বাংলাভাগ, হৃদয়ের বিভাজন ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বাংলাভাগ, হৃদয়ের বিভাজন ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১১ই পৌষ, ১৩৩৮-এ  রবীন্দ্রনাথের সপ্ততিতম-বর্ষশেষের জয়ন্তীতে লিখেছিলেন—“কবিগুরু, তোমার পানে চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের অন্ত নাই।” শরৎচন্দ্রের সার্ধশতবর্ষে এসে আমরা যখন উনার সৃজনসম্ভারের প্রতি দৃষ্টি রাখি, তখন যেন উনার কথায় উনাকে ফেরত দিতে হয়। শরৎবাবু, তোমার পানে চাহিয়াও আমাদের বিস্ময়ের অন্ত নাই। 

শরতচন্দ্র জন্মেছিলেন ১৮৭৬-এর ১৫ সেপ্টেম্বর। ইহজাগতিকতায় দাড়ি পড়ে ১৯৩৮-এর ১৬ জানুয়ারি। সময়টা অবিভক্ত ভারতের ব্রিটিশ শাসনের। উনার জন্ম দশকেই অনুষ্ঠিত হয় এই অঞ্চলের প্রথম আদমশুমারি, ১৮৭২-এ। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় প্রথমবারের মতো নজরে আসে সবার। সেদিনের অখণ্ড বাংলায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হিন্দুদের তুলনায় সামান্য কম। অথচ সমাজের উপরতলায় হিন্দুর অবস্থান ও বিস্তার এমনভাবে ছিল যে, বিষয়টা সেই অর্থে কারোরই নজরে আসে নি।

১৮৭২ সালের আদমশুমারিতে প্রথমবারের মতো জানা গেল বাংলায় মোট জনসংখ্যা ৩৫,৭৬৯,৭৩৫ জন। এর মধ্যে হিন্দু জনসংখ্যা ১৮,২০০,৪৩৮ জন এবং মুসলমান জনসংখ্যা ১৭,৬০৯,১৩৫ জন; বাকিরা ছিল অন্য সম্প্রদায়ভুক্ত। শতকরা হিসেবে মোট জনসংখ্যার তুলনায় হিন্দুর হার ছিল ৫০.১ শতাংশ আর মুসলমান ৪৮.৮ শতাংশ। পরের আদমশুমারিতে পাল্টে যায় এই চিত্র। ১৮৮১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায় মোট জনসংখ্যা ৩৫,৬০৭,৬৬৮ জন। এর মধ্যে হিন্দু জনসংখ্যা ১৬,৩৭০,৯৬৬ জন এবং মুসলমান জনসংখ্যা ১৭,৮৬৩,৪১১ জন। শতকরা হিসেবে হিন্দু ৪৮.৪৫ শতাংশ এবং মুসলমান ৫০.১৬ শতাংশ। প্রথম জনগণনার তুলনায় দ্বিতীয় জনগণনায় দেখা গেল মুসলমানের সংখ্যা ১৫ লক্ষ বেড়েছে।

জনসংখ্যার এই চিত্রই এ অঞ্চলের ভবিতব্য লিখে দেয়। আমাদের খেয়াল করা জরুরি যে, ১৮৭২-এর আদমশুমারিতে প্রথম জানা যায়, এ অঞ্চলের জনসংখ্যার চিত্রটা কী আর মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কতটা। ঠিক তার ১০০ বছর পর ১৯৭১-এ জন্ম হয় বাংলাদেশের। তার আগে ঘটে যায় ১৯৪৭-এর আনন্দ ও বেদনার অধ্যায়। দেশভাগের মতো করুণ ও মর্মস্পর্শী ঘটনার মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হয় এই জনপদ। অখণ্ড বাংলা ভাগ হয়ে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গ নামে পাকিস্তান ও ভারতের অংশ হয়। প্রশ্ন হলো বাংলা ভাগ কি অনিবার্য ছিল ? মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী কেন ‘হিন্দু-মুসলিম’ প্রসঙ্গে বলেছিলেন “হৃদয়ের বিভাজন আগেই হয়ে গিয়েছিল”। সত্যিই কি তাই, কেনইবা এমনটা হলো!

বাংলায় ‘হিন্দু-মুসলিম’-এর বসবাস তো হাজার বছরেরও বেশি সময়ের। তাহলে ভাগ কেন অনিবার্য হয়ে দাঁড়াল ? এই প্রশ্নের সুলুকসন্ধান রয়েছে শরৎচন্দ্রের লেখায়। আমরা এখানে উনার ‘মহেশ’ গল্পের আলোকে বিষয়টার সদর-অন্দরের চিত্রটা বোঝার চেষ্টা করব। 

গল্পের প্রারম্ভিক অংশের শরীরটা এরকম—

“পথের ধারে একটা পিটালি গাছের ছায়ায় দাঁড়াইয়া তর্করত্ন উচ্চকণ্ঠে ডাক দিলেন, ওরে, ও গফ্রা, বলি, ঘরে আছিস ?

তাহার বছর-দশেকের মেয়ে দুয়ারে দাঁড়াইয়া সাড়া দিল, কেন বাবাকে ? বাবার যে জ্বর।

জ্বর! ডেকে দে হারামজাদাকে। পাষণ্ড! ম্লেচ্ছ!

হাঁক-ডাকে গফুর মিঞা ঘর হইতে বাহির হইয়া জ্বরে কাঁপিতে কাঁপিতে কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। ভাঙ্গা প্রাচীরের গা ঘেঁষিয়া একটা পুরাতন বাবলাগাছ—তাহার ডালে বাঁধা একটা ষাঁড়। তর্করত্ন দেখাইয়া কহিলেন, ওটা হচ্ছে কি শুনি ? এ হিঁদুর গাঁ, ব্রাহ্মণ জমিদার, সে খেয়াল আছে ? তাঁর মুখখানা রাগে ও রৌদ্রের ঝাঁজে রক্তবর্ণ, সুতরাং সে মুখ দিয়া তপ্ত খর বাক্যই বাহির হইবে, কিন্তু হেতুটা বুঝিতে না পারিয়া গফুর শুধু চাহিয়া রহিল।

তর্করত্ন বলিলেন, সকালে যাওয়ার সময় দেখে গেছি বাঁধা, দুপুরে ফেরবার পথে দেখচি তেমনি ঠায় বাঁধা। গোহত্যা হলে যে কর্তা তোকে জ্যান্তকবর দেবে। সে যে-সে বামুন নয়!’’

