আগামী ৩ সেপ্টেম্বর উত্তমকুমারের জন্মশতবার্ষিকী। ১৯২৬ সালের এই দিনে তিনি প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেন। তিনি ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু আজও উত্তম বাঙালির প্রিয় নায়ক। যদিও তিনি ‘এলাম দেখলাম জয় করলাম’ এ দলের লোক ছিলেন না। প্রচণ্ড পরিশ্রম এবং কঠিন অনুশীলনের দরুনই সাফল্য তাঁর হাতে ধরা দিয়েছিল।
মহানায়ক উত্তমকুমারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অন্যদিন-এর এবারের প্রচ্ছদ রচনা। লিখেছেন মোমিন রহমান।
বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক—উত্তমকুমার। জীবদ্দশায় তাকে ‘মহানায়ক’, ‘গুরু’, ‘রাজা’ প্রভৃতি বিশেষণে ভূষিত করা হয়। কিন্তু সাফল্য হঠাৎ হাতের মুঠোয় আসে নি; ‘এলাম দেখলাম জয় করলাম’—এই দলের লোক উত্তম নন। বলা যায়, বড় অভিনেতা হওয়ার জন্য উত্তমকে প্রচণ্ড পরিশ্রম, কঠোর অনুশীলন করতে হয়েছে। দিনের পর দিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে করেছেন ফেসিয়াল এক্সারসাইজ। কোন কোন দৃশ্যে কেমন কেমন মুভমেন্ট হবে তা নিয়ে ভেবেছেন, দীর্ঘ সময় অনুশীলন করেছেন। যখন এক-একটা স্ক্রিপ্ট শুনতেন, তখনই ভেতরে ভেতরে শুরু হতো সেই চরিত্রে পারফরম করার প্রক্রিয়া। এভাবে অভাব অপমান অনিশ্চিয়তায় ঘষতে ঘষতে, অভিজ্ঞ হতে হতে, অভিনয় শিখতে শিখতে তিনি শীর্ষবিন্দুতে উঠে আসেন। দীর্ঘ তিন দশক একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন টালিগঞ্জকেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রশিল্পে। নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা তাঁর জীবন যেন এক রোমাঞ্চকর উপন্যাস—যার পাতায় পাতায় বৈচিত্র্যের ছোঁয়া।
একবিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের মাঝামাঝিতে দাঁড়িয়ে আমরা একটু পিছনের দিকে তাকাই, উত্তমকুমারের বণাঢ্য জীবনের ওপর দৃষ্টিপাত করি।

ভবানীপুরের সেই ছেলেটি
উত্তমের জন্ম কলকাতায়, ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বরে, আহেরীটোলা স্ট্রীটে, মামার বাড়িতে। জন্ম সময় সকাল ১০:১৫ মিনিট। তাঁর দাদামশাই (উত্তমের মায়ের বাবা) যখন তাঁকে দেখেন তখন তিনি নাকি তার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসেছিলেন। আর সেটা দেখেই দাদামশাই নামকরণ করেন উত্তম। উত্তমের পোশাকি নাম অবশ্য অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বাবা সাতকড়ি চট্টেপাধ্যায়। মা চপলা দেবী। উত্তমের পৈতৃক বাসস্থান কলকাতার ভবানীপুরে। এখনকার গিরিশ মুখার্জী রোডের ৪৬-এ নম্বর বাড়িটি তাঁদের। এই বাড়িতেই পুতুল, অরুণ, বরুণ, তরুণ—চার ভাইবোনের শৈশব কেটেছে (বড় বোন পুতুল অবশ্য অল্প বয়সেই মারা যায়)।
উত্তমের শৈশব ছিল অন্য আর দশজন মধ্যবিত্ত যৌথ পরিবারের ছেলেদের মতোই। পুতুলদি আর ভাইদের নিয়ে খেলাধুলা, দুষ্টুমিতে মেতে থাকা, বাবা-মাকে প্রচণ্ড ভয় পাওয়া।
শৈশবে উত্তমের পড়াশোনা শুরু হয় চক্রবেড়িয়া হাইস্কুলে। এই স্কুলে পড়ার সময়েই প্রথম প্রকাশ্যে অভিনয় করেন শখের থিয়েটার নাটক ‘মুকুট’-এ। আর স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে দশ বছর বয়সে নাটক করেন 'গয়াসুর'। এই অভিনয়েই প্রথম মেডেল পান। ক্লাস এইটের পর উত্তম ভর্তি হন সাউথ সুবারবণ মেইন স্কুলে। এখানে পড়তে পড়তে ভবানীপুর সুইমিং এসোসিয়েশনের সভ্য হিসেবে সাঁতার কাটতেন পদ্মপুকুরে। ফ্রি স্টাইল সাঁতার। এক্ষেত্রে অনেকবার চ্যাম্পিয়ান হয়ে কাপ, মেডেল পেয়েছেন। তা ছাড়া কুস্তি লড়া, ব্যাডমিন্টন-ফুটবল খেলাতেও উত্তমের ছিল অগ্রণী ভূমিকা। অবশ্য পড়াশোনায় উত্তম একেবারেই ছিলেন সাধারণ, যদিও কখনোই ফেল করেন নি। ছেলেবেলা থেকেই উত্তমের রক্তে নাটক আর গানের নেশা। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময় উত্তমের নেতৃত্বে তাঁর পাড়াতে বের হতো স্বদেশী প্রভাতফেরী। সেই সময়ে নিজের লেখা গান নিজের সুরে গাইতেন উত্তম।
