রোমেনা আফাজ  : জলেশ্বরীতলার বরেণ্য লেখিকা

রোমেনা আফাজ  : জলেশ্বরীতলার বরেণ্য লেখিকা

রোমেনা আফাজ (২৭ ডিসেম্বর ১৯২৬-১২ জুন ২০০৩), বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক। তিনি ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের জন্য বাঙালি পাঠক সমাজে বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর সাহিত্য-কর্ম অবলম্বনে কয়েকটি  চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে এবং সেগুলো দর্শকপ্রিয়তাও পেয়েছে। বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করা এই লেখিকা সাহিত্যে তাৎপর্যপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার—‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ লাভ করেছেন। তাঁর অবদানকে ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘রোমেনা আফাজ স্মৃতি পরিষদ’। প্রয়াত এই লেখিকার জন্মভূমি, জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে আলো ফেলা হয়েছে এই রচনায়। লিখেছেন কাজল রশীদ শাহীন।

উত্তরবঙ্গ সফরকালে বেগম রোকেয়ার পুণ্যভূমি রংপুরের পায়রাবন্দ সফর শেষে আমরা এবার এসেছি বগুড়া জেলায়। এই জেলার জলেশ্বরীতলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন জনপ্রিয় ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজ-এর কিংবদন্তিসম লেখিকা রোমেনা আফাজ। বিশেষজ্ঞদের মতে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে তিনিই একমাত্র লেখিকা যিনি গোয়েন্দা কাহিনির কাঠামো তৈরি করেছিলেন দেশীয় পটভূমিতে। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এই বাংলায় তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল সর্বশীর্ষে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়। উভয় বাংলায় রোমেনা আফাজকে বেশি জনপ্রিয় বলে মনে করা হতো। তরুণ-তরুণী পাঠকদের মধ্যে এ সিরিজের আকর্ষণ ছিল ঈর্ষণীয় পর্যায়ের।

তাঁর এই জনপ্রিয়তা ও সফলতার মূলে ছিল ‘দস্যু বনহুর সিরিজ’ গোয়েন্দা কাহিনি। উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালে লন্ডনের ‘আওয়ার হোম’ নামের একটি কাগজ রোমেনা আফাজকে বিশ্ববিশ্রুত গোয়েন্দা কাহিনির লেখিকা অগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে তুলনা করে লিখেছিল, ‘শি মে ওয়ানডে বি নোন অ্যাজ অগাথা ক্রিস্টি’। ‘তাঁর ‘রক্তে আঁকা ম্যাপ’ বইটির সমালোচনা করতে গিয়ে পত্রিকাটি সেই সময় এই মন্তব্য করেছিল।

প্রসঙ্গত, বিগত শতকে আরও কয়েকজন বিশ্ববিখ্যাত গোয়েন্দা উপন্যাস ও গল্প লেখিকার আবির্ভাব ঘটেছিল—যাঁদের সকলেই ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন। শীর্ষস্থানীয় তিনজন হলেন—জুম টমসন, পিডি জেমস ও রুখ বেন্ডেল।

জুমের তিনটি বিখ্যাত উপন্যাস হচ্ছে ‘শ্যাডো অব এ ডেইটি’ (১৯৮১), ‘টু মেক ও কিলিং’ (১৯৮২) ও ‘সাউন্ড এভিডেন্স’ (১৯৮৪)।

পিডি জেমসের সৃষ্ট চরিত্রগুলো প্রায়শই বিপত্নীক কবি এবং চিন্তাশীল। তাঁর সৃষ্ট প্রধান গোয়েন্দা চরিত্র হচ্ছে পুলিশ ডিকেটকটিভ এ্যাডাম ডালগোলিশ। ‘প্রাইড ফর এ নাইটিঙ্গেল’ (১৯৭১), ‘দ্যা ম্যাক টাওয়ার’, (১৯৭৫) এবং ‘স্কাল বিনিথ দ্য স্কিন’ (১৯৮২) তাঁর নামকরা তিনটি উপন্যাস।

