ধারাবাহিক উপন্যাস : মহররমের মিছিলে

ধারাবাহিক উপন্যাস :  মহররমের মিছিলে

[‘অলাতচক্র’ একটা নারী গোয়েন্দা এজেন্সি। অলাতচক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পেশায় কাজ করে কিন্তু পাশাপাশি তারা অলাতচক্রের সদস্য। অলাতচক্র গ্রুপের নাম সদস্যদের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে বানান, মানে : অ = অনীলা। লা = লাবণি। ত = তন্বী। চ = চন্দ্রিমা। ক্র = ক্রমেলা। 
এই থ্রিলার উপন্যাসটিতে দেখা যায়, পুরোনো ঢাকার মহররমের মিছিলে ‘তাতবির’ করতে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় প্রাণ হারায় তরুণ অপু। পুলিশ প্রাথমিক সুরতহালে একে অতিরিক্ত রক্তরক্ষণজনিত সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিলেও, সিআইডি এএসপি লাবণির তীক্ষè নজর এড়ায় নি এর পেছনের অসঙ্গতি। অপুর শরীরে অগণিত ধর্মীয় ক্ষতের ভিড়ে কি লুকিয়ে ছিল কোনো সুনিপুণ ঘাতকের ছদ্মবেশী আঘাত ? মৃত্যু-পূর্ববর্তী সেই রহস্যময় ফোন কল আর পাওনাদারের সাথে বিরোধ কি স্রেফ কাকতালীয়, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নিপুণ ষড়যন্ত্র ? মহররমের ভিড় আর মাতমের আবহে ঢাকা পড়া এক সন্দেহজনক মৃত্যুর জট খুলতে নামে ধীসম্পন্ন গোয়েন্দা লাবণি।]

৮
কক্সবাজারে বরুণ মার্মার কেস ঘাঁটতে গিয়ে ঢাকায় অপু হত্যার কাহিনি প্রায় ঝাপসা হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল। ধানমন্ডি থানার ওসি আবদুল ওয়াহাব ভোরসকালে দুটো ফুটেজ পাঠিয়ে লিখেছেন, আপা, যা ভেবেছিলাম, তাই। ভিক্টিম নিজের ভুলের কারণেই মরেছেন। তার জন্য আমার খারাপ লাগছে কিন্তু ভেবে দেখুন এই কেস নিয়ে আর এগোনোর দরকার আছে নাকি ?
গোয়েন্দা লাবণি প্রথমে ড্রোনে তোলা ফুটেজটা দেখল। ক’জন যুবক এবং মধ্যবয়সী পুরুষ মহরমের মিছিলের মাঝেই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তাতবির করছে। ওদের কাঁধ ঝাঁকানোর ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মরণে ওরা খুবই উদ্দীপ্ত। ছুরি দিয়ে শরীরে আঘাত করা এখন নিষিদ্ধ, কিন্তু এরা সব সময় নিষেধ মানে না। একটু পরই এরা প্রবহমান মিছিলে মিলিয়ে গেল। দ্বিতীয় ভিডিওটা ধানমন্ডি লেকের কোনো অ্যাপার্টমেন্টের সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। ভিডিওর রেজোলিউশন ভালো না। তবে লম্বা গড়নের অপুকে চিনতে অসুবিধে হচ্ছে না। লেক থেকে সবাই ফিরে যাচ্ছে, অপু লেকের ধারে এক কোণে গিয়ে প্রথমে ঘাসের ওপর বসল। মিনিট খানেকের ভেতরই ও বসা অবস্থা থেকে শুয়ে পড়ল। মনে হচ্ছে অপু ঘাসের ওপর শরীর বিছিয়ে দিয়ে আকাশ দেখছে। হয়তো সে আকাশই দেখছে, কিন্তু শেষবারের মতন।