এটুকু পড়ে আমরা নিশ্চয় বুঝতে পারছি ওই সময়ের বাংলায় মানুষের সঙ্গে মানুষের (পড়ুন হিন্দু ও মুসলমানের) সম্পর্কটা কেমন ছিল ? এবার আবুল মনসুর আহমদের একটি উদ্ধৃতি স্মরণ করা যাক। তিনি লিখেছেন, তখনকার শ্রেষ্ঠ সাপ্তাহিক খবরের কাগজ ‘বঙ্গবাসী’তে একবার এমন খবরও লেখা হয়েছিল, “সভায় কতিপয় ভদ্রলোক ও অনেক মুসলমান যোগ দিয়েছিলেন।” আবুল মনসুর আহমদ-এর প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। উনি কখনোই সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। কিন্তু সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতিটি বর্গে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায়, মর্যাদা রায় ও সাম্য অনুশীলনের পদক্ষেপে শিরদাঁড়া সোজা রাখায় ছিলেন বিশ্বাসী। তিনি মনে করতেন সকলকে সমঅধিকার দেওয়ার মধ্যে রয়েছে মানবিকবোধের প্রকাশ। সাংবাদিক আবুল মনসুরের এক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যাশা ছিল হিন্দুরা তো সামনের সারিতে রয়েছেন, এখন সকলের দায়িত্ব মুসলমানদেরও এগিয়ে নেওয়া। দেশের কোনো একটা ক্ষেত্রে একক কোনো বর্গ, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় যদি এগিয়ে যায় তাহলে সেখানে যে ‘সমতা’র চর্চা হয় না, সেকথা বলা বাহুল্য। এ লক্ষ্যেই তিনি চেয়েছেন সাংবাদিকতায় বাঙালি মুসলমানও এগিয়ে আসুক। অন্যদের সমান্তরালে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করে নিক। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “হিন্দু সংবাদপত্রে মুসলিম শিক্ষার্থীদের চান্স ছিল না।” তার প্রযত্নে অনেক সাংবাদিকই পরবর্তী সময়ে সাংবাদিক হিসেবে খ্যাত হয়েছেন, সংবাদপত্র শিল্পে গৌরবজনক অবদান রেখেছেন। এঁদের কয়েকজন হলেন (‘আত্মকথা’য় যেভাবে লিখেছেন) : মি. ওয়ালী উল্লাহ, মি. মোহাম্মদ মোদাব্বের, মি. জনাব আলী, মি. খোন্দকার ইলিয়াস, মি. কে. জি. মোস্তফা, মি. সিরাজুদ্দীন হোসেন, মি. রশীদ করীম, মিস হাযেরা খাতুন, মিস মরিয়ম খানম, কবি আহসান হাবীব, মি. রুকনুজ্জামান খান, মি. মোহাম্মদ নাসির আলী, মি. কাযী মোহাম্মদ ইদ্রিস, মি. তালেবুর রহমান, মি. খোন্দকার আবদুল হামিদ, মি. জহুরুল হক, কবি গোলাম কুদ্দুস প্রমুখ। ব্রিটিশ-বাংলায় ‘হিন্দু-মুসলমানে’র অবস্থান ও সম্পর্কটা কেমন ছিল তা বুঝতে খুব বেশি বেগ পাওয়ার কথা নয়। মুসলমানদের প্রতি সমাজের সকল তলার দৃষ্টি যে মোটেই সুখকর ছিল না, তা বেশ পষ্ট ও পরিষ্কার।

‘মহেশ’ গল্প থেকে আরও একটুপাঠ করা যাক—

“গফুর মুখ ভ্যাঙচাইয়া তাহার কণ্ঠস্বর অনুকরণ করিয়া কহিল, রাত্তিরে যে বলেছিলুম! রাত্তিরে বললে কারু মনে থাকে ? নিজের কর্কশকণ্ঠে ক্রোধ তাহার দ্বিগুণ বাড়িয়া গেল। মুখ অধিকতর বিকৃত করিয়া বলিয়া উঠিল, চাল থাকবে কি করে ? রোগা বাপ খাক আর না খাক, বুড়ো মেয়ে চারবার পাঁচবার করে ভাত গিলবি। এবার থেকে চাল আমি কুলুপ বন্ধ করে বাইরে যাব। দে, একঘটি জল দে,—তেষ্টায় বুক ফেটে গেল। বল, তাও নেই।

আমিনা তেমনি অধোমুখে দাঁড়াইয়া রহিল। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করিয়া গফুর যখন বুঝিল গৃহে তৃষ্ণার জল পর্যন্ত নাই, তখন সে আর আত্মসংবরণ করিতে পারিল না। দ্রুতপদে কাছে গিয়া ঠাস করিয়া সশব্দে তাহার গালে এক চড় কষাইয়া দিয়া কহিল, মুখপোড়া হারামজাদা মেয়ে, সারা দিন তুই করিস কি ? এত লোকে মরে তুই মরিস নে !

মেয়ে কথাটি কহিল না, মাটির শূন্য কলসীটি তুলিয়া লইয়া সেই রৌদ্রের মাঝেই চোখ মুছিতে মুছিতে নিঃশব্দে বাহির হইয়া গেল। সে চোখের আড়াল হইতেই কিন্তু গফুরের বুকে শেল বিঁধিল। মা-মরা এই মেয়েটিকে সে যে কি করিয়া মানুষ করিয়াছে সে কেবল সেই জানে। তাহার মনে পড়িল এই তাহার স্নেহশীলা কর্মপরায়ণা শান্ত মেয়েটির কোনো দোষ নেই। ক্ষেতের সামান্য ধান কয়টি ফুরানো পর্যন্ত তাহাদের পেট ভরিয়া দুবেলা অন্ন জুটে না। কোনোদিন একবেলা, কোনোদিন বা তাহাও নয়। দিনে পাঁচ-ছয়বার ভাত খাওয়া যেমন অসম্ভব তেমনি মিথ্যা। এবং পিপাসার জল না থাকার হেতুও তাহার অবিদিত নয়। গ্রামে যে দুই-তিনটা পুষ্করিণী আছে তাহা একবারে শুষ্ক। শিবচরণবাবুর খিড়কির পুকুরে যা একটু জল আছে, তাহা সাধারণে পায় না। অন্যান্য জলাশয়ের মাঝখানে দু-একটা গর্ত খুঁড়িয়া যাহা কিছু জল সঞ্চিত হয় তাহাতে যেমন কাড়িকাড়ি তেমনি ভিড়।

