সুকান্ত ভট্টাচার্য : জন্মশতবার্ষিকীর আলোয়

সুকান্ত ভট্টাচার্য : জন্মশতবার্ষিকীর আলোয়

সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৫.০৮.১৯২৬-১৩.০৫.১৯৪৭) বাংলা সাহিত্য—বিশেষ করে কবিতায় এক ক্ষণজন্মা প্রতিভা। বেঁচেছিলেন  মাত্রই একুশ বছর, বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে কুড়ি বছর আট মাস আঠাশ দিন। এই স্বল্পায়ু সত্ত্বেও, আশ্চর্যের বিষয়, আধুনিক বাঙলা কবিতার জগতে অবধারিত যাঁরা, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম আর জীবনানন্দের সঙ্গে সুকান্তর নামও উচ্চারিত হয়। বহু সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জন্মজয়ন্তী একই সঙ্গে পালন করেন। তিনি কোন দশকের কবি, এহেন প্রশ্ন কদাপি উচ্চারিত হয় না। তাঁর স্বল্প জীবন ও মাত্র সাত-আট বছরের স্বল্পতর সারস্বত বাংলা ভাষার অপরিহার্য কবি করে তুলেছে।
এই প্রবন্ধে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন ও সাহিত্যের নানা দিক তুলে ধরা হলো।