না, কোনো ভিডিও ফুটেজেই নাশকতার চিহ্ন নেই। কিন্তু তাতে কী প্রমাণ হয় ? বাকি সময়টায় কেউ যদি কিছু করে থাকে তার প্রমাণ তো এই দুই ভিডিওতে পাওয়া যাবে না। লাবণি বিরক্ত বোধ করল। ঢাকা আর চট্টগ্রামের কেসের একটাই মিল, দুই থানার ওসিই কেস ক্লোজ করতে চাচ্ছেন। তাদের বদ্ধমূল ধারণা এগুলো ওপেন অ্যান্ড শাট কেস। কিন্তু লাবণির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, দুটো মৃত্যুর একটাও স্বাভাবিক না। ঢাকার কেস ঝুলে যাওয়ার আগেই লাবণিকে ঢাকা ফিরে যেতে হবে। কিন্তু তার আগে কক্সবাজারের কেসের কিনারা করা দরকার।
লাবণির চাপেই কক্সবাজার সদরের ওসি সোমেন সমাদ্দার কেস নিয়ে এখনো তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। বরুণ মার্মা পলাশ হোটেলে উঠেছিলেন, পুলিশ হোটেলের রুম থেকে তার ল্যাপটপটা উদ্ধার করেছে। ল্যাপটপ ঢাকায় ডিজিটাল ফরেনসিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। খবরটা শুনে লাবণি খুশি হলো। বরুণ মার্মা নিশ্চয়ই তার রিপোর্ট কম্পিউটারে সেভ করেছেন। তা ছাড়া ওনার ইমেইল চালাচালি থেকেও অনেক তথ্য উঠে আসতে পারে। কিন্তু এজন্য আরও ক’দিন অপেক্ষা করতে হবে ?
রোহিঙ্গা শিবিরের সিআইসি তাহমিনা খান এনজিওগুলোর লিস্ট ইমেইল করেছেন। সেই লিস্ট মিলিয়ে চন্দ্রিমা উখিয়া ক্যাম্পের চারটা এনজিওর সাথে কথা বলেছে। সবাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই তথ্য দিয়েছে। বরুণ মার্মা এইডস পেশেন্ট নিয়েই কাজ করছিলেন। প্রতিটা এনজিওতে বরুণ মার্মা একটা রুটিন সার্ভে করেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন ক্যাম্পে কতজনের ক্যানসার হয়েছে, কতজন চিকিৎসা নিচ্ছে, কী চিকিৎসা নিচ্ছে, সারভাইভাল রেট কত, এইসব। লাবণি চন্দ্রিমাকে বলল, একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না।
কী ?
চিকিৎসা, সারভাইভাল রেট, এসব জেনে বরুণ মার্মার লাভ কী? উনি তো পাবলিক হেলথ নিয়ে গবেষণা করছেন না।
সেটাই তো, একজন ক্রাইম রিপোর্টার কেন এসব পাবলিক হেলথের প্রশ্ন করবে ?
এই ব্যাপারটা নিয়ে আরেকটু ভাবতে হবে। কিছু একটা মিস হচ্ছে। মাথাটাকে আরেকটু খেলাতে হবে।
তাহলে আজ আমার সাথে রাঙ্গামাটি চলো। ওখানে আরও গভীর মনোযোগে এসব নিয়ে ভাবতে পারবে। একরাত কাটিয়ে কাল ফিরে আসব। আমি কিন্তু আম্মাকে বলে দিয়েছি।
লাবণি আসলে ঢাকা ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিল। কারণ কক্সবাজারের তথ্য যা নেওয়ার নেওয়া হয়ে গেছে। ল্যাপটপটাও ঢাকায় ডিজিটাল ফরেনসিকে যাচ্ছে। ফেরার আগে রাঙ্গামাটি ঘুরে আসাটা মন্দ না।
রাঙ্গামাটি যাওয়ার জন্য লাবণি অফিসের গাড়ি নিতে চায় নি। কিন্তু ওসি সোমেন সমাদ্দার নাছোড়বান্দা। জোর করে গাড়ি দিয়ে বলেছেন, আপা, কেসটা যতই সহজ হোক আপনি যতদিন এই এলাকায় আছেন ততদিন আমাদের প্রটোকল থাকবে আপনার সাথে।