বিশেষত মুসলমান বলিয়া এই ছোট মেয়েটা ত কাছেই ঘেঁষিতে পারে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দূরে দাঁড়াইয়া বহু অনুনয়বিনয়ে কেহ দয়া করিয়া যদি তাহার পাত্রে ঢালিয়া দেয় সেইটুকুই সে ঘরে আনে। এ সমস্তই সে জানে। হয়তো আজ জল ছিল না, কিংবা কাড়াকাড়ির মাঝখানে কেহ মেয়েকে তাহার কৃপা করিবার অবসর পায় নাই—এমনিই কিছু একটা হইয়া থাকিবে নিশ্চয় বুঝিয়া তাহার নিজের চোখেও জল ভরিয়া আসিল।’’

গ্রামের গোড়াপত্তন কীভাবে হয়েছিল। কিংবা একটা জায়গা বা জনপদকে কোন সংজ্ঞার আলোকে আমরা গ্রাম বলি। গ্রাম হওয়ার প্রধান শর্ত হলো, সেখানে জলের সংস্থান থাকতে হবে। একটা জলাধার, পুকুর বা ইদারাকে কেন্দ্র করে আদিতে গ্রাম গড়ে ওঠে। জলই হচ্ছে ওই গ্রামের ভরকেন্দ্র। সেখানে সকলের যাতায়াত নিয়ে কোন বাধানিষেধ থাকে না, সেটা ন্যায়সঙ্গতও নয়। কিন্তু গফুরের গ্রাম সেরকম নয়। কারণ তখন জমিদারি শাসন বাংলায় চেপে বসেছে। হিন্দুরা অভিজাত বলে মুসলমানকে দূরে সরিয়ে রাখছে ক্ষেত্রবিশেষে পানি থেকেও বঞ্চিত করছে। মানবিক সম্পর্ক নয়, বর্ণগত, সম্প্রদায়গত, ধর্মগত সম্পর্কই সেখানে প্রধান বিবেচ্য, অন্যকিছু নয়। যা দারুণভাবে চিত্রিত করেছেন  শরৎবাবু।

এসব বিভাজন আর দূরত্বই পূঞ্জিভূত হচ্ছিল দিনের পর দিন।

 ‘মহেশ’ গল্প বাংলায় মুসলমানের হাল হকিকত এবং তার ধারাবাহিকতা বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ এক সমাজচিত্র। এমনকি বাংলা মূলুকে কেন ইসলাম প্রসারে দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ করে অখণ্ড ভারতে সাফল্য লাভ করল তার সুলুকসন্ধানও হাজির রয়েছে এখানে। গফুর, আমেনারা যখন জল সংগ্রহে বাধা বা বঞ্চণার শিকার হয়েছে, তখন এখানে মসজিদগুলোকে কেন্দ্র করে দিঘি বা পুকুর খনন হয়েছে। একারণে আমরা যখন পুরোনো দিনের মসজিদ, মাজার বা আখড়া দেখি, সেখানে জলাধারের রয়েছে অনিবার্য উপস্থিতি। জলাধারগুলোর আয়তনের দিকে খেয়াল করলেই বোঝা যায় পুরো জনপদ বা গ্রামের জল চাহিদা মেটানোর যাবতীয় ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। হৃদয়ের বিভাজনের শুরুটা কি এভাবেই ? যার ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে গত শতাব্দীর চারের দশকে। আবুল মনসুর আহমদকে আরও একটু ফিরে দেখা যাক। 

কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘পূর্ব পাকিস্থান রেনেসাঁ সোসাইটি’ আয়োজিত এতদ্বিষয়ক সম্মেলনের মূল সভাপতির অভিভাষণে আবুল মনসুর আহমদ বলেন : “রাজনীতিকের বিচার (সাবেক) ‘পাকিস্থানের’ অর্থ যাই হোক না কেন সাহিত্যিকের কাছে তার অর্থ তমদ্দুনী আজাদী, সাংস্কৃতিক স্বরাজ, কালচারেল অটোনমি। রাজনৈতিক আজাদী ছাড়া কোনো জাতি বাঁচতে পারে কিনা সে প্রশ্নের জবাব পাবেন আপনারা রাষ্ট্রনেতাদের কাছে। আমরা সাহিত্যিকরা শুধু এই কথাটাই বলতে পারি যে, তমদ্দুনী আজাদী ছাড়া কোনো সাহিত্য-বাঁচাত পরের কথা জন্মাতেই পারে না। পাকিস্থানও (সাবেক) একটা বিপ্লব। এ-বিপ্লব আনতে হলে সাহিত্যের ভেতর দিয়েই তা করতে হবে। কিন্তু কোথায় পাকিস্থানের সাহিত্য ? (সাবেক) পূর্ব পাকিস্থান অর্থাৎ বাংলা ও আসামের সাহিত্য বলতে আমরা যা বুঝি, তা বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্র-শরৎচন্দ্র যুগের সাহিত্যিকদের সাহিত্য। এটা খুবই উন্নত সাহিত্য। বিশেষত: রবীন্দ্রনাথ এ-সাহিত্যকে বিশ^-সাহিত্যের দরবারে স্থান দিয়ে গেছেন। তবুও এ-সাহিত্য পূর্ব-পাকিস্থানের সাহিত্য নয়। এ-সাহিত্যে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কোনো দান নেই। শুধু তা নয়, মুসলমানদের প্রতিও এ-সাহিত্যের কোনো দান নেই। অর্থাৎ এ সাহিত্য থেকে মুসলিম সমাজ—প্রাণ প্রেরণা পায় নি এবং পাচ্ছে না। এর কারণ আছে। সে কারণ এই যে, এ-সাহিত্যের স্রষ্টাও মুসলমান নয়; এর স্পিরিটও মুসলমানী নয়, এর ভাষাও মুসলমানের ভাষা নয়। প্রথমত, এ-সাহিত্যের স্পিরিটের কথাই ধরা যাক। এ-সাহিত্য হিন্দু মনিষীর সৃষ্টি। সুতরাং স্বভাবতই হিন্দু সংস্কৃতিকে বুনিয়াদ করে তাঁরা সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। ঠিকই তাঁরা করেছেন। নইলে ওটা জীবন্ত সাহিত্য হতো না—কিন্তু সত্যকথা এই যে, ওই সাহিত্যকে মুসলমানেরা তাদের জাতীয় সাহিত্য মনে করে না। কারণ ত্যাগ, বৈরাগ্য ভক্তিপ্রেম যত উঁচুদরের আদর্শ হোক, মুসলমানের জীবনাদর্শ তা নয়। সাহিত্যের স্পিরিট সম্বন্ধে যা বলেছি, বিষয়বস্তু সম্বন্ধেও তাই বলতে হয়। সাহিত্যের নায়ক নায়িকা যদি আমরা না হলাম, সাহিত্যের পটভূমি যদি আমার কর্মভূমি না হলো, সাহিত্যের বাণী যদি আমার মর্মবাণী না হলো তবে সে সাহিত্য আমার সাহিত্য হয় কি রূপে ? আমার ঐতিহ্য আমার ইতিহাস আমার ইতিকথা এবং আমার উপকথা যে সাহিত্যের উৎস নয়, সে-সাহিত্য আমার জীবন উৎস হবে কেমন করে ?...সব জাতীয় চেতনাই তার ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে। যতদিন সে-ঐতিহ্যকে বুনিয়াদ করে সাহিত্য রচিত না হবে, ততদিন সে-সাহিত্য থেকে কোনো জাতি প্রেরণা পাবে না। একটা অতি আধুনিক নজীর দিচ্ছি। ইংরেজি সাহিত্য খুবই উন্নত ও সম্পদশালী সাহিত্য। ওটা মিলটন শেক্সপিয়র স্কট শেলীর সাহিত্য। কিন্তু অত বড় সাহিত্যও আইরিশ জাতির প্রেরণা জাগাতে পারে নি। সুইফট, বার্কলে, গোল্ড স্মিথ ও বার্ণাডশ’র মতো অনেক প্রতিভাবান আইরিশ এই ইংরেজি সাহিত্যের সেবা করেছেন, বিশ্বজোড়া নামও করেছেন। কিন্তু তাদের সাহিত্যসেবা হয়েছে লন্ডনে বসে—আয়র্লন্ডের মাটিতে নয়। আয়র্লন্ডবাসীর জাতীয় জীবনে সে সাহিত্য কোন স্পন্দন সৃষ্টিও করতে পারে নি। তাই পার্নলে, ড্যাভিট, রেড-মন্ড প্রভৃতি রাষ্ট্রনেতার বিপুল ত্যাগ, কঠোর সাধনা কিছুই আইরিশ জাতির মুক্তি আন্দোলন সফল করতে পারে নি। অথচ যেদিন আয়র্লন্ডের জাতীয় কবি ডব্লিউ বি. ইয়েটস ইংরেজি প্রভাবমুক্ত স্বাধীন আইরিশ সাহিত্য সৃষ্টি করলেন, ইংরেজি কালচারের অনুকরণ মুক্ত করে তিনি যেদিন আইরিশ সাহিত্যসাধনাকে কেলটিক সংস্কৃতির বুনিয়াদে নিজস্ব রূপ দান করলেন, সেদিন আইরিশ গণ-মন নিজের হারানো ধন ফিরে পেল; নবজন্মের আনন্দে সে মেতে উঠল; নিজের ভাগ্য-নির্মাণে সে কর্মোন্মত্ত হয়ে গেল, তার ফল হলো এই যে, আইরিশ জাতির দুই শ’ বছরের ব্যর্থ স্বাধীনতা আন্দোলন ডি-ভেলেরার নেতৃত্বে কুড়ি বছরে জয়যুক্ত হলো।’’