রুথ বেন্ডেল, যিনি নিজেই বলেছেন, তিনি ঝলসে উঠেছেন ক্রমশ। অপেক্ষাকৃত কম বয়সী লেখিকাদের পরে তাঁর নাম ছড়িয়েছে। বিশ্বসাহিত্যে রোমেনা আফাজ এঁদের মতো আদৃত নয়। কেননা, ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর লেখাকে আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয় নি। তবে একথা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, সাহিত্যের বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল কিংবদন্তিসম।

কিংবদন্তিতুল্য এই লেখকের ‘শেকড়ের সন্ধানে’ আমাদের এবারের বগুড়া সফর। যাওয়ার পূর্বেই যে ভোগান্তি আমাদের পোহাতে হয়েছে তাতে যুগপৎভাবে আমরা ব্যথিত ও লজ্জিত। রোমেনা আফাজের লেখক পরিচিতি ও ঠিকানা পেতে আমরা শরণাপন্ন হই বাংলা একাডেমি প্রকাশিত লেখক অভিধানের ওপর। সেই অভিধানটি প্রকাশকালীন সময়ে লেখিকা জীবিত ছিলেন। ব্যথিত হই একারণে যে, এ ধরনের একটি গ্রন্থে রোমেনা আফাজের নামে কোনো পৃষ্ঠা বাংলাদেশ বরাদ্দের বদান্যতা দেখানো সম্ভব হয় নি। এমনকি পরিচিতি থাকলেও একেবারে সংক্ষিপ্ত—যা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত ও প্রত্যাশিত নয়।

আর লজ্জিত হওয়ার কারণও এই ব্যর্থতার মধ্যেই নিহিত। রোমেনা আফাজের মতো লেখিকা, যাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৫০, তাঁকে লেখক অভিধানে একটু স্থান দিতে বাংলা একাডেমির এত কার্পণ্য কেন ?

রোমেনা আফাজের ঠিকানা পেতে আমরা বগুড়ায় অবস্থানকালে এক সন্ধ্যায় দৈনিক করতোয়া অফিসে যোগাযোগ করি। করতোয়ার স্টাফ রিপোর্টার ফারুক ভাই ও সাহিত্য সম্পাদক আরিফ রেহমান আমাদের সকল প্রকার সহযোগিতা করে বাধিত করেন। পরদিন সকালে আমরা সাতমাথায় অবস্থিত হোটেল আল মদিনা থেকে রিকশা নিয়ে রোমেনা আফাজের বাসার উদ্দেশে জলেশ্বরীতলায় রওয়ানা দিই। কয়েক মিনিট পরেই আমাদের চোখ আটকায় ‘রোমেনা আফাজ সড়ক’ লেখা একটি স্মৃতিফলকের প্রতি। এই অনুভবে প্রীত হই যে, প্রথিতযশা এই সাহিত্যিকের প্রতি আমরা জাতীয়ভাবে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে ব্যর্থ হলেও বগুড়াবাসী এবং সেখানকার প্রশাসনের মানুষগুলো তাঁর মৃত্যুর স্বল্পসময়ের মধ্যে ‘রোমেনা আফাজ সড়ক’ বাস্তবায়ন করে যথার্থ কাজটিই করেছে।

রোমেনা আফাজ সড়ক’ ভবনের সামনে নেমে একজনকে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দেয় ‘রোমেনা আফাজ সংগ্রহশালা’য় যাওয়ার সিঁড়িটি। কলিংবেল টিপতেই বেরিয়ে আসেন তাঁর ছোট ছেলে আঞ্জু ভাই। খুলে দেন সংগ্রহশালার তালা দেওয়া ঘর। আমাদের সামনে তখন খুলে যায় অন্য এক ভুবন। চারিদিকে বই থরে থরে সাজানো। যার বেশিরভাগই ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজ। রোমেনা আফাজের বিভিন্ন বয়সের ছবি। সঙ্গী ফটোগ্রাফার  বিশ্বজিৎ সরকারের ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক করায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে। আমি রোমেনা আফাজের ব্যক্তিজীবনের সংগৃহীত বিভিন্ন জিনিসপত্র দেখতে থাকি, বই দেখতে থাকি। আর অদ্ভুত এক ঘোরের  মধ্যে কাটতে থাকে আমার সময়।