মেট্রিক পরীক্ষার পরে টানা তিন মাসের ছুটিতে বাড়িতে বসে সংগীতচর্চা করেন। পাশাপাশি অ্যামেচার থিয়েটারের নেশায় মেতে একের পর এক নাটক মহড়া দিয়ে মঞ্চস্থ করতে থাকেন বিপুল উদ্যমে। ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে উত্তম কমার্স পড়তে ভর্তি হন গভরমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজে। এই সময়ে আর্থিক কারণে চাকরির সন্ধানেও তাঁকে ব্যস্ত দেখা যায়। অবশেষে ১৯৪৬-এ মেজ মামা গৌরীশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের সূত্রে পোর্ট কমিশনারস অফিসে খিদিরপুর ডকে দু শ পঁচাত্তর টাকা মাইনের ক্যাশিয়ারের চাকরি জোটে। জীবনসংগ্রামের এই কঠিন সময়ে চক্রবেরিয়া (সাউথ) ‘মনোরমা’ স্কুলে গানের শিক্ষকতাও করেন উত্তম।

চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ
পোর্ট কমিশনারের চাকরিতে উত্তমের মন বসে না। তিনি দশটা-পঁাঁচটার নিয়মানুবর্তিতার প্রতি বীতস্পৃহ হয়ে ওঠেন। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের চেষ্টা করতে থাকেন। পাড়ার থিয়েটার ক্লাবের পরিচিত ভদ্রলোক গণেশ ব্যানার্জীর সূত্রে উত্তম ১৯৪৭ সালে অভিনয় করেন ‘মায়াডোর’ (ছবিটি মুক্তি পায় নি) হিন্দি ছবিতে। এই ছবির জন্য ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওতে পাঁচ দিনের কাজ করেছিলেন। পারিশ্রমিক দৈনিক পাঁচ সিকি। প্রথমদিনের দৃশ্যটি ছিল এরকম—বর সেজে বিয়ে করতে বসেছেন তিনি, তাঁকে মেরে বিয়ের আসর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
‘মায়াডোর’-এর পরে উত্তম ওরফে অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেন ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে—নায়ক অসিত বরণের ছোটবেলার চরিত্রে। এরপরে ‘ওরে যাত্রী’ ছবিতে জীবনে প্রথম বড় ভূমিকায় (একজন আর্মি অফিসারের চরিত্র) অভিনয়ের সুযোগ পান উত্তম। পরের বছর এল আরও বড় সুযোগ—‘কামনা’ ছবির নায়ক চরিত্রে অভিনয়ের। কিন্তু ‘কামনা’ ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হলো। ফলে পরবর্তী ছবি পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হলো। অবশেষে পাওয়া গেল ‘মর্যাদা’ ছবির নায়কের রোল। অরুণ কুমারের স্থলে নতুন নামকরণ হলো অরূপ কুমার। কিন্তু ‘মর্যাদা’ও ফ্লপ হলো। স্টুডিও পাড়ায় অরুণের (উত্তম) তখন ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ হিসেবে বদনাম জুটে গেছে। এরই মধ্যে এমপি প্রোডাকশন্সের এক্সক্লুসিভ আর্টিস্ট হিসেবে যোগ দিলেন। মাসে পাঁচ শ’ টাকায় চুক্তি হলো। পোর্ট কমিশনারসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরিভাবে চলচ্চিত্রে আত্মনিয়োগ করলেন। এমপি’রই ‘সহযাত্রী’ ছবিতে আবার নামের পরিবর্তন হলো, ডাকনাম ‘উত্তম’-ই টাইটেলে গেল। সেই থেকে উত্তমকুমারের জন্ম হলো। উল্লেখ্য, ‘সহযাত্রী’ ছবিতে উত্তমের কিছুটা খ্যাতি জুটেছিল, কিন্তু তা স্থায়ী হয় নি। কেননা পরপর তিনটি ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে।
বসু পরিবার থেকে অগ্নিপরীক্ষা
অভিনেতা হিসেবে প্রথম উত্তমকুমার স্বীকৃতি পেলেন নির্মল দে পরিচালিত ‘বসু পরিবার’ ছবিতে। এই ফ্যামিলি ড্রামাতে বড়ভাইয়ের চরিত্রে উত্তমের অভিনয় সমালোচকের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। পত্রিকায় লেখা হলো : “সুখেনের ভূমিকায় উত্তমকুমার মনে ধরার মতো অভিনয় করেছেন।” বলা যায়, উত্তমের জীবনে ‘বসু পরিবার’ একটি মাইলস্টোন। এরপরের ছবি ‘কার পাপে ?’ এটি উত্তমের কেরিয়ারে নতুন কিছু সংযোজন করে না। তবে তাঁর পরের ছবি নির্মল দের ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ উত্তম-সুচিত্রা প্রথম রোমান্টিক জুটি হিসেবে কিছুটা খ্যাতি কুড়ায়। অবশ্য ‘লাখ টাকা’ ও ‘নবীন যাত্রা’ (১৯৫৩)-তে অভিনেতা হিসেবে উত্তমের কিছু করণীয় ছিল না। তবে নরেশ মিত্র’র ‘বৌ ঠাকুরানীর হাট’ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের এই চলচ্চিত্ররূপটির পর উত্তমের অভিনয়ের ধারা পাল্টে যায়।