জল গড়িয়ে কোথায় যায়, খেয়াল রাখা জরুরি। ‘জল আগে না পানি’, কিংবা ‘জলের উপর পানি’, নাকি ‘পানির উপর জল’, অথবা ‘আলীর উপর কালী’, নাকি ‘কালীর উপর আলী’—এসব প্রশ্ন খোলতাই করতে হলে এসবের ওপর নজর দেওয়াটা প্রয়োজনে। তাহলে বোঝা যাবে হৃদয়ের বিভাজন কীভাবে বা কোন উপায়ে পৃথক দেশ, স্বতন্ত্র সত্তা নির্মাণের দিকে নিয়ে গেল, অসম্ভব এক অনিবার্যতায়।

‘মহেশ’ গল্পের শেষটা একটু দেখে নেওয়া যাক এবার—

“অনেক রাত্রে গফুর মেয়েকে তুলিয়া কহিল, আমিনা, চল্ আমরা যাই—

সে দাওয়ায় ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, চোখ মুছিয়া উঠিয়া বসিয়া কহিল, কোথায় বাবা ?

গফুর কহিল, ফুলবেড়ের চটকলে কাজ করতে।

মেয়ে আশ্চর্য হইয়া চাহিয়া রহিল। ইতিপূর্বে অনেক দুঃখেও পিতা তাহার কলে কাজ করিতে রাজী হয় নাই, সেখানে ধর্ম থাকে না, মেয়েদের ইজ্জত-আব্রু থাকে না, এ কথা সে বহুবার শুনিয়াছে।

গফুর কহিল, দেরি করিস নে মা, চল, অনেক পথ হাঁটতে হবে।

আমিনা জল খাইবার ঘটি ও পিতার ভাত খাইবার পিতলের থালাটি সঙ্গে লইতেছিল, গফুর নিষেধ করিল, ওসব থাক মা, ওতে আমার মহেশের প্রাচিত্তির হবে।

অন্ধকার গভীর নিশীথে সে মেয়ের হাত ধরিয়া বাহির হইল। এ গ্রামে আত্মীয় কেহ তাহার ছিল না, কাহাকেও বলিবার কিছু নাই। আঙিনা পার হইয়া পথের ধারে সেই বাবলাতলায় আসিয়া সে থমকিয়া দাঁড়াইয়া সহসা হুহু করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। নক্ষত্রখচিত কালো আকাশে মুখ তুলিয়া বলিল, আল্লা! আমাকে যত খুশি সাজা দিয়ো, কিন্তু মহেশ আমার তেষ্টা নিয়ে মরেচে। তার চ’রে খাবার এতটুকু জমি কেউ রাখে নি। যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয় নি, তার কসুর তুমি যেন কখনো মাপ কোরো না।’’

গফুরের এই চাওয়া বৃথা যায় নি, তবে যেমনটা হওয়ার কথা ছিল সেটা হয় নি। শরৎচন্দ্রকে বলা হয় ‘অমর’ কথাশিল্পী। একজন শিল্পী বা কথাকারকে কেন ‘অমর’ বলা হয়, সহজ উত্তর হলো যখন তার চরিত্ররা ‘অমর’ হয়ে যায়। উনার সৃষ্ট একাধিক চরিত্র ‘অমর’ হয়েছে, আমরা আলোচনা সীমিত রেখেছি ‘গফুর’, ‘মহেশ’ ও ‘আমেনা’র ওপর। এই চরিত্ররা কতটা অমর যখন তাদের খুঁজে পাওয়া যায় গানে ও কবিতায়। ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে ওরা যেন নতুন করে আমাদের মুখোমুখি করে দেয় স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রকল্পের সামনে। 

গানে গানে উল্লেখিত হয়েছে—

শরৎ বাবু, খোলা চিঠি দিলাম তোমার কাছে/ তোমার গফুর মহেশ এখন কোথায় কেমন আছে তুমি জানো না