সুকান্ত ভট্টাচার্য : এক বালক বীর
আজ তাঁর জন্মশতবর্ষের মহান ক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাই, মা সুনীতি দেবী ও বাবা নিবারণ চন্দ্রের এই পুত্রটি, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘চৎড়ফরমু’ বা বিস্ময়বালক। নইলে মাত্র সাত বছর বয়সেই হাতে লেখা পত্রিকা‘সঞ্চয়’-তে গল্প লিখছেন, এগারো বছরে লিখছেন গীতিনাট্য ‘রাখাল ছেলে’, আর প্রায় এই বয়সেই বিজন গঙ্গোপাধ্যায়-সম্পাদিত ‘শিখা’-তে বেরোচ্ছে তাঁর জীবনে প্রথম মুদ্রিত লেখা, প্রবন্ধ, স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে! বাগবাজারের কমলা বিদ্যামন্দির পাঠশালায় পড়তে অভিনয়ও করছেন ‘ধ্রুব’ নাটকে, আর সেভেনে পড়ার সময় সদ্য বন্ধুরূপে পেয়েছিলেন যাকে, আর আজীবন যার সঙ্গে অন্তর্লগ্ন হয়ে থাকবেন, তাঁর চেয়ে তিন বছরের বড় সেই অরুণাচল বসুর (১২.০৯.১৯২৩- ২৪.০৭.১৯৭৫) সঙ্গে বের করলেন নিজস্ব হাতে লেখা পত্রিকা, ‘সপ্তমিকা’। সুকান্ত তখন বেলেঘাটা দেশবন্ধু বিদ্যালয়ের ছাত্র, থাকেন উত্তর কলকাতার ৩৪, হরমোহন ঘোষ লেনে।
তাঁর কবিপ্রতিভা উন্মেষের পেছনে মা সুনীতি দেবী ও জ্যেঠতুতো দিদি রাণীর অবদানকে অবশ্য অস্বীকার করা যাবে না। দুঃখের কথা, এই রাণীদি সম্পর্কে বিশদ কিছুই জানা যায় না। তবে  তিনি ছিলেন আগ্রাসী গ্রন্থপ্রেমী, আর তাঁর ভাইটিকে তিনি তাঁর পড়া গল্প শোনাতেন, পড়ে শোনাতেন রবীন্দ্রনাথের ‘কথা ও কাহিনী’-সহ বহু কবিতা। আশ্চর্যের বিষয়, কিশোরী  বয়সেই তিনি কবির নামটি রাখেন সে-সময়কার বিখ্যাত লেখক—ব্যারিস্টার মনীন্দ্রলাল বসুর ‘রমলা’ উপন্যাসের নায়ক সুকান্তর নামে! ‘প্রবাসী’-তে উপন্যাসটি ১৯২২-২৩ জুড়ে ধারাবাহিক বেরিয়েছিল। হায়, উপন্যাসে সুকান্তর মৃত্যু হয়েছিলো যক্ষ্মায়! রাণীর সহসা মৃত্যু, সুকান্তর মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। তবে ভিত তৈরি করে দিয়ে গেছেন রাণী, ধরিয়ে দিয়ে গেছেন একতারাতে একটি যে সুর, সেটিকে বাজাবার। অর্থাৎ সাহিত্যপ্রীতির।
দ্বিতীয় অবদান তাঁর মায়ের। মাত্র এগারো বছর বয়সে তিনি সুকান্তর পিতার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী হয়ে আসেন, নিবারণচন্দ্রের প্রথমা স্ত্রী মনোমোহিনীর অকালপ্রয়াণে। ছয় পুত্রের জননী হন তিনি, যাদের মধ্যে সুকান্ত প্রথম। অন্যরা হলেন সুশীল, প্রশান্ত, বিভাস, অশোক ও অমিয়। নিবারণের প্রথম পক্ষের ছেলে মনোমোহনের সঙ্গেও অসম্ভব হৃদ্যতা ছিল সুকান্তর। তাঁর স্ত্রী সরযূ সুকান্তকে অসম্ভব স্নেহ করতেন। তিনিই সুকান্তর হাতেখড়ি দেন। আর সুকান্তর একমাত্র যে ছবিটি আমরা  আজ দেখতে পাই, সেটি স্টুডিও থেকে তুলে আনার পয়সাও দিয়েছিলেন তিনিই!
বাড়ির যাবতীয় ব্যস্ততা সামলে সুকান্তকে মা রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি বলতেন, শোনাতেন রূপকথার গল্প। এইভাবে সুকান্তর মানসগঠনে ভূমিকা রাখেন সুনীতিদেবী।
তা ছাড়া বাবা নিবারণচন্দ্রের ছিল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, ‘সারস্বত লাইব্রেরি’। এর একটা অনুকূল প্রভাব সুকান্তর ওপর অবশ্যই পড়ে ছিল। অল্প বয়স থেকেই রবীন্দ্রনাথে আগ্রহী হওয়া, অসম্ভব পুস্তকপ্রীতি, এমন ছন্দজ্ঞান ও গদ্যরচনার শৈলী, অতীব বিস্ময়কর!
রাণীদি মারা গেলেন, আর সুকান্তর মা-ও। ক্যানসারে। তখন সুকান্ত বারো বছরের। মধুপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মাকে। তাই তার শেষ দেখাটাও হতে পারে নি মায়ের সঙ্গে।
হ্যাঁ , বিস্ময়বালকই ছিলেন সুকান্ত। মাত্র ন’বছর বয়সে এমন নিপুণ অন্ত্যমিল দিয়ে নইলে কী করে লিখলেন এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তাঁর আদি কবিতাটি, ‘রমা রাণি দুই বোন পরির মতন,/ সবে বলে মেয়ে দুটি লক্ষ্মী কেমন।’ সে বয়সে লেখা আরও অধিক ও অনবদ্য ছন্দবোধ লক্ষ করি এই ছড়াটিতে, ‘বাড়ি কোন গাঁয়,/ বাড়ি বনগায়। / ছেলে কাহাদের/ ছেলে সাহাদের।/ চল আমরা/ পাড়ি আমড়া।’
এগারো বছর তখন সুকান্তর। এক দাদা সুকান্তর কবিতার খাতা সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে দিলে তা পাঠ করে বিস্ময়ের অন্ত থাকে না সুভাষের। তিনি দেখাতে নিয়ে যান তাদের সে সময়কার সাহিত্য-অভিভাবক বুদ্ধদেব বসুর কাছে। বুদ্ধদেব নিজেও অভিভূত সে-ই কবিতা পড়ে। সেসময় বুদ্ধদেব তাঁর ‘কবিতা’ পত্রিকা  বের করছেন, ১৯৩৫ থেকে। সেখানে কবিতা প্রকাশিত হলে কবিরা জাতে উঠতেন বলে মনে করা হতো। বুদ্ধদেব-সমসাময়িক কবিরা লিখতেন সেখানে, পরবর্তীরাও। সেখানে যে বালক বীরের বেশে সুকান্তেরও স্থানলাভ ঘটবে,  এবং তা দুবার, এই তথ্যটিই কি সুকান্ত-প্রতিভার দিকনির্দেশক নয় ? আর এর আগেই যে তিনি, মাত্র নয় বছরে আকাশবাণী কলকাতা থেকে (তখন আকাশবাণী নামকরণ হয় নি) ‘গল্পদাদুর আসর’-এ রবীন্দ্র কবিতা আবৃত্তি করছেন। অর্থাৎ আবৃত্তিকারও ছিলেন তিনি! রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের দিনটিতে নিজের লেখা কবিতা পড়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন বিশ্বকবিকে (উল্লেখ্য, সেদিন কাজী নজরুল ইসলামও কলকাতা বেতারে কবিতা ও গানে শ্রদ্ধা জানান রবীন্দ্রনাথকে। কৌতূহল হয় জানতে, দুজনের মোলাকাত হয়েছিল কখনো ? সুকান্তর কবিতা নজরুল পড়েছেন কখনো ? সুকান্ত নজরুলের কবিতা পড়েছেন, আর তার প্রবন্ধে নজরুলের নাম উল্লেখ করেছেন, যথাস্থানে তা আমরা দেখাব)। কিশোর সুকান্তর লেখা গান পর্যন্ত কলকাতা বেতার থেকে সেসময় প্রচারিত হয়েছে। সে-গানে সুর দিয়েছেন পঙ্কজ কুমার মল্লিকের মতো বিখ্যাত গায়ক-সুরকার। হ্যাঁ, কিশোর বয়স থেকেই সুকান্ত গীতিকার। তাঁর সংগীতপ্রীতির বর্ণনা দিয়েছেন সুকান্তের অনুজ অধ্যাপক অশোক ভট্টাচার্য, সুকান্তর ওপর কলকাতা দূরদর্শন যে তথ্যচিত্র নির্মাণ করে, সেখানে। অশোক জানিয়েছেন (সেটা বুদ্ধদেব বসুও লিখেছেন), সুকান্ত এক কানে কম শুনতেন। রেডিওতে কান লাগিয়ে গভীর মনোযোগে দিনের পর দিন গান শুনতে দেখেছেন তিনি তার  অগ্রজকে।
তা ছাড়া এই বিস্ময়বালক মাত্র এগারো বছর বয়সেই গীতিনাট্য পর্যন্ত লিখে ফেলেছেন! তুমুল বার্তাবহ সে গীতিনাট্যটির নাম ‘রাখাল ছেলে’। রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুলও লিখেছেন, তবে এ বয়সে কিন্তু নয়। আর সে গীতিনাট্য যে নিতান্ত হেলাফেলার, তা কিন্তু নয়। কেননা আজকের দিনেও মঞ্চে, দূরদর্শনে তা প্রচারিত হয়। এটির সঙ্গে জসীমউদ্দীনের ‘রাখাল ছেলে’ কবিতাটি গুলিয়ে ফেললে চলবে না, যে বিখ্যাত কবিতাটি শুরু হয়েছে ‘রাখাল ছেলে, রাখাল ছেলে, বারেক ফিরে চাও/ বাঁকা গাঁয়ের পথটি বেয়ে কোথায় চলে যাও ?’
সুকান্তর এই ক্ষুদ্র গীতিনাট্যটির দুটি বৈশিষ্ট্য বিবেচনাযোগ্য। এক, প্রাচীন ভারতে বিষ্ণুশর্মার শিশু-কিশোরপাঠ্য লেখা ‘পঞ্চতন্ত্র’-তে যেরকম মানুষ ও পশুপাখিকে চরিত্ররূপে পাই, এখানেও ঠিক তেমনি। এখানেও রাখালের সঙ্গে দোয়েল পাখি, হরিণও চরিত্র। সুকান্তদের বাড়ি সংস্কৃতচর্চার জন্য খ্যাত ছিল। তাঁর পিতা, জ্যাঠামশাই ও পূর্বপুরুষ এসব চর্চা করতেন। এর প্রভাবেই হয়তো এমন লেখা সম্ভব হয়েছে সুকান্তর। তাঁর লেখায় তৎসম শব্দের আশ্চর্য সুন্দর ব্যবহারও এ কথার সাক্ষ্য দেবে। তা ছাড়া এই গীতিনাট্যের গঠনে মৈমনসিংহগীতিকার আশ্চর্য সাযুজ্য রয়েছে। এ কি শৈশবে মায়ের কাছ থেকে শোনা রূপকথা-পরণকথার প্রভাবজাত ? সম্ভবত তাই।
সুকান্ত : এক অনন্য, শাশ্বত কবিপ্রতিভা
সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকি উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারে নি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিকও আবার, যে সবার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল। চিঠিপত্র, আমরা জানি, কখনো কখনো সাহিত্যের অনুপম আধার হয়ে দেখা দেয়। দিয়েছিল টলস্টয়, জন কীটস, মধুসূদন,রবীন্দ্রনাথ, কাফকার বিপুল পত্রাচারে। তাঁদের চিঠি লেখার বিপুলতার পাশে এ পর্যায়ে প্রাপ্ত সুকান্তর লেখা ৪৯টি চিঠির সিংহভাগই সেই অমরতা ও মাধুর্যের দাবিদার।
তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি কবি। অঙ্কে কাঁচা ছিলেন বলে ম্যাট্রিক পাশ করতে পারেন নি, অথচ সেই কবে থেকেই না নির্ম্যাট্রিক রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের মতো সুকান্তর কবিতাও ম্যাট্রিকে পাঠ্য হয়ে আসছে। তাঁকে নিয়ে দেশে-বিদেশে গবেষণা হচ্ছে, আবৃত্তিতে মুখরিত হচ্ছেন কণ্ঠশিল্পীরা,  তাঁর কবিতার গীতিরূপ দিচ্ছেন সলিল ঢৌধুরীর মতো কিংবদন্তি গীতিকার, গাইছেন দেবব্রত-হেমন্ত! সে গান ব্যবহৃত হচ্ছে ঋত্বিক ঘটক-নির্মিত চলচ্চিত্রে।
আমরা এখন সুকান্তর কবিসত্তার স্বরূপ অনুসন্ধানে প্রয়াসী হব।
সুকান্তর কবিতাকে কয়েকটি স্পষ্ট ভাগে ভাগ করা সম্ভব। বিদ্রোহ, স্বদেশচেতনা, আশাবাদ, প্রকৃতিপ্রেম, সমসাময়িকতা, আন্তর্জাতিকতা, হাস্যরস ও বিবিধ। আমরা একে একে এগুলোর পরিচয় নেব।