১৯৫৪ সালের প্রথমার্ধ্বে মুক্তি পায়—ওরা থাকে ওধারে, চাঁপাডাঙার বৌ, কল্যাণী, সদানন্দের মেলা এবং অন্নপূর্ণার মন্দির। এই পাঁচটি ছবির মধ্যে তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ ‘চাঁপাডাঙার বৌ’-এ মহাতপ চরিত্রে উত্তমের অভিনয় সবার মনে দাগ কাটে। বলা যায়, চরিত্রের সহজ-সরল গ্রাম্য স্বভাবটা অতি স্বচ্ছন্দে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। তবে উত্তমের জয়যাত্রা শুরু হয় সত্যিকার অর্থে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ থেকে। অগ্রদূত ওরফে বিভূতি লাহা পরিচালিত এ ছবি মুক্তি পাওয়ার পর থেকে উত্তম-সুচিত্রা জুটি দারুণ সাড়া ফেলে। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের মূলধারার চলচ্চিত্রে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা সেই সময় গ্ল্যামারহীন বাংলা চলচ্চিত্রে দর্শকরা কোনো আকর্ষণ খুঁজে না পেয়ে হিন্দি ছবির দিকে ঝুঁকেছিল। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ দর্শককে আবার বাংলা ছবির প্রতি আগ্রহী করে তোলে। এ প্রসঙ্গে সেবাব্রত গুপ্ত’র মূল্যায়ন : “ফিল্মস্টারের ইমেজ দর্শকের খুবই প্রিয়। সব মানুষের মনেই কোনো না কোনো অপূর্ণ বাসনা থাকে। অনেক কিছুই মানুষের কাছে অপ্রাপ্য ও দুর্লভ থেকে যায়। ফিল্মের স্টারের মধ্যে তার চেহারা, ব্যক্তিত্ব, কাজকর্ম, বীরত্ব ও প্রেমের মধ্যে দর্শক তার না পাওয়া বস্তুগুলো পেয়ে যায়। এই কারণে স্টার তার এত প্রিয়, তার ‘আইডল’। ‘অগ্নিপরীক্ষার’-র মাধ্যমে দুজন বড় স্টার হলেন। বাংলা ছবির প্রতি দর্শকের আগ্রহ আবার ফিরে এল। বাংলা ছবির দিকে আবার তারা মুখ ফেরালেন।”

মঞ্চাভিনেতা
১৯৫৩ সালে পুজোর সময় উত্তমকুমার ‘শ্যামলী’ নাটকের নায়করূপে স্টার থিয়েটারে যোগ দেন। তারপর দুই বছর দুই মাস তিনি এ নাটকে অভিনয় করেন। শ্যামলী চলাকালীন শেষের দিকে তিনি চলচ্চিত্রের কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়ায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকে মঞ্চাভিনয় থেকে সরে আসতে হয়। উল্লেখ্য, ‘শ্যামলী’ নাটকে উত্তমকুমারের অভিনয় দেখে ইংল্যান্ডের খ্যাতনামা অভিনেতা দম্পতি স্যার জন লুইস কেসন্ এবং ডেম সিরিল থ্রন্ডাইন ভূয়সী প্রশংসা করেন। ‘দেশ’ পত্রিকার সমালোচক লেখেন: “বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অভিনয় কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন অনিলের ভূমিকায় উত্তমকুমার। নিয়মিতভাবে পেশাদার মঞ্চে অভিনয় করা তার এই প্রথম; সখের দলের হয়ে মাঝে মাঝে মঞ্চে অবতরণ করার অভিজ্ঞতা তার থাকলেও প্রধানত পর্দার অভিনয় নিয়েই তিনি আছেন। কিন্তু এখানে অভিনয়ে তিনি দেখালেন যে, পর্দার চেয়ে মঞ্চাভিনয়েই তিনি বেশি কৃতী” (২১ বর্ষ ১ম সংখ্যা)। উল্লেখ্য, মঞ্চের অভিজ্ঞতা উত্তমের চলচ্চিত্র অভিনয়ে নতুন মাত্রা সংযোজন করে। অভিনেতা হিসেবে তাঁর উত্তরণ ঘটে।
চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের ধারণা, উত্তমকুমার মঞ্চে যদি আরও কিছুকাল অভিনয় করতেন তাহলে মঞ্চেও তিনি হতেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক।
নানা ছবি নানা চরিত্র
উত্তম নায়ক হিসেবে সর্বোত্তম এই কারণে যে তিনি বৃত্তাবদ্ধ অবস্থায় তথা অভিনয়ের কোনো বিশেষ ঢং (কমেডি বা ট্রাজেডি)-এর জন্য বিশিষ্ট নন। তিনি সব ধরনের চরিত্রেই ছিলেন সমানভাবে পারদর্শী। সেটা ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর ভূতনাথ হোক বা এন্টনি ফিরিঙ্গি হোক, ‘বিচারক’-এর অপরাধী মন বিচারক, ‘ধন্যি মেয়ে’-র কৌতুক চরিত্র হোক, কলংকিত নায়ক চরিত্র হোক ‘কলংকিত নায়ক’-এর, ‘স্ত্রী’-র নারী বিলাসী সামন্ততন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণু প্রতীক হোক।
‘হ্রদ’ ছবিতে অভিনয় করে উত্তম প্রশংসিত হন। সমালোচক লিখলেন : “উত্তমকুমার স্মৃতিভ্রষ্ট একটি যুবকের চরিত্রে প্রথম আবির্ভাব থেকেই দর্শক মনে এমন একটা সম্মোহনী প্রভাব বিস্তার করেন যে ছবি খানিকদূর এগিয়ে যাওয়ার পর কোনো দৃশ্যে ওঁকে না পেলে দর্শকমন উদগ্রীব হয়ে ওঠে।”