হারিয়ে গেছে কোথায় কখন তোমার আমিনা/ শরৎ বাবু এ চিঠি পাবে কিনা জানি না আমি।

গেল বছর বন্যা হলো এ বছর খরা/ খেতের ফসল ভাসিয়ে নিলো মাঠ শুকিয়ে মরা/ এক মুঠো ঘাস পায় না মহেশ দুঃখ ঘোচে না/ তুমি জানো না।।

বর্গিরা আর দেয় না হানা নেই তো জমিদার/ তবু কেন এদেশ জুড়ে নিত্য হাহাকার/ জেনেছো দেশ তো স্বাধীন আছে ওরা বেশ/ তোমার গফুর আমিনা আর তোমারই মহেশ/ এক মুঠো ভাত পায় না খেতে গফুর আমিনা /তুমি জানো না। 

[কথা—শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর—অংশুমান রায়, শিল্পী-ভূপেন হাজারিকা]

গত শতাব্দীর বাংলা আর একুশ শতকের বাংলাদেশের সমাজচিত্র কি একই রয়ে গেল ? কিন্তু কেন এমন হবে। উপনিবেশ মন আর স্বাধীন সত্তা যদি একই তরী বায়, তা হলে তো সবকিছু শূন্য হয়ে যায়, আমরা কি সেই শূন্য রচনায় করে যাব ? মনে রাখা জরুরি, বিংশ শতকের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধ ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও রক্তক্ষয়ী ও ঘটনাবহুল। এই যুদ্ধ ব্রিটিশ-ভারতের রাজনীতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রভূত ভূমিকা রাখে। প্রথম দিকে এই যুদ্ধ ইউরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও দ্রুত এশিয়াও জড়িয়ে যায়। এবং বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়।

এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে অবিভক্ত বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ব্রিটিশরা এই যুদ্ধের অংশভাক ও সুবিধাভোগী অথচ তার পুরো খেসারত দিতে হয় বাংলাকে। যুদ্ধরত সৈনিকদের যেন কোনোভাবেই খাদ্যের সংকটে পড়তে না হয়, সেকারণে সকল খাবার ব্রিটিশ সরকারের নীতি অনুযায়ী গুদামজাত করে আটকিয়ে রাখা হয়। চার্চিলের অমানবিক নীতির কারণে এই দুর্ভিক্ষে কমপক্ষে পঞ্চাশ লাখ লোক মারা যায়। উল্লেখ্য, বাংলার অতীত ইতিহাস বলছে এ অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের কোনো নজির নেই। পুন্ড্র অঞ্চলে একটি দুর্ভিক্ষের কথা জানা যায়। যা স্থানীয়ভাবেই মোকাবেলা করা হয়েছিল। রাজ কোষাগার থেকে এই শর্তে ঋণ বা সহযোগিতা করা হয়েছিল যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই ঋণ শোধ করতে হবে। বাংলায় দুর্ভিক্ষ না হওয়ার প্রধান কারণ, বাংলা প্রাকৃতিকভাবেই সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলা। এর মাটি উর্বর, এখানে পানির সরবরাহের কোনো কমতি নেই। এছাড়া প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা মসলা সমৃদ্ধ এলাকা। এখানকার মসলিনের খ্যাতি বিশ^জোড়া। বাণিজ্যিকভাবে বাংলা অনেক আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। চীন থেকে সিল্করোড মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ ও আফ্রিকায় গেছে। এই সিল্করোডের একটা গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছিল সেদিনের পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশ। ফলে, বাণিজিক্যভাবে এই জনপদ সেই প্রাচীনকাল থেকেই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত ছিল। উয়ারী বটেশ^রের প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে প্রমাণিত যে, দেড় হাজার বছর আগে এখানে বাণিজ্যিক নগরীর গোড়াপত্তন হয়েছিল। সিল্করোডকে ঘিরে বাণিজ্যের প্রসার হওয়ায় এসব এলাকায় জনবসতির ঘনত্বও তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। এ কারণে ১৮৭২ সালে ব্রিটিশদের দ্বারা এখানে জনগণনা শুরু হওয়ার পর দেখা যায় সেই সময়ের জেলাগুলোর মধ্যে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। এতে দুটো বিষয় সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসা সহজ হয়। এক. সিল্করোডের পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুসলমানরা অভিবাসী হয়েছেন, ব্যবসা সূত্রে এইসব এলাকায় আরবের বণিক মুসলমানদের আসা-যাওয়া ছিল, যারা বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের সংস্পর্শে এসে ধর্মান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। বাঙালি মুসলমানের নিচের তলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের আদি ইতিহাস মূলত এরকমই। দুই. সিল্করোডের গুরুত্ব যে বেশি ছিল তার প্রভাব পাওয়া যায়, অভিবাসিত হওয়ার মধ্য দিয়ে, এবং এই অঞ্চলের গুরুত্ব নিশ্চিত হওয়া যায় এসব প্রক্রিয়ার সমগ্রক রূপের মধ্য দিয়ে। উল্লেখ্য, রংপুর অঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটেছে বেশ আগে, ইসলামের আবির্ভাবের প্রত্যুষকালেই, সৌদি আরবের কাছাকাছি সময়ে। সেদিনের রঙ্গপুরের লালমনিরহাটের অনতিদূরে সাগরের ছড়া গ্রামেই পাওয়া গেছে ৪৯ হিজরীতে স্থাপিত হওয়া মসজিদের হদিশ।

এসবই এই অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর পুরাণের গৌরবগাথা।  কিন্তু এসব থেকে কী শিক্ষা নিলাম আমরা ? হৃদয়ের বিভাজন দূর করে হৃদয় জোড়া লাগানোর তরিকা কি দৃশ্যমান হচ্ছে আদতে ? যদি না হয় তা হলে আমেনাদের পরিণতি কি কেবলই রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার দশায় নিপতিত হবে ? কবি-সাহিত্যিকেরা কেন এসব চরিত্রকে ‘অমর’ করে তোলেন, যাতে সমাজ-রাষ্ট্র এখান থেকে যথার্থ পথ খুঁজে পান, মানুষের মুক্তি ঘটে। এ কারণে শরতের আমেনা হাজির হন, ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে। হাজির হন হুমায়ূন কবিরের অনূদিত কবিতায়।

‘ মেঘনায় ঢল’ কবিতায় তিনি লিখলেন—

“শোন্ মা আমিনা, রেখে দে রে কাজ ত্বরা করি মাঠে চল

এল মেঘনায় জোয়ারের বেলা এখনি নামিবে ঢল।

নদীর কিনার ঘন ঘাসে ভরা

মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা

করিস না দেরি—আসিয়া পড়িবে সহসা অথই জল

মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা মেঘনায় নামে ঢল।

 

ভরবেলা গেলো, ভাটা পড়ে আসে, আঁধার জমিছে আসি,

এখনো তবুও এল না ফিরিয়া আমিনা সর্বনাশী।

দেখ্ দেখ্ দূরে মাঝ-দরিয়ায়,

কাল চুল যেন ঐ দেখা যায়—

কাহার শাড়ির আঁচল-আভাস সহসা উঠিছে ভাসি ?

