গেল! অপুর গার্ডিয়ান বলতে আমরাই।

আমরা ময়নাতদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কাল পরশু রেজাল্ট জানতে পারব।

আমরাও তাই চাচ্ছিলাম। আমি সকালে হাফবেলা ছুটি নিয়েছিলাম। এখন একটু অফিস যেতে হচ্ছে।

ঠিক আছে। তানিয়ার কাছে থেকে আমি আপনার ফোন নম্বর নিয়ে রাখছি। কোনো প্রয়োজন হলে যোগাযোগ করব।

আহসান চলে যেতেই লাবণি তানিয়াকে বলল, অপুর পার্সোনাল লাইফ সম্পর্কে আরেকটু জানতে হবে।

বলো কী জানতে চাও ?

অপুর কোনো গার্লফ্রেন্ড ছিল ?

শবনম নামের ওর অফিসের একজন কলিগ আছে। ওর সাথে একটা রিলেশন ছিল। দু বছর আগে ব্রেকআপ হয়ে গেছে। তারপর তো আর কারও কথা শুনি নি।

এ নিয়ে কি অপু আপসেট ছিল ?

আপসেট ছিল কি না বলতে পারব না। ও তো খুব চাপা স্বভাবের।

ও কি খুব ধার্মিক ? মহররমের মিছিলে যাওয়ার কারণে বলছি।

খুব ধার্মিক না হলেও, ধর্ম মানত। তোমার সাথে কথা বলতে বলতে মনে হলো, ও মহররমের মিছিলে আগেও যেত কিন্তু শবনমের সাথে ব্রেকআপের পর থেকেই ও মিছিলে তাতবীর শুরু করে।

ওর কোনো শত্রু ছিল ? অফিসে কিংবা এলাকায় ?

শিওর না। এ নিয়ে আমাদের সাথে কখনো কোনো আলাপ হয় নি। বললাম না, ও খুব চাপা স্বভাবের ছিল।

ঠিক আছে। আমি আসছি তাহলে। অপুর ডেডবডি পরশু অথবা তার পরদিন হ্যান্ড ওভার করা হবে।

সানজানা তানিয়ার সাথেই রয়ে গেল। লাবণি গাড়ি নিয়ে পলাশীর কাছে আসতেই ওর মনে হলো, একটা নীল রঙের টয়োটা গাড়ি বেশ কিছুক্ষণ ধরে ওর পেছন পেছন একটা দূরত্ব রেখে আসছে। লাবণি নিশ্চিত হওয়ার জন্য নীলক্ষেতের কাছে এসে ওর গাড়িটা ডান দিকে ঘুরিয়ে ফুলার রোডে ঢুকে গেল। নীল টয়োটা গাড়িটাও ডানে মোচড় দিয়ে ওর পেছনে চলে এসেছে। তিনটা রিকশার পেছনে থাকায় গাড়ির ভেতরের চেহারাগুলো ঠাহর করা যাচ্ছে না। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের কাছে এসে লাবণি গাড়িটা আবার বামে মোহসিন হল বরাবর বাঁক ঘুরালো। নীল গাড়িটা শাঁ করে টিএসসি বরাবর চলে গেল।

লাবণি ভাবল, ব্যাপারটা কাকতালীয়, নাকি আসলেই কেউ ওকে অনুসরণ করছিল ?

 

(চলবে)

Leave a Reply

Your identity will not be published.