মরহুম কাজেম উদ্দীন আহম্মেদ সাহেবের কন্যা রোমেনা আফাজ ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে বগুড়া জেলার শেরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর। কার্যোপলক্ষে তাঁকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হতো। বাবার সঙ্গে তিনিও পুরো বাংলাদেশ এবং ভারতের দিল্লি, আগ্রা, লক্ষেèৗ, হুগলী, কলকাতা, মেদিনীপুর প্রভৃতি স্থানে ঘুরেছেন। এ কারণে তাঁর পক্ষে একস্থানে লেখাপড়া করাও সম্ভব হয়ে ওঠে নি।

স্থায়ীভাবে লেখাপড়া করার সুযোগ না হলেও ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সাহিত্যপ্রতিভার স্ফূরণ দেখা যায়। খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি লিখেছেন। সাহিত্যচর্চা শুরু করেন আর দশজন লেখক-সাহিত্যিকের মতো কবিতা দিয়েই। মাত্র নয় বছর বয়সে তাঁর লেখা প্রথম কবিতা ‘বাংলার চাষী’ ‘বগুড়ার কথা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তারপর থেকেই বিপুল উদ্দীপনায় নতুন লেখালেখি শুরু করেন। ‘মোহাম্মদী’, ‘পয়গম’, ‘সওগাত’ প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা ও ছোটগল্প লিখতে শুরু করেন।

সাহিত্যানুরাগী মাতার অনুপ্রেরণায় আর পিতার সঙ্গে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা 'রহস্য' সিরিজের প্রথম বই ‘রক্তে আঁকা ম্যাপ’ ১৯৫৭ সালে সাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর 'বনহুর' সিরিজের প্রথম বই ‘দস্যু বনহুর’। তাঁর আজকের এই জনপ্রিয়তার মূলে বনহুরের অবদান স্বয়ং রোমেনা আফাজও অস্বীকার করেন নি।

বই প্রকাশের অভিজ্ঞতাও অম্ল-মধুরতায় ভরা। বনহুর সিরিজের প্রথম বই ‘দস্যু বনহুর’-এর পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন প্রকাশক। তাও একজন নয় কয়েকজন, একবার না কয়েকবার। স্বামী ডা. আফাজউদ্দীনের সঙ্গে বেড়াতে এসেছেন ঢাকায়, সঙ্গে বনহুর সিরিজের প্রথম বইয়ের পাণ্ডুলিপি। নিয়ে গেলেন মফিজ বুক ডিপোতে, কাজ হয় নি কোনো, পরে আরও কয়েকটি প্রকাশনীতে; কিন্তু কাজের কাজ হলো না। পরে অনেক তর্কে-বিতর্কে বই বেরোল মফিজ হক ডিপো থেকে। প্রকাশক বগুড়ায় রোমেনা আফাজের কাছে ২০ কপি বই পাঠিয়ে দিলেন, সঙ্গে অনুরোধ— বনহুর সিরিজ আকারে লিখতে হবে। পাশাপাশি হুমকি ‘আপনি যদি সিরিজ লিখতে না চান, তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে লেখাব’। তারপরের ঘটনা ইতিহাস। মানুষ লুফে নিল বনহুর সিরিজ। ’৬৩ সালে সেই যে যাত্রা শুরু তা গিয়ে থেমেছে ’৮৫ সালে ১৩৮ নাম্বার বই ‘স্বর্ণ সিংহাসনে’। এর মধ্যে অনেক কিছুই বদলেছে। প্রথম যখন বই বেরুত তখন দাম ছিল ২ টাকা, আর শেষের দিকে ২৫ টাকা। প্রথম বনহুর লিখে পেয়েছিলেন ১৫০ টাকা, আর শেষে বই প্রতি ৫-৭ হাজার টাকা করে পেতেন। তবে ১৫০ টাকা থেকে ৫ হাজারে আসার পথটা খুব সহজ ছিল না। যখনই পয়সা দিতে গড়িমসি করত প্রকাশক তখনই লেখায় ঢিল পড়ে যেত, প্রকাশক বাধ্য হয়ে পারিশ্রমিক বের করতেন। আর এই টাকা আদায় করতেও খুব কষ্ট হতো।