বিদ্রোহ
সুকান্তর কবিতায় বাস্তব আর রূপকে বিদ্রোহের বার্তা। তিনি জন্মেছেন পরাধীন ভারতে। ১৫ আগস্ট। তারিখটি ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির। অথচ কী বেদনার কথা, দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন মাস আগে মৃত্যু হলো তাঁর! দেশপ্রেম ও তার পাশাপাশি কমিউনিজমে বিশ্বাসী (১৯৪৪-এ তিনি পার্টিসদস্য হন) সুকান্তর দায়বদ্ধতা ছিল দ্বিবিধ, নিজ দেশের স্বাধীনতা ও বিশ্বে সাম্যবাদকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা। এজন্যই ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি’, এহেন উক্তি তাঁর। পৃথিবীকে, কেবল নিজ দেশকে নয়।
পুঁজিবাদ, মুনাফালোভী মানুষ আর শোষকরাও কবির ক্রোধের শিকার এজন্য। ‘আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই/ স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবই’, এমন রুদ্র চণ্ডালের মতো ভাষা এসেছে তার  সাম্যবাদের প্রতি বিশ্বাস থেকেই। তাঁর সময়কালে একদিকে ফ্যাসিবাদ, অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হিটলারের রাশিয়া আক্রমণ, দেশব্যাপী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন, কলকাতার বুকে জাপানি বিমানের আক্রমণ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, একের পর এক ইতিহাসের ক্রুর অধ্যায় তাঁর জ্বালামুখ খুলে দিয়েছে, আর সুকান্ত তারই দিনপঞ্জিকা লিখে চলেছেন। ‘আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি’ তাঁর কাব্যবিলাসিতা নয়, বা ‘এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম’ নয় কোনো মোহন পদাবলী। এর মাহাত্ম্য ও যন্ত্রণা তিলে তিলে উপলব্ধি করতে হয়েছে তাঁকে। মনে করা যাক ‘সিগারেট’ কবিতার কয়েকটি লাইন, ‘তোমাদের শোষণের টানে আমরা ছাই হই;/ তোমরা নিবিড় হও আরামের উত্তাপে।/ তোমাদের আরাম:আমাদের মৃত্যু’। তার-ই জবাব মেলে যেন ‘দেশলাইকাঠি’-তে, ‘আমরা বারবার জ্বলি’। তিনি লিখছেন ‘বিদ্রোহের গান’ কবিতায়, ‘গড়ি, আমরা যে বিদ্রোহ গড়ি,/ ছিঁড়ি দুহাতের শৃঙ্খল ছিঁড়ি,/ মৃত্যুপণ।’ বিদ্রোহও গড়া যায় ? শিল্পনির্মাণ সে-ও ? এখানেই কবির অভিনবত্ব। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আমি যেতে চাই যেখানেই পীড়ন,/ যেখানে ঝলসে উঠবে আমার অসির কিরণ’ (মীমাংসা)।