আমিনারে মোর নিল কি টানিয়া মেঘনা সর্বনাশী...।”

মূল কবিতা ‘The Sands of Dee’, কবি Charles Kingsley. কবিতাটির অংশবিশেষ এরকম—

"O Mary, go and call the cattle home,

And call the cattle home,

And call the cattle home

Across the sands of Dee";

The western wind was wild and dank with foam,

And all alone went she.

লক্ষণীয়, মূল কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘মেরি’ অনূদিত কবিতায় হাজের-নাজেল হলেন ‘আমেনা’রূপে। মেরি কেন আমেনা হয়ে গেল ? কেন মরিয়ম হলো না ? মনে রাখা প্রয়োজন মেরি পাশ্চাত্য সভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র। এ কারণে ‘The Sands of DeeÕতে কবি Charles Kingsley কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে হাজির করেন মেরিকে। যা কবিতার ভাবগত ঐশ্বর্যকে অন্যমাত্রা ও তাৎপর্যবাহী এক বারতা। সেই মাত্রা ও তাৎপর্যকে আমলে নিয়েই কবি বেছে নেন ‘আমেনা’কে। সাহিত্যের দীঘল ক্যানভাসে সেই আমেনার স্রষ্টা হলেন শরৎচন্দ্র। এই আমেনার প্রতি খেয়াল করলে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কেন বাংলায় হৃদয়ের বিভাজন ঘটেছিল। দেশভাগের নেপথ্য কারণ কী ছিল। গফুর, আমেনা আর মহেশদের নিষ্ঠুর বাস্তবতা ও করুণ পরিণতিই যে এসবের জন্য দায়ী তা নিশ্চয় অস্বীকার করা যাবে না। শরৎবাবুকে আমরা শাদাচোখে হৃদয়ের কথাকার হিসেবে জানি। কিন্তু তিনি কেবল হৃদয়ের কথাকার ছিলেন না, হৃদয় বিভাজনের-আরশিনগরেরও কথাকার ছিলেন। এক্ষণে দেখে নেওয়া যাক হৃদয়ের কথাকারের সৃজন বৃত্তকে, খোলতাই হোক তার চিন্তন জগৎ।

 

দুই

শরৎচন্দ্র ছিলেন হৃদয়ের সম্রাট। কোন হৃদয়, যে হৃদয় বাঙালির। যে হৃদয় নদীমাতৃক বাংলাদেশের। যে হৃদয় ভালোবাসতে জানে, ভালোবাসার জন্য সর্বস্ব বাজি রাখতে পারে। সেই যে কবি বলেছিলেন, ভালোবেসে কেউ কেউ খুনি হয়ে যায়। এই হৃদয় ভালোবাসার জন্য খুনও করতে পারেন। এই কারণেই এ কথা বলা। যদি কেউ মনে করেন এটা কেবলই বলার জন্য, তা হলে  হৃদয়ের সম্রাটের ওপর অবিচার করা হবে। যেমনটা হয়েছিল তাঁর জীবদ্দশায়, যেমনটা হচ্ছে আজও। 

বাঙালির হৃদয় বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। বাঙালি কি তাকে বুঝতে পেরেছিলেন, পুরোটা ? বোঝার জন্য কোশেশ কি জারি রেখেছেন ? কি একাডেমিক পর্যায়ে, কি চেনা সেই বৃত্তের বাইরে ? বলছি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা। ১৯৩৮ সালের আজকের দিনে যিনি বিদায় জানান ইহজাগতিকতাকে। তার ঠিক দুই বছর আগে পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিলিট উপাধি। বড় মুখ করে বলার মতো স্বীকৃতি ও সম্মাননা ছিল এটাই। তার আগে ১৯২৩ সালে পেয়েছিলেন জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, ১৯০৩ সালে পেয়েছিলেন কুন্তলীন পুরস্কার। হৃদয় সম্রাটের এই প্রাপ্তিই বলে দেয় যারা পদক-পুরস্কার ও সম্মাননা দেন তারা প্রতিভা চেনার চেয়ে মানসাঙ্ক বুঝতেই বেশি পারঙ্গম। যে মানসাঙ্কের ধার ধারেন না পাঠক। একারণে যে কথাশিল্পীর পুরস্কার ভাগ্য খরাবেষ্টিত পাঠকপ্রিয়তায় তার বসন্ত যায় নি আমৃত্যু। এ কারণে বাঙালি তাঁকে অমর কথাশিল্পীর মর্যাদা দিয়েছেন। সত্যসত্যই তিনি ছিলেন সেই জয়মাল্যের অধিকারী।