রোমেনা আফাজের সংগ্রহশালার দেয়ালে শোভা পাচ্ছে রোমেনা আফাজের সঙ্গে দেশের বরেণ্য চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্তের ছবি। তাঁর অনেকগুলো উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। জানা যায়, তাঁর লেখা ছয়টি উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। এগুলো হলো—সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘কাগজের নৌকা’, মোস্তফা মেহমুদ পরিচালিত ‘মোমের আলো’, মায়ার সংসার, ‘মধুমিতা’ ও ‘মাটির মানুষ’ এবং মাসুদ পারভেজ পরিচালিত ‘দস্যু বনহুর’।

তাঁর আলোচিত গোয়েন্দা সিরিজ বনহুর সম্পর্কে তাঁর অভিমত ছিল, “আমি কখনো জঙ্গলে যাই নি, ডাকাতের আস্তানায় যাই নি। সব আমার কল্পনা। আফ্রিকার জঙ্গলের বর্ণনাগুলো আমি বইয়ে পড়েছি। কোনো বইয়ের অনুকরণ নয়, আল্লাহ আমাকে যে শক্তি দিয়েছেন সেটাই যথেষ্ট বলে মনে করি।” বনহুর চরিত্র নির্মাণ প্রসঙ্গে তারা ভাষ্য, “বনহুর আমি যদি সাদামাটা লিখতাম, “তবে কিশোর সমাজ পড়ত না। অনেক উপন্যাস আছে কেউ পড়ে না। আমি এমন একটা চরিত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই যার মধ্যে সততা, ন্যায় ও নিষ্ঠা থাকবে। তার চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কিশোর সমাজ তাকে গ্রহণ করবে। আমি সেইভাবে তাকে সৃষ্টি করলাম।”

বলা প্রয়োজন, সাত ছেলে ও দুই মেয়ের জননী রোমেনা আফাজ লেখালেখির বাইরে বিভিন্ন সময়ে ৩৫টি সামাজিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিলেন। লেখালেখি ও একাধিক সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পদকসহ একাধিক স্বীকৃতি জীবদ্দশাতেই পেয়েছিলেন।

রোমেনা আফাজের মেয়ে সেলিনা আফাজ মা’র লেখালেখি সম্পর্কে একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন—“মার লেখার কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না। যখন তিনি সময় ও সুযোগ পেয়েছেন তখনই তিনি লিখেছেন। লিখতে মা'র প্রায়ই খাওয়া-গোসলের সময় পেরিয়ে যেত। মা'কে আমি রাত দুটা পর্যন্ত লিখতে দেখেছি। এর মাঝে আমরা মাকে কত বিরক্ত করেছি, সেইসব ঝামেলা মিটিয়ে মা আবার লিখতে বসতেন। আমি আশ্চর্য হয়ে যেতাম আমার মা'র এত ঝামেলার মধ্যেও কেমন করে লেখার মুড আসে। আমরা তো তা পারি না। আসলেই আমার মা ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী মহিলা। মা বলতেন, ‘লিখতে বসলেই আমার লেখা আপনা আপনি এসে যায় কলমের ডগায়।’ আর তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখে যেতেন। মা একবার যা লিখে যেতেন সেই পাণ্ডুলিপি আর পরে দেখতেন না কী লিখেছেন! এমন কি বই আকারে ছাপা হওয়ার পরও আর পড়বার তাঁর সময় বা সুযোগ হতো না। মায়ের লেখা বইয়ের সংখ্যা ২৫০ খানা, এছাড়া প্রায় একশত কবিতা লিখেছেন। আমার ভীষণ আশ্চর্য লাগে এত লেখা কী করে সম্ভব ? আমি অবাক হই সংসারে মার কত ঝামেলা ছিল, এরপর তার মেহমানদারিও ছিল। তারপরেও মা এত বই কী করে লিখতে পারলেন ? মার আসলেই এটা ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভা। মার মতো এত অধিক সংখ্যক বই লিখতে পেরেছেন কি না আমার জানা নেই।”