ওসি সোমেন সমাদ্দারের আন্তরিক জোরাজুরির কাছে শেষমেশ হার মানতেই হলো লাবণিকে। পুলিশের সাদা রঙের পাজেরোটা যখন কক্সবাজারের সীমানা ছাড়িয়ে রাঙ্গামাটির পথ ধরল, তখন সকালের রোদ বেশ চড়েছে। সমুদ্রের নোনতা হাওয়ার জায়গা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে পাহাড়ি গাছগাছালির বুনো গন্ধ।
গাড়ির পেছনের সিটে লাবণির পাশে বসে আছে চন্দ্রিমা। তরুণ ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে মেয়েটার বেশ নামডাক, তবে আজ সে খবরের সন্ধানে নয়, যাচ্ছে লাবণিকে নিয়ে নিজের শেকড়ে। রাঙ্গামাটিতে চন্দ্রিমার বাবা-মায়ের বাড়ি, সেখানেই ক’টা দিন কাটিয়ে যাওয়ার এই হঠাৎ সিদ্ধান্তে লাবণিরও মন্দ লাগছে না। সমতলের একঘেয়েমি কাটিয়ে রাস্তা ক্রমেই সাপের মতো এঁকেবেঁকে ওপরে উঠতে শুরু করেছে। পথের দু-পাশে সারি সারি আকাশচুম্বী গর্জন আর সেগুন গাছের বন। কখনো কখনো পাহাড়ের ঢালে উঁকি দিচ্ছে সবুজ বাঁশঝাড় আর পাহাড়িদের জুমচাষের জমি। বর্ষার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটে নি, তাই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ছোট-বড় ঘনযৌবনা ঝরনাগুলো প্রবল আনন্দে পাথরের গা বেয়ে নেমে রাস্তার পাশ দিয়েই কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে। এমন বুনো আর স্নিগ্ধ রূপ দেখতে দেখতে ঢাকা ফেরার তাড়নাটা লাবণির মন থেকে অনেকটাই উবে গেল।
দুপুরের ঠিক আগে আগে গাড়ি রাঙ্গামাটি শহরে প্রবেশ করল। পাহাড়ি রাস্তা ধরে একটা বাঁক ঘুরতেই লাবণির চোখের সামনে যেন বিশাল এক নীলরঙা ক্যানভাস উন্মোচিত হলো, কাপ্তাই হ্রদ। হ্রদের ওপর ঝুলন্ত সেতুটা বাতাসে হালকা দুলে উঠছে।
শহরের কোলাহল পেরিয়ে গাড়ি চলল পাহাড়ি এলাকার সামান্য গভীরে, চন্দ্রিমাদের পাড়ায়। পাহাড়ি উপত্যকার ভাঁজে গড়ে ওঠা এই চাকমা পল্লিজুড়ে ছড়ানো-ছিটানো অনেকগুলো মাচাং ঘর। মাটি থেকে বেশ কিছুটা উঁচুতে কাঠ আর বাঁশের তৈরি বাড়িগুলো দেখে লাবণি ভাবল এত যে টেকসই স্থাপত্যের কথা বলা হয়, এগুলো তো তাই। উঁচু-নিচু পিচঢালা পথ থেকে নেমে যাওয়া সরু রাস্তা ধরে চন্দ্রিমার পিছু পিছু ওদের বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল লাবণি। হাঁটতে হাঁটতেই লাবণি খেয়াল করল, একটি বাড়ির উঠোনে রোদ পোহাতে পোহাতে এক বয়স্কা চাকমা মহিলা ‘কোমর তাঁতে’ সুতো বুনছেন। দক্ষ সুতোর বুননে ফুটে উঠছে ওদের ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের উজ্জ্বল লাল-কালো নকশা।