বাংলা ভাষা ও বাঙাল মুলুকে তো বটেই এই উপমহাদেশেরও সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাশিল্পী ছিলেন তিনি। শুধু কি গল্প-উপন্যাসে ? তাঁর সৃষ্টি থেকে মঞ্চে-সেলুলয়েডে যা কিছু নির্মিত হয়েছে তাও জনপ্রিয়তার রেকর্ড গড়েছে।  এমনকি টিভির পর্দায়ও শরৎবাবুর লেখা থেকে নির্মিত একক, খণ্ড, ধারাবাহিক কিংবা দীর্ঘ ধারাবাহিকও দর্শকপ্রিয়তায় আকাশচুম্বী সফলতা পেয়েছে। এ সবই প্রমাণ করে বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি উদাহরণ জাগানিয়া শিল্পী। উপমহাদেশের উল্লেখযোগ্য সবকটি ভাষায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে যে ক’টি ভাষা গভীরভাবে প্রভাবিত করে তার সবগুলোতে অনূদিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টি।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টির প্রসঙ্গ এলেই বাঙালির বৌদ্ধিকসমাজের কাছে হাজির হয় ‘দেবদাস’ উপন্যাসের কালজয়ী চরিত্ররা, তাদের মুখে উচ্চারিত সংলাপ। দেবদাসের আবেদন এখনো শেষ হয় নি, আগামীতেও সহজে শেষ হবে এমনটা বলা দুরূহ। শুধু কি খসখসে কাগজের পৃষ্ঠায় দেবদাসের আবেদন, তেমনটা নয় কিন্তু মোটেই। বেতার দুনিয়ায়, টেলিভিশনের পর্দায়, চলচ্চিত্রের রুপালি আলোয় এই উপন্যাস প্রতিবারই নতুনরূপে-নতুন আবেদনে হাজির হয়ে নিজের অনন্যতাকেই হাজের নাজেল করেছে। ঢালিউড, টলিউড, বলিউড এমনকি দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্র দুনিয়াতেও শরৎচন্দ্রের দেবদাস কাহিনি হিসেবে আজও টপ রেটেড। দেবদাসের কাহিনি সাধারণ। গল্পে নেই আহামরি কিছু। সেই প্রেম, অপূর্ণতা, ব্যর্থতা, গতানুগতিক সংলাপ, চেনা এবং প্রচল কথায় ছড়িয়ে রয়েছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠাজুড়ে। কিন্তু তার পাঠক মাত্রই অনপেক্ষণীয় আকর্ষণ-টান অনুভব করেন। প্রজন্ম বদলায়, শ্রোতা-দর্শকের রিপ্লেসমেন্ট হয় কিন্তু দেবদাসের আবেদন কমে না। পশ্চিমবঙ্গে দেবদাস মেলার যে আয়োজন তাতে মানুষের উপস্থিতিতে কোনোপ্রকার ভাটা পড়ে না। বাংলা সাহিত্যের কোনো উপন্যাসের চরিত্রের নামে দীর্ঘসময় ধরে ফি বাৎসরিক এরকম মেলার আয়োজন, বাস্তবিকই তুলনারহিত এক উদাহরণ। এখন প্রশ্ন হলো, দেবদাসে তাহলে কী আছে যাতে বুঁদ হতে ভালোবাসে পাঠক ? এর উত্তর একটাই। আছে হৃদয়।

দেবদাসের পৃষ্ঠাজুড়ে রয়েছে হৃদয়বৃত্তির প্রকাশ। যে হৃদয় মানুষকে মানুষ হিসেবে বড় করে তোলে। মহৎ সাহিত্যের বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাতে হৃদয়ের কথা যেমন থাকতে হবে, তেমনি হৃদয় দিয়ে সবকিছু দেখার প্রবণতা-প্রচেষ্টা সর্বান্তকরণে জারি রাখতে হবে। মহৎ হৃদয়ের কথা মহৎ হৃদয়ধারী ব্যক্তিই কেবল বলতে পারেন। অন্যের পক্ষে সম্ভব নয়। যদি কেউ সেই চেষ্টা জারি রাখতে চান তাহলে সেটা হয়ে ওঠে কাকের ময়ুরপুচ্ছ ধারণ। গ্রীক সমালোচক লঞ্জিনাস দুহাজার বছর পূর্বেই একথা বলে গেছেন, ‘মহৎ সাহিত্য এক মহৎ মানুষের সৃষ্টি।’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আমাদের মহৎ মানুষ, তাঁর সৃষ্টি মহৎ সাহিত্য। এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্তের শরৎ নিয়ে একটা প্রশ্ন হাজির করতে চাই। তিনি বলেছিলেন, “মহৎ সাহিত্য যদি মহৎ মানুষের সৃষ্টি হয় তা হলে আমাদের একালের সাহিত্য মহৎ সাহিত্য কিনা তা ভেবে দেখতে হবে।”

কেবল দেবদাসে নয়, শরৎবাবু সকল লেখাতেই হৃদয়বৃত্তির কথা বলেছেন। হৃদয়বৃত্তির মধ্য দিয়ে তিনি মিটিয়েছেন একজন মানুষ হিসেবে—একজন লেখক হিসেবে পরিবার-স্বজন-সমাজ-রাষ্ট্র এবং সময়ের কাছে থাকা সকল দায়। একজন মহৎ শিল্পীর বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি বিন্দুতে সিন্ধু হাজির করার ক্ষমতা রাখেন। তিনি সর্বত্র সকলাবস্থায় তাঁর কিবলা ঠিক রাখেন। শরৎবাবুর সৃষ্টিতে সেই মহৎ মানুষের উপস্থিতি ঘটে সহজিয়া ঢঙে। এ কারণে যারা বলেন শরৎ মানেই কান্নার ঢেউ; শরতের সৃষ্টি মানেই জল আর নাকের মলের মাখামাখি; তারা শুধু জল আর মলই দেখেন, হৃদয় দেখেন না। হৃদয়ের শক্তিই যে বড় শক্তি, হৃদয়ের বিপ্লবই যে বড় বিপ্লব। সেটাকে পর্যবেক্ষণ করেন না, বড়ো করে দেখার কোশেশে নিজেদের যুক্ত করেন না। কিন্তু ইংরেজরা ঠিকই দেখেছিলেন। তারা শরৎ সৃষ্টিমাত্রই কান্নার বুদ্বুদ—উপরিতলের এই ভাবনাকে আমলে নেন নি, ভেতরের সত্যকেই অন্বেষণ করেছেন।

‘পথের দাবী’ উপন্যাস এ কারণেই ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরাজ নিষিদ্ধ করেছিলেন। সেসময় পাশে পান নি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, যেটা মনে প্রাণে চেয়েছিলেন শরৎবাবু। রবীন্দ্রনাথ কেবল একটা চিঠি লিখেছিলেন। যার সারমর্ম ছিল, আঘাত করলে প্রত্যাঘাত আসবেই। এ কারণে আঘাত করার পূর্বে প্রত্যাঘাতে সতর্ক ও সচেতন হওয়া জরুরি। কবিতায় নজরুল, উপন্যাসে শরৎ ছাড়া ব্রিটিশ বেনিয়ার ১৯০ বছরের শাসন-পীড়নে আর কোনো নজির আছে কি, যিনি সরাসরি পড়েছিলেন রাজরোষের শ্যেনদৃষ্টিতে ?