স্বদেশচেতনা
সুকান্ত ভালোবাসেন বাংলাকে, বৃহদয়তন ভারতকে। ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাঙলাদেশ!’ কী শিহরিত উক্তি তাঁর ! আবার ‘চিরদিনের’ কবিতায় বুনে দিচ্ছেন আবহমান বাংলাকে, ‘এ গ্রামের পাশে মজা নদী বারো মাস/ বর্ষায় আজ বিদ্রোহ বুঝি করে,/ গোয়ালে পাঠায় ইশারা সবুজ ঘাস/ এ গ্রাম নতুন সবুজ ঘাগরা পরে।’ কী অপূর্ব চিত্রকল্প! আর জল আনবার পথে ঘোমটা খুলে কৃষক বধূর থমকে দাঁড়িয়ে ‘ঘোমটা খুলে সে দেখে নেয় কোনোমতে/ সবুজ ফসলে সুবর্ণ যুগ আসে’, ‘অনবদ্য!’ ‘বাঙলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত’, এহেন আপ্তবাক্যের সামনে এসে দাঁড়ালে বাংলাদেশের ইতিহাসে বায়ান্ন আর একাত্তরকে অন্য মাত্রায় পাঠ করা যায়। প্রসঙ্গত, সুকান্তর পূর্বপুরুষ কিন্তু বাংলাদেশের ফরিদপুর, অধুনা গোপালগঞ্জ জেলার ঊনশিয়া গ্রামের।    
বাংলার দুর্ভিক্ষে আহত কবি লেখেন, ‘আমার সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে,/ জমে ভিড় ভ্রষ্ট নীড় নগরে ও গ্রামে,/ দুর্ভিক্ষের জীবন্ত মিছিল,/ প্রত্যেক নিরন্ন গ্রামে বয়ে আনে অনিবার্য মিল।’ কবি তার পরেও আশাবাদী, ‘এদেশে ভান্ডার ভরে দেবে জানি নতুন ইউক্রেন’। উল্লেখ করা যায়, তখন, আর বর্তমানেও যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন শস্য উৎপাদনের প্রাচুর্যে বিশ্বে ‘রুটির ঝুড়ি’ নামে খ্যাত। এই স্তেপভূমির কৃষ্ণ মৃত্তিকা (ঈঐঊজগঙতঊগ) যব, ভুট্টা, সূর্যমুখী তেল উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। দেশপ্রেম নিবিড়ভাবে ধরা পড়েছে তাঁর ‘মণিপুর’ কবিতায়, : ‘এ আকাশ, এ দিগন্ত, এই মাঠ, স্বপ্নের সবুজ ছোঁয়া মাটি,/ সহস্র বছর ধরে একে আমি জানি পরিপাটি,/ জানি এ আমার দেশ অজস্র ঐতিহ্য দিয়ে ঘেরা,/ এখানে আমার রক্তে বেঁচে আছে পূর্বপুরুষেরা’। কবিতাটির  সময়কাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যখন স্বাধীন মণিপুর একদিকে ব্রিটিশ ও অন্যদিকে জাপান ও নেতাজীর আজাদ হিন্দ বাহিনীর লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে। মণিপুর ছিল ব্রিটিশের করদ রাজ্য। ১৯৪৯-এ তা ভারতের অন্তর্গত হয়।