চন্দ্রিমা মাঝেমধ্যেই পাড়ার মানুষজনের সাথে নিজের মাতৃভাষায় কুশল বিনিময় করছে। চন্দ্রিমাকে নিজের ভাষায় কথা বলতে দেখে লাবণির ভালো লাগছে। নিজের ভাষায় কথা বলার যে আনন্দ, তার কোনো তুলনা হয় না। চন্দ্রিমাদের বাড়ির কাছে আসতেই ওর বাবা-মা মেয়ে আর তার অতিথিকে স্বাগত জানালেন। তারা অতিথির জন্য রান্না সেরে ফেলেছেন। কারণ ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে পাহাড়ি মসলা, বাঁশকোড়ল ভাজি আর জুমের চালের ভাতের চমৎকার সুবাস। আজ সকালে লাবণি একটা বিস্কিট আর এক কাপ চা খেয়েছে। খাবারের সুঘ্রাণে ওর ক্ষুধাটা চাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা বোধহয় ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন। সামান্য কুশল বিনিময়ের পরেই তারা দুপুরের খাবার পরিবেশন করলেন। মন মিটিয়ে খেয়ে লাবণি আর চন্দ্রিমা খোলা বারান্দায় এসে বসল।
গোয়েন্দা জীবনের কাঠখোট্টা হিসেব-নিকেশ আর দৌড়ঝাঁপের মাঝে চন্দ্রিমার এই শান্ত-স্নিগ্ধ বাড়িটি লাবণির কাছে একটা সেফ হাউসের মতো মনে হচ্ছে।

চন্দ্রিমার মা মৈত্রী চাকমা কাছের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। বাবা সুগত চাকমা পৈতৃক পাহাড়ি জমিতে চাষবাস করেন। একসময় বাবার সঙ্গে জুম করলেও এখন তাঁর মন বেশি ফলবাগানে। পাহাড়ের ঢালু জমিটুকুতে সুগতের ছোট একটা ফলের বাগান আছে। আম আর কাঁঠালের গাছই বেশি, সঙ্গে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকটা কলাগাছ। নিচের দিকে, যেখানে মাটি একটু সমান, বছর কয়েক হলো মাল্টাও লাগিয়েছেন কারণ ইদানীং মাল্টার চাহিদা বেশি। বাড়ির কাছাকাছি জমিতে সুগত কখনো হলুদ-আদা, কখনো মরিচের চাষ করেন। আর অল্প যে নিচু জমিটুকু আছে, বর্ষায় সেখানে ধান হয়। যে বছর ফলমূল আর ফসলের ফলন ভালো, সে বছর আয়ও ভালো। আবার যে বছর ফলন খারাপ, আয়ও মোটামুটি। সংসারের নিশ্চিত টাকাটা আসলে আসে মৈত্রীর শিক্ষকতার বেতন থেকে।
খোলা বারান্দাটার কাঠের পাটাতনের উপর বেতের চেয়ারে বসে লাবণি আর চন্দ্রিমা গল্প করছে। দূর থেকে ভেসে আসছে ভেজা মাটি, বাঁশপাতা আর চুলোর কাঠের ধোঁয়া মেশানো পাহাড়ি ঘ্রাণ। এইমাত্র চন্দ্রিমার বাবা-মা ওদের সাথে যোগ দিয়েছেন। মৈত্রী চাকমা ওদের জন্য চা করে এনেছেন। চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে মৈত্রী বললেন, চন্দ্রিমা আপনার কথা অনেক বলে।
তাই নাকি ? চন্দ্রিমা আমার কথা আবার কী বলে ?
আপনি কিন্তু চন্দ্রিমার রোল মডেল। ও বলে আপনি বাংলাদেশের সেরা গোয়েন্দা। এমন কোনো অপরাধ নেই আপনি যেটার রহস্য সমাধান করতে পারেন না। আমরাও তো মাঝেমধ্যে আপনার কাণ্ডকীর্তি পত্রিকায় পড়ি।
চন্দ্রিমা একটু লজ্জা পেয়ে বলল, মা, তুমি আমার পার্সোনাল কথা লাবণি আপুকে বলছ কেন ?
‘তুমি যে ওনার এত বড় ভক্ত সেটা উনি জানলে কী অসুবিধা ?