শরৎচন্দ্র হৃদয় দিয়ে সবকিছু বুঝতে চেয়েছেন, হৃদয় দিয়ে উপড়াতে চেয়েছেন সকল প্রকার অন্যায়-অবিচার, শাসন-শোষণ, নির্যাতন-নিপীড়নের যাঁতাকল। জীবনকে গ্রহণ করেছিলেন শাদামাটাভাবে, কিন্তু হৃদয়ের শাসনকে মান্যতা দিয়ে। লেখক হবেন এরকম বাসনা ছিল না কখনোই। বাবা মতিলালের লেখার অভ্যাস ছিল, কিন্তু নিয়মমাফিক নন। লিখতেন কিন্তু শেষ করার তাগিদ অনুভব করতেন না। বাবার অসম্পূর্ণ লেখাগুলো পড়ে নানান রকমের প্রশ্ন আকুলিবিকুলি করত মনের ভেতর। কেন শেষ করেন নি লেখাগুলো ? শেষ করলে কীভাবে করতেন ? তারপর কী হতো ? আমি শেষ করলে কীভাবে করব ? বাবার ভাবনাটাইবা কী ছিল! এইসব প্রশ্ন কিশোর বেলায় যাকে ভাবুক করে তুলত, তিনিই বড়বেলায় হয়ে উঠলেন অমর এক কথাশিল্পী। এবং যেমন-তেমন একজন কথাশিল্পী নন, পাঠক-হৃদয় জয় করা। অভাব ছিল যাঁর প্রথম জীবনের রন্ধে রন্ধে, তিনিই পরবর্তী সময়ে কেবল লেখার বদৌলতে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভার এক জীবনের অধিকারী হয়েছিলেন। এ সবই সম্ভব হয়েছিল প্রধানত একটা কারণে—হৃদয়ের বারতা শোনার জন্য। হৃদয়বৃত্তিকে স্থান দিয়েছিলেন সবার ওপরে। যখন যেখানে, যা কিছু করেছেন সবকিছুতে হৃদয়কে দিয়েছেন সহজাতভাবে প্রকাশের অবারিত সুযোগ। অসিতে তাঁর বিশ্বাস ছিল না। মসিতেই রাখতেন প্রগাঢ় আস্থা ও অনুভব। এবং অনিবার্যভাবে সেই মসি ছিল হৃদয়ের মসি।

শরৎবাবু তেরো বছরের অধিক সময় ছিলেন আজকের মায়ানমারে। সেদিনের সেই ব্রক্ষ্মদেশ ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার নিয়ন্ত্রণে। জীবিকার প্রয়োজনে সেসব দিনগুলোতে কতকিছুই না করেছেন তিনি। গান গেয়ে গেয়ে দিন গোজরানের চেষ্টা করেছেন। সন্ন্যাসবৃত্তিতে জড়িয়েছেন। কিন্তু হৃদয়ের আমলনামাকে উপেক্ষা করেন নি। সেইসময় একটা ব্রোথেলে গিয়ে একজন রূপোপজীবীর সঙ্গে পরিচয় হয়। তখন তিনি অসুস্থ। শরৎবাবু তাকে ছেড়ে যান নি। চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন। শরৎবাবুর সৃজন হৃদয় এরকমই, তাতে মানসাঙ্কের স্থান হয় নি কখনোই। এই ব্রক্ষ্মদেশে থাকাকালেই তাঁর প্রথম লেখা ‘বড়দিদি’ প্রকাশিত হয়, যা তিনি জানতেনও না। বড় গল্প মতান্তরে ছোট উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হলে সাড়া পড়ে যায় ব্যাপক। কেউ কেউ মনে করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছদ্মনাম দিয়ে ওই লেখা লিখেছেন। এ সংক্রান্ত চিঠিও আসে পত্রিকা দপ্তরে। বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষকে ঘোষণা দিয়ে শরৎবাবুর নাম পরিষ্কার করে জানাতে হয়। যাকে নিয়ে যার লেখা নিয়ে এত সব কাণ্ড তিনিই জানতেন না একজন নবীন লেখককে ঘিরে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে চলেছে। জানত না আসলে কেউই। পাঠকই কি জানত ‘বড়দিদি’র এই লেখকই ক’দিন পর বাংলা কথাসাহিত্যে অমর কথাশিল্পীর উষ্ণীষ পাবেন!

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বঙ্গ মানেই নদ-নদীর মতো নানাবিধ জলরাশির ভান্ডার। বাংলার-বঙ্গের ভাষায় রয়েছে জলের সোঁদা গন্ধ। একারণে এর আবহাওয়ায় এরকম-মানুষের বৈশিষ্ট্য এরকম। এখানকার মানুষ হাসিতেও কাঁদে, কান্নাতেও কাঁদে। কেঁদেই সে প্রকাশ করে ভালোবাসা-রাগ-দুঃখ-আবেগ-অভিমানের মতো মানবীয়বৃত্তির। কেঁদেই সে সুখী হয়, কেঁদেই সে দুখী হয়, হয় গৌরবান্বিত-মহিয়ান। এখানকার সংস্কৃতি নদীজাত-জলপ্রেমে টাপুর টুপুর। বাঙালির কান্না মানেই তার বিন্দুতে বিন্দুতে রয়েছে বঙ্গজ সংস্কৃতির প্রবল উপস্থিতি। শরৎবাবু বাঙালির এই কান্নাকে ধরতে পেরেছিলেন তাঁর লেখায়। আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন বাঙালি হৃদয়ের শানে নযুল—কোন কান্নায় সে কোন কথা কয়, জানায় হৃদয়ের কোনো ইঙ্গিত কিংবা গোপন বারতা। 

এসব সফল ও সার্থকভাবে ধরতে পেরেছিলেন শরৎবাবু। যা গভীরভাবে মূর্ত হয়েছে শরৎ সাহিত্যে। হৃদয় দিয়ে বাঙালির বৃহত্তর হৃদয়কে ধরেছিলেন তিনি। একারণে তাঁর সাহিত্যে কেবল গল্প থাকে না, কান্নাও থাকে। এই কান্না বাঙালির বাঙালিত্বকে প্রকাশ করে। এই কান্না কেবল লালনের হাওয়ার ঘরে কিংবা কথাসাহিত্যের পট-ক্যারেক্টার-সেনটেন্স-ওয়ার্ডের দুনিয়ায় ফাঁদ পেতে ধরা যায় না। হৃদয় দিয়ে ধরতে হয়। শরৎ সাহিত্যে মেলে যার আকর উপস্থিতি।

শরৎচন্দ্রের সার্ধশতবর্ষে তাঁর হৃদয় অবলোকনকে বহুস্বর ও স্তরে দেখা জরুরি ও অবিকল্প। এভাবে দেখতে পারলেই আমরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হব ‘দেবদাস’, ‘পথের দাবী’, ‘মহেশ’-এর রচনাকারের  সৃজনশৈলীর মৌলিকত্ব ও ফারাকসমূহ। ওয়াকিবহাল হওয়া সম্ভব হবে কেন দেশভাগ হলো; কেন হৃদয়ের বিভাজনই বাঙালি মুসলমানকে নিয়ে গেল অনিবার্য এক রাষ্ট্র নির্মাণের প্রশ্নে।

Leave a Reply

Your identity will not be published.