অজয় ও বিজয়—দুটি বিপরীতধর্মী চরিত্রে যে অপূর্ব অভিনয় ক্ষমতা উত্তম ‘তাসের ঘর’ ছবিতে দেখালেন তাতে ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় লেখা হলো : “উত্তমকুমারই এ ছবির সর্বশ্রেষ্ঠ আকর্ষণ”। উল্লেখ্য, পেশাগত সাফল্যের শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে এক জনপ্রিয় চিত্রাভিনেতার নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতা উপলব্ধির কাহিনি ‘নায়ক’ উত্তমকুমারের চলচ্চিত্র উপযোগী অভিনয়ে সমৃদ্ধ। এ ছবির চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ বায় লিখেছেন : “...‘নায়ক’ লিখেছিলাম খানিকটা উত্তমকুমারের কথা ভেবেই। আমার কাহিনির নায়ক ছিলেন ‘স্টার’। এই ভূমিকায় যদি উত্তম ছাড়া আর কাউকে নিতাম তাহলে লোকে বলত কই, এঁকে তো স্টার হিসাবে দেখি নি। বারো বছর পরে গত শনিবার টিভিতে আবার নায়ক দেখলাম। ছবিতে আমার ত্রুটি নিশ্চয়ই অনেক আছে। কিন্তু উত্তমের কাজে একটিও ত্রুটি কোনোখানে খুঁজে পাওয়া যায় নি।”
‘বিকেলে ভোরের ফুল’-এর মধ্যবয়সী অবিবাহিত ইঞ্জিনিয়ার-কবির চরিত্রে কিংবা ‘যাদুবংশ’-এ গণনাথের চরিত্রে যে আশ্চর্য অভিব্যক্তি তা অবিস্মরণীয়। একইসঙ্গে একটি গভীর মমতাময় ভালোবাসা আবার নির্মোহ নির্লিপ্ততা দর্শকের মনকে দারুণভাবে অভিভূত করে। কিংবা ‘চিড়িয়াখানা’-তে সত্য অনুসন্ধানী ব্যোমকেশ-এর চরিত্র কিংবা ‘নগর দর্পণে’-র নগর সভ্যতার শিকার এক যন্ত্রণাকাতর মানুষের প্রতিচ্ছবি সেলুলয়েডে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এমনিভাবে ‘রৌদ্রছায়া’, ‘বড়দিদি’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘লালপাথর’, ‘এখানে পিঞ্জর’, ‘মৌচাক’, ‘রাজবংশ’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘সব্যসাচী’, ‘অমানুষ’, ‘জীবনজিজ্ঞাসা’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘দুই পৃথিবী’, ‘অগ্নিশ্বর’, ‘যদি জানতেম’, ‘দেবদাস’, ‘কলংকিনী কংকাবতী’, ‘সদানন্দের মেলা’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রে উত্তমকুমারের অভিনয়-প্রতিভার বহুমুখিতা লক্ষণীয়।
উত্তমের অভিনয় : মূল্যায়ন
উত্তম একজন জাত অভিনেতা। পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি নিজেকে উন্নীত করেন বড় অভিনেতার পর্যায়ে। চলচ্চিত্র অভিনয়ের শুরুতে উত্তমের বাচনভঙ্গিতে সামান্যতম জড়তা ছিল। এমনকি সেই সময়ে তাঁর কথার মধ্যে ক্ষীণভাবে একটুখানি তোতলামির ভাবও ছিল। বলা যায়, মধ্যপঞ্চাশ থেকে মধ্যষাট পর্যন্ত—অগ্নিপরীক্ষা, সাগরিকা, পথে হলো দেরী, শাপমোচন, হারানো সুর, শিল্পী ইত্যাদি চলচ্চিত্রে উত্তমকুমার কিছুটা চেহারা সর্বস্ব নায়কই ছিলেন। কিন্তু ‘নায়ক’ ছবির পর থেকে এক নতুন উত্তমের জন্ম হয়।
এ প্রসঙ্গে সমালোচক অরুণ দত্তগুপ্তের বক্তব্য : “সুদর্শন এই নট সত্যজিৎ রায়ের নায়ক (১৯৬৬) ছবির পর থেকে মুখের অভিব্যক্তি ও চলনশীলতা (সড়নরষরঃু) বিস্ময়করভাবে বাড়াতে সক্ষম হয়ে এবং স্বরক্ষেপণে বৈচিত্র্য প্রদর্শনে পারদর্শিতা দেখিয়ে নিজেকে যথার্থ প্রতিভাধর শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।”
উত্তমের অভিনয় প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের বক্তব্য হচ্ছে: “তার সংলাপ বলার একটা নিজস্ব ঢং ছিল; সেটা চমৎকার ঢং। বড় বাক্যকে ভাগ করে সে বাক্যের মাঝে চমৎকার বিরতি দিতে পারত। এছাড়া যখন অভিনেতার মুখে সংলাপ থাকে না তখন কিছু করাও অভিনয়। সেই নির্বাক মুহূর্তগুলোতে উত্তমের দর্শককে টেনে রাখার ক্ষমতা ছিল। তার অভিনয়ে গাম্ভীর্য ছিল, স্থৈর্য ছিল।...আজ অনেক নায়ক আছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই ভালো অভিনয় করেন, কিন্তু উত্তমের মতো কেউ নেই, কেউ হবে না।”
উত্তমকুমারের অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑস্বাভাবিকতা। এছাড়া তাঁর কণ্ঠস্বর, এক-একটা সিকোয়েন্সকে হোল্ড করে রাখার ক্ষমতা বা স্ক্রিন পার্সোনালিটি ছিল অসামান্য।
কয়েকটি হিন্দি ছবিতেও উত্তম অভিনয় করেছেন। নিজের প্রযোজিত ‘ছোট সি মুলাকাত’-এ উত্তম যে সফল হন নি, তার কারণ সেখানে ভাষাকে জয় করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় নি। অবশ্য পরবর্তী সময়ে ‘অমানুষ’-এর হিন্দি ভার্সনে সারা ভারতের হিন্দি দর্শক শ্রেণি উত্তমের অভিনয় ক্ষমতা অনুভব করতে পেরেছিল।