লাবণি হেসে বলল, আন্টি, চন্দ্রিমা বাড়িয়ে বলেছে। আমার চেয়ে ভালো গোয়েন্দা বাংলাদেশে আরও অনেক আছে। কিন্তু সবাই হয়তো আমার মতো সৌভাগ্যবান না, তাই মিডিয়া অ্যাটেনশন পায় নি।
চন্দ্রিমার বাবা যোগ করলেন, হ্যাঁ, আমরা এটাও শুনেছি যে আপনি খুবই বিনয়ী।
চন্দ্রিমা আর লাবণি দুজনেই হেসে ফেলল। মৈত্রী বললেন, ‘আমার কিন্তু চন্দ্রিমাকে নিয়ে খুব ভয় হয়।’
‘তাই ? ভয়ের কারণ কী ?’
‘এই দেশে কি সব জাতের মানুষের সমান দাম আছে ? চন্দ্রিমাকে কতবার বলেছি এসব ক্রাইম রিপোর্ট করার দরকার নেই। খামোখা শত্রু বানানো। তার চেয়ে নাটক-সিনেমা নিয়ে লেখো, অথবা আমার মতো কোনো স্কুলে পড়াও। একটা ক্ষতি হয়ে গেলে কেউ কি আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে! ও কী বলে জানেন ?
কী ?
ও বলে, ওর কোনো বিপদ হলে আপনি ওকে রক্ষা করবেন।
কথাটা শুনে লাবণি খুশি হলো, কিন্তু বলল, চন্দ্রিমার কোনো বিপদ হলে অবশ্যই আমি ওর জন্য এগিয়ে আসব। কিন্তু কতটুকু পারব সেটা তো বলতে পারি না। এ কারণে সাবধানে চলাই ভালো।
চন্দ্রিমার বাবা-মা কিছুক্ষণ গল্প করে নিজেদের ঘরে চলে গেলেন। চন্দ্রিমা বলল, আপু, সন্ধ্যার পর শহরটা একটু নিরিবিলি থাকে, দিনে তো পর্যটকদের যন্ত্রণায় টেকা দায়।
হ্যাঁ, চলো বের হই।
সঙ্গে গাড়ি আছে। তাই ওরা গাড়ি নিয়েই বের হলো। তবলছড়ি বাজার আর সবুজসঙ্ঘ মঠ পেরিয়ে গাড়ি এসে থামল পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের পার্কিংয়ে। লাবণি বলল, ড্রাইভার সাহেব, আপনিও আসেন।
আপা, আমি রাঙ্গামাটি অনেকবার এসেছি। আমি গাড়িতে ওয়েট করি। আপনারা ঘুরে আসেন।
চন্দ্রিমা আর লাবণি হাঁটতে হাঁটতে ঝুলন্ত ব্রিজের উপর চলে এল। ব্রিজের কাঠের পাটাতনে ওদের দুজনের পায়ের শব্দ ছাড়া এই মুহূর্তে সমস্ত চরাচর নীরব। কাপ্তাই লেকের জল শান্ত হলেও ব্রিজটা বাতাসে সামান্য দুলছে। চন্দ্রিমা বলল, আপু, বিকেলে আম্মু তোমাকে আড়ালে ডেকে কী বলল ?
কেন, তুমি কি একটুও ধারণা করতে পারছ ?
আমার বিয়ে নিয়ে কথা বলেছে ?
হ্যাঁ বলল উনি একটা ছেলে দেখে রেখেছেন। ওনার বান্ধবীর ছেলে। ঢাকা ব্যাংকে চাকরি করে। এখন তোমাকে রাজি করাতে হবে।
আম্মুকে বলে দিও আমি এখন এসব বিয়েটিয়ে নিয়ে ভাবতে চাই না।
'চাকমা ছেলেরা তো শুনেছি বাঙালি ছেলেদের মতো পজেসিভ না, তাহলে সমস্যা কী ?