আশাবাদ
একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সুকান্ত তাঁর কবিতা বেদনার অতল থেকে শুরু করে অন্তিমে তাকে পরিণত করেন আশাবাদে। ‘রানার’ কবিতায় তাই দেখি, একের পর এক বিধুরতার ছবি, ‘অনেক দুঃখে, বহু বেদনায়, অভিমানে,অনুরাগে,/ ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে’। তার ‘ঘরেতে অভাব, পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া’, অথবা ‘এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে’। কিন্তু এই নৈরাশ্যের মধ্যেই শেষ হয় নি কবিতাটি, আর সীমিত হয়ে থাকে নি কেবল রানারেই। এর ব্যাপ্তি ও আশাবাদ পেয়েছে আরও বৃহৎ আয়তন: ‘রানার! রানার! সময় হয়েছে নতুন খবর আনার’।
‘অনুভব’ কবিতাটির দুটি ভাগ। ‘১৯৪০’, আর ‘১৯৪৬’। প্রথম ভাগে আছে কেবল বেদনার বাণীরূপ, ‘আমরা যে পরাধীন’, ‘দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো’, ‘দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার’। কিন্তু পরে সুর পালটে গেল, ‘বিদ্রোহ আজ, বিদ্রোহ চারিদিকে’, ‘প্রত্যহ যারা ঘৃণিত ও পদানত,/ দ্যাখো আজ তারা সবেগে সমুদ্যত’। সুকান্ত সূর্যাস্ত দেখে সূর্যোদয়কে আহ্বান জানাতে ভোলেন না।


প্রকৃতিপ্রেম
তাঁর কবিতায় সলমা-চুমকির মতো প্রকৃতির কারুকাজ। কলকাতায় জন্ম ও গোটা জীবন কেটেছে তাঁর। খুব যে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেয়েছেন, তা নয়। তবু বারবার প্রকৃতির সৌন্দর্যে অবগাহন তাঁর। ‘রৌদ্রের গান’ কবিতার সূচনাতেই দেখি প্রকৃতির অপরূপতাকে কী নান্দনিকভাবে ধরা হয়েছে, ‘এখানে সূর্য ছড়ায় অকৃপণ/ দুহাতে তীব্র সোনার মতন মদ,/ যে সোনার মদ পান করে ধানক্ষেত/ দিকে দিকে তার গড়ে তোলে জনপদ’। ‘চিরদিনের’ কবিতায় পাই চিরায়ত প্রকৃতির চিত্র—‘রাত্রি এখানে স্বাগত শাখে/কিষাণকে ঘরে পাঠায় যে আলপথ’, বা ‘এখানে সকাল ঘোষিত পাখির গানে/ কামার, কুমোর, তাঁতি তার কাজে জোটে'। ‘দিনের নীলাভ শেষ আলো/ জানালো আসন্ন রাত্রি দুর্লক্ষ্য সঙ্কেতে’ ( ‘দিক্ প্রান্তে’)। ‘কাশ্মীর’ কবিতায় কী অপরূপ কালিদাসীয় চিত্রকল্প, ‘রোদকে ডেকেছে নন্দনবন পৃথিবীর’। এই কবিতাতেই কাশ্মীরে তুষারপাত কবির চোখে দেখা দিচ্ছে, ‘গলে গলে পড়ছে জীবনের স্পন্দন ‘-এর মতো! প্রকৃতির অনুভব কখনোবা অভিমানীও করে তোলে তাকে, ‘কে আর মনে রাখে নবান্নের দিনে কাটা ধানের গুচ্ছকে ?’
প্রকৃতির অনন্যতার মধ্যে তিনি যখন রূপকের অভিনবতায় বিপ্লবের আবাহনী নিয়ে আসেন, তখন তাঁর কবিত্বকে বাহবা জানাতেই হয়, ‘হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন/জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান’!