কিন্তু বাংলা ছবির চলচ্চিত্রকাররা উত্তমের অভিনয় ক্ষমতার খুব কমই ব্যবহার করতে পেরেছেন। ন্যাকা ন্যাকা তথা ভেজা ভেজা আবেগ আর মন মাতানো গান সমৃদ্ধ সিংহভাগ ছবিতেই উত্তমের অভিনয়ের প্রয়োগে ঘটেছে। পাশাপাশি আবার এটাও সত্যি যে, যতটুকু তাঁর দেওয়ার ক্ষমতা ছিল, ততটুকু সদ্ব্যবহারে তিনি অনিচ্ছুক ছিলেন। অর্থাৎ উত্তম ডি-গ্ল্যামারাইজড হতে চান নি এবং সেই কারণেই তিনি তরুণ মজুমদারের ‘সংসার সীমান্তে’ এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’-এর প্রধান চরিত্রের ভূমিকায় অভিনয় করতে রাজি হন নি।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে লিখেছেন: “উত্তম সব সময় ওঁর অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে অতিক্রম করতে পারতেন স্টার ইমেজ, বেশিরভাগ সময় করতেন না সেটাই দুঃখের”।
উত্তমের নায়িকারা
বাংলা-হিন্দি মিলিয়ে উত্তমকুমার দু শ’র অধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। এ সমস্ত ছবিতে চার দশকের ৪৫ জন নায়িকা তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেছেন। তার মধ্যে বাংলাদেশের নায়িকা অলিভিয়াও রয়েছেন। উত্তম সবচেয়ে বেশি অভিনয় করেছেন তিনজন নায়িকার বিপরীতে। এই তিনজন হলেন সুচিত্রা সেন, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এবং সুপ্রিয়া দেবী। ত্রয়ী এই নায়িকার বিপরীতে উত্তম যথাক্রমে ৩০, ২৭ এবং ৩১টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। উত্তমের অন্যান্য নায়িকারা হচ্ছেন : ছবি রায়, মনীষা দেবী, করবী গুপ্তা, ভারতী দেবী, সুনন্দা দেবী, সন্ধ্যারাণী, মঞ্জু দে, মায়া মুখোপাধ্যায়, অরুন্ধতী মুখোপাধ্যায়, প্রণতি ভট্টাচার্য, কাবেরী বসু, সবিতা চট্টোপাধ্যায়, অনুভা গুপ্তা, সুমিত্রা দেবী, অনিতা গুহ, মালা সিনহা, সন্ধ্যা রায়, সুমিতা সান্যাল, বাসবী নন্দী, সুনীতা দেবী, নন্দিতা বসু, শর্মিলা ঠাকুর, তনুজা সমর্থ, লোলিতা চট্টেপাধ্যায়, সুলতা চৌধুরী, মাধবী মুখোপাধ্যায়, রীণা ঘোষ, অঞ্জনা ভৌমিক, কণিকা মজুমদার, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, সুপর্ণা সেন, দীপা চট্টোপাধ্যায়, জয়া ভাদুড়ী, আরতি ভট্টাচার্য, মিঠু মুখোপাধ্যায়, মহুয়া রায় চৌধুরী, অলিভিয়া, প্রেম নারায়ণ, সুলক্ষণা পণ্ডিত, শকুন্তলা বড়ুয়া এবং গায়ত্রী মুখোপাধ্যায়।
হেমন্ত-উত্তম : সোনালি মেলবন্ধন
সুচিত্রা-উত্তম জুটির মতোই পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্রে গায়ক-নায়কের এক সোনালি মেলবন্ধন গড়ে উঠেছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর উত্তমকুমারের মাঝে। হেমন্তের কণ্ঠে উত্তমের ঠোঁট মেলানোর যে খেলা তা অপূর্ব। চলচ্চিত্র দর্শক-শ্রোতার মধ্যে এই বোধ জাগ্রত হয় যে, উত্তমই স্বয়ং গান গাইছেন। এর কারণ হলো হেমন্ত এবং উত্তমের দুজনেরই কণ্ঠস্বর, গলার টোনাল কোয়ালিটির মধ্যে প্রচণ্ড মিল।
হেমন্তের গাওয়া উত্তমের লিপে বাংলা চলচ্চিত্রের স্মরণীয় গানগুলির মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য : ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস আজকে হলো সাথী’, ‘বসে আছি পথ চেয়ে’, ‘শোনো বন্ধু শোন প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা’ (শাপমোচন), ‘মৌবনে আজ মৌ জমেছে’ (বন্ধু), ‘শূন্যে ডানা মেলে পাখিরা উড়ে গেলে’ (তাসের ঘর), ‘তারে বলে দিয়ো’ (দুইভাই), ‘তোমার ভুবনে মাগো এত পাপ’ (মরুতীর্থ হিংলাজ), ‘নওল কিশোরী গো’ (কুহক), ‘আমি যাই চলে যাই, চলে যাই’ (কাল তুমি আলেয়া), ‘সূর্য ডোবার পালা’, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই’ (ইন্দ্রাণী) ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, ‘শাপমোচন’ ছবিতে সর্বপ্রথম হেমন্তের গাওয়া গানে উত্তম ঠোঁট মেলান এবং সর্বশেষ গান হচ্ছে ‘তোমরা সবাই শোনো, এ আমার গান না, ঝড়ে ভাঙা এ আমার বুকফাটা কান্না।’ উল্লেখ্য, ‘সমাধান’ ছবির এই গানটির কথা ও সুরের মধ্যে নির্মম বাস্তবেরই পূর্বাভাস ধ্বনিত হয়েছিল।
গায়ক, সংগীত পরিচালক, প্রযোজক ও পরিচালক