ভালো হলেই হবে ? আমার নিজের একটা পছন্দ-অপছন্দ থাকবে না ? তা ছাড়া এখন ক্যারিয়ার করার সময় সেধে ঝামেলায় জড়াতে চাই না। তুমি তো নিজেই বিয়ে করো নি।
ইউ মেইড ইওর পয়েন্ট। আন্টিকে জানিয়ে দেব।
আপু, উপরে তাকাও।
লাবণি আকাশের দিকে তাকাল। ঈষৎ কালো আকাশজুড়ে অসংখ্য নক্ষত্র ছড়িয়ে আছে, কোথাও ঘন, কোথাও ফাঁকা, যেন অন্ধকারের গায়ে কেউ মুঠোভর্তি হীরার কণা ছুড়ে দিয়েছে। ঢাকায় আলোক-দূষণের কারণে এমন উদ্ভ্রান্ত আলোর মালা লাবণি কখনোই দেখতে পায় না। লাবণি মুগ্ধ কণ্ঠে বলল, ইশ, কী একটা অবস্থা! মনে হচ্ছে হাজার হাজার তারা মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে লাইভ কনসার্ট দেখছে।
চন্দ্রিমা বলল, আর আমার মনে হচ্ছে দাঙ্গাবাজ আলোগুলো কোনো শব্দ না করেই বিরাট হইচই বাঁধিয়ে দিয়েছে।
একটা শব্দ কিন্তু এখন পাওয়া যাচ্ছে।
চন্দ্রিমা কান পাতল। তারপর হেসে বলল, আপু, সেটা নক্ষত্রের কোলাহল না। একটা স্পিডবোট আসছে এদিকে।
এই রাতে ?
সামনেই তো বিজিবির ক্যাম্প। টহল দিচ্ছে মনে হয়। ওই যে আপু, দেখো।
চন্দ্রিমা আঙুল দিয়ে ইশারা করল। দূরে অন্ধকারের মধ্যে একটা সাদা আলো দেখা যাচ্ছে। আলোটা কখনো পানির ওপর পড়ছে, কখনো মিলিয়ে যাচ্ছে। ইঞ্জিনের শব্দও ক্রমে জোরালো হচ্ছে। চন্দ্রিমা বলল, আপু, এখন স্পিডবোটটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
হ্যাঁ, বোটটা ব্রিজের নিচ দিয়ে তাড়াতাড়ি বিদায় হলে আমরা পরিবেশটা উপভোগ করতে পারতাম।
কিন্তু ব্রিজের কাছে এসে স্পিডবোট গতি একদম কমিয়ে দিয়েছে। লাবণি চন্দ্রিমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী ব্যাপার ? এখানে থামল কেন ?
হয়তো ভাবছে আমরা ইয়াবা বিক্রি করছি কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী। জানোই তো পার্বত্য অঞ্চলের কী অবস্থা। সব সময় সব দোষ আমাদের।
হ্যাঁ, রেকি করছে। কিন্তু এটা বিজিবির বোট মনে হচ্ছে না। নেভিগেশন লাইট নেই। দেখি, আমি কথা বলি।
লাবণি ব্রিজ থেকে মাথা বাড়িয়ে নিচের দিকে তাকাতেই স্পিডবোট থেকে আসা সার্চলাইটের তীব্র আলোয় ওর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পরপর দুটো গুলির শব্দে রাতের আকাশ বিদীর্ণ হলো। কতগুলো শালিক পাখি আতঙ্কে চিঁ চিঁ করতে করতে লেকের ধারের জারুল গাছের মাথা থেকে পাখা ঝাপটে উড়ে গেল। একটা গুলি লাবণির একদম কান ঘেঁষে চলে গেছে। পনেরো বছর কর্মজীবনে লাবণিকে কেউ কখনো এভাবে সরাসরি গুলি করে হত্যার চেষ্টা করে নি। লাবণি চন্দ্রিমার হাত টান দিয়ে বলল, চন্দ্রিমা দৌড়াও।
লাবণি আর চন্দ্রিমা এখন রাঙ্গামাটির ব্রিজের ওপর দিয়ে তীব্র বেগে দৌড়াচ্ছে। স্পিডবোটটা ব্রিজের সমান্তরালে ছুটছে আর ওদের দিকে গুলি ছুড়ছে।

(চলবে)
 

Leave a Reply

Your identity will not be published.