একুশ শতকের চোখে শরৎচন্দ্র

একুশ শতকের চোখে শরৎচন্দ্র

বাংলা সাহিত্যের ঋদ্ধ ধারায় সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)। জন্মেছিলেন তিনি আজ থেকে সার্ধ-শত বছর পূর্বে, মৃত্যুর পরেও আমরা পেরিয়ে এসেছি প্রায় নব্বই বছর। উনিশ-বিশ শতকজুড়ে তাঁর জীবন, তবে সাহিত্যিক হিসেবে তিনি বিশ শতকের লেখক। সাহিত্যিক হিসেবে শরৎচন্দ্রের আবির্ভাবের পর অতিক্রান্ত সুদীর্ঘ সময়ে বিশ্বসাহিত্যের নানা বাঁকবদল ঘটেছে, রূপান্তর ঘটেছে বাংলা সাহিত্যেরও। তবু ভাবতে বিস্ময় লাগে, বাঙালি পাঠকের কাছে শরৎচন্দ্র এখনো সমান প্রাসঙ্গিক—না-কি বলব জনপ্রিয়তম লেখক। কিন্তু কেন ? একুশ শতকের এই প্রযুক্তির যুগে সাহিত্যের নানামাত্রিক রূপান্তরের পরেও শরৎচন্দ্র কীভাবে এখনো সমান জনপ্রিয় থাকতে পারেন, কোথায় তাঁর রচনার শক্তি—সেসব নিয়ে আজকের এই বয়ান।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জটিল সময়সংক্রান্তিতে বাংলা সাহিত্যে শরৎচন্দ্রের দীপ্র আবির্ভাব। বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজের অত্যাসন্ন পতন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে মানবিক মূল্যচেতনায় ক্রমভঙ্গুরতা এবং ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সময়খÐে শরৎচন্দ্র আবেগশাসিত ও ভাবালুতালালিত যে উপন্যাসধারা নির্মাণ করেছেন, বাঙালি পাঠক সেখানেই অকস্মাৎ পেয়ে গেল তার স্বপ্নময় জীবনের আশ্রয়। যে জীবন বাংলাদেশ থেকে ক্রমেই অপসৃত হয়ে যাচ্ছে, পাঠক সে-জীবনকেই খুঁজে পেল শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে। একান্তবর্তী পরিবারের ভাঙনের পটে শরৎচন্দ্রের উপন্যাস বাঙালিকে করেছে প্রবলভাবে আবেগায়িত। বাস্তবে অনুপস্থিত কল্পনার এক সংসার বলয় রচিত হতে দেখে বাঙালি পাঠক বিস্ময়কর একাত্মতায় অবগাহন করেছে শরৎসাহিত্যে। প্রসঙ্গত স্মরণীয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অভিমত : “শরৎচন্দ্রের দৃষ্টি ডুব দিয়েছে বাঙালির হৃদয়রহস্যে। সুখে-দুঃখে, মিলনে-বিচ্ছেদে সংঘটিত বিচিত্র সৃষ্টির তিনি এমন করে পরিচয় দিয়েছেন, বাঙালি যাতে আপনাকে প্রত্যক্ষ জানতে পেরেছে।” রবীন্দ্রনাথের এ মন্তব্যই শনাক্ত করে দেয় শরৎসাহিত্যের জনপ্রিয়তার মৌল-সূত্র।
একুশ শতকের মননঋদ্ধ যুগে শরৎচন্দ্র পাঠককে নিয়ে যান আবেগের সাত-সমুদ্রে। আবেগের নীলজলে সিক্ত করে মননশীল পাঠককেও শরৎচন্দ্র নিয়ে যান আপন আবেগের তেপান্তরে—মুহ‚র্তেই পাঠক মন্ত্রমুগ্ধের মতো বুঁদ হয়ে যান শরৎচন্দ্রে। একথা সবার কাছেই বিদিত যে, শরৎচন্দ্র উপন্যাস রচনায় মননশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তির চেয়ে ভাবাবেগকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। মননশীলতা, তাঁর উপন্যাসে, ভাবাবেগের কাছে পৌনঃপুনিকভাবে পরাভ‚ত হয়েছে—সর্বত্রই ভেঙে গেছে ঔপন্যাসিক চরিত্রপুঞ্জের সব ধরনের বুদ্ধি ও সংযমের বাঁধন। ঔপন্যাসিক সিদ্ধির জন্য চরিত্রের এ ধরনের পরাভব, সন্দেহ নেই, অনুক‚ল নয়। উপর্যুক্ত প্রবণতাই বাংলা উপন্যাসের ধারায় শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বড় গুণ কিংবা প্রবল দোষ। তবে তাঁর কথাসাহিত্য যে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে, তার পশ্চাতে এই ভাবালুতাময় জীবনই মুখ্য ভ‚মিকা পালন করেছে, সে-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। বাঙালির আবেগ জীবনের সরল অকপট কথকতাই তাঁর কথাসাহিত্যের অনিঃশেষ বিশিষ্টতা।
শরৎচন্দ্র মানবতাবাদী লেখক—মানুষকে তিনি সবকিছুর উপরে স্থান দিয়েছেন। সমকালের অন্য লেখকের মতো তিনি সংকীর্ণ ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন ছিলেন না। মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সামাজিক বঞ্চনা ও অসহায়ত্বকে গভীর সহানুভ‚তির সঙ্গে দেখেছেন তিনি। একুশ শতকের মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়-বিষয়ক ধারণার সঙ্গে শরৎচন্দ্রের চিন্তা-ভাবনাকে মিলিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে। শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যের অনেক চরিত্র তথাকথিত সামাজিক বিধি-নিষেধের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে, কখনো-বা তারা সামাজিক রীতি-নীতির চাপে নিজস্ব অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে বাধ্য হয়েছে। সেকালে সামাজিক রীতি-নীতি এবং বর্ণপ্রথা এত ভয়ংকর ছিল যে শরৎচন্দ্রের অনেক চরিত্র ওই বিধি-নিষেধের যূপকাষ্ঠে বলির শিকার হয়েছে। ধারণা করা যায়, চরিত্রের এই ধরনের পরাভব অঙ্কনে লেখক হিসেবে শরৎচন্দ্রের কষ্ট হয়েছে, তবু তিনি তা করেছেন, কারণ অন্যথায় উপায় ছিল না। শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যে ব্যক্তির ইচ্ছার সঙ্গে সামাজিক বিধি-নিষেধের নিয়ত দ্ব›দ্ব বেঁধেছে। শরৎচন্দ্র সে-দ্ব›েদ্বর কোনো মীমাংসায় পৌঁছুতে পারেন নি। বস্তুত, শরৎচন্দ্র কেন, এখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওই দ্ব›েদ্বর কোনো মীমাংসায় আমরা উপনীত হয়ে পারি নি।
শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যে নিম্নবর্গের মানুষের প্রতি গভীর সহানূভূতির কথা ব্যক্ত হয়েছে। তাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসের অনেক চরিত্রই উঠে এসেছে সমাজের নিম্নবর্গের স্তর থেকে। নিম্নবর্গের মানুষদের শরৎচন্দ্র স্থান দিয়েছেন সাহিত্যের কেন্দ্রে। একথা নিঃসন্দেহে বলা যাবেÑ শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্য কেন্দ্র-অভিসারী নয়, বরং প্রান্তমুখী। আজকের দিনের সমাজচিন্তায় যে অন্তর্ভুক্তিমূলকতার কথা বলা হয়, শরৎচন্দ্রের রচনায় শতবর্ষ পূর্বেই আমরা তার উপস্থিতি লক্ষ করি। আমাদের সমাজে দু-ধরনের নিম্নবর্গের মানুষ বিদ্যমান—একদল অর্থনৈতিকভবে অসহায় মানুষ, অন্যদলে আছে ভারতীয় বর্ণপ্রথার শিকার সর্বনিম্নশ্রেণির শূদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের বলা যেতে পারে ‘তলের তল’ (bottom of the bottom)। শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যে দ্বিতীয় ধারার নিম্নবর্গের উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ে। শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যে ভারতীয় জাতিবর্ণ ব্যবস্থার দৃঢ় শৃঙ্খলে আবদ্ধ নিম্নবর্গের মানুষের নানামাত্রিক জীবনসংগ্রাম, তাদের উপর উচ্চবর্ণের মানুষের—বিশেষত ব্রাহ্মণসমাজের—অত্যাচার-নিপীড়ন-বঞ্চনার ছবি অব্যর্থ ব্যঞ্জনায় শিল্পরূপ লাভ করেছে। একুশ শতকের চোখ দিয়ে শরৎসাহিত্যের নিম্নবর্গের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়Ñ শরৎচন্দ্রের মানসলোকে নিম্নবর্গের প্রতি কেবল ভালোবাসা আর সহানুভ‚তিই ছিল না, তিনি ঐকান্তিকভাবে কামনা করেছেন নিম্নবর্গের উত্থান।
নারীবাদী সাহিত্যতত্তে¡র আলোকে শরৎসাহিত্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা আবিষ্কার করতে পারব ভিন্ন এক শরৎচন্দ্রকে। নারীজাতির প্রতি প্রবল ভালোবাসা ও অবারিত সহানুভ‚তি শরৎমানসের বিশিষ্ট এক লক্ষণ। একালে নারীকে প্রাকৃতিক লৈঙ্গিক পরিপ্রেক্ষিতে নয়, বরং দেখা হয় সামাজিক জেন্ডার দৃষ্টিকোণে। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘নারীর মূল্য’ প্রবন্ধের কথা স্মরণ করা যায়। শতবর্ষ পূর্বেই শরৎচন্দ্রের রচনার মধ্যে নারীবাদী তাত্তি¡কদের এই মতবাদের ইঙ্গিত আমরা বিশেষভাবে লক্ষ করি। নারীকে তিনি নারী নয়, বরং দেখেছেন মানুষ হিসেবে। তিনি মনে করেন—নারীকে পুরুষের অধীন বা কেবল গৃহস্থালি কাজে সীমাবদ্ধ করে না দেখে, একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে তাকে দেখা ও তার অধিকারকে স্বীকার করা উচিত। তাঁর মতে নারী ও পুরুষ উভয়েই মানুষ—তাই বিচার-বিবেচনা ও মর্যাদার প্রশ্নে নারীর প্রতি সামাজিক-পারিবারিক বৈষম্য দূর করতে হবে। শরৎচন্দ্র বিশ্বাস করেন, নারী নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে। তাকে অবলা বা নির্ভরশীল বা মহিলা বলে দেখার সামাজিক-পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। শরৎচন্দ্র লিখেছেন—“নারীকে কেবল পুরুষের সহচরী বা ভোগের বস্তু হিসেবে বিচার করা উচিত নয়; তার নিজস্ব মানবিক মর্যাদা আছে, আছে সামাজিক পরিচয়।” বিশ শতকের প্রথমােের্ধর শিল্পী হয়েও শরৎচন্দ্র একুশ শতকের এই জঙ্গম কালখÐে স্বমহিমায় থাকতে পারছেন প্রাসঙ্গিক হয়ে তাঁর ওই নারীবাদী ভাবনার সূত্রে। শরৎচন্দ্রের নারীরা কথা বলেছে, পুরুষতান্ত্রিক দাপটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, কখনো-বা প্রতিরোধ করতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছে নিজেকে।