সমসাময়িকতা
তাঁর কবিতা সময়কে নিপুণভাবে ধরেছে। আধুনিকতার প্রাক্ শর্ত এটি। বারবার দেশের অন্তর্গত বেদনার কথা ঠাঁই পেয়েছে যেমন, তেমনি যুদ্ধপীড়িত পৃথিবীর কথা। সোমেন চন্দ আততায়ীর হাতে নিহত হলে তিনি যেমন ‘ছুরি’ লিখে দায়বদ্ধতা পালন করেন, তেমনি গান্ধী, লেনিন (‘বিপ্লবস্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন’), মার্শাল টিটো তাঁর কবিতায় উপস্থিত। তেমনি পয়লা মে, রোম ১৯৪৩, চট্টগ্রাম, ল্যাঙস্টন হিউজ স্মরণেও কবিতা আছে। জীবনকে সামগ্রিক পরিসরে অবলোকন, ওইটুকু বয়সে, ভাবা যায়!


আন্তর্জাতিকতা
কলকাতার এক নিতান্ত নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মে অনুবাদ করেছেন ভি. বিয়াঙ্কির শিশুসাহিত্য পাঠ ও তা থেকে অনুবাদ (‘লেজের কাহিনী’), বা তাঁর সময়কার বিশ্বের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিজ করপুটে রাখা, কবিতায় সেসবের প্রতিফলন ঘটানো, তাঁর কবিতায় বিদেশের অহরহ অনুষঙ্গ প্রমাণ করে, তিনি আন্তর্জাতিকতাকে কী প্রখরভাবে হৃদগত করে নিয়েছিলেন। অনুবাদ করেন ল্যাঙ্সটন হিউজের কবিতাও, ‘মজুরদের ঝড়’ নাম দিয়ে।


হাস্যরস
সুকান্তের লেখায় হাস্যরসের স্থানও রয়েছে, বিশেষ করে তাঁর শিশুতোষ রচনায়, যা তাঁর ‘মিঠেকড়া’ বইয়ে লভ্য। ‘ভেজাল’ কবিতায় পাই, ‘খাঁটি জিনিস এই কথাটি রেখো না আর চিত্তে,/ ভেজাল নামটা খাঁটি কেবল, আর সকলি মিথ্যে’। ‘মেয়েদের পদবি’  কবিতাটি হাস্যরসের আর এক উদাহরণ, ‘... ‘নাগ’ যদি ‘নাগা’ হয়, ‘সেন’ হয় ‘সেনা’,/ বড়ই কঠিন হবে মেয়েদের চেনা।’
বন্ধু অরুণাচল বসুকে লেখা চিঠির বহুস্থানে সুকান্তর রসিকতাবোধ ঝলসে ওঠে। চিঠিতে কখনো তাকে সম্বোধন করছেন, ‘সবুরে মেওয়াফল দাতাষু' বলে, কখনো আবার ‘প্রভূতআনন্দদায়কেষু’, বা ‘আশানুরূপেষু’, ‘শ্রী শ্রী’ ১০৮ অর্ণব স্বামী’, ‘প্রিয় বয়স্য’। রসিকতাবোধ ছিল সুকান্তর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

গান, গীতিনাট্য ও গল্প
সুকান্ত তাঁর স্বল্পপরিসর জীবনে কিছু গানও লিখে গেছেন। এ গান তাঁর নিভৃত প্রাণের দেবতা। শ্রাবণে জাত কবির একটি গান, ‘এই নিবিড় বাদল দিনে/ কে নেবে আমায় চিনে/ জানিনে তা।/ এ নব ঘন ঘোরে/ কে ডেকে নেবে মোরে/ কে দেবে হৃদয় কিনে/ উদাসচেতা’। অন্যত্র ‘কোন অভিশাপ নিয়ে এল এই/ বিরহ-বিধুর আষাঢ়/ এখানে বুঝি বা শেষ হয়ে গেছে/ উচ্ছল ভালোবাসার’। বেদনার সাথী পরের গানটি, ‘ফুল ঝরে যায় যৌবন চলে যায়/ বারবার তারা ‘ভালোবাসো’ বলে যায়/ তারপর কাটে বিরহে/শূন্য শাখায় কী রহে/ সে কথা শুধায় কোন মন...’। সূচনা হয়েছিল গীতিকারের, কিন্তু পূর্ণতা পেল না! এমন করেই তো বেরিয়েছিল তবু, ‘গানের সাগর পাড়ি দিলাম/ সুরের তরঙ্গে,/ প্রাণ ছুটেছে নিরুদ্দেশে/ ভাবের তুরঙ্গে’।
        একাধিক গীতিনাট্য লিখে গেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের পরে তিনি-ই এই ধারাটিকে ধরে রাখায় যত্ন নেন। তাঁর ‘সূর্যপ্রণাম’ তো রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা গীতিনাট্য। কবিকে নিয়ে চারটি কবিতা আছে সুকান্তর, তাঁর লেখার বহুস্থলে রবীন্দ্র-উদ্ধৃতি রয়েছে। তাঁর হাতের লেখাটিও রবীন্দ্রনাথকে মকশো করে রাবীন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল।
তাঁর অন্য গীতিনাট্যের নাম ‘অভিযান’। গীতিনাট্য দুটি এখনো বহু জায়গায় মঞ্চায়িত হয়। ‘রাখাল ছেলে’-র কথা তো আগেই বলা হয়েছে। তা ছাড়াও আছে তাঁর গল্প ‘দেবতাদের ভয়’, যেটি কলকাতা দূরদর্শনে গীতিনাট্য আকারে পরিবেশিত হয়েছিল।