উত্তমকুমারের প্রধান পরিচয় অভিনেতা হলেও আরও কয়েকটি ভূমিকায় তাঁকে দেখা গেছে। যেমন, তিনি কয়েকটি ছবির গানের প্লেব্যাক সিঙ্গার ছিলেন। প্রথমে তিনি দেবকী বসু পরিচালিত ‘নবজন্ম’ ছবিতে নচিকেতা ঘোষের সুরে ছটি গানে নেপথ্য কণ্ঠদান করেন। এছাড়া সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন দুটি চলচ্চিত্রে (কাল তুমি আলেয়া এবং সব্যসাচী)।
যুগ্ম প্রযোজক হিসেবে উত্তম যাত্রা শুরু করেন ‘হারানো সুর’-এর মাধ্যমে। তারপরে প্রযোজনা করেন ‘জতুগৃহ’, ‘সপ্তপদী’, ‘খেলাঘর’, ‘শুন বরনারী’, ‘কায়াহীনের কাহিনী’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’ এবং হিন্দি ছবি ‘ছোটি সি মুলাকাত’।
উত্তমকুমার পরিচালিত ছবি হচ্ছে ‘শুধু একটি বছর’ (১৯৬৬), ‘বনপলাশীর পদাবলী’ (১৯৭৩) এবং ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ (১৯৮০)। শেষের ছবিটি অবশ্য উত্তম শেষ করে যেতে পারেন নি।
জন দরদি উত্তম
দরদি মানুষ হিসেবেও উত্তম ছিলেন অসাধারণ পুরুষ। ১৯৭৮-এর বিধ্বংসী বন্যায় গোটা পশ্চিমবঙ্গ যখন বিপর্যস্ত, তখন উত্তমকুমার অন্য শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংগঠিত করে বহু টাকা ও সাহায্য তুলে দিয়েছিলেন বন্যা দুর্গত পশ্চিমবঙ্গবাসীদের জন্য। এছাড়া দুঃস্থ শিল্পী ও কলাকুশলীদের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম মমত্ববোধ একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। শিল্পী সংসদের সভাপতি ছিলেন তিনি। এবং এই সংগঠনের পক্ষে দুঃস্থ শিল্পীদের সহায়তাকল্পে দুটি ছবি তৈরি করেছিলেন।
প্রেম-পরিণয়-ভালোবাসা
উত্তমের জীবনে প্রথম প্রেম আসে ১৯৪৬-এ। তখন তিনি পোর্ট কমিশনারস অফিসে চাকরি করছেন। এই সময়ে এক ছুটির দিনে জ্যাঠতুতো বোন অন্নপূর্ণার বান্ধবী গৌরীরাণী গাঙ্গুলীকে প্রথম দেখে প্রেমে পড়ে যান। তার উদ্দেশে একের পর এক গান গেয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে এই প্রেম গভীর থেকে গভীরতর হয়, যার উপসংহার বিয়েতে। ১৯৫০ সালের ১ জুন ল্যান্স ডাউন রোডের গাঙ্গুলী বাড়ি থেকে গৌরী দেবী বধূ বেশে ৪৬-এ গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ির উঠোনে পা রাখেন। দাম্পত্যজীবনের বেশ কয়েকটি বছর ওঁরা কাটিয়ে দেন অদ্ভুত রোমান্সের জগতে। একমাত্র পুত্র গৌতমের জন্ম হয় (৭ সেপ্টেম্বর ১৯৫১)। তারপর ঘটে ছন্দপতন। উত্তমের জীবনে আসে দ্বিতীয় নারী। সুপ্রিয়া দেবী।
স্বামীর সঙ্গে সুপ্রিয়া দেবীর বনিবনা হচ্ছিল না। সেই সময়ে উত্তম সমব্যথী বন্ধু হিসেবে তার পাশে এসে দাঁড়ান। ঘনিষ্ঠতা ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং অবশেষে ১৯৬৩ সালে উত্তমকুমারের ময়রা স্ট্রীটের বাড়িতে সুপ্রিয়ার দাদা অনিল বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তমের হাতে তুলে দেন সুপ্রিয়াকে। শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গেই তাদের বিয়ে হয়েছিল।
গৌরী ও সুপ্রিয়া দেবী ছাড়া সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় আর সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ‘ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট’ হয়েছিল। এই দুজনকে তিনি ভালোবাসতেন। কিন্তু উত্তমের ভাষায় ‘সে ভালোবাসা অন্য জাতের, অন্য ধরনের। কামগন্ধ নাহি তায়’।
উত্তমের জীবনে অন্য আর নারী সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না।

নিঃসঙ্গ নায়ক
উত্তম বাংলা ছবির সর্বাধিক জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন। কিন্তু এই জনপ্রিয়তাই তাঁকে সাধারণ মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। স্বাভাবিক জীবনের জন্য তিনি ছিলেন কাঙাল। বন্ধুদের সঙ্গে এক আড্ডায় উত্তমকুমারের হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উচ্চারিত কথার মধ্যে তাঁর যন্ত্রণা কাতর সত্তাটি প্রকাশিত: “দূর দূর এটা একটা জীবন নাকি ? ইচ্ছেমতো রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে পারি না, বাজারে গিয়ে দরদস্তর করে মাছ কিনতে পারি না। গড়ের মাঠে দাঁড়িয়ে ফুচকা কিংবা চিনে বাদাম খেতে পারি না। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখতে পারি না। জেলের কয়েদিরাও বোধহয় এর চেয়ে সুখে থাকে। আমি তো আর এখন মানুষ নই, আমি একটা সেলেবল কমোডিটি। প্রোডিউসার ডিরেকটরদের ক্রীতদাস। পুতুল নাচের রঙচঙে পুতুল।” সত্যি কথা বলতে কী, জীবনের শেষ পর্যায়ে ঘরে-বাইরে কোথাও উত্তমের শান্তি ছিল না। একজন সাংবাদিকের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহারের কারণে কাগজের সাংবাদিকরা তাকে বয়কট করেছিলেন। ছবি ছাপানো হতো, তলায় নাম না দিয়ে লেখা হতো জনৈক শিল্পী। কিন্তু কেন যে তিনি সেই সাংবাদিকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলেন, সেদিন কেউ তা তলিয়ে দেখতে চায় নি। আবার হিন্দি ছবির আগ্রাসন থেকে বাংলা ছবিকে বাঁচাতে বাংলা ছবি দেখানোর সম্মানজনক একটা ব্যবস্থা করার জন্যে উত্তম সংরক্ষণ সমিতিকে মদত দিয়েছিলেন। এতে প্রদর্শকরা তাঁকে বয়কট করতে চেয়েছিলেন। এছাড়া গৌরী কিংবা সুপ্রিয়া দেবী কারও কাছ থেকেই তিনি মানসিক প্রশান্তি পাচ্ছিলেন না। রবি বসু লিখেছেন : “বাইরে থেকে অনেকে মনে করবেন উত্তমকুমার কত সুখী। কিন্তু তাঁর মতো অত দুঃখী মানুষ আমি আর একটিও দেখি নি। দুঃখী এবং নিঃসঙ্গ। তাঁর সব ছিল অথচ কেউ ছিল না। কিছুই ছিল না।”
উত্তমের প্রস্থান
১৯৬৭ সালে প্রথম উত্তমের হার্ট অ্যাটাক হয়। তারপর মাঝখানে আরেকবার এবং সর্বশেষের অ্যাটাকে এই মহানায়কের বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটে ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই বৃহস্পতিবার, রাত ৯.৩০ মিনিটে, কলকাতার বেলভিউ ক্লিনিক-এ। পরদিন কেওড়াতলার শ্মশানে সাজানো চিতাতে এই দুঃখী, নিঃসঙ্গ মানুষটি সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভ করে মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করেন।
শেষ কথা
আজ উত্তমকুমার বেঁচে নেই। ছেচল্লিশ বছর আগেই কলকাতার কেওড়াতলা শ্মশানে তাঁর নশ্বর দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হয়েছে। কিন্তু উত্তম এমন এক তারকা যার দেহের লয় হলেও দেহীর লয় হয় নি। তাঁর অভিনীত কালজয়ী কয়েকটি চলচ্চিত্রে এবং অগণিত গুণমুগ্ধ মানুষের হৃদয়ে তিনি বেঁচে আছেন। বেঁচে থাকবেন চিরকাল।
উত্তম অভিনীত ছবির তালিকা
১৯৪৭ : মায়াডোর (হিন্দি)। ছবিটি মুক্তি পায় নি।
১৯৪৮ : দৃষ্টিদান।
১৯৪৯ : কামনা।
১৯৫০: মর্যাদা।
১৯৫১ : ওরে যাত্রী / সহযাত্রী / নষ্টনীড়।
১৯৫২: সঞ্জীবনী / বসু পরিবার / কার পাপে।
১৯৫৩: সাড়ে চুয়াত্তর / লাখ টাকা /নবীনযাত্রা / বউ ঠাকুরাণীর হাট।
১৯৫৪: ওরা থাকে ওধারে / চাঁপাডাঙার বউ / কল্যাণী / সদানন্দের মেলা /অন্নপূর্ণার মন্দির / অগ্নিপরীক্ষা / গৃহপ্রবেশ / বকুল / মন্ত্রশক্তি / মনের ময়ূর / মরণের পরে।
১৯৫৫ : সাঁঝের প্রদীপ / রাইকমল /অনুপমা / দেবত্র / শাপমোচন / বিধিলিপি /হ্রদ / উপহার / কঙ্কাবতীর ঘাট /রাতভোর / ব্রতচারিণী / সবার উপরে।
১৯৫৬ : সাগরিকা / সাহেব বিবি গোলাম / লক্ষহীরা / চিরকুমার সভা / একটি রাত / শঙ্কর নারায়ণ ব্যাংক / শ্যামলী / ত্রিযামা / শিল্পী / নবজন্ম / পুত্রবধূ / হারানো সুর।
১৯৫৭ : হারজিৎ / বড়দিদি / যাত্রা হল শুরু / পৃথিবী আমারে চায় / তাসের ঘর /সুরের পরশে / পুনর্মিলন / অভয়ের বিয়ে /চন্দ্রনাথ / পথে হল দেরী । জীবনতৃষ্ণা।
১৯৫৮ : রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত / বন্ধু / মানময়ী গালর্স স্কুল / ডাক্তারবাবু / শিকার / ইন্দ্রানী / যৌতুক / সূর্যতোরণ।
১৯৫৯ : মরুতীর্থ হিংলাজ / চাওয়া পাওয়া / বিচারক / পুষ্পধনু / গলি থেকে রাজপথ / খেলাঘর / সোনার হরিণ / অবাক পৃথিবী।
১৯৬০ : মায়ামৃগ / রাজাসাজা / কুহক /উত্তর মেঘ / হাত বাড়ালেই বন্ধু / খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন / শখের চোর /শহরের ইতিকথা / শুন বরনারী।
১৯৬১ : সাথীহারা / অগ্নিসংস্কার / ঝিন্দের বন্দী / নেকলেস / সপ্তপদী / দুই ভাই।
১৯৬২ : বিপাশা / শিউলিবাড়ি / কান্না। ১৯৬৩ : শেষ অংক / নিশীথে / উত্তরায়ণ / ভ্রান্তিবিলাস / সূর্যশিখা / দেয়া নেয়া।
১৯৬৪: বিভাস / জতুগৃহ / নতুন তীর্থ / মোমের আলো / লাল পাথর।
১৯৬৫: থানা থেকে আসছি /রাজকন্যা / সূর্যতপা।