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে রূপলাভ করেছে ভ‚মিকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত জীবনের বিচিত্র সংকট ও সমস্যা, একান্তবর্তী পরিবারের নানা জটিলতা। মধ্যবিত্ত জীবন রূপায়ণে বহির্বাস্তবতার পরিবর্তে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে প্রাধান্য পেয়েছে চরিত্রপুঞ্জের মনোজাগতিক বাস্তবতা। ‘পল্লীসমাজ’ ছাড়া শরৎচন্দ্রের অন্য সব উপন্যাসেই অঙ্কিত হয়েছে, গ্রামীণ ভ‚সম্পত্তিকেন্দ্রিক জমিদারি ব্যবস্থার নানামাত্রিক অসঙ্গতি ও অনন্বয়ের ছবি। অচ্যুত গোস্বামী যথার্থই বলেছেন : “বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির যে বিরাট অংশ গ্রামের ভ‚সম্পত্তির মালিকানা থেকে উদ্ভূত হয়েছে, শরৎচন্দ্র তাদের প্রতিনিধি এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী।” জমিদারি ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা এবং তার প্রতি এক সহজাত সহমর্মিতাবোধ শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যে পৌনঃপুনিক শিল্পিতা পেয়েছে। প্রথম বিশ্বসমর-উত্তর সংক্ষুব্ধ কালের অধিবাসী হয়েও জীবনপ্রত্যয় ও শিল্পচেতনায় শরৎচন্দ্র ছিলেন স্মৃতিস্নিগ্ধ দূর অতীতের মানুষ। উপন্যাস কিংবা ছোটগল্পের বিষয়াংশ নির্বাচনে কিংবা আঙ্গিক বিন্যাসে তিনি উনিশ শতকী আবহেই বিচরণ করেছেন। উপন্যাসের প্লট, দৃষ্টিকোণ, চরিত্রায়ণ এবং অন্তিম মীমাংসা—সর্বত্রই আমরা তাঁর এ পশ্চাদ্মুখী মানসতা লক্ষ করি। জমিদারি ব্যবস্থাকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা, একান্তবর্তী পরিবারকে টিকিয়ে রাখা, সহানুভ‚তিতে সিক্ত করেও নারীকে পুরুষের মুখাপেক্ষী করে রাখা, সর্বোপরি সনাতন রক্ষণশীল মানসিকতার কাছে ব্যক্তির সত্তা বিসর্জন—এসব নেতিবাদী প্রবণতার কারণে শরৎসাহিত্য বিশ শতকী আধুনিকতাকে অঙ্গীকার করতে সমর্থ হয় নি। বিশ শতকী শিল্পী হয়েও উনিশ শতকী শিল্পাঞ্চলে বিচরণ করা, শরৎচন্দ্রের শিল্পীসত্তার পরাভব, সন্দেহ নেই। তবু তিনি কালজয়ী শিল্পী, বাঙালির আবেগ জীবনের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কথাকার। শরৎচন্দ্র যে একুশ শতকেও বাঙালি পাঠকের কাছে সমান আদরণীয়, তার পেছনেও আছে ওই আবেগ জীবনের অন্তর্গূঢ় প্রভাব। শরৎচন্দ্রই, অনুমান করি, এখনো বাঙালির প্রিয়তম কথাশিল্পী।
ঔপন্যাসিক হিসেবেই শরৎচন্দ্র বাঙালি পাঠকের কাছে সমধিক পরিচিত। ‘পল্লী-সমাজ’, ‘দেবদাস’, ‘চরিত্রহীন’, ‘দত্তা’, ‘গৃহদাহ’ , ‘দেনা-পাওনা’, ‘পথের দাবী’, ‘শেষপ্রশ্ন’—এসবই উপন্যাসের জন্য বাঙালির ঘরে ঘরে শরৎচন্দ্র এক আদরণীয় লেখক। ‘পল্লী-সমাজ’ বাংলা উপন্যাসের ধারায় এক ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। শতবর্ষ আগে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ-বাস্তবতা এ উপন্যাসে শিল্পরূপ লাভ করেছে। জমিদারি শোষণের চিত্র এখানে যেমন আছে, তেমনি আছে প্রজাসাধারণের প্রতিবাদের ছবি। ‘পল্লী-সমাজ’ সমাজ-সংস্কারমূলক উপন্যাস। গ্রামীণ জীবনপ্রবাহের বিচিত্র সমস্যা ও সংকটের প্রতি আলোকপাতই ছিল আলোচ্য উপন্যাসে শরৎচন্দ্রের মূল লক্ষ্য। তাই রমা ও রমেশের আদর্শায়িত প্রেমের প্রতি শরৎচন্দ্র তেমন মনোযোগ দেন নি, সমাজ-বাস্তবতার স্বরূপ উন্মোচন-সূত্রেই এ উপন্যাসে তিনি রমা-রমেশের প্রেম-ভালোবাসা-দ্ব›দ্ব ও সম্পর্ক নির্মাণ করেছেন।
‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে শরৎচন্দ্রের জীবন-অভিজ্ঞতা ও আত্মকথা। চার পর্বে সমাপ্ত ‘শ্রীকান্ত’ বাংলা সাহিত্যের এক অনুপম ও অদ্বিতীয় শিল্পকর্ম। বিচিত্র ঘটনা, বহু মানুষের জীবনকথা, অসংখ্য নর-নারীর আসা-যাওয়া, পরিব্রাজকের চলমানতা, বর্তমান ও স্মৃতিময় অতীতের অন্তর্বয়ন বিন্যাস, সময়ের সামনে চলা পেছনে যাওয়া—এসব পরস্পর বিচ্ছিন্ন উপকরণ ও উপাদান মিলে গড়ে উঠেছে ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের অনুপম অবয়ব। শরৎচন্দ্রের অন্য সব উপন্যাস গতানুগতিক ধারার একরৈখিক সংগঠনের প্রতিবেদন মাত্র। হার্দ্য-জটিলতা আর আবেগই সেসব রচনার মৌল প্রবণতা। সংগঠনের সারল্য ও একরৈখিকতাও বাঙালি পাঠককে প্রবলভাবে টেনেছে শরৎচন্দ্রের উপন্যাস। মননশীল পাঠক হয়তো এ প্রবণতায় সন্তুষ্ট হন নি, কিন্তু গড়-পাঠকের কাছে তা হয়েছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও আদরণীয়।
শরৎচন্দ্রের যে-সব উপন্যাস বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, ‘দেবদাস’ তার অন্যতম। ‘দেবদাস’ উপন্যাসে সামন্ত ব্যবস্থার নানা খÐচিত্র উপস্থাপিত হলেও, এটি একান্তই প্রেমের উপন্যাস। হৃদয়মথিত ভালোবাসা আর অন্তরছেঁড়া যন্ত্রণার যে-ছবি শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে চিত্রিত, বাঙালি পাঠক সেখান থেকে লাভ করেছে তার সাহিত্য-পিপাসার অফুরান আস্বাদ। ‘দেবদাস’ উপন্যাস সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। বাঙালির ঘরে ঘরে অতীতের মতো আজও জনপ্রিয় এক উপন্যাস ‘দেবদাস’।
‘চরিত্রহীন’ শরৎচন্দ্রের এক বিতর্ক-কণ্টকিত উপন্যাস। শরৎচন্দ্রের আত্ম-বিশ্লেষণে চরিত্রহীন elhical, scientific  এবং psychological উপন্যাস—এখানে এক বিন্দুও immorality নেই। শত নিন্দা-অপবাদ-বিতর্ক সত্তে¡ও ‘চরিত্রহীন’ শরৎচন্দ্রের অন্যান্য উপন্যাসের মতোই বিপুলভাবে পাঠকনন্দিত হয়েছে। শরৎ-উপন্যাসের জনপ্রিয়তার মৌল উপাদানরাশি ‘চরিত্রহীন’-এ বর্তমান। ভাবাবেগের প্রাবল্য, চিন্তার গোজামিল, আকস্মিকতা, সেবাপরায়ণা নারী, সেবাকাক্সক্ষী উদাসীন পুরুষ, ভাবালুতা ও উচ্ছ¡াস—শরৎ-সাহিত্যের এইসব আবশ্যিক উপাদান ‘চরিত্রহীন’কে এনে দিয়েছে বিস্ময়কর জনপ্রিয়তা। ব্যক্তির সমগ্রতার পরিবর্তে এ উপন্যাসেও ভাবাবেগতাড়িত কতগুলো খÐ মানুষই মুখ্য হয়ে উঠেছে—শেষ পর্যন্ত অক্ষুণœই থেকে গেছে শরৎচন্দ্রীয় শিল্প-প্যাটার্ন। আতিশয্য ও ভাবাবেগের কারণে এ উপন্যাসের সংগঠন হয়ে পড়েছে শিথিল ও এলায়িত।