সুকান্তর প্রবন্ধ
মাত্র একটিই প্রবন্ধ পেয়েছি তাঁর, ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’। এটি বেরিয়েছিল সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার-সম্পাদিত ‘অরণি’-তে, ২৫.০২.১৯৪৪-এ। সেই বয়সেই এমন প্রবন্ধ লেখার যোগ্যতা তাঁর ছন্দজ্ঞান ও আবৃত্তিশিল্প নিয়ে পরিপক্বতার পরিচয়বাহী। এখানে তিনি বিহারীলাল, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত,কাজী নজরুল ইসলাম থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অমিয় চক্রবর্তী, বিমলচন্দ্র ঘোষ, অন্নদাশঙ্কর, সুধীন্দ্রনাথ বুদ্ধদেব বসুর  ছন্দ নিয়ে আলোকপাত করেছেন। এ বয়সেই তাঁর কবিতাপাঠ যে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, এতেই তা প্রমাণিত। তাঁর আশাবাদ, ‘একথা যেন ভাবতে না হয় রবীন্দ্রনাথের পরে কারও কাছে আর কিছু আশা করবার নেই’। 
আর আবৃত্তি ? এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথকেও তো স্বতন্ত্র প্রবন্ধ লিখতে দেখি না! সুকান্ত কি এক্ষেত্রে অগ্রদূত ?  কান তৈরির জন্য তিনি রবীন্দ্রনাথ ও সুকুমার রায়ের ছড়া আবৃত্তি করতে উপদেশ দিচ্ছেন। আবৃত্তি নিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা পাই এখানে—‘সিনেমায় যদি নায়ক-নায়িকা বিশেষ মুহূর্তে দুচার লাইন রবীন্দ্রনাথের বা নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করে তাহলে কি রসভঙ্গ হবে ?’ সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর  সঙসার’-এ অপুর মুখে রবীন্দ্রকবিতা শোনা গিয়েছে।


আকাল
এটি আঠারোজন কবির পঞ্চাশের মন্বন্তর নিয়ে লেখা কবিতার সংকলন। বইটির প্রচ্ছদ সত্যজিৎ রায়-কৃত। আঠারো বছর বয়সী সম্পাদক সুকান্ত ভূমিকায় জানাচ্ছেন, ‘তেরো শ পঞ্চাশ কেবল ইতিহাসের একটা সাল নয়, নিজেই একটা স্বতন্ত্র ইতিহাস।’ সময়োপযোগী সংকলনটি একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়ে আছে।
      