১৯৬৬: রাজদ্রোহী / শুধু একটি বছর / নায়ক/ শঙ্খবেলা / কাল তুমি আলেয়া।
১৯৬৭: নায়িকা সংবাদ /চিড়িয়াখানা / এ্যান্টনী ফিরিঙ্গি /জীবনমৃত্যু / গৃহদাহ।
১৯৬৮: কখনো মেঘ / গড় নাসিমপুর / চৌরঙ্গী / তিন অধ্যায়।
১৯৬৯: অপরিচিত / কমললতা /চিরদিনের / মন নিয়ে / শুকসারী / সাবরমতী।
১৯৭০ : কলঙ্কিত নায়ক / দুটি মন / নিশিপদ্ম / বিলম্বিত লয় /মঞ্জরী অপেরা / রাজকুমারী।
১৯৭১: এখানে পিঞ্জর /ছদ্মবেশী / জয়জয়ন্তী / জীবন জিজ্ঞাসা / ধন্যি মেয়ে / নবরাগ।
১৯৭২ : অন্ধ অতীত / আলো আমার আলো / ছিন্নপত্র / বিরাজ বৌ / মেম সাহেব / স্ত্রী / হার মানা হার।
১৯৭৩ : কায়াহীনের কাহিনী /বনপলাশীর পদাবলী / রাতের রজনীগন্ধা / রৌদ্রছায়া/সোনার খাঁচা।
১৯৭৪: যদুবংশ / আলোর ঠিকানা / রোদন ভরা বসন্ত /বিকেলে ভোরের ফুল / রক্ত তিলক / যদি জানতেম।
১৯৭৫: অগ্নিশ্বর / আমি সে ও সখা / কাজললতা / নগর দপণে / প্রিয় বান্ধবী / বাঘবন্দী খেলা / মৌচাক / সন্ন্যাসী রাজা।
১৯৭৬: আনন্দমেলা / চাঁদের কাছাকাছি / নিধিরাম সর্দার /বহ্নিশিখা / মোমবাতি / সেই চোখ/ হোটেল স্নো ফক্স।
১৯৭৭: অসাধারণ / জাল সন্ন্যাসী / ভোলা ময়রা / রাজবংশ / সব্যসাচী / সিস্টার।
১৯৭৮: দুই পুরুষ / ধনরাজ তামাং।
১৯৭৯: ব্রজবুলি / দেবদাস /সুনয়নী / নবদিগন্ত / শ্রীকান্তের উইল / সমাধান।
১৯৮০: পঙ্খীরাজ / রাজনন্দিনী / আরো একজন / দর্পচূর্ণ / দুই পৃথিবী।
১৯৮১: ওগো বধূ সুন্দরী / কলংকিনী কঙ্কাবতী / ইমনকল্যাণ / খনা / রাজা সাহেব।
হিন্দি ছবি
ছোটিসী মুলাকাত (১৯৬৭), কিতাব (১৯৭৯), দেশপ্রেমী, প্লট নাম্বার ফাইভ।
ডবল ভার্সান ছবি
অমানুষ (১৯৭৪), আনন্দ আশ্রম (১৯৭৭), বন্দী (১৯৭৮), নিশান (১৯৭৮)।
উত্তমের প্রথম
প্রথম প্রকাশ্যে অভিনয়: দশ বছর বয়সে শখের থিয়েটার নাটক ‘মুকুট’-এ।
প্রথম ছবির শুটিং: ১৯৭৪ সালে ‘মায়াডোর’ হিন্দি ছবির জন্য।
প্রথম নায়ক চরিত্র: নব্যেন্দুসুন্দর বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘কামনা’ (১৯৪৯) ছবিতে।
প্রথম নায়িকা: ছবি রায়।
প্রথম হিট ছবি: ‘বসু পরিবার’ (১৯৫২)।
প্রথম পেশাদার মঞ্চে অভিনয়: ১৯৫৩ সালে স্টার-এ ‘শ্যামলী’ নাটকে সাবিত্রী চট্টোধ্যায়ের বিপরীতে।
প্রথম উত্তম-সুচিত্রা জুটি : ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৩)।
প্রথম প্লে-ব্যাক: ‘নবজন্ম’ ছবিতে নচিকেতা ঘোষের সুরে ছটি গান (১৯৫৬)।
প্রথম প্রযোজক: ১৯৫৭-এ ‘হারানো সুর’ ছবিতে। এ ছবির যুগ্ম প্রযোজক ছিলেন।
প্রথম দ্বৈত ভূমিকা: ‘তাসের ঘর’ (১৯৫৭) ছবিতে।
প্রথম রঙিন ছবি: ‘পথে হলো দেরী’ (১৯৫৭)।
প্রথম চলচ্চিত্র পরিচালনা: ‘শুধু একটি বছর’ (১৯৬৬)।
প্রথম সংগীত পরিচালনা: ‘কাল তুমি আলেয়া’ (১৯৬৬) ছবিতে।
প্রথম হিন্দি ছবি: ‘ছোটি সি মুলাকাত’ (১৯৬৭)।
প্রথম বিদেশ যাত্রা: ১৯৬৬ সালে বার্লিন চলচ্চিত্রে উৎসবের আমন্ত্রণে ‘নায়ক’ ছবির নায়ক হিসেবে।
প্রথম ভরত পুরস্কার: ১৯৬৭-এ ‘চিড়িয়াখানা’ এবং ‘এ্যান্টনী ফিরিঙ্গি’—এই দুই ছবির জন্য প্রথম ভারতীয় অভিনেতা উত্তমকুমার এই পুরস্কার পান।
উত্তমকুমারের পুরস্কৃত ছবি
হ্রদ (১৯৫৫): বি. এফ. জে. এ. কর্তৃক শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার।
হারানো সুর (১৯৫৭): ভারত সরকার কর্তৃক ‘সার্টিফিকেট অফ মেরিট’ দান।
সপ্তপদী (১৯৬১): বি. এফ. জে. এ. কর্তৃক শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার।
নায়ক (১৯৬৬): বি. এফ. জে. এ. কর্তৃক শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার।
চিড়িয়াখানা ও অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি (১৯৬৭) : ভারত সরকার কর্তৃক ভরত পুরস্কার দান।
গৃহদাহ (১৯৬৭) : বি. এফ. জে. এ শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার। এখানে পিঞ্জর (১৯৭১): বি. এফ. জে. এ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার দান।
অমানুষ (১৯৭৪) : ‘ফিল্ম ফেয়ার’ পুরস্কার ও রাজ্য সরকার কর্তৃক পুরস্কার।
বহ্নিশিখা (১৯৭৬) : বি. এফ. জে. এ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার।
Leave a Reply
Your identity will not be published.