‘দত্তা’ সরল প্রেমের উপন্যাস। নানা বন্ধুর ও জটিল পথ অতিক্রম করে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে প্রেম সার্থকতার পথ খুঁজে পায়। পারিবারিক ও সামাজিক ঘূর্ণাবর্তে তাঁর প্রিয় চরিত্রাবলিকে নিক্ষেপ করে শরৎচন্দ্র অন্তিমে তাদের পৌঁছে দেন এক আনন্দিত অলকাধামে। ‘দত্তা’ উপন্যাসেও প্রেমের রাজ্যে আমরা বাধা-বিঘেœর উপল-বন্ধুর পথ-পরিক্রমা লক্ষ করি। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের সংগঠনশৈলী সরল ও একমুখী। রূপকথার গল্পের মতো একমাত্রিক ঘটনাস্রোত পৌনঃপুনিকভাবে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে অনুসৃত হতে দেখি। ‘দত্তা’ উপন্যাসেও তার ব্যতিক্রম দেখা যায় না। কাহিনির অগ্র-পশ্চাৎ গতি, সময়ের বহুমাত্রিক ব্যবহার, মাইক্রো ও ম্যাক্রো-টাইমের নিপুণ বিন্যাস, দৃষ্টিকোণের রূপ-রূপান্তর—আধুনিক উপন্যাসের করণকৌশলগত এ সব বৈশিষ্ট্য শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় না ‘দত্তা’ উপন্যাসেও।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসধারায় ব্যতিক্রমী এক নির্মাণ ‘গৃহদাহ’। এ উপন্যাসই শরৎচন্দ্রের একমাত্র সৃষ্টি, যেখানে সাধিত হয়েছে হৃদয়াবেগের সঙ্গে মননের সমন্বয়। ‘গৃহদাহ’ উপন্যাসে ব্যবহৃত হয়েছে একটি ত্রিভুজ প্রেমের প্লট। শরৎচন্দ্রের অন্য উপন্যাসের সঙ্গে ‘গৃহদাহ’র মৌল পার্থক্য এই যে, এখানেই তিনি প্রেমকেন্দ্রিক প্লটের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ধরতে চেয়েছেন আধুনিক নরনারীর দাম্পত্য-জীবনের বহুভুজ সংকট। আধুনিক মানুষের চিত্তজাগতিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতা, দাম্পত্য-বিষয়ে পুরুষের আত্মজিজ্ঞাসা, নারীর আত্মস্বরূপ উন্মোচন—ইত্যাদি বিষয়ে এ উপন্যাসে যেভাবে পাওয়া যায়, শরৎচন্দ্রের অন্য কোনো উপন্যাসে তা পরিদৃষ্ট নয়। এ কারণে ‘গৃহদাহ’কেই শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে আধুনিক উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। শরৎচন্দ্র মুখ্যত বহির্বাস্তবতার শিল্পী। অন্তর্বাস্তবতা বিশ্লেষণের চেয়ে বহির্বাস্তবতার বিবরণ প্রদানেই তিনি সমধিক আগ্রহী। কিন্তু ‘গৃহদাহ’ উপন্যাসে এই গতানুগতিক পথে তিনি বিচরণ করেন নি। এখানে কাহিনিবৃত্তের মাঝেই মনস্তত্ত¡ বিশ্লেষণের প্রাথমিক প্রতিশ্রæতির স্বাক্ষর বর্তমান। তাই বহির্বাস্তবতার পরিবর্তে চরিত্রের মনোধর্ম আর মনস্তত্ত¡ই এ উপন্যাসে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। 
বাংলাদেশের সামন্ত ব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি ও অসদ্ভাব নিয়ে গড়ে উঠেছে শরৎচন্দ্রের দেনা-পাওনা উপন্যাস। শতবর্ষ পূর্বে বাংলায় সামন্ত-শোষণের বহুমাত্রিক চিত্র এবং তৎকালীন গ্রামীণ-অর্থনীতির স্বরূপ ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসে প্রতিভাত। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিককার বাংলার পল্লি-অর্থনীতি এবং জমিদারি ব্যবস্থার অন্তর্গত পল্লির সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের ছবি আলোচ্য উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য। ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসে সামাজিক স্তরবিন্যাসের যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে বহু শ্রেণির উপস্থিতি আমরা লক্ষ করি। জমিদার, জমিদারের গোমস্তা, পেয়াদা, মহাজন, গ্রাম্য ডাক্তার, উপস্বত্বভোগী নানা পেশাজীবী, এবং দরিদ্র প্রজাসাধারণ—এইসব বিচিত্র অর্থনৈতিক-শ্রেণির মানুষের সাক্ষাৎ মেলে এই প্রতিবেদনে। এইসব বিচিত্র শ্রেণির মানুষের পরস্পর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিল্পিত হয়েছে তৎকালীন সামন্ত-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যা আমাদের বিবেচনায়, ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অনুষঙ্গ।
বাংলা রাজনৈতিক উপন্যাসের ধারায় শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ এক স্মরণীয় নির্মাণ। তাঁর আত্মজৈবনিক উপাদান ও অভিজ্ঞতার উত্তাপে ঋদ্ধ এ উপন্যাস। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ‘সন্ত্রাসবাদী’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে ‘পথের দাবী’। তবে কেবল স্বাধীনতাই নয়, এর সঙ্গে জীবনের মহত্তর বিকাশের কথাও এখানে উচ্চারিত। রাজনৈতিক উপন্যাসে শিল্পের দাবি আর রাজনীতির চাহিদা—এ দুয়ের সমন্বয় সাধন সহজ কথা নয়। ‘পথের দাবী’ উপন্যাসে নায়কের বিপ্লবী সত্তা ও তার অন্তর্ভেদী আত্মজিজ্ঞাসার কোনো স্বাভাবিক সমন্বয় সাধিত হয় নি। এ কারণেই এ উপন্যাস নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের প্রধান লক্ষণ আবেগের অবারিত প্রবাহ এ উপন্যাসেও পরিলক্ষিত। 
‘শেষপ্রশ্ন’সহ শরৎচন্দ্রের অন্যান্য উপন্যাসেও আমরা তাঁর উপর্যুক্ত জীবনদর্শন ও শিল্প-ভাবনার প্রকাশ লক্ষ করি। উপন্যাসের মতো ছোটগল্পেও শরৎচন্দ্রের প্রধান শিল্প-উপাদান হার্দ্য-আবেগ। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘মহেশ’, ‘বিলাসী’, ‘সতী’—এসব গল্পের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। বাঙালির ফেলে-আসা অতীত জীবন এসব গল্পে যেমন রূপ পেয়েছে, তেমনি রূপ পেয়েছে তার স্বপ্নমুখী জীবনও।
শরৎচন্দ্র উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখতে শুরু করেছেন আজ থেকে সোয়াশো বছর পূর্বে। ব্যক্ত হয়েছে যে, তাঁর মৃত্যুর পরেও আমরা পেরিয়ে এসেছি প্রায় নব্বই বছর। এই দীর্ঘ সময় ধরে পাঠকের কাছে সমান জনপ্রিয় থাকা কম ঈর্ষার কথা নয়। একুশ শতকের পাঠকরুচির কাছে শরৎচন্দ্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবেন সে এক ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু গড়-পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় থাকার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো জাদু আছে। এ জাদুশক্তিই শরৎচন্দ্রকে বাঁচিয়ে রাখছে এবং বাঁচিয়ে রাখবে। লেখাই বাহুল্য যে, ফেলে-আসা জীবন আর নস্টালজিয়া এবং একান্নবর্তী পরিবারের স্নিগ্ধতার মাঝেই লুকিয়ে আছে শরৎচন্দ্রীয় জাদুর সোনার কাঠি, রূপার কাঠি।

Leave a Reply

Your identity will not be published.