চিঠিপত্রের সুকান্ত
তাঁর চিঠির পরিমাণ কম, কিন্তু গুরুত্বে বিশাল। এসব চিঠিতে ধরা দিয়েছেন প্রকৃত সুকান্ত, তাঁর প্রেম, প্রকৃতিচেতনা, ভাষার ওপর দখল, ভ্রমণ বার্তা, রসবোধ সমেত। সুকান্ত-জীবনের সমান্তরাল পাঠ যেন এগুলি।
দুজন নারী এসেছিল তাঁর জীবনে। বন্ধু অরুণাচলকে লেখা চিঠিতে একজনের নাম পাই, উপক্রমণিকা। ছদ্মনাম। পনেরো বছরের কিশোর লিখছেন, ‘উপক্রমণিকা ভরিয়ে তুলল আমাকে তার তীব্র শারীরিকতায়।...আমার মনের অন্ধকারে ফুটে উঠেছিল একটি রৌদ্রময় ফুল’। এ প্রেম অচিরেই শেষ হয়ে অন্য এক নারীতে বর্তায়, যে উপক্রমণিকার ‘অন্তরঙ্গ বন্ধু’। ‘একত্রে আহার করতাম,...রাত্রেও পাশাপাশি শুয়ে ঘুমোতাম...তারপর গত দু’বছর আস্তে আস্তে যা গড়ে উঠেছে, সে ওর প্রতি আমার প্রেম।...এখন...কেই সম্পুর্ণ ভালোবাসছি।’ এরপর আরেক চিঠিতে,কলকাতার রাস্তায় দুজনের হাঁটা, তার বর্ণনান্তে, ‘ওর পাশে চলে, ওর এত কাছে থেকে, যে আনন্দ আমি সেদিন পেয়েছি, তা আমার বাকি জীবনে পাথেয় হয়ে থাকল।’ এর আসল বা ছদ্ম, কোনো  নামই চিঠিতে উল্লিখিত হয় নি।
তিনি রাঁচি আর বেনারসে বেড়াতে যান। চিঠিতে সে প্রসঙ্গে, ‘জোছনা যে দেখেছে, তার ছোটনাগপুর আসা সার্থক’। বৃষ্টি ‘ক্ষীণস্রোতা সুবর্ণরেখার বুকে এনে দিয়েছে যৌবন’। কাশীর কথা: ‘কাশীর গঙ্গা ও উপাসনার মতো স্তব্ধ তার পরপার, এ দুটোই উপভোগ্য।...সবচেয়ে ভালো লাগল সারনাথ। তার ঐতিহাসিকতায়, তার নির্জনতায়, তার স্থাপত্যে আর ভাস্কর্যে, তার ইটপাথরে খোদিত কর্মগাথায় সে মহিমাময়।’ তিনি চট্টগ্রামেও গিয়েছিলেন, যদিও চিঠিতে সেকথা নেই। তবে কলকাতা ছিল তাঁর আদি ও অকৃত্রিম প্রেম, ‘কলকাতাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, একটা রহস্যময় নারীর মতো, ...প্রিয়ার মতো, মায়ের মতো’।
তাঁর চিঠি পড়েই জানতে পারি, ম্যালেরিয়া হয়েছিল সুকান্তর। জানি কলকাতায় জাপানি বোমা পড়ার কথা, তাঁর গোপন ইচ্ছের কথা, ‘...আমি কোথাও চলে যেতে চাই, নিরুদ্দেশ হয়ে মিলিয়ে যেতে চাই...কোনো গহন অরণ্যে কিংবা অন্য যে-কোনো নিভৃততম প্রদেশে; যেখানে কোনো মানুষ নেই, আছে কেবল সূর্যের আলোর মতো হিংস্র আর নিরীহ জীবেরা, আর অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ।’ সত্যি, এ এক অন্য সুকান্ত!
তাঁর মৃত্যুশয্যায় সুকান্তকে দেখতে এসেছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযানের বিপ্লবীরা। আনন্দের আতিশয্যে তিনি বন্ধু ভূপেনকে লেখেন, ‘মুক্ত বিপ্লবীরা সদলবলে সবাই আমার এখানে এসেছিলেন।...ফ্রান্সে আর আমেরিকায় আমার জীবনী বেরুবে যেদিন শুনলাম সেদিনও এত সার্থক মনে হয় নি আমার এই রোগজীর্ণ অশিক্ষিত শরীরকে...১১ সেপ্টেম্বরের এই সন্ধ্যা আমার কাছে অবিস্মরণীয়’।
তাঁকে চিকিৎসার জন্য আজমীরে নিয়ে যাওয়ার কথা হচ্ছিল, সুকান্তর চিঠি পড়ে জানতে পারি আমরা। কিন্তু তার আর অবসর মেলে নি।
কীটস, চেকভ, কাফকা, এমিলি ব্রন্টি থেকে মধ্যযুগে ফ্রান্সের রাজা নবম চার্লস ও ইংরেজরাজ সপ্তম হেনরির মতোই যক্ষ্মায় মৃত্যু হলো সুকান্তর। 
তবুও তিনি অমর, জীবিতকালেই রুশ ভাষায় অনুবাদ করেন যাঁকে কামাক্ষীপ্রসাদ, পরে অরুণ সোম। ইংরেজিতে অধ্যাপক অমিতেন্দু ভট্টাচার্য, কিরীটী সেনগুপ্ত, রাহাদ আবীর, রিনি ভট্টাচার্য, ক্ষিতীশ রায়, অপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়, বন্ধু অরুণাচল।
১৯৬০-এ ঢাকাতে ‘সুকান্ত একাডেমি’ গড়ে উঠেছিল, লেখক ও বুদ্ধিজীবী সদ্যপ্রয়াত আবুল কাসেম ফজলুল হক ও অন্যদের দ্বারা। ত্রিপুরাতেও তাঁর নামে মিলনায়তন ও প্রেক্ষাগৃহ আছে। অতএব এদেশে জন্মে কেবল পদাঘাতই তিনি পান নি, পেয়েছেন ও পাবেন আরও বহু কিছু। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজ পুত্রের নাম রাখেন সুকান্ত, তাকে নিয়ে কবিতা লেখেন, ‘আমরা চাঁদা তুলে মারব কীট,/ কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা!’ বুদ্ধদেব বসু তাঁর মৃত্যুতে, ‘কবিতা’ পত্রিকায় ছয় পৃষ্ঠা শোকবার্তা লেখেন। লেখেন, ‘গরকির মতো, তার চেহারাই যেন চিরাচরিতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।...হাসিটি মধুর, ঠোঁট দুটি সরল।...কবি হওয়ার জন্যই জন্মেছিল সুকান্ত, কবি হতে পারার আগেই তার মৃত্যু হলো।’ না, কবি হয়েই মৃত্যু হয়েছে সুকান্তর।
 

Leave a Reply

Your identity will not be published.