প্রসঙ্গত মহিয়সী এই সাহিত্যিকের ভাগ্যে সাহিত্যকর্মে অবদানের স্বীকৃতিও জুটেছে। তাঁর ‘লেখকের স্বপ্ন’ উপন্যাসটি ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক সেরা উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

উল্লেখ্য, গোয়েন্দা সিরিজসহ গল্প-উপন্যাস মিলে রোমেনা আফাজের প্রকাশনার সংখ্যা দু শ’ পঞ্চাশ। এরমধ্যে এক শ’ কবিতার একটি সংকলন রয়েছে। রোমেনা আফাজ শুধু জনপ্রিয় একজন কৃতী লেখিকাই নন, সুপরিচিত সমাজসেবীও ছিলেন বটে। তিনি রেড ক্রিসেন্ট, পবিবার পরিকল্পনা সমিতি, নারী পুনর্বাসন ফাউন্ডেশন বোর্ড, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, শিল্পকলা পরিষদ, শিশু একাডেমী, ঢাকার লেখিকা সংঘসহ ত্রিশটিরও বেশি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সাহিত্যিক ও সমাজসেবী হিসেবেও প্রচুর স্বীকৃতি পেয়েছেন রোমেনা আফাজ। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ ও রাজশাহীর আবদুর রাজ্জাক স্মৃতি সাহিত্য স্বর্ণপদক পুরস্কার, আমরা ক'জন (বগুড়া) শিল্পী গোষ্ঠীর সাহিত্য সম্রাজ্ঞী স্বর্ণ মুকুট, বগুড়া লেখকচক্র, বগুড়া ইয়ুথকয়্যার, বগুড়া থিয়েটার, রোটারি ক্লাব, গোয়েন্দা সাহিত্যে অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার, সবুজ সংঘ, শহীদ দেওয়ান স্মৃতিপদক, বাংলা সাহিত্যিকী। রাজশাহী থেকে রোমান্স সাহিত্য-সম্রাজ্ঞী পদক, সুললনা স্বাধীনতা পদক, বগুড়া পৌরসভার সোয়া শ' বছর পূর্তিতে সাহিত্যপদকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও পুরস্কার। উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের জরিপে বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখিকা হিসেবে তিনি স্বীকৃতি পান।

পাঠকপ্রিয় ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের জন্য হাজারো পাঠকের চিঠি পেয়েছেন। এসব চিঠির বেশিরভাগই সংরক্ষিত রয়েছে সংগ্রহশালায়। সেখানে দর্শনার্থীদের মন্তব্য লেখার জন্য একটি খাতাও রয়েছে, অনেকেরই পদধূলি রয়েছে। আঞ্জু ভাইয়ের প্রীতিমুগ্ধ ব্যবহার ও আপ্যায়ন শেষে বিস্ময়ের ঘোর কেটে কিংবা আরও বিস্ময়াভিভূত হয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি রোমেনা আফাজের সংগ্রহশালা থেকে। মনের ভেতরে তখন অনুরণন হতে থাকে তাঁর লেখা কয়েকটি পঙ্ক্তি : ‘বিশাল বিশ্বে অসংখ্য ভিড়ের মাঝে। কে কার মনে রয়/শুধু বেঁচে থাকে তার কাজ/ অনন্তকালের স্বাক্ষর হয়ে/ নাহি তার কোনো ক্ষয়।’

 

Leave a Reply

Your identity will not be published.